দত্ত পরিবার | পর্ব ০৪: যে বাড়িতে কেউ থাকে না

চা-ওয়ালার দাবি, ১৯৭১ সালের পর দত্ত ভবনে কেউ থাকে না। কিন্তু ১৯৪৭, ১৯৫২ ও ১৯৭১ সালের তিনটি চিহ্ন হাসানকে নিয়ে যায় দত্ত পরিবারের গোপন ইতিহাসের দিকে।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৩
দত্ত পরিবার | পর্ব ০৪: যে বাড়িতে কেউ থাকে না
১৯৪৭, ১৯৫২ ও ১৯৭১-এর তিনটি চাপা ইতিহাসের সামনে ঝড়ের মধ্যেও স্থির থাকে স্নেহার হারিকেনের শিখা।

অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস

দত্ত পরিবার

পর্ব ০৪: যে বাড়িতে কেউ থাকে না

লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান

‘দত্ত পরিবার’ ধারাবাহিক প্রসঙ্গে

১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা ও পরিচয়ের সংগ্রাম এবং ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত অভিঘাতকে বহন করা একটি পরিবারের রহস্যময় উত্তরাধিকার। দত্ত ভবনের পুরোনো দেয়াল, মুছে দেওয়া নাম এবং একই মুখের পুনরাবৃত্তির মধ্যে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস।

ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্নেহার দিকে তাকিয়ে থাকি।

কিছুক্ষণ আগের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা তখনো মাথার ভেতর জীবন্ত। সাদা শাড়ি, নিষ্প্রাণ হাসি, কর্পূরের গন্ধ, অমানবিক চোখ, ধারালো দাঁত এবং কাঠের হাতলওয়ালা ছুরি।

আমি স্পষ্ট দেখেছি, কালচে তরলে আমার শরীর ভেসে যাচ্ছে। মনে হয়েছিল, জীবনে প্রথমবার কাউকে হত্যা করেছি।

অথচ এখন ঘরে কোনো দেহ নেই।
কোনো রক্ত নেই।
ছুরিটিও নেই।

শুধু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে স্নেহা দত্ত। তার মুখ স্বাভাবিক, চোখে পরিচিত সতর্কতা। আমাকে দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়ে।

“আপনি ঠিক আছেন তো? কার সঙ্গে একা একা কথা বলছিলেন?”

আমি তার দিকে স্থির চোখে তাকাই।

“একটু আগে তো তুমি এখানেই ছিলে।”

“আমি?”

“হ্যাঁ। তুমি এই ঘরে এসেছিলে।”

স্নেহার চোখ সরু হয়ে আসে।

“আমি সন্ধ্যায় আপনার ঘরে আসি না, মি. হাসান। আপনার ভুল হচ্ছে।”

“ভুল?”

নিজের হাত দুটো তার সামনে তুলে ধরি।

“তাহলে ওটা কার দেহ ছিল? আর আমার হাতে এই রক্ত এল কোথা থেকে?”

কথাটি বলেই নিজের হাতের দিকে তাকাই।

আঙুলের ফাঁকে কোনো রক্ত নেই। হাতের তালু পরিষ্কার। এমনকি ছুরি শক্ত করে ধরারও কোনো চিহ্ন নেই।

বুকের ভেতরটা খালি হয়ে আসে।

আমি ঘুরে বিছানার দিকে তাকাই।

সাদামাটা চাদরটি অক্ষত। কোথাও কালচে তরলের দাগ নেই। বালিশ নিজের জায়গায়। মেঝেতে কোনো ছুরি পড়ে নেই। অথচ কিছুক্ষণ আগেও এই ঘরটিকে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো দেখাচ্ছিল।

স্নেহা ধীরে ঘরে প্রবেশ করে।

“আপনি কি কিছু খেয়েছেন?”

“কী খেয়েছি মানে?”

“এমন কিছু, যেটা খেলে মানুষ বাস্তব আর স্বপ্নের পার্থক্য ভুলে যায়।”

“আমি স্বপ্ন দেখিনি।”

“কিন্তু এখানে কোনো দেহ নেই।”

“ছিল।”

“আপনার হাতে রক্তও নেই।”

“ছিল!”

