মনিটাইজেশন: অস্তিত্ব বিক্রির এক ‘সভ্য’ প্রক্রিয়া
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘মনিটাইজেশন’ কি আমাদের অস্তিত্বের টুকরো টুকরো বিক্রির একটি ‘সভ্য’ নাম? আমরা শুধু সময় বা শ্রম নয়, বন্ধুত্ব, স্মৃতি, ট্রমা সব বিক্রি করে দিচ্ছি। জানুন কীভাবে অ্যালগরিদম আমাদের সম্পর্ক, অতীতকে ‘লিক্যুড অ্যাসেট’ ও ‘রিলেটেবল কনটেন্ট’-এ পরিণত করছে।
আমরা আমাদের সবকিছুই বিক্রি করছি। আমাদের হাতে থাকা সময়, আমাদের গায়ে থাকা শক্তি এবং মস্তিষ্কের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো কিছু চিন্তা -এই সবকিছুই আমরা ইচ্ছায়/অনিচ্ছায় নিয়মিত বিক্রি করছি। আধুনিক এই সভ্য সমাজে এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে আমরা বলছি ‘মনিটাইজেশন’। একটা পরিষ্কার, ঠান্ডা, বাজারসম্মত শব্দ, যেটা আসলে আমাদের অস্তিত্বের টুকরো টুকরো বিক্রির একটা ‘সভ্য’ নাম মাত্র।
সোশ্যাল মিডিয়ার মনিটাইজেশন পেলে মিষ্টি বিতরণ করছি। আমি নিজেও এই মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল যখন মনিটাইজ হচ্ছে তখন আমরা শুধুমাত্র নিজেকেই বিক্রি করছি না বরং আক্ষরিকভাবেই আমাদের পরিচিত আত্মাদের বিক্রি করছি, আমাদের বন্ধুদের বিক্রি করছি। আমাদের স্মৃতি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এবং এই তিতা সত্য আমরা সবাই কমবেশি জানি বা অনুধাবন করি।
অবশ্য আমরা শুধু নিজের সময় বা শ্রম বিক্রি করছি না, আমরা বিক্রি করছি আমাদের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, স্মৃতি, হাসি, কান্না, অর্জন… এগুলো আর আমাদের নয়। এগুলো ডেটা হয়ে গেছে। আর ডেটা মানেই পণ্য। আর যত বেশি এনগেইজমেন্ট তত বেশি টাকা।
‘এনগেইজমেন্ট’ শব্দটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় প্রতারণা। আমরা ভাবছি, আমরা ‘কানেক্ট’ হচ্ছি। কিন্তু আসলে আমরা ‘এনট্র্যাপ’ হচ্ছি। আমাদের প্রেম, আমাদের রাগ, আমাদের নস্টালজিয়া এগুলো এখন মেট্রিক্স মাত্র। এগুলো এখন ‘ভিউ’, ‘ক্লিক’, ‘শেয়ার’ ও ‘ভাইরাল’। আর ভাগ্য ভালো হলে কিছু টাকা!
যদিও এখানে ভাগ্য নয়, বরং একটা অতি সূক্ষ্ম, অতি ঠান্ডা গণিত চলছে। আর সেই গণিতের নাম দেওয়া যায়, “অ্যারাউন্ড দ্য গ্লোব, রাউন্ড দ্য ক্লক, ইনসাইড ইওর স্ক্রিন, ইনসাইড ইওর স্কিন”। কারণ এখন আর শুধু স্ক্রিনে নয়, অ্যালগরিদম ঢুকে গেছে আমাদের নিদ্রায়, আমাদের হৃদস্পন্দনে, আমাদের স্বপ্নের ফাঁকে ফাঁকে। সারাক্ষণ, সারাবিশ্ব এবং সারা-আমি-টা জুড়ে।
আমাদের স্মৃতি এখন আর ক্রোনোলজিক্যাল বা ইমোশনাল অর্ডারে থাকে না। অ্যালগরিদম সেটাকে রি-অ্যারেঞ্জ করে ‘এঙ্গেজমেন্ট-অপটিমাইজড’ টাইমলাইন বানায়। ফলে আমি যখন আমার প্রথম প্রেমের কথা মনে করতে চাই, তখন মাথায় প্রথমে ভেসে ওঠে সেটার ফেসবুক-পোস্ট ভার্সন, ক্যাপশন-সহ। প্রকৃত ঘটনার গন্ধ, তাপ, অস্পষ্টতা সব ম্লান হয়ে যায়। আমরা নিজেদের অতীতকেও হারিয়ে ফেলছি ডেটা-মেমোরির কাছে। এইটা এক ধরনের ‘অটো-আলঝাইমার’ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
আমরা ভাবি, বন্ধুত্ব বিক্রি হচ্ছে কিন্তু আসলে তা আরও এক ধাপ এগিয়ে। সম্পর্কগুলো এখন ‘লিক্যুড অ্যাসেট’। আজকে যে বন্ধুকে ট্যাগ করলাম, সে-ই কালকে হয়তো আমার অ্যাফিলিয়েট লিঙ্কে ক্লিক করবে। কালকে সে আবার আমারই কনটেন্টে এসে ‘হাহা’ রিয়েক্ট দেবে। আমরা পরস্পরকে ক্রেতা-বিক্রেতা বানিয়ে ফেলছি, ফলে বিশ্বাসটা সব সময় একটা হালকা কমিশনের গন্ধ পায়। এই ‘রিসেসন’ ঘটছে প্রেমেও। টিন্ডারের মত ডেটিং এপ্লিকেশনে ম্যাচ হওয়ার আগেই আমরা জানি তার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ কতটা?
