হিরো কমপ্লেক্স ও ভুক্তভোগী মানসিকতা: আত্মপরিচয়ের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ
আমরা কি সত্যিই খলনায়কের বিরুদ্ধে লড়ি, নাকি নিজের নায়কত্ব বাঁচাতে তাকে প্রয়োজন করি? জং, সার্ত্র ও কামুর দর্শনে খলনায়ক মনস্তত্ত্ব ও আত্মপ্রতারণার এক গভীর বিশ্লেষণ।
মানুষ কি সত্যিই খলনায়কের বিরুদ্ধে লড়ে, নাকি নিজের নায়কত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য খলনায়ককে প্রয়োজন করে?
আমার অস্তিত্বের জন্য আমার একজন খলনায়ক দরকার। অন্তত একজন খলনায়ক। মানে ভিলেন। কারণ আমি মানুষ হিসেবে যতটা বাঁচি, তার চেয়ে অনেক বেশি বাঁচি নিজের সম্পর্কে বানানো গল্পে। আর সেই গল্পে যদি কেউ আমাকে আটকে না দেয়, কেউ আমার বিরুদ্ধে না দাঁড়ায়, কেউ আমার সম্ভাবনা নষ্ট না করে, কেউ আমার আলো চুরি না করে, তাহলে আমি কাকে হারিয়ে নায়ক হবো?
আমি আমার সম্পর্কে যে গল্প মানুষকে শোনাতে চাই, সেই গল্পের জন্য অন্তত একজন ভিলেন দরকার। যাতে আমি নিজে একজন নায়ক হতে পারি। মেয়েদের ক্ষেত্রে, নায়িকা। আমার গল্পে। এই গল্পের ভেতরে আমার ব্যর্থতা থাকবে, কিন্তু ব্যর্থতা হবে অস্থায়ী। আমার কষ্ট থাকবে, কিন্তু কষ্ট হবে অর্থপূর্ণ। আমার অপমান থাকবে, কিন্তু অপমান হবে ভবিষ্যৎ উত্থানের ভূমিকা। আমার চোখের পানি থাকবে, কিন্তু সেই পানির মধ্যে থাকবে এক ধরনের নৈতিক দীপ্তি। আর এই আত্মপরিচয়ের থিয়েটারের জন্য, এই নায়কোচিত বিন্যাসের জন্য, এই “আমি আসলে ভালো, কিন্তু আমাকে হতে দেওয়া হয়নি” ধরনের গভীর ব্যক্তিগত বয়ানের জন্য দরকার একজন খলনায়ক। কেউ একজন, যার দিকে আঙুল তুলে বলা যায়: সে না থাকলে আমি অন্য রকম হতাম।
মানে হলো, আমার ব্যক্তি-অস্তিত্ব টিকেই থাকছে এক বা একাধিক খলনায়কের ওপর। আবার আমার ন্যারেটিভের খলনায়ক যত শক্তিশালী হবে, আমি তত বড় নায়ক হবো। যদি আমার প্রতিপক্ষ সামান্য হয়, তাহলে আমার বিজয়ও সামান্য। যদি আমার প্রতিপক্ষ বিশাল হয়, তাহলে আমার পরাজয়ও মহৎ, আমার ক্ষতও মহৎ, আমার টিকে থাকা যেন এক ধরনের মহাকাব্যিক সাফল্য। এইখানেই নায়কত্বের গোপন অর্থনীতি। খলনায়ক যত বড়, আমার আত্মদয়া তত বৈধ। খলনায়ক যত ভয়ংকর, আমার ব্যর্থতার দায় তত কম। খলনায়ক যত নিষ্ঠুর, আমার নৈতিক উচ্চতা তত নিরাপদ।
কিন্তু এই কথাটার ভেতরে ভয়ংকর এক মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ আছে। যদি আমার নায়কত্ব টিকে থাকে খলনায়কের ওপর, তাহলে আমার ব্যক্তি-অস্তিত্বও কি শেষ পর্যন্ত খলনায়ক-নির্ভর হয়ে পড়ছে না? আমি কি সত্যিই নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছি, নাকি আমার নিজের গল্পে নিজেকে মহৎ দেখানোর জন্য কাউকে অন্ধকারে দাঁড় করিয়ে রেখেছি? আমি কি সত্যিই খলনায়কের পরাজয় চাই, নাকি তার স্থায়ী উপস্থিতি চাই, যাতে আমার নায়কত্বের আয়নাটা ভেঙে না যায়? আমি কি মুক্তি চাই, নাকি এমন এক শত্রু চাই, যে না থাকলে আমার জীবনের নৈতিক নাটক মঞ্চহীন হয়ে পড়বে?
এই ধরনের সাদামাটা ও লিনিয়ার গল্পে খলনায়ক মানে নিরেট খারাপ মানুষ এবং নায়ক, অর্থাৎ আমি, নিরেট ভালো মানুষ। কিন্তু পৃথিবীতে এমন মানুষ পাওয়া খুবই কঠিন। মানে, স্রেফ ভালো মানুষ অথবা স্রেফ খারাপ মানুষ অদৌ হয় কি? মানুষ কি কখনো একরঙা? যে মানুষ আজ আমার গল্পে খলনায়ক, সে কি নিজের গল্পে নিজেকে ভুক্তভোগী ভাবে না? যে পরিবারকে আমি আমার বাধা মনে করি, সেই পরিবার কি নিজেকে দায়িত্বের ভারে পিষ্ট ভাবতে পারে না? যে সমাজকে আমি আমার বিপরীতে দাঁড় করাই, সেই সমাজ কি নিজেকে শৃঙ্খলা, সংস্কৃতি, সম্মান ও নিরাপত্তার রক্ষক ভাবতে শেখেনি? যে রাষ্ট্রকে আমি আমার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নিষ্ঠুর যন্ত্র ভাবি, সেই রাষ্ট্র কি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার নামে সবকিছুকে ন্যায্যতা দিতে অভ্যস্ত নয়?
তাহলে খলনায়ক কি বাস্তব, নাকি নির্মিত? নাকি এই দুইয়ের মাঝখানে এমন এক ধূসর অঞ্চল আছে, যেখানে সত্য, ক্ষোভ, স্মৃতি, অপমান, ব্যর্থতা, ক্ষমতা, আত্মপ্রতারণা, সামাজিক ভয় এবং ব্যক্তিগত অক্ষমতা একসঙ্গে মিশে যায়? আমরা কি সত্যিই খলনায়ককে চিনতে পারি, নাকি নিজের ক্ষতের ভাষায় তাকে বানিয়ে নিই? আমরা কি সত্যিই ন্যায় চাই, নাকি এমন এক নৈতিক মঞ্চ চাই যেখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ ঘোষণা করা যায়?
এখানে একটি জরুরি সতর্কতা রাখা দরকার। এই লেখার উদ্দেশ্য বাস্তব অত্যাচারী, শোষক, ম্যানিপুলেটর, দমনমূলক পরিবার, নিষ্ঠুর কর্মস্থল, শ্রেণিগত অবিচার, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বা রাজনৈতিক নিপীড়নকে অস্বীকার করা নয়। পৃথিবীতে বাস্তব খলনায়ক আছে। বাস্তব শোষক আছে। বাস্তব ক্ষমতা আছে। বাস্তব দমন আছে। বাস্তব অন্যায় আছে। বাস্তব নির্যাতন আছে। বাস্তব ক্ষমতার কাঠামো আছে, যা মানুষের শ্রম, শরীর, স্বপ্ন, প্রেম, ভাষা, ধর্ম, শ্রেণি, লিঙ্গ, নাগরিক অধিকার এবং চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রশ্নটি সেখানে নয়। প্রশ্নটি হলো, বাস্তব অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা কখন নিজের অস্তিত্বকেই খলনায়ক-নির্ভর করে ফেলি? আমরা কখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ থেকে নিজের ন্যারেটিভের নায়ক হয়ে উঠতে গিয়ে খলনায়কের ওপর মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ি? আমরা কি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়ি, নাকি অত্যাচারীকে নিজের আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে বসিয়ে রাখি?
