Predestination চলচ্চিত্রে Causal Loop, Bootstrap Paradox ও পূর্বনির্ধারিত সময়ের রহস্য

Predestination Paradox কী? Predestination চলচ্চিত্রের কাহিনির মাধ্যমে Causal Loop, Bootstrap Paradox, সময়ের বন্ধ চক্র ও স্বাধীন ইচ্ছার রহস্য জানুন।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৬
Predestination চলচ্চিত্রে Causal Loop, Bootstrap Paradox ও পূর্বনির্ধারিত সময়ের রহস্য
একই মানুষের বিভিন্ন সময়ের সংস্করণ নিয়ে গঠিত বন্ধ সময়চক্রের প্রতীকী দৃশ্য

সময়, বিজ্ঞান ও কল্পকাহিনি

অতীতে ফিরে গিয়ে যদি আপনিই নিজের ভুলের কারণ হন?

Predestination চলচ্চিত্রে Causal Loop, Bootstrap Paradox ও পূর্বনির্ধারিত সময়ের রহস্য

স্পয়লার সতর্কবার্তা

এই নিবন্ধে ২০১৪ সালের বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর চলচ্চিত্র Predestination-এর প্রায় সম্পূর্ণ কাহিনি, চরিত্রগুলোর প্রকৃত পরিচয় এবং শেষের বড় রহস্যগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি না দেখে থাকলে নিবন্ধটি পড়ার আগে দেখে নেওয়া ভালো।

কেমন হতো, যদি আপনি অতীতে ফিরে যেতে পারতেন?

আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, কেমন হতো যদি অতীতে ফিরে গিয়ে নিজের কোনো ভুল সংশোধন করতে পারতেন? হয়তো এমন একটি সিদ্ধান্ত বদলে দিতেন, যার জন্য আজও অনুশোচনা হয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই তা ঠেকিয়ে দিতেন। হারিয়ে যাওয়া কাউকে রক্ষা করতেন। নিজের জীবনের এমন একটি মুহূর্তে ফিরে যেতেন, যেখান থেকে সবকিছু নতুনভাবে শুরু করা সম্ভব।

প্রশ্নটি প্রথমে আশার দরজা খুলে দেয়। সময় যদি পেছনে ফিরত, তাহলে ভুলও হয়তো সংশোধন করা যেত। কিন্তু সেই দরজার ওপাশে আরও অস্বস্তিকর একটি প্রশ্ন অপেক্ষা করছে।

অতীত বদলাতে গিয়ে যদি আপনিই সেই ঘটনার কারণ হয়ে ওঠেন?

যে দুর্ঘটনা ঠেকাতে অতীতে গিয়েছিলেন, আপনার উপস্থিতির কারণেই যদি সেই দুর্ঘটনা ঘটে? যে মানুষটির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়েছিলেন, অতীতে গিয়ে যদি দেখেন সেই মানুষটি আপনি নিজেই? যে শিশুকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন, সেই শিশুটিকে তার নির্ধারিত স্থানে রেখে আসার দায়িত্বও যদি আপনার হয়?

তখন সময় আর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সরলরেখা থাকে না। সময় একটি বন্ধ চক্রে পরিণত হয়। কারণ ফলকে সৃষ্টি করে, আবার ফল ফিরে গিয়ে কারণকে সৃষ্টি করে। কোনো ঘটনার শুরু কোথায় এবং শেষ কোথায়, তা আর সহজে আলাদা করা যায় না।

সময়-ভ্রমণভিত্তিক কল্পকাহিনিতে এমন ব্যবস্থাকে সাধারণত Causal Loop বলা হয়। একে ভুল করে অনেক সময় Casual Loop লেখা হয়। কিন্তু casual অর্থ অনানুষ্ঠানিক বা আকস্মিক ধরনের কিছু। এখানে সঠিক শব্দটি causal, যার অর্থ কারণ ও ফলের সম্পর্ক।

Predestination Paradox আসলে কী?

আমরা সাধারণত সময়কে একটি সরলরেখার মতো কল্পনা করি। অতীত ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। বর্তমান এখন ঘটছে। ভবিষ্যৎ এখনো ঘটেনি। কারণ আগে আসে, ফল পরে দেখা দেয়।

কিন্তু Predestination Paradox-এ একজন সময়-ভ্রমণকারী অতীতে গিয়ে কোনো ঘটনা পরিবর্তন বা প্রতিরোধ করতে চান। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, তাঁর সেই প্রচেষ্টাই ঘটনাটি ঘটার প্রয়োজনীয় কারণ হয়ে উঠেছে। তিনি ইতিহাস বদলাননি। তিনি আগে থেকেই ঘটে থাকা ইতিহাসকে পূর্ণ করেছেন।

Predestination Paradox

সময়-ভ্রমণকারী অতীতের কোনো ঘটনা পরিবর্তন বা প্রতিরোধ করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই ঘটনার কারণ হয়ে ওঠেন। ফলে ইতিহাস পরিবর্তিত না হয়ে একটি আত্মসংগত বন্ধ চক্র তৈরি করে।

ধরুন, ভবিষ্যতে আপনি একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস পড়লেন। আগুন কীভাবে লেগেছিল, তা কেউ জানে না। আপনি সময়যন্ত্রে অতীতে গিয়ে আগুনটি ঠেকানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাড়াহুড়োর মধ্যে আপনার হাত থেকে একটি জ্বলন্ত বস্তু পড়ে গেল। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হলো।

