থিসিয়াসের জাহাজ প্যারাডক্স: সবকিছু বদলে যাওয়ার পরও কি আমরা একই মানুষ থাকি?
থিসিয়াসের জাহাজ (Ship of Theseus) প্যারাডক্সের রোমাঞ্চকর গল্প দিয়ে বুঝুন মানুষের আত্মপরিচয়ের গভীর দর্শন। সবকিছু বদলে যাওয়ার পরও কি আমরা একই মানুষ থাকি? জানুন এই আর্টিকেলে।
আমার মতো ‘পাইরেটস্ অব ক্যারিবিয়ান (Pirates of the Caribbean)’ সিনেমা সিরিজের ভক্ত কারা আছেন? বিখ্যাত কিংবা কুখ্যাত, বোকা কিংবা চতুর ক্যাপ্টেন ‘জ্যাক স্প্যারো’কে ভুলে যাওয়া কি এত সহজ? আর সেই জনপ্রিয় ‘ব্ল্যাক পার্ল (Black Pearl)’ জাহাজ! মনে আছে তো?
আমার আজকের আলোচনা অবশ্য ব্ল্যাক পার্ল জাহাজ নিয়ে নয়। আলোচনা একটি কাল্পনিক জাহাজ নিয়ে। ধরুন, আপনার কাছে একটি জাহাজ আছে। ব্ল্যাক পার্লের মতো অভিশপ্ত নয়, বরং আপনাকে উপহার দেওয়া আশীর্বাদপুষ্ট একটি জাহাজ।
কে উপহার দিল? ধরুন, এক অপরিচিত বৃদ্ধ গুণীজন। তার চেহারায় বিজ্ঞতার ঝলক ছিল। মৃত্যুর আগে তিনি এই জাহাজের মালিকানা আপনাকে দিয়ে গেছেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, এই জাহাজের একমাত্র মালিক হওয়ার যোগ্য শুধু আপনি।
এই জাহাজের নাম ধরে নেওয়া যাক ‘মুক্তা (Pearl)’। মুক্তা শুধু নামে নয়, গুণেও। এই জাহাজ নিয়ে যখনই আপনি সমুদ্রে যান, তখনই একটি কালো মুক্তা পেয়ে যান। প্রায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার!
বাস্তব জগতে এমনটি সম্ভব নয়, কিন্তু দর্শনের প্রশ্ন তুলতে আমাদের মাঝে মাঝে অসম্ভবকে সম্ভব ধরে নিতে হয়। কারণ দর্শনের অনেক বড় প্রশ্নই শুরু হয় এইভাবে: যদি এমন হতো, তাহলে?
এই গল্পটিও সেই ধরনের এক কল্পিত পরীক্ষাগার।
বাস্তব জগতে কালো মুক্তা, বিশেষ করে ‘তাহিতি কালো মুক্তা (Tahitian Black Pearl)’, সাধারণত ‘ব্ল্যাক-লিপড ওয়েস্টার’ বা Pinctada margaritifera নামের ঝিনুকের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই মুক্তাগুলো প্রধানত ফরাসি পলিনেশিয়া, তাহিতি ও আশেপাশের অঞ্চলের মুক্তাচাষের মাধ্যমে পরিচিত। কালচার্ড তাহিতি মুক্তা তৈরি হতে সাধারণত প্রায় ১৮ মাস থেকে ২ বছর বা তার বেশি সময়ও লাগতে পারে।
কিন্তু আমাদের কল্পিত জগতে আপনার ‘মুক্তা’ জাহাজটি নিয়মিতই অসম্ভবকে সম্ভব করে। বাস্তবে এমন মুক্তা বঙ্গোপসাগরে এভাবে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমাদের কল্পিত জগতে ‘মুক্তা’ জাহাজটি বাস্তব ভূগোলের নিয়ম মানে না। আপনাকে শুধু একটি বিশেষ জাল সমুদ্রে ২০ থেকে ৪০ মিটার গভীরে নিক্ষেপ করতে হয়। দিনশেষে যখন জাল তুলে আনেন, তখন অন্তত একটি কালো মুক্তা পেয়ে যান, প্রায় প্রতিদিনই।
তাও আবার যা-তা ধরনের মুক্তা নয়। ‘ব্ল্যাক-লিপড ওয়েস্টার’ ঝিনুকের ‘তাহিতি কালো মুক্তা’। গল্পের সুবিধার জন্য ধরে নিই, প্রতিটি মুক্তার বাজারমূল্য ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ আপনি প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা উপার্জন করছেন। তাও আবার বঙ্গোপসাগর থেকে! শুধুমাত্র এই ‘মুক্তা’ জাহাজের কল্যাণে।
মুক্তা সংগ্রহ করে আপনি তা দেশ-বিদেশে রপ্তানি করেন এবং প্রচুর টাকা উপার্জন করতে থাকেন। কিন্তু এক বছর পর আপনি খেয়াল করলেন, আপনার জাহাজ আগের মতো আর অত শক্তিশালী নেই। জাহাজের পাটাতন থেকে শুরু করে সেই বিখ্যাত জাল পর্যন্ত আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
একদিন তো মুক্তা জাহাজের একটি পাটাতন ভেঙে ভেতরে কিছু জল প্রবেশ করতে লাগল। আপনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। একসময় আপনার মনে হলো, জাহাজের ঐ পাটাতন পরিবর্তন করলে কেমন হয়? এতে করে কি মুক্তা পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে?
আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মুক্তা জাহাজের ঐ নির্দিষ্ট পাটাতন শুধু পরিবর্তন করবেন। তাই আপনি অনেক টাকা ব্যয় করে একজন দক্ষ শিপবিল্ডার দিয়ে পুরোপুরি নতুন একটি পাটাতন জাহাজে যুক্ত করলেন। তারপর খেয়াল করে দেখলেন, আপনি এখনও প্রতিদিন প্রায় একটি করে মূল্যবান কালো মুক্তা পাচ্ছেন। আগের মতোই ভালো উপার্জন হচ্ছে।
এরপর আপনি ক্রমান্বয়ে মুক্তা জাহাজের মেইন ডেক, আপার ডেক, লোয়ার ডেক, পেছনের উঁচু ডেক, ফরেক্যাসল ডেক এবং টুইন ডেকসহ সব ধরনের ডেক আস্তে আস্তে পরিবর্তন করলেন। ফলাফল কী হলো? এখনও আপনি প্রতিদিন একটি করে মূল্যবান কালো মুক্তা পাচ্ছেন। আপনার উপার্জনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আপনার চোখে পড়ল না। আপনি দেখলেন, সবকিছু যেন আগের মতোই আছে।
এরপর আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই জাহাজের সমস্ত পুরনো জিনিসপত্র সরিয়ে নতুন জিনিসপত্র লাগাবেন। আপনার কাছে টাকা আছে এবং আপনি সহজেই তা করতে পারেন। তাছাড়া পুরনো জাহাজের সবকিছু বিকল না হলেও প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সুতরাং এবার আপনি একটি পুরো টিমকে কাজে লাগিয়ে দিলেন জাহাজটির ব্যাপক পরিবর্তন আনতে।
শিপবিল্ডার, নেভাল ইঞ্জিনিয়ার, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, সবাই মিলে মুক্তা জাহাজে নতুন জিনিসপত্র বসিয়ে দিলেন। এমনকি ঐ বিশেষ জালও আরও অত্যাধুনিক জাল দিয়ে পরিবর্তন করা হলো। ফলাফল? এখনও আপনি প্রতিদিনই মূল্যবান কালো মুক্তা পাচ্ছেন। আপনার উপার্জনে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই।
কিন্তু আপনি যে প্রতিদিন এই বিশাল অঙ্কের টাকা উপার্জন করেন, তার রহস্য ধরে ফেলেছে আপনার বন্ধু আবদুল কুদ্দুস। সে গোপনে গোপনে আপনার পুরনো জাহাজের ফেলে দেওয়া সমস্ত জিনিসপত্র মেরামত করে আরেকটি জাহাজ তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, আবদুল কুদ্দুস খেয়াল রেখেছে, একটি ছোট বা ক্ষুদ্র অংশও যেন নতুন করে ঐ জাহাজে যুক্ত করা না হয়।
মানে হলো, এখন আবদুল কুদ্দুসের কাছে আরেকটি জাহাজ আছে, যা নতুন করে জোড়া লাগানো হলেও তৈরি হয়েছে আপনার ‘মুক্তা’ জাহাজের পুরনো অংশ দিয়েই। দেখতে সেটিও প্রায় পুরোপুরি ‘মুক্তা’ জাহাজের মতো। কারণ মুক্তা জাহাজের সমস্ত খুঁটিনাটি দিয়েই তো এই জাহাজ আবদুল কুদ্দুস তৈরি করেছে।
একদিন আপনি ‘মুক্তা’ জাহাজের সর্বশেষ পুরনো নেভিগেশন সিস্টেম, যেমন রাডার, জিপিএস, ইকো সাউন্ডার, অটোপাইলট, সবকিছু আরও অত্যাধুনিক করলেন। অন্যদিকে আপনার বন্ধু আবদুল কুদ্দুস এক শুভদিন দেখে এই সবগুলো পুরনো জিনিস বাজার থেকে কিনে এনে তার নিজের জাহাজে যুক্ত করল।
অবশ্য এতেও আপনার কোনো ক্ষতি হলো না। আপনি নিয়মিত একটি করে মূল্যবান কালো মুক্তা পেতেই থাকলেন। আপনার উপার্জনে কোনো ঘাটতি হলো না।
এখন প্রশ্ন হলো, ‘মুক্তা’ জাহাজ কোনটি?
