সহনশীলতার প্যারাডক্স: আমরা কতক্ষণ চুপ থাকব?

সহনশীলতা বা Tolerance বলতে কী বোঝায়? পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে সহনশীলতার অপব্যবহার এবং কার্ল পপারের ‘Paradox of Tolerance’ তত্ত্বের আলোকে সহনশীলতার যৌক্তিক সীমানা নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণ।

মে 27, 2026 - 00:00
মে 27, 2026 - 01:26
 0  4
সহনশীলতার প্যারাডক্স: আমরা কতক্ষণ চুপ থাকব?
সহনশীলতার প্যারাডক্স: আমরা কতক্ষণ চুপ থাকব?

‘সহনশীলতা’ বা ‘Tolerance’ বলতে কী বোঝায়? সহনশীলতার বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী? আমরা একটি ভিন্নমতের উপর কতক্ষণ সহনশীলতা দেখাবো? এই প্রশ্নগুলো বেশ সহজ। আর যেহেতু প্রশ্নগুলো সহজ, সেহেতু উত্তরগুলোও সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু সত্যিই কি সহজ? নাকি সহজ শব্দের আড়ালে সবচেয়ে কঠিন নৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ফাঁদগুলো লুকিয়ে থাকে?

 

আসুন, সহনশীলতা বলতে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র আমাদের কী শিখিয়েছে তা আগে জেনে নিই।

 

পৃথিবীতে কোনো আদর্শ পরিবার নেই। অন্যদিকে পৃথিবীতে অনেক বিষাক্ত পরিবারও আছে। পারিবারিক শিক্ষা সাধারণত এমন: সহনশীলতা মানে ‘অবিচ্ছিন্নতা’। মানে যেটাই হোক, নিজেদের মধ্যে মিলেমিশে থাকতে হবে। সম্পর্ক ভাঙা যাবে না। পরিবার ভাঙা যাবে না। আত্মীয়-স্বজনের সামনে মুখ রক্ষা করতে হবে। নিজের ভাঙা পরিবারকে কিছুটা গুছিয়ে দেখানোর চলন আমাদের সমাজে বেশ পুরোনো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে পরিবার নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে সদস্যের মানসিক নিরাপত্তা ভেঙে দেয়, তাকে কি শুধু ‘পরিবার’ বললেই সে পবিত্র হয়ে যায়?

 

একজন পরিবারপ্রধান যখন ভাবছেন, তার সন্তান তার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করুক, তখন সেটাকে আমরা প্রায়ই ভালোবাসা বলে ভুল করি। তিনি যা নিজে করতে পারেননি, তিনি সেটাই সন্তানের মধ্যে দেখতে চাইছেন। কিন্তু তিনি কি কখনও সন্তানকে জানাচ্ছেন, “আমার অপূর্ণ স্বপ্ন অনেক, চাপ নিও না?” তিনি কি বলছেন, “আমার ব্যর্থতা তোমার দায়িত্ব নয়?” তিনি কি সন্তানকে মানুষ হিসেবে দেখছেন, নাকি নিজের অসম্পূর্ণ জীবনের পুনর্বাসন-প্রকল্প হিসেবে দেখছেন?

 

এই জায়গায় পারিবারিক সহনশীলতা খুব দ্রুত ‘Emotional Blackmail’ হয়ে ওঠে। বাংলায় বললে, আবেগের মাধ্যমে দায় চাপিয়ে দেওয়া। সন্তানকে বলা হয়, “আমাদের মুখ রাখো।” স্ত্রীকে বলা হয়, “সংসার করতে হলে সহ্য করতে হয়।” ছোট ভাইকে বলা হয়, “রক্তের সম্পর্ক নষ্ট করো না।” কিন্তু কেউ কি বড়জনকে বলে, “অন্যায় করা বন্ধ করুন?” কেউ কি পরিবারপ্রধানকে বলে, “আপনার কর্তৃত্বের সীমা আছে?” কেন সবসময় দুর্বল সদস্যকেই সহনশীল হতে বলা হয়? কেন শক্তিশালী সদস্যকে সংযমী হতে বলা হয় না?

