এত বিকল্পের ভিড়ে আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?

বেশি বিকল্প কি বেশি স্বাধীনতা দেয়? স্মার্টফোন কেনার গল্পে Paradox of Choice, Choice Overload, Analysis Paralysis, FOMO ও অনুশোচনার মনস্তত্ত্ব জানুন।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৫
এত বিকল্পের ভিড়ে আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?
কেন বেশি দক্ষতা থাকার পরেও অনেকে বেকার থাকেন? অপশন প্যারাডক্সের জট খুলুন!

মনোবিজ্ঞান, স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত

এত বিকল্পের ভিড়ে আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?

Paradox of Choice, সিদ্ধান্তহীনতা, অনুশোচনা এবং “সেরা” বিকল্প খোঁজার মানসিক মূল্য

সম্পাদকীয় সতর্কবার্তা

এই লেখার আবদুল কুদ্দুস এবং স্মার্টফোন কেনার ঘটনাটি ধারণা ব্যাখ্যার জন্য নির্মিত কাল্পনিক উদাহরণ। বহু দক্ষ মানুষের বেকারত্ব, একাকিত্ব, আর্থিক সিদ্ধান্ত কিংবা সম্পর্কের জটিলতাকে শুধু Paradox of Choice দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও বিবেচনা করতে হবে।

আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন, একাধিক বিষয়ে দক্ষ কোনো মানুষ দীর্ঘদিন বেকার বসে আছেন? এমন কেউ, যিনি ছোট একটি পদ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন, কিন্তু কোন পেশাকে নিজের প্রধান পরিচয় করবেন, সেটিই স্থির করতে পারছেন না।

আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁর আয় মন্দ নয়, তবু অসংখ্য লক্ষ্য, ব্যয় ও সম্ভাবনার ভিড়ে একটি সাধারণ মোটরসাইকেল কেনার সিদ্ধান্তও বছরের পর বছর পিছিয়ে যাচ্ছে।

অনেক জ্ঞানী মানুষকে তুলনামূলকভাবে একা থাকতে দেখা যায়। বেশি জানার ফলে তাঁরা হয়তো মানুষ, সম্পর্ক ও প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা বেশি স্পষ্টভাবে দেখতে পান। আবার কখনো অতিরিক্ত বিশ্লেষণ তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন করে তোলে।

একইভাবে, কারও উপার্জন বাড়লে শুধু তাঁর ক্রয়ক্ষমতাই বাড়ে না। তাঁর সামনে জীবনযাপন, বিনিয়োগ, সামাজিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পারিবারিক দায়িত্বের আরও অনেক বিকল্পও তৈরি হতে পারে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা অবাক হই। আকর্ষণীয়, প্রতিষ্ঠিত অথবা সামাজিকভাবে বহু সম্ভাবনাসম্পন্ন একজন মানুষ হয়তো শেষ পর্যন্ত খুব সাধারণ জীবনযাপনের কাউকে বেছে নেন। বাইরে থেকে দেখে অনেকে মনে করেন, সেই মানুষটি নিজের সব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেননি।

“অতি বড় রূপসী না পায় বর, অতি বড় ঘরণী না পায় ঘর।”

প্রবাদটি কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র নয়। প্রত্যেক দক্ষ মানুষের বেকারত্ব, প্রত্যেক জ্ঞানী মানুষের একাকিত্ব কিংবা প্রত্যেক সম্পর্কের সিদ্ধান্তের পেছনে একই কারণও কাজ করে না। সেখানে অর্থনীতি, সামাজিক শ্রেণি, সুযোগের বৈষম্য, ব্যক্তিত্ব, স্বাস্থ্য, পরিবার, কর্মসংস্থানের কাঠামো এবং ভাগ্যের ভূমিকা থাকতে পারে।

তারপরও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

যখন একজন মানুষের সামনে অনেক সম্ভাবনা থাকে, তখন কি সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়? নাকি ভুল করার ভয়, বাদ পড়া বিকল্পের আফসোস এবং “সর্বোত্তম” কিছু খুঁজে পাওয়ার চাপও বাড়ে?

চারপাশে এমন মানুষের সঙ্গে আপনার নিশ্চয় পরিচয় আছে। হয়তো তাঁদের জীবনের গল্প শুনে মনে মনে হেসেছেন। হয়তো ভেবেছেন, এত সুযোগ পেয়েও মানুষটি কেন কিছু স্থির করতে পারলেন না। কিন্তু কখনো কি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, অনেক ভালো বিকল্পের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া কি সত্যিই সহজ?

