অ্যালগরিদমিক ড্রাগ: সোশ্যাল মিডিয়ায় কীভাবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
সোশ্যাল মিডিয়া কি শুধু দুঃখী করছে? না, এটি আমাদের চিন্তাকে একটি সীমিত ‘লুপে’ বন্দি করছে। কীভাবে এই অ্যালগরিদমিক ড্রাগ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করছে এবং মুক্তির পথ কী?
সোশ্যাল মিডিয়া শুধু আমাদের দুঃখী মানুষে পরিণত করছে না। আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে একটি নির্দিষ্ট বাক্স বন্দি করছে। কিছুটা একটা বৃত্ত বা একটা লুপ এর মত। আমরা সবাই ঘুর্নায়মান একটি সীমিত বক্সের মধ্যে ঢুকে আছি। ঘুমুতে যাওয়া থেকে শুরু করে ঘুম থেকে ওঠা পর্যন্ত। মোটামুটি দিনের শুরুতেই নির্ধারণ হয়ে যায় যে, আজ আমরা সবাই কি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, লিখবো, একে-অন্যের সাথে ঝগড়া করবো অথবা, এক কথায়, ‘চিন্তা করবো’।
দেশ-বিদেশের কোথাও না কোথাও মন্দ কিছু ঘটছে। কোথাও দূর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, কোথাও দুই দল মারামারি লেগে নিহত-আহত হচ্ছে, কোথাও ধর্ষণ হচ্ছে, কোথাও রাজনৈতিক হিংসা-প্রতিহিংসায় মানুষ মরছে, কোথাও আন্দোলন হচ্ছে, কেউ কেউ ডাকাতি করে পুরো বাড়িঘর বা দোকান লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা নিয়মিত এই সব তথ্য নিজেদের খাওয়াচ্ছি। ভিউ বাড়ছে, লাইক বাড়ছে, শেয়ার বাড়ছে।
পরেরদিন, ঠিক একইভাবে শুরু হচ্ছে। নতুন ঘটনা নিয়ে, নতুন বিষয় নিয়ে। আমরা পুনরায় নতুন ঘটনা বা বিষয় নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছি। একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে আমাদের নিজেদের মধ্যেই। কিছু ঘটলেই কে কত বেশি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি তার প্রতিযোগিতা। কেউ আমার ধর্মীয় বিশ্বাস কে আঘাত করলে আমি তার ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত করতে মোটেও ভুলছি না।
সবাইকে আমার মত করে বা একইরকম ভাবে এই পৃথিবীকে দেখতে হবে। আর যতদিন সবাই সম্মত না হচ্ছি ততদিন এই প্রতিযোগিতা চলমান থাকবে। আর যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে সবাই কখনো বা কোনোদিন সম্মত হতে পারবো না সেহেতু এই বাক্স বন্দি জীবন থেকে আমাদের মুক্তিও মিলবে না।
আমি বলছি না যে, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কোনো কাজেই লাগে না। আমাদের কোনো তথ্য-ই দেয় না —বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। আমি আসলে স্পষ্টভাবে বলার চেষ্টা করছি যে, এতে আমাদের চিন্তাভাবনা একটি নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত জায়গায় চলে এসেছে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য।
আমরা যারা নিয়মিত এসব নেতিবাচক ঘটনার বা বিষয়ের সাক্ষী হচ্ছি আমাদের মন তত বেশি দুঃখী হয়ে পড়ছে। আমাদের চিন্তা করার প্যাটার্ন নেতিবাচক ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। যিনি নিয়মিত দূর্ঘটনার খবর দেখছেন, পড়ছেন তিনি একসময় হয়তো নিজেকে কখনো আর কোথাও নিরাপদ অনুভব করতে পারবেন না। তার মনের মধ্যে চলবে অস্থিরতা। ব্যক্তিত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ ‘স্থিরতা’ তিনি কীভাবে পাবেন?
