প্রকৃত সংস্কৃতি নাকি হাইজ্যাকড সংস্কৃতি? পহেলা বৈশাখ থেকে বিজয় দিবস পর্যন্ত এক গভীর ব্যবচ্ছেদ
সংস্কৃতি কি শুধুই রবীন্দ্রসঙ্গীত আর ইলিশ ভাজা? নাকি ক্ষমতার হাতিয়ার? জানুন কীভাবে আমাদের সংস্কৃতি হাইজ্যাক হচ্ছে এবং কেন জাতীয় সংগীত বা পহেলা বৈশাখ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
সংস্কৃতি বলতে আমরা সাধারণত বুঝে থাকি: আমাদের চালচলন, আমাদের পোশাক-আশাকের স্টাইল, আমাদের কথাবার্তার ধরণ, আমাদের খাবারের মেনু এসবের সমষ্টি। আমরা সংস্কৃতি শব্দ থেকে আরো বুঝি, যা কিছুই একটি নির্দিষ্ট কমিউনিটি করতে পছন্দ করেন সেসব-ই হলো তাদের সংস্কৃতি।
সংস্কৃতি কোনো একক ব্যক্তির পছন্দ বা অপছন্দের উপর নির্ভর করে না। ধরুন, রোজ সন্ধ্যায় আমি ৫ কাপ চা পান করি। এটা কিন্তু আমাদের সংস্কৃতির পর্যায়ে যাবে না। কিন্তু বাঙালী জাতি যে চা পান করেন সেটা কিন্তু এক ধরণের সংস্কৃতি। কেউ সকালে চা পান করতে পারেন, কেউ দুপুরে, কেউ বিকেলে, কেউ সন্ধ্যায় আবার কেউ-বা রাতে।
আবার বাঙালী জাতির মধ্যে নির্দিষ্ট একটি পরিবার যদি কিছু নিয়মিত অনুষ্ঠান মেনে চলেন সেটাকেও সংস্কৃতি নামক বিশাল আমব্রেলা টার্মের মধ্যে নিয়ে আসা যায় না। দোয়া-মাহফিলের সংস্কৃতি আছে, কিন্তু সময় নির্দিষ্ট নয়। ঠিক যেমন চা পানের কথা বলছিলাম।
এখানে কেউ দুধ বিক্রি করে মদ পান করেন আবার কেউ মদ বিক্রি করে দুধ পান করেন। যদি এরকম মিল থাকে, তবে ‘মদ’ ও ‘দুধ’ দুটোই বাঙালী সংস্কৃতি। কিন্তু ‘মদ’ বা ‘দুধ’ এর মধ্যে একটি কে বাদ দিয়ে আরেকটি সংস্কৃতি তে রুপান্তরিত হতে পারে না। অবশ্য সেটাও এক ধরণের ‘Selective Culture (সংস্কৃতির রাজনীতি)’ এর মধ্যে পড়ে যায়। মানে হলো আপনি সজ্ঞানে আপনার সংস্কৃতি থেকে নির্দিষ্ট কিছু বাদ দিচ্ছেন বা দমন করছেন।
পুনরায়, সংস্কৃতি মানেই যে ভালো কিছু বুঝায় তা কিন্তু মোটেই নয়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেও বুঝবেন। চার্চের কর আরোপ এবং চার্চের নির্ধারিত পাপ-পূন্যের বিচারের সংস্কৃতি একসময় ছিলো। আজ সেটা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়। প্রচুর বই ও আর্টিকেল খুঁজে পাবেন যা ঐ সময়ের এই ধরণের সংস্কৃতি কে কটাক্ষ করে সমালোচনা করছে। ভীষণ বৈষম্যের কথা তুলে ধরছে।
এখন অবশ্য ঐ সংস্কৃতি আর জারি নাই। তারমানে হলো, সংস্কৃতি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল। বর্তমানেও আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ যৌতুক ও দেনমোহরের সংস্কৃতি খুবই পছন্দ করেন এবং মেনে চলেন। এটাও আমাদের সংস্কৃতি।
প্রশ্ন হলো, এইসব (যৌতুক ও দেনমোহর) সংস্কৃতি কি কোনোভাবে একটি ভালো সংস্কৃতি?
