আপনার প্রিয় চ্যানেলটি আপনাকে একচোখা বানাচ্ছে না তো?

আমরা কি আসলেই বস্তুনিষ্ঠ সত্য জানতে চাই, নাকি নিজের অবচেতন বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণ করতে চাই? জানুন Selective Exposure ও Confirmation Bias কীভাবে মিডিয়া ও অ্যালগরিদমের যুগে আমাদের একচোখা করে তুলছে।

জুলাই 16, 2026 - 00:00
জুলাই 16, 2026 - 12:13
 0  5
আপনার প্রিয় চ্যানেলটি আপনাকে একচোখা বানাচ্ছে না তো?
আপনার প্রিয় চ্যানেলটি আপনাকে একচোখা বানাচ্ছে না তো?
মনোবিজ্ঞান • গণমাধ্যম • নির্বাচিত সত্য

আপনি সত্য খুঁজছেন, নাকি নিজের বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি শুনছেন?

আমরা সংবাদ বেছে নিই, বক্তা বেছে নিই, চ্যানেল বেছে নিই। কিন্তু এই নির্বাচন কি সত্যের কাছে পৌঁছানোর পথ, নাকি নিজের পূর্ববিশ্বাসকে আরও নিরাপদ রাখার কৌশল?

সম্পাদকীয় সতর্কতা: এই প্রবন্ধে ব্যবহৃত রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমসংক্রান্ত উদাহরণ কোনো নির্দিষ্ট দল, প্রতিষ্ঠান বা মতাদর্শকে সমর্থন কিংবা প্রত্যাখ্যান করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। উদাহরণগুলোর লক্ষ্য হলো তথ্য নির্বাচন, মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাত, রাজনৈতিক ভাষা ও বয়ান নির্মাণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা।

ভিড়ের মধ্যে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ খুঁজে পাওয়ার আশায় আমরা নির্দিষ্ট কিছু চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করি। তাদের সংবাদ শুনি, বিশ্লেষণ দেখি, উপস্থাপকের বক্তব্য বিশ্বাস করি। ধীরে ধীরে আমাদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, আমরা যে চ্যানেলটি বেছে নিয়েছি, তার তথ্যের নির্ভুলতা শতভাগ না হলেও অন্যদের তুলনায় নিশ্চয় বেশি। আমাদের পছন্দের উপস্থাপক অন্তত বাকিদের চেয়ে একধাপ এগিয়ে। তিনি যা বলছেন, তা হয়তো পুরোপুরি সত্য নয়, কিন্তু অন্যরা যা বলছে তার চেয়ে বেশি সত্য।

কিন্তু সমস্যাটি কি ঠিক এখানেই শুরু হয়?

আপনি যখন একটি চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করছেন, তখন শুধু একটি সংবাদমাধ্যম বেছে নিচ্ছেন না। একই সঙ্গে হাজারো বিকল্প উৎস থেকে নিজেকে সরিয়েও নিচ্ছেন। যেসব চ্যানেল আপনার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না, যেসব বক্তার ভাষা আপনার কাছে অস্বস্তিকর, যেসব বিশ্লেষণ আপনার বহুদিনের ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সেগুলো আপনি শুনছেন না। কখনো আনসাবস্ক্রাইব করছেন, কখনো ব্লক করছেন, কখনো উৎসটিকে একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে আটকে দিয়ে তার সব বক্তব্য আগেই বাতিল করে দিচ্ছেন।

আপনি কি সত্যিই উৎসটিকে প্রত্যাখ্যান করছেন, নাকি সেই উৎস থেকে আসা অস্বস্তিটিকে প্রত্যাখ্যান করছেন?