 

সমাজ আমাদের আরও বড় শিক্ষা দেয়। সমাজ বলে, ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও। অন্যের ধর্ম আলাদা মানেই তাকে তার ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ ভিন্ন মত প্রকাশ করছে বলেই তাকে মানসিক বা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়। এই কথাগুলো সুন্দর। প্রয়োজনীয়ও। মানবিকও। UNESCO ১৯৯৫ সালের “Declaration of Principles on Tolerance”-এ সহনশীলতাকে মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছে। সেখানে সহনশীলতাকে উদাসীনতা নয়, বরং মানবিক মর্যাদা ও বৈচিত্র্যকে স্বীকার করার সক্রিয় নৈতিক অবস্থান হিসেবে ধরা হয়েছে।

 

কিন্তু সমস্যা হলো, সমাজ আমাদের শ্রদ্ধা শেখায়, সীমা শেখায় না। সমাজ আমাদের ভদ্রতা শেখায়, আত্মরক্ষা শেখায় না। সমাজ বলে, “সবাইকে সম্মান করো।” কিন্তু সমাজ বলে না, “কোন আচরণকে সম্মান করা বন্ধ করতে হবে।” সমাজ বলে, “ভিন্নমতকে জায়গা দাও।” কিন্তু সমাজ বলে না, “কোন পর্যায়ে ভিন্নমত আর ভিন্নমত থাকে না, বরং অন্যের স্বাধীনতা দখলের নকশা হয়ে ওঠে।”

 

ধর্ম পালন যদিওবা কিছুটা বুঝে আসে, এই উপমহাদেশে ধর্মচর্চা বিজ্ঞানচর্চাকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। ধর্ম নিয়ে কিছুটা মীমাংসাও হয়েছে, আবার বহু অমীমাংসাও থেকে গেছে। কিন্তু ভিন্নমত নিয়ে সহনশীলতা ঠিক বুঝে আসে না। একটি ভিন্নমত কোন পর্যায় পর্যন্ত গেলে আমি আর তা গ্রহণ করবো না? আমি একজন সহনশীল মানুষ হওয়ায় ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা কি আমার অসীম পর্যায়ের থাকতে হবে? কেউ যদি বলে, “আমি তোমার সঙ্গে একমত নই”, সেটি সহ্য করা যায়। কিন্তু কেউ যদি বলে, “তোমার মত প্রকাশের অধিকারই থাকা উচিত নয়”, তখনও কি তাকে ভিন্নমত বলা হবে?

 

আমাদের সমাজ অবশ্য এখানে বারবার চুপটি সেধেছে।

 

রাষ্ট্রের কথায় আসি। আমাদের রাষ্ট্র গণতন্ত্রের কথা বলে। কেমন এই গণতন্ত্র? তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক কম হচ্ছে না। গণতন্ত্র কি শুধু ভোটের নাম? নাকি গণতন্ত্র হলো নাগরিকের মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও ক্ষমতার জবাবদিহির সম্মিলিত কাঠামো? যদি রাষ্ট্র নাগরিকদের মতামতের প্রতি এত শ্রদ্ধাশীল হয়, তাহলে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বারবার বিপ্লব, আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, দমন-পীড়ন, রক্ত ও হতাশার পুনরাবৃত্তি কেন ঘটে?

 

প্রশ্ন অবশ্য শুধু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নয়। প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘ অভিজাতদের শাসন দেখেও আমাদের মতো কিছু প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর কতদূর পর্যন্ত সহনশীল হওয়া উচিত? ঠিক আর কতবার বিপ্লব হলে, আন্দোলন হলে, হাজারো মানুষ কোনো বোকা, মূর্খ, গোঁয়ার, আত্মমুগ্ধ বা ক্ষমতালোভী শাসকের অধীনে মৃত্যুবরণ করলেও আমাদের সহনশীলতা দেখিয়ে চুপ করে থাকা উচিত? এখানে সহনশীলতার মাত্রা কী? নাকি এই মাত্রা মূলত অসীম সহনশীলতাকেই বোঝায়?

