মিথ্যা স্মৃতি ও ডিজিটাল মায়া: যেভাবে একটি অস্তিত্বহীন বই বেস্টসেলার হয়
বারবার শোনা মিথ্যা কীভাবে সত্য হয়ে ওঠে? জানুন ‘Illusion of Truth’ এবং ‘FOMO’-এর মাধ্যমে কীভাবে একটি অস্তিত্বহীন বই বা পণ্যের কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করা হয়। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের এক ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
মিথা কথা বারবার বললে সত্য মনে হয়। কিন্তু ‘মিথ্যা স্মৃতি’ খুব সম্ভবত তারচেয়েও বেশি ভয়ংকর। আর আমরা যা চোখে দেখি তার সবটুকু সত্য নয়। আমরা সবসময় সবকিছু দেখি না, কখনো কখনো কিছু জিনিস আমাদের দেখানো হয়। সময়ের সাথে সাথে বিশ্বাস করানো হয়।
হঠাৎ নতুন একজন লেখকের বই বাজারে ছাপানো হলো। পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কপি। কিন্তু পাশের বুকস্টলে ক্রয় করতে গিয়ে আপনি দেখেন স্টক-আউট। নতুন লেখকের ১ হাজার কপি বইয়ের মধ্যে আর ১টি কপিও অবিক্রীত নেই। আপনি শত চেষ্টা করেও মাত্র এক কপি কোনোভাবেই সংগ্রহ করতে পারছেন না। বলা হচ্ছে, “পুনরায় নতুন কপি ছাপানো হলেই পাবেন।”
আমি মানছি, এমন লেখকও পৃথিবীতে জন্মেছে। কিন্তু আমি ঐ সব লেখকদের কথা বলছি না। একজন সামান্য ও সাধারণ একজন লেখকের কথা বলছি। সাধারণত একজন নতুন লেখকের প্রকাশক শুরুতেই এক হাজার কপি প্রকাশ করতে চাইবেন না। যদি অনেক ভালো পান্ডুলিপি হয় তবুও চাইবেন না। কারণ মানুষ নতুন লেখকের বই ক্রয়ে সাবধান থাকেন, চিন্তা করেন, ভেবে দেখেন, গবেষণা করেন।
প্রথমত, এই পেইড রিভিউর জমানায়, আপনি গুগলে সার্চ করবেন। আপনি জানতে চাইবেন ঐ নতুন লেখকের প্রকাশিত বই সম্পর্কে। আর যদি পাশে ফাইভ স্টার রেটিং উপস্থিত থাকে তাহলে আকর্ষণ অনুভব করবেন। হঠাৎ আপনি খেয়াল করলেন, অনলাইন ঐ বুকশপে, প্রায় দশ হাজার জন মানুষ ফাইভ স্টার রেটিং দিয়েছে!
আপনি মানুষ হিসেবে চতুর। আপনি চাইলেন ফেসবুকে ঢুকে ঐ বই সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো পাতা আছে কিনা। আপনি ঐ বই সম্পর্কিত একটি ‘পাতা’ খুঁজে পেলেন। শুধু তাই নয়, ঐ পাতায় অন্তত ১ লাখ ফলোয়ার দেখে চোখ ছানাবড়া। আপনার মনে হলো এসব ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রয় করা ফলোয়ার এবং একটি সংখ্যা মাত্র। আপনি খুঁজে বের করলেন ঐ পাতা খোলার তারিখ, মাত্র ৩ মাস পূর্বে! আর মাত্র দু'টি পোস্টে অসংখ্য ইতিবাচক মন্তব্য।
আপনি আরো ক্রসচেক করতে চাইলেন। যেহেতু ঐ বইটি এত জনপ্রিয় সেহেতু ঐ বই পড়ে নিঃসন্দেহে কেউ একজন বুক রিভিউ ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করেছে। আপনি ঐ বইয়ের নাম ‘XYZ (ধরে নিচ্ছি)’ লিখে ইউটিউবে সার্চ করলেন। আপনি সহসাই দেখতে পেলেন অসংখ্য রেজাল্ট।
আপনি খুব আনন্দিত হলেন এই ভেবে যে, আপনার সবচেয়ে পছন্দের ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সারও ঐ বই পড়েছেন এবং আধা-ঘন্টার একটি অতি-ইতিবাচক রিভিউ পর্যন্ত দিয়েছেন। তিনি যেন কোনো অধ্যায় বা পৃষ্ঠা বাদ না যায় ঠিক সেভাবে রিভিউ প্রদান করেছেন।
আপনি আপনার পরিচিত কতিপয় বন্ধুকে ঐ বই সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। ওদের কারো কাছেই একটিও কপি নাই। তবে ওরাও ঐ সম্পর্কে জানে। কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়া বিজ্ঞাপনে দেখেছে আবার কেউ কেউ শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার হিসেবে। বিশেষ করে তাদের ঐ বইয়ের কাভার চমৎকার লেগেছে; নান্দনিক। আপনার বন্ধুরাও বইটির পরবর্তী মুদ্রণের অপেক্ষা করছেন।
গুগলে সার্চ দিতেই স্ক্রিনে বইটির কাভার জ্বলজ্বল করে উঠলো। আসলেই অতি আকর্ষণীয় একটি কাভার, শৈল্পিক ও বৈচিত্র্যময়। মনে হচ্ছে একজন অতি-প্রতিভাবান ব্যক্তির রঙ তুলিতে এমন অসাধারণ ছবি ফুটে উঠেছে।
বইটি অনেক বেশি জনপ্রিয় এবং স্টক-আউট হয়ে যাওয়ায় এবার আপনি একটু আহত হলেন। ঐ অনলাইন বুকশপে ফোনকলে জানতে পারলেন, “আপনাকে আরো ৩ মাস অপেক্ষা করতে হবে!”