চলুন, একটি গল্প দিয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি।

২৫ হাজার টাকার সামনে বিশাল এক বাজার

কুদ্দুসের কাছে ২৫ হাজার টাকা শুধু স্মার্টফোন কেনার বাজেট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত কয়েক মাসের শ্রম, কিছু অপূর্ণ ইচ্ছা এবং একটি ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যক্তিগত দায়িত্ব।

আমার কাল্পনিক বন্ধু আবদুল কুদ্দুস একদিন ২৫ হাজার টাকা নিয়ে গ্রামের কাছাকাছি একটি শহরে স্মার্টফোন কিনতে গেল।

টাকাটা সে সহজে পায়নি। অল্প অল্প করে জমিয়েছে। তাই তার কাছে এটি শুধু একটি ফোন কেনার বাজেট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে কয়েক মাসের শ্রম, কিছু অপূর্ণ ইচ্ছা এবং একটি ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যক্তিগত দায়িত্ব।

শহরের বড় স্মার্টফোন মার্কেটে ঢুকেই কুদ্দুসের চোখ কপালে উঠল।

বিকেলের আলো কমতে শুরু করেছে। দোকানগুলোর কাচের দেয়ালে একের পর এক ফোন সাজানো। সন্ধ্যা নামতেই চারপাশের নিয়ন আলো জ্বলে উঠল। বড় বড় অক্ষরে অসংখ্য ব্র্যান্ডের নাম দেখা যাচ্ছে।

এক পাশে Apple, Samsung, Google Pixel, OnePlusHuawei

অন্য পাশে Xiaomi, Vivo, Oppo, Realme, Honor, Motorola, NokiaInfinix

এর বাইরেও পরিচিত-অপরিচিত আরও অনেক ব্র্যান্ড। প্রতিটি দোকানের বিক্রয়কর্মী দাবি করছেন, তাঁদের কাছেই এই বাজেটের সেরা ফোন আছে।

কুদ্দুসের বাজেট ২৫ হাজার টাকা। সে চায়, এই টাকার মধ্যে বাজারের সব সম্ভাব্য কোম্পানি যাচাই করে সবচেয়ে ভালো স্মার্টফোনটি কিনতে।

“সবচেয়ে ভালো” বলতে সে ঠিক কী বোঝে?

ভালো ক্যামেরা?
বেশি ক্ষমতার ব্যাটারি?
দ্রুত প্রসেসর?
RAM and Storage?
Software Update?
পরিচিত ব্র্যান্ড?

সমস্যাটি হলো, এই বৈশিষ্ট্যগুলো একই দামে একই ফোনে সমানভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।

একটি ফোনের ক্যামেরা ভালো, কিন্তু ব্যাটারি তুলনামূলক দুর্বল। আরেকটির ব্যাটারি ও চার্জিং ভালো, কিন্তু ক্যামেরা সাধারণ। কোনো মডেলে বেশি RAMstorage আছে, কিন্তু প্রসেসর পুরোনো।

কোনো ব্র্যান্ডের সফটওয়্যার পরিচ্ছন্ন, কিন্তু যন্ত্রাংশ ও সেবাকেন্দ্র নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। অন্য একটি ফোনে কাগজে-কলমে দুর্দান্ত সব specification, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কুদ্দুস যত ফোন দেখছে, তার সিদ্ধান্ত তত পরিষ্কার হওয়ার কথা। অথচ ঘটছে উল্টোটা।

বিকল্পের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সিদ্ধান্তের রাস্তা প্রশস্ত না হয়ে ক্রমেই সরু হয়ে আসছে।

পুরোনো iPhone-এর প্রলোভন

প্রায় দুই ঘণ্টা দোকান ঘোরার পর আবদুল কুদ্দুস আমাকে ফোন করল।

“আচ্ছা, এই বাজেটের মধ্যে Apple-এর কোনো ফোন পাওয়া যাবে?”

আমি বললাম, “পাওয়া যেতে পারে। তবে নতুন নয়। মার্কেটের তৃতীয় তলায় পুরোনো ফোনের দোকানগুলোতে খোঁজ করতে হবে। বাজেট অনুযায়ী কোনো পুরোনো iPhone পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু অবস্থা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। দাম নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।”

কুদ্দুসের মনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলো।

একটি iPhone হাতে নেওয়ার সামাজিক আকর্ষণ অন্যরকম। নতুন কোনো মধ্যম বাজেটের ফোনের বদলে পুরোনো হলেও Apple ব্যবহার করার মধ্যে যেন আলাদা পরিচয় আছে।

কুদ্দুস তৃতীয় তলায় গেল। কয়েকটি পুরোনো iPhone হাতে নিল।

কিন্তু বাজেটের সঙ্গে মিলিয়ে যে মডেলগুলো পাওয়া যাচ্ছিল, সেগুলোর কোথাও ব্যাটারির স্বাস্থ্য দুর্বল, কোথাও বাহ্যিক রং উঠে গেছে, কোথাও পর্দা বা যন্ত্রাংশ বদলানোর সন্দেহ, কোথাও আবার মডেল এত পুরোনো যে একই টাকায় নতুন Android ফোনে অনেক বেশি ব্যবহারযোগ্য সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।

কুদ্দুসের নতুন প্রশ্ন

ব্র্যান্ড ভালো। কিন্তু ব্যবহারিক মূল্য কতটা? পরিচিতি আছে। কিন্তু নিশ্চয়তা কতটুকু? ফোন হাতে নিলে সামাজিক মর্যাদার অনুভূতি আসতে পারে। কিন্তু চার্জ, ক্যামেরা, মেরামত, আপডেট ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার কেমন হবে?