 

আমরা তাত্ত্বিকভাবে জানি, সহনশীলতার বৈশিষ্ট্য হলো সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা, মুক্তমনা মনোভাব, ধৈর্য ও সংযম, সহানুভূতি, অহিংসা এবং ন্যায়পরায়ণতা। খুবই সুন্দর শব্দ। এসব শব্দ শুনতেও ভালো লাগে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুন্দর শব্দের ভেতরে যদি ক্ষমতার কৌশল লুকিয়ে থাকে, তখন কী হবে? “ধৈর্য ধরুন” কথাটি যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাগকে থামানোর জন্য ব্যবহার হয়, তাহলে সেটি কি নৈতিক পরামর্শ, নাকি শাসনের কোমল চাবুক?

 

আমি এখন মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটি গল্প উপস্থাপন করছি।

 

গল্পে, দুই ভাইয়ের মধ্যে জমিজমা নিয়ে প্রচণ্ড বিরোধ। এক পর্যায়ে তাদের চাচা এসে বললেন, “আমাদের এলাকায় একজন বিজ্ঞ মানুষ আছেন। তোমরা মোল্লার কাছে বিচার দাও। তিনি যে পক্ষে রায় দেবেন, সেটাই তোমাদের মেনে নিতে হবে।”

 

কথা অনুযায়ী কাজ। সেদিন রাতে মোল্লার দরবারে হাজির হলেন দুই ভাই এবং তাদের সেই চাচা। মোল্লা খুব গম্ভীর মেজাজে দুই ভাইয়ের কথা শুনছিলেন। ছোট ভাইয়ের যুক্তি শুনে মোল্লা খুশি হয়ে বললেন, “তুমিই ঠিক।” এবার বড় ভাইয়ের কথা শুনে ফের বললেন, “তুমিও ঠিক।” চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, “গুরুজী, এ কী করলেন? দু’জন বিপরীত কথা বললো, আর আপনি দুজনকেই ‘ঠিক’ বললেন? এ তো অসম্ভব!” মোল্লা চাচাকেও জানালেন, “তোমার কথাও কিন্তু ঠিক।”

 

মোল্লার বিচার থেকে আমরা আসলে কী বুঝি? ‘সত্য’ কি কোনো আপেক্ষিক বস্তু? নাকি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা এত গভীর যে আমরা প্রত্যেকেই নিজের অবস্থান থেকে নিজেকে ঠিক ভাবি? মোল্লা সাময়িকভাবে সবার কথা ও যুক্তিকেই স্বীকার করলেন। কিন্তু এই স্বীকৃতির ভেতরেই তিনি সহনশীলতার সীমা বুঝিয়ে দিলেন: সবার সত্য একইসঙ্গে সঠিক হতে পারে না। যদি সবার সত্য একই হয়, তাহলে ‘ন্যায়বিচার’ হয়ে উঠবে একটি প্রহসন মাত্র। আর সেই ন্যায়বিচারের কোনো ভিত্তি থাকতে পারে না।

 

এখানে সহনশীলতার একটি বড় ভুল ধারণা ভেঙে যায়। সহনশীলতা মানে সব মতকে সমান সত্য বলা নয়। সহনশীলতা মানে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, তার প্রতিটি মতকে সত্য ঘোষণা করা নয়। আপনি একজন মানুষ হিসেবে সম্মানের যোগ্য হতে পারেন, কিন্তু আপনার মত ভুল, ক্ষতিকর, অযৌক্তিক, নিষ্ঠুর বা বিপজ্জনক হতে পারে। একজন মানুষকে সম্মান করা যায়, তার মতকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেও।

 

কিন্তু মূল প্রশ্নের মীমাংসা এখানেও শেষ হয় না। আমরা যারা সহনশীল, অথবা অন্তত সহনশীলতার ভান ধরে থাকি, আমাদের সহনশীলতার সীমা ঠিক কতদূর পর্যন্ত হওয়া উচিত? এই সীমা কি অসীম? যদি অসীম না হয়ে সসীম হয়, তাহলে সেটাও বা কোন পর্যন্ত? একজন সহনশীল ব্যক্তি কি অসহনশীল আচরণ দেখাতে পারেন? আর যদি সহনশীল ব্যক্তি অসহনশীল হয়ে ওঠেন, তবুও কি তিনি সহনশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হবেন? কীভাবে হবেন?

