“Change Maker” নাকি অনুগ্রহের ছায়া রাষ্ট্রের ভদ্র শ্রমিক?
স্বেচ্ছাসেবা, নেতৃত্ব, দান, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও যুব উন্নয়নের ভাষা কি নাগরিককে ক্ষমতা দেয়, নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ভার তরুণের শ্রম, শরীর ও অপরাধবোধের ওপর সরিয়ে দেয়? বাংলাদেশের বাস্তবতা, তথ্য ও ডার্ক সাইকোলজির আলোকে একটি জিজ্ঞাসামূলক বিশ্লেষণ।
“Change Maker” নাকি অনুগ্রহের ছায়া রাষ্ট্রের ভদ্র শ্রমিক?
তরুণের হাতে ঝাড়ু আছে, কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাজেট কোথায়? তার শরীরে রক্ত আছে, কিন্তু হাসপাতালের নিরাপদ রক্তভান্ডার কোথায়? তার হাতে নেতৃত্বের সনদ আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কোথায়? “Change Maker” কি সত্যিই পরিবর্তনের মালিক, নাকি ভাঙা ব্যবস্থার ধাক্কা শোষণকারী ভদ্র শ্রমিক?
এই লেখা ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দেওয়া, অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া, রক্তদান, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, দুর্যোগে পাশে দাঁড়ানো, তরুণদের নেতৃত্ব শেখানো কিংবা স্বেচ্ছাসেবার বিরুদ্ধে নয়। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে, এটাই হয়তো সভ্যতার শেষ আলো। কিন্তু সেই আলো যদি রাষ্ট্রের অন্ধকার আড়াল করে, তখন আলোকেও জেরা করতে হয়। দয়া যদি অধিকারকে প্রতিস্থাপন করে, অনুগ্রহ যদি পুনর্বাসনের জায়গা দখল করে, নেতৃত্ব যদি ক্ষমতা ছাড়া পরিচয়ে আটকে যায়, আর “Change Maker” যদি বাস্তব পরিবর্তনের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমান মুখ তৈরির ভাষা হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন করা নিষ্ঠুরতা নয়। প্রশ্ন করাই নাগরিক দায়িত্ব।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাস্টবিন না পেয়ে একজন ছাত্র চকলেটের মোড়ক মাটিতে ফেলে দিল। পাশে থাকা বান্ধবীটি সদ্য “Active Citizen” প্রশিক্ষণ শেষ করেছে। সে আপত্তি করল, “যেখানে-সেখানে এসব ফেলবি না।” আপত্তিটি নৈতিকভাবে সঠিক। কিন্তু মোড়কটি তুলে নেওয়ার পর সেও কোনো ডাস্টবিন খুঁজে পেল না। শেষ পর্যন্ত নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে সেটি রেখে দিল।
ঘটনাটি কি এতই ছোট যে হাসতে হাসতে ভুলে যাওয়া যায়? নাকি এর মধ্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও ক্ষমতার একটি পূর্ণ পাঠ লুকিয়ে আছে? ডাস্টবিন নেই, কিন্তু সচেতনতা আছে। অবকাঠামো নেই, কিন্তু নৈতিক শিক্ষা আছে। প্রতিষ্ঠান অনুপস্থিত, কিন্তু নাগরিকের অপরাধবোধ উপস্থিত। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ, অথচ সেই ব্যর্থতার বস্তুগত ভার গিয়ে পড়ল একজন তরুণীর ব্যক্তিগত ব্যাগে। তার ভ্যানিটি ব্যাগ হয়ে উঠল ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের অস্থায়ী ডাস্টবিন।
ডাস্টবিন নেই, কিন্তু সচেতনতার পাঠ আছে। প্রতিষ্ঠান নেই, কিন্তু নাগরিকের অপরাধবোধ আছে। ব্যর্থতা রাষ্ট্রের, অথচ ময়লাটি বহন করছে একজন তরুণীর ব্যক্তিগত ব্যাগ।
তাহলে প্রশ্ন শুরু হোক এখান থেকে। যে নগর নাগরিককে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও কার্যকর বর্জ্য শাসন দিতে পারে না, সে নগর নাগরিককে সচেতনতার পাঠ দেয় কোন নৈতিক অবস্থান থেকে? যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিরাপদ, সহজলভ্য ও পূর্বপরিকল্পিত রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে না, সেখানে কেন যুবকের শরীরকে জরুরি রক্তের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হবে? যে অর্থনীতি সম্মানজনক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না, তার পাশে দাঁড়ানো প্রতিষ্ঠান কেন বেকার তরুণকে শুধু “মানসিকতা” বদলাতে শেখাবে? যে সমাজে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক, সেখানে সততার শপথ নিয়ে তরুণকে “Change Maker” বললে আসলে কী বদলায়? আর যে প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব শেখায়, সে কি সত্যিই সিদ্ধান্তের দরজা খুলে দেয়, নাকি কিছু সুন্দর, স্পষ্টভাষী ও ক্যামেরাবান্ধব মুখ সামনে রেখে নিজের প্রচারের মঞ্চ সাজায়?
