‘আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না’, বাংলা সিনেমায় বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক সুরক্ষা
সিনেমা গণমাধ্যম হিসেবে মানুষের চিন্তা ও জীবনবোধকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে পুরনো বাংলা চলচ্চিত্র (ঢালিউড) গ্রাম-শহর বৈষম্য, নাগরিক সুরক্ষা এবং বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে দর্শকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
সিনেমা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী একটি গণমাধ্যম। আমরা সিনেমা দেখি এবং সিনেমার রঙীন পর্দায় ভেসে ওঠা চরিত্রদের মত করে নিজেদের সাজাতে চাই। পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার থেকে শুরু করে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার পর্যন্ত করি। মানে আমাদের ‘সিনেমাটিক’ লাইফস্টাইলের প্রতি ভীষণ আকর্ষণ রয়েছে।
একসময় বাংলা চলচ্চিত্র (ঢালিউড) আমাদের জীবনে বিশাল প্রভাব রাখতো। আমাদের চুলের স্টাইল, আমাদের ড্রেস-সেন্স জনপ্রিয় নায়ক/নায়িকাদের অনুসরণ করতো। চিত্রনায়ক সালমান শাহ্ থেকে শুরু করে নায়ক মান্না কে প্রায় সরাসরি অনুকরণ করতে দেখা যায় ঐ সময়ের প্রজন্মের মধ্যে। আপনি হয়তো আপনার বাবা-মায়ের পুরনো অ্যালব্যামে তাদের ছবি দেখছেন এবং একটু হাসি পাচ্ছে বা একটু অবাক হচ্ছেন ভেবে যে, “এই স্টাইল তো পুরনো বাংলা সিনেমায় দেখানো হয়েছিলো!”
বর্তমানে বাংলা সিনেমার পুরনো ঐতিহ্য আর নেই। এখন আমরা সবাই বিদেশি সিনেমার প্রতি ঝুঁকছি। বিশেষ করে হিন্দি সিনেমা। নেটফ্লিক্স বা এই ধরণের স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম আসার পর আমাদের সিনেমা দেখার স্বাদ পাল্টেছে। আমরা মোটামুটি এখন জনপ্রিয় সব সিনে-ইন্ডাস্ট্রির সিনেমা কমবেশি দেখে থাকি।
আমার আজকের আলোচনা অবশ্য ‘সিনেমাটিক লাইফ’ নিয়ে নয়। বরং সিনেমা কীভাবে দর্শকদের চিন্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে সেসব নিয়ে। আর এজন্য বুঝার সুবিধার্থে আমি বাংলা চলচ্চিত্র নিয়েই কথা বলবো। বাংলা চলচ্চিত্রের একটি ‘রিপিটেটিভ প্যাটার্ন’ আছে। যতক্ষণ অবধি একটি চিন্তা একটি বড় অঙ্কের মানুষের মধ্যে পুরোপুরি সংক্রমিত না হচ্ছে ততক্ষণ অবধি বাংলা সিনেমায় ঐ একই রিপেটেটিভ বা পুনঃপুন দৃশ্য দেখানো হত।
আপনি একজন গ্রামের ছেলে বা মেয়ে সম্পর্কে সাধারণত কি জানেন? আপনি জানেন গ্রামের ছেলেটা বা মেয়েটা একটু ব্যাকডেটেড। শহুরে জীবনের সাথে মোটেই তাল মেলাতে পারে না। প্রায় প্রায় হোঁচট খায়। স্মার্ট নয়। সুন্দর করে কথা বলতে পারে না। আর সবচেয়ে ইতিবাচক যে ধারণা পোষণ করেন সেটা হলো, “গ্রামে বেড়ে ওঠা ছেলে বা মেয়ে মানেই সহজ-সরল!” তাই নয় কি?
