ছোটগল্প: এক্সপেক্ট মোর
মহাপ্লাবনের দ্বীপ, একটি খোলা কয়েনের বাক্স, চুরি করা বিস্কুট ও হারানো দাদুর স্মৃতি নিয়ে অর্থ আবিষ্কার ও নির্মাণের রহস্যময় ছোটগল্প।
ছোটগল্প: এক্সপেক্ট মোর
মহাপ্লাবনের পর ছড়িয়ে থাকা দ্বীপগুলোর একটিতে শোভন খুঁজে পায় মরচে ধরা একটি বোর্ড, খোলা কয়েনের বাক্স এবং এমন এক বৃদ্ধকে, যার হাতের স্পর্শ অচেনা স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। কিন্তু ঘুম ভাঙার পরও প্রশ্ন থাকে: মানুষ কি অর্থ আবিষ্কার করে, নাকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও স্মৃতির মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ নিজেই তৈরি করে?
বৃদ্ধকে দেখার অনেক আগে থেকেই শোভন “Expect More” শব্দ দুটির অর্থ জানত।
সমস্যা হলো, কোথায় শিখেছিল, তা জানত না।
সমুদ্রেরও কোনো দেশ আছে কি না, সেটিও তার জানা ছিল না। তার মানচিত্রে রাষ্ট্রের সীমারেখা অনুপস্থিত। সেখানে ছিল শুধু জল, জলের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা অনিয়মিত সবুজ ও ধূসর বিন্দু, আর প্রতিটি বিন্দুর পাশে তার নিজের হাতে লেখা কিছু সংখ্যা ও সংকেত। কোথাও মানুষ আছে, কোথাও বিশুদ্ধ পানি, কোথাও শুধু ভাঙা ভবনের চূড়া, যা ভাটার সময় ডুবে যাওয়া শহরের আঙুলের মতো সমুদ্রের ওপর জেগে ওঠে।
পৃথিবী একসময় কেমন ছিল, শোভনের তা মনে পড়ত না। দ্বীপের বৃদ্ধেরা বলতেন, মহাপ্লাবনের আগে মানুষ নাকি শুকনো মাটির ওপর দিয়ে দিনের পর দিন হেঁটে যেতে পারত। মানুষের দেশ ছিল, সীমান্ত ছিল, পতাকা ছিল। দূরে থেকেও একজন আরেকজনের মুখ দেখতে পেত। শোভনের কাছে এসব অবিশ্বাস্য মনে হতো। জল ছাড়া এত বড় পৃথিবী কীভাবে টিকে থাকতে পারে, সেটিই সে বুঝত না।
তার বয়স আঠারো। লম্বা, উজ্জ্বল চেহারার যুবকটি অচেনা জনপদে সহজেই নজরে পড়ত। কেউ বিস্ময়ে, কেউ সন্দেহে, কেউ এমনভাবে তাকাত, যেন তার মুখে বহু আগে হারিয়ে যাওয়া কারও ছায়া দেখেছে।
শোভন নিজের বাবা-মাকে চিনত না। কোথায় জন্মেছিল, কোন দেশের মানুষ ছিল, এমনকি শোভন তার প্রকৃত নাম কি না, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানত না। তবু পরিচয়হীনতা তাকে দৃশ্যত অস্থির করত না। সে শান্ত, চিন্তাশীল এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম কথা বলত।
তার কাজ ছিল এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়া এবং তথ্য সংগ্রহ করা। মানুষ কতজন, খাবার আসে কোথা থেকে, পানির উৎস কয়টি, রোগ কেমন, বিপদ কোন দিকে, মানুষ কাকে নেতা মানে, কী দিয়ে বিনিময় করে, পুরোনো পৃথিবীর কোনো নিদর্শন আছে কি না, এসব সে ছোট একটি নোটবইয়ে লিখে রাখত। কার জন্য তথ্য সংগ্রহ করত, প্রশ্নটি তার মনে আসত। তবে উত্তর খোঁজার চেয়ে কাজটি করে যাওয়া বেশি জরুরি মনে হতো।
এক বিকেলে সে এমন একটি দ্বীপে পৌঁছাল, যেটি তার মানচিত্রে ছিল না।
তীরের কাদা ঠান্ডা ও নরম। প্রতিটি পদক্ষেপে মাটি তার পা সামান্য টেনে ধরছিল। বাতাসে নোনা জল, পচা শৈবাল, কাঁচা মাছ ও ভেজা কাঠের গন্ধ। দূরে জোড়াতালি দেওয়া কয়েকটি নৌকা কাত হয়ে পড়ে ছিল। কোথাও পতাকা নেই, নামফলক নেই, প্রহরীও নেই।
