আমাদের গল্প

আমাদের গল্প

এআই-ঝড়ের পরেও কেন ফিরে এলাম? Oviyatri-এর জন্ম ও আমার পুনরারম্ভের গল্প

আমি কি আরেকটি ওয়েবসাইট তৈরি করতে ফিরে এসেছি, নাকি নিজের হারিয়ে যাওয়া লেখক ও সম্পাদক-পরিচয়ের জন্য আবার একটি ঘর বানাতে এসেছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাকে ফিরে যেতে হয়েছে ২০২১ সালের একটি রাত, কয়েকটি ভুল ডোমেইন, একটি বিক্রি হয়ে যাওয়া ওয়েবসাইট এবং এআইকে ঘিরে নিজের গভীরতম ভয়ের কাছে।

এআই-ঝড় পেরিয়ে Oviyatri প্রকাশমাধ্যমে ফিরে আসার নেপথ্য গল্প
একটি ডোমেইনের গল্প নয়, নিজের কণ্ঠ ও পরিচয়ের জন্য আবার ঘর বানানোর গল্প

২৫ আগস্ট ২০২১। অন্তর্জালের দুনিয়ায় প্রকাশক হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হয়। প্রথম ডটকম ডোমেইন ছিল backspace-journal.com। নামটি আমার স্বপ্নের তুলনায় অনেক বেশি যান্ত্রিক ছিল। দীর্ঘ নাম, উচ্চারণে জটিলতা, মনে রাখার অসুবিধা, মাঝখানে বিরক্তিকর হাইফেন। লোগো তৈরি থেকে শুরু করে অনুসন্ধানযন্ত্রে দৃশ্যমানতা কিংবা “Search Engine Optimization” নিশ্চিত করা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি জায়গায় নামটি আমাকে আটকে দিচ্ছিল।

কিন্তু একটি নাম কি শুধু উচ্চারণ ও অক্ষরের সমষ্টি? নাকি নামের ভেতরেই একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ, দর্শন ও পরিচয়ের ইঙ্গিত থাকতে হয়? তখন এই প্রশ্নের উত্তর জানতাম না। শুধু জানতাম, আমি একটি প্রকাশমাধ্যম চাই।

প্রথমে ব্র্যান্ডের নাম ছিল “BackSpace”। পরে সেটিকে বদলে “The BackSpace” করি। কারণ BackSpace নামে দেশ-বিদেশে আগে থেকেই বিভিন্ন প্রকাশনা, প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল উদ্যোগ ছিল। প্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয়ও সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে ব্র্যান্ডকে ধরে রাখার চেষ্টা চলল, কিন্তু ডোমেইন বদলাতে থাকল।

এক পর্যায়ে দুটি নতুন ডোমেইন বেছে নিয়েছিলাম:

১. TBJworld.com

২. TheBackSpaceJournal.com

এখন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমি তখন নাম নির্বাচন করছিলাম না। আমি একটি পুরোনো নামকে যেকোনোভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলাম। ডোমেইনগুলো ব্র্যান্ডকে বহন করছিল, কিন্তু আমার যাত্রাকে কোনো অর্থ দিচ্ছিল না। নাম ছিল, অথচ নামের ভেতর গল্প ছিল না।

এরপর খুঁজে পেলাম ovizatri.com। নামটি আমার তৈরি ছিল না। অন্য একজনের কাছ থেকে পুরো ওয়েবসাইটটি কিনে নিয়েছিলাম। এর সঙ্গে একটি সহজ, ছোট ও স্মরণযোগ্য নাম পেয়েছিলাম। পাশাপাশি এমন কিছু জটিলতাও পেয়েছিলাম, যা কেনার সময় পুরোপুরি বুঝিনি।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল একই উচ্চারণের একটি পরিচিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভ্রান্তি। কেউ কেউ ওয়েবসাইটে থাকা নম্বরে ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ করে জানতে চাইতেন, “অমুক বইটি কবে পাওয়া যাবে, স্যার?” কিংবা “বইটি কোথায় পাওয়া যাবে?” আমি কাউকে বিভ্রান্ত করতাম না। তাঁদের নিকটবর্তী বইয়ের দোকান বা সংশ্লিষ্ট প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলতাম।

