ভদ্রতার মুখোশ: সুশীল সমাজ নাকি এক আদিম জঙ্গল?

আমাদের তথাকথিত সভ্যতা কি আসলে একটা প্রেশার কুকার? পপ কালচারের জনপ্রিয় সিরিজগুলোর আয়নায় দেখুন কীভাবে ভদ্রতার মুখোশ পরে আমরা আমাদের আদিম রাগকে চেপে রাখছি।

জুলাই 5, 2026 - 01:00
জুলাই 5, 2026 - 01:12
 0  2
ভদ্রতার মুখোশ: সুশীল সমাজ নাকি এক আদিম জঙ্গল?
ভদ্রতার মুখোশ: সুশীল সমাজ নাকি এক আদিম জঙ্গল?

সম্পাদকীয় সতর্কতা: এই লেখাটি সমাজ, সভ্যতা, দমন, সহিংসতা ও জনপ্রিয় সিরিজের সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা নিয়ে একটি মতামতধর্মী বিশ্লেষণ। এখানে কোনো সহিংস আচরণকে সমর্থন করা হয়নি; বরং দমন, ভণ্ডামি ও অদেখা মানসিক চাপ কীভাবে সামাজিক বিস্ফোরণের ভূমি তৈরি করে, সেই প্রশ্নটি উন্মুক্ত করা হয়েছে।

মনের সব অভিব্যক্তি কথায় প্রকাশ করা যায় না। কিছু অনুভূতি এত তীব্র হয় যে, ভাষা সেখানে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। কিছু রাগ আছে, যা বাক্যে ঢোকে না; কিছু অপমান আছে, যা কান্নাতেও শেষ হয় না; কিছু ভয় আছে, যা মানুষকে চুপ করায়, কিন্তু মুছে দেয় না। আমরা সভ্যতাকে যত বেশি আপন করে নিয়েছি, আমরা কি তত বেশি মানুষ হয়েছি, নাকি তত বেশি নীরব হয়ে গেছি? সভ্যতা আমাদের কেবল টেবিল ম্যানার, পোশাক, ভাষা ও আইনের পাঠ দেয়নি; সে আমাদের শিখিয়েছে, মনের মধ্যে আগুন জ্বললেও মুখে যেন ধোঁয়া না দেখা যায়।

ফলে আমরা নিজের অনুভূতিকে নিজের অজান্তেই গোপন করতে শিখি। রাগ, হিংসা, ঘৃণা, লোভ, ঈর্ষা, অপমান, প্রত্যাখ্যান, প্রতিশোধস্পৃহা, সবকিছুকে আমরা নিজের ভেতরে চাপিয়ে রাখি। কেন? কারণ আমরা মনে করি, আমরা “সভ্য”। আর সভ্য হওয়ার অন্যতম অলিখিত শর্ত হলো, নিজের অনুভূতি যত কম প্রকাশ করা যায়, তত ভালো। যে কাঁদে না, সে শক্তিশালী; যে প্রতিবাদ করে না, সে ভদ্র; যে অপমান গিলে ফেলে, সে পরিণত; যে ক্ষত দেখায় না, সে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গ্রহণযোগ্যতা কি সত্যিই মানবিক, নাকি এটি মানুষের ভেতরকার জীবন্ত সত্তাকে ধীরে ধীরে পোষ মানানোর এক দীর্ঘ সামাজিক প্রশিক্ষণ?