কিন্তু দেখা যায়, এই সমস্ত তথ্যের একটি অন্যতম সূত্র হচ্ছে ‘বাংলা সিনেমা’। বাংলা সিনেমায় একজন গ্রামের ছেলে বা মেয়েকে সর্বোচ্চ দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে।
(এক) গ্রামে বড় হয়েছে কিন্তু রহস্যজনক ভাবে সে শহুরে জীবনে খুবই ভালো পারফর্ম করছে। এজন্য হয়তো দেখানো হচ্ছে যে, সে গ্রামে বড় হলেও শহরে তার রুট আছে বা কোনো না কোনো সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। সে শহরে গিয়ে শহরের মানুষদের আউট-স্মার্ট করে যাচ্ছে।
(দুই) গ্রামে বড় হয়েছে এবং সহজ-সরল। পিছিয়ে পড়া। সে চলমান বিশ্বের অনেক কিছু সম্পর্কে-ই জানে না। সে সৎ কিন্তু শহুরে জীবন-যাপনে অক্ষম। সে আধুনিক নয় এবং হবার সম্ভাবনাও নাই।
বাংলা সিনেমার দেওয়া এই দুই তথ্যই পুরোপুরি সত্য বা মিথ্যা নয়। কিছু মিল আছে আবার কিছু অমিলও আছে। সিনেমাও তো একধরনের শিল্প। তার কিছু উদ্দেশ্য থাকে। একটা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা সিনেমা শ্রেণী বৈষম্য নিয়ে কাজ করেছে। ফলে গ্রামের ছেলে বা মেয়েটার প্রতি একটু এমপ্যাথি তাকে বড় সুযোগ এনে দিতে পারে। ফলে গ্রাম থেকে কেউ শহরে কোনো কাজের জন্য গেলে একটু সুবিধা পাওয়ার জন্য বলতে পারে, “আমি এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছি...”।
সমস্যা হলো, যখন সে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের কথা বলছে তখন সে কিন্তু এসব জেনেশুনেই বলছে। আর আপনিও জানেন যে, গ্রামে ভালো শিক্ষা নেই, চিকিৎসা নেই, ভালো মানের সেবা গ্রামে পাওয়া যায় না। কিন্তু আপনার মধ্যে আপনার পেশার বাইরে যে এমপ্যাথি তার প্রতি কাজ করতে পারে তার বড় বা অন্যতম সূত্র হতে পারে বাংলা সিনেমা।
সিনেমা আপনাকে দীর্ঘিদিন ধরে বুঝিয়েছে যে, গ্রাম থেকে কেউ শহরে আসলে তার প্রতি বৈষম্য করা হয়। সুতরাং আপনি এখন তার প্রতি বেশি সচেতন। আপনার চিন্তার মধ্যে ঘুরছে, “আমি কি তার প্রতি কোনো বৈষম্য করে ফেলছি না তো!” মানে একটা ভয়ানক গিল্ট ট্রিপ!
প্রশ্ন এটাও থাকে যে, তাহলে কি গ্রামের মানুষদের প্রতি কখনোই বৈষম্য করা হয় না? হ্যাঁ, হয়। কিন্তু সেটা ইতিহাস। বর্তমান জমানায় গ্রাম ও শহর প্রায় মিলেমিশে একাকার। আজও সুযোগ-সুবিধার কিছু কমবেশি ফারাক থাকলেও শুধুমাত্র প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কেউ কোথাও ঢুকে পড়লেই তার সেখানে সুবিধা বেশি পাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি নায্য নয়।
বাংলা সিনেমার এই সাধারণ ন্যারেটিভ থেকে আপনি যখন আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে ভাববেন তখন টের পাবেন যে, এই দেশে আইন নাই, এই দেশে বিচার নাই। মনে পড়বে বাংলা সিনেমার সে-ই বিখ্যাত ডায়ালগ, “আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না”। আর সেটাও বলছে নায়ক যখন সিনেমার শেষ দিকে ভিলেনকে নিজ হাতে হত্যা করতে চলেছে ঠিক তখন।
শেষ দৃশ্যে সব অন্যায় প্রায় ঘটে গেলেই এখানে পুলিশ এসে এই বিখ্যাত ডায়ালগ দিয়ে সিনেমার সমাপ্তি ঘোষণা করে।
বাংলাদেশে একজন সাধারণ মানুষ মোটেই সুরক্ষিত অনুভব করেন না। এদেশের নাগরিক সুরক্ষা আজও ঐ সালমান শাহ্’র আমলের মত-ই থেকে গেছে। এই বিশাল জনসংখ্যার বিপরীতে রাষ্ট্র যে নাগরিক সুরক্ষা দিতে পারছে না বিষয়টি কিন্তু এমনও নয়। বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনের মধ্যে বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও নাই নাগরিক অধিকার বা সুরক্ষা নিয়ে কাজ করবার। এবং এই পুরো বিষয়টি মোটেই নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা পরম্পরা।