 

‘Paradox of Tolerance’ বা ‘সহনশীলতার প্যারাডক্স’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারণা, যা কার্ল পপার ১৯৪৫ সালে তার “The Open Society and Its Enemies” বইতে উপস্থাপন করেন। পপারের যুক্তি ছিল, সীমাহীন সহনশীলতা শেষ পর্যন্ত সহনশীলতার বিলুপ্তি ঘটাতে পারে। যদি একটি সহিষ্ণু সমাজ অসহিষ্ণু শক্তির বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে অসহিষ্ণুরাই শেষ পর্যন্ত সহিষ্ণুদের ধ্বংস করতে পারে।

 

তবে পপার এটাও বলেননি যে, অসহিষ্ণু দর্শন প্রকাশ পেলেই তা সবসময় দমন করতে হবে; যতক্ষণ যুক্তি ও জনমতের মাধ্যমে তাকে মোকাবিলা করা যায়, ততক্ষণ দমন জ্ঞানসম্মত নয়। কিন্তু যখন অসহিষ্ণু শক্তি যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে এবং মুষ্টি বা অস্ত্র দিয়ে উত্তর দিতে শেখায়, তখন সহনশীলতার নামেই তাকে না-সহ্য করার অধিকার সমাজের থাকা উচিত।

 

এই প্যারাডক্সের একটি বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক উদাহরণ ১৯৩০-এর দশকের জার্মানি। হিটলার ৩০ জানুয়ারি ১৯৩৩ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর হন এবং ২৩ মার্চ ১৯৩৩ সালের “Enabling Act” জার্মান Reichstag পাস করলে তার সরকার সংসদীয় অনুমোদন ছাড়াই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পায়, যা নাৎসি একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার পথে বড় ধাপ হয়ে দাঁড়ায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে ক্ষমতায় এসে সেই ব্যবস্থাকেই ভেঙে ফেলার এই ইতিহাস সহনশীলতার সীমা নিয়ে আমাদের কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। গণতন্ত্র কি নিজের কবর খোঁড়ার সরঞ্জাম নিজেই তুলে দেবে? যে শক্তি ক্ষমতায় গিয়ে ভিন্নমত, সংবাদমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকার ধ্বংস করবে, তাকে কি কেবল “আরেকটি রাজনৈতিক মত” বলে সহ্য করা যায়?

 

জন রলস তার “A Theory of Justice” বইয়ের “Toleration of the Intolerant” অংশে বলেন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ সাধারণত অসহিষ্ণুদেরও সহ্য করতে পারে, কিন্তু যদি তারা ন্যায়পরায়ণ স্বাধীনতার কাঠামো ও অন্যদের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে, তখন সমাজের আত্মরক্ষার প্রশ্ন ওঠে। অর্থাৎ, সহনশীলতা আছে, কিন্তু আত্মবিনাশের লাইসেন্স নেই। ন্যায়পরায়ণতা আছে, কিন্তু ন্যায়ের কাঠামো ধ্বংসকারীর সামনে আত্মসমর্পণ নেই।

 

কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। ঠিক কখন আমাদের মনে হবে আমাদের, মানে সহনশীলদের, স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে? এর সীমা ঠিক কোন পর্যন্ত? কোন পর্যায়ে গেলে একজন সহনশীল মানুষের অসহনশীল হয়ে পড়াটা যুক্তিযুক্ত হবে?

 

এই প্রশ্নের একদম নিখুঁত উত্তর হয়তো আজও নেই। কিন্তু কিছু নৈতিক সূচক আছে। যখন কোনো মত অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকার করে, তখন বিপদ শুরু হয়। যখন কোনো গোষ্ঠীকে “অপবিত্র”, “শত্রু”, “বিশ্বাসঘাতক”, “নষ্ট জাত”, “জন্মগত অপরাধী” বা “অমানুষ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন তা শুধু ভাষা থাকে না। ভাষা তখন সহিংসতার ‘rehearsal’ হয়ে ওঠে। ইতিহাস দেখিয়েছে, মানুষকে আগে ভাষায় অমানুষ করা হয়, তারপর বাস্তবে তার উপর আঘাত করা সহজ হয়।

