দত্ত পরিবার | পর্ব ০৩: স্বপ্নের পশ্চিমঘর

অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস ‘দত্ত পরিবার’-এর ৩য় পর্ব ‘স্বপ্নের পশ্চিমঘর’। বন্ধ দরজার ওপাশের রহস্য, থেমে থাকা সময় ও অতিলৌকিক স্মৃতির এক শিউরে ওঠা সাইকোলজিক্যাল হরর আখ্যান।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৫
দত্ত পরিবার | পর্ব ০৩: স্বপ্নের পশ্চিমঘর
দত্ত পরিবার উপন্যাস পর্ব ৩ ‘স্বপ্নের পশ্চিমঘর’ — রহস্যময় বন্ধ দরজা ও সাড়ে বারোটায় থেমে থাকা সময়

অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস

দত্ত পরিবার

পর্ব ০৩: স্বপ্নের পশ্চিমঘর

লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান

‘দত্ত পরিবার’ ধারাবাহিক প্রসঙ্গে

১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগে বিচ্ছিন্ন একটি পরিবার, ১৯৭১ সালের রহস্যময় ছবি এবং বর্তমান সময়ে ফিরে আসা একটি পরিচিত মুখকে কেন্দ্র করে ইতিহাস, রহস্য, হরর, পারিবারিক নাটক ও ভালোবাসার দীর্ঘ আখ্যান।

ঘুম ভাঙার পর প্রথম যে অদ্ভুত বিষয়টি লক্ষ করলাম, তা হলো সময়।

দেয়ালের পুরোনো সেগুনকাঠের ঘড়িটি এখনো সাড়ে বারোটার ঘরেই নিথর হয়ে থেমে আছে। কিন্তু বন্ধ জানালার কাঠের ফাঁক দিয়ে চুয়িয়ে পড়া একফালি ধূসর আলো স্পষ্ট বলছে, বিকেল গড়িয়ে বাইরে এখন সন্ধ্যার ঘন ছায়া নামছে। আমি দিনের বেলায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এটি এমন এক ভারী ও অস্বস্তিকর ঘুম, যা মানুষকে সতেজ করে না; বরং চেতনাকে আরও অসাড় ও শ্রান্ত করে তোলে। মনে হচ্ছিল, আমার দেহটি হয়তো এই নিস্তব্ধ বিছানায় পড়ে ছিল, কিন্তু মন ঘুরে বেরিয়েছে অন্য কোনো নিষিদ্ধ ও অচেনা জগতে।

মাথার ভেতর একধরনের ঘন ঘোলাটে অনুভুতি। স্মৃতির টুকরোগুলো যেন কোনো অদৃশ্যে হারিয়ে যাওয়া অপরিচিত হাত এলোমেলো করে সাজিয়ে রেখে গেছে; আর সেই হাত বেশ কিছু জরুরি স্মৃতিকে একদম ভুল জায়গায় সঁপে দিয়ে গেছে। আমি আঁকুপাঁকু করে চেষ্টা করছিলাম সেগুলোকে নিজের অভ্যস্ত জায়গায় ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু কিছু স্মৃতি এমন এক অন্ধকার গভীরতায় গিয়ে তলিয়ে গেছে, যেখানে চেতনার কোনো আলোই পৌঁছায় না।

যেমন সেই সুদূর ও অচেনা কণ্ঠস্বর।
যে কণ্ঠ ফিসফিস করে বলেছিল, “তুমি আগেও এ কথা বলেছিলে।”

সেটি কি নিছকই কোনো অলীক কল্পনা ছিল, নাকি সত্যি কেউ এসে কানের কাছে বলে গিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারছি না। কিন্তু স্বপ্নের আবেশ থেকে জেগে ওঠার পর এই শব্দগুলোর সাথে দীর্ঘক্ষণ একা একা লড়াই করতে হয়। অবচেতন মন বারবার সেই রহস্যময় সীমান্তে ফিরে যেতে চায়, যেখানে জাগ্রত বাস্তবতা ও অবচেতন স্বপ্নের মাঝে কোনো শক্ত দেয়াল ছিল না।