২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল সংসদে উপস্থাপিত তথ্যানুসারে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত ৭১ হাজার ৫৯১টি স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থার মধ্যে ৬০ হাজার ২৮৬টি সক্রিয় এবং ১১ হাজার ৩০৫টি নিষ্ক্রিয় হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। একই তথ্যে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনুদানের জন্য ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল এবং ৪ হাজার ২২১টি সংগঠন অনুদান পেয়েছিল।
এই সংখ্যাগুলো নিছক সংগঠনের হিসাব নয়। এগুলো দেখায় যে স্বেচ্ছাসেবা কোনো বিচ্ছিন্ন আবেগের ক্ষেত্র নয়। এটি নিবন্ধন, বিধিবিধান, অনুদান, প্রতিষ্ঠান, দৃশ্যমানতা এবং সামাজিক সেবার সঙ্গে যুক্ত এক বিশাল পরিসর। এই পরিসর অসংখ্য মানুষকে সহায়তা করে, দুর্যোগে পাশে দাঁড়ায় এবং এমন বহু জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল বা বিলম্বিত। কিন্তু এখানেই অস্বস্তিকর প্রশ্নটি আসে। নাগরিক উদ্যোগ কি রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক করে, নাকি কখনো কখনো রাষ্ট্রের অপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তাকে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করে দেয়?
আমরা “এক টাকায় আহার” শুনলে আবেগপ্রবণ হই। কেন হই? কারণ ক্ষুধার দৃশ্য নিষ্ঠুর, কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবারের প্যাকেটের দৃশ্য তুলনামূলকভাবে সুন্দর। খাবার পাওয়ার ঘটনাটি ক্যামেরায় সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু মানুষটি কেন খাবার কিনতে পারে না, তার আয় কোথায়, তার কাজ কোথায়, তার সামাজিক নিরাপত্তা কোথায়, খাবারের প্যাকেট শেষ হওয়ার পর তার পরবর্তী আহার কোথা থেকে আসবে, এসব প্রশ্ন ছবির বাইরে থেকে যায়।
এক টাকার প্রতীক মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষার চেষ্টা হতে পারে। এই মানবিক যুক্তিকে অবজ্ঞা করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আত্মমর্যাদা কি কেবল প্রতীকী মূল্য পরিশোধে ফিরে আসে, নাকি এমন অর্থনৈতিক সক্ষমতা থেকে আসে, যার ফলে মানুষকে দাতার নির্ধারিত খাবারের লাইনে দাঁড়াতে হয় না? এক টাকা দেওয়ার সুযোগ দিয়ে আমরা কি ব্যক্তিকে মর্যাদা দিচ্ছি, নাকি দারিদ্র্যকে এমনভাবে মঞ্চস্থ করছি যাতে দাতা, প্রতিষ্ঠান, দর্শক ও রাষ্ট্র পরস্পরকে মানবিক মনে করতে পারে?
মর্যাদা কি এক টাকার প্রতীকে আসে, নাকি এমন আয়ে আসে যাতে মানুষকে খাবারের লাইনে দাঁড়াতে না হয়?
