দত্ত পরিবার | পর্ব ০১: যে বাড়িতে ঘড়ি থেমে আছে
রাজবাড়ীর নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন হাসানকে রহস্যময় স্মৃতি দত্ত নিজের প্রাচীন বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দেন। এক মাস পর স্নেহার আগমন এবং ১৯৭১ সালের একটি পারিবারিক ছবি জানিয়ে দেয়, হাসানকে উদ্ধার করা হয়নি, বরং বহুদিন ধরে খোঁজা হচ্ছিল।
অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস
দত্ত পরিবার
পর্ব ০১: যে বাড়িতে ঘড়ি থেমে আছে
লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান
নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন হাসানকে রহস্যময় স্মৃতি দত্ত নিজের প্রাচীন বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দেন। কিন্তু এক মাস পর স্নেহার আগমন এবং ১৯৭১ সালের একটি পারিবারিক ছবি জানিয়ে দেয়, হাসানকে উদ্ধার করা হয়নি। তাকে বহুদিন ধরে খোঁজা হচ্ছিল।
রাজবাড়ি। আমার প্রাণের শহর।
অথচ মানুষ তার প্রাণের কাছেই সবচেয়ে বেশি অপমানিত হয়। দূরের কোনো শহর আপনাকে প্রত্যাখ্যান করলে আপনি তাকে অপরিচিত বলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। নিজের শহর যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন ক্ষমা করার মতো কোনো অজুহাত থাকে না।
শহরটা তখন আমাকে ধীরে ধীরে ত্যাগ করছিল।
কিছুদিন আগে গ্রামের বাড়ি থেকে মা ফোন করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে অনুরোধ ছিল, কিন্তু সেই অনুরোধের আড়ালে আমি একটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেয়েছিলাম।
“বাবা, সম্ভব হলে কিছু টাকা পাঠাস। তোর বাবার ওষুধ শেষ।”
‘সম্ভব হলে’ কথাটা আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ভদ্রতা। আমরা কেউ কাউকে সরাসরি বলি না যে ঘরে চাল নেই, ওষুধ নেই কিংবা দোকানদার আর বাকিতে দিতে চাইছে না। শুধু বলি, সম্ভব হলে কিছু টাকা পাঠিও।
আমি বলেছিলাম, “দুই দিনের মধ্যে পাঠাচ্ছি।”
কথাটা বলার সময় আমার পকেটে ছিল সাতত্রিশ টাকা। তার মধ্যে দশ টাকা দিয়ে সিগারেট কিনব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম।
আমার স্থায়ী কোনো চাকরি ছিল না। আবার একেবারে কিছুই করতাম না, তাও নয়। পেশাটার কোনো সরকারি নাম নেই। ইংরেজিতে নিজের সুবিধামতো নাম দিয়েছিলাম, “Proxy Man”।
ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
চাকরিজীবী মানুষদের মধ্যে যাঁরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও উপস্থিত থাকতে চান, তাঁদের জন্য আমি মাঝেমধ্যে হাজিরা দিতাম। কোনো ছোট অফিসে ফাইল বহন করতাম, কোথাও কারও বদলে প্রশিক্ষণে বসে থাকতাম, আবার কখনো কোনো কোচিং সেন্টারে অসুস্থ শিক্ষকের জায়গায় ইংরেজি পড়াতাম। একবার তো এক ভদ্রলোকের বদলে তাঁর শ্বশুরবাড়িতেও যেতে হয়েছিল। তিনি অফিসের জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলেন। তাঁর শ্বশুরমশাই আমাকে প্রায় আধঘণ্টা ধরে পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে জ্ঞান দিয়েছিলেন। আমি মাথা নিচু করে শুনেছিলাম এবং শেষে পাঁচশ টাকা পেয়েছিলাম।
সেদিনই বুঝেছিলাম, মানুষ নিজের জীবন যাপন করার চেয়ে অন্যের ভূমিকায় অভিনয় করে কখনো কখনো বেশি আয় করতে পারে।