আপনি যে আগুন ঠেকাতে অতীতে গিয়েছিলেন, সেই আগুনের কারণ আপনিই।

আপনার ভবিষ্যতের জ্ঞান আপনাকে অতীতে নিয়ে গেছে। অতীতে আপনার কাজ আগুনের জন্ম দিয়েছে। সেই আগুনের ইতিহাস পড়ে ভবিষ্যতের আপনি আবার অতীতে গেছেন। এর কোনো আলাদা সূচনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ ও ফল পরস্পরকে সৃষ্টি করে চলেছে।

Causal Loop, Bootstrap Paradox ও পূর্বনির্ধারণ

একটি Causal Loop-এ কোনো ঘটনা, মানুষ, বস্তু বা তথ্য শেষ পর্যন্ত নিজেরই কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতের ঘটনা অতীতকে প্রভাবিত করে, আবার সেই অতীত একই ভবিষ্যৎ তৈরি করে। ফলে ঘটনাটির প্রথম উৎস নির্ধারণ করা কঠিন হয়।

Concept মূল বৈশিষ্ট্য কেন্দ্রীয় প্রশ্ন
Predestination Paradox ঘটনা ঠেকাতে গিয়ে সময়-ভ্রমণকারী ঘটনাটিই ঘটান অতীত কি পরিবর্তনযোগ্য?
Causal Loop ভবিষ্যৎ অতীতের এবং অতীত ভবিষ্যতের কারণ প্রথম কারণ কোথায়?
Bootstrap Paradox মানুষ, বস্তু বা তথ্যের স্বাধীন প্রথম উৎস নেই সেটি প্রথম তৈরি করল কে?

চলচ্চিত্রটির পরিচয়

Predestination একটি অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর thriller। চলচ্চিত্রটি লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন মাইকেল ও পিটার স্পিরিগ। এতে অভিনয় করেছেন ইথান হক, সারাহ স্নুক ও নোয়া টেলর। চলচ্চিত্রটি রবার্ট এ. হাইনলাইনের ১৯৫৯ সালের ছোটগল্প “—All You Zombies—”-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।

চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে আছেন একজন Temporal Agent। তিনি এমন একটি সংস্থার হয়ে কাজ করেন, যারা অতীতের বিভিন্ন সময়ে গিয়ে বড় অপরাধ ও বিপর্যয় ঠেকানোর চেষ্টা করে।

তাঁর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা একজন রহস্যময় বোমা হামলাকারীকে আটকাতে না পারা। সংবাদমাধ্যম সেই হামলাকারীকে Fizzle Bomber নামে চেনে। এই ব্যক্তিকে ধরাই এজেন্টের শেষ এবং সবচেয়ে ব্যক্তিগত দায়িত্বে পরিণত হয়।

প্রথম দৃশ্য: বিস্ফোরণ, দগ্ধ মুখ এবং রহস্যময় উদ্ধারকারী

চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখা যায়, একজন মানুষ একটি বোমা নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। তাঁর মুখ স্পষ্ট দেখা যায় না। তিনি দ্রুততার সঙ্গে বোমাটির যন্ত্রাংশ খুলছেন।

ঠিক তখনই Fizzle Bomber তাঁকে আক্রমণ করে। দুজনের মধ্যে লড়াই শুরু হয়। গুলির শব্দ, ধস্তাধস্তি ও সময়ক্ষেপণের মধ্যে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ শেষ হয়ে আসে। শেষ মুহূর্তে এজেন্ট বোমাটির কাছে ফিরে গেলেও বিস্ফোরণ ঠেকাতে পারেন না।

বোমাটি তাঁর মুখের সামনে বিস্ফোরিত হয়।

দগ্ধ অবস্থায় তিনি মেঝেতে পড়ে যান। তাঁর মুখ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশে পড়ে থাকা বেহালার বাক্সের মতো সময়-ভ্রমণ যন্ত্রটি ধরার চেষ্টা করেন, কিন্তু শারীরিক অবস্থার কারণে সেটির কাছে পৌঁছাতে পারেন না।

ঠিক তখন সেখানে তৃতীয় একজন মানুষ উপস্থিত হন। রহস্যময় ব্যক্তি সময়-ভ্রমণ যন্ত্রটি দগ্ধ এজেন্টের কাছে এগিয়ে দেন। এজেন্ট সেটি সক্রিয় করে ১৯৯২ সালে তাঁর সংস্থার সদর দপ্তরে ফিরে যান।

সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর নতুন মুখ তৈরি করা হয়। বিস্ফোরণে কণ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁর কণ্ঠস্বরও বদলে যায়।

এই দৃশ্যটি মনে রাখুন

কে তাঁকে সময়যন্ত্রটি এগিয়ে দিয়েছিল? রহস্যময় সহায়তাকারী কীভাবে জানল, আহত মানুষটির কাছে যন্ত্রটি পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চলচ্চিত্রের অনেক পরে পাওয়া যায়। তখন বোঝা যায়, দৃশ্যে উপস্থিত মানুষগুলো অপরিচিত নয়। তারা একই জীবনের ভিন্ন বয়স ও ভিন্ন সময়ের সংস্করণ।

চলচ্চিত্রের কাহিনি অনুযায়ী, Fizzle Bomber-এর বড় হামলাটি ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে নিউইয়র্কে ঘটে এবং তাতে ১১ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়। এটি চলচ্চিত্রের কাল্পনিক ঘটনা, বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনা নয়।

পরিচয় পুনর্গঠনের পর এজেন্টকে জানানো হয়, তাঁর সামনে আর মাত্র একটি দায়িত্ব আছে। এরপর তাঁকে অবসর নিতে হবে। সেই শেষ দায়িত্বের জন্য তিনি ১৯৭০ সালের নিউইয়র্কে ফিরে যান।