একজন সাধারণ মানুষ যখন দিনের পর দিন নিজের অনুভূতি চেপে রাখতে শুরু করেন, তখন সেই অনুভূতি নিঃশেষ হয়ে যায় না। বরং তা চরিত্রের অন্ধকার ঘরে জমতে থাকে। একসময় কোনো একটি ক্ষুদ্র ঘটনা, একটি অপমান, একটি প্রত্যাখ্যান, একটি অন্যায়, একটি অসম্মান, একটি বঞ্চনা সেই জমে থাকা চাপের মুখ খুলে দেয়। তখন অনুভূতি আর স্বাভাবিক ভাষায় প্রকাশ পায় না; তা বিস্ফোরিত হয়। আর সেই বিস্ফোরণের দায়ভার সভ্য সমাজ সাধারণত নেয় না। সমাজ বলে, “লোকটা অস্বাভাবিক ছিল।” পরিবার বলে, “আগে তো এমন ছিল না।” প্রতিষ্ঠান বলে, “আমরা কিছু জানতাম না।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতদিন যে মানুষটিকে চুপ করানো হলো, তার ভেতরের চাপের শব্দ কি কেউ শুনেছিল?

মানুষকে মতামত জানানোর অধিকার সবসময় দেওয়া হয় না। বরং বহুভাবে তাকে শেখানো হয়, কোন কথা বলা যাবে, কোন কথা বলা যাবে না, কোন রাগ গ্রহণযোগ্য, কোন রাগ বর্বরতা, কোন কান্না সহানুভূতির যোগ্য, আর কোন কান্না দুর্বলতা। কখনো এই দমনকে শৃঙ্খলা বলা হয়, কখনো ভদ্রতা, কখনো পারিবারিক মানসম্মান, কখনো পেশাগত আচরণ, কখনো ধর্মীয় নৈতিকতা, কখনো সামাজিক পরিপক্বতা। আর যখন মানুষ আর পারছে না বলে সংকেত দেয়, তখন সেই সংকেতকে খুব দ্রুত “সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যেন মানুষের যন্ত্রণা নয়, তার প্রকাশটাই আসল অপরাধ।

অসভ্যতা বলতে আমরা সাধারণত বুঝি, মানুষ যখন কারও বা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজের প্রবৃত্তি প্রকাশ করে। কিন্তু সভ্য সমাজ কি সত্যিই তার বিপরীত? নাকি সভ্য সমাজ অনেক সময় এক ধরনের ভদ্র মুখোশধারী ভণ্ডামি? এই সমাজ যুদ্ধের জন্য অস্ত্র বানায়, আবার শান্তির সম্মেলনে কবুতর উড়ায়। একই সমাজ শ্রমিককে নিংড়ে নেয়, তারপর শ্রমিক দিবসে ফুল দেয়। একই সমাজ মানুষকে প্রতিযোগিতার যন্ত্র বানায়, তারপর মানসিক স্বাস্থ্যের সেমিনার করে। একই সমাজ অপমানের সংস্কৃতি তৈরি করে, তারপর কাউন্সেলিং সেন্টার খুলে। প্রশ্ন হলো, যে ব্যবস্থা ক্ষত তৈরি করে, সে যদি পরে ব্যান্ডেজ বিক্রি করে, তাকে কি আমরা মানবিক বলব, নাকি চতুর?

একটি তথাকথিত অসভ্য সমাজের সমালোচনা অনেক আছে, থাকা উচিতও। কিন্তু অন্তত সেখানে অনেক সময় ভণ্ডামির আড়াল এত ঘন নয়। সেখানে প্রবৃত্তি সরাসরি দেখা যায়, তাই তাকে চেনা যায়। কিন্তু সভ্য সমাজে প্রবৃত্তি লুকিয়ে থাকে ভাষা, আইন, প্রতিষ্ঠান, মর্যাদা, ডিগ্রি, অফিসিয়াল হাসি ও সামাজিক ভদ্রতার ভাঁজে। সভ্য সমাজ রীতিনীতির পুস্তিকা হাতে ধরিয়ে দেয়, তারপর সুবিধামতো নিজেই সেই রীতি ভাঙে। সে আমাদের বলে, “সহনশীল হও”, কিন্তু ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন করলে বলে, “বেশি বাড়াবাড়ি করো না।” সে বলে, “সবাইকে সম্মান করো”, কিন্তু শ্রেণি, অর্থ, পদবি ও পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে অদৃশ্য করে রাখে।