নিজের কণ্ঠস্বর এত জোরে বেরিয়ে আসে যে আমিই চমকে উঠি।

স্নেহা আরেকটু কাছে আসে। তার দৃষ্টি আমার চোখ, কপাল ও গলার ওপর ঘুরে যায়। তারপর নিচু স্বরে বলে, “আপনি ভয় পেয়েছেন।”

“ভয় পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।”

“কী দেখেছেন?”

কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকি।

কীভাবে বলব, তারই মুখ ধারণ করা কোনো অজানা সত্তাকে আমি ছুরি চালিয়েছি? কীভাবে বোঝাব, তার পরিচিত মুখের ভেতর থেকে অন্য কিছু আমার দিকে তাকিয়েছিল?

আমি শুধু বলি, “তোমার মতো দেখতে কাউকে।”

স্নেহার মুখের স্বাভাবিকতা ক্ষণিকের জন্য বদলে যায়।

খুব সামান্য পরিবর্তন। অন্য সময় হলে হয়তো খেয়ালই করতাম না। কিন্তু এই মুহূর্তে তার প্রতিটি দৃষ্টি ও শ্বাস আমি পরীক্ষা করছি।

“আমার মতো?”

“হুবহু।”

“তারপর?”

“তারপর সে আর তোমার মতো ছিল না।”

স্নেহা কোনো প্রশ্ন করে না।

এই নীরবতাই আমাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে।

“তুমি অবাক হচ্ছ না কেন?”

“এই বাড়িতে দীর্ঘদিন থাকলে অবাক হওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।”

“সেটা উত্তর নয়।”

“সব সত্য উত্তর হয়ে আসে না।”

কথাটি স্মৃতি দত্তও বলেছিলেন।
হঠাৎ মনে হয়, এই পরিবারের সবাই একই অদৃশ্য পাণ্ডুলিপি থেকে সংলাপ মুখস্থ করে রেখেছে।
শুধু আমাকে সেই পাণ্ডুলিপি পড়তে দেওয়া হয়নি।

স্নেহা দরজার দিকে ফিরে তাকায়।

“আপনার একটু বাইরে যাওয়া দরকার। খোলা বাতাসে গেলে মাথা পরিষ্কার হতে পারে।”

“তুমি আমার সঙ্গে যাবে?”

“এখন নয়।”

“কেন?”

“আপনাকে প্রথমে একা বুঝতে হবে, আপনি কী দেখেছেন।”

“তুমি কি জানো আমি কী দেখেছি?”

স্নেহা দরজার বাইরে চলে যায়। যাওয়ার আগে একবার ঘুরে বলে, “আপনি যদি সত্যিই আমাকে দেখে থাকেন, তাহলে আমি সেটা ছিলাম না।”

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখি।

কথাটি সতর্কবার্তা, না স্বীকারোক্তি, বুঝতে পারি না।

যে বাড়িতে কেউ থাকে না

দত্ত ভবন থেকে কয়েক শ গজ দূরে রাস্তার পাশে ছোট একটি চায়ের দোকান আছে। বাঁশের খুঁটি, মরচে ধরা টিনের ছাউনি, সামনে দুটি লম্বা বেঞ্চ। সন্ধ্যার পর সাধারণত কয়েকজন মানুষ বসে গল্প করে। কিন্তু আজ দোকানটি প্রায় ফাঁকা।

হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে পৌঁছাই।

এক কাপ চা আর একটি সিগারেট জরুরি হয়ে পড়েছে। তার চেয়েও জরুরি, গত কয়েক মাসের ঘটনাগুলো শুরু থেকে মনে করা।

যদি পাগল হয়েই যাই, তাহলে অন্তত কোন দিন থেকে পাগলামি শুরু হয়েছে, সেটির একটা হিসাব থাকা দরকার।

“মামা, এক কাপ রং চা দিন। সঙ্গে একটা সিগারেট।”

দোকানি চুলার ওপর বসানো কেতলিতে পানি ঢালতে ঢালতে আমার দিকে তাকায়।

“দাদা, এমন ঘামছেন কেন? কী হয়েছে?”