একসময় কুদ্দুস বুঝল, শুধু ব্র্যান্ডের জন্য পুরোনো ও অনিশ্চিত একটি ফোন কেনা তার পক্ষে যুক্তিসংগত হবে না।

সে আবার নতুন ফোনের দোকানগুলোতে ফিরে গেল।

তিন ঘণ্টা পর একটি সিদ্ধান্ত

দীর্ঘ তিন ঘণ্টার দ্বিধা, তুলনা, দোকান বদল, বিক্রয়কর্মীদের পরামর্শ এবং অনলাইনের specification দেখার পর কুদ্দুস শেষ পর্যন্ত Infinix-এর একটি স্মার্টফোন বেছে নিল।

ফোনটি তার বাজেটের মধ্যে ছিল। ক্যামেরা, ব্যাটারি, প্রসেসর, RAM, storage ও অন্যান্য সুবিধার সম্মিলিত বিবেচনায় সে এটিকেই তখন নিজের জন্য সবচেয়ে ব্যবহারযোগ্য মনে করেছিল।

কুদ্দুস ফোনটি কিনে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেল।

গল্পটি এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।

সে প্রয়োজন অনুযায়ী একটি ফোন কিনেছে। ফোনটি কাজ করছে। বাজেট অতিক্রম করেনি। পুরোনো ও অনিশ্চিত ফোনের বদলে নতুন ফোন পেয়েছে। সিদ্ধান্তটি ব্যর্থ হওয়ার কোনো স্পষ্ট কারণও নেই।

কিন্তু বাড়িতে ফেরার পর কুদ্দুসের মনে নতুন অস্বস্তি শুরু হলো।

এত বড় বাজারে সত্যিই কি সবচেয়ে ভালো ফোনটি খুঁজে পেয়েছে?

যে ফোনগুলো বাদ দিয়েছে, সেগুলোর কোনোটি কি আরও ভালো ছিল?

আরেকটু বাজেট বাড়ালে কি বেশি পরিচিত ব্র্যান্ড নেওয়া যেত?

পুরোনো iPhone না নিয়ে কি ভুল করল?

দাম যদি পরের সপ্তাহে কমে যায়?

কুদ্দুসের হাতে একটি ব্যবহারযোগ্য ফোন আছে। কিন্তু তার মনের মধ্যে তখনো অসংখ্য না-কেনা ফোন সক্রিয়।

সে শুধু একটি ফোন কেনেনি। একই সঙ্গে বহু বিকল্প প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রত্যাখ্যান করা প্রতিটি বিকল্প তার সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সম্ভাব্য কারণ হয়ে রয়ে গেছে।

কুদ্দুসের হাতে স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে তুলনা, মানসিক শ্রম, সময়ের খরচ এবং ভুল করার ভয়ও এসেছিল।

কুদ্দুসের গল্প কাল্পনিক। কিন্তু সমস্যাটি পরিচিত।

স্মার্টফোনের জায়গায় হতে পারে ল্যাপটপ, পোশাক, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশা, জীবনসঙ্গী, বাড়ি, গাড়ি, বিনিয়োগ, চিকিৎসা, অনলাইন কোর্স কিংবা বিনোদনের জন্য একটি চলচ্চিত্র।

আমরা অনেক সময় কিছু বেছে নিতে পারি না, কারণ আমাদের সামনে কিছুই নেই। আবার কখনো বেছে নিতে পারি না, কারণ সামনে খুব বেশি কিছু আছে।

অতিরিক্ত বিকল্পের ছয়টি মানসিক মূল্য

১. সিদ্ধান্তহীনতা ও Analysis Paralysis

প্রতিটি নতুন বিকল্প একটি নতুন তুলনা তৈরি করে। বিশ্লেষণ একসময় সিদ্ধান্তকে উন্নত না করে সিদ্ধান্ত গ্রহণই স্থগিত করে দিতে পারে।

আমাদের সামনে যখন অনেক কাছাকাছি মানের বিকল্প থাকে, তখন কোনটি নেব এবং কোনটি বাদ দেব, তা নির্ধারণ কঠিন হতে পারে।

প্রতিটি নতুন বিকল্পের সঙ্গে নতুন তুলনার প্রয়োজন হয়। ব্যাটারি বনাম ক্যামেরা, প্রসেসর বনাম ব্র্যান্ড, বর্তমান সুবিধা বনাম ভবিষ্যৎ নির্ভরযোগ্যতা, কম দাম বনাম সামাজিক পরিচিতি।

এই তুলনা একসময় সিদ্ধান্তকে উন্নত না করে স্থগিত করতে পারে। মানুষ বিশ্লেষণ করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে কোনো সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নিরাপদ মনে হয় না। এই অবস্থাকে সাধারণভাবে Analysis Paralysis বলা হয়।

আবদুল কুদ্দুস শেষ পর্যন্ত একটি ফোন কিনেছিল। কিন্তু অনেক মানুষ “আজই সেরা বিকল্পটি বেছে নিতে হবে” এই চাপে কিছুই কিনতে পারেন না। সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন, আবার গবেষণা করেন, নতুন মডেলের অপেক্ষা করেন এবং একসময় আগের তুলনাগুলোও অচল হয়ে যায়।