কিন্তু ৩ মাস অনেক দীর্ঘ সময়। আপনি চাচ্ছিলেন খুব দ্রুত বইটি হাতে পেতে। বইটির মূল্য একটি বেশি, ১৫০ পৃষ্ঠার বই ৯৯৯ টাকা। আপনি আপনার মানিব্যাগ থেকে এই টাকা সাইডে রেখে দিলেন।
এক সপ্তাহ পর লক্ষ্য করলেন, আপনার কাছের বন্ধুরা নাকি ঐ বইটির পাইরেটেড পিডিএফ পড়েছে কিন্তু শেয়ার করতে নারাজ। অবশ্য ওরা নিজেদের মধ্যে ঐ বই নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা করছে। কিন্তু একজন বলছে ৪৫ নং পৃষ্ঠা আবার আরেকজন বলছে ৫৪ নং পৃষ্ঠা। আপনার পুরো বিষয়টি বিরুক্ত লাগছে। আবার আপনার মনের মধ্যে ঐ বইটি ক্রয়ের তীব্র আকাঙ্খা জন্মেছে।
আপনি অগ্রীম ৯৯৯ টাকা একটি নির্দিষ্ট অনলাইন বুকশপে দিয়ে দিলেন। তিনমাস পর শোনা গেল বইটি পুনরায় মুদ্রিত হয়েছে। এবারও স্টক-আউট তাই আপনার কপি আপনি পেলেন না। পরবর্তী মুদ্রণে ছয়মাসের দেরি হতে পারে…
এই বিন্দুতে এসে আপনার আর বইটির জন্য অপেক্ষা করতে ইচ্ছা করছে না। বরং আপনার মনে এক ধরনের জেদ চেপে বসেছে। এই পুরো ঘটনাটি আপনার কাছে এখন আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। যে বন্ধুরা পিডিএফ পড়ার কথা বলেছিল, তাদের অসংলগ্ন কথাবার্তা যেমন পৃষ্ঠার নম্বরের গড়মিল আপনার মনে সন্দেহের বীজ বপন করেছিল। আপনি আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন।
এবার আপনি আর ক্রেতা নন, বরং একজন অনুসন্ধানী। আপনি সেই প্রকাশনীর ওয়েবসাইটে গেলেন। অবাক হয়ে দেখলেন, এই ‘XYZ’ বইটি ছাড়া তাদের আর কোনো বইয়ের তথ্য নেই। প্রকাশনীটির অফিসের ঠিকানা একটি আবাসিক এলাকা, যেখানে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব থাকাটাও বিস্ময়কর।
আপনি সেই জনপ্রিয় ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সারের কাছে একটি ই-মেইল পাঠালেন। জানতে চাইলেন, তিনি বইটির একটি কপি (Physical Copy) কোথায় পেয়েছেন? কয়েকদিন পর এলো একটি স্বয়ংক্রিয় উত্তর, যা আপনার প্রশ্নের সাথে কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিক নয়।
আপনার সন্দেহ ঘনীভূত হলো। আপনি বুঝতে পারলেন, আপনি কোনো বইয়ের জনপ্রিয়তার সাক্ষী হচ্ছেন না, বরং একটি নিখুঁত ও সুপরিকল্পিত মার্কেটিং কৌশলের শিকার হচ্ছেন। এখানে কোনো বই হয়তো ছাপানোই হয়নি, কিংবা ছাপানো হলেও তা হাতে গোনা কয়েকটি কপি, যা শুধু ইনফ্লুয়েন্সারদের উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য।
এই পুরো প্রক্রিয়াটিই হলো একটি যত্নসহকারে নির্মিত ‘illusion’ বা ‘মায়া’। আসুন, এবার এই মায়ার পেছনের মনোবিজ্ঞানটি বোঝার চেষ্টা করি।
শুরুতেই বলা হয়েছিল, “মিথ্যা কথা বারবার বললে সত্য মনে হয়।” মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Illusion of Truth Effect’। যখন আমরা একটি তথ্য বারবার বিভিন্ন উৎস থেকে পেতে থাকি হোক তা গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব বা বন্ধুর মুখ থেকে। আমাদের মস্তিষ্ক সেই তথ্যকে সত্য বলে ধরে নিতে শুরু করে।