এক টাকার ডাক্তার কিংবা নামমাত্র মূল্যের চিকিৎসার গল্পেও একই নৈতিক কোমলতা আছে। কোনো চিকিৎসক নিজের শ্রম ও পেশাগত দক্ষতা দরিদ্র মানুষের জন্য প্রায় বিনা মূল্যে উন্মুক্ত করলে সেটি নিঃসন্দেহে মানবিক কাজ। কিন্তু মানবিক চিকিৎসককে নায়ক বানাতে গিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা আড়াল হয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। চিকিৎসা কি অলৌকিক অনুগ্রহ হওয়ার কথা, নাকি নাগরিক অধিকার হওয়ার কথা? কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া আমাদের কাছে এত আশ্চর্য লাগে কেন? আশ্চর্যটি কি চিকিৎসকের মহত্ত্বে, নাকি স্বাভাবিক চিকিৎসা অপ্রাপ্য হয়ে ওঠার মধ্যে?
এখানেই আবেগ কখনো আমাদের রাজনৈতিক স্নায়ু অসাড় করে। আমরা ক্ষত দেখি, ব্যান্ডেজ দেখি, তারপর ব্যান্ডেজদাতাকে মহিমান্বিত করি। কিন্তু ক্ষত তৈরির যন্ত্রটি পরীক্ষা করি না। ক্ষুধা স্বাভাবিক হয়ে যায়, দান অসাধারণ হয়ে ওঠে। চিকিৎসা অপ্রাপ্য হয়ে যায়, নামমাত্র মূল্যের চিকিৎসক অলৌকিক চরিত্রে পরিণত হন। ময়লা স্বাভাবিক হয়, অথচ তরুণের ঝাড়ু হাতে ছবি দেশপ্রেম হয়ে ওঠে। বেকারত্ব স্বাভাবিক হয়, প্রেরণামূলক বক্তৃতা আশার ভাষা হয়ে ওঠে। দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়, কিন্তু সততার শপথ নাগরিক সাফল্যের দৃশ্য তৈরি করে।
এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো ক্লিনিক্যাল রোগনির্ণয় নয়, বরং এই লেখার বিশ্লেষণী ধারণা। মানবিক কাজের আবেগময় দৃশ্য কাঠামোগত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের রাজনৈতিক অস্বস্তি সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়। আমরা সহায়তা দেখে স্বস্তি পাই, কিন্তু যে ব্যবস্থা মানুষকে বারবার সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে ঠেলে দেয়, সেটি বদলানোর দাবি দুর্বল হয়ে যায়।
BD Clean-এর উদাহরণ নেওয়া যাক। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত লক্ষ্য মানুষের যত্রতত্র ময়লা ফেলার অভ্যাস বদলানো, ডাস্টবিন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং দৃশ্যমান পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেশজুড়ে সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। ২০২৪ সালের The Business Standard-এর একটি প্রতিবেদনে সংগঠনটিকে স্বেচ্ছাসেবী-নির্ভর ও স্ব-অর্থায়িত উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং সে সময় ৪৫ হাজার সক্রিয় সদস্য ও ৫০০টি দলের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে প্রতি শুক্রবার নির্বাচিত স্থানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার পদ্ধতির কথা বলা হয়।
কাজটি প্রয়োজনীয়। কোনো তরুণ যদি ময়লা তুলে, মানুষকে সচেতন করে এবং একটি নোংরা জায়গাকে পরিচ্ছন্ন করে, তার কাজকে তুচ্ছ করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্নটি ব্যক্তির সদিচ্ছা নিয়ে নয়। প্রশ্নটি পরিবর্তনের সংজ্ঞা নিয়ে। একই জায়গায় যদি আবার ময়লা জমে, আবার তরুণেরা যায়, আবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান হয়, আবার ছবি ওঠে, তাহলে কোন অংশটি বদলাল? ময়লা তোলা কি পরিবর্তন, নাকি ময়লা উৎপাদন, সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবস্থাপনার কাঠামো বদলানোই পরিবর্তন?
- সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাজেট কোথায়?
- বর্জ্য সংগ্রহের নির্ভরযোগ্য সময়সূচি কোথায়?
- বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির দায় কোথায়?
- প্লাস্টিক উৎপাদক ও বিক্রেতাদের সম্প্রসারিত দায়িত্ব কোথায়?
- নিয়ম ভাঙার কার্যকর জরিমানা কোথায়?