১৯৭০ সালের বার এবং রহস্যময় জন

১৯৭০ সালে গিয়ে এজেন্ট একটি বারে বারকিপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁকে দেখে মনে হয়, তিনি শুধু পানীয় পরিবেশন করছেন না। তিনি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন।

তিনি ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। দরজার দিকে নজর রাখছেন। যেন আগে থেকেই জানেন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট একজন মানুষ বারে প্রবেশ করবেন।

একসময় জন নামের একজন ব্যক্তি বারে আসেন। জন একজন বিষণ্ন ও ক্ষুব্ধ লেখক। তিনি The Unmarried Mother ছদ্মনামে বিভিন্ন সাময়িকীতে স্বীকারোক্তিমূলক গল্প লেখেন।

একজন পুরুষ হয়েও নারীদের অভিজ্ঞতা এত নিখুঁতভাবে কীভাবে লিখতে পারেন, এ নিয়ে বারকিপার তাঁর সঙ্গে কথা শুরু করেন। কথার একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে বাজি হয়। জন দাবি করেন, তিনি নিজের জীবনের এমন গল্প বলতে পারেন, যা বারকিপার আগে কখনো শোনেননি।

এরপর জন নিজের অতীত বলতে শুরু করেন। আর সেই অতীতই চলচ্চিত্রের সময়চক্র খুলে দেওয়ার প্রথম বড় দরজা।

অনাথাশ্রমের শিশু জেন

জনের জীবনের শুরু জন হিসেবে নয়। জন্মের পর তাঁকে একটি অনাথাশ্রমের সামনে রেখে যাওয়া হয়েছিল। সেই শিশুকে জেন নাম দেওয়া হয়।

কে শিশুটিকে সেখানে রেখে গিয়েছিল, কেউ জানত না। জেন নিজের মা-বাবার পরিচয় জানতেন না। তাঁর কোনো পারিবারিক ইতিহাস ছিল না। তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তাঁর জন্মের আগে কী ঘটেছিল এবং কেন তাঁকে পরিত্যাগ করা হয়েছিল, এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না।

অনাথাশ্রমে বড় হতে হতে জেন বুঝতে পারেন, নিজের বয়সী অন্যদের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য আছে। তিনি শারীরিকভাবে সক্ষম, আত্মরক্ষায় দক্ষ এবং পড়াশোনায়ও ভালো। কিন্তু সামাজিকভাবে সহজে কারও সঙ্গে মিশতে পারেন না।

জেন দেখতে আকর্ষণীয় হলেও তাঁকে কেউ দত্তক নেয় না। তিনি এমন এক শৈশব কাটান, যেখানে তাঁকে ঘিরে কোনো পারিবারিক স্মৃতি নেই এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নিশ্চিত প্রতিশ্রুতিও নেই।

এই উৎসহীনতা শুধু চরিত্রটির আবেগগত সমস্যা নয়। পরে বোঝা যায়, এটিই চলচ্চিত্রের Bootstrap Paradox-এর কেন্দ্র। জেনের কোনো পরিচিত পূর্বপুরুষ নেই, কারণ জেনের জন্ম এমন একটি সময়চক্রের মধ্যে, যেখানে জেনের নিজেরই ভিন্ন সংস্করণগুলো জেনের জন্মের কারণ।

মি. রবার্টসন ও Space Corps

জেন বড় হওয়ার পর মি. রবার্টসন নামের এক ব্যক্তির নজরে পড়েন। রবার্টসন তাঁকে Space Corps নামের একটি কর্মসূচিতে নিয়ে যান।

এই কর্মসূচিতে শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম তরুণীদের নির্বাচিত করা হচ্ছিল। জেন বিভিন্ন শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় ভালো করেন। অনেক ক্ষেত্রেই অন্য প্রার্থীদের তুলনায় এগিয়ে থাকেন।

কিন্তু তাঁর স্বতন্ত্রতা তাঁকে অন্যদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে না। একপর্যায়ে অন্য এক প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ ঘটে। দৃশ্যত সেই ঘটনাকে কারণ দেখিয়ে তাঁকে কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়।

আসল কারণ শুধু মারামারি ছিল না। চিকিৎসা পরীক্ষায় জেনের জন্মগত দেহবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, যা তখন তাঁকে জানানো হয়নি। রবার্টসন ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা তাঁর সম্পর্কে এমন কিছু জানতেন, যা জেন নিজে জানতেন না।

এই বাদ পড়া জেনকে হতাশ করে। তাঁর মনে হয়েছিল, জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের যোগ্যতার উপযুক্ত একটি জায়গা পেয়েছেন। কিন্তু সেটিও তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হলো। তারপরও জেন পুরোপুরি হাল ছাড়েন না। নিজের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যান।

জেনের রহস্যময় প্রেমিক

এই সময় জেনের জীবনে একজন অপরিচিত ব্যক্তি প্রবেশ করেন। মানুষটি জেনের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেন, যেভাবে আগে কেউ বলেনি। জেন নিজের জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন অবহেলা, প্রতিযোগিতা ও প্রতিরক্ষার মধ্যে। সেই কারণে অপরিচিত ব্যক্তির মনোযোগ ও ভদ্রতা তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জেন প্রেমে পড়েন। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, উৎসহীন ও একাকী জীবনের পর হয়তো এমন কাউকে পেয়েছেন, যিনি তাঁকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারেন।

