কেন ঝুঁকি নেওয়া জীবনের একমাত্র প্রমাণ?

ঝুঁকি গ্রহণের মাধ্যমে কীভাবে আমরা অনিশ্চয়তাকে নিশ্চয়তা দেই? প্রেম, বিনিয়োগ ও জীবনের ব্যর্থতাকে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুন। ঝুঁকিই জীবনের একমাত্র প্রমাণ।

নভেম্বর 24, 2025 - 23:39
নভেম্বর 24, 2025 - 23:39
 0  5
কেন ঝুঁকি নেওয়া জীবনের একমাত্র প্রমাণ?
কেন ঝুঁকি নেওয়া জীবনের একমাত্র প্রমাণ?

ঝুঁকি’ বলতে আমরা কি বুঝি? এবং কেন আমদের ঝুঁকি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ? আমার মতে, ঝুঁকি বা রিস্ক গ্রহণের সবচেয়ে ভালো সংজ্ঞা হতে পারে, “আমি অনিশ্চয়তা সম্পর্ক অবগত আছি এবং আমি ঐ অনিশ্চয়তা কে একটি নিশ্চয়তা প্রদান করতে চাই।” কারণ সাধারণত আপনি যখন ঝুঁকি গ্রহণ করেন তখন লাভও হতে পারে আবার ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু লাভ বা ক্ষতি উভয় অবস্থা এক ধরণের নিশ্চয়তা প্রদান করে

 

এই সংজ্ঞায় ‘লাভ’ বুঝলেও ‘ক্ষতি’ বুঝাটা একটু কঠিন। প্রশ্ন আসে, ক্ষতি কীভাবে আমাদের নিশ্চয়তা দেয়? নিশ্চয়তা অবশ্যই দেয়। আপনি যখন ঝুঁকি নেবেন তখন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় একধরনের প্রস্তুতিও আপনার থাকবে। ফলে যখন হেরে যাবেন এবং এই ক্ষতি বা ব্যর্থতাও একটি ‘Defined End-State’; যা পৃথিবীতে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।

 

আবার আপনি যদি ঝুঁকি না নেন তাহলে কখনোই জানবেন না যে, আপনি অদৌ কী কী করতে সক্ষম? বা, অক্ষম? আমরা যখন পরীক্ষা দিই তখনও একধরনের ঝুঁকি আমদের গ্রহণ করতে হয়। আমরা যখন বিনিয়োগ করি তখনও একধরনের ঝুঁকি আমাদের গ্রহণ করতে হয়

 

এখানে এই লাভ ও ক্ষতি ঝুঁকি নেবার মধ্যেই নিহিত। সাধারণত আমি দেখেছি, যেসব মানুষ জীবনে বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন তারা হয়তো সবাই সফল নন কিন্তু জীবন সম্পর্কে তাদের কাছে বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি হয়তো জানেন না যে, সঠিক রাস্তা কোনটি? কিন্তু তিনি একাধিক ব্যর্থতার রাস্তা বলে দিতে পারবেন এবং সাবধান করতে পারবেন

 

ঝুঁকি নেবার পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সফলতা একটি কালো ও রহস্যময় বাক্সের মত আচরণ করে। আপনি জানেন না, ঐ বাক্সের মধ্যে কি আছে? হতে পারে একটি সাপ আছে অথবা, একটি বিড়াল আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি ঐ বাক্স খুলছেন না ততক্ষণ পর্যন্ত ‘Infinite’ সম্ভাবনা ঐ বাক্স ঘিরে বিদ্যমান থাকে

 

আর এই ‘মুহুর্ত (Moment)’ নিয়েই মূলত ‘কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা’ কাজ করে চলেছে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে এটাকে বলা হয় ‘সুপারপজিশন’। সাম্প্রতিক সময়ে পদার্থবিজ্ঞানে যারা যারা নোবেলজয়ী হয়েছেন তাদের সবাই কিন্তু এই কোয়ান্টাম ও সুপারপজিশন নিয়ে কাজ করেছেন। একটু সোজা বাংলায়, ঐ কালো বাক্স না খোলা পর্যন্ত সম্ভাবনা গণনার মধ্যে আর থাকে না। আপনার কল্পনা যতদূর যায় তারও বাইরে ঐ বাক্সে কিছু একটা থাকতে পারে

 

