প্রযুক্তি: আশীর্বাদ না অভিশাপ? ডিজিটাল অভ্যস্ততার নেতিবাচক দিক
প্রযুক্তি শুধু সুবিধা নয়, কেড়ে নিচ্ছে আমাদের স্মৃতিশক্তি, ধৈর্য ও সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা। স্মার্টফোন, ক্যালকুলেটর ও AI কীভাবে অভিশাপ হচ্ছে, জেনে নিন।
প্রযুক্তি শুধু আশীর্বাদ নয়, অভিশাপও। একসময় নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবীর যোগাযোগ নম্বর আমাদের মুখস্ত থাকতো। সময়ের পরিবর্তনে আমাদের হাতে উন্নত মানের স্মার্টফোন এসেছে কিন্তু আমরা খুব সম্ভবত একটি নম্বরও আমাদের মাথায় সংরক্ষণ করে আর রাখি না, রাখার প্রয়োজন মনে হয় না। এই যোগাযোগ নম্বর মনে রাখার দায়িত্ব এখন গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল ও মাইক্রোসফটের।
২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া শাহরুখ খানের হিন্দি সিনেমা ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস (Chennai Express)’ -এ তিনি ‘NOKIA LUMIA 920’ স্মার্টফোন ব্যবহার করছিলেন। কিন্তু ফোনটি যখন হারিয়ে যায় তখন তার সাথে সাথে সমস্ত যোগাযোগ নম্বরও হারিয়ে বসেন। এক পর্যায়ে বলিউড বাদশাহ্ ঐ সিনেমাতেই স্বীকার করেন যে, উন্নত ফোন তার পরিচিতদের যোগাযোগ নম্বর ভুলে যাবার একমাত্র কারণ। এবং এতে তার উক্ত সিনেমায় সমস্যা আরো বেড়ে যায়।
ঠিক এমনটিই দেখা যায় ‘ক্যালকুলেটর’ ব্যবহারে। ১৯৭০ সালে পকেট ক্যালকুলেটর আবিষ্কার হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে আমরা সবাই ‘ক্যালকুলেটর’ ব্যবহার করতে শুরু করি। মানিয়ে নিতে শুরু করি। আজকাল সামান্য খুচরো হিসাব করার জন্যও ক্যালকুলেটর ছাড়া আমরা মানুষের মস্তিষ্কের হিসাব গ্রহণ করতে নারাজ।
প্রায় প্রায় মাত্র ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মত সামান্য হিসেবেও কেউ কেউ আমাকে ডাকেন। হিসাব করার জন্য নয়, ক্যালকুলেটরে অংক টাইপ করার জন্য।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ক্যালকুলেটর বাতিল করার বিষয়টি। আমি প্রথম প্রথম খুব ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু ক্যালকুলেটর ছাড়াই অংক অনুশীলন করার সময় আমি খেয়াল করি জটিল দশমিকের গুন, ভাগ, যোগ, বিয়োগ পর্যন্ত আমি নিজে নিজেই করতে সক্ষম হচ্ছি।
আজও বিসিএসের মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগীতামূলক চাকুরীর পরীক্ষায় ক্যালকুলেটর বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা নিষেধ। আমার বিশ্বাস, আপনারা যারা বিসিএস প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা ক্যালকুলেটর ছাড়াই অংক কষতে অনেকখানি সক্ষম।
জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়টি দিনদিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন এখানে এটা নয় যে, আপনার কাছে জন্মদিনের গুরুত্ব কতটুকু? সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ‘ফেসবুক (Facebook)’ খুলতেই আগামীকাল কার জন্মদিন সে বিষয়ে একটি নোটিফিকেশন পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে আমরা কেউ কারো জন্মদিন মনে রাখছি না, লিখে রাখছি না। আমাদের মন ধরেই নিয়েছে, কারো জন্মদিন আসার পূর্বে ফেসবুকে আমি একটি নোটিফিকেশন অবশ্যই পাবো।
আর শুভেচ্ছা জানানোর জন্য একটি ফেসবুক মেসেজ ফেসবুক নিজেই তৈরি করে দেয়, বাজারে গিয়ে জন্মদিনের কার্ড ক্রয় করার প্রয়োজন নাই। এতে করে সম্পর্কের মধ্যে একধরণের কৃত্রিম ও দেখানোর বিষয়টি বাড়ছে।
ডিজিটাল হাতঘড়ি বাজারে আসার পর আমরা ঘড়ির কাঁটা গুনে সময় বের করার মানসিক পরিশ্রম করতে আর ইচ্ছুক নই। অ্যালার্ম-ঘড়ি বাজারে আসার পর আমরা ঘুম থেকে উঠার দায়িত্ব অ্যালার্ম-ঘড়ি বা মোবাইলের উপর ছেড়ে দিয়েছি। এতে করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা সময়মত ঘুম থেকে উঠতে পারছি না।
কিন্তু একসময় সময়মত ঘুম থেকে উঠার দায়িত্ব একান্তই আমাদের নিজেদের ছিলো। আপনি হয়তো সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠতে চাইছেন। অ্যালার্ম সেট করা এভাবে, ৬:৩০, ৭:৩০ ও ৮:০০ মিনিটে। তবুও দেরি হয়ে যায়।
