ভয়ানক থেকে ভাঁড় জ্বীনের ইতিহাস, নাম তার ‘আলাদিন’
আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপ: এক সাংস্কৃতিক হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত। সিরীয় যুবক হানা দিয়াবের মুখে জন্ম নেওয়া বিশুদ্ধ লোককথা কীভাবে আঁতোয়া গ্যালাঁ, ডিজনি এবং কে-ড্রামা ‘জিনি: মেক অ্যা উইশ’ -এর হাতে পড়ে বিকৃত হলো? এই প্রবন্ধে ধর্মীয় অবমাননা, সাংস্কৃতিক চৌর্যবৃত্তি এবং গ্লোবাল মিডিয়ার বাণিজ্যিক কসাইখানায় একটি ‘এতীম গল্প’ -এর আত্মা হত্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
এক অচেনা রাস্তায় পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় চোখে পড়ল ফেলে রাখা এক বই। এর পাতায় ছিল এক গল্প, কিন্তু তাতে লেখকের নাম বা গল্পের কোনো শিরোনাম ছিল না। সেই গল্পের ভাষা এতটাই জীবন্ত ছিল যে মনে হচ্ছিল আমি নিজেই তার অংশ, কিন্তু আমি তা নিজের নামে প্রকাশ করার স্পর্ধা দেখাইনি, কারণ আমি জানতাম, এই সৃষ্টি আমার নয়; এটি কোনো এক অজানা স্রষ্টার ফেলে যাওয়া স্মৃতি।
কিন্তু প্রকাশের পর গল্পটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল, মানুষ মুগ্ধ হলো, আলোচনা শুরু হলো, কে এর লেখক? উত্তর কেউ জানত না। আমি কেবল নীরব দর্শক হয়ে দেখলাম, কীভাবে এক অজ্ঞাত গল্প সকলের সম্পত্তিতে পরিণত হলো। শত শত বছর পর সাহিত্যিকেরা যখন এর উৎস খুঁজলেন, তখন তারা দেখলেন এর কোনো জনক নেই, কেউ এর পিতৃত্ব দাবি করেনি। তাই তারা এর নাম দিলেন ‘এতীম গল্প’ বা ‘অরফান টেল’। কিন্তু এই এতীম গল্পের করুণ পরিণতি কেউ সেদিন কল্পনাও করতে পারেনি।
আমি যে গল্পটির কথা বলছি, সেটি ‘আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপ’, আর তার ইতিহাস কোনো রূপকথার বিবর্তন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ শবচ্ছেদের প্রতিবেদন। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল এক সিরীয় যুবকের মুখের বিশুদ্ধ লোককথা থেকে, কিন্তু তার সমাপ্তি ঘটেছে গ্লোবাল মিডিয়ার বাণিজ্যিক কসাইখানায়, যেখানে তার আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করে ধর্মীয় অবমাননার চূড়ান্ত অধ্যায় লেখা হয়েছে।
এই গল্পের বিশুদ্ধতম রূপের জন্ম হয়েছিল সিরিয়ার যুবক হানা দিয়াবের মুখে। ১৭০৮ সালে প্যারিসে এসে তিনি যখন ফরাসি প্রাচ্যবিদ আঁতোয়া গ্যালাঁকে এই লোককথা শোনান, তখন তার কোনো লিখিত অস্তিত্ব ছিল না। দিয়াবের গল্পটি ছিল তার নিজের আলেপ্পোর ধুলোমাখা বাজার, বাণিজ্যিক নৈতিকতা আর লোকবিশ্বাসের এক প্রাণবন্ত মিশ্রণ। তার ‘আলাদিন’ ছিল চীনের এক ইসলামি সংস্কৃতির কিশোর, তার জাদুকর ছিল আফ্রিকার এক কালো জাদুর সাধক, আর তার জ্বীন ছিল এক আদিম, ভয়ংকর শক্তি; ধোঁয়ার স্তম্ভ, জ্বলন্ত চোখ আর বজ্রের মতো কণ্ঠস্বর নিয়ে সে ছিল প্রকৃতির এক অদম্য শক্তি।
দিয়াবের গল্পে ইচ্ছার কোনো গৎবাঁধা নিয়ম ছিল না, ছিল মালিকের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গল্পটির একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি ছিল, লোভের প্রতীক জাদুকরের পতন এবং দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে জ্বীনের মুক্তি। কিন্তু এই বিশুদ্ধ আত্মার গল্পটির ওপর প্রথম আঘাত হানেন গ্যালাঁ নিজেই।
তিনি ১৭১২ সালে তার ‘আরব্য রজনী’র ফরাসি অনুবাদে গল্পটি অন্তর্ভুক্ত করেন, কিন্তু হানা দিয়াবের নাম উল্লেখ না করে এটিকে নিজের সংগ্রহের অংশ হিসেবে চালিয়ে দেন। এটি ছিল প্রথম সাংস্কৃতিক চৌর্যবৃত্তি, এক সিরীয় গল্পকথকের স্মৃতিকে মুছে দিয়ে তাকে ইউরোপীয় পাঠকের জন্য এক ‘অরিয়েন্টাল ফ্যান্টাসি’ হিসেবে মোড়কজাত করা হলো।
এখান থেকেই শুরু হলো এতীম গল্পটির পরিকল্পিত হনন এবং তার আত্মাকে বিকৃত করার দীর্ঘ, যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া।