বাস্তব অত্যাচারীকে মনস্তাত্ত্বিক প্রক্ষেপণ বলে উড়িয়ে দেওয়া নিষ্ঠুরতা। আবার নিজের প্রতিটি ব্যর্থতাকে অত্যাচারের ইতিহাস বানিয়ে ফেলা আত্মপ্রতারণা। পরিণত বিশ্লেষণ এই দুই বিপদের মাঝখানে দাঁড়ায়। সেখানে অভিযোগ আছে, কিন্তু আত্মসমালোচনাও আছে। সেখানে ক্ষত আছে, কিন্তু ক্ষতের বাজারও আছে। সেখানে শোষণ আছে, কিন্তু শোষণের ভাষা ব্যবহার করে নিজের দায় থেকে পালানোর প্রবণতাও আছে। সেখানে ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান আছে, কিন্তু নিজের ক্ষুদ্র ক্ষমতার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন আছে। মানুষ এই জটিল জায়গাটিতেই সবচেয়ে বেশি অসৎ হয়, কারণ এখানে সে একই সঙ্গে আহত এবং সুবিধাভোগী হতে পারে।
আবার শুধুমাত্র মানুষ বা নির্দিষ্ট ব্যক্তি খলনায়ক হয়, তাও নয়। আমি আমার পরিস্থিতিকেও চূড়ান্ত খলনায়ক বিবেচনায় নিতে পারি। আমি আমার পরিবারকে খলনায়ক ভাবতে পারি। আমি আমার সমাজকে খলনায়ক ভাবতে পারি। আমি আমার কর্মস্থলকে খলনায়ক ভাবতে পারি। কারো কারো কাছে রাষ্ট্র নিজেই খলনায়ক হয়ে আছে। আবার কারো কাছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো খলনায়ক। তারও বাইরে আছে দূরে চুপটি মেরে বসে থাকা সুপার পাওয়ারদের ছায়া-রাজনীতি, যাকে অনেক সময় “Deep State” বলি। এখানে “Deep State” বলতে কোনো সস্তা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বোঝানো হচ্ছে না; বরং রাষ্ট্রের দৃশ্যমান নির্বাচিত কাঠামোর বাইরে নিরাপত্তা, আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা, কর্পোরেট স্বার্থ, ভূরাজনীতি, সামরিক কৌশল, বহুজাতিক অর্থনীতি এবং ক্ষমতার সেই সমান্তরাল জটিল বিন্যাসকে বোঝানো হচ্ছে, যা অনেক সময় সাধারণ নাগরিকের জীবনে অদৃশ্য খলনায়কের মতো কাজ করে।
তারমানে খলনায়ক হতে পারে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, নিজ পরিবার, নিজ কর্মস্থল, নিজ সমাজ, নিজ রাষ্ট্র এবং সর্বশেষ ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা দূরের কোনো সুপার পাওয়ারের ক্ষমতা-যন্ত্র। কিন্তু এই সবকিছুকে খলনায়ক বলার মধ্য দিয়ে আমি কী করছি? আমি কি বাস্তব ক্ষমতার মানচিত্র পড়ছি, নাকি নিজের ব্যর্থতা ও ভয়কে এক বাহ্যিক মুখ দিচ্ছি? আমি কি বিশ্লেষণ করছি, নাকি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করছি? আমি কি মুক্তি চাই, নাকি একটি সুবিধাজনক শত্রু চাই? আমি কি সত্যিই ক্ষমতা বুঝতে চাই, নাকি ক্ষমতার একটি সহজ মুখ বানিয়ে তাকে ঘৃণা করতে চাই?
এখান থেকে বেশ কয়েকটি গভীর প্রশ্ন উদয় হয়। অস্তিত্ব কী জিনিস? অস্তিত্বের সঙ্গে খলনায়ক থাকা বা না থাকার সরাসরি সম্পর্ক কীভাবে জড়িয়ে আছে? নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য খলনায়ক কেন দরকার? নির্দিষ্ট ব্যক্তি থেকে Deep State পর্যন্ত এই সমস্ত উপাদানকে কীভাবে আমরা খলনায়ক বানাই? তারা কি অদৌ বিশুদ্ধ খলনায়ক? আমি, একজন ব্যক্তি, দিনশেষে নায়ক হতে চাই কেন? এবং আমি নিজের কাছে নিজে নায়ক হবার এই প্রত্যাশা না রাখলে সমস্যা কী? আমার নৈতিকতা ভেঙে পড়ে? আমার আত্মসম্মান ভেঙে পড়ে? আমার বেঁচে থাকার অর্থ ভেঙে পড়ে? নাকি আমার গল্প বলার ক্ষমতা ভেঙে পড়ে?
“Man first of all exists, encounters himself, surges up in the world, and defines himself afterwards.”
Jean-Paul Sartre, Existentialism is a Humanism
Jean-Paul Sartre-এর এই উক্তিটি আমাদের মূল প্রশ্নের কেন্দ্রে। অস্তিত্বের মানে হলো প্রথমে “থাকা”, তারপর “হওয়া”। কিন্তু এই “হওয়া” বা নিজেকে সংজ্ঞায়িত করার প্রক্রিয়াটি এত কঠিন কেন? কারণ, মানুষকে নিজের অর্থ নিজেই তৈরি করতে হয়। তার কোনো পূর্বনির্ধারিত সারবত্তা নেই। সে জন্মগতভাবে কোনো সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নিয়ে আসে না। পরিবার তাকে একটি নাম দেয়, সমাজ তাকে একটি পরিচয় দেয়, রাষ্ট্র তাকে একটি নাগরিক নম্বর দেয়, ধর্ম তাকে একটি নৈতিক ভাষা দেয়, অর্থনীতি তাকে একটি শ্রেণিগত অবস্থান দেয়; কিন্তু “আমি কে” এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তাকে নিজেকেই বানাতে হয়।
এই স্বাধীনতা শুনতে মুক্তির মতো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি ভয়ংকর দায়। আমি কী হবো, কেন হবো, কীভাবে হবো, আমার জীবনের অর্থ কী, আমার ব্যর্থতার দায় কার, আমার ক্ষতের ব্যাখ্যা কী, আমার অপমানের ইতিহাস কোথায়, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমাকে নিজেকেই তৈরি করতে হয়, তাহলে খলনায়ক একটি সুবিধাজনক আশ্রয় হয়ে ওঠে। নিজের অর্থ নির্মাণের ভয় থেকে পালাতে আমি বলি, আমাকে হতে দেওয়া হয়নি। কেউ আমাকে আটকে দিয়েছে। কেউ আমার সম্ভাবনা নষ্ট করেছে। কেউ আমার আলো চুরি করেছে। কেউ আমার জীবনকে এমন দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেদিকে আমি যেতে চাইনি।
Sartre-এর ভাষায়, এটি “Bad Faith” বা আত্মপ্রতারণার একটি রূপ হতে পারে। অবশ্য সবক্ষেত্রে নয়। কারণ বাস্তব বাধা বাস্তবই। শ্রেণি বাস্তব। দারিদ্র্য বাস্তব। পারিবারিক দমন বাস্তব। রাজনৈতিক সহিংসতা বাস্তব। কর্মস্থলের শোষণ বাস্তব। কিন্তু যেখানে আমি নিজের স্বাধীনতার চাপ সহ্য করতে পারি না, সেখানে আমি বাইরের কোনো শক্তিকে এমনভাবে দায়ী করি, যেন আমার নিজের কোনো দায়ই নেই। খলনায়ক তখন শুধু শত্রু নয়, সে আমার নৈতিক অজুহাত। সে আমার ব্যর্থতার বীমা। সে আমার অসম্পূর্ণ জীবনের ব্যাখ্যা। আমি তখন বলি, আমি পারিনি, কারণ আমাকে পারতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই বাক্যের ভেতরে কতটা সত্য, কতটা আত্মরক্ষা, কতটা হিসাবি নাটক, কতটা অক্ষমতার নৈতিক সাজসজ্জা, সেটি কি আমি নিজে কখনো যাচাই করি?
“Life can only be understood backwards; but it must be lived forwards.”