আমি বারবার ডোমেইন বদলেছি। কিন্তু আসলে কি ডোমেইন বদলাচ্ছিলাম, নাকি নিজের প্রকাশক-পরিচয়ের জন্য একটি যথার্থ নাম খুঁজছিলাম?

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এআই-নির্ভর কনটেন্টের প্রবল স্রোত আমার কাছে এক ধরনের ঝড় হয়ে আসে। কয়েক সেকেন্ডে নিবন্ধ তৈরি হচ্ছে, ছবি তৈরি হচ্ছে, ভিডিও তৈরি হচ্ছে, একই বিষয়ের শত শত সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। আমার মনে হতে থাকে, মানুষের লেখা, গবেষণা, সম্পাদনা ও ব্যক্তিগত কণ্ঠ খুব দ্রুত মূল্য হারিয়ে ফেলবে।

আমি তখন এআইকে শুধু একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখিনি। তাকে দেখেছিলাম এমন এক প্রতিযোগী হিসেবে, যার গতি অসীম, ক্লান্তি নেই, বিরতি নেই এবং উৎপাদনের ব্যয় মানুষের তুলনায় প্রায় কিছুই নয়। সেই প্রতিযোগিতায় নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে শুরু করেছিল।

শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা ডোমেইন ovizatri.com নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিই। আমার দলের জন্য কোনো গোছানো বিদায় ছিল না। দীর্ঘদিনের শ্রম, পরিকল্পনা, অসমাপ্ত লেখা, ব্যর্থতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বলার মতো ভাষাও খুঁজে পাইনি। শুধু নীরবে চলে গিয়েছিলাম।

কিছু প্রস্থান দরজা বন্ধ করার শব্দে ঘটে না। কিছু প্রস্থান ঘটে যখন একজন মানুষ নিজের স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না।

তবু চলে যাওয়ার পরও প্রশ্নটি যায়নি। বরং ওয়েবসাইট না থাকায় প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আমি যদি আর প্রকাশক না হই, তাহলে আমি কে? আমি কি শুধু অন্যের প্ল্যাটফর্মে লেখা পোস্ট করা একজন মানুষ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম যদি আমার লেখা পাঠকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে কি লেখাটির অস্তিত্বও কমে যায়? কোনো সম্পাদক যদি শিরোনাম দেখেই লেখা না খোলেন, তাহলে কি আমার প্রশ্নের কোনো মূল্য থাকে না?

২০ অক্টোবর ২০২৫। অনলাইন জগৎ তখন আরও বেশি এআই-নির্ভর হয়ে উঠছে। সেই সময় আমি আবার ডিজিটাল প্রকাশনা নিয়ে পড়াশোনা ও পরিকল্পনা শুরু করি। মানসিকভাবে তখনও স্থির ছিলাম না। কিন্তু কয়েক মাস ধরে একটি প্রশ্ন আমাকে বারবার টেনে তুলছিল:

আমার কেন আবার একটি ওয়েবসাইট প্রয়োজন?

প্রশ্নটি আমি নিজেকে অসংখ্যবার করেছি। কোনো সহজ উত্তর পাইনি। বারবার ফিরে গিয়েছি ২৫ আগস্ট ২০২১ সালের সেই রাতে, যখন অল্প কিছু টাকা দিয়ে প্রথম ডোমেইন ও হোস্টিং কিনেছিলাম। সেই অর্থও আমাকে সাহায্য হিসেবে নিতে হয়েছিল। আমার স্বপ্নের কথা ভেবে একজন মানুষ সাহায্য করেছিলেন।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছিল না, তিনি কে ছিলেন। প্রশ্ন ছিল, তিনি কেন আমার স্বপ্নকে সাহায্য করার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন? আর আমি নিজেই কেন অন্তর্জালের এই অনিশ্চিত দুনিয়ায় পা রাখতে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম?

