শুধু কোডিং জানলেই ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার হওয়া যায় না: এআই (AI) বিপ্লব ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ
ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার মানে কি শুধুই কোডিং? পেমেন্ট, ম্যাপ, ও সোশ্যাল লগইন API ইন্টিগ্রেশনের চ্যালেঞ্জ এবং এআই যুগে ডেভেলপারদের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
‘ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার (Full Stack Developer)’ হওয়া মানে শুধু নির্দিষ্ট কোন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানে কোডিং শিখলেই আপনি ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার হতে পারবেন না। বর্তমান সময়ের এআই (AI) বিপ্লবেও ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপারদের চাহিদা একবিন্দুও কমে নাই, বরং বেড়েছে।
এই পেশার মানুষদের সব ধরণের আইটি ফার্ম নিয়োগ দিতে পর্যন্ত সক্ষম নয়। বিশেষ করে তাদের জটিল কাজ এবং সেসবের পারিশ্রমিক তূলনামূলক অনেক বেশি। আপনি হয়তো প্রায় প্রায় শুনে থাকবেন, ফ্রিল্যান্সিং করে মাসে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করা সম্ভব। কিন্তু তারা কারা সেটা হয়তো জানেন না।
আজকাল একাধিক এআই (AI) বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে কোডিং করে দিতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আপনারা যারা এই দুনিয়ায় একেবারে নতুন, আপনারা ঐ সমস্ত কোড দিয়ে অন্তত একটি ওয়েবসাইট বা একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে পেরেছেন? যদি পারতেন, তাহলে চারপাশে সেটা আমরা অবশ্যই লক্ষ্য করতাম।
আমি একজন ওয়েব ও অ্যাপ ডেভেলপার হিসেবে অবশ্যই আমাদের পরিচিত গ্রুপগুলোতে আপনাদের মানে নতুন নতুন মুখ দেখতে পেতাম। কিন্তু এই এআই বিপ্লবে হাতেগোনা দুই-একজন ব্যতীত ওয়েব/অ্যাপ ডেভেলপার এখন পর্যন্ত জন্মায় নাই। অন্তত আমার পর্যবেক্ষণ তাই বলছে।
প্রশ্ন হলো, এআই এতসব কোড লিখে দিলেও আপনি কেন একটি ওয়েবসাইট বা একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে পারছেন না?
উত্তর খুব সোজা। আপনি জানেন ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশনের সাধারণত একটি ফ্রন্টেন্ড থাকে এবং এক বা একাধিক ব্যাকেন্ড থাকতে পারে। কিন্তু আপনি জানেন না ফ্রন্টেন্ড ও ব্যাকেন্ড কীভাবে একে অন্যের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে। ব্যাকেন্ডে একটি সামান্য পরিবর্তন ফ্রন্টেন্ডে কী ধরণের পরিবর্তন আনতে সক্ষম!
একজন ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপারের একাধিক কাজের মধ্যে নিম্নে আমি মাত্র একটি কাজের জটিলতা তুলে ধরার চেষ্টা করছি,
API (Application Programming Interface)
১. বর্তমানে অধিকাংশ ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশনে গুগল/ফেসবুক/টুইটার (X)/লিংকড-ইন/মাইক্রোসফট অথবা Apple ID দিয়ে সাইন-ইন বা সাইন-আপ করা সম্ভব হচ্ছে।
২. কিছু কিছু ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশন সময়, তারিখ ও সাল প্রদর্শন করে থাকে; একাধিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। এছাড়াও আবহাওয়া বিষয়ক তথ্যও প্রদর্শিত হয়। স্থান অনুযায়ী আপনি রিয়েল টাইম আবহাওয়া সম্পর্কেও অবগত হতে পারবেন।
৩. বর্তমানে বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটে পেপ্যাল/বিকাশ/নগদ/ক্রেডিট কার্ড/স্ট্রাইপ ইত্যাদি মাধ্যমে পণ্যর দাম প্রদান করা সম্ভব। ই-কমার্স সাইটের জন্য এই ফিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪. বিভিন্ন ওয়েবসাইটে গুগল ম্যাপ যুক্ত করা থাকে। উদ্দেশ্য হলো, খুব সহজেই ঐ প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির ফিজিক্যাল অবস্থা নির্ণয় করা। এছাড়াও আপনি যেখানে থাকেন সেখান থেকে ঐ প্রতিষ্ঠানের দুরত্ব নির্ণয় করতেও সুবিধা হয়। ফলে যে কোনো অসুবিধায় আপনি সরাসরি ঐ প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তাদের সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