আমি কাঠের ছাদের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলাম। ছাদের পুরোনো কড়িকাঠের ফাঁক দিয়ে নামা মলিন ধূসর আলো ঘরের মেঝেতে একধরনের ছায়াময় জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেছে। চোখ বন্ধ করে আবার খুললাম। আলোর রেখাগুলো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেও মনে হলো, সেগুলো নিঃশব্দে সামান্য একটু সামনে এগিয়ে এসেছে।

বিছানা ছেড়ে উঠতে গিয়ে পায়ের নিচে শক্ত ও ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেলাম। নিচু হয়ে তাকিয়ে দেখি, মেঝের ওপর পড়ে আছে একটি ছোট ধারালো ছুরি; যার হাতলটি ক্ষয়ে যাওয়া পুরোনো কালচে কাঠের। স্নেহা কখনো কখনো বিকেলের নাশতায় আপেল কেটে আমাকে খাইয়ে দিত এই ছুরিটি দিয়ে। কিন্তু এটি যে এই নির্জন ঘরে কী করে এল, তা আমার জানা ছিল না।

ছুরিটি হাতে তুলে নিলাম। গোধূলির এই অস্পষ্ট আলোয় ধাতুর শরীরে কোনো উজ্জ্বলতা নেই, অথচ স্পর্শটা হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। এমন হিমশীতল অনুভূতি, যেন কোনো আতঙ্কিত প্রাণী এটিকে বহুক্ষণ ধরে মুঠোর ভেতর চেপে ধরে রেখেছিল, তারপর নিঃশব্দে ফেলে রেখে গেছে।

ঠিক তখনই দরজার নিচের সরু ফাঁক দিয়ে আলোকের একটি সূক্ষ্ম রেখা ভেতরের মেঝেতে এসে পড়ল।

প্রথমেই ভেবেছিলাম, হয়তো বাইরের দীর্ঘ করিডরের আলো। কিন্তু আমি জানি, দত্ত ভবনের নিঝুম করিডরে রাতের বেলা কোনো বাতি জ্বালানো থাকে না। সেখানে যা ঝুলছে, তা কেবল দেওয়ালের সারি সারি তেলচিত্রের নির্জীব প্রতিকৃতিগুলোর কৃত্রিম চোখ; যেগুলো নাকি ঘোর অন্ধকারেও মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

আলোর সেই রেখাটি ধীরে ধীরে আরও চওড়া ও উজ্জ্বল হতে লাগল। না, বাইরে কেউ আলো নিয়ে হেঁটে আসছে না; বরং আলোটিই যেন নিজস্ব কোনো প্রাণ পেয়ে ঘরের দিকে ধেয়ে আসছে। যেন কোনো জীবন্ত সত্তা নিজের অশুভ ইচ্ছায় ঘরের পানে এগোচ্ছে।

হাতে ছুরিটি শক্ত করে চেপে ধরে এক পা এক পা করে দরজার দিকে এগোতে লাগলাম। কাঠের দরজার কাছে পৌঁছে থমকে দাঁড়ালাম। দরজার হাতল শক্ত করে ধরলাম, তবে পরক্ষণেই মনে হলো, আমি ছুরিটিকে ধরে নেই; বরং ছুরিটির ভেতরের কোনো এক গোপন শক্তি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দরজার ওপারে।

দরজা খুলতেই এক অদ্ভুত উজ্জ্বল আলোর ঝিলিকে চোখ ধাঁধিয়ে গেল।
আর যখন চোখ মেললাম, সামনে স্নেহা দত্ত দাঁড়িয়ে আছেন।

তিনি পরনে ধবধবে সাদা শাড়ি। তবে সেই সাদার মাঝে স্বাভাবিক কোনো পরিচ্ছন্নতা ছিল না; তা ছিল একধরনের অলৌকিক ও নিষ্প্রভ ধবলতা। যেন চাঁদের সরাসরি আলো এসে পড়েছে তাঁর অবয়বে, অথচ আকাশের দিকে তাকিয়ে কোথাও কোনো চাঁদ দেখতে পেলাম না। জানালার বাইরে তো এখনো কেবল গোধূলির আবেশ, আকাশে তো এখনো চাঁদ ওঠার কথা নয়!

