গ্রেট এক্সপেকটেশন্স: ডিকেন্সের আয়নায় আমাদেরই অপ্রিয় প্রতিচ্ছবি
সামাজিক মর্যাদা নাকি প্রকৃত মনুষ্যত্ব? গ্রেট এক্সপেকটেশন্স-এর চরিত্রগুলোর ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে জীবনের গভীর সত্যগুলো খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য চেষ্টা। পিপ, জো এবং এস্তেলার মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে চেনার সফর।
শুরুতেই সতর্কবাণী: চার্লস ডিকেন্সের এই উপন্যাসটি হাতে তুলে নেওয়ার আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন। কারণ এটি কোনো সাধারণ গল্প নয়। এটি এক আয়না, যার ভেতরে আপনি নিজেকে দেখতে পাবেন, কিন্তু সেই ছবি হবে আপনার সবচেয়ে অপ্রিয় রূপ। এমন এক রূপ যা আপনি বছরের পর বছর আয়নার সামনে এড়িয়ে চলেছেন, যেমন এড়িয়ে চলেন সেই সত্যগুলোকে যা জানলে ঘুম আসে না।
আমি আরো বলবো, পড়ার সময় কফি রাখুন কিন্তু সেটা ঘুম দূর করার জন্য নয়। বরং সেই ক্ষণিকের উষ্ণতার জন্য, যখন বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা ঠান্ডা বাস্তবতায় আপনার হাত কাঁপবে। আর হ্যাঁ, একটা বালিশ রাখুন পাশে। কিন্তু সেটা মুখ চেপে ধরার জন্য নয় বরং সেই ক্ষণে, যখন আপনি হঠাৎ বুঝতে পারবেন যে, পিপের গল্প আসলে ‘আপনার’ গল্প, এবং সেই উপলব্ধিতে আপনার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে।
প্রথম অধ্যায়
পিপ। একটা শব্দ যা শুনলে মনে হয় কোনো হাঁসের বাচ্চা ডাকছে, বা বৃষ্টিতে ভেজা কাগজের শব্দ। কিন্তু এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তার পুরো জীবনের ট্র্যাজেডির বীজ। ফিলিপ পিরিপ—এক নাম যা কেটে কেটে ছোট হয়ে গিয়েছিল, ঠিক যেমন তার জীবনে কাটা-কাটি হয়েছিল সবকিছু: স্বপ্ন, সম্পর্ক, আত্মসম্মান।
ডিকেন্স এখানে একটা ভয়ঙ্কর খেলা খেলেছেন। তিনি তার নায়ককে দিয়েছেন একটা নাম যা শিশুসুলভ, নিরীহ, কিন্তু সেই নামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ‘পিরিপ’; যার অর্থ ক্ষুদ্র, অসার, ক্ষয়িষ্ণু। পিপ যখন বড় হবার চেষ্টা করে, সে আসলে তার নামের বিরুদ্ধে লড়াই করে। একটা অস্তিত্বগত যুদ্ধ যেখানে সে জানেই না যে শত্রু আসলে সে নিজেই।
তার জন্মভূমি কেন্টের কাদামাখা গ্রাম। এখানে আকাশ সবসময় ধূসর, ঘাস সবসময় ভেজা, আর মানুষেরা সবসময় ক্লান্ত। কিন্তু এই ক্লান্তিতেও একটা সৌন্দর্য আছে। একটা সরলতা যা পিপ পরে যখন লন্ডনে যায়, তখন হৃদয় বিদারকভাবে মিস করে। সে তখন বোঝে না যে, সে যা ছাড়ছে, তা আসলে স্বর্গের এক টুকরো ছিল, আর সে যেখানে যাচ্ছে সেটা শুধুই সোনার চামড়ায় মোড়া নরক।
দ্বিতীয় অধ্যায়
জো গার্জেরি। ব্ল্যাকস্মিথ। হাত ভারী, কথা কম, হৃদয়—অসীম। পিপের কাছে জো ছিলেন ‘ভদ্রলোক’ শব্দটার সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা। কারণ জো ছিলেন সরল, অশিক্ষিত, গ্রাম্য—সবকিছু যা একজন ‘জেন্টেলম্যান’ হওয়ার বিপরীতে। কিন্তু তিনি ছিলেন একমাত্র মানুষ যে পিপকে ভালোবেসেছিলেন শর্তহীনভাবে, নিঃস্বার্থভাবে, এমনভাবে যে কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
সেই দৃশ্যটা মনে করুন, পিপ যখন তার কাকভেজা বোনের (মিসেস জো) নির্মমতার শিকার হয়, জো তাকে বাঁচান। কিন্তু কীভাবে? কোনো বড় কথা বলে নয়, কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়। শুধু নীরব উপস্থিতি দিয়ে, একটা হাত রেখে দিয়ে, একটা দৃষ্টিতে যা বলে, “আমি আছি”।
এবং পিপ কী করে? সে লন্ডনে গিয়ে জোকে এড়িয়ে চলে। লজ্জায়, অহংকারে, সেই অদ্ভুত মনোভাবে যে, “এখন আমি অন্য শ্রেণীর মানুষ।” এখানে ডিকেন্স আমাদের মুখোমুখি করেন সেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের, আমরা কি সত্যিই আমাদের শেকড়কে ভুলে যাই যখন আমরা ‘উন্নতি’ করি? আমরা কি সেই মানুষগুলোকে ফেলে আসি যারা আমাদের গড়ে তুলেছিলেন, যখন আমরা ছিলাম কিছুই না?