নিজের কাছে যদি এই যাত্রার একটি গোছানো গল্প বলতে না পারি, তাহলে কাছের মানুষদের কীভাবে বোঝাব? কীভাবে বলব যে আরেকটি ওয়েবসাইট আমার শখ নয়, আবার শুধু ব্যবসাও নয়?

ধীরে ধীরে উত্তরগুলো পরিষ্কার হতে শুরু করল।

একটি ওয়েবসাইট আমার শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য প্রয়োজন নয়। আমি অনলাইন থেকে আয় করেছি। ভবিষ্যতেও আয় হতে পারে। কিন্তু অর্থ কখনো আমার প্রথম কারণ ছিল না। আমার প্রয়োজন ছিল একটি পরিচয়, একটি স্বাধীন প্রকাশমাধ্যম এবং এমন একটি স্থায়ী ঠিকানা, যেখানে অন্য কোনো সম্পাদকের অনুমোদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কিংবা তৃতীয় পক্ষের প্ল্যাটফর্ম-নীতির ওপর আমার অস্তিত্ব পুরোপুরি নির্ভর করবে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাকে পাঠক দিতে পারে, আবার একদিন সেই পাঠক থেকে বিচ্ছিন্নও করতে পারে। কোনো ব্লগ আমাকে প্রকাশের জায়গা দিতে পারে, আবার নীতি পরিবর্তন করে আমার পুরোনো লেখা অদৃশ্যও করে দিতে পারে। কিন্তু নিজের ওয়েবসাইট অন্তত এমন একটি কেন্দ্র তৈরি করে, যেখানে আমার লেখা, পরিচয়, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ইতিহাস একটি জায়গায় সংরক্ষিত থাকে।

আমি নিয়মিত লিখি। বিভিন্ন ব্লগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপ এবং পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করেছি। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করলেও বাংলা ভাষায় ভাবতে ও লিখতে আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কিন্তু এমন বহু লেখা আছে, যা দেশের প্রচলিত পত্রিকার কাঠামোয় সহজে স্থান পায় না।

কখনো লেখার দৈর্ঘ্য সমস্যা হয়। কখনো বিষয়। কখনো প্রশ্নের তীব্রতা। কখনো প্রতিষ্ঠিত বয়ানের বাইরে দাঁড়ানো। কখনো সম্পাদক ই-মেইল খোলার আগেই শিরোনাম দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। তখন শুধু একটি লেখা অপ্রকাশিত থাকে না। ধীরে ধীরে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়, লেখক-পরিচয়, ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।

আমি মূলত নিজের জন্য লিখি। কারও ভালো লাগলে ভালো। না লাগলেও লেখাটি আমার অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও প্রশ্নের দলিল হিসেবে থেকে যায়। আমার অধিকাংশ লেখা কাউকে বিনোদন দেওয়া কিংবা তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য তৈরি হয় না। কিছু কথা আমি বলতে চাই। কিছু প্রশ্ন রেখে যেতে চাই। কিছু চিন্তা এমনভাবে সংরক্ষণ করতে চাই, যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী প্রবাহে সেগুলো হারিয়ে না যায়।

একটি নিজস্ব ওয়েবসাইট আমার কাছে শুধু প্রকাশনার জায়গা নয়। এটি আমার কণ্ঠের আর্কাইভ, লেখক-পরিচয়ের ঠিকানা এবং নিজেকে হারিয়ে না ফেলার ব্যক্তিগত ব্যবস্থা।