আমরা নিজেদের খুব সভ্য মনে করি, তাই না? কিন্তু আমাদের এই তথাকথিত সভ্যতা আসলে অনেক সময় একটি প্রেশার কুকার। এখানে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের আদিম প্রবৃত্তি, ক্ষত, ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিরোধকে চেপে রাখি। আর এই চেপে রাখাটাকেই আমরা নাম দিই “ভদ্রতা”। যে ছেলে ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকে, তাকে আমরা ভালো বলি। যে মেয়ে প্রতিবাদ করে না, তাকে আমরা ভদ্র বলি। যে কর্মী বসের অন্যায় সহ্য করে যায়, তাকে আমরা পেশাদার বলি। যে নাগরিক রাষ্ট্রের অন্যায় দেখে চুপ থাকে, তাকে আমরা শান্তিপ্রিয় বলি। কিন্তু এই শান্তি কি সত্যিই শান্তি, নাকি বিস্ফোরণের আগের স্তব্ধতা?

“Weak Hero” সিরিজের ক্লাসরুমে ঢুকলে এই প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। ইয়ন শি-ইউন চুপচাপ থাকে, পড়াশোনায় মন দেয়, কারও সঙ্গে অকারণে মেশে না। বাইরে থেকে তাকে দুর্বল মনে হয়। কিন্তু তার ভেতরে আছে বিশ্লেষণ, ক্ষত, প্রতিরোধ ও জমে থাকা ক্রোধের এক ঠান্ডা গাণিতিকতা। সমাজ এমন ছেলেকে “ভালো ছাত্র”, “শান্ত ছেলে”, “ভদ্র সন্তান” বলে সার্টিফিকেট দেয়। কিন্তু এই সার্টিফিকেটগুলো সবসময় প্রশংসা নয়; অনেক সময় এগুলো শিকল। এগুলো দিয়ে বলা হয়, তুমি ভালো, কারণ তুমি চুপ। তুমি ভদ্র, কারণ তুমি সহ্য করো। তুমি গ্রহণযোগ্য, কারণ তুমি আমাদের অস্বস্তিতে ফেলো না।

কিন্তু চুপ থাকা সবসময় চরিত্রের মহত্ত্ব নয়; অনেক সময় তা দীর্ঘদিনের সামাজিক ভয়ের ফল। যখন একজন মানুষকে বারবার বলা হয়, “সহ্য করো”, “মাথা নিচু করো”, “বাড়াবাড়ি করো না”, তখন সে একদিন হয় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, নয়তো প্রতিরোধের ভাষা হারিয়ে হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। “Weak Hero” আমাদের দেখায়, বুলিং কেবল শারীরিক আঘাত নয়; তা একটি মানুষকে নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত প্রতিরক্ষা-যন্ত্রে পরিণত করতে পারে। তখন সে আর শুধু আক্রান্ত থাকে না, সে নিজেও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপজ্জনক হওয়ার দায় কেবল তার? নাকি সেই ক্লাসরুম, সেই দর্শক, সেই শিক্ষক, সেই পরিবার, সেই প্রতিষ্ঠানও দায়ী, যারা আগুনের গন্ধ পেয়েও জানালা খুলে দেয়নি?

অফিসে বসের অপমান খেয়ে যারা হাসে, বাসায় ফিরে যারা রাগ গিলে ফেলে, অন্যায় দেখে যারা বলে “আমার কী”, সম্পর্কের ভেতরে যারা অপমানকে স্বাভাবিক করে নেয়, শি-ইউন তাদেরও আয়না। সে দেখায়, চুপ থাকা সবসময় শান্তি নয়। অনেক সময় তা দমনের সামাজিক অভিনয়। আমরা যখন বিস্ফোরিত মানুষকে দ্রুত দোষী করি, তখন সুবিধা হয়। কারণ তাতে কাঠামোকে প্রশ্ন করতে হয় না। বলতে হয় না, কেন একজন মানুষ এতদিন একা ছিল? কেন তার অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি? কেন তার প্রতিবাদকে বেয়াদবি বলা হয়েছিল? কেন তার ভয়ের ভাষা কেউ শেখেনি?

