আপনি কি স্বাধীন, নাকি একটি অ্যালগরিদমের তৈরি স্ক্রিপ্ট?

আমাদের দৈনন্দিন আচরণ কি সত্যিই আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত? নাকি আমরা 'প্রেডিক্টেবল সোশ্যাল স্ক্রিপ্ট' এবং ডিজিটাল প্রোফাইলিংয়ের শিকার? ডার্ক সাইকোলজি এবং অনলাইন অ্যালগরিদম কীভাবে আমাদের ম্যানিপুলেট করছে এবং কীভাবে এর থেকে রক্ষা পাবেন, তা জানতে পড়ুন এই বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

মার্চ 6, 2026 - 15:34
মার্চ 6, 2026 - 15:35
 0  1
আপনি কি স্বাধীন, নাকি একটি অ্যালগরিদমের তৈরি স্ক্রিপ্ট?
আপনি কি স্বাধীন, নাকি একটি অ্যালগরিদমের তৈরি স্ক্রিপ্ট?

সতর্কতা: অনুগ্রহ করে ডার্ক সাইকোলজি তে আলোচিত বিষয়গুলো কারো প্রতি প্রয়োগ করবেন না। এতে করে উক্ত ব্যক্তি ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারেন এবং এজন্য আমি কোনো দায় নিতে রাজী নই। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনি নিজে সচেতন থাকুন এবং কাছের মানুষদেরকেও সচেতন রাখুন।

'প্রশ্ন' না করলে অজানা থাকে অনেককিছু কিন্তু 'প্রশ্ন' এক ধরণের হুমকিও বটে। 'প্রশ্ন' এক ধরণের হাতিয়ার। একটি রাষ্ট্র, একটি প্রতিষ্ঠান, একজন ব্যক্তি সবসময় 'প্রশ্ন' কে স্বাগত জানায় না। 'প্রশ্ন' আমাদেরকে সত্যর দিকে নিয়ে যায়। ‘প্রশ্ন’ আধিপত্যবিস্তারে সবচেয়ে বড় বাধা। 'প্রশ্ন' ভাবাতে বাধ্য করে, চিন্তায় নিমজ্জিত হতে বাধ্য করে। ফলে চিন্তাশীল ব্যক্তি বা সমাজ আরো বেশি দায়বদ্ধ, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সৃজনশীল হয়ে গড়ে ওঠে।

ডার্ক সাইকোলজিতে 'প্রশ্ন' ভয়ংকর; এই ক্যানভাসে 'প্রশ্ন' এক ধরণের হাতিয়ার। এমন কি হয়? যদি এমন কেউ থাকে যার সাথে কথা বলায় কমফোর্টেবল নন তাহলে আমার জন্য বিষয়টি বুঝাতে আরো সুবিধে হত।

সাধারণত এমন ব্যক্তি প্রশ্ন করেন বক্তার কাছে থেকে গোপন তথ্য, তার ভয়, ইনসিকিউরিটি সম্পর্কে বিশদ জানার জন্য। পরবর্তীতে তিনি এই সমস্ত কিছু তার টার্গেট কে ব্যবহার অথবা, ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ব্যবহার করতে পারেন। এমন হতে পারে, এই ব্যক্তি আপনার নিকটতম কেউ, সহকর্মী বা একজন বন্ধু৷ অনুগ্রহ করে নিজের অনুভূতি, কিছু নিয়ে কোন প্রকার ভয় বা নিজের কোনো গোপন তথ্য শেয়ার করবেন না।

কিছু প্রশ্ন এরকম আছে যে প্রশ্নগুলোতে প্রশ্নকর্তা জেনেশুনেই আপনাকে ছোট করেছেন। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক,

“তুমি এত সেন্সিটিভ কেন? মজাও নিতে পারো না?”

প্রথমে আপনাকে সেন্সিটিভ তকমা দিয়ে দিলো তারপর প্রশ্নের কেন্দ্র ঘুরালো। আবার ঐ জোকস্ এর মধ্যে এমন কিছু কথা বললো তাও মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে। জীবনে কি কখনো এমন কিছু ঘটেছে?