এসব করে কিছু টাকা পাওয়া গেলেও জীবন চলছিল না। বরং জীবন আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল, জানতাম না।
এর মধ্যে হোটেলও ছাড়তে হলো। তিন মাসের ভাড়া বাকি পড়েছিল। মালিক প্রতিদিন সকালবেলা দরজায় ধাক্কা দিয়ে আমার চৌদ্দ পুরুষের নাম উদ্ধার করতেন। শেষ দিন আমার জামাকাপড়, বই আর ভাঙা স্যুটকেস রাস্তায় ছুড়ে ফেলে বলেছিলেন, “স্যার সেজে কোট-টাই পরলেই ভদ্রলোক হওয়া যায় না। ভাড়া দিতে হয়।”
কথাটা ভুল ছিল না। কিন্তু সত্য কথা বলারও একটা ভদ্র পদ্ধতি আছে। সেই পদ্ধতির সঙ্গে হোটেলমালিকের পরিচয় ছিল না।
স্যুটকেসটা এক পরিচিত চায়ের দোকানে রেখে সারাদিন শহরে ঘুরলাম। সন্ধ্যার দিকে ক্ষুধা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে নৈতিকতা, আত্মসম্মান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা একসঙ্গে দুর্বল হয়ে গেল।
তারপর একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে বিনা পয়সায় খেতে বসে গেলাম।
পরিকল্পনাটা সরল ছিল। প্রথমে খাব, পরে দেখা যাবে। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভবিষ্যৎ বলতে বিল আসার আগের সময়টুকুই বোঝায়।
ইচ্ছেমতো অর্ডার করলাম। ভাত, ডাল, সবজি, গরুর মাংস, সালাদ, কোমল পানীয়। শেষে কী মনে করে ফিরনিও চাইলাম। সম্ভবত মানুষ সর্বনাশের দিকে এগোতে থাকলে মাঝপথে থামতে চায় না।
আমার পাশের টেবিলে প্রায় সত্তর বছর বয়সী এক ভদ্রমহিলা বসেছিলেন। সাদা চুলগুলো পরিপাটি করে পেছনে বাঁধা। পরনে কালো পাড়ের সাদা শাড়ি, চোখে পুরোনো নকশার চশমা। তাঁর আঙুলে একটি বড় নীল পাথরের আংটি। তিনি কিছুক্ষণ পরপর আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন।
তাকাবেন না-ই বা কেন? আমি যেভাবে কবজি ডুবিয়ে খাবার মুখে তুলছিলাম, তাতে মনে হচ্ছিল বহু বছর পর সভ্য সমাজে ফিরে এসেছি।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর বিল এল।
পাঁচশ টাকা।
বিলটা দেখে আমার চোখ চড়কগাছ। আমার হিসাব অনুযায়ী একশ থেকে একশ বিশ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু হিসাব সব সময় গরিব মানুষের পক্ষ নেয় না। বাজারে ধানের দাম কমছিল, চালের দাম বাড়ছিল। কৃষক ও ক্রেতা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল, অথচ মাঝখানের লোকেরা দিব্যি বেঁচে ছিল। অর্থনীতির ভাষায় একে কী বলে জানি না। আমার ভাষায় এর নাম ছিল সম্মিলিত প্রতারণা।
ওয়েটার বিল হাতে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, পাঁচশ টাকা।”
আমি বিলটা উল্টেপাল্টে দেখে বললাম, “বিলের মধ্যে প্লেটের দামও যোগ করেছেন?”
সে প্রথমে বুঝতে পারল না।
“মানে?”
“প্লেটগুলো কি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারব?”
ওয়েটারের মুখ বদলে গেল। আমি গম্ভীরভাবে বললাম, “দুঃখিত। আমার কাছে বিল পরিশোধ করার মতো টাকা নেই।”
গায়ে কোট আর গলায় টাই দেখে বেচারা সম্ভবত বকশিশ পাওয়ার আশা করেছিল। সেই আশার ওপর শুধু গুড়ে বালি নয়, পুরো বালুর ট্রাক পড়ে গেল।
রেস্তোরাঁর মালিক কাউন্টার ছেড়ে এগিয়ে এলেন। তাঁর পেট তাঁর আগে আগে চলছিল।
“টাকা নেই মানে? টাকা ছাড়া এত খাবার অর্ডার করেছেন কেন?”