একটি সরু পথ দ্বীপের ভেতরে চলে গেছে। দুপাশে নিচু ঝোপ, লবণে পোড়া ঘাস ও বাঁশের বেড়া। কিছুদূর যাওয়ার পর হাঁস-মুরগির ডাক, কাঠ কাটার ঠকঠক, ধাতব কিছু পাথরে ঘষার শব্দ, শিশুদের কান্না এবং মানুষের নিচু কণ্ঠ একসঙ্গে মিশে গভীর পানির নিচ থেকে ভেসে আসা গুঞ্জনের মতো শোনাল।
গ্রামের কেন্দ্রের বাজারে বাঁশ, কাঠ, খড় ও পুরোনো টিনের দোকান কাদামাটির ওপর কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও শুকনো মাছ, কোথাও কন্দ, লবণ, মোটা কাপড় ও হাতে তৈরি ছুরি। ভাঙা ধাতব চাকাকে কেউ পাত্রের ঢাকনা বানিয়েছে, কাচের টুকরো দিয়ে বানিয়েছে অলংকার। শোভনের প্রথম ধারণা হলো, এরা বাইরের পৃথিবীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
বাজারে ঢুকতেই কয়েকজন তার দিকে তাকাল। একটি দোকানে দরদাম থামল। মাটির পাত্র হাতে একজন নারী পাশ কাটানোর সময় সামান্য দূরত্ব রাখলেন। শোভন কাউকে প্রশ্ন করল না। মানুষের মুখের উত্তরের চেয়ে আচরণকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করত সে।
বাজারের একপাশে এসে সে থেমে গেল। সামনে মাটির দেয়ালের জরাজীর্ণ দোকান। বৃষ্টিতে দেয়ালের নিচের অংশ ফুলে উঠেছে, কোথাও মাটি খসে বাঁশের কঙ্কাল বেরিয়েছে। মাথার ওপর খড়ের ছাউনি, নিচে অসমান বেঞ্চ ও একটি পা ভাঙা টেবিল। সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল সামনে ঝুলতে থাকা মরচে ধরা স্টিলের বোর্ড।
বোর্ডে লেখা ছিল: EXPECT MORE
দোকানের ভেতরে প্রায় আশি বছরের এক বৃদ্ধ বড় কড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাদা চুল-দাড়ি, নুয়ে পড়া শরীর, মুখের বলিরেখা হারিয়ে যাওয়া নদীর শুকনো রেখার মতো। বয়স তাঁকে ধীর করেছে, কিন্তু হাত স্থির। কাঠের আগুনে চড়ানো কড়াই তিনি লম্বা খুন্তি দিয়ে নাড়ছিলেন।
ঘষ্... ঘষ্... ঘষ্...
চাল, ডাল, কন্দ, শাক, শুকনো মাছ ও অচেনা পাতার গন্ধ বাষ্পের সঙ্গে উঠছিল। বাষ্প কখনো বৃদ্ধের মুখ ঢেকে দিচ্ছিল, বাতাসে আবার সরিয়ে নিচ্ছিল। তাঁকে একই সঙ্গে উপস্থিত ও অনুপস্থিত মনে হচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর কালো বোরকায় শরীর ঢাকা দুই নারী কয়েকটি শিশুকে নিয়ে এলেন। কাপড় পুরোনো, বিভিন্ন জায়গায় সেলাই করা। শিশুদের হাতে ভাঙা বাটি। বৃদ্ধ কিছু জিজ্ঞেস না করে পাত্র ভরে দিলেন, শিশুদের জন্য একটু বেশি। কিছুক্ষণ পর সিঁথিতে লাল সিঁদুর পরা আরও দুই নারী এলেন। তাঁদের পাত্রও একইভাবে ভরে গেল। তারপর আরও মানুষ। কারও হাতে পাত্র, কারও হাতে কিছুই নেই। ক্ষুধাই যেন সেখানে একমাত্র পরিচয়পত্র।
কেউ কয়েন দিল না, শস্য দিল না, প্রতিশ্রুতিও দিল না। শোভন বিভ্রান্ত হলো। তার জানা পৃথিবীতে মুদ্রা মূল্য হারালেও বিনিময় হারায়নি। পানির বদলে মাছ, আশ্রয়ের বদলে শ্রম, পথের খবরের বদলে অন্য দ্বীপের তথ্য দিতে হতো।
তার নিজেরও ক্ষুধা লেগেছিল। আগের রাতে শেষ খাবার খেয়েছে। সকালে সামান্য পানি ছাড়া কিছুই পেটে পড়েনি। কড়াইয়ের গন্ধে মুখে লালা জমছিল। তবু বিনা মূল্যে খাবার চাইতে পারল না।
বৃদ্ধ তাকালেন। চোখ ঘোলা, দৃষ্টি স্থির। “ক্ষুধা পেয়েছে?”
শোভন মাথা নাড়ল। বৃদ্ধ থালা নিতে গেলে সে বলল, “আমি বিনা বিনিময়ে খাব না।”
বৃদ্ধ তার ক্ষুধায় নুয়ে পড়া শরীর দেখে বললেন, “তা হলে দাঁড়িয়ে থাকো। তোমাকে দেখে আমার কড়াইয়েরও ক্ষুধা লেগে যাচ্ছে।”
শোভন বুঝল না, বৃদ্ধ তাকে অপমান করলেন, নাকি খেতে বললেন।
“কী দিতে পারবে?”