খুব সম্ভবত নয়। “আবার কে কাকে কত দেবে? কার স্বার্থে দেবে? কেন দেবে?” - একটু ভালো করে খেয়াল করে দেখবেন এসবও কিন্তু সংস্কৃতি আমাদের বলে দেয়। মানে সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম সম্পর্ক আছে। কারণ এটা একধরণের সামাজিক চুক্তি। আর এই সামাজিক চুক্তিতে দেনা-পাওনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি হবে সেটা কেউ না কেউ ঠিক করে দেন, মানে ক্ষমতা ব্যবহার করেন।
আর আমি এই পর্যন্ত মোট ৫টি বিষয় গুছিয়ে বলেছি,
১. সংস্কৃতি নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি পছন্দের উপর নির্ভর করে না।
২. সংস্কৃতি শুধু মিলের বা অমিলের কথা বলে না। বরং এর সাথে সাথে সময়ের কথাও বলে দেয়।
৩. সংস্কৃতি একইসাথে ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে।
৪. সংস্কৃতি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল।
৫. সংস্কৃতির সাথে ক্ষমতা জড়িত।
প্রশ্ন হলো, প্রকৃত ও বিকৃত সংস্কৃতি কি? সংস্কৃতির হাইজ্যাক হওয়া একটি জাতির জন্য কেন বিপজ্জনক?
বিকৃত সংস্কৃতি হলো, যখন কেউ জোর করে আপনার উপর কিছু চাপিয়ে দেয় বা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। যেমন আমাদের বাংলা ভাষা কে মর্যাদা না দিয়ে উর্দুকে বেশি মর্যাদা দেওয়ার কথা উঠলে ভাষা আন্দোলন ঘটে। বাকিটা ইতিহাস।
আবার অন্যদিকে আমরা দেখেছি একটা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের বুঝানো হয়েছে বাঙালী সংস্কৃতি মানেই শাড়ি পরা, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর ইলিশ ভাজা। এই দুই ধরণের চিন্তা বর্তমান বাংলাদেশে বিদেশিদের লেন্সে দেখা বাঙালী জাতির সংস্কৃতি (পাকিস্তান ও ভারত)।
প্রকৃত সংস্কৃতি কোনো স্থির, কালজয়ী বা ‘শুদ্ধ’ কিছু নয়। মানে কোনো সংস্কৃতি ‘বাইবেল’ বা পবিত্র আল-কোরআন নয় যে, পরিবর্তন করা যাবে না বা হবে না। বরং এটি একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আনন্দ, বেদনা ও রোজনামচার সমষ্টি, যা তাদের নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব সময়ে, নিজস্ব শর্তে গড়ে ওঠে।
আর বিকৃত সংস্কৃতি হলো যখন এই প্রক্রিয়াটিকে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে সংস্কৃতিকে পুনর্বিন্যাস করে, কিছু অংশকে মুছে দেয়, আবার কিছু অংশকে অতিরঞ্জিত করে তোলে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পাল্টানোর চিন্তা-ভাবনা কেউ কেউ করেছেন। জাতীয় সংগীত মানেন না বা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন এদেশের একটা বড় অংশের মানুষ। কিন্তু আরো একটি বড় অংশও আছে যারা জাতীয় সংগীত কে শুধুই মানেন না, বরং শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন। দুই দলের কাছে দুই ধরণের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
প্রশ্ন হলো, এই ধরণের ক্ষেত্রে আমাদের সংস্কৃতিতে বর্তমান জাতীয় সংগীত কোথায় বা কীভাবে দাঁড়াবে?
উত্তর হলো, জাতীয় সংগীত কোনো ‘বিশুদ্ধ সংস্কৃতি’ নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা একটি নির্দিষ্ট ইতিহাস ও ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে গৃহীত হয়েছে। তাই, এটি যদি কারো কাছে অপ্রতিনিধিত্বমূলক মনে হয়, তবে সেটি সংস্কৃতির ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। কারণ রাষ্ট্র কখনোই একটি সমন্বিত, সমাবেশী জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি। বিশেষ করে যেখানে সবার অভিজ্ঞতা, ভাষা ও সংগ্রামের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
আর ঠিক এই ‘বিন্দু’ থেকেই সংস্কৃতির হাইজ্যাক হওয়া শুরু হয়। মানে যখন যুগ যুগ ধরে পালন করা সংস্কৃতি হঠাৎ বড় বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হয় এবং তার কাছে প্রয়োজনীয় উত্তর না থাকে তখন মানুষ অন্তত দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। আর ঠিক তখনই তৃতীয় পক্ষ ঐ সংস্কৃতি হাইজ্যাক করার উৎসাহ পায় বা, সাহস পায়।