Søren Kierkegaard
Søren Kierkegaard-এর এই প্যারাডক্স মানুষের গল্প বলার প্রবণতার মূলে আছে। জীবনকে বোঝা যায় পেছনে তাকিয়ে, কিন্তু বাঁচতে হয় সামনে এগিয়ে। আমরা যখন বর্তমানের ভেতরে থাকি, তখন ঘটনা বিশৃঙ্খল। কে বন্ধু, কে শত্রু, কোন সিদ্ধান্ত ঠিক, কোন ব্যথা অর্থপূর্ণ, কোন অপমান ভবিষ্যতের মোড় ঘুরিয়ে দেবে, আমরা জানি না। কিন্তু পরে ফিরে তাকালে আমরা গল্প বানাই। বলি, ওই মানুষটি না থাকলে আমি আজ এখানে আসতাম না। ওই শত্রু আমাকে তৈরি করেছে। ওই অপমান আমাকে জাগিয়েছে। ওই ব্যর্থতা আমাকে বদলে দিয়েছে। অর্থাৎ অতীতকে বোঝার জন্য আমরা খলনায়ক বানাই। খলনায়ক আমাদের স্মৃতিকে কাঠামো দেয়। বিশৃঙ্খল ঘটনাকে plot বানায়। কিন্তু বিপদ হলো, যে জীবন বাস্তবে ধূসর ছিল, স্মৃতির আদালতে সেটি সাদা-কালো হয়ে যায়।
স্মৃতি কখনো নিরপেক্ষ আদালত নয়। স্মৃতি অনেক সময় নিজের বর্তমান পরিচয়ের আইনজীবী। আজ আমি যে মানুষ হতে চাই, স্মৃতি সেই মানুষটির পক্ষে সাক্ষী সাজায়। সে কিছু ঘটনা বড় করে, কিছু ঘটনা ছোট করে, কিছু মানুষের মুখ বিকৃত করে, কিছু মানুষের অবদান মুছে দেয়, কিছু অপমানকে ঐতিহাসিক করে তোলে, কিছু ভুলকে তুচ্ছ করে। ফলে খলনায়ক শুধু অতীতের চরিত্র নয়; সে বর্তমান আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক নির্মাণ। আমি আজ যে নায়ক হতে চাই, সেই নায়কের জন্য গতকালের খলনায়ককে নতুন করে সাজাই।
Martin Heidegger তাঁর Being and Time গ্রন্থে “Being-in-the-world” বা জগতে-থাকার কথা বলেছেন। অস্তিত্ব কোনো শূন্য বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বিশ্বের সঙ্গে নিরন্তর একটি সম্পর্ক। আমি আলাদা একা কোনো আত্মা নই, যে পৃথিবীর বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন দেখছে। আমি সবসময় জগতের মধ্যে। সময়, মৃত্যু, ভয়, ভাষা, অন্য মানুষ, সামাজিক প্রত্যাশা, ইতিহাস, অর্থনীতি, শরীর, বয়স, অসমতা, শ্রম, লজ্জা, সম্মান, আকাঙ্ক্ষা, সবকিছুর মধ্যে আমার অস্তিত্ব। এই জগতে-থাকার মধ্যেই ঘর্ষণ আসবে। বাধা আসবে। সীমাবদ্ধতা আসবে। অন্যের উপস্থিতি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলবে। সময় আমাকে ক্ষয় করবে। মৃত্যু আমাকে তাড়া করবে। সমাজ আমাকে মাপবে। রাষ্ট্র আমাকে নিবন্ধিত করবে। অর্থনীতি আমাকে দামের মধ্যে নামিয়ে আনবে।
কিন্তু এই নৈর্ব্যক্তিক বাধাগুলোকেই আমরা অনেক সময় ব্যক্তিসত্তায় রূপ দিয়ে “খলনায়ক” বানিয়ে ফেলি। সময়কে খলনায়ক বানাই। দারিদ্র্যকে খলনায়ক বানাই। সমাজকে খলনায়ক বানাই। রাষ্ট্রকে খলনায়ক বানাই। নিজের জন্মপরিস্থিতিকে খলনায়ক বানাই। এমনকি নিজের ভেতরের অলসতা, ভয়, ঈর্ষা, অক্ষমতা, স্থগিতকরণ, অনুশাসনের অভাব, সিদ্ধান্তহীনতা, স্থায়ী ক্লান্তি এবং অসমাপ্তির অভ্যাসকেও বাইরের কারও মুখে বসিয়ে দিই। প্রশ্ন হলো, আমি কি বাধার প্রকৃতি বুঝতে চাই, নাকি বাধাকে একটি মুখ দিয়ে তাকে ঘৃণা করতে চাই?
এই জায়গায় মানুষের মনস্তত্ত্ব খুব কৌশলী। বিমূর্ত যন্ত্রণাকে ঘৃণা করা কঠিন। দারিদ্র্যকে ঘৃণা করা যায়, কিন্তু দারিদ্র্যের কাঠামো বোঝা কঠিন। সময়কে ঘৃণা করা যায়, কিন্তু সময় ব্যবস্থাপনা শেখা কঠিন। রাষ্ট্রকে ঘৃণা করা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও শ্রেণিগত প্রকৃতি বোঝা কঠিন। পরিবারকে ঘৃণা করা যায়, কিন্তু পরিবারের ভেতরে অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা, সামাজিক ভয়, সম্মান-রাজনীতি, প্রজন্মগত ট্রমা এবং ভালোবাসার ভাষায় নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস বোঝা কঠিন। তাই আমরা জটিল কাঠামোকে অনেক সময় সহজ মুখে নামিয়ে আনি। কারণ মুখের বিরুদ্ধে রাগ করা যায়। কাঠামোর বিরুদ্ধে ভাবতে হয়।
“Everyone carries a shadow, and the less it is embodied in the individual's conscious life, the blacker and denser it is.”
Carl Jung
Carl Jung-এর এই ধারণাটি খলনায়ক মনস্তত্ত্ব বুঝতে অত্যন্ত মূল্যবান। আমাদের সত্তার যে অন্ধকার অংশটি আমরা স্বীকার করতে চাই না, আমাদের ক্রোধ, ঈর্ষা, লোভ, হিংসা, নিষ্ঠুরতা, হীনম্মন্যতা, প্রতিহিংসা, স্বীকৃতির ক্ষুধা, ক্ষমতার লালসা, ভালোবাসা না পাওয়ার ক্ষত, পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়, নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ দেখানোর বাসনা, এগুলোই আমাদের “Shadow” বা ছায়া। আমরা নিজেদের ভালো ভাবতে চাই। নৈতিক ভাবতে চাই। সংবেদনশীল ভাবতে চাই। নির্দোষ ভাবতে চাই। কিন্তু এই ভালো মানুষের মুখোশের নিচে যে অন্ধকার জমে থাকে, তাকে কোথাও না কোথাও পাঠাতে হয়। তখন আমরা অন্যের মধ্যে সেই অন্ধকার দেখি। বলি, সে ঈর্ষাকাতর। সে ক্ষমতালোভী। সে ম্যানিপুলেটর। সে নিষ্ঠুর। সে স্বার্থপর। সে বিশ্বাসঘাতক। অথচ এই সব গুণের বীজ কি আমার ভেতরে একেবারেই নেই?