তাঁর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রাঞ্জল হাসি। তবে সেই হাসি যেন কোনো পুরোনো অ্যালবামের ছবি থেকে কেটে এনে চিপকে দেওয়া হয়েছে। একদম স্থির, নির্জীব। সেই চোখে কোনো প্রাণের পুলক নেই, কোনো আবেগ নেই। মনে হলো, এই হাসিটি কেবল মুখের চামড়ার ওপর চাপিয়ে রাখা একটি মুখোশ, ভেতরে পুরো অস্তিত্বটাই শূন্য।

“ভেতরে আসব?” তিনি ধীরকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।

“সন্ধ্যাবেলায় এখানে কী করছেন?” আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম। নিজের কণ্ঠস্বর কানে আসতেই চমকে উঠলাম। মনে হলো, এ তো আমার নিজের গলা নয়; যেন অনেক আগে ক্যাসেটে রেকর্ড করে রাখা অন্য কারও যান্ত্রিক শব্দ।

“সন্ধ্যাবেলায় আপনার কাছে আসা কি বারণ?”

“না, তা তো নয়। কিন্তু—”

“কিন্তু কী?” তিনি আরও এক পা ঘরের ভেতর এগিয়ে এলেন। আমি বাধ্য হয়ে পিছিয়ে গেলাম। পিঠ গিয়ে ঠেকলো ঘরের কাঠের দেয়ালে। আর পেছনে সরার কোনো পথ নেই।

“লক্ষ্য করছি, আমার প্রতি আপনার মনোযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। হতে পারে আমি বয়সে ছোট, কিংবা আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সুন্দরী রমণীদের মতো অত চটুল নই। এমনকি অতটা ফর্সাও হয়তো নই। তাই নয় কি?

কথাগুলো শুনে আমার ভেতরের চেতনায় বিপদের সংকেত বেজে উঠল। এটি স্নেহা হতে পারেন না! আসল স্নেহা কখনো এভাবে কথা বলেন না। তিনি যখন কথা বলেন, তাঁর বাক্যে কোনো করুণা খোঁজার চেষ্টা থাকে না; তাঁর প্রতিটি শব্দ ছিল এক একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই স্নেহা অনবরত প্রশ্ন করছেন। প্রশ্ন করছেন এমন এক ভঙ্গিতে, যেন উত্তর তাঁর জানা নেই; অথচ তাঁর নিষ্প্রাণ চোখ দুটি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, উত্তর তাঁর অনেক আগেই জানা।

“সেটা তো ঔপনিবেশিক মানসিকতার দোষ,” নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম। “তবে এই নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।”

“কিন্তু স্পর্শ করতে বোধহয় আপনার প্রচণ্ড আপত্তি আছে,” তিনি আরও কাছে ঘেঁষে এলেন। “এতগুলো দিন আমরা একই ছাদের নিচে কাটিয়ে দিলাম, অথচ একবারের জন্যও কি আমার হাত দুটি ছুঁয়ে দেখেছেন?”

“স্নেহা, আমি নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি।”

“নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলাটাই তো জীবন্ত মানুষের ধর্ম। সবসময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে ধরে রাখার অর্থ তো একপ্রকার মরে থাকা।”

“আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন, আমি একজন পুরুষ। আর আপনি মিসেস দত্ত—”

“মিসেস দত্তের কী?” তিনি আরও এক ধাপ সামনে এলেন। এবার তাঁর নিঃশ্বাসের তাণ্ডব অনুভব করা যাচ্ছে। “মিসেস দত্ত কি কিছুই বোঝেন না? নাকি সব জেনেও না দেখার ভান করে থাকেন?”