“কাজ করতে পারি।”
বৃদ্ধ খুন্তিটি এগিয়ে দিলেন। “নাড়তে থাকো। তলায় যেন লেগে না যায়।”
খুন্তি নেওয়ার সময় বৃদ্ধের শুষ্ক ও উষ্ণ হাতের স্পর্শে শোভনের শরীর দিয়ে শিহরণ গেল। এই হাত সে আগে কোথাও ধরেছে। কিন্তু কোথায়?
খাবার ঘন। খুন্তি চালাতে দুই হাতের শক্তি লাগছিল। আগুনে মুখ গরম হয়ে উঠল, পিঠে লাগল সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস। “কতক্ষণ নাড়ব?”
বৃদ্ধ বোর্ডটির দিকে তাকালেন। “যতক্ষণ না বুঝতে পারো, কখন থামতে হয়।” তারপর যোগ করলেন, “তবে বেশি দর্শন কোরো না। পুড়ে গেলে মানুষ আমাকে ধরবে, তোমাকে নয়।”
দর্শন শব্দটি পরিচিত লাগল। অর্থ মনে করার আগেই খুন্তি তলায় আটকে গেল। বৃদ্ধ কাশতে কাশতে বললেন, “কড়াইয়ের সঙ্গে তর্ক করলে কড়াই সব সময় জেতে।”
খাবার হয়ে গেলে বৃদ্ধ একটি বড় থালা ভরে দিলেন। তারপর বললেন, “সন্ধ্যা হয়েছে। আলো থাকতে থাকতে ফিরতে হবে। তোমার পক্ষে সম্ভব হলে কিছুক্ষণ থেকো।” তিনি তালা বা চাবি দিলেন না, কোনো হিসাবও বোঝালেন না।
শোভন জিজ্ঞেস করল, “পুরো দোকান আমার কাছে রেখে যাচ্ছেন?”
বৃদ্ধ ফিরে তাকালেন। “দোকান তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি না। তোমাকে দোকানের কাছে রেখে যাচ্ছি।” দুই কদম গিয়ে আবার বললেন, “খাবারটা আগে খেয়ো। খালি পেটে মানুষ নিজেকে দার্শনিক ভাবে। আসলে সে তখন শুধু ক্ষুধার্ত।”
বৃদ্ধ বাজারের ভিড়ে মিলিয়ে গেলেন।
শোভন নিচু বেঞ্চে বসে খেতে শুরু করল। খাবার খুব ঝাল নয়, বেশি নোনতাও নয়। পোড়া রসুনের তিক্ততা, কন্দের মৃদু মিষ্টতা, শুকনো মাছের নোনা আভাস। কয়েকটি লোকমার পর মনে হলো দূর থেকে কেউ বলছেন, “ধীরে খাও।” হাত থেমে গেল। কণ্ঠটি কার, মনে করতে পারল না।
খাওয়া শেষ হওয়ার আগে মানুষ আসতে শুরু করল। কেউ বৃদ্ধকে চাচা, কেউ কাকা বলল। শোভন জানাল, তিনি বাড়ি গেছেন। একজন অপরিচিত যুবক দোকানে বসে আছে দেখে কেউ বিস্মিত হলো না। বৃদ্ধ যদি রেখে গিয়ে থাকেন, তবে যেন আর কোনো প্রশ্ন প্রয়োজন নেই।
সন্ধ্যায় বাজারের হারিকেনগুলো জ্বলে উঠল। দূর থেকে বাজারটি কালো জলের ওপর ভাসমান ছোট ছোট আগুনের দ্বীপ। কাদায় পায়ের চপচপ শব্দ, জমা পানিতে কাঁপা প্রতিফলন। মনে হচ্ছিল, মাটির নিচেও আরেকটি বাজার আছে, যেখানে একই মানুষ নিঃশব্দে উল্টো হয়ে হাঁটছে।
দোকানে চাল, ডাল, লবণ, তেল, মোমবাতি, সুতা, পাত্র, চকোলেট ও প্যাকেটজাত বিস্কুট ছিল। একটি রঙিন বিস্কুটের প্যাকেট ধূসর ঘরে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। শোভনের পেট ভরা, প্রয়োজন নেই। তবু বাইরে তাকাল। কেউ দেখছে না।
একটি বিস্কুট খাওয়া চুরি নয়, সে নিজেকে বোঝাল। এটি দ্বীপটির খাদ্যসংস্কৃতি সম্পর্কিত মাঠপর্যায়ের গবেষণা। প্যাকেটটি আড়ালে নিয়ে ছিঁড়তেই মনে হলো, গবেষণার নৈতিক অনুমোদন সম্ভবত আগে নেওয়া উচিত ছিল।
খস্...