খলনায়ক অনেক সময় এই ছায়ার বাহ্যিক প্রক্ষেপণ। “External Projection” বা বাহ্যিক প্রক্ষেপণ। আমি নিজের যে অংশটিকে দেখতে চাই না, তাকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিই। ফলে বাইরের মানুষটি শুধু মানুষ থাকে না; সে আমার অবদমিত অন্ধকারের বাহক হয়ে ওঠে। তখন তাকে ঘৃণা করা মানে নিজেকে পবিত্র ভাবা। তাকে দোষী প্রমাণ করা মানে নিজের ভেতরের আদালতে নিজেকে নির্দোষ ঘোষণা করা। এখানেই ডার্ক সাইকোলজির সূক্ষ্ম খেলা। আমরা অনেক সময় সত্যের জন্য নয়, আত্মপরিচয় রক্ষার জন্য শত্রু বানাই।
এখানে “Victim Identity Loop” বা ভুক্তভোগী-পরিচয়ের চক্র কাজ করে। প্রথমে কেউ সত্যিই আমাকে আঘাত করে। তারপর আমি সেই আঘাতকে নিজের পরিচয়ের কেন্দ্রে বসাই। এরপর আমি এমন সব ঘটনাও সেই আঘাতের ভাষায় পড়তে শুরু করি, যেগুলো হয়তো সরাসরি সেই খলনায়কের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। শেষে আমি কষ্ট পাই, কিন্তু কষ্ট হারাতেও ভয় পাই; কারণ কষ্ট হারালে আমার গল্পের কেন্দ্র হারাবে। তখন ক্ষত শুধু ক্ষত থাকে না, ক্ষত হয়ে ওঠে পরিচয়। আর পরিচয় একবার ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়ে গেলে মানুষ মুক্তির চেয়ে পুনরাবৃত্তিকে বেশি চেনে।
আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো “Splitting”, অর্থাৎ মানুষকে পুরো ভালো বা পুরো খারাপ হিসেবে দেখা। সে খারাপ, তাই আমি ভালো। সে অন্ধকার, তাই আমি আলো। সে অত্যাচারী, তাই আমি নৈতিক। সে মিথ্যা, তাই আমি সত্য। সে অসভ্য, তাই আমি সংস্কৃতিমান। এই বিভাজন সাময়িক মানসিক আরাম দেয়, কিন্তু বাস্তবতা ধ্বংস করে। কারণ মানুষ এত সরল নয়। কোনো মানুষ সম্পূর্ণ দেবদূত নয়, কোনো মানুষ সম্পূর্ণ দানবও নয়। তবে ক্ষমতা যখন কারও হাতে জমা হয়, তখন তার অন্ধকার অংশ সামাজিকভাবে কার্যকর হয়ে ওঠে। তাই ব্যক্তির জটিলতা বোঝা আর তার অপরাধকে ক্ষমা করা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্য না বুঝলে আমরা হয় নিষ্ঠুর হই, নয় সরল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় “Scapegoating” বা বলির পাঁঠা বানানোর প্রবণতা। যখন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ বুঝতে পারে না, অথবা বুঝলেও স্বীকার করতে চায় না, তখন সে এক ব্যক্তি, এক সম্প্রদায়, এক প্রতিষ্ঠান, এক প্রজন্ম, এক লিঙ্গ, এক রাজনৈতিক দল, এক প্রতিবেশী রাষ্ট্র, এক সংস্কৃতি বা এক অদৃশ্য ষড়যন্ত্রকে সব দোষের কেন্দ্র বানিয়ে ফেলে। এতে বিশ্লেষণের শ্রম কমে যায়। আত্মসমালোচনার কষ্ট কমে যায়। দায় বণ্টনের জটিলতা কমে যায়। কিন্তু সত্যও কমে যায়।
আর আছে “Hero Complex”, অর্থাৎ নিজেকে সবসময় উদ্ধারকর্তা ভাবার প্রবণতা। আমি আসবো, বুঝবো, লড়বো, বদলাবো, উদ্ধার করবো। এই বীরত্বের মধ্যে অনেক সময় নৈতিকতা থাকে, কিন্তু অনেক সময় থাকে আত্মমুগ্ধতা। আমি সাহায্য করি, কারণ মানুষকে সাহায্য করতে চাই। আবার কখনো সাহায্য করি, কারণ সাহায্যকারী হিসেবে নিজেকে দেখতে ভালো লাগে। আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, কারণ অন্যায় সত্যিই অন্যায়। আবার কখনো দাঁড়াই, কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার ছবি ভালো আসে। এইখানেই “Moral Narcissism” বা নৈতিক আত্মমুগ্ধতা কাজ করে। নিজের নৈতিক অবস্থানকে এত ভালোবাসা যে বাস্তব মানুষের কষ্টের চেয়ে নিজের নৈতিক ভঙ্গিটাই বড় হয়ে ওঠে।
“Narrative Addiction” বা বয়ান-আসক্তিও এখানে কাজ করে। মানুষ নিজের গল্পে এতটাই আসক্ত হয়ে পড়ে যে বাস্তব পরিবর্তনের চেয়ে গল্পের ধারাবাহিকতা তাকে বেশি নিরাপদ মনে হয়। সে বারবার একই ক্ষত, একই শত্রু, একই অপমান, একই দুঃখ, একই উদ্ধারের দৃশ্য পুনরাবৃত্তি করে। কারণ এই পুনরাবৃত্তি তাকে পরিচিত রাখে। পরিবর্তন তাকে অচেনা করে দেবে। আর মানুষ অনেক সময় মুক্তির চেয়ে পরিচিত কারাগারকে বেশি ভালোবাসে।
George Herbert Mead-এর “Symbolic Interactionism” থেকে বোঝা যায়, আমাদের “Self” বা আমিত্ব গঠিত হয় “Me” এবং “I”-এর সংঘাতে। “Me” হলো সমাজের দৃষ্টিতে আমি, আর “I” হলো আমার স্বতন্ত্র ইচ্ছাশক্তি। সমাজ আমাকে বলে, তুমি কে। পরিবার বলে, তোমার সীমা কোথায়। শ্রেণি বলে, তোমার জায়গা কত দূর। প্রতিষ্ঠান বলে, তোমার মূল্য কত। রাষ্ট্র বলে, তুমি কতটা আনুগত্যশীল। আর আমার ভেতরের “I” বলে, না, আমি এর বেশি। এই টানাপোড়েনেই পরিচয় তৈরি হয়। খলনায়ক এখানে একটি বাহ্যিক “Me” হিসেবে কাজ করে, যা সমাজের বা বিরূপ পরিস্থিতির প্রতিনিধি হয়ে আমার স্বতন্ত্রতাকে হুমকির মুখে ফেলে। আমি তাকে হারাতে চাই, কারণ তাকে হারানো মানে কেবল একজন মানুষকে হারানো নয়; আমাকে ছোট করে দেখা পুরো দৃষ্টিকেই হারানো।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারে খলনায়ক অনেক সময় কোনো মানুষ নয়; খলনায়ক হলো “মানুষ কী বলবে”। এই এক বাক্য কত প্রেম হত্যা করে, কত পেশা বদলে দেয়, কত মেয়েকে নিজের জীবন থেকে নির্বাসিত করে, কত ছেলেকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিরাপদ ব্যর্থতার পথে ঠেলে দেয়, তার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। পরিবার অনেক সময় ভালোবাসার ভাষায় নিয়ন্ত্রণ করে। সমাজ সম্মানের ভাষায় ভয় শেখায়। কর্মস্থল পেশাদারিত্বের ভাষায় শোষণ করে। রাষ্ট্র নিরাপত্তার ভাষায় আনুগত্য চায়। আর আমরা এই সব ভাষার ভেতর দাঁড়িয়ে কোনো এক ব্যক্তিকে খলনায়ক বানাই, কারণ কাঠামোকে ঘৃণা করা কঠিন, কিন্তু একজন মানুষকে ঘৃণা করা সহজ।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও এই খলনায়ক নির্মাণের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত নয়। একজন ছাত্র ব্যর্থ হলে পরিবার বলে, সে অলস। শিক্ষক বলে, সে মনোযোগী নয়। সমাজ বলে, সে অযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন খুব কম ওঠে: শিক্ষা কি তার ভাষায় পৌঁছাতে পেরেছে? স্কুল কি তার বাস্তবতার সঙ্গে কথা বলেছে? পরীক্ষার কাঠামো কি তার চিন্তাকে মাপে, নাকি শুধু মুখস্থ ক্ষমতাকে পুরস্কৃত করে? অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, ভাষাগত দুর্বলতা, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষকের মান, শ্রেণিগত লজ্জা, এসব কি ব্যর্থতার অংশ নয়? আমরা যখন একজন ছাত্রকে খলনায়ক বানাই, তখন আসলে একটি ভাঙা ব্যবস্থাকে নির্দোষ রাখি।
কর্মস্থলেও একই ঘটনা ঘটে। কোনো কর্মী ক্লান্ত, মন্থর, হতাশ বা অনুৎসাহী হলে তাকে বলা হয় অপ্রফেশনাল। কিন্তু প্রশ্ন করা হয় না, বেতন কি ন্যায্য? কাজের চাপ কি মানবিক? প্রতিষ্ঠান কি loyalty চায়, কিন্তু dignity দেয় না? বস কি নেতৃত্ব দেন, নাকি guilt, fear এবং dependency দিয়ে মানুষ চালান? কর্মস্থলের শোষণ অনেক সময় পরিবারতান্ত্রিক ভাষায় আসে: আমরা তো তোমাকে নিজের মানুষ ভাবি। এই বাক্যটি অনেক সময় বেতনের বিকল্প, ছুটির বিকল্প, সম্মানের বিকল্প, চুক্তির বিকল্প হয়ে যায়। তখন কর্মী যদি প্রতিবাদ করে, সে অকৃতজ্ঞ। যদি চুপ থাকে, সে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই খলনায়ক বানাতে শুরু করে।
Joseph Campbell তাঁর The Hero with a Thousand Faces বইয়ে নায়কের যে শাশ্বত যাত্রার কথা বলেছেন, সেখানে প্রতিটি ধাপে যেমন “Crossing the First Threshold” বা “Tests, Allies, Enemies”, বাধা বা খলনায়কের উপস্থিতি একেবারেই বাধ্যতামূলক। এর কারণ হলো গল্পের চিরায়ত কাঠামো। একটি গল্পে দ্বন্দ্ব ছাড়া কোনো কাহিনি হয় না। মনোবিজ্ঞানী Dan McAdams-এর মতে, মানুষ নিজের জীবনকেও একটি গল্প হিসেবেই দেখে, যাকে বলা যায় “Narrative Identity” বা বয়াননির্ভর আত্মপরিচয়। নিজের জীবনের এই গল্পে খলনায়ক ছাড়া “Redemption Sequence” বা উত্তরণের কোনো সুযোগ থাকে না। পতন না থাকলে উত্থান নেই। অপমান না থাকলে প্রতিশোধের নৈতিকতা নেই। অন্ধকার না থাকলে আলো দেখানোর অভিনয়ও নেই।
কিন্তু এখানেই বিপদ। যদি আমার জীবনকে গল্প বানানোর জন্য খলনায়ক দরকার হয়, তাহলে আমি কি অজান্তে খলনায়ক উৎপাদন করতে থাকি? আমি কি এমন মানুষ খুঁজি, যাকে আমার ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা যায়? আমি কি এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজি, যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে পারি? আমি কি এমন রাষ্ট্র খুঁজি, যার নিষ্ঠুরতার সামনে আমি নিজের নৈতিকতা প্রদর্শন করতে পারি? আমি কি এমন সম্পর্ক খুঁজি, যেখানে আমাকে বারবার আঘাত করা হবে, যাতে আমি আবারও আহত নায়ক হতে পারি? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর, কিন্তু প্রয়োজনীয়। কারণ অনেক সময় নায়কত্বও এক ধরনের আত্মমুগ্ধতা।
“When we are no longer able to change a situation, we are challenged to change ourselves.”