- পরিষ্কার করা স্থানটির ৩ বা ৬ মাস পরের অবস্থা যাচাই করা হয় কি?
নাগরিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পরস্পরের শত্রু নয়। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন নাগরিক দায়িত্বের দৃশ্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অনুপস্থিতিকে স্বাভাবিক করে তোলে।
রক্তদানের ক্ষেত্রেও একই দায়িত্ব স্থানান্তরের আশঙ্কা দেখা যায়। স্বেচ্ছায় রক্তদানের নেটওয়ার্ক জরুরি মুহূর্তে অসংখ্য জীবন বাঁচায়। কিন্তু রক্তদাতা কি শুধু একটি রক্তের গ্রুপ? তার শরীর, পুষ্টি, ক্লান্তি, রাতের নিরাপত্তা, যাতায়াত, পরবর্তী যত্ন এবং “না” বলার অধিকার কোথায়? প্রতিবার জরুরি অনুরোধে যদি একজন তরুণকে নিজের শরীর নিয়ে ছুটতে হয়, তাহলে মানবিকতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতিহীনতাও সামনে আসে।
এটি এই নিবন্ধের একটি বিশ্লেষণী পরিভাষা। কেউ সরাসরি রক্ত দিতে বাধ্য করে না। কিন্তু “একজন রোগী মারা যাবে”, “আপনি না গেলে কেউ নেই” কিংবা “মানবিক হলে এখনই আসুন” ধরনের নৈতিক চাপ ব্যক্তিকে নিজের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সীমা উপেক্ষা করতে বাধ্য করতে পারে। মানবিক আবেদন তখন সম্মতির জায়গা সংকুচিত করে। স্বেচ্ছাসেবা থাকে, কিন্তু “স্বেচ্ছা” শব্দটির ভেতরে অপরাধবোধ ঢুকে পড়ে।
যুব নেতৃত্বের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত। British Council-এর Active Citizens কর্মসূচির নিজস্ব তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে প্রায় ৭০০টি সম্প্রদায়ের ৬০টি জেলায় ৪৬ হাজারের বেশি যুবনেতাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ২ হাজার ৪০০টির বেশি Social Action Project শুরু হয়েছে। কর্মসূচিটি নেতৃত্ব, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও স্থানীয় সামাজিক উদ্যোগের সক্ষমতা তৈরির কথা বলে।
Volunteer for Bangladesh-এর নিজস্ব পরিচিতি অনুযায়ী, সংগঠনটির ৬৪টি জেলায় ৫৫ হাজার নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী রয়েছে এবং তারা স্বেচ্ছাসেবা, নেতৃত্ব উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, পরামর্শদান ও সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা এক নয়।
সামাজিক প্রকল্পের সংখ্যা এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের সংখ্যা এক নয়।
নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা এবং সুরক্ষিত, দক্ষতাসম্পন্ন কিংবা সম্মানজনক কর্মসংস্থানে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও এক নয়।
তাই প্রশ্ন করতে হবে, এই নেতৃত্ব কোথায় জমা হচ্ছে? স্থানীয় সরকারের বাজেট আলোচনায়, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালবামে? নীতি প্রণয়নে, নাকি যুব সম্মেলনের ব্যানারে? কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, নাকি LinkedIn-এর পরিচয়পত্রে? প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে, নাকি দাতাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে?
“Leadership” শব্দটি সরল নয়। এটি কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব দক্ষতা, সংগঠন, আলোচনার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমষ্টিগত দায়িত্ব তৈরি করতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি মুখ সামনে রাখার প্রযুক্তিতে পরিণত হতে পারে। কয়েকজন স্পষ্টভাষী, ক্যামেরাবান্ধব, শহুরে ভদ্র ভাষায় কথা বলা তরুণ-তরুণীকে সামনে আনা হয়। তারা আলোচনা সভায় বসে, ছবি তোলে, উদ্ধৃতি দেয়, ভিডিওতে আসে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে স্থান পায়। প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করতে পারে, “আমরা যুবকদের ক্ষমতায়িত করছি।” তরুণ পায় পরিচয়, যোগাযোগ ও প্রতীকী পুঁজি। কিন্তু তার হাতে কি বাজেট আছে? ভোট আছে? সিদ্ধান্তের ক্ষমতা আছে? নীতিনির্ধারকের কাছে প্রবেশাধিকার আছে? তার শ্রমের পারিশ্রমিক আছে? নাকি সে প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমানতার অর্থনীতির আকর্ষণীয় মুখ?