গবেষণার ভারসাম্য

বেশি বিকল্প সব অবস্থায় সিদ্ধান্ত নষ্ট করে না। গবেষণায় choice overload-এর প্রভাব সব পরিস্থিতিতে সমান পাওয়া যায়নি। বিকল্পের জটিলতা, সিদ্ধান্তের কঠিনতা, নিজের পছন্দ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এবং সিদ্ধান্ত দ্রুত শেষ করার প্রবণতা প্রভাবটিকে শক্তিশালী করতে পারে।

২. সময়ের অদৃশ্য খরচ

আমরা পণ্যের দাম হিসাব করি, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ব্যয় করা সময়, মনোযোগ ও মানসিক শক্তির দাম সাধারণত হিসাব করি না।

ধরুন, আপনার সামনে তিনটি ফোন আছে। তিনটির দাম, প্রধান সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা তুলনা করা তুলনামূলকভাবে সহজ।

কিন্তু সামনে যদি ত্রিশটি ফোন থাকে, তাহলে শুধু specification দেখাই যথেষ্ট নয়। আপনাকে review পড়তে হবে, ভিডিও দেখতে হবে, ব্যবহারকারীর অভিযোগ জানতে হবে, সেবাকেন্দ্র সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে এবং একই দামের মডেলগুলোর পার্থক্য বের করতে হবে।

কুদ্দুস তিন ঘণ্টা বাজারে ছিল। যদি তার সময়েরও আর্থিক বা ব্যক্তিগত মূল্য ধরা হয়, তাহলে ফোনটির প্রকৃত খরচ শুধু ২৫ হাজার টাকা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত তিন ঘণ্টা, শহরে যাতায়াত, মানসিক ক্লান্তি এবং বাড়ি ফেরার পরও চলতে থাকা সন্দেহ।

আমরা সাধারণত পণ্যের দাম হিসাব করি। সিদ্ধান্তের দাম করি না।

৩. অনুশোচনা ও বাদ পড়া বিকল্পের ছায়া

যে বিকল্পটি আমরা গ্রহণ করিনি, তার সীমাবদ্ধতা আর দেখতে পাই না। ফলে না-বেছে নেওয়া বিকল্পটি মনে প্রায়ই বাস্তবের চেয়ে বেশি নিখুঁত হয়ে ওঠে।

একটি বিকল্প বেছে নেওয়া মানে অন্য বিকল্পগুলো প্রত্যাখ্যান করা।

সামনে যদি তিনটি ফোন থাকে, একটি বেছে নেওয়ার পর দুটি বাদ পড়ে। কিন্তু একশটি ফোনের মধ্যে একটি বেছে নিলে মনের মধ্যে নিরানব্বইটি সম্ভাব্য বিকল্প থেকে যায়।

কুদ্দুসের নতুন ফোনের কোনো দুর্বলতা চোখে পড়লেই বাদ দেওয়া ফোনগুলোর সুবিধা মনে পড়বে। ক্যামেরা দুর্বল মনে হলে অন্য মডেলটির ক্যামেরা মনে পড়বে। চার্জ দ্রুত শেষ হলে বেশি ব্যাটারির ফোনটির কথা মনে হবে।

এই অনুশোচনার একটি অংশ বাস্তব তুলনা। কিন্তু আরেকটি অংশ কল্পিত তুলনা। আমরা যে বিকল্প গ্রহণ করিনি, তার সব সীমাবদ্ধতা জানি না। ফলে বাদ পড়া বিকল্পটি মনে প্রায়ই বাস্তবের চেয়ে বেশি নিখুঁত হয়ে ওঠে।

৪. স্বাধীনতা কখন বোঝায় পরিণত হয়?

বিকল্প মানুষকে নিয়ন্ত্রণ দেয়। একই সঙ্গে ব্যর্থ সিদ্ধান্তের দায়ও ব্যক্তির নিজের ওপর কেন্দ্রীভূত করে।

আমরা সাধারণত মনে করি, বেশি বিকল্প মানেই বেশি স্বাধীনতা। একটি মাত্র ফোন থাকলে আপনাকে সেটিই নিতে হবে। দশটি ফোন থাকলে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বেছে নিতে পারবেন। এই অর্থে বিকল্প অবশ্যই স্বাধীনতা বৃদ্ধি করে।

কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে।

কুদ্দুসকে কেউ একটি ভুল ফোন চাপিয়ে দিলে সে বিক্রেতাকে দায়ী করতে পারত। কিন্তু অনেক ফোন যাচাই করে নিজে একটি বেছে নেওয়ার পর ফোনটি খারাপ মনে হলে দায়টি তার নিজের ওপর ফিরে আসে।

“আমি ভুল ফোনটি কেন বেছে নিলাম?”

“আরও গবেষণা করিনি কেন?”

“অন্য দোকানে গেলাম না কেন?”

“বাজেট আরেকটু বাড়ালাম না কেন?”