কিন্তু কিছু সময় পর সেই ব্যক্তি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই চলে যান। জেন একা হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা।

জেন হাসপাতালে একটি শিশুর জন্ম দেন। চিকিৎসার সময় তাঁর জন্মগত দেহবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এমন তথ্য প্রকাশ পায়, যা তাঁর নিজের কাছেও অজানা ছিল। চলচ্চিত্রে দেখানো হয়, পরবর্তী চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর তিনি জন হিসেবে জীবন শুরু করেন।

চলচ্চিত্রের এই অংশটি একটি বিশেষ কল্পকাহিনিনির্ভর চরিত্র নির্মাণ। এটি বাস্তব চিকিৎসাবিজ্ঞান কিংবা সব আন্তঃলিঙ্গ মানুষের অভিজ্ঞতার সাধারণ বর্ণনা নয়।

চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর জেন ধীরে ধীরে জন হিসেবে জীবন শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ও বাহ্যিক পরিচয় বদলে যায়। জেন নামটি পেছনে রেখে তিনি জন নামে পরিচিত হন।

কিন্তু এই বিরাট পরিবর্তনই তাঁর একমাত্র ক্ষতি ছিল না। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় কেউ তাঁর নবজাতক শিশুটিকে চুরি করে নিয়ে যায়।

তিনি জানেন না প্রেমিক কেন চলে গিয়েছিলেন। জানেন না সন্তানকে কে চুরি করেছে। জানেন না অনাথাশ্রমের সামনে তাঁকে কে রেখে গিয়েছিল। জানেন না রবার্টসন তাঁর সম্পর্কে আগে থেকেই কতটা জানতেন।

কিন্তু বারকিপার এসবের অনেক কিছুই জানেন। কারণ বারকিপার এই গল্পটি প্রথমবার শুনছেন না। তিনি জনের ভবিষ্যৎ জানেন। আরও গভীরভাবে বললে, তিনি নিজের অতীত শুনছেন।

প্রতিশোধের প্রস্তাব

জন বারকিপারকে জানান, যদি কোনোদিন সেই ব্যক্তিকে খুঁজে পান যিনি জেনকে ভালোবাসার পর পরিত্যাগ করেছিলেন, তাহলে তাঁকে হত্যা করবেন।

বারকিপার তখন এমন একটি প্রস্তাব দেন, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে দেওয়া অসম্ভব। যদি জনকে সত্যিই সেই মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে তিনি কী করবেন?

এরপর বারকিপার নিজের সময়-ভ্রমণ যন্ত্র দেখান। জনকে নিয়ে অতীতে যান, যখন জেন এখনো জন হয়ে ওঠেননি এবং রহস্যময় প্রেমিকের সঙ্গে জেনের দেখা হয়নি।

নিজের অতীতের প্রেমে

জন অতীতে ফিরে জেনকে দেখেন। সেই জেন তাঁর নিজেরই অতীত সংস্করণ।

জন প্রথমে জানেন, এই মানুষটি কে। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জেন কোনো অচেনা তরুণী নন। জেনের স্মৃতি, কষ্ট, একাকিত্ব ও ভবিষ্যৎ সবই জনের জানা। কারণ জন নিজেই একসময় জেন ছিলেন।

জন জেনের সঙ্গে কথা বলেন। জেন এমন একজন মানুষের দেখা পান, যিনি তাঁকে সহজে বুঝতে পারেন। জনের কাছে জেনের প্রতিটি ভয়, অভিমান ও আকাঙ্ক্ষা পরিচিত।

জন জানেন জেন কী শুনতে চান। জানেন জেন কেন একা। জানেন জেন কেন মানুষের ওপর সহজে বিশ্বাস করতে পারেন না।

কারণ জন অন্য কারও মন পড়ছেন না। তিনি নিজের অতীত পড়ছেন।

ধীরে ধীরে জেন জনের প্রেমে পড়েন। জনও জেনের প্রতি আকৃষ্ট হন।

জেন যাঁর প্রেমে পড়েছিলেন, তিনি জেনেরই ভবিষ্যৎ সংস্করণ জন।

জন যে মানুষটির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে অতীতে গিয়েছিলেন, তিনিই সেই মানুষে পরিণত হন। অতীতের প্রেমিককে খুঁজতে গিয়ে জন প্রেমিকটির ভূমিকা পূর্ণ করেন।

জন যদি প্রতিশোধ নিতে অতীতে না যেতেন, জেনের সঙ্গে সেই মানুষের দেখা হতো না। জেন সন্তান জন্ম দিতেন না। অস্ত্রোপচারের পর জেন জন হতেন না। আর জন না হলে ভবিষ্যতে প্রতিশোধ নিতে অতীতে যাওয়ার প্রশ্নও উঠত না।

কারণটি ফলকে সৃষ্টি করছে। ফলটি ফিরে গিয়ে কারণকে সৃষ্টি করছে।

প্রথম দৃশ্যের রহস্য উন্মোচন

জনকে অতীতে রেখে বারকিপার নিজের দায়িত্বে চলে যান। তাঁর লক্ষ্য Fizzle Bomber-কে আটকানো এবং বোমা বিস্ফোরণ ঠেকানো।

এই যাত্রায় তিনি এমন একটি দৃশ্যের কাছে পৌঁছান, যা দর্শক চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখেছেন। তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান। সেই শব্দ অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে দেখেন, একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে এবং একজন এজেন্টের মুখ দগ্ধ হয়ে গেছে।