আমরা যখন চিন্তা করি বা কল্পনা করি তখনও বিশ্বে একধরনের পরিবর্তন ঘটে। আমরা যখন সক্রিয়ভাবে অ্যাকশন নিই তখন পুরো বিশ্বে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। সুপারপজিশন আমাদের সাধারণ জীবনে একটি ‘রহস্য’ যুক্ত করে যায়। আমরা তখন সাধারণ মানুষ থেকে অসাধারণ মানুষ হয়ে উঠি

 

প্রশ্ন হলো, আমাদের কল্পনার কারণেও কী পৃথিবীতে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে? উত্তর হলো, ‘হ্যাঁ’। সুতরাং, আমরা কল্পনা করলেও যে পরিবর্তন ঘটে তা ব্যাখ্যার জন্য ‘Law of Attraction’ -এ যেমন প্রাচীন দর্শনের শক্তি পাওয়া যায়, তেমনি অনেক আধুনিক ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের সুপারপজিশন ধারণাটিকে একটি রূপক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, মহাবিশ্ব হলো সম্ভাবনার এক ক্ষেত্র (সুপারপজিশন), আর আমাদের স্থির ও সচেতন কল্পনা সেই পর্যবেক্ষকের কাজ করে—যা সেই সম্ভাবনাগুলিকে নির্দিষ্ট বাস্তবে পরিণত করে।

 

কোয়ান্টাম সুপারপজিশন বলে, কণা একসাথে অনেক অবস্থায় থাকে যতক্ষণ না দেখা হয়, তেমনি আমাদের মাথায় একটা লক্ষ্য যতক্ষণ কাজে নামি না ততক্ষণ অসংখ্য সম্ভাবনা ভেসে থাকে অন্যদিকে ‘Law of Attraction’ বলে, সেই সম্ভাবনাগুলোকে ছোট ছোট পদক্ষেপে বারবার ‘মাপা’। মানে অ্যাকশন নিলে একটাই বাস্তব ফল পাওয়া যায়, আর সেটাই দুই জগতের সেতু।

 

ইসলামে ধর্মে, ভালো চিন্তার জন্য পূন্য কেন লেখা হয়? কারণ, ভালো চিন্তা ভালো কাজে আমাদের প্রভাবিত করতে পারে। মানে হলো, চিন্তা আমাদের কাজে পরিণত হতে পারে। তবে আমার উদাহরণে কালো ও রহস্যময় বাক্সের মধ্যে কিছু নাও থাকতে পারে, মানে খালি একটি বাক্সও আপনি পেতে পারেন

 

একটা মজার উদাহরণে একবার নজর দেওয়া যাক!

 

আপনি যখন আপনার পার্টনার কে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছেন সেটা কিন্তু একধরনের ‘ঝুঁকি’। এই ‘ঝুঁকি’ গ্রহণের ফলে আপনি আপনার বর্তমান পার্টনারের থেকে ‘হ্যাঁ’ শুনেছেন বলেই আজ একসাথে আছেন। হয়তো প্রেম করছেন নয়তো সংসার করছেন। আপনাদের প্রেমে/সংসারে ‘ঝুঁকি’ নেওয়াটা আবশ্যিক ছিলো। আর ঐ ঝুঁকি বা রিস্ক নিতে পেরেছেন বলেই আজ হয়তো দুজনে ভালো আছেন কিন্তু এই পুরো বিষয়টি এত মসৃণ মোটেই নয়!

 

প্রথমত, আপনি তাকে কোথাও দেখেছেন নিশ্চয়। আপনি তার সম্পর্কে কিছু না কিছু তো জানেন। কিন্তু কেমন হত যদি আপনার সাথে তার দেখা-ই না হত? মানে এমন কবিতাও তো অনেক কবি লিখেছেন। দেখা না হলে ‘ঝুঁকি’ কাকে উদ্দেশ্য করে নিতেন? বা কেন-ই-বা নিতেন? বলুন তো? অথবা, ‘Law of Attraction’ অনুযায়ী কাকে আপনি কল্পনায় খুব করে চাইতেন? বা, সুপারপজিশনে এমন মানুষের অস্তিত্ব-ই যদি না থাকতো! আমি ঐ খালি বাক্সের কথা বলছি

 

সুপারপজিশন বলে, কণা সব সম্ভাবনায় একসাথে থাকে যতক্ষণ না তাকে ‘অবজার্ভ (পর্যবেক্ষণ)’ করা হয়। কিন্তু যদি কণাটাই না থাকে? তাহলে সুপারপজিশনও নেই। শূন্যতার সুপারপজিশন মানে কিছুই না থাকার সম্ভাবনাও একটা সম্ভাবনা। সুতরাং, ঝুঁকি নেওয়ার আগে আমরা যে ‘বাক্স’ কল্পনা করি, সেটাই হয়তো আমাদের সৃষ্টি