প্রয়োজনীয় বিকল্প স্বাধীনতা দেয়। কিন্তু অসংগঠিত, কাছাকাছি মানের এবং কঠিন তুলনাসম্পন্ন অতিরিক্ত বিকল্প স্বাধীনতাকে মানসিক শ্রমে পরিণত করতে পারে।

৫. নিজের বিচারক্ষমতার ওপর আস্থা হারানো

একটি জটিল বাজারে অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হওয়া ব্যক্তিগত অযোগ্যতার প্রমাণ নয়।

কুদ্দুসের মনে হতে পারে, “আমি এত ফোন দেখেও সঠিকটি খুঁজে পেলাম না। হয়তো আমি ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।”

এই সিদ্ধান্তটি বিপজ্জনক। একটি জটিল বাজারে অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হওয়া ব্যক্তিগত অযোগ্যতার প্রমাণ নয়। কোনো একক “সেরা ফোন” নাও থাকতে পারে।

যে ফোন ক্যামেরার জন্য সেরা, সেটি ব্যাটারির জন্য সেরা নয়। যে ফোন কাগজে-কলমে এগিয়ে, সেটি দীর্ঘমেয়াদি সফটওয়্যার বা সেবায় পিছিয়ে থাকতে পারে।

ভুল প্রশ্ন: “সবচেয়ে ভালো কোনটি?”

ভালো প্রশ্ন: “আমার প্রয়োজন, বাজেট ও অগ্রাধিকারের জন্য কোনটি যথেষ্ট ভালো?”

৬. FOMO: অন্যরা কি আরও ভালো কিছু পেল?

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও বাজার মনের মধ্যে খোলা থাকলে অন্যের প্রতিটি পছন্দ নিজের নির্বাচনকে প্রশ্ন করার নতুন কারণ হয়ে ওঠে।

FOMO বা Fear of Missing Out হলো অন্যের অভিজ্ঞতা, সুযোগ বা নির্বাচনের তুলনায় নিজে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হারিয়ে ফেলেছি বলে মনে হওয়া।

কুদ্দুসের ফোন ভালোই চলছে। কিন্তু গ্রামের আরেকজন একই বাজেটে ভিন্ন ব্র্যান্ডের ফোন কিনেছে। সেই ফোনের ছবি হয়তো একটু ভালো। সঙ্গে সঙ্গে কুদ্দুসের মনে হতে পারে, তার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।

ডিজিটাল বাজার এই তুলনাকে আরও বাড়ায়। নতুন মডেল, review, unboxing, মূল্যছাড় ও “সেরা ফোন” তালিকা প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে আরও একটি বিকল্প ছিল, যা হয়তো বেছে নেওয়া যেত।

ফলে ক্রয়ের পরও নির্বাচন শেষ হয় না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও বাজার মনের মধ্যে খোলা থাকে।

এই ঘটনাটির নাম কী?

এই পুরো সমস্যাকে সাধারণত Choice Overload, Overchoice অথবা জনপ্রিয় আলোচনায় Paradox of Choice বলা হয়।

Choice Overload

বিকল্পের সংখ্যা, জটিলতা ও পারস্পরিক সাদৃশ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক খরচ এমনভাবে বাড়িয়ে দেয়, যাতে মানুষ সিদ্ধান্তহীনতা, বিলম্ব, অনুশোচনা, আত্মসন্দেহ কিংবা ক্লান্তির মধ্যে পড়েন।

বাংলায় একে বলা যেতে পারে অতিবিকল্পের চাপ, বিকল্পের ভার কিংবা পছন্দের প্যারাডক্স।

আলভিন টফলার ১৯৭০ সালের Future Shock বইয়ে overchoice ধারণাটি ব্যবহার করেন। বইটির বৃহত্তর আলোচনার বিষয় ছিল দ্রুত সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে মানুষের মানসিক চাপ ও দিকভ্রান্তি।

পরবর্তীকালে ব্যারি শোয়ার্জের ২০০৪ সালের The Paradox of Choice: Why More Is Less বই ধারণাটিকে সাধারণ পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে।

শোয়ার্জের মূল বক্তব্য বিকল্পের বিরোধিতা নয়। তাঁর যুক্তি হলো, পছন্দ ও স্বাধীনতা মানুষের কল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সীমাহীন বিকল্প সবসময় কল্যাণ বাড়ায় না। কখনো তা সিদ্ধান্ত স্থবিরতা, অসন্তুষ্টি ও অনুশোচনা বাড়াতে পারে।

বিখ্যাত জ্যাম পরীক্ষা আমাদের কী বলে?