আহত মানুষটি মেঝেতে পড়ে সময়যন্ত্রটি ধরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেটি তাঁর নাগালের বাইরে। বারকিপার যন্ত্রটি তাঁর দিকে এগিয়ে দেন।

এই দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। তবে এবার আমরা রহস্যময় সহায়তাকারীর পরিচয় জানি।

যে মানুষটি দগ্ধ এজেন্টকে সময়যন্ত্রটি দিয়েছিলেন, তিনি বারকিপার। আর দগ্ধ এজেন্টটি জনের ভবিষ্যৎ সংস্করণ। আরও স্পষ্টভাবে বললে, তিনি বারকিপারেরই অপেক্ষাকৃত তরুণ সংস্করণ।

বারকিপার নিজের অতীত সংস্করণকে বাঁচান। সেই অতীত সংস্করণ ভবিষ্যতে বারকিপার হয়ে আবার নিজের অতীতকে বাঁচাতে ফিরে আসে।

তাহলে প্রথমবার তাঁকে কে বাঁচিয়েছিল?

এই প্রশ্নের কোনো রৈখিক উত্তর নেই। বারকিপার নিজের বেঁচে থাকার কারণ নিজেই। তিনি বেঁচেছিলেন, কারণ ভবিষ্যতের তিনি অতীতের তাঁকে যন্ত্রটি দিয়েছিলেন। আর ভবিষ্যতের সেই সংস্করণ অস্তিত্ব পেয়েছে, কারণ অতীতের আহত সংস্করণটি যন্ত্রটি পেয়ে বেঁচে গিয়েছিল।

এটি একটি আত্মসংগত Causal Loop

শিশুটিকে কে চুরি করেছিল?

বারকিপার এরপর জনের জীবনের আরেকটি অসমাপ্ত অংশ পূর্ণ করতে যান। তিনি হাসপাতালে ফিরে জেনের নবজাতক শিশুটিকে নিয়ে যান।

অর্থাৎ জেনের সন্তানকে যে রহস্যময় ব্যক্তি হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিয়েছিল, তিনি বারকিপার।

তারপর সময়যন্ত্র ব্যবহার করে শিশুটিকে ১৯৪৫ সালের একটি অনাথাশ্রমের সামনে রেখে আসেন। সেই শিশুটির নাম পরে রাখা হয় জেন।

এখন পুরো চক্রটি দেখুন

জেন বড় হয়ে জনের প্রেমে পড়েন।

জন আসলে জেনেরই ভবিষ্যৎ সংস্করণ।

জেন ও জনের সম্পর্ক থেকে একটি শিশুর জন্ম হয়।

বারকিপার শিশুটিকে নিয়ে অতীতে যান।

শিশুটিকে অনাথাশ্রমের সামনে রেখে আসেন।

শিশুটি বড় হয়ে আবার জেন হন।

তাহলে জেনের মা কে? জেন নিজেই।

জেনের বাবা কে? জেনের ভবিষ্যৎ সংস্করণ জন।

জেনের সন্তান কে? জেন নিজেই।

শিশুটিকে অনাথাশ্রমে কে রেখে গিয়েছিল? জেন ও জনের আরও ভবিষ্যৎ সংস্করণ বারকিপার।

এখানে কোনো রৈখিক বংশতালিকা নেই। ব্যক্তিটি নিজের মা, নিজের বাবা, নিজের সন্তান এবং নিজের অভিভাবকের ভূমিকায় উপস্থিত।

এই আত্মসৃষ্ট অস্তিত্বই Bootstrap Paradox-এর সবচেয়ে চরম রূপগুলোর একটি।

জন কেন জেনকে ছেড়ে যান?

জন যখন অতীতে গিয়ে জেনের প্রেমে পড়েন, তখন তিনি সহজে ফিরে আসতে চান না। তিনি জানেন, জেনকে ছেড়ে গেলে জেন ভয়াবহ কষ্ট পাবেন। কারণ সেই কষ্ট তিনিও বহন করেছেন।

বারকিপার তাঁকে মনে করিয়ে দেন যে এই সম্পর্কের শেষ তিনি জানেন। জন বলেন, তিনি জেনকে ছেড়ে যেতে পারবেন না।

কিন্তু বারকিপারও জেনকে ভালোবাসেন। কারণ বারকিপার জনের ভবিষ্যৎ সংস্করণ। জন যে ভালোবাসা অনুভব করছেন, বারকিপারও একসময় একই ভালোবাসা অনুভব করেছিলেন।

তবু বারকিপার জনকে নিয়ে যান। জনকে জেনের কাছ থেকে সরিয়ে না নিলে সময়চক্র সম্পূর্ণ হবে না। জেনকে পরিত্যাগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সন্তান জন্ম দিতে হবে। জন হিসেবে জীবন শুরু করতে হবে। বারে গিয়ে নিজের কাহিনি বলতে হবে। এরপর আবার অতীতে ফিরে জেনের সেই প্রেমিক হতে হবে।

বারকিপার জানেন, কী ঘটবে। তবু তিনি ঘটনাগুলো ঘটতে দেন।

বারকিপার একই সঙ্গে ভুক্তভোগী এবং ব্যবস্থাপক। নিজের ক্ষত জানেন, কিন্তু সেই ক্ষতের ধারাবাহিকতাও তাঁকেই নিশ্চিত করতে হয়।

বারকিপারই কি ভবিষ্যতের Fizzle Bomber?