আবার “Wednesday” সিরিজ আমাদের এই ন্যাকামি-ভরা নরমাল হওয়ার সংস্কৃতির গালে আরেকটি ঠান্ডা থাপ্পড়। নেভারমোর একাডেমি এক অর্থে আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি। এখানে সবাই নিজেকে আলাদা ভাবে, কিন্তু আলাদা হওয়ারও নিয়ম আছে। তুমি ভিন্ন হতে পারো, কিন্তু এমনভাবে ভিন্ন হবে যাতে প্রতিষ্ঠান অস্বস্তিতে না পড়ে। তুমি অন্ধকার পছন্দ করতে পারো, কিন্তু অন্ধকারের সত্য বললে সমস্যা। তুমি শোক পালন করতে পারো, কিন্তু শোককে সৌন্দর্যে সাজিয়ে নিতে হবে। তুমি সত্য বলতে পারো, কিন্তু তা যদি খুব সরাসরি হয়, তোমাকে বেয়াদব বলা হবে।

ওয়েনসডে অ্যাডামস আমাদের শেখায়, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হাসি সবসময় সুস্থতার চিহ্ন নয়। কেউ যদি কালো পোশাক পরে, শুষ্ক কথা বলে, মিষ্টি সামাজিক অভিনয়ে অংশ না নেয়, তবে তাকে আমরা দ্রুত “অস্বাভাবিক” বলি। কারণ ভিন্নতা আমাদের ভয় দেখায়। আমরা চাই সবাই এক ছাঁচে ঢালা পুতুল হোক। যে খুব বেশি হাসে না, সে সমস্যা; যে সরাসরি সত্য বলে, সে সমস্যা; যে একা থাকতে চায়, সে সমস্যা; যে ভিড়ের সংস্কৃতিতে নিজেকে হারাতে চায় না, সে সমস্যা। কিন্তু সমস্যা কি মানুষটির, নাকি সেই সমাজের, যে ভিন্নতাকে বোঝার বদলে দ্রুত লেবেল লাগাতে শেখে?

আমরা মানুষকে বলি, “নিজের আগুন নিজের ভেতরে রাখো।” কিন্তু আগুন তো পকেটে রাখা রুমাল নয়। তা লুকিয়ে রাখলে নিভে যায় না; কখনো সে শরীর পোড়ায়, কখনো ভাষা পোড়ায়, কখনো সম্পর্ক পোড়ায়, কখনো একদিন পুরো ঘর জ্বালিয়ে দেয়। শেষে যখন কেউ ভেঙে পড়ে, আমরা বলি, সে বিপজ্জনক। কিন্তু দায়টা নিজেদের কাঁধে নেওয়া আমাদের শেখানো হয়নি। আমরা ভেবেছিলাম, সভ্যতার অভিনয় করলেই শান্তি মিলবে। কিন্তু অভিনয় যত দীর্ঘ হয়, ভেতরের ক্লান্তিও তত ঘন হয়।

“Squid Game” আমাদের সভ্যতার আরেকটি নির্মম মুখ খুলে দেয়। সেখানে একটি মাঠ আছে, খেলা আছে, নিয়ম আছে, পুরস্কার আছে, নজরদারি আছে, শাস্তি আছে। বাহ্যিকভাবে সবকিছুই সুশৃঙ্খল। কিন্তু সেই শৃঙ্খলার ভেতরে মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে। “রেড লাইট, গ্রিন লাইট” শুধু একটি খেলা নয়; এটি আমাদের সামাজিক শর্তায়নের প্রতীক। এগোবে, কিন্তু সংকেত দেখে। থামবে, যখন বলা হবে। নিয়ম মানবে, যদিও নিয়মটি তোমার বিরুদ্ধে তৈরি। একটু নড়লেই গুলি, একটু সিস্টেমের বাইরে গেলেই বাদ।