লেখক ও সম্পাদক, এই দুটি পরিচয় আমার কাছে স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ার কথা ছিল। পথ চলতে কিছু অর্থ এলে মন্দ নয়। একটি প্রকাশমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখতেও অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু অর্থ যদি লক্ষ্যকে প্রতিস্থাপন করে, দৃশ্যমানতা যদি লেখাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং বাজার যদি আমার কণ্ঠের বিষয় নির্ধারণ করে, তাহলে আমি হয়তো আয় করব, কিন্তু কেন যাত্রা শুরু করেছিলাম সেটিই ভুলে যাব।

পাওলো কোয়েলহোর The Alchemist আমাকে এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে করিয়ে দেয়। সান্তিয়াগো ফাতিমার প্রেমে পড়ে নিজের স্বপ্ন ভুলে যায় না। ফাতিমাই তাকে নিজের যাত্রা সম্পূর্ণ করতে উৎসাহিত করেন। অন্যদিকে স্ফটিক ব্যবসায়ী মক্কায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেও ভয়, অভ্যাস এবং পরিবর্তনের অনিশ্চয়তার কারণে সেই যাত্রা বারবার পিছিয়ে রাখেন।

উপন্যাসটির এই দুই চরিত্র আমাকে শেখায়, সত্যিকারের সম্পর্ক স্বপ্নকে থামায় না। কিন্তু ভয় ও অভ্যাস মানুষকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্নের কাছ থেকেও দূরে রাখতে পারে।

আমিও কি সেই স্ফটিক ব্যবসায়ীর মতো হয়ে যাচ্ছিলাম? নিজের প্রকাশমাধ্যমের স্বপ্ন দেখব, কিন্তু এআইয়ের ভয়, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং ব্যর্থতার স্মৃতি দেখিয়ে যাত্রা শুরু করব না?

কোয়েলহোর বহুল আলোচিত ভাবনাটির সারকথা হলো, মানুষ যখন নিজের গভীর আকাঙ্ক্ষার দিকে আন্তরিকভাবে এগোয়, তখন তার চারপাশের মানুষ, ঘটনা ও সম্ভাবনার ভেতরেও সহায়তার পথ দৃশ্যমান হতে শুরু করে। এটিকে কোনো জাদুকরী নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। লক্ষ্য পরিষ্কার হলে মানুষ সুযোগকে নতুনভাবে চিনতে পারে, সহায়তা গ্রহণ করতে পারে এবং পথের ছোট ছোট সংকেতের অর্থ বুঝতে শেখে।

আমার তৃতীয় উত্তরটি ছিল ভয়। আমি এআইয়ের কাছে হেরে যাওয়ার ভয় পেয়েছিলাম। বর্তমান সময়ে এই ভয় অস্বাভাবিক নয়। এআই কয়েক সেকেন্ডে নিবন্ধ, ছবি, ভিডিও, কোড ও বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতে পারে। একজন স্বতন্ত্র লেখকের পক্ষে এই গতি ও পরিমাণের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়।

কিন্তু আমি কেন এআইয়ের সঙ্গে পরিমাণের প্রতিযোগিতা করব? আমি কি শুধু টিকে থাকার জন্য লিখি? আমি কি কোনো যন্ত্রকে হারানোর জন্য লিখি? নাকি আমি লিখি কারণ চিন্তা না লিখলে তা ভেতরে জমে থাকে, প্রশ্ন না তুললে নিজের কাছেই অসৎ মনে হয় এবং ভাষায় না ধরলে নিজের অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারি না?