Viktor Frankl, Man's Search for Meaning
Viktor Frankl নাৎসি ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছিলেন, অর্থ ছাড়া মানুষ টিকে থাকতে পারে না। যখন পরিস্থিতি বদলানো যায় না, তখন মানুষ নিজের ভেতরে অর্থ নির্মাণের চেষ্টা করে। কিন্তু এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় কোনো নৈর্ব্যক্তিক পরিস্থিতিকে “খলনায়ক” হিসেবে কল্পনা করা অনেক সময় টিকে থাকার জন্য সহায়ক হয়ে ওঠে। অন্ধ, নিষ্ঠুর, অসংলগ্ন কষ্টকে যদি কোনো লড়াইয়ের রূপ দেওয়া যায়, তাহলে মানুষ ভেঙে পড়লেও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। খলনায়ক সংগ্রামকে ব্যক্তিগত করে। একটি অন্ধ ও নৈর্ব্যক্তিক পরিস্থিতিকে মানবিক লড়াইয়ে রূপান্তরিত করে আমাদের টিকে থাকার অর্থ জোগায়।
কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থাকে, এই কল্পিত খলনায়ক কি আমাকে বাঁচাচ্ছে, নাকি আমাকে আটকে রাখছে? সে কি আমার অর্থের উৎস, নাকি আমার পুনরাবৃত্ত ক্ষতের কারাগার? কষ্টকে অর্থ দেওয়া জরুরি, কিন্তু কষ্টকে পরিচয় বানিয়ে ফেলা বিপজ্জনক। কারণ পরিচয় একবার কষ্টের ওপর দাঁড়ালে মানুষ সুখকেও সন্দেহ করতে শেখে। মুক্তিও তখন অচেনা লাগে। যাকে সারাজীবন বলেছি আমার খলনায়ক, সে যদি একদিন হারিয়ে যায়, তাহলে আমি কী করবো? আমি কি নতুন খলনায়ক খুঁজবো? নাকি প্রথমবারের মতো নিজের ফাঁকা জায়গাটির দিকে তাকাবো?
“The Orient was almost a European invention.”
Edward Said, Orientalism
Edward Said দেখিয়েছেন, কীভাবে “Other” বা অপর নির্মিত হয়। পাশ্চাত্য নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য প্রাচ্যকে খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত করেছে: অনুভবশূন্য, অসভ্য, রহস্যময়, অলস, আবেগপ্রবণ, শিশুসুলভ। এই “অপর”কে দমন করার মাধ্যমেই পাশ্চাত্য নিজেকে সভ্য বলে সংজ্ঞায়িত করে। খলনায়ক এখানে একটি পরিচয় নির্মাণের হাতিয়ার। নিজেকে সংজ্ঞায়িত করতে অন্যের বিরোধিতার প্রয়োজন হয়। অন্যকে নিচু না করলে নিজেকে উঁচু বলা কঠিন। অন্যকে অন্ধকার না বানালে নিজের আলো এত উজ্জ্বল দেখায় না।
এই “Othering” শুধু ঔপনিবেশিক ইতিহাসে নয়, পরিবারে, সমাজে, রাজনীতিতে, ধর্মীয় সম্প্রদায়ে, জাতিগত পরিচয়ে, লিঙ্গ-রাজনীতিতে, এমনকি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলেও কাজ করে। আমরা নিজেদের সংজ্ঞায়িত করি কাদের মতো নই, সেটি বলে। আমরা নিজেদের ভালো বলি, কারণ কেউ একজন খারাপ। আমরা নিজেদের সভ্য বলি, কারণ কেউ একজন বর্বর। আমরা নিজেদের দেশপ্রেমিক বলি, কারণ কেউ একজন দেশদ্রোহী। আমরা নিজেদের ধার্মিক বলি, কারণ কেউ একজন পথভ্রষ্ট। আমরা নিজেদের প্রগতিশীল বলি, কারণ কেউ একজন পশ্চাৎপদ। এই “অপর” ছাড়া আমাদের পরিচয়ের অনেক ব্যানারই হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে যায়।
মানুষের নৈতিকতা অনেক সময় নিজের ভেতরের আলো দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় অন্যের অন্ধকার দেখিয়ে। আমি ভালো, কারণ সে খারাপ। আমি সৎ, কারণ তারা দুর্নীতিবাজ। আমি ভদ্র, কারণ তারা অশিক্ষিত। আমি ধার্মিক, কারণ তারা পথভ্রষ্ট। আমি সংস্কৃতিমান, কারণ তারা বর্বর। আমি সচেতন, কারণ তারা অন্ধ। এই ধরনের নৈতিকতা দেখতে ধারালো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পরজীবী। কারণ এটি নিজের ওপর দাঁড়ায় না; দাঁড়ায় অন্যের পতনের ওপর। তাহলে আমার নৈতিকতা কি সত্যিই আমার, নাকি অন্যের অন্ধকার থেকে ধার করা আলো?
“The specific political distinction to which political actions and motives can be reduced is that between friend and enemy.”