 

যখন কোনো মত নিজের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায়, তখন সেটি আর সাধারণ ভিন্নমত থাকে না। কেউ যদি বলে, “আমি এভাবে বাঁচতে চাই”, তাকে জায়গা দেওয়া উচিত। কিন্তু কেউ যদি বলে, “তোমাকেও আমার মতো করেই বাঁচতে হবে”, তখন সেটি ভিন্নমত নয়, আধিপত্য। কেউ যদি বলে, “আমি আমার ধর্ম পালন করবো”, সেটি অধিকার। কিন্তু কেউ যদি বলে, “আমার ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী রাষ্ট্র, শিক্ষা, নারী, সাহিত্য, শিল্প, আইন ও নাগরিক জীবন চলতে হবে”, তখন সেটি শুধু বিশ্বাস নয়, ক্ষমতার দাবি।

 

যখন কোনো মত যুক্তির ময়দান ছেড়ে ভয়, হুমকি, সহিংসতা ও সংগঠিত নিপীড়নের দিকে যায়, তখন সহনশীলতার সীমা পরীক্ষা শুরু হয়। বিতর্ক সহনীয়। সমালোচনা সহনীয়। তীব্র মতভেদও সহনীয়। কিন্তু হত্যার ডাক, হামলার হুমকি, জীবিকা ধ্বংসের প্রচেষ্টা, সামাজিক বয়কটের সন্ত্রাস, ঘৃণার সংগঠন, রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত মিথ্যাচার, এগুলোকে কি শুধু “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” বলা যায়? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি অন্যকে চুপ করানোর স্বাধীনতা?

 

যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অকার্যকর করতে চায়, তখন সতর্ক হওয়া জরুরি। নির্বাচন থাকবে, কিন্তু প্রতিযোগিতা থাকবে না। আদালত থাকবে, কিন্তু স্বাধীনতা থাকবে না। সংবাদমাধ্যম থাকবে, কিন্তু প্রশ্ন থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা থাকবে না। সংসদ থাকবে, কিন্তু জবাবদিহি থাকবে না। এই অবস্থাকে গণতন্ত্র বলা যায় না। এটাকে বলা যায় গণতন্ত্রের অভিনয়।

 

আরও একটি সূক্ষ্ম কৌশল আছে। কেউ কেউ আলাপের ভাষা ব্যবহার করে আলাপ ধ্বংস করে। তারা বলে, “আমরাও তো মত দিচ্ছি।” কিন্তু তাদের মতের উদ্দেশ্য অন্যের মত প্রকাশের অধিকার বন্ধ করা। তারা বলে, “আমাদেরও স্বাধীনতা আছে।” কিন্তু তাদের স্বাধীনতার ধারণা অন্যের স্বাধীনতাকে বাতিল করে। তারা সহনশীলতার ভাষা ধার নেয়, কিন্তু সহনশীলতার কাঠামো ভেঙে ফেলতে চায়। এটাকে বলা যায় “tolerance laundering”, অর্থাৎ সহনশীলতার ভাষা দিয়ে অসহনশীলতাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য দেখানোর কৌশল।

 

এই জায়গায় একজন সহনশীল মানুষের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিনি কি চুপ থাকবেন? তিনি কি বলবেন, “সবাই নিজের মত বলুক?” কিন্তু যদি এক পক্ষের মতই হয় অন্য পক্ষকে আর কোনোদিন কথা বলতে না দেওয়া, তখন নিরপেক্ষ থাকা কি সত্যিই নিরপেক্ষতা? নাকি তা নিপীড়কের পক্ষে নীরব সহযোগিতা?