“কিছু হয়নি।”

“কিছু না হলে মানুষ সন্ধ্যার সময় দৌড়ে এসে এমন হাঁপায় না।”

“শরীরচর্চা করছি।”

“সিগারেট খেয়ে?”

“আধুনিক শরীরচর্চা। এখনো গ্রামে পৌঁছায়নি।”

লোকটি হাসে না। চা বানাতে থাকে।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে প্রথম চুমুক দিই। তারপর বলি, “মিসেস দত্তকে চেনেন?”

লোকটির হাত থেমে যায়।

“পুরো নাম কী?”

“স্মৃতি দত্ত।”

সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

“আপনি কোথায় থাকেন, দাদা?”

“ওই দত্ত বাড়িতে।”

“কত দিন ধরে?”

“প্রায় ছয় মাস।”

চা-ওয়ালার চোখে অবিশ্বাস দেখি। তারপর সে দোকানের বাইরে তাকায়। যেন কেউ আমাদের কথা শুনছে কি না, নিশ্চিত হতে চাইছে।

“আপনার সঙ্গে কি কিছু ঘটেছে?”

“মেয়েলি ব্যাপার?”

“আমি তা বলিনি।”

“আপনার মুখ তা-ই বলছে।”

“আপনি স্মৃতি দত্তকে দেখেছেন?”

“প্রতিদিন দেখি। তিনি আমাকে থাকতে দিয়েছেন। খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ছোট ভাইয়ের মতো দেখাশোনা করেন।”

লোকটি ধীরে বেঞ্চের অন্য পাশে বসে।

“দাদা, আপনি ছয় মাস ওই বাড়িতে আছেন। আমার মনে হয়, বাড়িটা সম্পর্কে আপনার কিছু জানা উচিত।”

সিগারেট ধরাই।

“বলুন।”

“তবে শুনে রাগ করবেন না।”

“সিগারেট শেষ হওয়ার আগে রাগ করব না। তারপর পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেব।”

লোকটি গলা নিচু করে।

চা-ওয়ালা ধীরে বলে

“ওই বাড়িতে কেউ থাকে না।”

আমি ধোঁয়া ছাড়তে গিয়ে কাশতে শুরু করি।

“কী বললেন?”

“বহু বছর ধরে বাড়িটা পরিত্যক্ত।”

“আপনি সম্ভবত অন্য বাড়ির কথা বলছেন।”

“না, দাদা। বড় লোহার ফটক, সামনে পাথরের স্তম্ভ, ভেতরে পুরোনো দোতলা বাড়ি। পশ্চিম দিকে ভাঙা অংশ।”

“বাড়িটা ভাঙা নয়।”

“রাস্তা থেকে ভালো করে দেখা যায় না। গাছপালা ঢেকে রেখেছে।”

আমি কাপটি বেঞ্চে নামিয়ে রাখি।

“স্মৃতি দত্ত এবং তাঁর মেয়ে সেখানে থাকেন।”

চা-ওয়ালা নিচু স্বরে বলে, “আমি ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, একাত্তরের পর থেকে সেখানে কেউ থাকে না।”

“কার কাছ থেকে শুনেছেন?”

“আমার বাবার কাছ থেকে। এই দোকান আগে তিনিই চালাতেন। তাঁর আগেও এই এলাকার মানুষ একই কথা বলত।”

আমি চুপ করে থাকি।

লোকটি বলতে থাকে, “তবে দত্ত বাড়ির ইতিহাস একাত্তরে শুরু হয়নি। দেশভাগের সময় থেকেই ওই পরিবার নিয়ে নানা কথা আছে।”

“কী কথা?”

“সাতচল্লিশে পরিবারের বড় একটি অংশ কলকাতায় চলে গিয়েছিল। যারা থেকে যায়, তারা বাড়ির দুই পাশ বন্ধ করে দেয়। পশ্চিমের অংশে নাকি কলকাতায় চলে যাওয়া মানুষদের জিনিস রাখা ছিল।”

সংরক্ষণকক্ষের দুটি ট্রাঙ্ক মনে পড়ে।

কলিকাতা, ১৯৪৭

পূর্ববঙ্গ

আমি জিজ্ঞেস করি, “তারপর?”