আমি নিজেও সক্রিয় রাজনীতির মধ্যে কখনোই ছিলাম না। কিন্তু যখন থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে হচ্ছিলো তখন কোথাও না কোথাও কারো স্ব-পক্ষে এবং কারো বিপক্ষে লিখে ফেলতাম। প্রথম ধাপ অবশ্য আমি নিজেই নিয়েছিলাম কিন্তু পরের ধাপ আমি দেবো কি দেবো না সে বিষয়ে আমার আর নিয়ন্ত্রণ রইলো না।
মানে হলো, এই খেলার মধ্যে প্রবেশ করা যত সহজ বেড়িয়ে আসা ঠিক ততটাই কঠিন। বেশ উপভোগ্য। আজ হয়তো আমি কারো বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ তৈরি করতে পেরে খুব খুশি হচ্ছি কিন্তু ঠিক তার পরেরদিন আবার ঐ ব্যক্তি পাল্টা ন্যারেটিভ ও বিষয় নিয়ে হাজির হয়। যেন এক নতুন চ্যালেঞ্জ। তারপর আমাকে আবার ঐ বিষয় নিয়ে ঘাঁটতে মানে পড়াশোনা শুরু করতে হয়।
সত্যি করে বলতে এখানে কেউ জেতে না। আবার কেউ পুরোপুরি হেরেও যায় না। একটা লুপ। অনেকটা যেখানে শুরু করেছিলাম পুরো দিন হাঁটাহাঁটি করে পুনরায় সেখানেই ফিরে আসা। আমরা মূলত প্রোডাক্টিভ কিছুই করছি না। এসব শুকনো কথায় অন্তত কখনোই চিড়ে ভিজে না। রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা আবার এসব মনোযোগ দিয়ে দ্যাখে! হয়তো, ওরাও মুচকি মুচকি হাসে বা মজা নেয়…
আমার বন্ধু একদিন বললো, তুই আসলে কি লিখতে চাস? আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, আমি কিছুই তো বাদ দিচ্ছি না! কারণ আমার চোখে শুধু ধরা পড়ছিলো, “আরেহ্! আমি তো লিখছি আর লিখছি...”
কিন্তু না, আমি আসলে কাজের কিছুই লিখছিলাম না। এই যেমন ধরুন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমর্থনে লিখা, “ইলিশ মাছ রপ্তানির সাথে হীরার তুলনা”। কিন্তু আমি মন থেকে জানি, এইসব সাময়িক সময়ে আমি জিতেছি নামক ‘ডোপামিন’ এর খেলা।
আমি মনোবিজ্ঞান নিয়ে আরো লিখতে পারতাম। আরো জানতে পারতাম। কিন্তু যে নেশায় আমি মন দিয়েছিলাম ওটা হলো সোশ্যাল মিডিয়ার ‘অ্যালগরিদমিক’ ড্রাগ। আচ্ছা, এতসব লিখতে কিন্তু আমার অনেক কিছু জানতে বা পড়তে হয়েছে। আমি ঐ সময়গুলোতে চাকুরীর জন্য আরো পড়াশোনা করতে পারতাম। এমনকি ঐ সময়ে নিজে না পড়েও বাকিদের জন্য হোমওয়ার্ক করে দিলেও ওদের জীবন আরো সহজ হত।
আমার মেন্টাল ব্যান্ডউইথ অনেক যেত। ওটুকু সময়ে একটা নতুন ভাষা শেখা যায়। অথবা, এআই (AI) দিয়ে একটা পুরো ওয়েবসাইট তৈরি করা যায় বা একটা বাংলাদেশের মিনি এআই বট! কিন্তু না, আমি যা করি না (সক্রিয় রাজনীতি), আমি সে বিষয়ে দিস্তার পর দিস্তা লিখে যাচ্ছিলাম।
একটু দেরীতে আমার ঘুম ভাঙলেও আজ আমি কিন্তু তার ফল পাচ্ছি। আমার নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার এখন অনেক সময়। সর্বশেষ কারো ‘সিভি (CV)’ বানিয়ে দিতে চাই (আমি যা ভালো পারি)। এখন ঐ সময় আজও আমি লিখছি, কিন্তু পুরো ক্যানভাস-ই আলাদা। আর যেহেতু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার সময় বেশি পাচ্ছি সেহেতু বা খুব সম্ভবত আমি নতুন করে নিজের ওয়েবসাইট খুলেছি এমনকি এখন সেটাও বেশ গোছানো।
এমনকি আমি হয়তো শীঘ্রই আরো ভালো খবর আমার কাছের মানুষদের জানাতে পারবো। আমি সত্যিকার দুনিয়ায় নেমে দায়িত্ব নিচ্ছি। সাহস হচ্ছে কারণ নিজেকে নিয়ে হোমওয়ার্ক করছি বা করার সময় পাচ্ছি।
পরিশেষে, আমরা যে সোশ্যাল মিডিয়ার আছি সেটা আমাদের যোগাযোগ বা আমাদের কাজ দেখানোর একটা ভালো মার্কেটিং প্লেস। কিন্তু ভোক্তা হিসেবে আমাদের এখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আর খেয়াল রাখুন, যে, আপনি সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন। যদি উল্টো হয়, তাহলে বলবো, নিজের সময় নষ্ট করছেন।
দিনশেষে, আপনি আপনার জন্য কি করছেন? প্রশ্নটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0