জো যখন লন্ডনে আসেন, পিপ তার প্রতি কেমন আচরণ করে সেটা পড়তে পড়তে আপনার চোখ জ্বলবে। কিন্তু সেই জ্বলুনি শুধু পিপের জন্য নয় আপনার নিজের জন্যও। কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় পিপ হয়েছি। আমরা সবাই কাউকে না কাউকে ‘নিচু’ মনে করে দূরে সরে গেছি, যখন সেই মানুষটাই ছিলেন আমাদের একমাত্র আশ্রয়।
তৃতীয় অধ্যায়
সেই রাত। কুয়াশাঢাকা কবরস্থান। আট বছরের পিপ একা। আর সেই পলাতক কয়েদি অ্যাবেল ম্যাগউইচ।
এই দৃশ্যটি পুরো উপন্যাসের মাইক্রোকসম। একটা শিশু, যে নিজেই সমাজের কাছে অবহেলিত, একজন অপরাধীকে সাহায্য করে। কিন্তু কেন? ভয়ে? করুণায়? নাকি সেই মৌলিক মানবিকতায় যা বলে, “আমি তোমার কষ্ট দেখতে পাচ্ছি?”
ম্যাগউইচ যখন পিপকে ধমক দেন, যখন তাকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে খাবার চান, এটা কি শুধুই একজন অপরাধীর হিংস্রতা? না, এটা একজন মানুষের যন্ত্রণার প্রকাশ, যে জীবনে কখনো কারো কাছ থেকে ভালোবাসা পায়নি। আর সেই শূন্যতায়, পিপের সামান্য সাহায্য, একটা পাই, একটু ব্র্যান্ডি তাকে বাঁচিয়ে দেয়। শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় বিড়ম্বনা। পিপ ভাবে সে সাহায্য করেছে একজন ভয়ঙ্কর লোককে। কিন্তু আসলে সে বীজ বুনেছে এক অদ্ভুত সম্পর্কের যেখানে ঋণী-ঋণদাতার সম্পর্ক উল্টো হয়ে যায়। ম্যাগউইচ পরে পিপের ‘পৃষ্ঠপোষক’ হোন। কিন্তু সেই পৃষ্ঠপোষকতা কি শুধুই টাকার? না, এটা একজন মানুষের তার জীবনের একমাত্র ভালো কাজের প্রতিদান। পিপ যখন জানতে পারে যে, তার ‘গ্রেট এক্সপেকটেশন্স’-এর উৎস আসলে এই ‘অপরাধী’, তার আত্মার যে ধাক্কা লাগে, তা পড়তে পড়তে আপনার নিজের আত্মাও কেঁপে উঠবে।
কারণ আমরা সবাই চাই আমাদের সফলতার কারণ হোক কোনো রাজকীয় রক্ত, কোনো অসাধারণ বংশ, কোনো দিব্য আশীর্বাদ। কিন্তে বাস্তবে, আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো ঘুরিয়ে দেয় সেইসব মানুষ যাদের আমরা ‘তুচ্ছ’ বলে ভাবি। ম্যাগউইচ ছিলেন ‘ক্রিমিনাল’ কিন্তু তিনি ছিলেন একমাত্র মানুষ যিনি পিপকে শর্তহীনভাবে ভালোবেসেছিলেন, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই।
চতুর্থ অধ্যায়
মিস হ্যাভিশাম। নামটি শুনলেই একটা ছায়া নামে মনে। সত্তর বছরের পুরানো বিয়ের পোশাক, একটা পঁচা কেক, ঘরে ঘরে অন্ধকার, আর ঘড়ি যা সবসময় ৮টা ৪০ এ থেমে আছে। সেই মুহূর্তে যখন তার বর পালিয়েছিলেন।
তিনি কি পাগল? হয়তো। কিন্তে তার পাগলামি কি শুধুই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি? না, এটা একটা সামাজিক রোগের প্রতীক যেখানে সমাজ নারীদের শুধু বিয়ের মাধ্যমেই সংজ্ঞায়িত করে। যখন সেই বিয়ে ভেঙে যায়, মিস হ্যাভিশামের পুরো অস্তিত্বই ভেঙে পড়ে। তিনি বাঁচেন না, কিন্তু মরেনও না। তিনি একটা ‘লিভিং ডেড’-এ/জম্বিতে পরিণত হোন।