“দেশভাগের পরও বাড়ির দুই পাশের মানুষের যোগাযোগ নাকি থামেনি। চিঠি যেত, মানুষ আসত। তবে নিজেদের নাম প্রকাশ করত না।”

“কেন?”

“সে সময় মানুষ নিজের নামের চেয়েও পরিচয়ের জন্য বেশি ভয় পেত।”

চা-ওয়ালা চুলার আগুনের দিকে তাকায়।

“বায়ান্নর সময় আবার বাড়িটির নাম সামনে আসে।”

আমার আঙুলে ধরা সিগারেট স্থির হয়ে যায়।

“১৯৫২?”

“হ্যাঁ। আমার বাবা তখন ছোট। তাঁর বড় ভাই ফরিদপুরে পড়তেন। ভাষার দাবিতে সভা, মিছিল আর কাগজপত্র নিয়ে এলাকায় এলাকায় খবর আসত। বাবা বলতেন, দত্ত বাড়ির পশ্চিমের ঘরে কয়েক রাত কিছু তরুণ আশ্রয় নিয়েছিল।”

“ভাষা আন্দোলনের লোক?”

“লোকমুখে তা-ই শোনা যায়। কেউ বলে ছাত্র, কেউ বলে সংবাদ বহনকারী। কেউ বলে শুধু কয়েকটি কাগজ আর হাতে লেখা পোস্টার রাখা হয়েছিল।”

“কী লেখা ছিল পোস্টারে?”

“সেটা বাবা স্পষ্ট করে বলেননি। শুধু বলতেন, সেখানে বাংলা অক্ষর ছিল। আর বাড়ির ভেতরে এমন একজন ছিলেন, যিনি বলেছিলেন, দেশ ভাগ করে মানুষকে আলাদা করা গেছে, কিন্তু মানুষের মুখের ভাষা ভাগ করা যায়নি।”

“দেশ ভাগ করে মানুষকে আলাদা করা গেছে,
কিন্তু মানুষের মুখের ভাষা ভাগ করা যায়নি।”

কথাটি মাথার ভেতর প্রতিধ্বনি তোলে।

১৯৪৭-এ দেশ ভাগ।

১৯৫২-তে ভাষার দাবি।

১৯৭১-এ যুদ্ধ।

একই বাড়ির দেয়ালে তিনটি সময় এসে যেন একে অন্যের ওপর ছায়া ফেলছে।

চা-ওয়ালা বলে, “সেই সময় থেকে নাকি পশ্চিমঘর নিয়ে ভয় শুরু হয়।”

“ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে পশ্চিমঘরের সম্পর্ক কী?”

“আমি জানি না। তবে বাবার কাছে শুনেছি, বায়ান্নর ফেব্রুয়ারির এক রাতে ঘরের ভেতর থেকে অনেক মানুষের কণ্ঠ শোনা গিয়েছিল। সবাই একসঙ্গে বাংলা ভাষায় কিছু বলছিল। দরজা খুলে সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।”

“লোককথা।”

“হতে পারে।”

“তারপর?”

“একাত্তরে বাড়ির কর্তা আশপাশের কয়েকজন প্রতিরোধযোদ্ধাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। পরে খবরটি শত্রুপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়।”

“কে খবর দেয়?”

“কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। কেউ বলে বাড়ির কর্মচারী। কেউ বলে পরিবারেরই একজন। আবার কেউ বলে সম্পত্তির লোভে বাইরের কোনো লোক।”

“স্মৃতি দত্ত?”

চা-ওয়ালা কিছুক্ষণ চুপ থাকে।

“লোকমুখে শোনা যায়, স্মৃতি দত্ত ও তাঁর স্বামীও সেদিনের পর আর ফিরে আসেননি।”

“আর স্নেহা?”