যে জাহাজ আপনাকে এক বিজ্ঞ বৃদ্ধ লোক উপহার দিয়েছিলেন সেটি? নাকি আবদুল কুদ্দুসের নির্মিত পুরনো অংশের জাহাজটি? কারণ আপনার জাহাজে ঐ বৃদ্ধের রেখে যাওয়া বস্তুগত কোনো অংশ আর নেই। অন্যদিকে আবদুল কুদ্দুসের জাহাজে আছে মুক্তা জাহাজের প্রায় সব পুরনো অংশ।
সাধারণ বোধে আমরা হয়তো বলতে চাইব, ‘মুক্তা’ জাহাজ একসঙ্গে দুইটি হতে পারে না। কিন্তু প্যারাডক্সের বিপদ এখানেই: বস্তুগত অংশ, ইতিহাস, ব্যবহার ও মালিকানার ধারাবাহিকতা আলাদা আলাদা দিকে ইশারা করতে শুরু করে।
এই দুই জাহাজের মধ্যে কোনটি সেই আশীর্বাদপুষ্ট মুক্তা জাহাজ? তবে কি আবদুল কুদ্দুসও এখন মূল্যবান কালো মুক্তা পাবে? কিন্তু আশীর্বাদ ছিল তো একজনের জন্য!
“ক্ষয়ে যাওয়া কাঠ একে একে সরিয়ে নতুন কাঠ বসানো হলো। তবু প্রশ্ন রয়ে গেল: জাহাজটি কি এখনও সেই একই জাহাজ?”
Plutarch-এর Life of Theseus অবলম্বনে ভাবানুবাদ
আর প্রশ্ন এখানেই শেষ নয়। আমরা প্রায়ই শুনি, মানুষের শরীরের বহু কোষ কয়েক বছর থেকে এক দশকের মধ্যে নবায়িত হয়। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। শরীরের সব কোষ একই গতিতে বদলায় না। কিছু কোষ দ্রুত বদলায়, যেমন অন্ত্রের আস্তরণের কোষ কয়েক দিনের মধ্যে বদলাতে পারে; কিছু কোষ বহু বছর থাকে; আবার মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র ও চোখের কিছু কোষ দীর্ঘকাল বা প্রায় সারাজীবনও থাকতে পারে।
তাহলে দশ বছর আগের যে ‘আমি’ ছিলাম, আজও কি সে-ই ‘আমি’ আছি? যদি আমার শরীরের অধিকাংশ উপাদান বদলে যায়, তাহলে আমার পরিচয় কোথায় থাকে? মাংসে? স্মৃতিতে? নামে? সম্পর্কে? নাকি ধারাবাহিকতায়?
গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, এথেন্সের রাজা থিসিয়াস ক্রীট দ্বীপ থেকে ফেরার পর তার জাহাজটিকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের কাঠের অংশগুলো, যেমন পাটাতন, বৈঠা, মাস্তুল, ক্ষয়ে যেতে থাকায় সেগুলো নতুন কাঠ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। Plutarch-এর বর্ণনায় এই ঘটনাই পরবর্তীতে পরিচয় ও পরিবর্তনের একটি বিখ্যাত দার্শনিক ধাঁধায় পরিণত হয়।
পরে Thomas Hobbes এই ধাঁধাকে আরও কঠিন করে তোলেন এই প্রশ্ন তুলে: যদি পুরনো কাঠগুলো জড়ো করে আরেকটি জাহাজ বানানো হয়, তাহলে আসল জাহাজ কোনটি?
প্রশ্ন ওঠে, সমস্ত অংশ পরিবর্তন হওয়ার পরও জাহাজটি কি থিসিয়াসের মূল জাহাজ? যদি না হয়, তাহলে কোন মুহূর্তে এটি নতুন জাহাজে পরিণত হলো? প্রথম পাটাতন বদলানোর সময়? অর্ধেক অংশ বদলানোর সময়? নাকি শেষ কাঠের টুকরোটি বদলে যাওয়ার পর?
এতক্ষণ ধরে আমরা কথা বলছিলাম ‘থিসিয়াসের জাহাজ (Ship of Theseus)’ প্যারাডক্স নিয়ে। এই প্যারাডক্স আমাদের এমন একটি ধাঁধায় ফেলে দেয়, যেখান থেকে খুব সহজে মুক্তি মেলা অসম্ভব। কারণ এটি শুধু একটি জাহাজের প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের নিজেরও প্রশ্ন।
আমি কি আমার শরীর? যদি শরীরই আমি হই, তাহলে শরীরের উপাদান বদলে গেলে আমি বদলাই না কেন? আমি কি আমার স্মৃতি? কিন্তু স্মৃতি তো ভুলে যায়, বদলে যায়, সাজানো হয়, কখনও কখনও মিথ্যাও তৈরি করে। আমি কি আমার নাম? নাম তো সমাজের দেওয়া লেবেল। আমি কি আমার সম্পর্ক? সম্পর্ক বদলালে কি আমিও বদলে যাই? আমি কি আমার পেশা? পেশা বদলালে কি ‘আমি’ বদলে যাই? আমি কি আমার অতীত? কিন্তু অতীতের ব্যাখ্যা তো বর্তমান মনস্তত্ত্ব বদলে দেয়।
তাহলে ‘আমি’ কোথায় থাকে?
থিসিয়াসের জাহাজ আমাদের শেখায়, পরিচয় কোনো সহজ বস্তুগত হিসাব নয়। শুধু কাঠ, পাটাতন, মাস্তুল, জাল, রাডার, জিপিএস, স্মৃতি, কোষ বা চেহারা দিয়ে পরিচয় ধরা যায় না। পরিচয় হয়তো একটি চলমান ধারাবাহিকতা, যেখানে বস্তু বদলায়, কিন্তু সম্পর্ক, ইতিহাস, ব্যবহার, উদ্দেশ্য এবং স্বীকৃতির সুতা একে ধরে রাখে।
কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। কারণ যদি ধারাবাহিকতাই পরিচয়ের ভিত্তি হয়, তবে আবদুল কুদ্দুসের জাহাজ কেন বাদ পড়বে? তার জাহাজে তো মূল অংশগুলো আছে। আর আপনার জাহাজে আছে ধারাবাহিক মালিকানা, ব্যবহার ও আশীর্বাদের ইতিহাস। তাহলে আসল ‘মুক্তা’ কি বস্তুগত? নাকি ঐতিহাসিক? নাকি কার্যগত? নাকি মালিকের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভেতরেই তার পরিচয়?
আর যদি এই প্রশ্ন মানুষে প্রয়োগ করি, তাহলে আরও ভয়ংকর এক প্রশ্ন সামনে আসে। একজন মানুষ কি তার শরীরের ধারাবাহিকতা? তার স্মৃতির ধারাবাহিকতা? তার সামাজিক পরিচয়ের ধারাবাহিকতা? নাকি অন্যরা তাকে যেভাবে চিনে, সেই স্বীকৃতির ধারাবাহিকতা?
একজন মানুষ যদি গরিব থেকে ধনী হয়, সে কি একই মানুষ থাকে? একজন বিপ্লবী যদি ক্ষমতায় গিয়ে শাসক হয়, সে কি একই মানুষ থাকে? একজন লেখক যদি বাজারের চাপে নিজের ভাষা বদলে ফেলে, সে কি এখনও সেই লেখক থাকে?