আর এই মৃত্যুঞ্জীবী মহিলার হাতে বড় হয় এস্তেলা। কী ভয়ঙ্কর বংশবৃক্ষ! বিষগাছের নিচে আরেকটি বিষগাছ।
মিস হ্যাভিশাম এস্তেলাকে গড়ে তোলেন একটাই উদ্দেশ্যে, “পুরুষদের হৃদয় ভাঙতে।” কিন্তু কেন? কারণ একজন পুরুষ তার হৃদয় ভেঙেছিল? না, গভীরে দেখলে বোঝা যায়, তিনি চান সব পুরুষই শাস্তি পাক, সবাই যেন তার মতো যন্ত্রণা পায়। এস্তেলা হন তার অস্ত্র, তার যন্ত্র, তার প্রতিশোধের দূত।
কিন্তু এখানেই ট্র্যাজেডি। এস্তেলা যখন বড় হন, তিনিও একজন ভিক্টিম হয়ে ওঠেন। তিনি শিখেছেন ভালোবাসা মানে দুর্বলতা, স্নেহ মানে অস্ত্র। তিনি হয়ে ওঠেন সেই মানুষ যে পারেন না ভালোবাসতে, যে জানেন না কীভাবে হাসতে, যার চোখে সবসময় একটা বরফের প্রাচীর।
পিপ যখন প্রথম সাতারি হাউসে যায়, সে ভাবে এটা একটা অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু সেটা আসলে একটা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র। মিস হ্যাভিশামের প্রতিটি কথা, এস্তেলার প্রতিটি ঠোঁটের কোণের হাসি, প্রতিটি ‘কমন বয়’-এর উপাধি—সবকিছু পিপের মনে বীজ বোনে অহংকারের, লোভের, আত্ম-ঘৃণার।
ডিকেন্স এখানে দেখান কীভাবে ভালোবাসার অভাব মানুষকে পশুতে পরিণত করে। মিস হ্যাভিশাম ভালোবাসার অভাবে পাগল, এস্তেলা ভালোবাসার অভাবে বরফ। আর পিপ? সে ভালোবাসার অভাবে একটা খোলসে পরিণত হয়। যে খোলস দেখতে সুন্দর, কিন্তু ভেতরে শূন্য।
পঞ্চম অধ্যায়
এস্তেলা। নামটি শুনলে মনে হয় ‘স্টার’-এর মতো—দূরে, উজ্জ্বল, অধরা। কিন্তু তারপর বুঝতে পারি, তারা তারকারা মৃত হয়ে গেছে বহু আগে, আমরা শুধু তাদের আলো দেখি।
পিপ এস্তেলাকে ভালোবাসে। কিন্তু কী ভালোবাসা এটা? এটা কি সত্যিকারের ভালোবাসা, নাকি একটা প্রজেকশন? পিপ কি এস্তেলাকে ভালোবাসে, নাকি এস্তেলার মাধ্যমে নিজেকে ভালোবাসে একটা ‘ভদ্রলোক’ হিসেবে, একজন ‘উচু শ্রেণীর’ স্বামী হিসেবে?
এস্তেলা যখন বলেন, “আমার হৃদয় নেই,” পিপ শুনতে চায় না। কারণ সত্য শুনলে তার স্বপ্ন ভেঙে যাবে। এটা কি শুধু পিপের সমস্যা? না, এটা মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমরা সেই মানুষকেই চাই যারা আমাদের চায় না, আর যারা আমাদের চায় তাদের আমরা অবজ্ঞা করি।
তাদের সম্পর্কটা পড়তে পড়তে আপনি বারবার চিৎকার করতে চাইবেন, “পিপ, বোকা না হয়ে যাও, দেখো না সে তোমাকে ব্যবহার করছে!” কিন্তু তারপর থেমে ভাববেন, আমি কি কখনো এমন করিনি? আমি কি কখনো কাউকে আকাশে তুলে ধরেছি, যখন সে আমাকে মাটিতেই রাখতে চেয়েছিল?