প্যাকেট সরানোর পর তাকের নিচে খোলা কাঠের বাক্স দেখা গেল। তাতে তামাটে, রুপালি, কালচে ও অসমান কয়েন জমে আছে। একজন এসে কয়েন রেখে তেলের পাত্র নিল। একজন নারী কিছু না রেখে ডাল ও মোমবাতি নিলেন। আরেকজন কিছু না নিয়ে দুটি কয়েন রেখে গেলেন। পরে এক বৃদ্ধ লবণ নিয়ে বাক্স থেকে ছোট কয়েন তুলে নিলেন।
কেউ অনুমতি চাইছে না। কেউ প্রকাশ্যে হিসাবও পরীক্ষা করছে না। তবু দূরের কয়েকটি চোখ দোকানের দিকে ফিরে আসছিল। ব্যবস্থাটির কোনো খাতা না থাকলেও একটি সামাজিক স্মৃতি আছে, এমন মনে হলো। যার সামর্থ্য আছে, রেখে যায়। যার প্রয়োজন, নিয়ে যায়।
শোভনের মনে হলো, দ্বীপের মানুষকে খুব তাড়াতাড়ি পিছিয়ে পড়া বলেছে। প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসে? তার চেনা পৃথিবীতে মূল্যবান জিনিসের পাশে তালা, প্রহরী ও সন্দেহ থাকে। এখানে খোলা বাক্সে কয়েন পড়ে আছে।
তাহলে সে বিস্কুটটি লুকিয়ে নিল কেন? প্রকাশ্যে বিনা মূল্যের খাবার নিতে অস্বীকার করেছিল, অথচ কেউ না দেখায় বিস্কুট নিয়েছে। তার আত্মমর্যাদা কি শুধু অন্যের চোখের সামনে সক্রিয়?
বিস্কুটটি মুখে খুব শুকনো লাগল। মিষ্টতা আনন্দ দিল না। সে আর খেল না। ছেঁড়া প্যাকেট আগের জায়গায় রাখল, কিন্তু সেটি আর নতুন নয়, একটি বিস্কুটও কম। কাজটি পুরোপুরি ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় নেই।
তীরে ফিরতে ইচ্ছে করল। তবু বের হতে পারল না। বৃদ্ধ কেন তাকে বিশ্বাস করলেন? মানুষগুলো খোলা বাক্সে কয়েন রেখে যায় কেন? বোর্ডটি কোথা থেকে এলো?
হারিকেন নিয়ে দোকানের পেছনে গিয়ে চালের বস্তা, পুরোনো কাপড় ও দড়ির মাঝখানে পাতলা কাগজ পেল। বহুবার ভাঁজ করা, এক পাশে তেলের দাগ। খুলে দেখল তিনটি পঙ্ক্তি:
তুমি মাছ হও
জলে থাকো
ছোট ছোট বই পড়ো
চিরকুটে তার নাম নেই, তবু মনে হলো কথাগুলো তাকেই বলা। প্রতিটি বাক্যের আলাদা অর্থ সে বোঝে, কিন্তু তিনটি একসঙ্গে কী বলতে চায়, বোঝে না। শব্দগুলো ধীরে নিজের কণ্ঠ থেকে সরে অন্য কারও কণ্ঠে উচ্চারিত হতে লাগল।
টুং।
দূরে কয়েন পড়ল। হারিকেন কেঁপে উঠল। বাজার, দোকান, খড়ের ছাউনি, স্টিলের বোর্ড ও তার হাতের রেখা তরল হয়ে গেল। অক্ষরগুলো কাগজ থেকে উঠে জলের ওপর ভাসতে লাগল। শোভন ধরতে হাত বাড়াল।
জলে থাকো
ছোট ছোট বই পড়ো
প্রথমে চোখ খুলেও বুঝতে পারল না কোথায় আছে। খড়ের ছাউনির বদলে সাদা ছাদ, হারিকেনের বদলে পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢাকার ধূসর সকাল। বাজারের গুঞ্জন বদলে গেছে গাড়ির হর্নে, কাদায় পায়ের শব্দ বদলে পানির মোটরের কম্পনে।
তার বয়স আঠারো নয়। সে পরিচয়হীন দ্বীপপর্যটকও নয়। শোভন বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের প্রভাষক। ঢাকা শহরের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে একা থাকে। দিনের বড় অংশ শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের সঙ্গে কাটলেও রাতে দরজা বন্ধ করার পর তার জন্য কেউ অপেক্ষা করে না।
স্বপ্নটি এত জীবন্ত ছিল যে সে কবজি পরীক্ষা করল। কোনো ব্যথা নেই, অথচ খুন্তির ভার পেশির স্মৃতিতে রয়ে গেছে। মুখে বিস্কুটের শুকনো স্বাদ। বিছানার পাশে চিরকুট নেই। তবু কথাগুলো স্পষ্ট।
তুমি মাছ হও। জলে থাকো। ছোট ছোট বই পড়ো।
জানালার কাছে গিয়ে সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ার ভেতর বৃদ্ধের মুখ গড়ে উঠল। মাছের প্রথম কাজ বেঁচে থাকা। জল কি সম্পদ, আধুনিক মানুষের জল কি টাকা? নিজের ব্যাংক হিসাব মনে পড়তেই বুঝল, মাছ হলে সে বেশ অগভীর পানিতে আছে। ছোট বই হয়তো সারাংশ, অল্প সময়ে মূল ধারণা জানার উপায়।
কিন্তু Expect More? আরও টাকা, আরও জ্ঞান, আরও সততা, নাকি নিজের বর্তমান অবস্থার চেয়ে ভালো কিছু হওয়ার দাবি?