লোকটি আমার দিকে তাকায়, কিন্তু উত্তর দিতে চায় না।

“বলুন।”

“তাঁর পরিণতি নিয়ে অন্ধকার কিছু গল্প আছে। কোনটি সত্য, বলতে পারব না। যুদ্ধের সময় ওই পরিবারের ওপর নির্মমতা নেমে এসেছিল, এটুকু বহুজনই বলে। তবে কে বেঁচেছিলেন, কে নিখোঁজ হয়েছিলেন এবং পরে কার দেহ পাওয়া গিয়েছিল, সেই বয়ান একেক মানুষের কাছে একেক রকম।”

আমি হেসে ফেলি।

হাসিটা নিজের কানেই অস্বাভাবিক শোনায়।

“তাহলে গত ছয় মাস ধরে আমি কার সঙ্গে কথা বলছি?”

“সেই কারণেই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, দাদা। আপনি ঠিক কী দেখেছেন?”

“মানুষ দেখেছি। খাবার খেয়েছি। ঘরে থেকেছি। স্নেহার হাতে কফি খেয়েছি। স্মৃতি দত্তের সঙ্গে কথা বলেছি।”

“বাড়ির অন্য কাউকে পরিষ্কারভাবে দেখেছেন?”

প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যাই।

প্রথম রাতে একজন গাড়িচালক ছিল। দরজা খুলে দেওয়া একজন মধ্যবয়সী মানুষও ছিল। মাঝে মাঝে খাবার ঘরে পাওয়া যায়। কাপড় ধোয়া অবস্থায় ফিরে আসে।

কিন্তু গত ছয় মাসে কাকে পরিষ্কারভাবে দেখেছি?

স্মৃতি।

স্নেহা।

আর কাউকে?

চা-ওয়ালা আমার নীরবতা লক্ষ করে।

“দাদা, আমি বলছি না আপনি মিথ্যা বলছেন। আবার বাবার কাছ থেকে শোনা কথাও নিজের চোখে দেখিনি। তবে ওই বাড়ি নিয়ে অনেক গল্প আছে।”

“কী ধরনের গল্প?”

“রাতে আলো জ্বলে। জানালায় মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। ভেতর থেকে ঘড়ির শব্দ আসে। কখনো কারও নাম ধরে ডাকে।”

সিগারেটটি আঙুলের মধ্যে স্থির হয়ে যায়।

“নাম ধরে ডাকে?”

“হ্যাঁ। তবে সবাই বলে, ডাক শুনে উত্তর দেওয়া যাবে না।”

স্নেহার সতর্কবার্তা মনে পড়ে।

অন্ধকার থেকে কেউ আমাকে নাম ধরে ডাকলে সেটি স্নেহা নয়।

আমি দ্বিতীয় একটি সিগারেট চাই।

চা-ওয়ালা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলে, “আমার কথা বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। দিনের আলোয় গ্রামের বয়স্কদের জিজ্ঞেস করতে পারেন। কারও কথা কারও সঙ্গে পুরো মিলবে না। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত।”

“কোন বিষয়ে?”

“ওই বাড়িতে যারা একবার ঢোকে,
তারা বাড়িটাকে ছেড়ে এলেও বাড়িটি তাদের ছাড়ে না।”

যাকে দোকানি দেখতে পায় না

নতুন চায়ের কাপ সামনে আসে।

কাপটি হাতে নেওয়ার আগেই টের পাই, বেঞ্চের অন্য পাশে কেউ বসেছে।

ঘুরে তাকাই।

স্নেহা দত্ত।

তার হাতে পুরোনো একটি হারিকেন। হারিকেনের হলুদ আলোয় তার মুখের এক পাশ উজ্জ্বল, অন্য পাশ ছায়ায় ঢাকা।

কখন এসে বসেছে, টের পাইনি।

“অনেক হয়েছে,” সে বলে। “এসব বাড়িতে বসেও করা যায়।”

“কোনগুলো? চা, সিগারেট, না নিজের মানসিক সুস্থতা নিয়ে সন্দেহ?”