 

আপনি যদি কাউকে ‘কল্পনা (ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে)’ করেন, তাহলে সেটাও এক ধরনের ইবাদত। কারণ আপনি একটা অজানা ভালোবাসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আর ইসলাম বলছে, ভালো চিন্তা = পূণ্য, এমনকি যদি সেটা কখনো বাস্তবে রুপান্তরিত নাও হয়। কারণ সেই চিন্তা আপনাকে ভালো কাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং, ঝুঁকি নেওয়ার আগে কল্পনা করা আসলে এক ধরনের প্রস্তুতি, যেখানে বাক্স খালি হলেও আপনি নিজেকে প্রস্তুত করছেন ভালোবাসার জন্য, ব্যর্থতার জন্য, বা শূন্যতার জন্য

 

খালি বাক্স আসলে ঝুঁকির শূন্যতার দর্শন। কারণ ঝুঁকি শুধু কিছু পাওয়ার জন্য নয়, কখনো কখনো কিছু না পাওয়ার জন্যও নিতে হয়। আর সেই খালি বাক্স-ই আপনাকে শেখায়, ভালোবাসা শুধু অন্যের প্রতি নয়, নিজের অজানা অংশের প্রতিও এক ধরনের ভালোবাসা

 

আপনি যদি কখনো কাউকে না দেখেন, তাহলেও ঝুঁকি থাকে। আর সেটা হলো, নিজের কল্পনার প্রতি বিশ্বাস রাখার ঝুঁকি। আর সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, যেখানে বাক্স খালি, কিন্তু আপনি তবুও হাত বাড়ান

 

দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে আমরা যা কিছুই করছি তা আমাদের নিজের লেখা একটা স্ক্রিপ্ট। নিজের লেখা একটা ন্যারেটিভ। যে ব্যক্তিত্ব আমরা বহন করছি সেটা কিছুই নয় আমাদের চিন্তা ছাড়া/কল্পনা ছাড়া। এই গল্পে আমরা সবাই হিরো/হিরোইন তো বটে কিন্তু খালি বাক্স হাতে পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকছে।

 

ফলে উদাহরণ থেকে যে ছেলে/মেয়ের পাশে আপনি বসে আছেন তিনি হয়তো আপনার গল্পের মাত্র একটা কল্পনা। তার সাথে দেখা না হয়ে অন্য কারো সাথে দেখা হলে মানুষটি কিন্তু পুরোপুরি পাল্টে যেত। গল্পে পরিবর্তন আসতো। অথবা, আপনি যদি ভিন্ন কোথাও জন্মগ্রহণ করতেন! তাহলে পুরো গল্পের সেটিংস-ই চেঞ্জ হয়ে যেত। তাই না?

 

আমরা প্রায়শই স্মার্টফোনের প্লে স্টোরে এমন কিছু চমৎকার গেম দেখতে পাই, যার প্রতিটিই একজন বা একাধিক ডেভেলপারের তৈরি নিয়ম ও গল্পের ভিত্তিতে পরিচালিত। এই ধারণাকে ভিত্তি করে অনেক দার্শনিক মনে করেন, ঠিক একইরকমভাবে আমরাও হয়তো এই পৃথিবীতে সিমুলেট হওয়া মানুষ চরিত্র—যার নেপথ্যে কোনো এক উন্নত সত্তা (যাকে আপনি ঈশ্বর বলতে পারেন বা না-ও বলতে পারেন) আছেন।

 

এই সিমুলেশন থিওরি অনুসারে, আমাদের অভিজ্ঞতাগুলি নিয়ন্ত্রিত। উদাহরণস্বরূপ, জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে (যেমন: দ্য ম্যাট্রিক্সচলচ্চিত্রে) যেমন দেখানো হয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের দেজা ভ্যু (Déjà Vu)’ অভিজ্ঞতাগুলো সেই সিমুলেশনে ঘটে যাওয়া একধরনের গ্লিচহতে পারে। এই সিমুলেশন তত্ত্বে বিশ্বাস করলে, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা বা নিজেকে গল্পের একমাত্র হিরো/হিরোইন ভাবার ক্ষমতার উপর একটি সীমাবদ্ধতা চলে আসে, কারণ আমরা মূলত অন্যের লেখা নিয়মের জালে বাঁধা।