মনোবিজ্ঞান ও গণযোগাযোগের গবেষণায় এই প্রবণতাকে বলা হয় “Selective Exposure” বা নির্বাচিত তথ্যের সংস্পর্শ। মানুষ সাধারণত নিজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও পূর্বধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বার্তা বেছে নিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। “Confirmation Bias” বা নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত সেই নির্বাচিত তথ্যকে ব্যাখ্যা, মনে রাখা এবং পুনরায় ব্যবহারের সময় আমাদের পুরোনো বিশ্বাসকেই শক্তিশালী করে।

Selective Exposure

নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎস, বক্তব্য ও সংবাদ বেছে নেওয়ার মানসিক প্রবণতা।

Confirmation Bias

নিজের পুরোনো বিশ্বাসকে সমর্থনকারী তথ্য বেশি গ্রহণ এবং বিপরীত প্রমাণকে কম গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা।

Motivated Reasoning

নিরপেক্ষভাবে সত্য খোঁজার বদলে নিজের কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য যুক্তি নির্মাণ।

গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ রাজনৈতিক অনলাইন তথ্যের মধ্যে নিজের পূর্ববর্তী অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্যে বেশি সময় দিতে পারে। এই অভ্যাস পরবর্তী সময়ে তার পুরোনো অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে পারে। অর্থাৎ আমরা শুধু কোনো একটি বিশ্বাস নিয়ে সংবাদ পড়তে যাই না, সংবাদ পড়ে ফিরে আসার পর সেই বিশ্বাসটিকে আরও শক্তিশালী করেও আনতে পারি।

ধরুন, আপনি গুগলে লিখলেন, “I can do it!” অনুসন্ধানের ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আপনার সামনে আসতে পারে অনুপ্রেরণামূলক গান, বক্তব্য, উক্তি, চলচ্চিত্র কিংবা আত্মোন্নয়নমূলক নিবন্ধ। আবার “I can’t do it anymore!” লিখলে অনুসন্ধানের অভিপ্রায় বদলে যায়, ফলে ফলাফলের প্রকৃতিও বদলাতে পারে।

এর মানে এই নয় যে গুগল আপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক মানুষ বানাচ্ছে। বরং আপনি যে ভাষায় প্রশ্ন করছেন, সার্চ ইঞ্জিন সেই ভাষার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছে। অনুসন্ধানের বাক্যটি যদি আগে থেকেই কোনো সিদ্ধান্ত, ভয় অথবা আকাঙ্ক্ষা বহন করে, তাহলে ফলাফলেও সেই মানসিক অবস্থার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক উপকরণ বেশি দৃশ্যমান মনে হতে পারে।

Algorithmic Mirror

অনুসন্ধানযন্ত্র কি আমার বিশ্বাস তৈরি করছে, নাকি আমার আগের বিশ্বাসই অনুসন্ধানযন্ত্রকে এমন প্রশ্ন দিচ্ছে, যার উত্তর আগে থেকেই আমার পছন্দমতো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

সার্চ ফলাফল শুধু ব্যক্তিগত ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে না। সময়, অবস্থান, ভাষা, যন্ত্রের ধরন, সাম্প্রতিক অনুসন্ধান এবং প্রশ্নের প্রেক্ষাপটও ফলাফলে পার্থক্য তৈরি করতে পারে। ব্যক্তিগতকরণ চালু থাকলে আগের অনুসন্ধান ও কার্যকলাপ কখনো ফলাফলের ক্রম বদলে দিতে পারে, যদিও সব ফলাফল ব্যক্তিগতকৃত হয় না।

চারপাশে অসংখ্য টেলিভিশন ও ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। রেডিওর সামাজিক গুরুত্ব কিছুটা কমে এলেও “Podcast” বা শ্রুতিনির্ভর ডিজিটাল অনুষ্ঠানের বিস্তার ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফেসবুকের নিউজফিড, ইউটিউবের সুপারিশ, ছোট ভিডিও, অনলাইন পত্রিকা, ব্যক্তিগত ব্লগ, রাজনৈতিক বক্তৃতা এবং নামহীন অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত তথাকথিত গোপন সংবাদ।

তথ্যের এই বিপুল প্রবাহের বিপরীতে আমাদের হাতে সময় কতটুকু?