আর এভাবেই আমাদের পহেলা বৈশাখ এবং বিজয় দিবস পালনের সংস্কৃতিও সংকটে পড়েছে। এবং আমার আজকের প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্যে হচ্ছে এই ‘সংস্কৃতির হাইজ্যাক’ প্রসঙ্গে প্রচুর প্রশ্ন তোলা এবং সত্যের সন্ধান করা। সর্বোপরি কোনোভাবে ‘হাইজ্যাক’ বা চুরি হওয়া ঠেকানো। কারণ আমরা যদি ভুল হাতে এসব তুলে দিই, তাহলে আর কোনোদিন নিজেদের চিনতে পারবো না, বুঝতে পারবো না।
আপনি যদি শৈশবে ফিরে যান তাহলে দেখবেন আপনার গত ‘পহেলা বৈশাখ’ কত রঙীন ছিলো। আপনি কোনো মেলায় গেছেন এবং মেলাটা উপভোগ করছেন। এখন আপনি যখনি শুনছেন যে, এই অনুষ্ঠান ‘অ-ইসলামিক’ তখন কিন্তু আপনি আর উপভোগ করতে পারছেন না। আপনার কাছে মনে হতে পারে এসব ‘হিন্দু সংস্কৃতি’ এবং হয়তো আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পহেলা বৈশাখের আগের দিন মঙ্গল শোভা যাত্রা পরিচিত হলো মাত্র, নব্বই দশকের কথা। এই শোভাযাত্রা নিয়ে বিশাল তর্ক-বিতর্ক চলমান। কিন্তু আপনি যদি প্রান্তিক হোন, তাহলে আপনি নিশ্চয় মঙ্গল শোভাযাত্রা পালন করেন না, আমি কি ঠিক বলছি? যদি তাই হয়, তাহলে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা জোরপূর্বক চাপানোর সাহস হয়েছে কারণ আপনি পহেলা বৈশাখ বেহাত করে ফেলেছেন।
একইভাবে যখন ভারতীয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফেসবুক ও টুইটারে লিখছেন, ১৬ ডিসেম্বর হলো, পাকিস্তান ও ভারতের যুদ্ধে ভারতের বিজয়ের বিজয় দিবস তখন আপনি কোনোভাবেই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান পালন করলেও ধারণ করতে পারছেন না। কিন্তু আপনার শৈশব বা কৈশোরে বিজয় দিবস পালন করতে তো কোনো সমস্যা হয় নাই! আজ এমন কেন হচ্ছে?
তাহলে, নরেন্দ্র মোদী যা লিখেছেন তা কি সত্য? যদি মিথ্যা হয়, তাহলে ‘বিজয় দিবস’ -এর অনুষ্ঠান/মেলা আপনার। আর যদি সত্য হয়, তাহলে ইতিহাস পুনর্লিখন করতে হবে। কারণ সত্য যখন আমাদের সামনে আসে মিথ্যা তখন মুছে যেতে বাধ্য। কিন্তু এই পুরো কৌশল একটি অভিনব সংস্কৃতি হাইজ্যাক করার কৌশল। যেখানে অসম্পূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
অবশ্য যদি আপনি স্রেফ এবং স্রেফ ভারতীয় লেন্সে পুরো মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দেখেন তাহলে নরেন্দ্র মোদী ভুল কিছুই লিখেন নাই। ভারতের বিজয় ছিলো। কিন্তু পুরো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঘাঁটলে আপনি ভারতের বিজয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতা খুঁজে পাবেন।
প্রশ্ন এটা নয় যে, বাইরের শক্তি আপনাকে কী বিবেচনায় সংজ্ঞায়িত করছে? প্রশ্ন হলো, আপনি আপনাকে কীভাবে দেখছেন? এই যে বেড়ে ওঠা, এই যে জাতীয় সংগীত, পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান/মেলা আমাদের স্মৃতিতে কত মধুর হয়ে লেগে আছে। এর সবটুকুই কি মিথ্যা? সবকিছুই কি অন্য কারো লিখে দেওয়া স্ক্রিপ্ট? যে সংবিধান আমরা মাথায় তুলেছি তার ‘Crafting/Drafting’ কি অন্য কোনো রাষ্ট্র করে দিয়েছে? এর কিছুই কি আমাদের নয়?
এসব নিয়ে প্রশ্ন করবার দরজা খোলা রাখা উচিত। একটা রাষ্ট্র, যে তার বিজয় দিবসে প্রাণ খুলে আনন্দিতও হতে পারে না, এরচেয়ে বড় দেউলিয়াত্ব আমি আর কিছুতেই দেখি না। এই সংস্কৃতির হাইজ্যাক হওয়া আমাদের রুখতে হবে। রুখতে হলে সত্যটা তো জানতেই হবে; হোক সেটা নিম পাতার চেয়েও বেশি তেতো!
আর সংস্কৃতির হাইজ্যাক বা অপহরণ তখনই হয়, যখন আমরা নিজেরা অন্তত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ি। আমরা নিজেরা নিজেদের প্রতি বিশ্বাস হারাই। অবশ্য এতে সংস্কৃতির দোষ নেই, দোষ আছে রাষ্ট্রের।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0