When Choice Is Demotivating

শিনা আয়েঙ্গার ও মার্ক লেপারের গবেষণায় বড় জ্যামের প্রদর্শনী বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করলেও ছোট বিকল্পসমষ্টির অবস্থায় ক্রয়ের হার বেশি ছিল। তবে এই ফলাফল থেকে বেশি বিকল্প সব পরিস্থিতিতে খারাপ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

শিনা আয়েঙ্গার ও মার্ক লেপারের ২০০০ সালের গবেষণার একটি অংশ “জ্যাম পরীক্ষা” নামে পরিচিত।

একটি দোকানে কখনো ছয় ধরনের জ্যাম এবং কখনো চব্বিশ ধরনের জ্যাম প্রদর্শন করা হয়েছিল। বড় প্রদর্শনী বেশি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু সীমিত বিকল্পের অবস্থায় ক্রয় করার হার বেশি ছিল।

গবেষণাটির অন্য পরীক্ষাগুলোতেও সীমিত বিকল্প পাওয়া অংশগ্রহণকারীদের কাজ শুরু করা, নির্বাচনের সন্তুষ্টি ও কাজের মানে কিছু সুবিধা দেখা গিয়েছিল।

এই ফলাফল আকর্ষণীয়। কিন্তু এখান থেকে “বেশি বিকল্প সবসময় খারাপ” সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

Choice Overload কখন বেশি দেখা দিতে পারে?

  • বিকল্পগুলো তুলনা করা কঠিন হলে
  • নিজের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার অস্পষ্ট হলে
  • পণ্য সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকলে
  • কোনো বিকল্প স্পষ্টভাবে এগিয়ে না থাকলে
  • ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ক্ষতি বেশি হলে
  • দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ থাকলে

২০১৫ সালের ৯৯টি পর্যবেক্ষণ ও ৭,২০২ অংশগ্রহণকারীর তথ্য নিয়ে করা meta-analysis চারটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক চিহ্নিত করে: choice-set complexity, decision-task difficulty, preference uncertainty এবং decision goal

অর্থাৎ আবদুল কুদ্দুসের সমস্যা শুধু দোকানে অনেক ফোন থাকার কারণে নয়। ফোনগুলো জটিল, কাছাকাছি মানের, কুদ্দুসের অগ্রাধিকার অস্পষ্ট এবং তার লক্ষ্য “যথেষ্ট ভালো” নয়, “সর্বোচ্চ ভালো” ফোন খুঁজে বের করা।

“সেরা” খোঁজার ফাঁদ

এখানে কুদ্দুসের সবচেয়ে বড় সমস্যা ফোনের সংখ্যা নয়। সমস্যা তার লক্ষ্য।

সে নিজের জন্য উপযুক্ত ফোন খুঁজছে না। সে বাজারের “সর্বোচ্চ ভালো” ফোন খুঁজছে।

কিন্তু ২৫ হাজার টাকার মধ্যে সর্বাধিক ক্যামেরা, সর্বাধিক ব্যাটারি, দ্রুততম প্রসেসর, সবচেয়ে বেশি RAM, দীর্ঘতম আপডেট, সবচেয়ে পরিচিত ব্র্যান্ড এবং সর্বোত্তম বিক্রয়োত্তর সেবা একই ফোনে নাও থাকতে পারে।

Decision Style প্রধান লক্ষ্য সম্ভাব্য অভিজ্ঞতা
Maximizer সম্ভাব্য সর্বশ্রেষ্ঠ বিকল্প খোঁজা বেশি তুলনা, সময় ও অনুশোচনা
Satisficer প্রয়োজন পূরণকারী যথেষ্ট ভালো বিকল্প খোঁজা দ্রুত সিদ্ধান্ত ও তুলনামূলক কম অনুশোচনা

ব্যারি শোয়ার্জের আলোচনায় maximizer সম্ভাব্য সর্বোত্তম বিকল্প খোঁজেন। অন্যদিকে satisficer নিজের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করা যথেষ্ট ভালো বিকল্প গ্রহণ করেন।

যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচনের মানদণ্ড স্পষ্ট না হয়, ততক্ষণ বিকল্প কমিয়েও সমস্যার পুরো সমাধান হবে না।

সঠিক সিদ্ধান্তের আগে সঠিক প্রশ্ন প্রয়োজন।

দক্ষ মানুষ কেন কখনো একটি পথ বেছে নিতে পারেন না?

এখন শুরুতে বলা বহু দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক।

একজন মানুষ হয়তো লেখালেখি, শিক্ষকতা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, বিপণন ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষ। বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এত দক্ষতা থাকলে তাঁর সুযোগ বেশি হওয়া উচিত।

বাস্তবে সুযোগ বাড়তে পারে। আবার সিদ্ধান্তও কঠিন হতে পারে।

কোন পরিচয় সামনে আনবেন?

কোন দক্ষতাটি পেশা হবে?

কোনটি পার্শ্বপ্রকল্প থাকবে?

কোন কাজ দ্রুত আয় দেবে?

কোনটি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠা দেবে?

কোনটি ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে আফসোস হবে?