“খিদে পেয়েছিল।”
“খিদে পেলেই চুরি করবেন?”
“চুরি করলে তো না বলে চলে যেতাম। আমি আগেই জানাচ্ছি।”
আমার যুক্তি তাঁর পছন্দ হলো না। তিনি ওয়েটারসহ আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে শুরু করলেন। একসময় পরিস্থিতি ধস্তাধস্তির দিকে গড়াল। কিন্তু আমার কাছে টাকা না থাকায় টাকা দেওয়ার ব্যাপারে আমি অনড় রইলাম।
“আরে ভাই, আমার মানিব্যাগে আজ এক পয়সাও নেই। একটু তো বুঝুন।”
“মানিব্যাগ দেখান।”
আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে খুলে ধরলাম। ভেতরে একটি পুরোনো বাসের টিকিট, মায়ের ছবি আর বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি ব্যাংক হিসাবের কার্ড ছিল।
দীর্ঘদেহী এক ওয়েটার সিনেমার খলনায়কের মতো হাতার বোতাম খুলে আমার দিকে এগিয়ে এল। সে সম্ভবত আমার শার্টের কলার ধরবে। আমি দ্রুত হিসাব করলাম, পালিয়ে দরজা পর্যন্ত যেতে তিন সেকেন্ড লাগবে। কিন্তু দরজার পাশে আরও দুজন দাঁড়িয়ে ছিল।
ঠিক তখন পাশের টেবিলের বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন।
তাঁর খাওয়া শেষ। তিনি নিজের বিলের সঙ্গে আমার বিলটিও হাতে নিয়ে রেস্তোরাঁর মালিককে বললেন, “ওর বিল আমি দিয়ে দিচ্ছি। আপনারা থামুন।”
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ শান্ত হয়ে গেল।
টাকা মানুষের কণ্ঠস্বরের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করে। যার হাতে টাকা থাকে, তার নিচু স্বরও সবাই শুনতে পায়।
রেস্তোরাঁর বাইরে এসে আমি ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ দিতে চাইলাম। তিনি আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, “সিগারেট খাও?”
“হ্যাঁ।”
“আমি প্রকাশ্য জায়গায় ধূমপান করি না। আমার সঙ্গে যাবে?”
“কোথায়?”
“আমার বাসায়।”
আমি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “ভয় নেই। আমি একা থাকি।”
“আপনাকে ভয় পাচ্ছি না। যারা পাঁচশ টাকা দিয়ে অপরিচিত মানুষ উদ্ধার করে, সাধারণত তাদের উদ্দেশ্য পাঁচশ টাকার চেয়ে বড় হয়।”
তিনি এবার সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে বার্ধক্যের ক্লান্তির চেয়ে অপেক্ষা বেশি ছিল।
“তুমি যেতে না চাইলে যেও না।”
রাস্তার পাশে একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়ির রং কয়েক জায়গায় উঠে গেছে, কিন্তু সামনের ছোট ধাতব প্রতীকটি দেখে বোঝা যাচ্ছিল, একসময় গাড়িটি যথেষ্ট দামি ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “গাড়িটা আপনার?”
“না, ব্রিটিশ সরকারের। আমাকে সাময়িকভাবে ব্যবহার করতে দিয়েছে।”
তাঁর মুখে হাসি ছিল না। আমি বুঝতে পারলাম না, তিনি রসিকতা করলেন, না সত্যিই আমার বুদ্ধি পরীক্ষা করলেন।
গাড়িতে উঠে বসলাম।
শহরের আলো পেছনে রেখে আমরা ধীরে ধীরে নির্জন রাস্তার দিকে এগোতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর পাকা রাস্তা ছেড়ে গাড়ি পুরোনো গাছপালায় ঘেরা সরু পথে ঢুকল। দুপাশে বাঁশঝাড়। কোথাও কোথাও বটগাছের শিকড় এত নিচে নেমে এসেছে যে মনে হচ্ছিল অন্ধকারে অসংখ্য হাত ঝুলছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আর কত দূর?”