নেতৃত্ব কি ক্ষমতা, নাকি ক্ষমতার ভঙ্গি?
“Change Maker” শব্দটিকেও একইভাবে পড়তে হবে। শব্দটি কোমল, আশাবাদী এবং মর্যাদাপূর্ণ। কিন্তু এর ভেতরে ক্ষমতাহীনতার একটি কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে থাকতে পারে। একজন তরুণ বিশ্বাস করে সে পরিবর্তন করছে। অথচ তার কাজ যদি হয় বারবার একই ময়লা তোলা, একই রক্তসংকটে নিজের শরীর দেওয়া, একই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শপথ নেওয়া, একই বেকারত্বের মধ্যে প্রেরণামূলক বক্তৃতা শোনা এবং একই সামাজিক সংকটে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দেওয়া, তাহলে সে পরিবর্তন করছে কোথায়?
হয়তো সে পরিবর্তনের মালিক নয়। সে ভাঙা ব্যবস্থার “Shock Absorber” বা ধাক্কা-শোষক। সে ধাক্কা গ্রহণ করে, সাময়িক ক্ষতি কমায়, মানুষকে বাঁচায়, সংকটের তীব্রতা শোষণ করে। কিন্তু ধাক্কার উৎস, ক্ষমতার বিন্যাস ও সম্পদের বণ্টন অপরিবর্তিত থেকে যায়।
Transparency International-এর হালনাগাদ country profile অনুযায়ী, ২০২৫ সালের Corruption Perceptions Index-এ বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০০-এর মধ্যে ২৪ এবং অবস্থান ছিল ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম।
একই পৃষ্ঠায় ২৪ শতাংশ সরকারি সেবাগ্রহীতার ঘুষ দেওয়ার তথ্যও রয়েছে। তবে সংখ্যাটি ২০২৫ সালের CPI-এর অংশ নয়। এটি সর্বশেষ প্রকাশিত Global Corruption Barometer Asia 2020-এর অভিজ্ঞতাভিত্তিক তথ্য। CPI মূলত সরকারি খাতের দুর্নীতির ধারণাভিত্তিক সমন্বিত সূচক। তাই দুটি সংখ্যাকে একই বছরের একই জরিপের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখা যদি নিজেই ভিন্ন সময়ের দুটি সূচককে এক করে ফেলে, তাহলে সেই লেখা তথ্যগত সততার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়। তথ্য শুধু যুক্তির অলংকার নয়। তথ্য যুক্তির নৈতিক দায়িত্ব।
দুদকের ক্ষেত্রেও সময়ভিত্তিক পার্থক্য জরুরি। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩০০-এর বেশি প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল। প্রায় ৯ হাজার মামলা, অনুসন্ধান ও তদন্ত বিচারাধীন বা অসম্পূর্ণ ছিল। ওই সময়ে ৫২৫টি অনুসন্ধান শুরু এবং ২৯৭টি মামলা করা হলেও মাত্র ৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল।
তবে এটিই ২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ শেষ চিত্র নয়। পরবর্তী হালনাগাদে জানানো হয়, পুরো ২০২৫ সালে দুদক ১৩ হাজার ৮৭৭টি অভিযোগ পেয়েছিল, ২ হাজার ৫৩৬টির অনুসন্ধান শুরু করেছিল, ৫৯৪টি মামলা করেছিল এবং ৪১৩টি মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছিল। নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় দণ্ডের হার ৫২ শতাংশে উঠেছিল বলেও দুদকের তথ্য উদ্ধৃত করা হয়। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, শুধু অনুসন্ধান, মামলা বা দণ্ডের সংখ্যা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা প্রমাণ করা যায় না।
সংখ্যার পরিবর্তন স্বীকার করতে হবে, কিন্তু মূল প্রশ্নটি তবু থেকে যায়। দুর্নীতিবিরোধী নেতৃত্ব কি পোস্টার, শপথ, বিতর্ক ও সচেতনতা কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি এটি সরকারি ক্রয়, ভূমি, কর, শুল্ক, ব্যাংকঋণ, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক সুরক্ষা, সময়মতো মামলা নিষ্পত্তি, স্বাধীন তদন্ত এবং অভিযোগকারীর সুরক্ষা পর্যন্ত পৌঁছাবে?