“সবগুলোই।”

“চা-ওয়ালা বলছে, দত্ত বাড়িতে কেউ থাকে না।”

স্নেহা চা-ওয়ালার দিকে তাকায় না।

“মানুষ নিজের অজানা জায়গা গল্প দিয়ে পূরণ করে।”

“সে বলছে, তোমরা বহু বছর আগে মারা গেছ।”

“আর আপনি বিশ্বাস করেছেন?”

“আমি এখন নিজের চোখকেও পুরোপুরি বিশ্বাস করি না।”

“তাহলে অপরিচিত মানুষের গল্প এত সহজে বিশ্বাস করছেন কেন?”

“সে ১৯৪৭, ১৯৫২ ও ১৯৭১, তিনটি সময়ের কথা বলেছে।”

এই প্রথম স্নেহার চোখে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখি।

“বায়ান্নর কথা কী বলেছে?”

“পশ্চিমঘরে নাকি কিছু তরুণ আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলা ভাষার দাবির কাগজ রাখা হয়েছিল।”

স্নেহা চুপ করে যায়।

“তুমি জানো?”

“সব কথা রাস্তার দোকানে বলা যায় না।”

“বাড়িতে গিয়ে বলবে?”

“আপনি শোনার মতো অবস্থায় থাকলে।”

আমি চা-ওয়ালার দিকে তাকিয়ে জোরে বলি, “মামা, আরেকটি কাপ দিন। আমার সঙ্গে যিনি এসেছেন, তিনি চা খাবেন।”

চা-ওয়ালা কোনো উত্তর দেয় না।

স্নেহা কঠিন স্বরে বলে, “দত্ত পরিবারের নাম নিয়ে এখানে আলোচনা করবেন না।”

“নাম নষ্ট হওয়ার ভয়?”

“নাম শুধু পরিচয় নয়। কখনো নাম প্রমাণ। কখনো অপরাধ। কখনো এমন প্রতিশ্রুতি, যা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মৃত মানুষও শান্তি পায় না।”

“ষষ্ঠ প্রতিকৃতির নামও কি এ জন্য মুছে দেওয়া হয়েছিল?”

স্নেহা দ্রুত আমার দিকে তাকায়।

“মা আপনাকে প্রতিকৃতিটি দেখিয়েছেন?”

“হ্যাঁ।”

“কোনটি?”

“ষষ্ঠ।”

হারিকেনের স্থির আলোয় তার মুখ ফ্যাকাশে দেখায়।

“আপনি সেখানে কী দেখেছেন?”

“নিজেকে।”

স্নেহা উঠে দাঁড়ায়।

“চলুন।”

“আমার চায়ের বিল?”

“আমি দিয়ে দিয়েছি।”

“কখন?”

“আপনি যখন নিজের সঙ্গে তর্ক করছিলেন।”

আমি চা-ওয়ালার কাছে গিয়ে বিল দিতে চাইলে সে বলে, “দুটি চায়ের দাম।”

“তিনটি নয়?”

“আপনি তো দুই কাপ খেয়েছেন।”

আমি স্নেহার দিকে তাকাই। সে দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে জ্বলন্ত হারিকেন।

“আমার সঙ্গে যিনি ছিলেন?”

চা-ওয়ালা বাইরে তাকায়।

তার চোখ ঠিক স্নেহার ওপর দিয়ে অন্ধকার রাস্তার দিকে চলে যায়।

চা-ওয়ালা প্রশ্ন করে

“কে ছিলেন?”

শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়।

আমি টাকা দিয়ে বেরিয়ে আসি।

স্নেহা সামনে হাঁটছে। দ্রুত পা চালিয়ে তার পাশে যাই।

“চা-ওয়ালা তোমাকে দেখতে পায়নি।”

“আপনি তাকে জিজ্ঞেস করেছেন?”

“সে বলেছে, আমার সঙ্গে কেউ ছিল না।”

“মানুষ অনেক কিছুই দেখে না।”

“তুমি কি মানুষ?”