ভদ্রমহিলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “ভয় পেতে শুরু করেছ?”
“না। তবে আমাকে মেরে ফেললে আমার পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ পাবেন না।”
“তোমার পরিবার আছে?”
“আছে। কিন্তু টাকা নেই।”
তিনি আর কিছু বললেন না।
শহর থেকে অল্প দূরে একটি বিশাল লোহার ফটকের সামনে গাড়ি থামল। ফটকের দুই পাশে পাথরের স্তম্ভ। একটি স্তম্ভের গায়ে শ্বেতপাথরের ফলক বসানো ছিল। শ্যাওলা আর অন্ধকারের কারণে পুরো লেখা পড়তে পারলাম না। শুধু শেষের দুটি শব্দ চোখে পড়ল।
দত্ত ভবন
ড্রাইভার নেমে ফটক খুলে দিলেন। গাড়ি ভেতরে ঢুকতেই বাড়িটা চোখে পড়ল।
আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম।
“এটা বাড়ি, না ছোটখাটো প্রাসাদ?”
ভদ্রমহিলা বললেন, “আমার দাদু জমিদার ছিলেন। এখন অবশ্য জমিদারি নেই, শুধু বাড়িটা আছে। দেয়ালে একটু শ্যাওলা পড়েছে, তাই না?”
“একটু নয়। প্রকৃতি বাড়িটাকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে দাবি করতে শুরু করেছে।”
“তবু টিকে আছে।”
“হ্যাঁ। এত পুরোনো বাড়ি এখনো অক্ষয় হয়ে অমরত্বের সংবাদ দিচ্ছে।”
“কোনো কিছু অনেক দিন টিকে থাকলেই অমর হয় না। কোনো কোনো জিনিস মরতে পারে না বলেই টিকে থাকে।”
কথাটা শুনে আমি বাড়িটার দিকে আবার তাকালাম।
দোতলা বাড়ি। সামনের অংশে উঁচু স্তম্ভ, প্রশস্ত বারান্দা, খিলানযুক্ত জানালা। ছাদের কিনারায় পাথরের কয়েকটি মূর্তি ছিল। অন্ধকারে সেগুলো মানুষ না পশু ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। বাড়ির ডান পাশের জানালাগুলো বন্ধ, কিন্তু বাঁ পাশের দোতলায় একটি জানালায় কোমল হলুদ আলো জ্বলছিল।
ভদ্রমহিলা তো বলেছিলেন, তিনি একা থাকেন।
আমি আলোটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম, জানালার সামনে যেন কেউ সরে গেল।
“ওই ঘরে কে থাকে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
একজন মধ্যবয়সী লোক দরজা খুলে দিলেন। গাড়িটির চালক ছাড়া আর কোনো মানুষকে তখন পর্যন্ত দেখিনি। অথচ বাড়ির ভেতর এতটাই পরিচ্ছন্ন যে নিয়মিত কয়েকজন কাজ না করলে তা সম্ভব নয়।
আমাকে দোতলার একটি চমৎকার ঘরে বসানো হলো। উঁচু ছাদ, ভারী পর্দা, পুরোনো কাঠের আলমারি এবং দেয়ালজুড়ে অচেনা লোকদের প্রতিকৃতি। পুরো ঘরের মধ্যে রাজকীয়তার পাশাপাশি একধরনের চাপা বিষণ্নতা ছিল। দেয়ালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিরাট ঘড়িটি সাড়ে বারোটায় থেমে আছে।
তখন রাত মাত্র নয়টা।
আমার সামনে একে একে ওয়াইনের বোতল, দামি ব্র্যান্ডের সিগারেট এবং রুপালি রঙের একটি অ্যাশট্রে রাখা হলো। ভদ্রমহিলা নিজের গ্লাসে পানীয় ঢাললেন। জল মেশালেন না। তারপর বিশাল খাটটির এক পাশে পা ঝুলিয়ে বসলেন।
আমি সোফায় বসে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “মদ খাও?”