সচেতনতা কি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ তৈরি করছে, নাকি কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের নৈতিক অবস্থান প্রদর্শনের সুযোগ দিচ্ছে?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর Labour Force Survey 2024-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক বেকার ছিলেন। উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ছিল ১৩.৫ শতাংশ, যা সব শিক্ষা স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জাতীয় বেকারত্বের হার ছিল ৪.৪৮ শতাংশ।
কিন্তু একজন তরুণ যখন বলে, “আমার সম্মানজনক কাজ দরকার”, তখন তাকে প্রায়ই বলা হয়, “তোমার দক্ষতা কম”, “তোমার মানসিকতা ঠিক নয়”, “তুমি আরামপ্রিয়”, “তুমি যথেষ্ট ইতিবাচক নও”, “তুমি নিজেই কাজ তৈরি করো।” দক্ষতা উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। আত্মসমালোচনাও প্রয়োজন। কিন্তু অর্থনীতির কর্মসংস্থান-সংকট, বিনিয়োগের দুর্বলতা, শিল্পের সীমাবদ্ধতা ও নিয়োগের বৈষম্যকে যদি পুরোপুরি ব্যক্তির মানসিক ব্যর্থতায় রূপান্তর করা হয়, সেটি আর উন্নয়নমূলক পরামর্শ থাকে না।
কাজ নেই, কিন্তু বলা হয় তোমার ভেতরে যথেষ্ট আগুন নেই। পুঁজি নেই, কিন্তু বলা হয় তোমার সাহস নেই। বাজারসংযোগ নেই, কিন্তু বলা হয় তুমি মূল্য তৈরি করছ না। সামাজিক নিরাপত্তা নেই, কিন্তু বলা হয় ঝুঁকি নিতে না পারা তোমার দুর্বলতা। কাঠামোর ব্যর্থতা ব্যক্তির আত্মসম্মানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র হয়ে ওঠে।
উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের ভেতরেও একটি দ্বৈত ফাঁদ আছে। ২০২৫ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত নীতিতে স্টার্টআপ ঋণের সর্বোচ্চ সুদ ৪ শতাংশ নির্ধারণ, প্রতিষ্ঠানের পর্যায় অনুযায়ী ঋণসীমা ২ কোটি থেকে ৮ কোটি টাকায় উন্নীত করা এবং ৫০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ব্যবস্থা করা হয়। এতে ২১ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশির আবেদন এবং সর্বোচ্চ ১২ বছর বয়সী নিবন্ধিত স্টার্টআপের অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়।
নীতিটি সম্ভাবনাময়। কিন্তু সম্ভাবনার সঙ্গে প্রবেশযোগ্যতা এক নয়। ঋণ পেতে নিবন্ধন, ঋণখেলাপিমুক্ত ইতিহাস, উদ্ভাবন, দ্রুত সম্প্রসারণের সামর্থ্য, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও ব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। ফলে একটি “Catch-22” তৈরি হতে পারে। ব্যবসা দাঁড় করাতে অর্থ দরকার, কিন্তু অর্থ পেতে ব্যবসাটি আগে থেকেই কতটা দাঁড়িয়ে আছে তা দেখাতে হয়। প্রশিক্ষণ তরুণকে উদ্যোগী হতে বলে, কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি কমাতে ইতিমধ্যে প্রমাণিত উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
ব্যবসা করতে ঋণ দরকার। ঋণ পেতে ব্যবসার ইতিহাস দরকার। তাহলে প্রথমবার দাঁড়াতে চাওয়া তরুণটি কোথায় যাবে?