ইউরোপের হাতে পড়ার পর গল্পটির আত্মাকে ধীরে ধীরে বিকৃত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ইউরোপীয় পুনর্লিখনে গল্পটির ওপর এক নিষ্ঠুর সাংস্কৃতিক অস্ত্রোপচার চালানো হয়। জ্বীনের অসীম এবং ভয়ংকর শক্তিকে শিশুদের উপযোগী ‘তিন-ইচ্ছা’র সরল নিয়মে বেঁধে ফেলে তার আদিম সত্তাকে খর্ব করা হলো। এটি ছিল গল্পের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক গভীরতাকে সমূলে উৎপাটন করার একটি নির্লজ্জ প্রচেষ্টা। এর চেয়েও ভয়ংকর ছিল মুসলিম এবং আরব চরিত্রগুলোকে লোভী, ধূর্ত ও কপট হিসেবে চিত্রিত করে প্রাচ্য-বিরোধী যে বর্ণবাদী কালিমা লেপন করা হয়েছিল, তা উপনিবেশিক মানসিকতার এক কদর্য প্রতিফলন।
দিয়াবের গল্পের যে বাণিজ্য-নৈতিকতা এবং বিশ্বস্ততার পুরস্কারের বার্তা ছিল, তা সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হলো। এরপর উনিশ শতকের থিয়েটার এবং প্যান্টোমাইম জ্বীনের ভয়াল রূপকে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে একজন দরবারি ভাঁড়ে পরিণত করল, যার একমাত্র কাজ দর্শকদের হাসানো। এভাবে, একটি গভীর নৈতিক রূপক এক অগভীর বিনোদনে পরিণত হলো।
একজন সিরীয় বণিকের মুখে জন্ম নেওয়া আফ্রিকান-চীনা-আরব সংস্কৃতির মিশ্রণটি ফরাসি কলমের মাধ্যমে ইউরোপের হাতে পড়ে তার মূল পরিচয় হারিয়ে এক বিকলাঙ্গ রূপকথায় পরিণত হলো, যার শরীর আছে, কিন্তু আত্মা নেই।
এই সাংস্কৃতিক বিকৃতির চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে বাণিজ্যিক রূপটি আমরা দেখতে পাই ডিজনির হাতে। ১৯৯২ সালের অ্যানিমেশন এবং পরবর্তী ২০১৯ সালের লাইভ-অ্যাকশন সংস্করণ ছিল আলাদিনের গল্পকে এক চকচকে, সংগীতময় মোড়কে পুরে বিশ্বজুড়ে বিক্রি করার এক নিখুঁত কর্পোরেট কৌশল। ডিজনি আলাদিনের আত্মাকে একটি সাংস্কৃতিক শিল্প-দানবের কসাইখানায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে তার নৈতিকতার শেষ চিহ্নটুকুও কেটে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করা হয়েছে।
দিয়াবের গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা ছিল জ্বীনের মুক্তি, যা ছিল দাসত্ব-বিরোধী এক কালজয়ী রূপক। ডিজনি সেই রূপকটিকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলে ‘সেলফ-ডিসকভারি’র মতো এক ফাঁপা পশ্চিমা থিম দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে।
‘আগরাবাহ’ নামক এক কাল্পনিক আরব শহর তৈরি করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিকে কিছু দস্যু, বাজার আর মিনারেটের এক স্থূল ক্যারিকেচারে পরিণত করা হয়েছে, যা আদতে এক সাংস্কৃতিক চিড়িয়াখানা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উদ্বোধনী সংগীতের “It's barbaric, but hey, it's home” লাইনটি বিতর্কের মুখে পরে সরিয়ে নেওয়া হলেও, সেই ‘বারবারিক’ বা বর্বর মানসিকতার চিত্রায়ণ পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে রয়ে গেছে।
নারী ক্ষমতায়নের নামে রাজকন্যা জেসমিনকে স্বাধীনচেতা হিসেবে দেখানো হলেও, তা ছিল শুধুমাত্র বাজারের চাহিদা মেটানোর একটি কৌশল, যা লোকদেখানো প্রগতিশীলতার ভণ্ডামি মাত্র। দিনশেষে, ডিজনির ‘আলাদিন’ ছিল শুধু গ্লিটার, গান আর বক্স অফিস রেকর্ডের এক সফল প্যাকেজ, যার ভেতরে দিয়াবের সেই এতীম গল্পের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। দিয়াবের মুখে জ্বীন ছিল মুক্তির প্রতীক; ডিজনির পর্দায় সে পরিণত হলো এক বিনোদন-মেশিন।
তবে এই গল্পের কফিনে শেষ এবং সবচেয়ে অবমাননাকর পেরেকটি ঠুকেছে ২০২৫ সালের কাল্পনিক কে-ড্রামা ‘জিনি: মেক অ্যা উইশ (Genie, Make a Wish)’। এই সিরিজটি সাংস্কৃতিক বিকৃতিকে অতিক্রম করে সরাসরি ধর্মীয় অবমাননার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর লেখিকা কিম ইউন-সুক ‘ক্রিয়েটিভ ফ্রিডম’-এর নামে যা করেছেন, তা এক কথায় সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস এবং ধর্মতাত্ত্বিক ধৃষ্টতা।