“কখনো কখনো। বলতে পারেন, অন্য কেউ খাওয়ালে।”
“নাম কী তোমার?”
“হাসান। আপনার?”
“স্মৃতি দত্ত।”
“সুন্দর নাম।”
“মুসলিম?”
“নামের ওপর বিশ্বাস করলে তাই।”
তিনি কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“কী করো?”
“বেকার।”
“রেস্তোরাঁয় বলছিলে তুমি প্রক্সি দাও।”
“সেটা পেশা নয়। পেশা বললে পেশাজীবীরা অপমানিত হবেন।”
আমি ওয়াইনের সঙ্গে সামান্য জল মিশিয়ে ছোট একটি পেগ বানালাম। একটি সিগারেট ধরাতেই মনে হলো বহুদিন পর রাজ্যের সুখ আমার সামনে এসে বসেছে। সুখ যে এত সহজে মেলে, তা জানলে মানুষ নীতিবান হওয়ার এত চেষ্টা করত না।
স্মৃতি দত্ত বললেন, “কোথায় থাকো?”
“বর্তমানে আমার কোনো আবাসস্থল নেই।”
“হোটেলে থাকতে?”
আমি চমকে তাঁর দিকে তাকালাম। আমি তাঁকে হোটেলের কথা বলিনি।
তিনি গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, “তোমার স্যুটকেসের সঙ্গে হোটেলের পুরোনো ট্যাগ ঝুলছে। অনুমান করেছি।”
আমি স্বস্তি পেলাম, যদিও আমার স্যুটকেস তখনও চায়ের দোকানে পড়ে ছিল। পরে মনে হলো, তিনি আমার স্যুটকেস দেখলেন কোথায়?
জিজ্ঞেস করার আগেই তিনি বললেন, “তোমাকে একটা প্রস্তাব দিতে চাই। আপত্তি না থাকলে বলি।”
“বলুন। কোনো চাকরি? না কি এই বাড়ির পরিচারক হতে হবে?”
“তোমাদের প্রজন্মের সমস্যা হলো, ভূমিকা শেষ হওয়ার আগেই উপসংহারে চলে যাও।”
“আমাদের জীবন ছোট। সময় বাঁচাতে হয়।”
তিনি প্রথমবার একটু হাসলেন।
“তুমি চাইলে এখানে থাকতে পারো। অনেকগুলো ঘর খালি পড়ে আছে। চাকরি পেলে চলে যেও।”
কয়েক মুহূর্ত তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। পৃথিবীতে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ রাস্তা থেকে তুলে আনা অপরিচিত যুবককে নিজের বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দেয় না। বিশেষ করে সেই বাড়ি যদি প্রাসাদের সমান হয় এবং যুবকটির মানিব্যাগে টাকা না থাকে।
“আপনার মেহেরবানি। কিন্তু এত বড় উপকার কেন করতে চাইছেন?”
তিনি গ্লাসের ভেতর পানীয় ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, “গোপন কথা।”
“আমাকে কি কোনো কাজ করতে হবে?”
“সময় এলে বলব।”
“মানে সওদা?”
“সওদাই ধরো। মঞ্জুর?”