বারকিপারের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ছিল Fizzle Bomber-কে খুঁজে বের করা। তিনি বিশ্বাস করেন, এই অপরাধীকে থামাতে পারলে হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা পাবে।

কিন্তু শেষ দিকে তিনি আবিষ্কার করেন, Fizzle Bomber তাঁরই আরও বয়স্ক ভবিষ্যৎ সংস্করণ।

সময়-ভ্রমণের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব এবং নিজের কাজ সম্পর্কে বিকৃত নৈতিক যুক্তির ফলে ভবিষ্যতের বারকিপার এমন এক বিশ্বাসে পৌঁছেছেন যে ছোট হামলার মাধ্যমে তিনি আরও বড় বিপর্যয় ঠেকাচ্ছেন।

বর্তমানের বারকিপারের কাছে এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি নিজের ভবিষ্যৎ সংস্করণকে হত্যা করেন।

তিনি মনে করেন, Fizzle Bomber-কে শেষ করে হয়তো সময়চক্র ভেঙেছেন। কিন্তু এখানেই চলচ্চিত্রের শেষ ভয়ংকর ইঙ্গিতটি লুকিয়ে আছে।

যে বারকিপার ভবিষ্যতের নিজেকে হত্যা করলেন, তিনিই কি ধীরে ধীরে সেই একই ভবিষ্যৎ সংস্করণে পরিণত হবেন?

নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করার কাজটিই কি তাঁকে সেই ভবিষ্যতের দিকে আরও এগিয়ে দিল?

শিকার অপরাধীকে অনুসরণ করছে। অপরাধী শিকারের ভবিষ্যৎ। আর যে মানুষটি নিজের ভবিষ্যৎকে হত্যা করছে, একসময় সে-ই সেই ভবিষ্যতে পরিণত হবে।

পুরো সময়চক্র এক নজরে

একই ব্যক্তির সময়চক্র

Baby Jane → Jane → John → Temporal Agent → Barkeep → Fizzle Bomber

বারকিপার আবার শিশু জেনকে ১৯৪৫ সালের অনাথাশ্রমের সামনে রেখে আসেন। ফলে সময়চক্রটি নিজের শুরুর বিন্দু নিজেই তৈরি করে।

  • একটি শিশুকে ১৯৪৫ সালে অনাথাশ্রমের সামনে রাখা হয়।
  • শিশুটি বড় হয়ে জেন হন।
  • জেন রহস্যময় জনের প্রেমে পড়েন।
  • জন আসলে জেনের ভবিষ্যৎ সংস্করণ।
  • জেন একটি শিশুর জন্ম দেন।
  • বারকিপার শিশুটিকে ১৯৪৫ সালের অনাথাশ্রমে রেখে আসেন।
  • সেই শিশুই আবার জেন।
  • চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর জেন জন হিসেবে জীবন শুরু করেন।
  • জন সময়-ভ্রমণকারী সংস্থায় যোগ দেন।
  • বোমা বিস্ফোরণে জনের মুখ দগ্ধ হয়।
  • অস্ত্রোপচারের পর জন বারকিপারের মুখ ও কণ্ঠ পান।
  • বারকিপার অতীতে গিয়ে নিজের দগ্ধ সংস্করণকে বাঁচান।
  • বারকিপারের ভবিষ্যৎ সংস্করণ Fizzle Bomber হন।
  • তরুণ বারকিপার নিজের বয়স্ক ভবিষ্যৎ সংস্করণকে হত্যা করেন।
  • সম্ভবত একই বারকিপার ধীরে ধীরে আবার Fizzle Bomber-এ পরিণত হন।

এই মানুষের প্রকৃত উৎস কোথায়?

কাহিনির সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিটির প্রথম সংস্করণ কোথা থেকে এলো?

সাধারণভাবে একজন মানুষের জন্মের জন্য তাঁর আগে আলাদা মা ও বাবার অস্তিত্ব প্রয়োজন। কিন্তু জেনের ক্ষেত্রে মা ও বাবা একই ব্যক্তির ভিন্ন সময়ের সংস্করণ।

জেন নিজেকেই জন্ম দিয়েছেন। জন, যিনি জেনের ভবিষ্যৎ সংস্করণ, সেই জন্মের অন্য অভিভাবক। জন্ম নেওয়া শিশুটিও জেন। শিশুটিকে অনাথাশ্রমে রেখে যাওয়া বারকিপারও জেনের ভবিষ্যৎ সংস্করণ।

তাহলে এই বংশতালিকার শুরু কোথায়?

কোথাও নয়। অথবা বলা যায়, শুরুটি পুরো চক্রজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

চরিত্রটির কোনো উৎস চক্রের বাইরে নেই। ব্যক্তিটির শরীর, পরিচয় ও জীবন সময়ের মধ্যে নিজেই নিজেকে পুনরুৎপাদন করছে।

কোন সময়টি সত্যিকার বর্তমান?

এই চক্রে কোন সময় চলছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে ক্যালেন্ডারের সময় এবং চরিত্রের ব্যক্তিগত সময় আলাদা করে দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়।

চলচ্চিত্রে ১৯৪৫, ১৯৬৩, ১৯৬৪, ১৯৭০, ১৯৭৫ ও ১৯৯২ সালের মতো নির্দিষ্ট সময় আছে। অর্থাৎ ক্যালেন্ডারের সময় মুছে যায়নি।

যা ভেঙে গেছে, তা হলো চরিত্রটির জীবনের সরল ধারাবাহিকতা।

ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৯৪৫ সালের জেন শিশু। কিন্তু শিশুটিকে সেখানে রেখে যাওয়া বারকিপার একই ব্যক্তির অনেক পরের সংস্করণ। জেনের কাছে জন ভবিষ্যতের মানুষ। কিন্তু জনের কাছে জেন তাঁর অতীত। দগ্ধ এজেন্টের কাছে বারকিপার ভবিষ্যতের মানুষ। কিন্তু বারকিপারের কাছে দগ্ধ এজেন্ট নিজের অতীত।

প্রশ্নটি শুধু “কোন সময় বর্তমান?” নয়। প্রশ্নটি হলো, “কার বর্তমান?”