আমি এআইয়ের চেয়ে বেশি লিখতে চাই না। আমি শুধু নিজের চেয়ে বেশি সত্যভাবে লিখতে চাই।

একসময় আমার প্রশ্ন ছিল, “আমি কি এআইয়ের চেয়ে ভালো লিখতে পারি?” এখন বুঝতে পারি, প্রশ্নটিই ভুল ছিল। এআইয়ের সক্ষমতা আমার লেখক হওয়ার বৈধতা নির্ধারণ করে না। একটি যন্ত্র দ্রুত লিখতে পারে বলে আমার স্মৃতি, প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থানের মূল্য শেষ হয়ে যায় না।

আমি নিখুঁত লিখি না। অনেক সময় হয়তো গড়পড়তা লিখি। তবু আমি লিখি, কারণ লিখতে আমার ভালো লাগে। আমার লেখায় আমার জনপদ, ভুল, সম্পর্ক, আর্থিক বাস্তবতা, সামাজিক অবস্থান, ক্ষোভ, স্মৃতি, দ্বিধা ও ভাষাগত সীমাবদ্ধতা থাকে। এই অসম্পূর্ণ মানবিক অবস্থানই আমার কণ্ঠ।

এআই আমাকে সহায়তা করতে পারে। তথ্য সাজাতে পারে, ভুল ধরতে পারে, বিকল্প বাক্য দিতে পারে, গবেষণার সূত্র খুঁজে দিতে পারে। কিন্তু আমি কেন লিখছি, কোন প্রশ্নে আমার ঘুম নষ্ট হয়, কোন অভিজ্ঞতা আমাকে বদলে দিয়েছে এবং কোন সত্য উচ্চারণে আমি ঝুঁকি অনুভব করি, সেই নৈতিক অবস্থান কোনো যন্ত্র আমার হয়ে নির্ধারণ করতে পারে না।

প্রযুক্তিকে অস্বীকার করে লেখক হওয়া যাবে না। আবার প্রযুক্তির উৎপাদনক্ষমতার সামনে নিজের কণ্ঠ সমর্পণ করেও লেখক থাকা যাবে না। আমার কাজ তাই এআইকে হারানো নয়। তাকে একটি সহায়ক যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেও নিজের চিন্তা, ভাষা, দায় ও সম্পাদকীয় বিচার অক্ষুণ্ণ রাখা।

এই উপলব্ধির পর অনেক ভাবনা, পরীক্ষা ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে একটি নতুন ডোমেইন বেছে নিলাম: oviyatri.com

এবার শুধু একটি ছোট ও স্মরণযোগ্য ডোমেইন চাইনি। নামটির ভেতরেও যাত্রা, দৃশ্য, গল্প, প্রশ্ন ও ভবিষ্যতের একটি ধারণা রাখতে চেয়েছি। The BackSpace-এর স্মৃতি মুছে দিতে চাইনি। আবার পুরোনো নামকে আঁকড়ে ধরে নতুন যাত্রার সম্ভাবনাও হারাতে চাইনি।

Oviyatri আলাদা প্রকাশমাধ্যম। The BackSpace আমার সাংগঠনিক ও সৃজনশীল ইতিহাসের অংশ। পুরোনো প্রকল্প আমাকে মানুষ, দল, সম্পাদনা, প্রযুক্তি ও ব্যর্থতা সম্পর্কে যা শিখিয়েছে, নতুন প্রকাশমাধ্যম তার উত্তরাধিকার বহন করবে। তবে দুটি আলাদা পরিচয়কে জোর করে এক করে পাঠককে বিভ্রান্ত করা হবে না।

“Oviyatri” নামের নিজস্ব ব্র্যান্ড-ব্যাখ্যা

Oviya শব্দটি তামিল Oviyam শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। শব্দটি ছবি, চিত্র, অঙ্কন বা শিল্পকর্মের ধারণা প্রকাশ করে।

Yatri মানে যাত্রী, পথিক বা ভ্রমণকারী।

এই দুটি ধারণাকে মিলিয়ে Oviyatri-কে আমি চিত্র, গল্প, চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও প্রশ্নের ভেতর দিয়ে যাত্রাকারী একটি প্রকাশমাধ্যম হিসেবে দেখতে চাই। “দুঃসাহসিক পথিক” এর সরাসরি অভিধানগত অর্থ নয়। এটি আমাদের নির্বাচিত ব্র্যান্ড-দর্শন। এমন এক পথিক, যে পরিচিত রাস্তার বাইরে প্রশ্ন করতে ভয় পায় না এবং যাত্রার চিহ্ন হিসেবে লেখা, ছবি, তথ্য ও স্মৃতি রেখে আসে।