স্নেহা থেমে যায়।

হারিকেনের আলো তার মুখে দোলার কথা। কিন্তু আলোটি অস্বাভাবিক স্থির।

“এই প্রশ্নটা আপনাকে নিজেকেও করা উচিত।”

তিনটি সাল

দত্ত ভবনের পথে লোকবসতি দ্রুত কমে যায়। রাস্তার দুই পাশে শিরীষ, বট ও বাঁশঝাড়। দিনের বেলায় পথটি সাধারণ মনে হলেও সন্ধ্যার পর গাছগুলোর ছায়া পরস্পরের সঙ্গে মিশে লম্বা অন্ধকার দেয়াল তৈরি করে।

স্নেহার হাতে থাকা হারিকেন আমাদের সামনের অল্প পথ আলোকিত করছে।

“তুমি হারিকেন নিয়ে বের হয়েছিলে কেন?”

“বিদ্যুৎ চলে গেছে।”

“দত্ত ভবনে জেনারেটর নেই?”

“আছে।”

“তাহলে হারিকেন?”

স্নেহা উত্তর দেয় না।

বাড়ির ফটক সামনে দেখা যায়।

ঠিক তখন বাতাস ওঠে।

প্রথমে পাতার হালকা শব্দ। তারপর মুহূর্তের মধ্যে পুরো পথ ঝড়ের মধ্যে ডুবে যায়। বাঁশগুলো একে অন্যের সঙ্গে আঘাত করতে থাকে। গাছের ডাল নিচু হয়ে আসে। শুকনো পাতা ও ধুলো চোখেমুখে আছড়ে পড়ে।

আমি হাত দিয়ে চোখ ঢাকি।

“স্নেহা, দাঁড়াও!”

বাতাসের শব্দে নিজের কণ্ঠও শুনতে পাই না।

স্নেহা আমার কয়েক হাত সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার পোশাক ও চুল ঝড়ের তীব্রতায় পেছনে উড়ছে। চারপাশের গাছগুলো এমনভাবে দুলছে, যেন শিকড়সহ উঠে আসবে।

কিন্তু তার হাতে থাকা হারিকেনের আলো নিভছে না।

শুধু নিভছে না বললে ভুল হবে।

কেরোসিনে জ্বলা সলতেটি একবিন্দুও নড়ছে না।
শিখাটি সোজা হয়ে স্থির আছে।
যেন হারিকেনের কাচের ভেতরে ঝড় পৌঁছাতে পারছে না।

স্নেহা হারিকেনটি উঁচু করে ধরে।

হলুদ আলো ফটকের পাশের পাথরের স্তম্ভে পড়ে। শ্যাওলার নিচে এত দিন আড়ালে থাকা কয়েকটি খোদাই করা অক্ষর ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়।

আমি আরও কাছে যাই।

পাথরের গায়ে তিনটি সাল নিচে নিচে খোদাই করা।

১৯৪৭

১৯৫২

১৯৭১

প্রতিটি সালের মাঝখানে গভীর উল্লম্ব আঁচড়।
তিনটি ক্ষতকে যুক্ত করা একই রেখা।

“এগুলো আগে দেখিনি।”

স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

“সব লেখা দিনের আলোয় দেখা যায় না।”

“১৯৫২ কেন এখানে?”

“কারণ সাতচল্লিশে যারা বাড়ি ছাড়েনি, বায়ান্নতে তাদের আবার নিজের পরিচয়ের জন্য দাঁড়াতে হয়েছিল।”

“দত্ত পরিবারের কেউ ভাষা আন্দোলনে যুক্ত ছিল?”

“মানুষকে শুধু মিছিলে দেখলেই আন্দোলনে যুক্ত বলা যায় না। কেউ আশ্রয় দেয়। কেউ খবর বহন করে। কেউ কাগজ লুকিয়ে রাখে। কেউ আহত মানুষকে পানি দেয়। আবার কেউ ভয়ে দরজা বন্ধ করে রাখে।”

“এই বাড়ি কোন কাজটি করেছিল?”

স্নেহা হারিকেনের দিকে তাকায়।

“এক রাতে পশ্চিমঘরের দরজা খোলা হয়েছিল।”

“কার জন্য?”