Carl Schmitt, The Concept of the Political
Carl Schmitt-এর মতে, রাজনীতি মানেই বন্ধু এবং শত্রুর বিভাজন। শত্রু ছাড়া রাজনীতি অচল। রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এবং নাগরিকদের ভেতরে ঐক্য ধরে রাখার জন্য সবসময়ই একটি বাহ্যিক খলনায়ক বা শত্রুর প্রয়োজন বোধ করে। বাহ্যিক শত্রু, অভ্যন্তরীণ শত্রু, সংস্কৃতির শত্রু, ধর্মের শত্রু, উন্নয়নের শত্রু, জাতির শত্রু, বিপ্লবের শত্রু, নিরাপত্তার শত্রু। শত্রু যত স্পষ্ট, ক্ষমতার ভাষা তত সহজ। নাগরিক তখন প্রশ্ন করে না, সারিবদ্ধ হয়। শাসন তখন যুক্তির চেয়ে ভয়ের ওপর দাঁড়ায়। খলনায়ক রাষ্ট্রের জন্য শুধু শত্রু নয়; সে শৃঙ্খলা তৈরির যন্ত্র। সে নাগরিককে উদ্বিগ্ন রাখে, আর উদ্বিগ্ন নাগরিক অনেক সময় স্বাধীনতার চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি ভালোবাসে।
Michel Foucault ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্কে দেখিয়েছেন, কীভাবে সমাজ “স্বাভাবিক” এবং “অস্বাভাবিক” নির্ধারণ করে। ক্ষমতা শুধু দমন করে না, সত্যও তৈরি করে। সমাজ নির্ধারণ করে কে সুস্থ, কে অসুস্থ; কে শৃঙ্খলিত, কে বিপজ্জনক; কে নাগরিক, কে বিচ্যুত; কে সভ্য, কে বেয়াদব; কে প্রশ্নকারী, কে রাষ্ট্রবিরোধী। যারা সমাজের নির্ধারিত নিয়মের বাইরে, তারাই সমাজের চোখে খলনায়ক হয়ে ওঠে। আর Noam Chomsky ও Edward Herman Manufacturing Consent-এ দেখিয়েছেন, গণমাধ্যম কীভাবে আমাদের জন্য খলনায়ক বা শত্রু তৈরি করে দেয়। কোন কষ্ট দেখানো হবে, কোন কষ্ট আড়াল করা হবে, কাকে মানবিক করা হবে, কাকে দানব বানানো হবে, কোন মৃত্যু সংবাদ, কোন মৃত্যু পরিসংখ্যান, কোন মৃত্যু নীরবতা হয়ে থাকবে, এগুলো ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। খলনায়কের চেহারা বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামো টিকিয়ে রাখতে খলনায়কের প্রয়োজনীয়তা সবসময়ই থেকে যায়।
তাহলে কি খলনায়ক ছাড়া রাজনীতি অচল? হয়তো পুরোপুরি নয়। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি খলনায়ক ছাড়া অস্বস্তিতে পড়ে। কারণ খলনায়ক ছাড়া নাগরিক প্রশ্ন করতে শুরু করে। খলনায়ক ছাড়া মানুষ জানতে চায়, বাজেট কোথায় গেল? ন্যায়বিচার কোথায়? শিক্ষা কেন দুর্বল? স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেন ভঙ্গুর? শ্রমের দাম এত কম কেন? অভিজাতরা এত সুবিধা পায় কীভাবে? কর্মসংস্থান কোথায়? প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির বাইরে কেন? তখন ক্ষমতা বুঝে, মানুষকে জটিল প্রশ্ন থেকে সরিয়ে সহজ ঘৃণার দিকে পাঠাতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনে আমরা যেমন নিজের ব্যর্থতার দায় এড়াতে খলনায়ক বানাই, রাষ্ট্রও তেমনি কাঠামোগত ব্যর্থতা আড়াল করতে শত্রু বানায়। ব্যক্তির আত্মপ্রতারণা ও রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা এখানে অদ্ভুতভাবে একই ছায়ায় দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই, যখন নাগরিক নিজের প্রশ্নকে নিজেই ভয় পেতে শেখে। তখন খলনায়ক বাইরে থাকে না; নাগরিকের মাথার ভেতর বসে যায়। নাগরিক তখন নিজেই নিজেকে সেন্সর করে। নিজেই নিজের সন্দেহকে থামায়। নিজেই নিজের অসন্তোষকে অপরাধ ভাবে। খলনায়ক তখন কোনো ব্যক্তি নয়, একটি অভ্যন্তরীণ পুলিশ। এই অভ্যন্তরীণ পুলিশ নাগরিককে শুধু চুপ করায় না, তাকে এমনভাবে বদলে দেয় যে সে নিজের চুপ থাকাকেই দায়িত্বশীলতা ভাবতে শুরু করে।
বাংলাদেশি বাস্তবতায় এই খলনায়ক নির্মাণের রাজনীতি নানা রূপে কাজ করে। কখনো উন্নয়নবিরোধী বলে প্রশ্নকারীকে চুপ করানো হয়। কখনো সংস্কৃতিবিরোধী বলে ভিন্ন রুচিকে তুচ্ছ করা হয়। কখনো ধর্মবিরোধী বলে নৈতিক জিজ্ঞাসাকে অপরাধ বানানো হয়। কখনো দেশবিরোধী বলে নাগরিকের ক্ষোভকে রাষ্ট্রদ্রোহের কাছে ঠেলে দেওয়া হয়। আবার কখনো সামাজিক সম্মানের নামে নারী, তরুণ, প্রেম, পেশা, পোশাক, ভাষা, শিল্প, চিন্তা, সবকিছুর ওপর অদৃশ্য পাহারা বসানো হয়। প্রশ্ন হলো, খলনায়ক কে? যে প্রশ্ন করছে, নাকি যে প্রশ্নকে ভয় পাচ্ছে?
“One must imagine Sisyphus happy.”
Albert Camus, The Myth of Sisyphus
Albert Camus সিসিফাসকে নায়ক হিসেবে দেখান, যে চিরকাল পাথর ঠেলে পর্বতের চূড়ায় নিয়ে যায়, কিন্তু পাথরটি আবার নিচে গড়িয়ে পড়ে। এখানে কোনো বাহ্যিক খলনায়ক নেই। নেই কোনো দানব, কোনো অত্যাচারী রাজা, কোনো ষড়যন্ত্রকারী শত্রু। যুদ্ধটা কেবল মহাবিশ্বের অর্থহীনতার বিরুদ্ধে। “Absurdity” বা অর্থহীনতার বিরুদ্ধে। Camus-এর এই “Absurd Hero” জানে, তার এই লড়াইয়ের কোনো শেষ নেই, কোনো চূড়ান্ত জয় নেই, কোনো মহাকাব্যিক সমাপ্তি নেই, তবু সে লড়ে। সে নিজের শাস্তিকে চিনেছে। সে নিজের পাথরকে নিজের করে নিয়েছে।
এইখানেই Camus আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করান। যদি কোনো খলনায়ক না থাকে, তবু কি নায়ক হওয়া যায়? যদি কেউ আমাকে আটকে না দেয়, তবু যদি জীবন অর্থহীন, পুনরাবৃত্ত, ক্লান্তিকর, সীমাবদ্ধ ও মৃত্যুমুখী হয়, তাহলে লড়াইয়ের অর্থ কোথায়? সব লড়াইয়ের জন্য কি খলনায়ক লাগে? কখনো লড়াই কি পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে নয়? কখনো লড়াই কি অর্থহীনতার বিরুদ্ধে নয়? কখনো লড়াই কি নিজের ক্লান্তির বিরুদ্ধে নয়? কখনো লড়াই কি এই সত্য মেনে নেওয়া নয় যে কেউ আমাকে আটকায়নি, তবু আমি থেমে গেছি? কেউ আমার জীবন নষ্ট করেনি, তবু আমি আমার সম্ভাবনাকে স্থগিত রেখেছি? এই স্বীকারোক্তি খলনায়ক খোঁজার চেয়েও বেশি ভয়ংকর। কারণ এখানে অভিযোগ করার মতো কেউ নেই।
“Man is a rope, tied between beast and overman, a rope over an abyss.”