“মি. হাসান, আপনি এখনো অবুঝ বালকের মতো আচরণ করছেন।
সত্যিকারের পুরুষ হলে এতক্ষণে আমাকে সাগ্রহে ভেতরে নিমন্ত্রণ জানাতেন।

আমি কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি আচমকা আমার ডান হাতটি চেপে ধরলেন।

স্পর্শটি আপাতদৃষ্টিতে কোমল মনে হলেও, সেই কোমলতার গভীরে এক অস্বাভাবিক চাপ লুকিয়ে ছিল। যেন ওই হাতের ওপর অলক্ষ্যে আরও একটি শক্ত হাত ভর করে আছে, যা আমাকে কোনোভাবেই ছাড়তে চাইছে না। আমি হাতটি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু শরীরের সমস্ত শক্তি যেন একমুহূর্তে উবে গেল।

“আপনি কি প্রমাণের অপেক্ষা করছেন?” তিনি ফিসফিস করে বললেন। “তবে তাই হোক।”

আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁর কোমর স্পর্শ করলাম। শাড়ির মিহি সুতো যেন বাতাসের তরঙ্গে ভাসছে, অথচ ঘরের ভেতরের বাতাস একদম স্তব্ধ। তাঁর শরীরের তাপমাত্রা আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও, স্পর্শ করার সাথে সাথে মনে হলো আমার হাতের নিজস্ব উত্তাপ দ্রুত কমে যাচ্ছে। যেন তিনি আমার শরীর থেকে ধীরে ধীরে জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছেন।

এক অচেনা উন্মাদনায় তাঁকে দুই বাহুতে তুলে নিলাম। শরীরটি ছিল অদ্ভুত রকমের হালকা। অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য হালকা! যেন কোনো মানুষ নয়, কাঠের তৈরি একটি ফাঁপা পুতুল আমি কোলে তুলে নিয়েছি, যার ভেতরে কোনো রক্ত-মাংসের অস্তিত্ব নেই।

তিনি অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখ দুটি দেখতে অপূর্ব সুন্দর হলেও, সেই সৌন্দর্যের মাঝে কোনো আত্মিক গভীরতা ছিল না। মনে হলো যেন কাঁচের তৈরি দুটি কৃত্রিম চোখ; আলো পড়লে ঝিলমিল করে ওঠে, কিন্তু গভীরে কোনো ছায়া ফেলার ক্ষমতা নেই।

তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। ধীরে ধীরে তাঁর ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে পড়লাম। কিন্তু ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ানোর ঠিক আগের মুহূর্তে এক অজানা আশঙ্কায় থমকে গেলাম। এক তীব্র ও উগ্র গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিল। কর্পূরের তীব্র গন্ধের মতো, তবে তার চেয়েও বহুগুণ গাঢ়। যেন শতাব্দী প্রাচীন কোনো অন্ধকার ঘরে বহুযুগ ধরে কোনো পচা বস্তুকে আটকে রাখা হয়েছে।

আমি চুমু খেলাম।
সেই চুমু ছিল শুষ্ক ও প্রাণহীন।
যেন কোনো বহু কাল আগে শুকিয়ে যাওয়া বিষাক্ত ফুলের ওপর ঠোঁট রাখা।

তিনি দুই বাহু দিয়ে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু সেই আলিঙ্গনের ভেতর কোনো ভালোবাসা ছিল না, ছিল এক নির্দয় ও হিংস্র হিংস্রতা। যেন কোনো ক্ষুধার্ত শিকারি তার অসহায় শিকারকে শেষবারের মতো বুক চেপে ধরেছে। আমি সবকিছু স্পষ্ট অনুধাবন করতে পারছিলাম, কিন্তু বুঝে ওঠার পরও আমার কোনো কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। শরীর আর আমার আদেশে চলছিল না, মনও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেবল একটি আদিম ভয় কাজ করছিল: আমি এখান থেকে পালাতে চাই, কিন্তু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অসাড়!

হঠাৎ করেই তিনি আমার বুকের ওপর উঠে বসলেন। তাঁর মুখের সেই মেকি আলোর দ্যুতি মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। চাঁদের ছদ্মবেশী আলো যেন কোনো কালো মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল, আর সেই অন্ধকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো তাঁর প্রকৃত ভয়াবহ রূপ।