 

সহনশীলতার বিপরীত সবসময় অসহনশীলতা নয়। অনেক সময় সহনশীলতার বিপরীত হলো কাপুরুষ নীরবতা। আমরা অনেক সময় নিজেদের শান্তিপ্রিয় ভাবি, কারণ আমরা সংঘাতে যেতে চাই না। কিন্তু সব সংঘাত খারাপ নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংঘাত নৈতিক। নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভ্যতার শ্বাসপ্রশ্বাস। শোষণের বিরুদ্ধে রাগ মানসিক অসুস্থতা নয়, বরং ন্যায়বোধের লক্ষণ। যে মানুষ অন্যায় দেখে কখনো রাগে না, সে খুব শান্ত নয়, সে হয়তো ভেতরে ভেতরে মৃত।

 

তবে এর মানে এই নয় যে, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নামে আমরাও একইভাবে নিষ্ঠুর হব। সহনশীল সমাজের প্রতিরোধও ন্যায়ভিত্তিক হতে হবে। প্রথমে যুক্তি, তারপর সামাজিক প্রতিবাদ, তারপর সাংবিধানিক ও আইনগত ব্যবস্থা, তারপর প্রাতিষ্ঠানিক আত্মরক্ষা। প্রতিরোধের মাত্রা হুমকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কারণ প্রতিরোধ যদি প্রতিশোধে পরিণত হয়, তাহলে পুরোনো নিপীড়কের জায়গায় নতুন নিপীড়ক জন্ম নেয়।

 

একজন সহনশীল ব্যক্তি অসহনশীল আচরণ করতে পারেন কি? পারেন, যদি তার অসহনশীলতা মানুষের মতপ্রকাশ বন্ধ করার জন্য না হয়ে মতপ্রকাশের পরিবেশ রক্ষার জন্য হয়। কেউ যদি বলে, “আমি তোমার সঙ্গে একমত নই”, তাকে চুপ করানো অসহনশীলতা। কিন্তু কেউ যদি বলে, “আমি ক্ষমতায় গেলে তোমার কথা বলার অধিকারই থাকবে না”, তাকে বাধা দেওয়া সহনশীলতার আত্মরক্ষা।

 

এই পার্থক্য বোঝার জন্য কয়েকটি প্রশ্ন করা যায়। আমি কি প্রতিপক্ষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতে চাইছি, নাকি তার দ্বারা অন্যদের অধিকার কেড়ে নেওয়া ঠেকাতে চাইছি? আমি কি তার মতের সমালোচনা করছি, নাকি তার অস্তিত্ব মুছে দিতে চাইছি? আমি কি যুক্তি, প্রমাণ ও ন্যায়ের ভিত্তিতে সীমা টানছি, নাকি দলীয়, ধর্মীয়, শ্রেণিগত বা ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে তাকে দমন করতে চাইছি? আমার লক্ষ্য কি সবার জন্য উন্মুক্ত পরিসর রক্ষা করা, নাকি শুধু আমার মতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা?

 

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এই তিন জায়গায় সহনশীলতার অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পরিবার বলে, “সহ্য করো, সম্পর্ক বাঁচাও।” সমাজ বলে, “সহ্য করো, ভদ্রতা বজায় রাখো।” রাষ্ট্র বলে, “সহ্য করো, স্থিতিশীলতা রক্ষা করো।” কিন্তু খুব কম মানুষ জিজ্ঞাসা করে, কার সম্পর্ক? কার ভদ্রতা? কার স্থিতিশীলতা? নির্যাতিতের নীরবতাকে যদি সম্পর্ক বলা হয়, সেটি সম্পর্ক নয়, বন্দিত্ব। প্রান্তিক মানুষের মুখ বন্ধ রাখাকে যদি সামাজিক শান্তি বলা হয়, সেটি শান্তি নয়, ক্ষমতার সুশৃঙ্খল শব্দহীনতা। নাগরিকের প্রতিবাদকে যদি রাষ্ট্রবিরোধিতা বলা হয়, সেটি রাষ্ট্রপ্রেম নয়, শাসকের আত্মমুগ্ধতা।

 

ক্ষমতাবানের সহনশীলতা এবং প্রান্তিকের সহনশীলতা এক জিনিস নয়। ক্ষমতাবান যখন বলে, “আমি তোমাকে সহ্য করছি”, সেখানে অনুগ্রহের গন্ধ থাকে। কিন্তু প্রান্তিক যখন বলে, “আমি সহ্য করছি”, সেখানে বেঁচে থাকার কৌশল, ভয়, বাধ্যতা ও অসম শক্তিসম্পর্ক কাজ করে। তাই প্রান্তিক মানুষের কাছে অসীম সহনশীলতা দাবি করা আসলে “moral burden shifting”, অর্থাৎ অন্যায়ের দায় অন্যায়কারীর উপর না চাপিয়ে সহ্যকারীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া।