ইসলাম ধর্মে যে ইবলিস বা শয়তানকে চূড়ান্ত মন্দ এবং অভিশপ্ত সত্তা হিসেবে দেখা হয়, তাকে এই সিরিজে এক সুদর্শন, দুঃখী এবং রোমান্টিক ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এটি কেবল মুসলিম দর্শকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতই নয়, এটি একটি জীবিত ধর্মের পবিত্র প্রতীককে বিকৃত করে বাণিজ্যিক লাভের চূড়ান্ত নিদর্শন। এটি ছিল নির্মাতাদের পক্ষ থেকে এক নির্লজ্জ ঔদ্ধত্য, যেখানে তারা ধরে নিয়েছেন যে, একটি সংস্কৃতির ধর্মীয় বিশ্বাসকে ইচ্ছেমতো ভাঙচুর করার অধিকার তাদের রয়েছে। #BoycottGenieMakeAWish হ্যাশট্যাগ এবং মুসলিম বিশ্বে সিরিজটির রেটিং শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়া প্রমাণ করে, এই আঘাত কতটা গভীর ছিল।
‘জিনি: মেক অ্যা উইশ (Genie, Make a Wish)’ সিরিজের অপরাধ এখানেই শেষ নয়। ‘বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব’-এর নামে তারা একটি সমকামী চরিত্রকে গল্পে প্রবেশ করিয়েছে শুধুমাত্র তাকে করুণভাবে হত্যা করার জন্য, যা ‘Bury Your Gays’-এর মতো একটি পুরোনো এবং ক্ষতিকর ট্রপের পুনরাবৃত্তি। এটি প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং প্রান্তিক গোষ্ঠীর আবেগকে নিয়ে এক নিষ্ঠুর মানসিক শোষণ।
গল্পে অপ্রয়োজনীয় এবং গ্রাফিক সহিংসতা যোগ করা হয়েছে শুধুমাত্র দর্শকদের সস্তা উত্তেজনা দেওয়ার জন্য, যার কোনো শৈল্পিক বা নৈতিক ভিত্তি নেই; এটি নির্মাতাদের সৃজনশীল দেউলিয়াত্বের পরিচায়ক।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এই সিরিজটি আলাদিনের মূল নৈতিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। দিয়াবের গল্পে জ্বীন দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছিল; কিন্তু এই কে-ড্রামায় ইবলিস কোনো চক্র থেকে মুক্তি পায় না, বরং অমরত্বের অভিশাপে এক রোমান্টিক চক্রে আটকে থাকে। এখানে মুক্তির কোনো বার্তা নেই, আছে শৃঙ্খলের রোমান্টিকীকরণ।
লেখিকা ‘আরব্য রজনী’র ট্যাগ ব্যবহার করে, অথচ এর ভাষা, ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বা সামাজিক নীতিকে বিন্দুমাত্র সম্মান না করে, নির্মাতারা প্রমাণ করেছেন যে তাদের কাছে প্রাচ্য সংস্কৃতি কেবল কিছু বহিরাগত উপাদানের এক স্ক্র্যাপবুক, যেখান থেকে ইচ্ছেমতো উপাদান নিয়ে বিকৃত করা যায়।
চূড়ান্ত বিচারে, হানা দিয়াবের সেই এতীম গল্পটি আজ আবার এতীম, তবে এবার তার কোনো জনক নেই বলে নয়, বরং তার আত্মাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে। পৃথিবী গল্পটিকে বিশ্বজুড়ে বিক্রি করেছে, কিন্তু তার জন্মভূমির ধর্ম, নৈতিকতা এবং ইতিহাসকে ভুলে গেছে।
আঁতোয়া গ্যালাঁ তার উৎস গোপন করে যে বিকৃতির সূচনা করেছিলেন, ডিজনি তাকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করে সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে, এবং সবশেষে কিম ইউন-সুকের মতো নির্মাতারা ধর্মীয় অবমাননা এবং সাংস্কৃতিক অপব্যবহারের মাধ্যমে তার শবদেহের উপর নৃত্য করেছেন।
‘ক্রিয়েটিভ ফ্রিডম’-এর আড়ালে এটি আসলে ছিল ‘সাংস্কৃতিক লুটপাট’, যার মধ্যে ধর্মীয় অবমাননা, টোকেনিজম, শক-ভ্যালু এবং নৈতিক বিপর্যয় সবই একসাথে মিশে আছে। দর্শক আজ কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে, কীভাবে একটি নিরপরাধ লোককথা বিশ্বায়নের দানবের হাতে পড়ে প্রথমে এতীম এবং শেষে নিহত হলো; এবার অবশ্য দর্শকের ক্ষোভ এবং ঘৃণার হাত ধরে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0