তাঁর চোখের তারা দুটি দ্রুত গাঢ় হতে লাগল। যেন চোখের কোটরে বিষাক্ত কালো কুয়াশা জমছে। গোলাপি ঠোঁট দুটি মরণাপন্ন মানুষের মতো ফ্যাকাশে ও নীল হয়ে গেল। কিন্তু সবচেয়ে বীভৎস রূপ নিল তাঁর দাঁতগুলো! সেগুলো আকারে বড় হচ্ছিল না, বরং অত্যন্ত ধারালো ও তীক্ষ্ণ রূপ ধারণ করছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো জরাজীর্ণ ছবির কাঁচের ফ্রেম ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, আর সেই ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো হিংস্রভাবে বাইরের দিকে বেরিয়ে আসছে।

আমি সজোরে ধাক্কা দিয়ে তাঁকে সরিয়ে দিতে চাইলাম।
কিন্তু তিনি অন্য পাশে গিয়ে ছিটকে পড়লেন না।
তিনি আমার শরীরের ওপর ভর করেই স্থির হয়ে রইলেন।
যেন তাঁর দেহের নিজস্ব কোনো ওজন নেই।
অথবা ওজন আছে, কিন্তু আমার অসাড় শরীর তা অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

তিনি আবার এক হিংস্র হিংস্রতায় আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সেই তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো আমার গলার শ্বাসনালীর দিকে নেমে আসতে লাগল। আমি সাধ্যমতো ধস্তাধস্তি করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাঁর শীর্ণ হাতের ভেতর লুকিয়ে থাকা শক্তির কাছে আমি সম্পূর্ণ পরাস্ত। যেন কোনো অমানবিক শক্তি তাঁর শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, আর সেই শক্তি আমাকে মেঝের সাথে পিসে ফেলছে।

তিনি শক্ত মুঠোয় আমার গলা টিপে ধরলেন। আমার শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে এল, দম আটকে আসতে লাগল। চোখের দৃষ্টির সামনে ঘন অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করল। কিন্তু সেই অতল অন্ধকারের আড়ালে আমি একটি স্পষ্ট দৃশ্য দেখতে পেলাম: দত্ত ভবনের সেই অভিশপ্ত পশ্চিমঘর! সেই শক্ত কাঠের বন্ধ দরজা। দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে এক কনকনে হিমশীতল বাতাস ধেয়ে আসছে, আর সেই বাতাসের সাথে ভেসে আসছে এক সুদূর কণ্ঠস্বর।

ঘন অন্ধকারের ভেতর থেকে সেই একই কণ্ঠস্বর পুনরায় বেজে উঠল:

“তুমি আগেও এ কথা বলেছিলে।”

আমার হাত দুটি অবশ অবস্থায় বিছানায় ও মেঝেতে আঁকুপাঁকু করছিল। সেই কাঠের হাতলওয়ালা ছুরিটিকে পাগলের মতো খুঁজছি। কিন্তু ছুরিটি তো একটু আগেও আমার হাতেই ছিল! আমি কি ওটা হাত থেকে ফেলে দিয়েছিলাম? কিছুই মনে করতে পারছি না। কিচ্ছু না! কেবল কানের পাশে বাজতে থাকা সেই কণ্ঠস্বর। যে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমি অতীতেও এই বাড়িতে এসেছিলাম, অতীতেও এই একইভাবে প্রাণ হারিয়েছিলাম, আবার ফিরে এসেছি।

হঠাৎ আমার আঙুল ঠান্ডা ধাতুর স্পর্শ পেল। ছুরি!

কোনো কিছু না ভেবে, সম্পূর্ণ অন্ধের মতো ছুরিটি উঁচিয়ে সেই অতিলৌকিক শক্তির দিকে তীব্র শক্তিতে চালিয়ে দিলাম।

বাতাসে কোনো চিৎকার ধ্বনিত হলো না, কোনো আর্তনাদ শোনা গেল না। কেবল একটি অস্পষ্ট শব্দ হলো; যেন পুরোনো কোনো ক্যানভাসের মোটা কাপড় মাঝখান থেকে হঠাৎ ছিঁড়ে গেল। পরমুহূর্তেই কালচে গরম কোনো তরল এসে আমার মুখ ও বুকে ছড়িয়ে পড়ল। রক্ত! কিন্তু এই রক্তের মাঝে কোনো তাজা আয়রনের গন্ধ ছিল না; এটি ছিল তীব্র কর্পূর ও জরাজীর্ণ ঘরে জমিয়ে রাখা স্যাঁতসেঁতে ধুলোর বিশ্রী গন্ধ।

আমি খুন করেছি!
কিন্তু কাকে?
স্নেহা দত্তকে?
নাকি এমন কোনো অশুভ শক্তিকে, যা স্নেহার রূপ ধরে আমাকে ধ্বংস করতে এসেছিল?