আপনি প্রতিদিন যত তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন, তার প্রতিটি দাবি যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। ফলে আপনি একটি মানসিক সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নেন। পরিচিত চ্যানেল হলে বিশ্বাস করেন। পরিচিত মুখ হলে সন্দেহ কম করেন। নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিললে শেয়ার করেন। বিরোধী অবস্থান থেকে এলে তথ্যের উৎস দেখার আগেই বক্তার চরিত্র বিশ্লেষণ শুরু করেন।

তথ্যের সত্যতা তখন আর তথ্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় তথ্যটি কে বলেছে, কাকে আঘাত করেছে এবং আমার পছন্দের পরিচয়কে কতটা নিরাপদ রেখেছে।

এভাবেই নির্বাচিত তথ্য মানুষকে ক্রমান্বয়ে একচোখা করে তোলে। তার পৃথিবী ছোট হতে শুরু করে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক অথবা ব্যক্তিগত বয়ান তার কাছে সম্পূর্ণ বাস্তবতা হয়ে ওঠে। সেই বয়ানের বিপরীতে কোনো তথ্য এলে সে তথ্যটি যাচাই করার আগে ক্রুদ্ধ হয়। যুক্তির বদলে পরিচয় কথা বলতে শুরু করে। প্রশ্নকে সে আক্রমণ মনে করে এবং সংশোধনকে অপমান হিসেবে গ্রহণ করে।

চরমপন্থা কি কোনো এক সকালে হঠাৎ জন্ম নেয়? নাকি তা প্রতিদিনের ছোট ছোট নির্বাচনের ফল? একই ধরনের বক্তাকে শোনা, একই পক্ষের সংবাদ পড়া, বিরোধী মতকে বিদ্রূপ করা, অস্বস্তিকর তথ্য এড়িয়ে যাওয়া এবং নিজের পক্ষের প্রতিটি ভুলের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তৈরি করা কি চরমপন্থার মানসিক প্রস্তুতি নয়?

Motivated Reasoning

এই প্রক্রিয়ায় মানুষ সব সময় নিরপেক্ষভাবে সত্য খোঁজে না। সে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায়, সেই সিদ্ধান্তকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মতো যুক্তি, স্মৃতি ও তথ্য সংগ্রহ করে। নতুন প্রমাণ তখন বিচারকের সামনে উপস্থাপিত সাক্ষ্য নয়, বরং নিজের বিশ্বাস রক্ষার জন্য নিয়োগ করা আইনজীবীর অস্ত্র হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা অত্যন্ত দৃশ্যমান। কেউ বলতে পারেন, “২০১৮ সালে বাংলাদেশে ভালো নির্বাচন হয়নি।” আবার কেউ বলতে পারেন, “২০১৮ সালে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনই হয়নি।” দুটি বাক্য একই প্রকৃতির দাবি নয়। প্রথমটি নির্বাচনের গুণগত মান নিয়ে মূল্যায়ন। দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক অতিশয়োক্তি অথবা রূপক, যার উদ্দেশ্য হতে পারে নির্বাচনটির গ্রহণযোগ্যতাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা।

পর্যবেক্ষণ ও মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ব্যালট বাক্স ভরা, বিরোধী পক্ষের এজেন্ট ও ভোটারদের ভয় দেখানো এবং অন্যান্য গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নমুনাভুক্ত আসনগুলোর বড় অংশে এক বা একাধিক অনিয়ম পাওয়ার কথাও সংবাদে প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সেই গবেষণা প্রত্যাখ্যানের ঘটনাও রয়েছে।

একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই সেটি ভালো নির্বাচন হয়ে যায় না। আবার গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলেই আক্ষরিক অর্থে বলা যায় না যে কোনো নির্বাচনই ঘটেনি। রাজনৈতিক বয়ান প্রায়ই ঘটনার সরল বর্ণনা নয়, বরং ঘটনার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা।

এক পক্ষ ঘটনাটিকে বৈধতার ভাষায় সাজায়, অন্য পক্ষ অবৈধতার ভাষায়। মাঝখানে সত্য পড়ে থাকে প্রমাণ, সাক্ষ্য, নথি ও পদ্ধতিগত অনুসন্ধানের অপেক্ষায়।

“Truth is very narcissistic.”