ভেতরে ভেতরে আমরা একটা ‘সেলফ-ক্যানিবালাইজেশন’ চালাচ্ছি। আমি যখন নিজের ব্যর্থতা, আমার অসুস্থতা, আমার কাছের মানুষের মৃত্যু সব পোস্ট করি, তখন ভাবি এটা ‘ভালোবাসার অভিযোজন’। কিন্তু সেই গভীর ট্রমাটাও শেষ পর্যন্ত হয়ে যায় ‘রিল’ বা ‘শর্টস’ -এর ফিডে আরেকজনের বিজ্ঞাপন-ব্রেকের আগের ১৫ সেকেন্ড। আমি নিজেকেই খেয়ে ফেলছি, হাড়গুলোও যেন ক্রান্চি স্ন্যাকস বানিয়ে বিক্রি করছি।
মনিটাইজেশনের টাকাটা আসলে ‘নিঃস্বতার ডিভিডেন্ড’। যত বেশি আমি নিজেকে খালি করে দিচ্ছি, তত বেশি ডলার যোগ হচ্ছে ওয়ালেটে। কিন্তু সেই ডলার দিয়ে আমি আর কিনতে পারব না সেই প্রথম চুমুর অপ্রকাশিত ঘনত্ব, সেই রাতের আকাশ যেটা দেখে কেউ ক্যামেরায় তোলেনি, সেই কথা যেটা শুধু কানে কানে ফিসফিস করে বলা হয়েছিল। অনেক বড় সিক্রেট!
আমরা এই সমস্তটাই বিক্রি করে দিচ্ছি, আর সেগুলোই পুনরুৎপাদন যোগ্য ছিলো না। ফলে আমরা হয়তো ধনী হচ্ছি দিনে দিনে, কিন্তু আমাদের ভেতরের ‘অনন্য’ অংশটা দিনে দিনে আরো দরিদ্র হচ্ছে।
আমরা এখন ‘মিউচুয়াল ইউটিলিটি ফ্রেন্ডশিপ’-এ আটকে গেছি। তুমি আমার পোস্ট শেয়ার করলে আমি তোমার গিগে ক্লিক করি; আমি তোমার স্টোরি রি-পোস্ট করলে তুমি আমার কমেন্ট বুস্ট করো। এই পারস্পরিক খাওয়ানো-খাওয়ানির বাইরে আমরা আর কোনো ভাষা রাখিনি।
ফলে যে বন্ধু আমার কনটেন্টে ‘এঙ্গেজ’ করে না, সে আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যায়। না আমি তাকে মুছেছি, না সে আমায়; অ্যালগরিদম দুজনকেই একে অপরের কাছ থেকে ‘অপটিমাইজ’ করে দিয়েছে। আমরা পরস্পরের জীবন থেকে অ্যালগরিদমিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। বিহঙ্গের মত উড়ে বেড়াই, কিন্তু কখনো ল্যান্ড করি না।
আমরা নিজেরাই নিজেদের স্টার্ট-আপ। প্রতিদিন সকালে উঠে আমার প্রথম কাজ হলো ‘ব্র্যান্ডিং মিটিং’। কোন ছবি দেবো? কোন ক্যাপশন দেবো? কোন হ্যাশট্যাগে ট্রেন্ড হবে? কি ভিডিও/রিলস্ বানাবো? ভাইরাল কি যাচ্ছে?
ঠিক যেন আমরা আমাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতাগুলোকে ‘স্টোরিলাইন’ বানাই, আমাদের ট্রমাকে ‘নিশ’ বানাই। একসময় দেখি আমরা আমাদের ভেতরের সব খারাপ জিনিসও বিক্রি করে ফেলেছি। কারণ সেটাও বাজারে ‘রিলেটেবল কনটেন্ট’।
ডিলিট বাটনটা আসলে একটা ফাঁকি-অ্যাসাইনমেন্ট: “নিজের চোখে মুছে ফেলো, আমরা বাকিটা রেখে দেব ভবিষ্যতের জন্য।” সুতরাং আমরা যখন ‘ক্লিয়ার হিস্ট্রি’ ট্যাপ করি, তখন আসলে নিজের অতীতকে ভবিষ্যতের বাজারে গচ্ছিত রাখি।
আমরা যখন আমাদের শেষ কান্না লাইভ করি, তারপর আত্মহত্যা করি, তখন মনে হয় আমরা আসলে আমাদের ডেথ-সার্টিফিকেটটাও সই করে ফেলেছি পাবলিক-ডিমান্ডের জন্য, তাও রিয়েল-টাইমে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0