“মি. হাসান?”

কণ্ঠস্বরটি ভেসে এল অনেক দূর থেকে। অথচ মনে হলো কণ্ঠটি ভীষণ কাছেই কোথাও আছে। কাছে, কিন্তু বাস্তবের অন্য কোনো স্তরে। যেন শক্ত ইটের দেয়ালের ওপার থেকে কেউ মৃদু গলায় ডাকছে।

“মি. হাসান? আপনি কি ভেতরে আছেন? সব ঠিক আছে তো?”

আমি আচমকা চোখ খুললাম।

ঘরে কেউ নেই। ঘরের ভারী কাঠের দরজা বন্ধ। জানালার পর্দা আগের মতোই নিশ্চল। বিছানার চাদরে কোনো রক্তের দাগ নেই। এমনকি আমার হাতেও কোনো রক্ত কিংবা ছুরি নেই।

কিন্তু দেয়ালের সেই মেহগনি কাঠের ঘড়িটি এখনো সাড়ে বারোটার ঘরেই নিথর হয়ে আটকে আছে!

আর জানালার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে পড়া আলো স্পষ্ট বলছে, এখনো গোধূলির আলো কাটেনি। এখন সন্ধ্যা ছয়টা। আমি তাহলে ঘুমিয়েছিলাম! কিন্তু কতক্ষণের জন্য? এক মিনিট? এক ঘণ্টা? নাকি বহু শতাব্দী ধরে?

“মি. হাসান?”

কণ্ঠটি আবার দেওয়াল ভেদ করে ভেতরে এল।
এবার অত্যন্ত স্পষ্ট।
অত্যন্ত জীবন্ত ও বাস্তব।

আমি দরজার দিকে তাকালাম। দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে এখন আর কোনো অদ্ভুত আলো আসছে না। কিন্তু ওপাশে কণ্ঠটি রয়ে গেছে। স্নেহা দত্তের কণ্ঠ। কিন্তু স্নেহা দত্ত কি সত্যি এখনো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন? নাকি তিনি কখনোই ঘরের ভেতরে আসেননি? অথবা তিনি ভেতরেই ছিলেন, কিন্তু অন্য কোনো ভীতিপ্রদ রূপে?

আমি ধীরপায়ে উঠে দাঁড়ালাম। পায়ের নিচে মেঝের কাঠ এখন নিরেট ও বাস্তব। এটি কি তবে সত্যি বাস্তবতা? কিন্তু এই বাস্তবতা কতটুকু খাঁটি? ঘুমের ঘোরাঘুরির মাঝে যা ঘটে গেল, তা কি শুধুই এক দুঃস্বপ্ন? নাকি তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল কোনো নির্মম সত্য, যা অবচেতন মনের আড়ালে আত্মপ্রকাশ করেছিল?

আমি দরজার খিল খুলে দিলাম।

বাইরে দীর্ঘ করিডরটি ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। তবে সেই অন্ধকারের মাঝে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন স্নেহা দত্ত। তাঁর হাতে কোনো কফির কাপ নেই, তাঁর মুখে সেই মেকি চটুল হাসিও নেই। তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি ঠিক আছেন? ভেতর থেকে শব্দ পাচ্ছিলাম।”

“আমি ভালো আছি,” গলায় জোর এনে বললাম। “কিন্তু আপনি কেমন আছেন?”

তিনি স্থির চোখে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরকণ্ঠে বললেন, “আমি কখনোই ভালো থাকি না। কিন্তু আজ রাতে আপনার ঘরের দরজাটা খোলা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলাম।”

“খোলা ছিল?”