আমার একজন প্রিয় শিক্ষকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

কথাটি কোনো প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক সূত্র নয়, কিন্তু এর মধ্যে একটি অস্বস্তিকর ইঙ্গিত রয়েছে। সত্যের কি সত্যিই আত্মমুগ্ধতার প্রয়োজন আছে? নাকি সত্য সামনে এলে আমাদের অহংকারই আহত হয় বলে আমরা তাকে আত্মমুগ্ধ মনে করি? সত্য নিজে কি দাম্ভিক, নাকি আমাদের বিশ্বাস এত ভঙ্গুর যে বিপরীত প্রমাণকে আমরা ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে দেখি?

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পরিস্থিতিও এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। প্যারিসভিত্তিক “Reporters Without Borders” বা RSF প্রকাশিত ২০২৬ সালের “World Press Freedom Index”-এ ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। সূচকটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আইনি কাঠামো, সামাজিক পরিবেশ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার মতো বিষয় বিবেচনা করে।

তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিটি বক্তব্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য, কিংবা স্থানীয় প্রতিটি মাধ্যম মিথ্যা। আপনি BTV দেখুন, BBC-ও দেখুন। রাষ্ট্রীয় মাধ্যমের বক্তব্য শুনুন, বেসরকারি মাধ্যমের প্রতিবেদনও পড়ুন। দেশীয় গবেষণা দেখুন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও দেখুন। কিন্তু সব উৎসকে সমান নির্ভরযোগ্য ধরে নেবেন না।

বহুমত শোনা আর সব মতকে সমান সত্য মনে করা এক বিষয় নয়।

একটি গবেষণা প্রতিবেদন, একটি দলীয় বক্তৃতা, একটি সম্পাদকীয় এবং একটি নামহীন ফেসবুক পোস্ট একই প্রমাণমূল্য বহন করে না। বস্তুনিষ্ঠতা মানে দুই পক্ষের দুটি বাক্য পাশাপাশি বসিয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাওয়া নয়। বস্তুনিষ্ঠতা মানে দাবির পেছনে প্রমাণ দেখা, উৎসের স্বার্থ বোঝা, পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা খোঁজা এবং নতুন প্রমাণ এলে নিজের অবস্থান সংশোধনের সাহস রাখা।

নির্বাচিত শ্রবণ শুধু রাজনীতিতে কাজ করে না। ব্যক্তিগত সম্পর্কেও একই প্রবণতা দেখা যায়। কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর আমরা কি তার সব স্মৃতি সমানভাবে মনে রাখি? নাকি নিজেদের সিদ্ধান্তকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করার জন্য অপমান, ব্যর্থতা ও কষ্টের স্মৃতিগুলো সামনে আনি? ভালো সময়গুলো কি তখন ধীরে ধীরে পেছনে চলে যায়?

বিচ্ছেদের পর একজন মানুষ কখনো সম্পর্কটির ইতিহাস নতুন করে নির্মাণ করেন। তিনি হয়তো সরাসরি মিথ্যা বলছেন না। কিন্তু স্মৃতির বিশাল ভাণ্ডার থেকে এমন ঘটনাগুলো বেছে নিচ্ছেন, যেগুলো তার বর্তমান সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। বিচ্ছেদ তখন শুধু একটি ঘটনা থাকে না। এটি নিজের অবস্থানের পক্ষে সাজানো একটি ব্যক্তিগত বয়ানে পরিণত হয়।

ষড়যন্ত্রতত্ত্বও একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করে। একজন মানুষ প্রথমে সন্দেহ করেন, তারপর সেই সন্দেহের পক্ষে ভিডিও খোঁজেন, মিল খুঁজে বের করেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে যুক্ত করেন এবং বিপরীত প্রমাণকে ষড়যন্ত্রের আরও বড় প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার গবেষণা তখন সত্য আবিষ্কারের পদ্ধতি থাকে না। আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠা করার উপকরণে পরিণত হয়।