এস্তেলার বিয়ে ডঙ্কলে’র সাথে। সেই নির্মম, নিষ্ঠুর, কিন্তু ‘উচু শ্রেণীর’ মানুষের সাথে। পিপের জন্য একটা বিপর্যয়। কিন্তু সত্যি কি এটা শুধুই পিপের বিপর্যয়? না, এটা এস্তেলারও বিপর্যয়। কারণ তিনি বিয়ে করেন একজনকে যাকে তিনি ঘৃণা করেন, শুধুমাত্র সামাজিক মর্যাদার জন্য। তিনি তার শিক্ষাগুরুর মতোই একটা বন্দী হয়ে থাকেন সোনার খাঁচায়, কিন্তু খাঁচাতেই।
ষষ্ঠ অধ্যায়
পিপ যখন লন্ডনে আসে, সে ভাবে সে স্বর্গে আসছে। কিন্তু ডিকেন্স তাকে দেখান একটা শহর যেখানে সবাই অভিনয় করছে, সবাই নকল, সবাই বিক্রি হচ্ছে।
জ্যাগার্স: আইনজীবী যার কাছে মানুষ মানে শুধুই ‘কেস’। তার কক্ষে ঘুরতে ঘুরতে পিপ দেখে মানুষের জীবন কীভাবে কাগজে কলমে বন্দি হয়ে যায়। আইন যে ন্যায়বিচার করে না, এটা শুধু শক্তিশালীদের হাতিয়ার এই শিক্ষাটা পিপ পায় জ্যাগার্সের কাছ থেকে, যদিও জ্যাগার্স কখনো সরাসরি বলেন না।
হার্বার্ট পকেট: পিপের একমাত্র বন্ধু যে শেখায় যে ‘জেন্টেলম্যান’ হওয়া মানে কেবল ভালো পোশাক পরা নয়। কিন্তু হার্বার্ট নিজেই একজন ভিক্টিম। তার স্বপ্ন কখনো পূরণ হয় না, সে কখনো ‘সফল’ হয় না ঐতিহ্যগত অর্থে। তবু সে সুখী। কেন? কারণ সে জানে কীভাবে ভালোবাসতে, কীভাবে বন্ধুত্ব করতে, কীভাবে সরল থাকতে।
লন্ডনের দৃশ্যগুলো: ভেজা রাস্তা, ধোঁয়াচ্ছন্ন আকাশ, ক্লাবগুলোতে বসে গসিপ করা মানুষ—সবকিছু মিলিয়ে একটা ছবি আঁকেন ডিকেন্স। এটা একটা শহর যেখানে আপনি হারিয়ে যেতে পারেন নিজেকে খুঁজতে গিয়ে। পিপ হারায়। সে খোঁজে ‘ভদ্রলোক’ পিপকে, কিন্তু পায় শুধু একটা খোলস।
সপ্তম অধ্যায়
সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়। পিপ জানতে পারে তার টাকার উৎস। ম্যাগউইচ ফিরে আসেন। আর সেই সাথে শুরু হয় একটা ধ্বংসলীলা যা শুধু পিপের নয়, সবার।
ম্যাগউইচকে লুকিয়ে রাখা, পুলিশের ভয়, টাকার অভাব। পিপ এখন দেখে যে ‘জেন্টেলম্যান’ হওয়ার মূল্য কত। সে দেখে যে সমাজ তাকে এখন ‘ছুঁড়ে ফেলা’ মানুষ বলে চিনে। সেই সমাজ যা তাকে কিছুদিন আগেই সম্মান করত, এখন তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
কিন্তু এখানেই সত্যিকারের পরীক্ষা। পিপ যখন ম্যাগউইচকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, যখন সে তার ‘পৃষ্ঠপোষক’-এর জন্য সবকিছু বিপর্যয় ঝুঁকিতে ফেলে সে তখন আসলে তার মানবতা ফিরে পায়। সে বোঝে যে ঋণ শুধু টাকার হয় না, মানসিকও হয়। আর সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে সে আবার মানুষ হয়ে ওঠে।
ম্যাগউইচের মৃত্যু, সেই দৃশ্য যেখানে তিনি পিপের হাত ধরে মরেন, বিশ্বাস করে যে তার কন্যা (যে আসলে এস্তেলা) বেঁচে আছে। এটা একটা রেডিম্পশন। একজন ‘অপরাধী’ মরেন একজন ‘পিতা’ হিসেবে, একজন ‘মানুষ’ হিসেবে যার জীবনের একটা ভালো কাজ ছিল।
অষ্টম অধ্যায়
শেষে পিপ আবার জোর কাছে ফিরে আসে। কিন্তু কীভাবে? লজ্জায়, ক্ষত-বিক্ষত, কিন্তু সত্যিকারের।
জো তাকে ক্ষমা করেন। কিন্তু সেই ক্ষমা কি সহজ? না, এটা একটা মহৎ হৃদয়ের ক্ষমা। জো বলেন না, “আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম।” তিনি শুধু আছেন, সেইভাবেই যেভাবে ছিলেন সবসময়। এই উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় ক্ষমা।
এবং এস্তেলা? দ্বিতীয় শেষে (যা ডিকেন্স পরে লিখেছিলেন), তিনি ফিরে আসেন। কিন্তু কি অবস্থায়! বর্বর স্বামীর হাতে নির্যাতিত, কিন্তু এবার সত্যিকারের মানুষ হয়ে। তাদের শেষ সাক্ষাৎ যেখানে এস্তেলা বলেন যে, তিনি এখন বুঝতে পারেন পিপ কী ছিলেন! এটা কি সুখী সমাপ্তি?