অতীত কি সত্যিই পরিবর্তন করা যায় না?

Predestination এমন একটি সময়-ভ্রমণ মডেল অনুসরণ করে যেখানে ইতিহাস আত্মসংগত। অতীতে যাওয়া সম্ভব হলেও ইতিহাসের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়।

এই ধারণাটিকে তাত্ত্বিক আলোচনায় Novikov Self-Consistency Principle-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই নীতি অনুযায়ী, সময়-ভ্রমণমূলক কোনো ঘটনা যদি অতীতের সঙ্গে যৌক্তিক বিরোধ সৃষ্টি করে, তবে সেই অসংগত ফল ঘটবে না। কেবল এমন ঘটনাই ঘটবে, যা সামগ্রিক ইতিহাসকে আত্মসংগত রাখে।

এটি সময়-ভ্রমণের পরীক্ষিত প্রাকৃতিক আইন নয়। বরং সময়-ভ্রমণের যৌক্তিক বিরোধ এড়াতে প্রস্তাবিত একটি তাত্ত্বিক consistency principle

এই মডেলে আপনি অতীতে যেতে পারেন। অতীতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। ঘটনার অংশ হতে পারেন। কিন্তু আপনার অংশগ্রহণ আগে থেকেই ইতিহাসের মধ্যে ছিল।

আপনি অতীত বদলানোর চেষ্টা করবেন, কিন্তু আপনার সেই চেষ্টাই ইতিহাসকে আগের মতো রাখবে।

তাহলে স্বাধীন ইচ্ছা কোথায়?

চরিত্রটি কি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিচ্ছেন?

জন কি সত্যিই নিজের ইচ্ছায় জেনের প্রেমে পড়েছিলেন? বারকিপার কি শিশুটিকে অন্য কোনো পরিবারে দিয়ে আসতে পারতেন? তিনি কি জনকে জেনের সঙ্গে থাকতে দিতে পারতেন? তিনি কি নিজের ভবিষ্যৎ সংস্করণকে হত্যা না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন?

তাত্ত্বিকভাবে প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর সামনে সিদ্ধান্ত আছে বলে মনে হয়। কিন্তু সময়চক্রের মধ্যে ফলাফল ইতিমধ্যেই ইতিহাসের অংশ।

শিশু জেন অনাথাশ্রমে বড় হয়েছেন। তাই বারকিপার শিশুটিকে অন্য কোথাও রেখে আসতে পারবেন না। জেনকে তাঁর প্রেমিক ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাই জন শেষ পর্যন্ত জেনকে ছেড়ে যাবেন। দগ্ধ এজেন্ট সময়যন্ত্রটি পেয়েছিলেন। তাই বারকিপার যন্ত্রটি এগিয়ে দেবেন।

সময়চক্রে মানুষ ভবিষ্যৎ থেকে পালাতে পারে না, কারণ পালানোর চেষ্টাটিও সেই ভবিষ্যতের কারণ।

রবার্টসন কি চক্রটি পরিচালনা করছেন?

চলচ্চিত্রে মি. রবার্টসনের ভূমিকা রহস্যময়। তিনি জেনকে অল্প বয়সেই খুঁজে পান। জেনের অস্বাভাবিক সক্ষমতা সম্পর্কে জানেন। চিকিৎসা পরীক্ষার তথ্যও তাঁর নাগালে ছিল। পরে জনকে সময়-ভ্রমণকারী সংস্থায় যুক্ত করার পেছনেও তাঁর ভূমিকা থাকে।

রবার্টসন এমন একজন এজেন্ট চান, যার কোনো সাধারণ পারিবারিক বা ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই। জেন-জনের জীবনচক্র তাঁকে এমন একজন এজেন্ট দেয়, যার অস্তিত্বই সময়ের বন্ধ বৃত্তে নির্মিত।

প্রশ্ন হলো, রবার্টসন কি শুধু চক্রটি আবিষ্কার করেছেন, নাকি সচেতনভাবে সেটিকে রক্ষা ও পরিচালনা করেছেন?

জেনকে যদি ছোটবেলা থেকেই পর্যবেক্ষণ করা হয়ে থাকে, জনকে যদি নির্দিষ্ট সময়ে নিয়োগ করা হয় এবং বারকিপারকে যদি নিজের তরুণ সংস্করণকে সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে ব্যক্তিটির স্বাধীন জীবন কোথায়?

তিনি কি একজন স্বাধীন মানুষ, নাকি নিজের জন্ম থেকে নিজের ধ্বংস পর্যন্ত পরিচালিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক যন্ত্র?

Predestination Paradox কি বাস্তবে ঘটে?