Friedrich Nietzsche, Thus Spoke Zarathustra
Friedrich Nietzsche-এর “Übermensch” বা অতিক্রান্ত মানুষ হলো নিজের পুরোনো সত্তাকে অতিক্রম করা। এখানে লড়াই বাইরের কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়, নিজের দুর্বলতার সঙ্গে। খলনায়ক আমার ভেতরের ভীরুতা, herd morality বা পাল-নৈতিকতা, ressentiment বা জমে থাকা ক্ষোভ, দুর্বলতার নৈতিকতা, অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরতা, নিজের ব্যর্থতাকে ন্যায়ের ভাষায় সাজিয়ে তোলার প্রবণতা। Nietzsche আমাদের জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি সত্যিই শক্তিশালী হতে চাও, নাকি কেবল দুর্বলতার জন্য একটি নৈতিক মঞ্চ চাও? তুমি কি নতুন মূল্য তৈরি করতে চাও, নাকি পুরোনো অপমানের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেকে নৈতিকভাবে উঁচু ভাবতে চাও? এই প্রশ্ন ভয়ংকর, কারণ এটি আমাদের ভুক্তভোগী পরিচয়ের আরামটুকুও কাঁপিয়ে দেয়।
যে মানুষ সারাজীবন বলে গেছে, আমাকে তারা হতে দেয়নি, সে একদিন যদি দেখে কেউ আর তাকে থামাচ্ছে না, তখন কী হবে? সে কি এগোবে? নাকি নতুন শত্রু আবিষ্কার করবে? খলনায়ক অনেক সময় আমাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু কখনো কখনো খলনায়কই আমাদের অলসতার ছাদ। তার নিচে দাঁড়িয়ে আমরা রোদ, ঝড়, সিদ্ধান্ত, দায়, স্বাধীনতা, সবকিছু থেকে বাঁচি। আমরা বলি, আমি আটকে আছি। কিন্তু হয়তো প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমি কি সত্যিই আটকে আছি, নাকি আটকানোর গল্পে নিরাপদ আছি?
“Under certain circumstances failing, losing, forgetting, unmaking, undoing, unbecoming, not knowing may in fact offer more creative, more cooperative, more surprising ways of being in the world.”
Jack Halberstam, The Queer Art of Failure
Jack Halberstam-এর কাছে “ব্যর্থতা” একটি রাজনৈতিক অবস্থান। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া সফলতার গল্প থেকে বেরিয়ে আসা। আমরা সবাই নায়ক হতে চাই, কারণ সমাজ আমাদের নায়ক হওয়ার বাজার বানিয়েছে। সফল হও। জিতো। প্রমাণ করো। প্রতিশোধ নাও। তাদের দেখিয়ে দাও। নিজের ব্র্যান্ড বানাও। নিজের কষ্টকে কনটেন্ট বানাও। নিজের লড়াইকে motivational product বানাও। নিজের ক্ষতকে বাজারে তুলো। নিজের বেঁচে থাকাকে inspirational packaging-এ সাজাও। কিন্তু যদি আমি নায়ক না হই? যদি আমি জিততে না চাই? যদি আমি ব্যর্থতার মধ্যেও একটি সৃজনশীল অস্তিত্ব খুঁজে পাই? যদি আমি প্রমাণ করার বাজার থেকে বেরিয়ে আসি? তাহলে খলনায়কের প্রয়োজন কমে যায়। কারণ খলনায়ক দরকার হয় তখনই, যখন আমার গল্পে জয়ের দৃশ্য দরকার।
এই জায়গায় ব্যর্থতা এক ধরনের মুক্তি। কারণ ব্যর্থতা আমাকে বলে, তুমি সবসময় সফলতার নাটকে অভিনয় করতে বাধ্য নও। তুমি সবসময় কাউকে হারিয়ে প্রমাণ করতে বাধ্য নও। তুমি সবসময় নিজের কষ্টকে hero content বানাতে বাধ্য নও। তুমি চাইলে নায়ক না হয়েও মানুষ হতে পারো। তুমি চাইলে নিজের অসম্পূর্ণতাকে বাজারে না তুলেও বাঁচতে পারো। তুমি চাইলে এমন জীবনও বেছে নিতে পারো, যেখানে জিততে হবে না, কেবল সত্যি থাকতে হবে।
“The one primary word is the combination I-Thou.”
Martin Buber, I and Thou
Martin Buber দেখিয়েছেন, যখন আমি অন্যকে “Thou” বা তুমি হিসেবে দেখি, তখন সে খলনায়ক হতে পারে না, কারণ সে আমার সহযাত্রী। সে একটি পূর্ণ অস্তিত্ব। সে আমার মতোই জটিল, আহত, অসম্পূর্ণ, সম্ভাবনাময়। কিন্তু যখন আমি তাকে “It” বা বস্তু হিসেবে দেখি, তখন সে ব্যবহারযোগ্য, দমনযোগ্য, বিচারযোগ্য, ঘৃণাযোগ্য হয়ে যায়। খলনায়ক কেবল “I-It” সম্পর্কে বেঁচে থাকে। কারণ খলনায়ককে মানুষ হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। মানুষ হিসেবে দেখলে তার ব্যথাও দেখতে হয়, তার যুক্তিও শুনতে হয়, তার ইতিহাসও বুঝতে হয়। তখন তাকে স্রেফ দানব বলা কঠিন হয়ে যায়। আর আমরা অনেক সময় খলনায়ককে মানুষ হতে দিতে চাই না, কারণ সে মানুষ হয়ে গেলে আমাদের নায়কত্বের সরলতা নষ্ট হয়ে যায়।
যে মানুষকে আমি খলনায়ক বানিয়েছি, তাকে যদি একদিন মানুষের মতো দেখি? যদি দেখি, তারও ভয় ছিল? তারও অপমান ছিল? তারও অসম্পূর্ণতা ছিল? তারও সামাজিক চাপ ছিল? সে যে আমাকে আঘাত করেছে, তা সত্য। কিন্তু সে যে কোনো শূন্য থেকে জন্মানো দানব নয়, সেটিও সত্য। এই সত্য অপরাধ মুছে দেয় না, কিন্তু ঘৃণার সরলতা ভেঙে দেয়। আর মানুষের মন ঘৃণার সরলতা খুব ভালোবাসে। কারণ বোঝা কঠিন, ঘৃণা সহজ।
“But they seem to know where they are going, the ones who walk away from Omelas.”
Ursula K. Le Guin, The Ones Who Walk Away from Omelas
Ursula K. Le Guin-এর The Ones Who Walk Away from Omelas-এ দেখা যায়, Omelas শহরের নাগরিকরা সুখী, কিন্তু তাদের সুখ দাঁড়িয়ে আছে এক শিশুর অবর্ণনীয় কষ্টের ওপর। কেউ এই চরম অন্যায় মেনে নেয়, কেউ যুক্তি বানায়, কেউ সুবিধা নেয়, আর কেউ নিঃশব্দে শহর ছেড়ে চলে যায়। তারা কোনো মঞ্চ বানায় না। কোনো বিপ্লবের পতাকা তোলে না। কোনো খলনায়ককে হত্যা করে না। তারা শুধু চলে যায়। এই চলে যাওয়া কোনো প্রচলিত নায়কত্ব নয়, কোনো খলনায়কের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহও নয়; এটি নিছক প্রত্যাখ্যান। কিছু ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায়, কিছু ব্যবস্থাকে বদলানো যায়, আর কিছু ব্যবস্থাকে শুধু অস্বীকার করা যায়।
Omelas আমাদের আরেকটি প্রশ্ন শেখায়। সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কি যুদ্ধ করতে হয়? নাকি কিছু অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভাষাটিও সেই অন্যায়েরই অংশ? কখনো কি সবচেয়ে বড় নৈতিকতা হলো মঞ্চ ছেড়ে চলে যাওয়া? কিন্তু আবার, চলে যাওয়া কি সুবিধাভোগীর নীরব পবিত্রতা? যে চলে গেল, সে কি শিশুটিকে উদ্ধার করলো, নাকি নিজের বিবেককে উদ্ধার করলো? এই প্রশ্ন সহজ নয়। কারণ নায়কত্বের বাইরে নৈতিকতার ভাষা আমরা খুব কম শিখেছি। আমরা ভাবি, নৈতিকতা মানেই যুদ্ধ, ঘোষণা, প্রতিরোধ, প্রকাশ্য অবস্থান। কিন্তু কখনো কখনো নৈতিকতা নিঃশব্দে সরে যাওয়াও হতে পারে। তবে সেই সরে যাওয়া কি পালানো, নাকি প্রত্যাখ্যান, তা বিচার করার দায়িত্বও সহজ নয়।
আমরা বাইরে যে খলনায়ক খুঁজি, সে অনেক সময় আমাদের নিজেদেরই অস্বীকৃত অংশ। আবার সবসময় নয়। এখানেই জটিলতা। সব খলনায়ক কল্পিত নয়, কিন্তু সব খলনায়ক বিশুদ্ধও নয়। যে মানুষ আমাকে আঘাত করেছে, সে হয়তো সত্যিই দায়ী। কিন্তু আমার ক্ষতের ভেতরে তার মুখ যত বড় হতে থাকে, আমার নিজের জীবন তত ছোট হয়ে যায় কি না, সেটিও দেখা দরকার। যে পরিবার আমাকে থামিয়েছে, সে হয়তো সত্যিই oppressive বা দমনমূলক। কিন্তু আমি কি সারাজীবন পরিবারকে নিজের অসম্পূর্ণতার একমাত্র ব্যাখ্যা বানিয়ে রাখবো? যে রাষ্ট্র আমাকে বঞ্চিত করেছে, সে হয়তো সত্যিই অন্যায়কারী। কিন্তু আমি কি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার ভেতরে নিজের ব্যক্তিগত দায়, শ্রম, কৌশল, অক্ষমতা ও সম্ভাবনার প্রশ্নকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেবো? যে সমাজ আমাকে চেপে ধরেছে, সে হয়তো সত্যিই নিষ্ঠুর। কিন্তু আমি কি সমাজকে ঘৃণা করতে করতে নিজেই আরেক ক্ষুদ্র নিষ্ঠুর সমাজ হয়ে উঠছি না?