আমি বলবো, না। এটা একটা ‘হোপফুল’ সমাপ্তি, কিন্তু সুখী নয়। কারণ তারা দুজনেই হারিয়েছেন অনেক কিছু। সময়, সুযোগ, সরলতা। কিন্তু তারা পেয়েছেন কিছু মূল্যবান। আত্মজ্ঞান, ক্ষমা, এবং সত্যিকারের ভালোবাসার সম্ভাবনা।
নবম অধ্যায়
এই উপন্যাস কি শুধুই একটা গল্প? না, এটা একটা দর্শন। এটা বলে:
১. স্বপ্ন দেখা ভালো, কিন্তু স্বপ্নের পেছনে ছোটা বিপজ্জনক: যখন স্বপ্ন আমাদের শেকড় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সেটা আর স্বপ্ন নয়, অভিশাপ।
২. ভালোবাসা শেখা যায় না, কিন্তু অভাব শেখা যায়: এস্তেলা শিখেছিলেন ভালোবাসা নয়, ব্যবহার করতে। পিপ শিখেছিল অহংকার, কিন্তু পরে শিখেছিল বিনয়।
৩. সমাজের সংজ্ঞায় জীবন নয়: ‘জেন্টেলম্যান’, ‘লেডি’—এই শব্দগুলো খোলস মাত্র। আসল মানুষ হওয়া ভেতরে।
৪. ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া নয়, গ্রহণ করা: জো ক্ষমা করেননি কারণ তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি ক্ষমা করেছেন কারণ তিনি ভালোবাসতেন।
৫. আমরা সবাই পিপ: আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় নিজেদের বড় ভেবেছি, অন্যকে ছোট ভেবেছি, আর পরে অনুশোচনা করেছি।
শেষ কথা
‘গ্রেট এক্সপেকটেশন্স’ পড়া শেষে আপনি বই বন্ধ করবেন। কিন্তু গল্প শেষ হবে না। কারণ আপনি দেখবেন আপনার নিজের জীবনে কতজন মানুষকে আপনি ‘জো’ বানিয়েছেন, কতজনকে ‘ম্যাগউইচ’ ভেবে এড়িয়ে গিয়েছেন, আর কতজন ‘এস্তেলা’-র জন্য নিজেকে জ্বালিয়েছেন।
ডিকেন্স লিখেছিলেন এই বই ১৮৬০-৬১ সালে। কিন্তু এটা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ মানুষের অহংকার, লোভ, ভুল সিদ্ধান্ত, এবং শেষ পর্যন্ত আত্মজ্ঞান এইগুলো কালজয়ী।
তাই পড়ুন। কাঁদুন। রেগে যান পিপের উপর, কিন্তু ক্ষমাও করুন। কারণ শেষে আপনি বুঝবেন যে, পিপ আপনি, আমি, আমরা সবাই। আর সেই উপলব্ধিই হলো এই বইয়ের একমাত্র, সত্যিকারের ‘গ্রেট এক্সপেকটেশন’।
“তুমি যতই হারাও, তুমি যতই ভুল করো, তোমার ভেতরে এক পিপ সব সময় জেগে থাকবে, যে জানে—ভালোবাসা শেষ কথা বলে না, এটি শুরুর কথা বলে।”
এবং হ্যাঁ, বইটা পড়ার পর নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: আমি কি আসলেই ভালো মানুষ হতে চাই? নাকি শুধু ভালো হিসেবে নিজেকে দেখাতে চাই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজুন, এটাই জীবন, এটাই সাহিত্য, এটাই ‘গ্রেট এক্সপেকটেশন্স’…
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0