দর্শনের শিক্ষক হিসেবে অন্যের নৈতিক সংকট বিশ্লেষণ সহজ। কান্টের কর্তব্য, উপযোগবাদীদের ফলাফল, অ্যারিস্টটলের চরিত্র, ক্যামুর অর্থহীন পৃথিবী। কিন্তু স্বপ্নের একটি বিস্কুট তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে।
বৃদ্ধের মুখ মনে করতে গেলে রেখাগুলো বদলে যায়। কখনো অচেনা, কখনো ভবিষ্যতের শোভন, কখনো তার দাদু। দাদু বহু বছর আগে মারা গেছেন। চাকরি, ঢাকা ও ক্লাসের ভিড়ে মুখের বিস্তারিত রেখা স্মৃতি থেকে সরে গেছে। সে দাদুকে ভুলে যায়নি। শুধু মনে করার অভ্যাস হারিয়েছে।
ঢাকার সকালে বেরিয়ে শোভনের মনে হলো শহরটি শুকনো মাটি নয়, অদৃশ্য নদী। সবাই কি মাছ? কেউ দ্রুত সাঁতার কাটছে, কেউ ভেসে আছে, কেউ ডুবে যাওয়ার আগে অন্যের পা ধরে ফেলছে। কারও চারপাশে প্রচুর জল, কারও শ্বাস নেওয়ার জায়গাও নেই।
একটি ছোট দোকানের সামনে কেউ বিস্কুট নিয়ে টাকা রেখে গেল। ঘটনাটি এত সাধারণ যে অন্যদিন চোখেই পড়ত না। আজ মনে হলো খোলা কাঠের বাক্সে একটি কয়েন পড়েছে। টুং।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে শোভন শ্রেণিকক্ষে ঢুকল। আজ নৈতিক দর্শনের নির্ধারিত অংশ পড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আজ ক্লাস নেব না।” পেছনের সারির একজন এমন আনন্দে সোজা হয়ে বসল, যেন দর্শনের ইতিহাসে মানবমুক্তির চূড়ান্ত ঘোষণা এসেছে।
“আমার কাছে একটা গল্প আছে। শুনবে?”
সবাই রাজি হলো। শেষ পর্যন্ত গল্পে নম্বর নেই, খাতা খুলতে হয় না, ভুল উত্তরেরও ভয় নেই। শিক্ষার্থীদের কাছে এর চেয়ে গ্রহণযোগ্য শিক্ষাব্যবস্থা আর কী হতে পারে?
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পথে এবং শিক্ষককক্ষে বসে শোভন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত উপকরণ দিয়ে স্বপ্নের দৃশ্য বানিয়েছিল। ধূসর সমুদ্র, দ্বীপ, বাজার, বৃদ্ধ, কড়াই, নারী, শিশু এবং আঠারো বছরের শোভন বড় স্মার্ট টেলিভিশনে ফুটে উঠল।
পর্দার তরুণ শোভনকে দেখে রাজিয়া সুলতানা মার্জিয়া রহমানের দিকে ঝুঁকে বলল, “স্যার কি নিজের স্বপ্নে নিজেকেই নায়ক বানিয়েছেন?” মার্জিয়া বলল, “এআইকে রেফারেন্স ছবি কে দিয়েছে, সেটাই আগে জানা দরকার।”
একটি দৃশ্যে বৃদ্ধের ডান হাতে ছয়টি আঙুল দেখা গেল। পেছন থেকে একজন বলল, “স্যার, মহাপ্রলয়ের পর কি বিবর্তন একটু দ্রুত হয়েছে?”