বহু দক্ষতার মানুষ অনেক সময় একটি কাজ বেছে নেওয়াকে অন্য সব সম্ভাবনার মৃত্যু মনে করেন। ফলে কোনো একটি পথে দীর্ঘ সময় বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে দক্ষ মানুষের বেকারত্বকে শুধু choice overload দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। শ্রমবাজার, সুযোগের অভাব, সামাজিক যোগাযোগ, ভৌগোলিক সীমা, নিয়োগব্যবস্থা, অর্থনৈতিক মন্দা ও বৈষম্যের মতো কাঠামোগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কেও কি একই সমস্যা ঘটে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও dating platform মানুষকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সম্ভাব্য পরিচয়ের সামনে নিয়ে আসে। বাহ্যিকভাবে এটি স্বাধীনতা বাড়ায়।

কিন্তু প্রতিটি মানুষকে যদি আরেকটি সম্ভাব্য বিকল্পের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগেই মূল্যায়ন শুরু হয়।

আরও আকর্ষণীয় কেউ কি আছেন?

আরও সফল?

আরও বুদ্ধিমান?

আরও মানানসই?

আরও স্থিতিশীল?

মানুষ তখন কোনো বাস্তব ব্যক্তিকে গ্রহণ না করে একটি কল্পিত সর্বোত্তম মানুষের অপেক্ষা করতে পারেন। কিন্তু সেই কল্পিত মানুষটি বহু আলাদা ব্যক্তির সেরা বৈশিষ্ট্যের সম্মিলিত নির্মাণ। বাস্তবে এমন কেউ নাও থাকতে পারেন।

তাই বহু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেউ সাধারণ জীবনযাপনের একজন মানুষকে বেছে নিলে সেটিকে ব্যর্থ নির্বাচন বলা যায় না। হয়তো সেই ব্যক্তি বিকল্পের সংখ্যা নয়, সম্পর্কের গুণমানকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

ভালো নির্বাচন সবসময় সবচেয়ে বেশি সামাজিক মূল্যসম্পন্ন মানুষকে বেছে নেওয়া নয়। কখনো ভালো নির্বাচন হলো এমন একজনকে বেছে নেওয়া, যাঁর সঙ্গে বাস্তব জীবন সম্ভব।

সব বিকল্প কমিয়ে ফেলাই কি সমাধান?

না।

একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়, একটি পেশা, একটি পণ্য বা একটি জীবনপথ চাপিয়ে দেওয়া স্বাধীনতা নয়। বিকল্প প্রয়োজন, কারণ মানুষের প্রয়োজন, সামর্থ্য, আগ্রহ ও মূল্যবোধ আলাদা।

সমস্যা বিকল্পের অস্তিত্বে নয়। সমস্যা অগোছালো বিকল্প, অস্পষ্ট অগ্রাধিকার এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিখুঁত ফল পাওয়ার অবাস্তব দাবিতে।

বিকল্পের ভার কমানোর সাতটি উপায়

  1. নিজের প্রধান তিনটি প্রয়োজন আগে নির্ধারণ করুন।
  2. সর্বোচ্চ বাজেট স্থির রাখুন।
  3. সব বিকল্প নয়, তিন বা চারটির সংক্ষিপ্ত তালিকা তুলনা করুন।
  4. “সেরা” নয়, নিজের জন্য “যথেষ্ট ভালো” বিকল্প খুঁজুন।
  5. সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করুন।
  6. সিদ্ধান্তের পরে বাজার থেকে মানসিকভাবে বেরিয়ে আসুন।
  7. খারাপ ফল হলেই অতীতের সিদ্ধান্তকে নির্বোধ বলবেন না।

নিজের প্রধান প্রয়োজন আগে নির্ধারণ করুন

ফোন কেনার আগে ঠিক করুন, আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় কী। যেমন ব্যাটারি, ক্যামেরা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার। সব specification-কে সমান গুরুত্ব দিলে তুলনা কখনো শেষ হবে না।

সর্বোচ্চ বাজেট স্থির রাখুন

“আর মাত্র দুই হাজার টাকা” বলতে বলতে বাজেটের সীমা হারিয়ে ফেলবেন না। আর্থিক সীমা একটি দুর্বলতা নয়। এটি বিকল্প ছাঁটাইয়ের কার্যকর মানদণ্ড।

একটি ছোট তালিকা তুলনা করুন

একশটি ফোন থেকে সরাসরি একটি বেছে নেওয়ার চেষ্টা না করে প্রথমে তিন বা চারটি উপযুক্ত মডেলের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করুন।

“সেরা” নয়, “যথেষ্ট ভালো” খুঁজুন

সব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়। আপনার প্রধান প্রয়োজন পূরণ করে এবং বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না, এমন বিকল্পই যথেষ্ট ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সিদ্ধান্তের সময়সীমা নির্ধারণ করুন

অনির্দিষ্ট সময় ধরে গবেষণা করলে নতুন তথ্য ও নতুন বিকল্প আসতেই থাকবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত শেষ করার নিয়ম তৈরি করুন।

সিদ্ধান্তের পরে বাজার থেকে মানসিকভাবে বেরিয়ে আসুন

কেনার পর প্রতিদিন দাম, নতুন মডেল ও অন্যের specification দেখা চালিয়ে গেলে সন্তুষ্টি কমবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নির্বাচিত পণ্যটি ব্যবহার করুন।