এবার আসি, র‍্যাপিড ফায়ার কোশ্চেন ইন ডার্ক সাইকোলজি তে। এখানে আমি বেশকিছু প্রশ্ন করছি, শুধুমাত্র পড়ে দেখুন আপনার কেমন অনুভব হয়,

১. আচ্ছা, তুমি তোমার মৃত্যুর তারিখ অথবা মৃত্যুর কারণ এই দুটির মধ্যে কোনটা জানতে চাইবে?

২. যদি তোমার বাবা-মায়ের মধ্যে একজনকে হত্যা করতে বাধ্য হও তবে তুমি কাকে হত্যা করবে?

৩. সেক্স করার সময় সবচেয়ে বাজে কি ধারণা মাথায় কাজ করে?

৪. তুমি কি কখনো মানুষের রক্তের স্বাদ গ্রহণ করেছে? কেমন লেগেছে?

৫. সিরিয়াল কিলার সম্পর্কে তো অনেক শুনেছো কিন্তু কার হত্যা করার স্টাইল সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর লেগেছে?

৬. কীভাবে আপনি মৃত্যুবরণ করতে চান? প্রচুর রক্তাক্ত হয়ে নাকি বিশাল আগুনের স্তুপে পুড়ে?

৭. যদি কোনো দ্বীপে একটি জাহাজ আটকে যায় যে জাহাজে তুমি সহ ১০০ জন যাত্রী আছে। আর ঐ দ্বীপে আপনার জন্য মাত্র দুটি উপায় থাকে,
(ক) মানুষের মাংস খাওয়া এবং বেঁচে থাকা
(খ) ক্ষুধার্ত হওয়া এবং মরে যাওয়া
তুমি কোনটি বেছে নেবে?

৮. যদি তোমার ভালোবাসার মানুষ একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায় তবে কি তুমি তাকে বাঁচানোর জন্য উক্ত হত্যাকাণ্ডের সব প্রমাণ মুছে ফেলবে? নাকি তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করবে?

৯. তুমি দিনে ক'বার মৃত্যু নিয়ে চিন্তা কোরো?

১০. তুমি কি কখনো হন্টেড (ভূতুড়ে) বাড়িতে থেকেছো? কেমন লেগেছে?

১১. যদি কেউ দরজা ভেঙ্গে তোমার বাড়িতে প্রবেশ করে তবে তুমি নিজেকে রক্ষার্থে কি করবে?

১২. ধরো, তুমি আত্মহত্যা করতে চাও। কেমন হবে যদি তুমি একটি রানিং বাস বা ট্রাকের সামনে লাফ দাও?

এই তালিকা অনেক দীর্ঘ করা যায়। এসব প্রতিটি প্রশ্নে আপনার মধ্যে ভয়, Vulnerability, Insecurity খুঁজে বেড়ানো হতে পারে। এসব হিউমার কে 'ডার্ক হিউমার' বলে যা 'ডার্ক সাইকোলজি' তে প্রেজেন্ট করার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

প্রথমত, এইসব প্রশ্ন এবজার্ড (অর্থহীন) কিন্তু যদি প্রশ্ন পড়েই অনুভূত হয় আপনি ভালো অনুভব করছেন না তাহলে ভাবুন প্রশ্নকর্তা এই সুযোগে আপনার থেকে কি কি তথ্য সরাসরি পেয়ে যেতে পারে। অনেকটা অনলাইন হ্যাকিং এর মত করে আপনার মনের সাইটে দূর্বলতা খুঁজে দেখা এবং ঐ দূর্বলদিক দিয়েই মনের সাইটে অনুপ্রবেশ করার মতন।

এই ধরণের প্রশ্নকর্তা টার্গেট অনুযায়ী বান্ডিল-বান্ডিল প্রশ্ন সেট করেন এবং টার্গেটের আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান, আত্মপ্রত্যয় ধূলোর সঙ্গে মিশে দিতে পারেন। এমনকি আপনাকে ‘Nihilistic' ব্যক্তিত্বে রুপান্তর পর্যন্ত করতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক কাছের বন্ধু আমাকে জিগ্যেস করে বসে,

“এমন কিছু তো করছিস না যা এই ডিপার্টমেন্টের নাম পর্যন্ত খারাপ করে?”