শোভন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “বৃদ্ধের বাড়তি আঙুলটির কোনো দার্শনিক তাৎপর্য নেই। আপাতত সেটি এআইয়ের ব্যক্তিগত অবদান।”
চিত্রগুলো সুন্দর, হয়তো প্রয়োজনের চেয়েও সুন্দর। সমুদ্র নিখুঁতভাবে ধূসর, শিশুগুলোর চোখ নিখুঁতভাবে বেদনাময়, বৃদ্ধের বলিরেখাও যেন ইচ্ছাকৃতভাবে দার্শনিক। কিছুক্ষণ পর কেউ ফোন বের করল, কেউ হাই তুলল। শুধু মার্জিয়া ও রাজিয়া মন দিয়ে দেখছিল। বিস্কুটের ঘটনার পর তাদের মুখের হাসিও মিলিয়ে গেল।
শেষ দৃশ্যে পর্দা অন্ধকার হয়ে তিনটি পঙ্ক্তি ভেসে উঠল। তারপর নিচে দেখা গেল EXPECT MORE। এবার শ্রেণিকক্ষে নীরবতা নামল।
কেউ বলল মাছ স্বাধীনতার প্রতীক। অন্যজন বলল বন্দিত্বের, কারণ জল ছাড়া সে বাঁচে না। কারও কাছে জল সমাজ, কারও কাছে টাকা। ছোট বইকে কেউ অভিজ্ঞতা, কেউ সারাংশ, কেউ সীমাবদ্ধ জ্ঞান বলল।
কয়েকজন বিভিন্ন এআই চ্যাটবটকে প্রশ্ন পাঠাল। কয়েক মিনিটে পাঁচটি এআই সাত ধরনের উত্তর দিল। একটির মতে জল মাতৃগর্ভের নিরাপত্তা, অন্যটির মতে আর্থিক অস্থিরতা। একটি প্রায় নিশ্চিত ছিল, শোভনের ছুটি নেওয়া প্রয়োজন।
পেছন থেকে একজন বলল, “স্যার, এআইও মনে হয় প্রশ্নটা কমন পায়নি।” আরেকজন বলল, “এত উত্তর মানে গণতান্ত্রিকভাবে সব উত্তরই ভুল।”
ফ্রয়েডের নাম উঠতেই পেছনের সারিতে অকারণে আগ্রহ বাড়ল। একজন জিজ্ঞেস করল, “ফ্রয়েড হলে বিস্কুট নিয়ে কী বলতেন?” শোভন বলল, “ফ্রয়েডকে আপাতত বিস্কুট থেকে দূরে রাখো।”
হাসি থামলে শোভন জিজ্ঞেস করল, “তোমরা যে গল্প দেখলে, সেটিই কি আমার স্বপ্ন?” সবাই হ্যাঁ বললে সে মাথা নাড়ল। “আমি যতটুকু মনে করেছি, এটি তার বর্ণনা। স্বপ্নকে মনে করেছি, গল্পে সাজিয়েছি, তারপর এআই ছবি বানিয়েছে। তোমরা স্বপ্ন দেখোনি। স্বপ্নের সম্পাদিত অনুবাদের দৃশ্যায়ন দেখেছ।”
সে বলল, ফ্রয়েডীয় পাঠে স্বপ্ন বিচ্ছিন্ন স্মৃতি, ভয় ও আকাঙ্ক্ষাকে একত্র করতে পারে। জেগে ওঠার পর মন ভাঙা অংশ জুড়ে গোছানো কাহিনি বানায়। এটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যার কাঠামো, প্রতিটি প্রতীকের বৈজ্ঞানিক অভিধান নয়।
একজন বলল, “তাহলে এআই আপনার স্বপ্নের রিমেক বানিয়েছে?” শোভন উত্তর দিল, “হ্যাঁ। এবং রিমেক যথারীতি মূলের চেয়ে বেশি বাজেট পেয়েছে।”
রাজিয়া বলল, “এমনও তো হতে পারে এর কোনো অর্থ নেই। মাছ কি শুধু মাছ হতে পারে না?” মার্জিয়া জিজ্ঞেস করল, “তাহলে স্বপ্নটার মানে কী?” রাজিয়া পাল্টা বলল, “মানেই থাকতে হবে কেন?”
পেছনের সারি থেকে প্রশ্ন এল, “যদি কোনো উত্তর না থাকে?” শোভন জিজ্ঞেস করল, “তাহলে প্রশ্নটা এতক্ষণ মাথায় আছে কেন?” ছেলেটি বলল, “উত্তর নেই বলেই।” সেদিনের সবচেয়ে অমনোযোগী শিক্ষার্থীই হয়তো সবচেয়ে সৎ উত্তর দিয়েছে।
মানুষ বিশৃঙ্খলার মধ্যে নকশা খোঁজে। সেই ক্ষমতা বিপদ শনাক্ত করতে, ভাষা গড়তে ও জ্ঞান তৈরি করতে সাহায্য করে। আবার একই ক্ষমতা মেঘে মুখ, কাকতালীয় সংখ্যায় সংকেত এবং অসংলগ্ন স্বপ্নে মহাজাগতিক নির্দেশনা দেখায়।
মার্জিয়া বলল, “প্রথমত বিবেক, কারণ কেউ না দেখলেও বিস্কুট নেওয়ার পর অস্বস্তি হয়েছে। দ্বিতীয়ত বুদ্ধি, কারণ সে সবকিছুকে যুক্তিতে ধরতে চায়। তৃতীয়ত জ্ঞান, মানুষ অল্প অল্প করে শেখে।” রাজিয়া যোগ করল, “আর Expect More হয়তো বলছে, এগুলো দিয়ে আরও কিছু হতে হবে।”
ব্যাখ্যাটি সুন্দর, প্রায় নিখুঁত। এই নিখুঁততাই শোভনকে অস্বস্তিতে ফেলল। তারা কি সত্য আবিষ্কার করেছে, নাকি তিনটি পঙ্ক্তির ওপর তিনটি সুন্দর ধারণা বসিয়েছে?