তবে এখানে একচোখা হওয়া যাবে না। সব প্রতিষ্ঠান একই নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান সত্যিই মানুষ তৈরি করে। কেউ থিয়েটারে নিয়ে গিয়ে মঞ্চে দাঁড়াতে শেখায়, কণ্ঠ, শরীর, উপস্থিতি ও দর্শকের সামনে ভয় সামলানোর বাস্তব অনুশীলন দেয়। কেউ বিতর্কের কাঠামো শেখায়, যুক্তির নিয়ম শেখায় এবং ভিন্নমতের সঙ্গে শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে লড়তে শেখায়। কেউ সম্পাদনার কাজ দিয়ে শ্রমের মূল্য দেয়, কর্মপ্রবাহ শেখায় এবং বাস্তব প্রকাশনার দায়িত্ব দেয়। কেউ অতিথি শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে দাঁড় করায়, যেখানে শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা বই থেকে নয়, বাস্তব শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়িয়ে শিখতে হয়।
এসব প্রতিষ্ঠান দেখায়, প্রতিষ্ঠান মানুষকে ব্যবহারও করতে পারে, আবার তৈরি করতেও পারে। পার্থক্যটি কোথায়? বাস্তব অনুশীলনে, নিয়মিত প্রতিক্রিয়ায়, হস্তান্তরযোগ্য দক্ষতায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগে, পেশাগত রূপান্তরে, শ্রমের স্বীকৃতিতে এবং সম্ভব হলে পারিশ্রমিকে।
- প্রতিষ্ঠানটি কি শুধু পরিচয় দেয়, নাকি বাস্তব সক্ষমতা তৈরি করে?
- অংশগ্রহণকারী কি শুধু ছবি ও সনদ পায়, নাকি স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা অর্জন করে?
- তরুণের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়, নাকি সিদ্ধান্তক্ষমতাও দেওয়া হয়?
- স্বেচ্ছাশ্রমের সীমা, নিরাপত্তা ও সম্মতির নীতি আছে কি?
- বাস্তব কাজের জন্য পারিশ্রমিক বা পেশাগত সুযোগ আছে কি?
- কর্মসূচি শেষ হওয়ার ৬ বা ১২ মাস পরে ফলাফল অনুসরণ করা হয় কি?
তাই এই লেখার পাঠ প্রতিষ্ঠানবিরোধী নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, কোন প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা দেয় আর কোন প্রতিষ্ঠান শুধু পরিচয় দেয়? কোন প্রতিষ্ঠান দক্ষতা তৈরি করে আর কোন প্রতিষ্ঠান স্লোগান তৈরি করে? কোনটি পারিশ্রমিক বা বাস্তব সুযোগ দেয় আর কোনটি মানবিক আবেগকে বিনা মূল্যের শ্রমে রূপান্তর করে? কোনটি আপনাকে মঞ্চ, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা, সম্পাদনা, নীতিগত আলোচনা কিংবা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করায়, আর কোনটি সনদ, হ্যাশট্যাগ, অনুষ্ঠানের ছবি ও প্রেরণামূলক উদ্ধৃতি দিয়ে বিদায় করে?
রাষ্ট্র, বাজার বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ব্যক্তির ওপর সরিয়ে দেওয়া।
অবকাঠামোগত ব্যর্থতাকে ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতায় রূপান্তর করা।
সিদ্ধান্তক্ষমতা না দিয়ে ক্ষমতাবান হওয়ার অনুভূতি দেওয়া।
মানবতা, দেশপ্রেম, নেতৃত্ব বা অভিজ্ঞতার নামে যুবকের সময়, শ্রম ও আবেগ গ্রহণ করা, অথচ তার সীমা, নিরাপত্তা, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ রূপান্তর নিশ্চিত না করা।
কাজের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের চেয়ে কাজের ছবি, ভিডিও, হ্যাশট্যাগ ও প্রচারমূল্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা।
ক্ষমতা, নীতি ও কাঠামো না বদলিয়েও পরিবর্তনের ভাষা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভাবমূর্তি উন্নত করা।
এই পরিভাষাগুলো ক্লিনিক্যাল রোগনির্ণয় নয় এবং সব প্রতিষ্ঠান বা স্বেচ্ছাসেবকের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োগযোগ্য অভিযোগও নয়। এগুলো পরীক্ষাযোগ্য বিশ্লেষণী ধারণা। কোনো কর্মসূচির ক্ষেত্রে এগুলো প্রযোজ্য কি না, তা জানতে ফলাফল, বাজেট, ক্ষমতা বণ্টন, শ্রমনীতি, অংশগ্রহণকারীর নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরীক্ষা করতে হবে।
- এক টাকার খাবার গ্রহণকারী কতজন নির্দিষ্ট সময় পরে নিয়মিত আয়ের মাধ্যমে খাবারের লাইন থেকে বের হয়েছেন?