আমাদের সমাজটাও কি খুব আলাদা? ঋণ, চাকরি, মর্যাদা, বাজার, প্রতিযোগিতা, সামাজিক তুলনা, সফলতার চাপ, সব মিলিয়ে মানুষকে এমন এক খেলায় নামানো হয়, যেখানে হারলে বলা হয়, “সে যথেষ্ট চেষ্টা করেনি।” অথচ খেলার নিয়ম কে বানাল? কারা দর্শক? কারা মুনাফা তুলল? কারা মানুষকে ঋণে ঠেলে দিয়ে আবার নৈতিকতার বক্তৃতা দিল? “Squid Game” দেখায়, যখন বাঁচার প্রশ্ন আসে, সভ্যতার পাতলা মুখোশ কত দ্রুত খুলে যায়। তখন বন্ধু প্রতিদ্বন্দ্বী হয়, নৈতিকতা কৌশল হয়, সম্পর্ক দর-কষাকষি হয়, মানুষ সংখ্যায় নেমে আসে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, খেলার ভেতরের নিষ্ঠুরতা অনেক সময় বাইরের পৃথিবীর চেয়ে বেশি অসৎ নয়; বরং তা বাইরের পৃথিবীর নগ্ন সংস্করণ। বাইরে ব্যাংক, ঋণ, চাকরি, পরিবার, সামাজিক মর্যাদা ও ব্যর্থতার অপমান মানুষকে যে জায়গায় ঠেলে দেয়, খেলার ভেতর সেটি মাত্র দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যে মানুষ টাকা জিতেও শান্তি পায় না, সে বুঝতে পারে, সে আসলে শুধু অর্থ পায়নি; সে নিজের ভেতরের একটি অংশ হারিয়েছে। কিন্তু আমরা কি এই প্রশ্ন করি, কেন একজন মানুষ এমন খেলায় নামতে রাজি হয়? ক্ষুধা, ঋণ, অপমান ও বেঁচে থাকার আতঙ্ক কি তাকে আগে থেকেই বন্দি করে রাখেনি?

“Alice in Borderland” আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। সেখানে জনশূন্য শহর, অদৃশ্য নজরদারি, খেলার নিয়ম, মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে মৃত্যু। এখানে সভ্যতার সাজসজ্জা নেই। সরাসরি বলা হয়, খেলো, নইলে মরো। কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবনেও কি নিয়মটা খুব আলাদা? এখানে বলা হয়, পড়ো, নইলে বাদ; চাকরি করো, নইলে অদৃশ্য; মানিয়ে নাও, নইলে একা; প্রতিযোগিতা করো, নইলে ব্যর্থ; হাসো, নইলে অসামাজিক; চুপ থাকো, নইলে ঝামেলাবাজ।

আরিসুদের পৃথিবী আমাদের ভয় দেখায়, কারণ সেটি অস্বাভাবিক নয়; বরং আমাদের বাস্তবতার অতিরঞ্জিত কিন্তু সৎ সংস্করণ। সেখানে বাঁচার জন্য খেলতে হয়। এখানে বাঁচার জন্যও খেলতে হয়। সেখানে “ভিসা” শেষ হলে মৃত্যু। এখানে সামাজিক অনুমোদন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা, পেশাগত অবস্থান, সবকিছুরও অদৃশ্য মেয়াদ আছে। মেয়াদ ফুরোলেই মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। কেউ আর ফোন করে না, কেউ আর পাশে দাঁড়ায় না, কেউ আর তার ক্ষতের রাজনৈতিক অর্থ বুঝতে চায় না।