“ব্যাখ্যাটি সুন্দর,” শোভন বলল। “কিন্তু সৌন্দর্য সত্যের প্রমাণ নয়।” মার্জিয়া জিজ্ঞেস করল, “তাহলে ভুল?” শোভন বলল, “সেটাও জানি না।”
ক্লাস শেষে একজন সঠিক উত্তর জানতে চাইলে শোভন বলল, “সঠিক উত্তর থাকলে বলতাম।” করিডরে হাঁটতে হাঁটতে তার কানে ভেসে এল বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান। শব্দগুলো বদলে গেল মাছ, জল, বইয়ে। গাড়ির হর্নের নিচে শোনা গেল কড়াইয়ে খুন্তি ঘষার শব্দ। ঘষ্... ঘষ্... ঘষ্...
সন্ধ্যায় ফ্ল্যাটে ফিরে আলো না জ্বালিয়ে জানালার পাশে বসে থাকল। ঢাকার বাতিগুলো একে একে জ্বলছে। দূর থেকে হারিকেন মনে হয়। ধোঁয়ার ভেতর বৃদ্ধের মুখ গড়ে উঠল। এবার মুখটি দাদুর।
বহু বছর ধরে বন্ধ একটি কাঠের বাক্স বিছানার নিচে ছিল। গ্রামের বাড়ি বিক্রির আগে বাবা পুরোনো কিছু জিনিস পাঠিয়েছিলেন। শোভন কখনো ভালোভাবে খুলে দেখেনি।
বাক্সের ভেতর কাগজ, সাদাকালো ছবি, হলদে চিঠি, ছোট পুস্তিকা ও শিশুকালের খাতা। একটি ছবিতে দাদু মাটির দেয়ালের ছোট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স কম, শরীরও সোজা, কিন্তু চোখ ও ঠোঁটের কোণের হাসি স্বপ্নের বৃদ্ধের মতো।
দোকানের দেয়ালে পুরোনো স্টিলের বিজ্ঞাপনী পাত। মরচে ও আলোর প্রতিফলনে পুরো লেখা দেখা যায় না। শুধু শেষের অংশ: ...PECT MORE
শোভনের বুকের ভেতর কিছু ধীরে নড়ে উঠল। দাদুর ছোট দোকান, কেরোসিনের গন্ধ, কাচের বয়ামে বিস্কুট। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বাকিতে খাবার নিত। দাদু খাতায় নাম লিখতেন, পরে অনেক হিসাব আর চাইতেন না।
শোভন শিশুবয়সে একদিন লুকিয়ে বিস্কুট নিয়েছিল। দাদু দেখেছিলেন, কিন্তু চোর বলেননি। রাতে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, “চাইলি না কেন?” ছোট শোভন বলেছিল, “যদি না দাও?” দাদু হেসেছিলেন। “চাইলে মানুষ না-ও দিতে পারে। কিন্তু না চাইলে তুই জানবি কী করে?”
আরেকটি ছবিতে পুকুরঘাটে ছোট শোভন, পাশে দাদু। পেছনে লেখা: “আজ শোভনকে সাঁতার শেখালাম। পানি খুব ভয় পায়। বললাম, পানির সঙ্গে লড়িস না। মাছের মতো শরীর ছেড়ে দে। জল তোকে ধরে রাখবে।”
বাক্সের নিচে কৃষি, স্বাস্থ্য, নৈতিক গল্প ও সাধারণ জ্ঞানের কয়েকটি পাতলা পুস্তিকা। দাদু মোটা বই পড়তে পারতেন না। বলতেন, “ছোটটা আগে পড়। তারপর আরেকটা। বই ছোট হলে জ্ঞান ছোট হয় না।”
রহস্যের প্রায় সব উপাদান ব্যাখ্যা করা যায়। মাছ এসেছে সাঁতার শেখার স্মৃতি থেকে, জল পুকুর থেকে, ছোট বই দাদুর পুস্তিকা থেকে, বিস্কুট শিশুকালের অপরাধবোধ থেকে, বৃদ্ধ ছিলেন দাদু, আর Expect More ছিল দোকানের পুরোনো বিজ্ঞাপন। স্বপ্নটি ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বিচ্ছিন্ন স্মৃতির পুনর্গঠন।
শোভন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর স্বস্তি অস্বস্তিতে বদলে গেল। দাদুর দোকানে খোলা কয়েনের বাক্স ছিল না। বোরকা ও সিঁদুর পরা নারীদের এমন স্মৃতি নেই। মহাপ্লাবনের দ্বীপগুলো কোথা থেকে এল? আর চিরকুটটি?