আমরা পরিচয়কে স্থির ভাবতে ভালোবাসি, কারণ স্থির পরিচয় আমাদের নিরাপত্তা দেয়। পরিবার আমাদের একটি নাম দেয়। সমাজ আমাদের একটি ভূমিকা দেয়। রাষ্ট্র আমাদের একটি নম্বর দেয়। বাজার আমাদের একটি মূল্য দেয়। স্মৃতি আমাদের একটি গল্প দেয়। কিন্তু জীবন কি সত্যিই এত স্থির?
শরীর বদলায়, স্মৃতি বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, ভাষা বদলায়, বিশ্বাস বদলায়, রাজনৈতিক অবস্থান বদলায়, এমনকি নিজের সম্পর্কে নিজের গল্পটাও বদলায়। তবুও আমরা বলি, ‘আমি আমি-ই আছি।’ কিন্তু এই দাবির ভিত কোথায়?
হয়তো ‘আমি’ কোনো একক বস্তু নয়। ‘আমি’ একটি চলমান গল্প। একটি অসমাপ্ত সম্পাদনা। একটি জাহাজ, যার পাটাতন বদলায়, মাস্তুল বদলায়, পাল বদলায়, নাবিক বদলায়, কিন্তু কোথাও যেন একটি অদৃশ্য রুট, একটি অদৃশ্য উদ্দেশ্য, একটি অদৃশ্য ইতিহাস তাকে ধরে রাখে।
কিন্তু যদি সেই রুটও বদলে যায়? যদি উদ্দেশ্যও বদলে যায়? যদি ইতিহাসও নতুন করে লেখা হয়?
তাহলে কি আমরা এখনও সেই মানুষ থাকি?
থিসিয়াসের জাহাজের সৌন্দর্য এখানেই। এটি আমাদের উত্তর দেয় না। এটি আমাদের এমন এক আয়নার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে আমরা শুধু জাহাজ দেখি না, দেখি নিজেদেরও। দেখি আমাদের শরীর, স্মৃতি, সম্পর্ক, ভাঙন, পুনর্গঠন, সামাজিক নাম, বাজারমূল্য, উত্তরাধিকার, আশীর্বাদ এবং প্রতারণার সম্ভাবনা।
আপনার ‘মুক্তা’ জাহাজ প্রতিদিন কালো মুক্তা এনে দেয়। আবদুল কুদ্দুসের জাহাজে আছে মূল অংশ। কিন্তু আসল প্রশ্ন মুক্তা কোন জাহাজে আছে, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা পরিচয় বলতে আসলে কী বুঝি?
যে জিনিস বদলায় না, তাকে?
নাকি যে বদলাতে বদলাতেও নিজের গল্প ধরে রাখে, তাকে?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। আর হয়তো সহজ উত্তর না থাকাটাই এই প্যারাডক্সের আসল সৌন্দর্য।
রেফারেন্স নোট: ‘থিসিয়াসের জাহাজ’ প্যারাডক্সের প্রাচীন আলোচনাটি Plutarch-এর Life of Theseus-এ সংরক্ষিত বিবরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরবর্তীকালে Thomas Hobbes পুরনো অংশগুলো সংগ্রহ করে দ্বিতীয় একটি জাহাজ নির্মাণের সম্ভাবনা তুলে ধরে এই পরিচয়-সমস্যাকে আরও জটিল দার্শনিক প্রশ্নে পরিণত করেন। এই প্রবন্ধে ব্যবহৃত ‘মুক্তা’ জাহাজ, আবদুল কুদ্দুস এবং বঙ্গোপসাগরে তাহিতি কালো মুক্তা পাওয়ার গল্পটি বাস্তব বর্ণনা নয়, বরং ‘Ship of Theseus’ প্যারাডক্স বোঝানোর জন্য নির্মিত একটি কল্পিত চিন্তা-পরীক্ষা। কালো মুক্তা ও মানবদেহের কোষ-নবায়ন সম্পর্কিত তথ্যগুলোও এখানে মূলত দার্শনিক প্রশ্নের প্রেক্ষাপট তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0