আমি চারপাশে তাকালাম। দামি সিগারেট, থাকার জায়গা, খাবারের নিশ্চয়তা। অন্যদিকে রাস্তায় রাত কাটানোর সম্ভাবনা।
“না বলার মতো অবস্থায় নেই। শুধু ভয় হচ্ছে, মাঝরাতে কেউ গলা টিপে না ধরে।”
স্মৃতি দত্ত হেসে উঠলেন।
হাসির শব্দটা ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। একই সঙ্গে আমার মনে হলো, বন্ধ দরজার ওপাশ থেকেও কেউ যেন হেসে উঠল।
আমি দরজার দিকে তাকালাম।
“কী হলো?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“কিছু না।”
সেই রাতেই আমাকে বাড়ির দক্ষিণ পাশের একটি ঘর দেওয়া হলো। ঘরটি বড়, পরিষ্কার এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আরামদায়ক। তবে ঘরের কাঠের আলমারিটি তালাবদ্ধ ছিল। জানালার পাশে একটি পুরোনো টেবিলে কাচের নিচে কারও হাতের লেখা চিঠি রাখা ছিল। কালি ফিকে হয়ে যাওয়ায় শুধু শেষের লাইনটি পড়তে পেরেছিলাম।
দত্ত পরিবারের কেউ বাড়ি ছেড়ে যায় না।
আমি ভেবেছিলাম, কোনো নাটকীয় পূর্বপুরুষের লেখা। বড়লোক পরিবারের মানুষদের সাধারণ কথাও রহস্যময় করে লেখার অভ্যাস থাকে।
এরপর পুরো একটি মাস প্রায় বসে আর শুয়ে কাটিয়ে দিলাম।
প্রতিদিন তিনবেলা খাবার আসত। আমার জামাকাপড় ধুয়ে ঘরে রেখে যাওয়া হতো। কিন্তু কে এসব করত, কখনো দেখতে পেতাম না। মাঝে মাঝে নিচতলায় কারও হাঁটার শব্দ শুনতাম। বারান্দায় কারও ছায়া চলে যেতে দেখতাম। জিজ্ঞেস করলে স্মৃতি দত্ত বলতেন, “পুরোনো বাড়িতে নানা রকম শব্দ হয়।”
দত্ত ভবনের তিনটি নিয়ম
- উত্তর দিকের বারান্দায় রাত দশটার পর যাওয়া যাবে না।
- নিচতলার পশ্চিম পাশের ঘরটি খোলা যাবে না।
- দেয়ালের কোনো ছবি জায়গা থেকে সরানো যাবে না।
আমি প্রথম দুটি নিয়ম মেনে চললাম। তৃতীয় নিয়মটি ভাঙার প্রয়োজন বোধ করিনি। মৃত মানুষের ছবির সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ ছিল না।
এক সকালে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙল।
প্রথমে মনে হলো, স্মৃতি দত্ত হবেন। তারপর মনে পড়ল, তিনি কখনো আমাকে ঘুম থেকে ডাকেন না। বাড়িতে আর কেউ থাকে না বলেই জানি। গাড়িচালক লোকটিকেও প্রথম রাতের পর আর দেখিনি।
দরজায় আবার শব্দ হলো।
“কে?”
কোনো উত্তর এল না।
বাজার করা হয়নি, গায়ে শার্টও নেই। কোনো বিপদ ঘটেছে ভেবে খালি গায়েই দরজা খুললাম।
দরজা খুলে মনে হলো, পুরোনো বাড়ির সামনে কোনো রাজকন্যা ভুল করে এসে দাঁড়িয়েছে।
লম্বা কালো চুল। তামাটে গায়ের রং। লাল শাড়ি। নিষ্পাপ মুখ, কিন্তু চোখ দুটি মোটেও নিষ্পাপ নয়। উচ্চতা পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির কাছাকাছি। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ।
তাঁকে দেখে প্রথম যে নামটি মাথায় এল, তা ঐশ্বরিয়া রায়। দ্বিতীয় যে কথাটি মনে হলো, তা হচ্ছে, খালি গায়ে দরজা খোলাটা ভুল হয়েছে।
যুবতী অবশ্য আমার পোশাকহীনতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না।
“হাসান সাহেব, আমাদের পরিচিতি পর্ব এখনো হয়নি। মা বললেন, আপনার সঙ্গে অন্তত একবার দেখা করা উচিত। আপনি এই বাড়ির অতিথি বলে কথা।”
“মা?”
“স্মৃতি দত্ত আমার মা।”
আমি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্মৃতি দত্ত বলেছিলেন, তিনি একা থাকেন। হয়তো তাঁর কাছে বাড়িতে থাকা আর অস্তিত্বশীল থাকা একই বিষয় নয়।
“সে না হয় বুঝলাম। কফি হাতে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন?”
“আপনার জন্যই কফিটা করেছি। কিন্তু আপনি তো ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন না।”
আমি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালাম।
“আসুন, মিস...”