 

কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি (QFT) অনুযায়ী, মহাবিশ্বের ‘Vacuum’ বা শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়; সেটি জিরো-পয়েন্ট এনার্জি (Zero-Point Energy) নামক সর্বনিম্ন শক্তিতে পরিপূর্ণ। আপনার খালি বাক্সএই Vacuum-এরই একটি রূপক। এখানে দৃশ্যমান কোনো বাস্তব কণা না থাকলেও, এই শূন্যস্থানটি সম্ভাব্যতার এক ক্ষেত্র—যা প্রতিটি অবস্থার ‘Amplitude’ বা সম্ভাবনা বহন করে।

 

সুতরাং, যখন আমরা কিছু না থাকাবা শূন্যতার কথা বলি, তখন সেটিও আসলে একটি সুনির্দিষ্ট কোয়ান্টাম স্টেট। আর যখন এই শূন্যতাকে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন এর অসীম সম্ভাবনাগুলো ভেঙে যায় এবং আমরা কিছু না থাকার নিশ্চয়তা লাভ করি। এই কিছু না থাকার নিশ্চিত জ্ঞানই এক অর্থে একটি দার্শনিক সূচনা বিন্দু। এই শূন্যতা এবং অনিশ্চয়তার বোধই আমাদের নতুন করে Amplitude (নতুন লক্ষ্য বা সম্ভাবনা) তৈরি করার এবং নতুন কিছুর জন্য হাত বাড়ানোর (প্রচেষ্টা করার) অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।

 

ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা নিয়ত (Intention)’ হলো যেকোনো কাজের সূচনাবিন্দু এবং এর আধ্যাত্মিক ভিত্তি। এই নিয়তের ধারণাকে অনেকে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের সম্ভাবনা (Probability)’ বা সুপারপজিশন’-এর সাথে তুলনা করেন, যদিও এটি শুধুমাত্র একটি দার্শনিক উপমা। হাদিস অনুসারে, আল্লাহ যখন কারো কল্যাণ চান, তখন তাকে প্রথমে ভালো কাজের খাঁটি নিয়ত করার সুযোগ দেন, যা তাকে সেই ভালো কাজটি বাস্তবে করার দিকে ধাবিত করে। আপনার এই বিশুদ্ধ নিয়ত যখন কর্মে পরিণত হয় এবং ফলাফল নিয়ে আসে, তখন তা পর্যবেক্ষণযোগ্য কল্যাণে (Observable Goodness)’ রূপ নেয়—যা অনেকটা ওয়েভ ফাংশন কলাপস-এর মাধ্যমে সম্ভাবনা থেকে বাস্তবে রূপান্তরের মতো।

 

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এমনকি যদি আপনি প্রত্যাশিত পার্থিব ফলাফল না-ও পান বা আপনার খালি বাক্সজোটেও, তবুও আপনার সেই বিশুদ্ধ নিয়তটি হারিয়ে যায় না। বরং এটি আপনার আধ্যাত্মিক খাতায় জমা থাকে এবং আপনার পরবর্তী প্রচেষ্টার বা সম্ভাবনার (Amplitude) বীজ হিসেবে কাজ করে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় কল্যাণের পথ খুলে দেয়।

 

আবার অনেকে বিশ্বাস করেন যে ‘Law of Attraction’ (আকর্ষণের সূত্র)-এর কাজ করার পদ্ধতিটিকে কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের ধারণার মাধ্যমে রূপকভাবে বোঝা যেতে পারে। যদিও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, এই রূপক অনুসারে—যখন আপনি কোনো কিছু মনে-প্রাণে চান বা বিশ্বাস করেন, তখন আপনি মহাবিশ্বের কাছে সেই নির্দিষ্ট ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনা (Probability Amplitude) বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। যেমন কোয়ান্টাম জগতে কোনো পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি অসীম সম্ভাবনার ওয়েভ ফাংশনকে কলাপস করতে বাধ্য করে, ঠিক তেমনি আপনার সুদৃঢ় ‘নিয়ত’ বা মানসিক ফোকাস সেই কাঙ্ক্ষিত বাস্তবতাটিকে আপনার জীবনের দিকে টেনে আনে।

 