৫. হাতেগোনা কিছু ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশন আপনাকে অডিও ও ভিডিও কলের সুযোগ দিচ্ছে। আপনি নির্দিষ্ট কোন কোর্স বা পরিষেবা সরাসরি অডিও ও ভিডিও কলে কথা বলে আপনার মতামত, অর্ডার ও অভিযোগ জানাতে এখন সক্ষম।
এছাড়াও অধিকাংশ ওয়েবসাইট ও আপ্লিকেশনে লাইভ চ্যাট চালু করা থাকে। যদি লাইভ চ্যাটে কাউকেই না পান তাহলে টিকেটের মাধ্যমে আপনি আপনার মতামত, সমস্যা ও অভিযোগ জানাতে পারবেন। তাও সমস্যা হলে, WhatsApp -এর মাধ্যমে সরাসরি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম।
৬. এআই (AI) আসার পর একাধিক ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশনে ব্লগিং অটোমেটেড করা হচ্ছে। ছবি সহ একটি পুরো আর্টিকেল এআই লিখে দিচ্ছে। একটি ওয়েবসাইট বা একটি অ্যাপ্লিকেশন পুরোপুরি অটোমেটেড করা সম্ভব হচ্ছে। এমনকি টেকনিক্যাল টিমের অনুপস্থিতে এআই বট এসে আপনাকে প্রয়োজনীয় তথ্য সহ সমাধান পর্যন্ত বলে দিচ্ছে।
৭. ধরুন, আমি একটি বাংলা ওয়েবসাইট চালাই। আমার সব আর্টিকেল এমনকি পুরো ওয়েবসাইট বাংলা ভাষায় সাজানো। কিন্তু হঠাৎ ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, আরবী বা মান্দারিন ভাষার একজন লোক আমার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলো। কিন্তু তিনি তার নেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ অনুযায়ী সমস্ত আর্টিকেল পড়তে পারছেন। তিনি তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারছেন তার নিজ ভাষায়।
৮. ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশনের পাশে এখন বিশ্বস্ত এক বা একাধিক নিউজ পোর্টালের নিউজ দেখানো সম্ভব হচ্ছে। এছাড়াও ইউটিউব, ইনট্রাগ্রাম, টুইটার (X) এর ফিড দেখানোও সম্ভব হচ্ছে।
৯. ই-মেইল, এসএমএস, পুশ নোটিফিকেশন ব্যবস্থা এখন প্রায় অধিকাংশ ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশনে যুক্ত করা থাকে। সিকিউরিটির ক্ষেত্রে টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাও যুক্ত করা থাকে। এতে করে ঐ সাইট বা অ্যাপ্লিকেশন হ্যাক করা সহজ হয় না। কোন কোন ক্ষেত্রে ৩টি সিকিউরিটি লেয়ার যুক্ত করা থাকে।
১০. ধরুন, আপনার সাইটের স্টোরেজ লিমিট সীমিত। আপনি চাইছেন, ব্যবহারকারী তার ছবি, ভিডিও যখন আপলোড করবেন তখন আপনার প্রধান সার্ভারে তা আপলোড না হয়ে অন্য কোনো সার্ভার তার ভার বইবে; সেটাও কিন্তু সম্ভব হয়ে গেছে।
REST API বা GraphQL সহ পুরো API দুনিয়ার কাহিনী না-হয় বাদই থাক। এসব নিয়ে দিস্তার পর দিস্তা লেখার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আপনি জানেন কি? এতসব করার পর একজন ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপার তার কাজের মাত্র ৪০% সম্পূর্ণ করলেন। বাকি ৬০% এবং ক্ষেত্রবিশেষে ৮০% শতাংশ কাজ বাকি থেকেই গেল।
এখন একজন ক্লায়েন্ট এসে বলছেন, এই সমস্ত API আমি ক্রয় করতে পারবো না, আমাকে সমস্ত API ফ্রি-তে দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে ফ্রি-তে দেবেন? কারণ এসব API ক্রয় করতে হয় একাধিক কোম্পানি থেকে। আর ফ্রি API -এর লিমিট বা সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানেন কি? বা, যদি এতগুলো API ক্রয় করেই দিতে হয় তাহলে কত মূল্য পড়বে?
এখানেই ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপারদের আসল খেলা। আপনাকে উপরোক্ত সমস্ত API তিনি ফ্রিতেই আপনাকে দিতে সক্ষম। হ্যাঁ, ফ্রি API এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে কিন্তু যেটুকু পরিষেবা আপনার দরকার তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফ্রি API দিয়েই হয়ে যায়। এছাড়াও তিনি সমস্ত API খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে ইন্টেগ্রেট করে দেবেন।
হাস্যকর বিষয় কি জানেন? আপনি ওয়ার্ডপ্রেস ক্যামনে ইন্সটল দিতে হয় সেটাই জানেন না! আপনি এসেছেন ফুল-স্ট্যাক ডেভেলপারদের সম্পর্কে মতামত জানাতে, তাদেরকে ক্রিটিসাইজ করতে, তাদেরকে ছোট করতে। এটাই হচ্ছে গর্বিত মূর্খ মানুষদের সহজাত স্বভাব।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0