“মিস স্নেহা দত্ত।”
তিনি ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর কফির কাপ রাখলেন। আমি দ্রুত একটি শার্ট গায়ে দিলাম। বোতাম লাগাতে গিয়ে প্রথমটি ভুল ঘরে ঢোকালাম।
স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শার্টটি আপনার সঙ্গে মানানসই হচ্ছে না।”
“আপনার সঙ্গে লাল শাড়িটা মানিয়েছে। কিন্তু স্নেহা দত্ত নামটা একটু বেঢপ।”
“বেঢপ কেন?”
“নাম শুনলে কোমল কোনো মেয়ের কথা মনে হয়। আপনার চোখ দেখে তা মনে হচ্ছে না।”
“আপনি মনে হয় যা বলার মুখের ওপর বলে দেন।”
“মনে যা আসে, সব বলি না। তাহলে সমাজে টিকে থাকা কঠিন হতো।”
তিনি কফির কাপটি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
“কফিটা মুখে নিলে অত্যুক্তি হবে না আশা করি।”
“এক্ষুনি চলে যাবেন, সেই ভয় দেখাচ্ছেন?”
“আমি ভয় দেখাচ্ছি না। ভয় পাচ্ছি।”
“কাকে?”
“আপনাকে।”
আমি হেসে বললাম, “আমার মানিব্যাগে টাকা নেই। ভয় পাওয়ার মতো আর কী আছে?”
তিনি আমার চোখের দিকে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ড। তারপর শান্ত স্বরে বললেন, “আপনার চোখ মিষ্টি কিছু বলছে না। সেখানে অনুরাগ আছে, টানও আছে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি আছে ক্ষুধা।”
“সকালের নাশতা করিনি।”
“আমি খাবারের ক্ষুধার কথা বলিনি।”
কথাটা বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর চলে যাওয়া দেখলাম। বুকের ভেতর অস্বস্তিকর দ্রুততায় কিছু একটা শব্দ করছিল। হয়তো হৃদস্পন্দন। হয়তো প্রেমে পড়ার প্রাথমিক লক্ষণ।
তবে চাকরি নেই। প্রেমে পড়ার মতো বিলাসিতা বেকার মানুষের জন্য নয়। প্রেমিক হতে গেলে অন্তত চায়ের বিল দেওয়ার সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
পরদিন সকালেও স্নেহা কফি নিয়ে এলেন।
তার পরদিনও।
কয়েক দিনের মধ্যে দরজায় কড়া নাড়ার অভ্যাসটি তিনি বাদ দিলেন। সরাসরি ঘরে ঢুকে টেবিলে কফি রেখে দিতেন। যেন ঘরটি তাঁরই। অবশ্য বাড়িটা সত্যিই তাঁদের। উড়ে এসে জুড়ে বসেছি আমি। তবু সামান্য সৌজন্য দেখানো যেতে পারে।
পরে ভেবে দেখলাম, বেকার ও আশ্রিত মানুষের অধিকারের তালিকা খুব ছোট। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্ভবত সেই তালিকায় পড়ে না।
স্নেহা কখনো পাঁচ মিনিট বসতেন, কখনো আধঘণ্টা। কিন্তু নিজের বিষয়ে প্রায় কিছুই বলতেন না। আমি প্রশ্ন করলে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতেন। শুধু জানতে পারলাম, তিনি দীর্ঘদিন এই বাড়ির বাইরে ছিলেন এবং হঠাৎ ফিরে এসেছেন।
কোথায় ছিলেন, কেন ফিরে এসেছেন, তা বললেন না।
একদিন সকালে তিনি কফি রেখে আমার ঘরের তালাবদ্ধ আলমারিটির সামনে দাঁড়ালেন। আঙুল দিয়ে কাঠের গায়ে জমে থাকা ধুলোয় একটি বৃত্ত আঁকলেন।
“এই আলমারি খোলার চেষ্টা করেছেন?”
“না। চাবি নেই।”
“চাবি থাকলে খুলতেন?”