অর্থাৎ, মহাবিশ্বের অসীম সম্ভাবনার (Superposition) মধ্য থেকে, আপনার মানসিক ফোকাস সেই পর্যবেক্ষক’-এর ভূমিকা পালন করে, যা নির্দিষ্ট করে দেয়—কোন সম্ভাবনাটি বাস্তবে ‘Collapse’ হবে বা আপনার জীবনে ধরা দেবে।

 

তৃতীয়ত বা সর্বশেষ যে কথাগুলো বলতে চাই তা হলো, ঝুঁকি না নিলে আমরা জীবনের প্রকৃত রূপ বা আমাদের মৃত্যুব্রতী সত্তাকে চিনতে পারি না। ঝুঁকি নেওয়ার পর যে ব্যর্থতা আসে, সেটিই আমাদের সাহসিকতার প্রতীক এবং চেষ্টার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে বুকে ধারণ করি। ঝুঁকি হলো সেই পরীক্ষার মুহূর্ত, যেখানে নিজের শক্তি ও দুর্বলতা যাচাই করে নিশ্চিত হতে হয় যে আমরা এখনও সক্রিয়ভাবে জীবিত; অন্যথায় জীবন কেবল মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া এক যান্ত্রিক হার্টবিট ছাড়া আর কিছুই নয়—যাকে আমরা ভুল করে ‘বেঁচে থাকা’ বলি।

 

একাকীত্ব এবং শূন্যতার সঙ্গী অন্যদিকে, আমরা যখন কল্পনায় কাউকে ডাকি, তখন মূলত নিজেদের ভেতরের গভীর শূন্যতাকেই নাড়াচাড়া করি। আমরা ভাবি অন্য কেউ এসে এই কালো গহ্বর পূর্ণ করবে, কিন্তু বাস্তবে পাই কেবল তাদের ‘অভাব’। এই অভাববোধই সম্ভবত আমাদের একমাত্র স্থায়ী সঙ্গী, যা কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে না। কাউকে না দেখেও তাকে নিয়ে বেঁচে থাকাটা আসলে নিজের মৌলিক একাকীত্ব লুকানোর একটি নিরর্থক প্রয়াস মাত্র। দর্শকহীন নাট্যমঞ্চ ঝুঁকি নিয়ে যখনই আমরা পৃথিবীর মঞ্চে দাঁড়াই, তখনই দেখা যায় পুরো বিশ্বটাই আসলে এক দর্শকহীন নাট্যমঞ্চ। সেখানে কার্পেট উঠলে দেখা যায় দর্শকাসনে কেউ নেই; এই বিশাল শূন্য থিয়েটারে আমরাই অভিনেতা, নির্দেশক এবং দর্শক।

 

নিজের হাসি-কান্না নিজেকেই শুনতে হয় এবং স্ব-আরোপিত মূল্য দিয়ে নিজেকে বোঝাতে হয় যে, এই সব কিছুর একটা তাৎপর্য আছে। অস্তিত্বের অর্থহীনতা আসলে জীবনের কোনো ঐশ্বরিক বা গূঢ় অর্থ নেই; আছে কেবল এক অসীম শূন্যতা, যা আমরা স্মৃতি, ব্যর্থতা বা সম্পর্কের নাম দিয়ে ভরাট করার বৃথা চেষ্টা করি। তাই ‘ঝুঁকি নেওয়া’ মানে নিজেকে বারবার এই মিথ্যে আশ্বাস দেওয়া যে আমরা বেঁচে আছি। অথচ বেঁচে থাকাটাই একটি দীর্ঘমেয়াদী মোহ। একদিন সব থেমে গেলে হয়তো বোঝা যায় যে, আমাদের অস্তিত্বের সংগ্রাম, আমাদের ঝুঁকি, এবং আমাদের এই জীবন সবই ছিল সেই অস্তিত্বের শূন্যতার মুখোমুখি হওয়া এক নিছক মরীচিকা।

 

পরিশেষে, আমি জানি এই ভাবনা অনেকের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরায়ে দেবে। কারো মতের সাথে না মেলায় রাগান্বিত হবেন। কিন্তু আমি যেটা আশা করছি, সেটা হলো, অন্তত একবার ভাবুন। ভাবতে তো কোনো ক্ষতি নাই। আমি শুধু জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু আমাদের জীবনে এরকম বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম! (License notice - applies to this profile photo only: This photo is licensed under the Creative Commons Attribution-ShareAlike 4.0 International (CC BY-SA 4.0). License: https://creativecommons.org/licenses/by-sa/4.0/, Attribution: MD Mehedi Hasan, Source: https://oviyatri.com/profile/mrbikel)