আমরা আজ যে সামান্যতম সুরক্ষিত অনুভব বোধ করি সেটার কারণ কিন্তু শক্তিশালী প্রশাসন নয়; সমাজ। এদেশের মানুষ আজও প্রশাসন কে ভয় পায়। আর যেসব জায়গায় এই সমাজটুকুও বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে তারা ইউরোপ পাড়ি দেবার যে চিন্তা করছে তাও নতুন কিছুই নয়।
ইউরোপ-আমেরিকায় অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে সুবিধা সেটা হলো, তার নাগরিক অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা। অথবা, ভিন্নভাবে, তারা আইন সচেতন ও তাদের বিচার-ব্যবস্থা সচল।
বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞ আলেম বা ধর্মীয় নেতা (নাম নেবো না) বলছেন, “শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার জন্য ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া উচিত নয়।” খুব সম্ভবত তিনি তাত্ত্বিক কথা বলেছেন এবং খুবই ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ধর্মীয়ভাবেও এটা চরম ভুল কথা। এই ধরণের ফতোয়া তার থেকে আমি কাম্য করি নাই। প্রকৃতপক্ষে, যেখানে জীবনের নিশ্চয়তা নাই সেখান থেকে একজন সাধারণ মানুষের পালানো ছাড়া আর কি উপায় থাকে! আপনি তো তার জীবনের সুরক্ষা দিতে পারছেন না!
আমার মতে, বাংলাদেশের নাগরিকদের দেশের প্রতি ভালোবাসার কমতি নাই। যদি কমতি থাকতো তাহলে এই দেশ ইতিমধ্যেই পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে যেত। কিন্তু এই দেশপ্রেম দেখানোর জায়গা কোথায়? যখন তার জীবন নিয়ে, পরিবারের সদস্য নিয়ে, তার অবস্থান বা সম্পত্তি নিয়ে সারাক্ষণ শঙ্কিত থাকতে হয় তখন ‘দেশপ্রেম’ নিয়ে উঁচু বাক্য শুধু শুনতেই ভালো লাগে।
যাকগে, বাংলা সিনেমা আমাদের দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে এত বেশি কাঁটাছেড়া করেছে যে, আজ পর্যন্ত আমাদের মনের কোথাও না কোথাও সেটা দাগ কেটে আছে। এই সিনে-ইন্ডাস্ট্রি আজও হামাগুড়ি দিয়ে চলছে। আজ হয়তো সফলতা খুব কম। কিন্তু বাংলা সিনেমা অন্তত একটি বিষয় নিয়ে দারুণ কাজ করে গেছে। মানুষকে তার অধিকার সচেতন করেছে। তাকে বারবার বুঝিয়েছে, পরিবর্তন কেউ এসে করবে না। তোমাকে নিজে উঠে লড়াই করতে হবে। পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
এখানে আদালতের যে বিচার সেটা পাওয়ার পরেও প্রার্থনায় মানুষ যে বিচার উপর আল্লাহ্’র নিকট চান সেটাও বারবার বাংলা সিনেমায় উপস্থাপিত হয়েছে। যদি আদালতে সত্যিই বিচার হত তাহলে এই জায়নামাজ পেতে নামাজ শেষে প্রার্থনায় যে বিচার চাওয়া হচ্ছে সেটা কীসের বিচার? আমরা সবাই বুঝি সেটা। এখানে কোথাও স্বচ্ছতা নাই, সবাই দুর্নীতিবাজ।
* সত্যের মৃত্যু নেই সিনেমাটি দেখুন:
যে প্রধান ১০টি বাংলা সিনেমা বিবেচনায় এই প্রবন্ধ লেখা হয়েছে,
১. কেয়ামত থেকে কেয়ামত (১৯৯৩)
২. বিক্ষোভ (১৯৯৪)
৩. সত্যের মৃত্যু নেই (১৯৯৫)
৪. আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭)
৫. স্বপ্নের ঠিকানা (১৯৯৫)
* মান্না অভিনীত
১. দাঙ্গা (১৯৯১)
২. আম্মাজান (১৯৯৯)
৩. কষ্ট (২০০০)
৪. বীর সৈনিক (২০০৩)
৫. গুন্ডা নাম্বার ওয়ান (২০০০)
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0