 

আমরা কেন সবসময় দুর্বলকে বলি সহ্য করতে? কেন শক্তিশালীকে বলি না থামতে? কেন সন্তানকে বলি বাবা-মায়ের স্বপ্ন বুঝতে, কিন্তু বাবা-মাকে বলি না সন্তানের মানসিক চাপ বুঝতে? কেন নাগরিককে বলি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে, কিন্তু রাষ্ট্রকে বলি না নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করতে? কেন নারীকে বলি সংসার টিকিয়ে রাখতে, কিন্তু পুরুষকে বলি না মানুষ হতে? কেন সংখ্যালঘুকে বলি সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতি বুঝতে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠকে বলি না নিজের ক্ষমতার নেশা চিনতে?

 

সহনশীলতার প্রশ্ন তাই শুধু নৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি ক্ষমতার প্রশ্নও। কে কাকে সহ্য করছে? কোন অবস্থান থেকে সহ্য করছে? সহ্য না করলে কার ক্ষতি হবে? সহ্য করলে কার লাভ হবে? সহনশীলতার ভাষা কি সত্যিই মানবিকতার ভাষা, নাকি শাসনব্যবস্থার কোমল হাতিয়ার? এই প্রশ্ন না করলে সহনশীলতা একটি সুন্দর শব্দ হয়ে থাকবে, কিন্তু তার ভেতরে লুকানো ক্ষমতার কৌশল ধরা পড়বে না।

 

শেষ পর্যন্ত সহনশীলতার একটি কার্যকর সংজ্ঞা হতে পারে: সহনশীলতা হলো ভিন্নতাকে জায়গা দেওয়ার নৈতিক শক্তি, কিন্তু সেই ভিন্নতা যদি অন্যের জায়গা ধ্বংস করতে চায়, তাকে সীমাবদ্ধ করার ন্যায়সঙ্গত সাহস।

 

অতএব, সহনশীলতা অসীম নয়। অসীম সহনশীলতা শেষ পর্যন্ত অসহিষ্ণুতার জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে। আবার সীমাহীন প্রতিরোধও বিপজ্জনক, কারণ তা প্রতিশোধ, দমন ও নতুন অত্যাচারে পরিণত হতে পারে। তাই আমাদের দরকার ন্যায়ভিত্তিক সীমা, যুক্তিভিত্তিক প্রতিরোধ এবং মানবমর্যাদাভিত্তিক সাহস।

 

আমরা সহনশীল থাকব যতক্ষণ ভিন্নমত মানুষের মর্যাদা, অধিকার, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি ধ্বংস করতে উদ্যত না হয়। কিন্তু যখন কোনো মত মানুষের মানুষত্ব অস্বীকার করে, অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায়, সহিংসতা উসকে দেয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করতে চায় এবং সহনশীলতার ভাষা ব্যবহার করে অসহনশীলতার সাম্রাজ্য গড়তে চায়, তখন চুপ থাকা সহনশীলতা নয়।

 

ü  তখন দাঁড়ানোই সহনশীলতা।

ü  তখন প্রতিবাদই নৈতিকতা।

ü  তখন সীমা টানাই মানবিকতা।

 

কারণ যে সহনশীলতা অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে, সেটি আর সহনশীলতা থাকে না। সেটি হয়ে যায় প্রশিক্ষিত নীরবতা।

 

রেফারেন্স নোট

UNESCO. Declaration of Principles on Tolerance, 16 November 1995.

Karl Popper. The Open Society and Its Enemies, 1945. Notes to Chapter 7, Paradox of Tolerance.

John Rawls. A Theory of Justice. Section: Toleration of the Intolerant.

Encyclopaedia Britannica. Enabling Act, Germany, 1933.

German Bundestag. National Socialism, 1933-1945, and the Enabling Act.

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!