ফলাফল খারাপ হলেই সিদ্ধান্তকে নির্বোধ বলবেন না

ভালো সিদ্ধান্তও খারাপ ফল দিতে পারে। কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখনকার তথ্যের ভিত্তিতে। ভবিষ্যতের অজানা তথ্য দিয়ে অতীতের সিদ্ধান্তকে বিচার করলে নিজের প্রতি অন্যায় করা হয়।

শেষ কথা

আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করেছি, বেশি বিকল্প মানেই বেশি স্বাধীনতা। কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা নয়। বিকল্পের অভাব মানুষকে বন্দী করে। পছন্দের সুযোগ মানুষকে নিজের প্রয়োজন, মূল্যবোধ ও পরিচয় অনুযায়ী জীবন গড়তে সাহায্য করে।

কিন্তু স্বাধীনতারও ওজন আছে।

প্রতিটি নতুন বিকল্প নতুন সম্ভাবনা দেয়। একই সঙ্গে নতুন তুলনা, নতুন অনুশোচনা এবং নতুন দায় তৈরি করে।

আবদুল কুদ্দুস ২৫ হাজার টাকায় একটি ফোন কিনতে গিয়েছিল। বাজার তাকে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বাধীনতার মূল্য ছিল তিন ঘণ্টার অনুসন্ধান, অসংখ্য তুলনা, বাদ পড়া ফোনগুলোর আফসোস এবং বাড়ি ফিরে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ।

তার ফোনটি হয়তো খারাপ ছিল না। তার সমস্যা ছিল, না-কেনা প্রতিটি ফোন তার মনের মধ্যে আরও ভালো হয়ে বেঁচে ছিল।

জীবনেও আমরা প্রায়ই একই ভুল করি। যে পেশাটি নিইনি, যে শহরে যাইনি, যে সুযোগটি গ্রহণ করিনি, যে সম্পর্কটি শুরু হয়নি, সেগুলোকে বাস্তবের সীমাবদ্ধতা ছাড়া কল্পনা করি। আর যে জীবনটি বেছে নিয়েছি, তার প্রতিটি সীমাবদ্ধতা প্রতিদিন দেখি।

ফলে বাস্তব জীবন সবসময় অসম্পূর্ণ এবং না-বেছে নেওয়া জীবন সবসময় নিখুঁত মনে হয়।

Paradox of Choice আমাদের বিকল্প ত্যাগ করতে বলে না। এটি আমাদের শেখায়, সব সম্ভাবনা ধরে রেখে কোনো একটি জীবন সম্পূর্ণভাবে বাঁচা সম্ভব নয়।

একটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হলে অন্য দরজাগুলোকে সাময়িকভাবে পেছনে ফেলতে হয়।

একটি ফোন ব্যবহার করতে হলে অন্য ফোনগুলো না কেনার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

একটি পেশায় গভীর হতে হলে কিছু সম্ভাবনাকে অপেক্ষায় রাখতে হয়।

একটি সম্পর্ক গড়তে হলে কল্পিত অসংখ্য মানুষের তুলনা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।

স্বাধীনতা শুধু অনেক কিছু বেছে নেওয়ার ক্ষমতা নয়। স্বাধীনতা হলো কেন একটি পথ বেছে নিচ্ছেন, তা জানা। তারপর না-বেছে নেওয়া পথগুলোর ছায়ায় নিজের বর্তমানকে ছোট না করা।

কারণ সব বিকল্প খোলা রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত মানুষকে মুক্ত রাখে না।

কখনো কখনো কোনো পথেই এগোতে দেয় না।

তথ্যসূত্র ও আরও পড়ুন

  1. Barry Schwartz and Andrew Ward, Doing Better but Feeling Worse: The Paradox of Choice

    বিকল্প, স্বাধীনতা, অনুশোচনা এবং সিদ্ধান্তের মানসিক মূল্য নিয়ে আলোচনা।

  2. Alvin Toffler, Future Shock

    দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন, তথ্যের চাপ এবং অতিবিকল্পের ধারণা।

  3. Sheena S. Iyengar and Mark R. Lepper, When Choice Is Demotivating

    সীমিত ও বিস্তৃত বিকল্পসমষ্টির প্রভাব নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা।

  4. Alexander Chernev, Ulf Böckenholt and Joseph Goodman, Choice Overload: A Conceptual Review and Meta-analysis

    বিকল্পের জটিলতা, সিদ্ধান্তের কঠিনতা, পছন্দের অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তের লক্ষ্য নিয়ে meta-analysis

  5. Benjamin Scheibehenne, Rainer Greifeneder and Peter M. Todd, Can There Ever Be Too Many Options?

    গবেষণাগুলোর মধ্যে choice overload-এর প্রভাব কেন একরকম নয়, তার পর্যালোচনা।

সম্পাদকীয় নোট: এই লেখার আবদুল কুদ্দুস ও স্মার্টফোন কেনার ঘটনাটি ধারণা ব্যাখ্যার জন্য নির্মিত কাল্পনিক উদাহরণ। বহু দক্ষ মানুষের বেকারত্ব, একাকিত্ব, আর্থিক সিদ্ধান্ত কিংবা সম্পর্কের জটিলতাকে শুধু Paradox of Choice দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও বিবেচনা করতে হবে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!