“কয়েকটি নামের জন্য।”

“মানুষ নয়?”

“দেশভাগের পর অনেক মানুষের নাম বদলে গিয়েছিল। বায়ান্নতে তাদের ভাষা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে তারা বুঝেছিল, নাম আর ভাষা হারানোর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই।”

“আর ১৯৭১?”

স্নেহা পাথরের শেষ সালের ওপর হাত রাখে।

“একাত্তরে কেউ পুরোনো খাতা খুলেছিল।”

“কোন খাতা?”

“যেখানে লেখা ছিল,
সাতচল্লিশে কে চলে গিয়েছিল,
বায়ান্নতে কে ফিরে এসেছিল,
এবং কার নাম দুই পাশের কোনো নথিতেই রাখা হয়নি।”

ঝড়ের শব্দের মধ্যেও কথাগুলো পরিষ্কার শুনতে পাই।

“হাসান নামটি কি সেই খাতায় আছে?”

স্নেহা উত্তর দেয় না।

ঠিক তখন ঝড় থেমে যায়।

এক মুহূর্তে।

কোনো ধীরতা নেই। কোনো শেষ ঝাপটা নেই। যেন কেউ অদৃশ্য সুইচ বন্ধ করে দিয়েছে।

গাছগুলো স্থির।

পাতাগুলো স্থির।

চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা নামে যে হারিকেনের ভেতর কেরোসিন পুড়তে থাকার ক্ষীণ শব্দও শোনা যায়।

ফটকের অন্ধকার থেকে কারও কণ্ঠ ভেসে আসে।

খুব নিচু।

খুব পরিচিত।

“হাসান...”

আমি স্নেহার দিকে তাকাই।

সে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁট বন্ধ।

কণ্ঠটি আবার ডাকে।

“হাসান...”

স্নেহা হারিকেনটি আমার মুখের কাছে তুলে ধরে।

“আমি আপনাকে কী বলেছিলাম?”

অন্ধকার থেকে কেউ নাম ধরে ডাকলে সেটি স্নেহা নয়।

কণ্ঠটি এবার আরও কাছে আসে।

“হাসান, দরজাটা খোলো।”

আমি ফটকের দিকে তাকিয়ে থাকি।

স্নেহা আমার কবজি চেপে ধরে।

তার হাত ঠান্ডা।

স্বপ্নের প্রতিরূপটির হাতও এমন ঠান্ডা ছিল।

আমি দ্রুত তার বাঁ ভ্রুর দিকে তাকাই।

ছোট তিলটি আছে।

তবু হাত সরিয়ে নিই।

স্নেহার চোখে ক্ষণিকের আঘাত ফুটে ওঠে।

“আপনি এখন আমাকেও বিশ্বাস করছেন না?”

আমি উত্তর দিই না।

ফটকের ভেতর থেকে কাঠে তিনবার আঘাতের শব্দ আসে।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

হারিকেনের শিখাটি প্রথমবারের মতো কেঁপে ওঠে।

মাত্র একবার।

তারপর নিভে যায়।

অন্ধকারে আবার সেই কণ্ঠ শোনা যায়।

এবার আমাকে হাসান বলে ডাকে না।

একটি ভাঙা নাম উচ্চারণ করে।

শব্দটির শুরু ঝড়ের শেষ প্রতিধ্বনিতে হারিয়ে যায়। শুধু শেষাংশটি শুনতে পাই।

অন্ধকার থেকে কণ্ঠটি ডাকে

“...নাথ।”

চলবে...

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রচনা-সংক্রান্ত ঘোষণা

‘দত্ত পরিবার’ একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। এর চরিত্র, পরিবার, বাড়ি, পশ্চিমঘর এবং পারিবারিক রহস্য সৃজনশীল নির্মাণ। ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাস্তব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

দত্ত পরিবারের সদস্যদের ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধে নির্দিষ্ট ভূমিকা উপন্যাসের কাল্পনিক কাহিনি। চা-ওয়ালার বক্তব্য স্থানীয় জনশ্রুতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যাচাইকৃত ঐতিহাসিক দাবি হিসেবে নয়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!