একসময় খরচ করতেন সরাসরি ক্যাশ টাকা ব্যবহার করে। এখন বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি মোবাইল ব্যাংকিং আর্থিক লেনদেন সহজ করেছে। কিন্তু এতে করে খরচ বরং বেড়ে যাচ্ছে। কারণ ক্যাশ টাকা খরচ করতে মাথায় এসে থাকে আপনি মোট কতটাকা অতিরিক্ত ব্যয় করছেন। কিন্তু মোবাইল ব্যাংকিং-এ টাকাগুলো একটি সংখ্যা হিসেবে চোখে ধরা পড়ে। এবং এতে করে আপনার অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে, গবেষণাও তাই বলছে।
এছাড়াও আপনি হয়তো খেয়াল করছেন না, প্রতিটি লেনদেনে নির্দিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং প্লাটফর্মে কতটাকা প্রদান করছেন লেনদেনের চার্জ হিসেবে। এর প্রাকটিকাল প্রমাণ পাবেন, অন্তত ১ মাস ক্যাশ টাকা লেনদেনে।
আবার ক্যাসেট, সিডি (Compact Disk), রেডিওর কথাও মনে আছে নিশ্চয়। তখন আমাদের হাতে নিজের পছন্দের গানের তালিকা বা প্লে-লিস্ট থাকতো। পছন্দের ক্লাসিক সিনেমার তালিকা সিডি বা ডিভিডিতে থাকতো। আর রেডিওর ফ্রেকুয়েন্সিও মনে থাকতো। কিন্তু এখন ‘Spotify’ ও ‘YouTube Music’ এর মত এপ্লিকেশনে প্লে-লিস্ট নিজের মত করে গুছিয়ে রাখতে বিরুক্ত লাগে। বিশেষ করে রেডিমেড প্লে-লিস্ট এমনিতেই এখন পাওয়া যায়।
অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আপনার পছন্দের গানের তালিকা এই অ্যাপ্লিকেশন নিজেই তৈরি করে থাকে। সুতরাং আমরা আমাদের স্বকীয়তা পুরোপুরি না হারালেও অনেকখানি বিসর্জন দিয়েছি। মাত্র একটি সার্চের মাধ্যমেই পছন্দের গান খুঁজে পাচ্ছি। এছাড়াও ‘Netflix’ এর সাবক্রিপশন থাকলে সেখানে নিজের পছন্দের সিনেমার তালিকা তৈরি করতে পারেন।
ডায়েরি লিখা এখন পরিণত হয়েছে গুগল বা মাইক্রোসফটের নোট লিখাতে। ডায়েরি নষ্ট হলেও, ডায়েরির তথ্য হারালেও গুগল বা মাইক্রোসফটের নোট কিন্তু হারাচ্ছে না। কিন্তু যেটা হারাচ্ছে সেটা হলো আমাদের স্মৃতিশক্তি। ‘Google Drive’, ‘OneDrive’, ‘Dropbox’, ‘MEGA’ ও ‘TeraBox’ -এর মত ক্লাউড প্লাটফর্মে আমরা হাজারো ছবি ও ভিডিও জমা রাখতে পারছি।
কিন্তু সর্বশেষ কবে আমরা সেসব খুলে দেখেছি তাও মনে পড়ে না। আমরা ভেবে নিই, এখন জমা থাকুক, একদিন দেখে নেবো। মানে আমরা মনে রাখছি না, মনে রাখতে চাইছি না।
শুনেছি, নতুন বইয়ের একটা গন্ধ থাকে, রহস্যময় সুগন্ধি। উপন্যাসের হার্ডকপি আমাদের এখন বাজার থেকে তেমন ক্রয় করতে হয় না। এর বদলে প্রজেক্ট গুটেনবার্গ থেকে ‘PDF’ ডাউনলোড করে পড়ছি, ‘Academia’ থেকে রিসার্চ পেপার পড়ছি। কিন্তু নীল স্ক্রীনের ‘PDF’ ফাইল আমাদের ঐ অনুভূতি দিতে আর সক্ষম হচ্ছে না। ভুলে যাচ্ছি মূল গল্পের অনেককিছু। মনে থাকছে না গুরুত্বপূর্ণ উক্তি ও পৃষ্ঠা নম্বর।
গুগল ম্যাপ এসে তো বিশ্বকেই মুঠোফোনে আবদ্ধ করে দিয়েছে। শহরের মানচিত্র আর মনে থাকছে না। মোট মানচিত্রের ৩০% তো একেবারেই ভুলে যাচ্ছি। রাস্তা না হারালেও স্মৃতিশক্তি হারাচ্ছি। আর ক্যামেরা এসে আমাদের গল্প ফিল্টারে আবদ্ধ হয়ে গেছে। ‘Snapchat’ আর মুঠোফোনের ক্যামেরা ক্লিকে উঠে এসেছে বহু ফটো। খুব সম্ভবত এই ফটোগুলোই আমাদের মনে থাকছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ গল্পগুলো।
নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হচ্ছে। আমরা তার সাথে মানিয়েও নিচ্ছি। অথবা, মেনে নিতে একরকম বাধ্য হচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসার পর আমাদের এই অসারতা আরো বেড়েছে। একসময় সবই মোটামুটি একত্রে এনেছিলো স্মার্টফোন কিন্তু এখন খুবই ক্ষুদ্র ডিভাইসের মাধ্যমে আমরা আরো বেশি সুবিধা পেতে যাচ্ছি।
পুরো গল্প পড়ার আর প্রয়োজন নেই। একদিনেই ১০০টি গল্প পড়ুন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের আরো বেশি অলস ও ধৈর্য্য ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। আমাদের কাজ আরো সংকীর্ণ করছে। আর আমাদের ক্রিটিকাল থিংকিং করার সক্ষমতা নিচে নামিয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ। পুনরায়, আমাদের মেনে নিতে হবে বা, একসময় এটাও মেনে নিতে বাধ্য হবো।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0