- নামমাত্র মূল্যের চিকিৎসা কত পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঋণ থেকে রক্ষা করেছে?
- পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ৩ বা ৬ মাস পর স্থানটি পুনরায় নোংরা হয়েছে কি না?
- বর্জ্য উৎপাদনের উৎস ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির মধ্যে আনা হয়েছে কি না?
- রক্তদাতাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সম্মতি ও পরবর্তী যত্নের নীতি আছে কি না?
- প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকদের কতজন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটি বা স্থানীয় বাজেট প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছেন?
- কতজন স্বেচ্ছাসেবী পরবর্তী সময়ে পারিশ্রমিকভিত্তিক দায়িত্ব পেয়েছেন?
- উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নেওয়া কতজন ১২ মাস পরে সক্রিয় ও লাভজনক ব্যবসা পরিচালনা করছেন?
- দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা কতটি সেবাপ্রক্রিয়া পরিবর্তন করেছে?
- প্রেরণামূলক কর্মসূচির পরে কতজন সম্মানজনক কাজ পেয়েছেন?
এগুলো নিষ্ঠুর প্রশ্ন নয়। এগুলো ফলাফল যাচাইয়ের প্রশ্ন।
প্রশ্ন না করলে রাষ্ট্র আরাম পায়। প্রতিষ্ঠান করতালি পায়। দাতা নৈতিক স্বস্তি পায়। গুরু বাজার পায়। তরুণ সনদ পায়। কিন্তু নাগরিক অধিকার পায় না।
যখন রাষ্ট্র অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়, তখন প্রতিষ্ঠান অনুগ্রহ দেয়। যখন অর্থনীতি সম্মানজনক কাজ দিতে ব্যর্থ হয়, তখন গুরু মানসিকতা দেয়। যখন শহর ডাস্টবিন দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সচেতন তরুণী নিজের ব্যাগে ময়লা রাখে। যখন হাসপাতাল নিরাপদ রক্তব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তরুণের শরীর জরুরি রক্তের গুদাম হয়ে ওঠে। যখন দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়, তখন যুবকদের সততার শপথ পড়ানো হয়। আর যখন এই সবকিছু মিলিয়ে একটি প্রজন্মকে বলা হয়, “তোমরাই Change Maker”, তখন প্রশ্ন করতে হয়, তাদের হাতে সত্যিই কি পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, নাকি ভাঙা ব্যবস্থার ভার বইবার জন্য একটি সুন্দর নাম দেওয়া হয়েছে?
আমাদের সময়ের বড় বিপদ শুধু দারিদ্র্য নয়, শুধু বেকারত্ব নয়, শুধু দুর্নীতি নয়। আরও বড় বিপদ হলো, আমরা এগুলোকে স্বাভাবিক মনে করতে শিখছি। আমরা অনুগ্রহ দেখে অধিকার ভুলছি। নেতৃত্ব দেখে ক্ষমতা ভুলছি। প্রেরণামূলক বক্তৃতা দেখে কর্মসংস্থান ভুলছি। পরিচ্ছন্নতা অভিযান দেখে বর্জ্য শাসন ভুলছি। রক্তদান দেখে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভুলছি। “Change Maker” দেখে পরিবর্তনের রাজনৈতিক অর্থ ভুলছি।
তাই প্রশ্ন করতেই হবে।
কারণ যে সমাজ প্রশ্ন ভুলে যায়, সে সমাজ অনুগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাকে নাগরিকত্ব মনে করতে শেখে। আর যে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা হয় না, সে রাষ্ট্র মানুষের দয়া, যুবকের শ্রম, নারীর ব্যাগ, ছাত্রের রক্ত, বেকারের অপরাধবোধ এবং নাগরিকের নীরবতাকে নিজের ব্যর্থতার নরম বালিশ বানিয়ে নেয়।
তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন
ট্যাগ:
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0