এখানেই “Shadow Integration” দরকার। নিজের ছায়াকে স্বীকার করা। আমি আহত, কিন্তু আমি নির্দোষ দেবদূত নই। আমি শোষিত, কিন্তু আমার ভেতরেও ক্ষমতার ক্ষুধা আছে। আমি অবহেলিত, কিন্তু আমিও কাউকে অবহেলা করেছি। আমি ম্যানিপুলেশনের শিকার, কিন্তু আমিও কখনো ভাষা, আবেগ, নৈতিকতা বা দুর্বলতা ব্যবহার করে অন্যকে প্রভাবিত করেছি। আমি খলনায়কের বিরুদ্ধে, কিন্তু আমার ভেতরেও খলনায়কের বীজ আছে। এই স্বীকারোক্তি আত্মধ্বংস নয়; বরং পরিণত মানুষ হওয়ার শুরু। কারণ যে নিজের ছায়া দেখে না, সে অন্যের ওপর ছায়া ফেলে। যে নিজের অন্ধকারের দায়িত্ব নেয় না, সে পৃথিবীকে অন্ধকার বলে ঘৃণা করে।
এখানে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, বাস্তব অন্যায়কে অস্বীকার না করে নিজের ভেতরের অন্ধকার স্বীকার করা। কারণ অনেকেই নিজের ছায়া স্বীকার করতে গিয়ে অত্যাচারীর দায় কমিয়ে ফেলে। আবার অনেকেই অত্যাচারীর দায় দেখাতে গিয়ে নিজের ছায়াকে অস্বীকার করে। প্রথমটি আত্মবিনাশী ক্ষমাশীলতা, দ্বিতীয়টি আত্মমুগ্ধ ভুক্তভোগিতা। পরিণত মানুষকে এই দুই ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হয়। তাকে বলতে হয়, তুমি আমাকে আঘাত করেছ, এটি সত্য। কিন্তু আমার প্রতিক্রিয়ার দায়িত্বও আমার। তুমি অন্যায় করেছ, এটি সত্য। কিন্তু তোমার অন্যায়কে সারাজীবনের অজুহাত বানিয়ে নিজের জীবন স্থগিত রাখবো কি না, সেটির দায় আমার।
“Fairy tales are more than true: not because they tell us that dragons exist, but because they tell us that dragons can be beaten.”
Neil Gaiman, paraphrasing G.K. Chesterton, Coraline
Neil Gaiman তাঁর Coraline বইয়ের শুরুতে G.K. Chesterton-এর ধারণাকে নিজের মতো করে লিখেছিলেন এই কথাটি। Chesterton-এর মূল বক্তব্যটি ছিল তাঁর Tremendous Trifles গ্রন্থে কিছুটা ভিন্ন ভাষায়।
“The baby has known the dragon intimately ever since he had an imagination. What the fairy tale provides for him is a St. George to kill the dragon.”
G.K. Chesterton, Tremendous Trifles
Chesterton-এর এই বক্তব্য আমাদের আবার শুরুর প্রশ্নে ফিরিয়ে আনে। রূপকথা শিশুদের ড্রাগনের ভয় দেখায় না, কারণ ড্রাগনের ভয় মানুষের ভেতরে জন্মগতভাবেই আছে। রূপকথা আমাদের Saint George দেয়, যে ড্রাগনকে হত্যা করতে পারে। অর্থাৎ খলনায়ককে আমরা সবাই চিনি। ভয়কে আমরা সবাই চিনি। বাধাকে আমরা সবাই চিনি। অন্ধকারকে আমরা সবাই চিনি। গল্প আমাদের শুধু বলে, লড়াই সম্ভব। কিন্তু ড্রাগন কি বাইরে? নাকি ড্রাগন আমার কল্পনায় আগেই ছিল? রূপকথা কি আমাকে ভয়ের সঙ্গে পরিচয় করায়, নাকি ভয়কে লড়াইযোগ্য করে তোলে? যদি ভয় আগে থেকেই আমার ভেতরে থাকে, তাহলে খলনায়ক শুধু বাইরের চরিত্র নয়; সে ভেতরের আতঙ্কের দৃশ্যমান অবয়ব। অদৃশ্য ভয় অস্বস্তিকর। দৃশ্যমান ড্রাগন সুবিধাজনক।
খলনায়ককে আমরা সবাই চিনি। কিন্তু দিনশেষে প্রশ্ন হলো, আমরা কি Saint George হয়ে লড়াই করতে চাই? নাকি Taoism-এর “Wu Wei”, অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় প্রবাহ বা জবরদস্তিহীন কর্মপ্রবাহ অনুসরণ করে ড্রাগনের অস্তিত্বকে মেনে নিয়ে সহাবস্থান করতে চাই? নাকি Omelas শহরের সেই মানুষদের মতো সব ছেড়ে এমন কোথাও হেঁটে চলে যেতে চাই, যেখানে না আছে ড্রাগন, না আছে George, কেবল আছি আমরা? অথবা চতুর্থ কোনো পথ আছে কি, যেখানে ড্রাগনকে হত্যা নয়, পূজা নয়, পালানোও নয়; বরং তার দিকে তাকিয়ে বলা, তোমার কোন অংশ বাইরের, আর কোন অংশ আমার নিজের ছায়া?
হয়তো পরিণত অস্তিত্বের শুরু এখানেই। যখন আমি খলনায়ককে দরকার করি, কিন্তু তাকে পূজা করি না। যখন আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, কিন্তু নিজের আত্মপ্রতারণাকে ছাড় দিই না। যখন আমি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার নির্মমতা দেখি, কিন্তু নিজের ক্ষতকে বাজারে তুলি না। যখন আমি বুঝি, নায়ক হওয়া জরুরি নয়; মানুষ হওয়া জরুরি। এবং মানুষ হওয়া মানে নিজের গল্পে সবসময় জয়ী থাকা নয়, বরং কখনো কখনো নিজের গল্পের খলনায়ককে নিজের ভেতরেও খুঁজে পাওয়ার সাহস রাখা।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এই নয় যে, আমার জীবনে খলনায়ক আছে কি নেই। প্রশ্নটি হলো, আমি কি খলনায়ককে ব্যবহার করে নিজেকে চিনছি, নাকি নিজেকে এড়িয়ে যাচ্ছি? আমি কি লড়ছি, নাকি শুধু গল্প বানাচ্ছি? আমি কি মুক্তি চাই, নাকি এমন এক শত্রু চাই, যে না থাকলে আমার নায়কত্বের মঞ্চ ভেঙে পড়বে? আমি কি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি, নাকি অত্যাচারীকে নিজের পরিচয়ের কেন্দ্রে রেখে তাকে অদ্ভুত এক অমরত্ব দিয়ে ফেলেছি?
খলনায়ক ছাড়া আমি আমি থাকি কি না, প্রশ্নটি হয়তো শেষ প্রশ্ন নয়। শেষ প্রশ্ন হলো, খলনায়ক চলে গেলে আমি কি নিজের দায়, নিজের অন্ধকার, নিজের স্বাধীনতা এবং নিজের অসম্পূর্ণতার সামনে দাঁড়াতে পারবো?
নাকি খলনায়ক হারিয়ে গেলে প্রথমবারের মতো আমাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়?
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0