এখন পর্যন্ত মানুষ অতীতে ফিরে গিয়ে কোনো ঘটনা পরিবর্তন করেছে, এমন পরীক্ষিত প্রমাণ নেই। ব্যবহারযোগ্য কোনো সময়যন্ত্রও আবিষ্কৃত হয়নি।

আপেক্ষিকতা তত্ত্বে সময়ের প্রবাহ পর্যবেক্ষক, গতি ও মহাকর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। অত্যন্ত উচ্চগতিতে চলা ব্যক্তি এবং তুলনামূলক স্থির পর্যবেক্ষকের জন্য সময়ের অগ্রগতিতে পার্থক্য হতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতের দিকে অসম হারে অগ্রসর হওয়া এবং অতীতে ফিরে যাওয়া একই বিষয় নয়।

সাধারণ আপেক্ষিকতার কিছু গাণিতিক সমাধানে Closed Timelike Curve বা বদ্ধ কালসদৃশ বক্ররেখার ধারণা পাওয়া যায়। এটি এমন একটি তাত্ত্বিক পথ, যা স্থানকালের মধ্যে ঘুরে নিজের আগের বিন্দুতে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু এ ধরনের পথের বাস্তব অস্তিত্ব, স্থায়িত্ব, ভৌত শর্ত ও ব্যবহারযোগ্যতা প্রমাণিত নয়।

সুতরাং Predestination Paradox কোনো পরীক্ষিত প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি মূলত একটি চিন্তানিরীক্ষা, যেখানে পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা এবং বিজ্ঞান কল্পকাহিনি এক জায়গায় মিলেছে।

এই প্যারাডক্স আমাদের যে প্রশ্নগুলো করতে শেখায়

  • কারণ ও ফল কি সবসময় রৈখিক?
  • অতীত পরিবর্তনযোগ্য হলে পরিচয় কীভাবে টিকে থাকবে?
  • ভবিষ্যতের তথ্য অতীতে গেলে সেই তথ্যের প্রথম উৎস কোথায়?
  • নিজের জন্মের কারণ নিজে হলে বংশপরিচয়ের অর্থ কী?
  • ইতিহাস আত্মসংগত হলে স্বাধীন ইচ্ছা কতটা বাস্তব?
  • ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান ভবিষ্যৎ ঠেকাবে, নাকি ঘটাবে?

শেষ কথা

অতীত বদলানোর ইচ্ছা মানুষের অনুশোচনা থেকে জন্ম নেয়।

আমরা প্রায়ই ভাবি, একটি সিদ্ধান্ত বদলাতে পারলে বর্তমান জীবনও বদলে যেত। একটি কথা না বললে, একটি জায়গায় না গেলে, একটি সম্পর্ক শুরু না করলে, একটি সুযোগ ফিরিয়ে না দিলে কিংবা একটি ভুল না করলে হয়তো জীবন অন্যরকম হতো।

Predestination Paradox সেই আশার সামনে একটি অস্বস্তিকর সম্ভাবনা দাঁড় করায়।

অতীত সংশোধনের জন্য আপনি যে কাজটি করবেন, সেটিই যদি অতীতের ঘটনার কারণ হয়, তাহলে ইতিহাস আর সম্পাদনাযোগ্য লেখা থাকে না। ইতিহাস একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত হয়ে ওঠে, যেখানে শুরু ও শেষ একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকে।

Predestination চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি নিজের উৎস খুঁজতে গিয়ে সর্বত্র নিজেকেই পান।

অনাথ শিশুটি তিনি।

জেন তিনি।

জন তিনি।

জেনের প্রেমিক তিনি।

শিশুটির মা ও বাবা তিনি।

শিশুটিকে অনাথাশ্রমে রেখে যাওয়া মানুষটিও তিনি।

দগ্ধ এজেন্ট তিনি।

বারকিপার তিনি।

নিজেকে উদ্ধার করা মানুষটি তিনি।

যে অপরাধীকে তিনি সারা জীবন খুঁজেছেন, সেই Fizzle Bomber-ও তিনি।

তিনি নিজের জন্ম, প্রেম, পরিত্যাগ, উদ্ধার, নিয়োগ, শাস্তি ও ধ্বংসের কারণ।

এ কারণেই চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে ভয়ংকর রহস্য কোনো সময়যন্ত্র নয়। রহস্যটি হলো এমন একটি পরিচয়, যার বাইরে কোনো পরিবার নেই, প্রথম কারণ নেই, শুরুর বিন্দু নেই।

শুধু একটি মানুষ আছেন, যিনি সময়ের বিভিন্ন বিন্দুতে দাঁড়িয়ে নিজের অসমাপ্ত জীবনকে বারবার সম্পূর্ণ করছেন।

আপনি যদি অতীতে ফিরে গিয়ে একটি ঘটনা ঠেকাতে চান, কিন্তু আপনার উপস্থিতিই যদি সেই ঘটনার কারণ হয়, তাহলে আপনি আর শুধু সময়ের যাত্রী নন। আপনি সময়ের অসমাপ্ত বাক্যকে সম্পূর্ণ করার জন্য ফিরে যাওয়া একটি শব্দ।

তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন

  1. Sony Pictures: Predestination
  2. Apple TV: Predestination
  3. Predestination: Film Information and Plot Overview
  4. IMDb: Predestination Plot Summary
  5. Predestination Explained: Time Paradoxes and Ending
  6. Novikov Self-Consistency Principle

সম্পাদকীয় নোট: সময়-ভ্রমণের প্যারাডক্সগুলো মূলত দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে আলোচিত ধারণা। চলচ্চিত্রের কাহিনি বাস্তব সময়-ভ্রমণ কিংবা অতীতে ফিরে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়। চলচ্চিত্রে দেখানো আন্তঃলিঙ্গ চরিত্রের চিকিৎসাগত যাত্রাকেও সব আন্তঃলিঙ্গ মানুষের সাধারণ বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবে পড়া উচিত নয়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!