তাই প্রশ্নটি আসলে সিরিজগুলোর নয়; প্রশ্নটি আমাদের। আমরা কি সত্যিই সভ্য, নাকি শুধু পোষ মানা? আমরা কি সত্যিই শান্ত, নাকি শুধু ভয় পেয়েছি? আমরা কি সত্যিই নৈতিক, নাকি সুযোগ না পেয়ে নৈতিক? আমরা কি সত্যিই সহনশীল, নাকি ক্ষমতার অভাবে নিরীহ? আমরা যে সন্তানকে চুপ থাকতে বলি, যে ছাত্রকে সহ্য করতে বলি, যে কর্মীকে মানিয়ে নিতে বলি, যে নাগরিককে অপেক্ষা করতে বলি, তাদের ভেতরে জমে থাকা আগুনের দায় কে নেবে?

সভ্যতা যদি মানুষের প্রবৃত্তিকে বোঝার বদলে শুধু দমন করে, তবে সে সভ্যতা একদিন নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। কারণ দমন কখনো শূন্যে মিলিয়ে যায় না। তা ভাষা বদলায়, পথ বদলায়, চেহারা বদলায়, কখনো শরীরে অসুখ হয়, কখনো সম্পর্কে বিষ হয়, কখনো সমাজে সহিংসতা হয়, কখনো সংস্কৃতিতে অন্ধকার হয়ে ফিরে আসে। আমরা তখন অবাক হয়ে বলি, “এমন হলো কেন?” অথচ প্রশ্নটি হওয়া উচিত ছিল, এতদিন আমরা কী দেখিনি?

শান্তি কোনো অভিনয় নয়। শান্তি মানে শুধু চুপ থাকা নয়। শান্তি মানে মানুষকে নিরাপদভাবে রাগ করতে দেওয়া, অপমানের ভাষা দিতে দেওয়া, ভয়ের জায়গা স্বীকার করা, ভিন্নতাকে জায়গা দেওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাকে অসভ্যতা না বলা। যে সমাজ মানুষের সব আগুন ভেতরে আটকে রাখতে চায়, সেই সমাজ নিজেই একদিন প্রেশার কুকারে পরিণত হয়। আর প্রেশার কুকারের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তটি হলো, বাইরে থেকে যখন সবকিছু স্বাভাবিক দেখায়।

আমরা এখনও পরবর্তী সংকেতের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। কখন সবুজ আলো জ্বলবে, কখন লাল আলো থামাবে, কখন নিয়ম বদলাবে, কখন আরেকটি রাউন্ড শুরু হবে। আমরা জানি বিস্ফোরণ আসবেই, কিন্তু তবু আমরা আগুনের নাম দিই ভদ্রতা, দমনের নাম দিই সভ্যতা, ভয়ের নাম দিই শৃঙ্খলা। আর এই ভয়টাই আমাদের সবচেয়ে বড় কারাগার।

শান্তি? সেটি রূপকথায় থাকলে থাকে। আমাদের জন্য আছে পরবর্তী রাউন্ড, আরও একটু চুপ থাকা, আরও একটু পুড়ে যাওয়া, আরও একটু সভ্য সাজার প্রস্তুতি। কিন্তু একদিন হয়তো প্রশ্নটি ফিরেই আসবে: যে সমাজ মানুষকে অনুভূতি প্রকাশের নিরাপদ ভাষা দেয় না, সে সমাজ বিস্ফোরণের পর শোক প্রকাশের অধিকার রাখে কি?

Source & Reference Note:

এই লেখায় আলোচিত সিরিজগুলোর প্রাথমিক প্রেক্ষাপট নেওয়া হয়েছে Netflix Official Site, IMDb, AsianWiki এবং সংশ্লিষ্ট সিরিজের উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার থেকে। সিরিজগুলোর দৃশ্য, চরিত্র ও প্লট এখানে সরাসরি পুনর্কথন নয়; বরং সমাজমনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!