২০ অক্টোবর ২০২৫ ছিল ফিরে আসার সিদ্ধান্ত, আত্মজিজ্ঞাসা ও প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ দিন। এরপর কাঠামো, পরিচয়, প্রযুক্তি, লেখা ও প্রকাশনীতি নিয়ে কাজ চলেছে। ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে Oviyatri আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা নিউজ ও ম্যাগাজিন পোর্টাল হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

তাই এবার কোনো অনির্দিষ্ট “Coming Soon” নেই। যাত্রা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে একটি ওয়েবসাইট চালু করা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রকাশমাধ্যম তৈরি করা এক বিষয় নয়। ডোমেইন এক দিনে নিবন্ধিত হয়। সফটওয়্যার কয়েক দিনে স্থাপন করা যায়। কিন্তু প্রকাশমাধ্যম তৈরি হয় নিয়মিত লেখা, যত্নশীল সম্পাদনা, তথ্য যাচাই, পাঠকের আস্থা, ভুল স্বীকার এবং ভুল সংশোধনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায়।

Oviyatri আমার ফিরে আসা, কিন্তু আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়। এটি আগের ব্যর্থতা, ভুল নাম, বিক্রি হয়ে যাওয়া ডোমেইন, হারিয়ে যাওয়া দল, অসমাপ্ত লেখা, এআই-ভীতি এবং প্রকাশক হিসেবে নিজের অনিশ্চয়তাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন পথে যাত্রা শুরু করা।

এবার আমি শুধু একটি ওয়েবসাইট বানাতে চাই না। এমন একটি সম্পাদকীয় ঘর তৈরি করতে চাই, যেখানে তথ্য যাচাই ছাড়া দাবি প্রকাশিত হবে না, মানুষের মর্যাদাকে কনটেন্টে পরিণত করা হবে না, বাংলা ভাষাকে শুধু ট্রাফিক আনার উপায় হিসেবে দেখা হবে না এবং এআইকে লেখকের বিকল্প নয়, দায়িত্বশীল সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

আমি জানি না এই পথ কত দূর যাবে। জানি না পাঠক কতজন হবে, আয় কত হবে, অ্যালগরিদম কতটা সহায়তা করবে কিংবা এআই আগামী দিনে প্রকাশনার ভাষা কতটা বদলে দেবে। তবে এবার অন্তত জানি, কেন ফিরে এসেছি।

ফিরে এসেছি এআইকে হারাতে নয়। ফিরে এসেছি নিজের লেখক-পরিচয়কে আর অ্যালগরিদমের ভয় দিয়ে নির্ধারণ না করতে। ফিরে এসেছি এমন লেখার জন্য একটি স্বাধীন ঠিকানা তৈরি করতে, যেগুলো অন্য কোথাও জায়গা না পেলেও আমার কাছে প্রয়োজনীয়। ফিরে এসেছি কারণ একজন মানুষের নিজের ভাষায় পৃথিবীকে পাঠ করার অধিকার এখনো কোনো যন্ত্র কেড়ে নেয়নি।

এবার গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কাছের মানুষদের কাছে দোয়া চাই। যেতে হবে বহুদূর। তবে এবার আমি শুধু একটি ওয়েবসাইট সঙ্গে নিয়ে পথ চলছি না। সঙ্গে নিয়ে চলছি নিজের ভাষা, নিজের প্রশ্ন, পুরোনো ব্যর্থতা, প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন বোঝাপড়া এবং আবার শুরু করার সাহস।

আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে অভিযাত্রী কুকি ব্যবহার করে। গোপনীয়তা নীতি পড়ুন