“মানুষের সামনে বন্ধ দরজা থাকলে খোলার ইচ্ছা হবেই।”
তিনি আমার দিকে না তাকিয়ে বললেন, “এই বাড়ির সব বন্ধ দরজা খোলা উচিত নয়।”
“আপনার মাও একই ধরনের কথা বলেন।”
স্নেহা এবার ঘুরে দাঁড়ালেন।
“মা আপনাকে কী বলেছেন?”
“সময় এলে কাজ দেবেন।”
তাঁর মুখের স্বাভাবিক রং মুহূর্তে বদলে গেল।
“আপনি রাজি হয়েছেন?”
“না বলার মতো অবস্থা ছিল না।”
“আপনার আজই এই বাড়ি থেকে চলে যাওয়া উচিত।”
প্রথমবার তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট ভয় শুনতে পেলাম।
আমি কিছু বলার আগেই নিচতলা থেকে ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ এল। তারপর পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। দেয়ালের সাড়ে বারোটায় থেমে থাকা ঘড়িটি হঠাৎ টিকটিক করতে শুরু করল।
স্নেহা ঘড়ির দিকে তাকালেন।
তাঁর হাত থেকে কফির কাপটি মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।
ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে প্রথমে একটার ঘর ছুঁল। তারপর দুইটা। তারপর তিনটা। যেন বহু বছর থেমে থাকার পর হারিয়ে যাওয়া সময় একসঙ্গে ফিরে পেতে চাইছে।
ঠিক তখন তালাবদ্ধ আলমারির ভেতর থেকে তিনবার শব্দ হলো।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
আমি স্নেহার দিকে তাকালাম। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে।
“ভেতরে কী আছে?”
তিনি উত্তর দিলেন না।
আলমারির নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ বেরিয়ে এল। কাগজটি মেঝেতে পড়ে আমার পায়ের কাছে থামল।
আমি নিচু হয়ে সেটি তুলে নিলাম।
সেটি বহু পুরোনো একটি পারিবারিক ছবি।
ছবির মাঝখানে তরুণী স্মৃতি দত্ত দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ। পেছনে এই বাড়িরই বারান্দা। ছবির ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবকের মুখ দেখে আমার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
যুবকটির পরনে কোট ও টাই।
চেহারাটিও আমার।
ছবির নিচে কালো কালিতে লেখা ছিল:
দত্ত পরিবার, ১৯৭১।
স্নেহা আমার হাত থেকে ছবিটি কেড়ে নিলেন। তারপর এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন প্রথমবার আমাকে দেখছেন।
“আপনার পুরো নাম কী?”
“হাসান।”
“শুধু হাসান নয়। আপনার পুরো নাম বলুন।”
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার বাইরে স্মৃতি দত্তের কণ্ঠ শোনা গেল।
“ছবিটা শেষ পর্যন্ত ওর হাতে পৌঁছেই গেল?”
আমরা দুজন একসঙ্গে দরজার দিকে তাকালাম।
স্মৃতি দত্ত সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর হাতে সেই নীল পাথরের আংটিটি নেই। আংটির জায়গায় একটি গভীর কাটা দাগ।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“দত্ত পরিবারে স্বাগতম, হাসান।”
সেই মুহূর্তে প্রথমবার আমার মনে হলো, রেস্তোরাঁয় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হওয়াটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না।
তিনি আমাকে উদ্ধার করেননি।
তিনি আমাকে খুঁজে পেয়েছিলেন।
চলবে...
লেখক পরিচিতি
মোঃ মেহেদি হাসান একজন লেখক, সম্পাদক, শিক্ষক, অভিনয়শিল্পী ও প্রযুক্তি অনুরাগী। ‘দত্ত পরিবার’ তাঁর রহস্য, স্মৃতি, পরিচয় এবং পারিবারিক ইতিহাসনির্ভর ধারাবাহিক উপন্যাস।
প্রকাশনা তথ্য
এটি একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। কাহিনি, চরিত্র ও ঘটনা লেখকের সৃজনশীল নির্মাণ। জীবিত বা মৃত কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিল পাওয়া গেলে তা অনিচ্ছাকৃত ও কাকতালীয়।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0