‘XYZ’ বইটির ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছে। হাজার হাজার ফাইভ স্টার রেটিং, লক্ষাধিক ফলোয়ার, বিখ্যাত ইনফ্লুয়েন্সারের রিভিউ এবং শহরের বিলবোর্ড এই সবকিছু মিলে আপনার মস্তিষ্কে একটি সত্য নির্মাণ করেছে যে, বইটি অসাধারণ এবং অনেক জনপ্রিয়।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘Social Proof’ বা সামাজিক প্রমাণের ধারণা। যখন আমরা দেখি বহু মানুষ একটি জিনিস পছন্দ করছে বা ব্যবহার করছে, আমরাও সেটিকে ভালো বলে ধরে নিই। দশ হাজার রেটিং আর এক লক্ষ ফলোয়ার মূলত এই সামাজিক প্রমাণ তৈরির একটি কৃত্রিম উপায়। মানুষ সংখ্যার দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই সংখ্যাগুলোই আপনাকে বিশ্বাস করিয়েছে যে, বইটি না পড়াটা হবে একটি বড় ভুল।
বইটি যে বারবার ‘স্টক-আউট’ হয়ে যাচ্ছিল, সেটাও পরিকল্পনারই অংশ। একে বলে ‘Scarcity Principle’ বা দুর্লভতার নীতি। কোনো জিনিসের সরবরাহ যখন কম থাকে, তখন তার প্রতি আমাদের আকর্ষণ বহুগুণে বেড়ে যায়। কারণ, আমাদের মনে হয়, যা দুর্লভ, তা নিশ্চয়ই মূল্যবান।
৯৯৯ টাকা দামের একটি বই মুহূর্তে শেষ হয়ে যাওয়াটা আপনার মনে এর মূল্য এবং গুরুত্ব দুটোই বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই দুর্লভতাই জন্ম দিয়েছে ‘FOMO (Fear of Missing Out)’ বা ‘বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়’। আপনার বন্ধুরা যখন বইটি নিয়ে (হোক তা কাল্পনিক) আলোচনা করছিল, আপনি সেই আলোচনায় অংশ নিতে না পারার কারণে নিজেকে পিছিয়ে পড়া ভাবছিলেন। এই ভয়ই আপনাকে অগ্রিম টাকা দিয়ে বইটির জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য করেছে।
এখন আসি সবচেয়ে ভয়ংকর অংশে ‘মিথ্যা স্মৃতি’। আপনি বইটি কখনো চোখে দেখেননি, হাতে নিয়ে এর পৃষ্ঠা ওল্টাননি। কিন্তু বারবার এর আকর্ষণীয় কাভারটি দেখতে দেখতে, এর রিভিউ শুনতে শুনতে আপনার মস্তিষ্কে বইটি সম্পর্কে একটি স্মৃতি তৈরি হয়ে গেছে। এটি কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি স্মৃতি নয়, বরং বহু মিথ্যার সমন্বয়ে তৈরি একটি কৃত্রিম বা মিথ্যা স্মৃতি।
আপনি বইটির গন্ধ কল্পনা করেছেন, এর ভেতরের গল্প নিয়ে ভেবেছেন এবং এটি পড়ার আনন্দ কেমন হবে, তা নিয়ে রোমাঞ্চিত হয়েছেন। এই মিথ্যা স্মৃতি এতটাই শক্তিশালী যে, এটি আপনার বাস্তব যুক্তিবোধকে পরাজিত করে দিয়েছে এবং আপনাকে এমন একটি অস্তিত্বহীন জিনিসের জন্য অর্থ এবং সময় ব্যয় করতে প্ররোচিত করেছে।
শেষ পর্যন্ত, ‘XYZ’ বইটি কোনো সাহিত্যকর্ম নয়; এটি আধুনিক ডিজিটাল যুগের একটি নিখুঁত উদাহরণ, যা দেখায় কীভাবে প্রযুক্তি ও মনোবিজ্ঞানকে ব্যবহার করে মানুষের বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আমাদের যা দেখানো হয়, আমরা তাই দেখি। যা বিশ্বাস করানো হয়, তাই বিশ্বাস করি। বইটির অস্তিত্ব হয়তো নেই, কিন্তু এর তৈরি করা আকাঙ্ক্ষা, এর জন্য ব্যয় করা অর্থ এবং সময় সবই বাস্তব।
সুতরাং, পরেরবার যখন কোনো কিছুকে অতিরিক্ত জনপ্রিয় বা নিখুঁত দেখবেন, তখন একবারের জন্য হলেও থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি যা দেখছেন তা কি আসল, নাকি আপনাকে দেখানোর জন্য যত্নসহকারে সাজানো একটি মঞ্চ?
কারণ এই ডিজিটাল মায়ার জগতে, চোখের দেখা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0