“হ্যাঁ। আমি একটু আগে দুবার এই করিডর দিয়ে গিয়েছি। প্রথমবার আপনার দরজা বন্ধ ছিল, কিন্তু দ্বিতীয়বার এসে দেখি দরজাটা অর্ধেকের মতো খোলা।”

“কিন্তু আমি তো দরজা খুলিনি!”

তিনি আর কোনো মন্তব্য করলেন না। কেবল করিডরের শেষ প্রান্তের ঘোর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন সেই অন্ধকারের ঘন ছায়ায় এমন কেউ দাঁড়িয়ে আছে, যাকে তিনি চেনেন; যাকে তিনি বহু বছর ধরে ভয় পেয়ে আসছেন।

তারপর তিনি ফিসফিস করে অত্যন্ত সতর্ক গলায় বললেন:

“পশ্চিমঘরের দরজাটি আজ রাতে খোলা ছিল না।
কিন্তু ভেতর থেকে কেউ একজন অনবরত দরজায় আঘাত করছিল।

আমি চমকে উঠে তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। তাঁর চোখেমুখে সেই চরম আতঙ্কের ছায়া! যে ভয়টি আমি প্রথম দিন এই বাড়িতে পা রাখার পর তাঁর চোখে দেখেছিলাম, যখন তিনি আমাকে গোপনে সতর্ক করে বলেছিলেন এই অভিশপ্ত বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে।

“কে ছিল ভেতরে?” আমি নীচু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি সেই প্রশ্নের কোনো জবাব দিলেন না। কেবল করিডরের দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। সাড়ে বারোটায় থেমে থাকা সেই রহস্যময় ঘড়ি; যার কাঁটা কখনো এক চুল এগোয় না, অথচ যার ছায়ায় সময় নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে।

“এখন গিয়ে শুয়ে পড়ুন, মি. হাসান,” তিনি আলতো করে বললেন। “তবে ঘরের দরজাটা ভালো করে বন্ধ রাখবেন। আর শোনেন, রাতে যদি অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ আপনাকে নাম ধরে ডাকে—”

তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন।

“যদি কেউ ডাকে, তবে কী হবে?”

তিনি সোজাসুজি আমার চোখের গভীরে তাকালেন। আর সেই চাহনির ভেতর ছিল এমন এক শিউরে ওঠা নিস্তব্ধতা, যা আমি এই কয়েক দিনে তাঁর মাঝে কখনোই দেখিনি।

“যদি কেউ আপনাকে অন্ধকারের ভেতর থেকে ডাকে,
মনে রাখবেন, সেটি কখনোই আমি নই।”

তিনি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। করিডরের ঘন অন্ধকারের মাঝে নিঃশব্দে মিলিয়ে গেলেন।

আমি ঘরের ভেতরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। খিল আঁটলাম, তবে তালা দিলাম না। কারণ এই পুরোনো দরজায় তালা ঝুলানোর মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

বিছানায় এসে নিঃশব্দে শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করলাম, কিন্তু চোখের পাতায় ঘুমের বিন্দুমাত্র ছোঁয়া নেই। বারবার মনে হচ্ছে, দরজার ঠিক ওপাশেই কেউ একজন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ একজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কেউ জানে, আমি নিশ্চয়ই কোনো এক রাতে এই দরজা খুলব।

আর সেই রাত হয়তো খুব বেশি দূরে নয়।

কারণ কানের গভীরে এখনো সেই শীতল কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যে কণ্ঠ বলেছিল, “তুমি আগেও এ কথা বলেছিলে।”

আর এবার আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, এটি কোনো মতিভ্রম বা অলীক কল্পনা ছিল না।

এটি ছিল এক হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি।

এমন এক প্রাচীন স্মৃতি, যা আমার এই বর্তমান জন্মের নয়।

চলবে...

রচনা-সংক্রান্ত ঘোষণা

‘দত্ত পরিবার’ একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। এর চরিত্র, পরিবার, বাড়ি ও কেন্দ্রীয় রহস্য সৃজনশীল নির্মাণ। বাস্তব ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ব্যবহৃত হলেও উপন্যাসের পারিবারিক ঘটনা ও ব্যক্তিগত চরিত্রসমূহ কাল্পনিক।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!