আত্মপ্রবঞ্চনার সবচেয়ে নিখুঁত রূপ

একচোখা মানুষ নিজেকে সাধারণত একচোখা মনে করেন না। তিনি মনে করেন, বাকিরা সবাই প্রভাবিত, শুধু তিনিই স্বাধীন। বাকিরা প্রচারণার শিকার, শুধু তিনিই সত্যের সন্ধান পেয়েছেন। অন্যদের সংবাদমাধ্যম পক্ষপাতদুষ্ট, কিন্তু নিজের পছন্দের চ্যানেলটি যেন বাস্তবতার নির্ভুল আয়না।

একচোখা মানুষ শুধু তর্কে ভয়ংকর নন। তিনি পরিবার, বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্কেও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারেন। কারণ তিনি মানুষকে আর সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেন না। তিনি মানুষকে নিজের মতের পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকা একটি পরিচয়ে নামিয়ে আনেন।

এভাবেই ছোট একটি পক্ষপাত বড় হতে হতে মিথ্যার বটগাছে পরিণত হয়। তার প্রতিটি শাখায় থাকে নির্বাচিত তথ্য, অর্ধসত্য, পরিচয়ের অহংকার এবং বিপরীত মতের প্রতি ঘৃণা।

তাহলে এই একচোখা তথ্যজগৎ থেকে মুক্তির উপায় কী?

০১. নিজের বিশ্বাসের বিপরীত সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিটি খুঁজে দেখুন।

০২. সংবাদ, বিশ্লেষণ, মতামত ও প্রচারণার মধ্যকার পার্থক্য শনাক্ত করুন।

০৩. সম্ভব হলে মূল গবেষণা, প্রতিবেদন, নথি অথবা পূর্ণ বক্তব্য পড়ুন।

০৪. শিরোনামের বাইরে গিয়ে একই ঘটনার একাধিক বর্ণনা ও প্রেক্ষাপট দেখুন।

০৫. তথ্য শেয়ার করার আগে উৎস, তারিখ, প্রমাণ এবং প্রকাশের উদ্দেশ্য পরীক্ষা করুন।

০৬. প্রতিপক্ষকে যে কঠোর প্রশ্ন করেন, নিজের পছন্দের পক্ষকেও সেই একই প্রশ্ন করুন।

আমি কি সত্য জানতে চাইছি, নাকি আমার পুরোনো বিশ্বাসটিকে আরেকবার সত্য প্রমাণ করতে চাইছি?

মানুষকে বলতে দিন। প্রশ্ন করতে দিন। বিপরীত মত প্রকাশ করতেও দিন। কিন্তু শোনার সময় মনে রাখুন, শুধু বক্তা আপনাকে প্রভাবিত করেন না। আপনার ভয়, পরিচয়, ক্ষোভ, স্মৃতি এবং কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তও ঠিক করে দেয় আপনি কোন কথাটি শুনবেন, কোনটি ভুলে যাবেন এবং কোন অসত্যকে সত্য বলে বুকে ধরে রাখবেন।

বলুন, বলতেও দিন। তবে শোনার ক্ষেত্রে সাবধান থাকুন।

কারণ সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু সব সময় সরাসরি মিথ্যা নয়। কখনো কখনো সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু সেই নির্বাচিত সত্য, যা আমাদের স্বস্তি দেয়, কিন্তু সম্পূর্ণ বাস্তবতা দেখতে দেয় না।

তথ্যসূত্র ও অতিরিক্ত পাঠ

  1. Reporters Without Borders, Bangladesh Country Profile and World Press Freedom Index 2026
  2. Reporters Without Borders, World Press Freedom Index
  3. U.S. Department of State, Bangladesh 2018 Human Rights Report
  4. Transparency International Bangladesh Election Review, reported by The Daily Star
  5. Oxford Handbook of Political Communication, Selective Exposure Theories
  6. Google Search Help, Personalization and Search Results
  7. Google Search Help, Why Search Results May Differ

নোট: সূচকের অবস্থান ও সমসাময়িক তথ্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। পাঠকদের মূল প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার হালনাগাদ তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!