একটি ছোট বইয়ের মলাটে দাদুর হাতের লেখা ছিল: “সব বুঝতে না পারলেও পড়বি। কিছু বুঝতে বুঝতে আসে, কিছু করতে করতে।”
এটি কি স্বপ্নের উত্তর? নাকি প্রয়োজনের কারণে একটি সাধারণ বাক্যকে সে আবারও বেশি তাৎপর্য দিচ্ছে? শোভন হাসল। তার তিন মাসের গ্যাস বিল বাকি। চাইলে সেটির মধ্যেও মহাজাগতিক সংযোগ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
মানুষ নকশা খোঁজে। কখনো নকশা সত্যিই থাকে। কখনো মানুষ নিজেই আঁকে। আর কখনো নকশাটি সত্য কি না, তার চেয়ে সেটি মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্বপ্নের সঠিক অর্থ না থাকলেও এটি বহু বছর পর দাদুর বাক্স খুলিয়েছে। ভুলে যাওয়া মুখ মনে করিয়েছে। প্রকাশ্য আত্মমর্যাদা ও গোপন লোভের ব্যবধান দেখিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সামনে উত্তর না জানার কথা স্বীকার করিয়েছে। অর্থহীন স্বপ্ন যদি মানুষকে একটু বেশি সৎ করে, তবে তার অর্থহীনতা কি সম্পূর্ণ ব্যর্থতা?
চোখ বন্ধ করতেই দাদুকে কড়াইয়ের সামনে দেখল। শোভন জিজ্ঞেস করল, “বিবেক, বুদ্ধি আর জ্ঞানের পর কী থাকে?” দাদু বললেন, “ক্ষুধা।” শোভন অবাক হলে তিনি হাসলেন। “ক্ষুধার্ত মানুষকে আগে খাওয়াবি। কথা পরে।”
পরদিন শ্রেণিকক্ষে শোভন বোর্ডে লিখল: মানুষ কি অর্থ আবিষ্কার করে, নাকি তৈরি করে?
পেছন থেকে কেউ জিজ্ঞেস করল, “গতকালের ধাঁধার উত্তর পেয়েছেন?” শোভন বলল, “না। তবে দাদুকে পেয়েছি।”
সে ছবিগুলোর কথা বলল, সাঁতার, ছোট বই, বিস্কুট ও পুরোনো স্টিলের বোর্ডের কথা। রাজিয়া জিজ্ঞেস করল, “তাহলে মাছ শুধু মাছ?” শোভন বলল, “হতে পারে।” মার্জিয়া বলল, “বিবেক, বুদ্ধি আর জ্ঞান?” শোভন বলল, “সেগুলোও হতে পারে।”
“দুটোই কীভাবে সত্য?”
শোভন জানালার বাইরে তাকাল। সকালের আলোয় শহর বাস্তব, তবু দূরের ভবন দ্বীপের মতো। “সব সত্যকে একই ধরনের হতে হয় না। কোনো ব্যাখ্যা ঘটনার উৎস বোঝায়, কোনো ব্যাখ্যা নিজের দিকে তাকাতে শেখায়, আর কোনো ব্যাখ্যা শুধু সুন্দর গল্প হয়।”
পেছনের সারির একজন হাত তুলল। “স্যার, আজ কি নিয়মিত ক্লাস হবে?”
শোভন মৃদু হেসে বলল, “Expect more.”
হাসির মধ্যে সে স্মার্ট টেলিভিশনের কালো পর্দায় নিজের প্রতিফলনের পেছনে ক্ষীণ হলুদ আলো দেখল। হারিকেনের শিখার মতো দুলে উঠেই মিলিয়ে গেল। হয়তো আলোর প্রতিফলন, হয়তো স্মৃতি, হয়তো অস্থির মস্তিষ্ক এলোমেলো ছায়ায় পরিচিত নকশা খুঁজেছে। শোভন আর পরীক্ষা করতে গেল না। সে ক্লাস শুরু করল।
কারণ সব স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা জানা জরুরি নয়। পৃথিবী প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয়। কিন্তু কোনো স্বপ্ন যদি জেগে ওঠা মানুষকে একটু বেশি মনোযোগী, একটু বেশি সৎ এবং সামান্য বেশি মানবিক করে, তবে সেটিকে পুরোপুরি অর্থহীন বলারও তাড়া নেই।
বৃদ্ধের দোকানে তখন হয়তো আবার কড়াই বসেছে। ক্ষুধার্ত শিশুদের পাত্র ভরছে। কেউ কয়েন রেখে যাচ্ছে, কেউ প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যাচ্ছে। খড়ের ছাউনিতে বৃষ্টি পড়ছে। টুপ। খোলা বাক্সে কয়েন পড়ছে। টুং।
মাটির দেয়ালের বাইরে মরচে ধরা স্টিলের বোর্ডটি সন্ধ্যার বাতাসে দুলছে।
আরও অর্থ নয়। আরও তত্ত্ব নয়।
হয়তো শুধু মানুষের কাছ থেকে আরেকটু মানুষ হয়ে ওঠার প্রত্যাশা।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0