বন্ধুটি আমার ফেসবুক এবং ব্যক্তি বন্ধু তালিকায় এখনো আছে। কিন্তু একবার ভাবুন তো, আমি যদি খারাপ কিছু করেই ফেলি তা একান্তভাবেউ উক্ত ব্যক্তির দায়, পুরো ডিপার্টমেন্ট তার জন্য দায় কেন নেবে? বা ডিপার্টমেন্ট চলে কিছু ডিসিপ্লিনের মধ্যে দিয়ে এখন মাস্টার্স শেষে জীবনে ব্যর্থ হলে ডিপার্টমেন্ট সেই বার্ডেন কোনোক্রমেই গ্রহণ করবে না। কারণ আমাদের শিক্ষক যেটুকু পেরেছেন সেটুকু শেখানোর ও বুঝানোর চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু এখানে আমার আত্ববিশ্বাসে ঝামেলা এসেছিলো। মনে হতে শুরু হয়েছিলো যে, আমার এই প্রথাবিরুদ্ধ কাজ হয়তো ডিপার্টমেন্টের সুনাম নষ্ট করবে; যা বাস্তব চিত্রে কোনোক্রমেই হতে পারে না। একটি ডিসিপ্লিন এত মানুষকে মনে রাখতে এমনিতেও সক্ষম নন।

'প্রশ্ন' আপনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কে নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত করতে সক্ষম। আপনার অনুভূতি কে বাজে ভাবে বিগড়ে দিতেও সক্ষম। এবং আপনার পুরো ব্যক্তিত্বের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে অন্যের হাতে। কারণ এমন প্রশ্নকর্তা টার্গেট কে এমনভাবে পেচিয়ে রাখেন যে, এরা নিজের জীবনে নিজেই ভিকটিম হয়ে পড়েন; যা খুবই করুণ ঘটনা।

‘12th Fail' সিনেমায় মনোজ কুমার শর্মার হাত যখন তার প্রেমিকা ধরলো তখন তার বন্ধু খুব বাজেভাবে মনোজ কে অপমান করলো। বেশ কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো। বললো, “UPSC ক্লিয়ার করতে না পারলে এমন মেয়েরা কি আর পাশে থাকে?” খেলা ঠিক এখানেই।

মনোজের বন্ধু তার ডার্ক হিউমার কে এত সুন্দরভাবে ভালোদিকে প্রভাবিত করেছেন যা মনোজের প্রেমিকার ইগো কে ভয়ানক হার্ট করেছে। পুরো গল্পে মেয়েটি মনোজ কে নিয়ে যতটা না ভেবেছে তারচেয়ে বেশি ভেবেছে ঐ কতিপয় প্রশ্ন নিয়ে এবং বলতে বাধ্য হয়েছে যে, “তুমি UPSC তে না টিকলেও আমি তোমার সাথেই থাকবো।”

এখন ভাবুন, ঐ প্রশ্নগুলো যদি অন্যদিকে প্রভাবিত করা যেত তাহলে কি ভয়ংকর দশা ঘটতো মনোজের জীবনে! ওমন বন্ধু যেমন অনেক উপকারের তেমনি যদি ওরা চায় তাহলে আপনার জীবনে সামনে পা দেবার রাস্তায় ফুলস্টপ বসিয়ে দেবেন তাও মাত্র কতিপয় প্রশ্ন দিয়ে।

প্রশ্ন করুন, করতেও দিন। কিন্তু প্রশ্নটা নিয়ে একটু ‘Brainstorming’ করুন। জানতে বা অজান্তেই আমি-আপনি ফেঁসে যাচ্ছি না তো হাজারো প্রশ্নের ঝুট-ঝামেলার মধ্যে!

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম! (License notice - applies to this profile photo only: This photo is licensed under the Creative Commons Attribution-ShareAlike 4.0 International (CC BY-SA 4.0). License: https://creativecommons.org/licenses/by-sa/4.0/, Attribution: MD Mehedi Hasan, Source: https://oviyatri.com/profile/mrbikel)