দিলদার: কৌতুক অভিনেতার আড়ালে ঢাকাই সিনেমার সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি
দিলদার কি শুধুই কৌতুক অভিনেতা ছিলেন? তাঁর অভিনয়, শ্রেণি-পরিচয়, নগরায়ণ, শ্রমজীবী দর্শক ও ঢাকাই সিনেমায় সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বের গভীর বিশ্লেষণ।
চলচ্চিত্র, সমাজ ও সংস্কৃতি
দিলদার: কৌতুক অভিনেতার আড়ালে ঢাকাই সিনেমার সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি
আজ এতগুলো বছর পর আমি দিলদারকে নিয়ে ভাবতে বসেছি। কেন?
বাংলা সিনেমার শত শত নায়ক, খলনায়ক, কৌতুক অভিনেতা, সহশিল্পী ও ক্ষণজন্মা তারকার ভিড়ে এই একটি মুখ এখনও আমাদের স্মৃতির অন্ধকার ঘরে এত জীবন্ত কেন? তাঁর চোখ বড় করে তাকানো, আকাশফাটা চিৎকার, ক্ষমতাবানের সামনে শরীর গুটিয়ে নেওয়া, প্রেম করতে গিয়ে অদ্ভুতভাবে ধরা পড়ে যাওয়া এবং বিপদের মধ্যেও বেঁচে থাকার রাস্তা খোঁজা আমাদের এত পরিচিত মনে হয় কেন? আমরা কি কেবল তাঁর অভিনয় মনে রেখেছি, নাকি তাঁর শরীরের ভেতর নিজেদের হারিয়ে যাওয়া একটি সময়কে এখনও খুঁজে ফিরি?
১৯৪৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্ম নেওয়া দিলদার ২০০৩ সালের ১৩ জুলাই মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যান। একাধিক সংবাদ ও চলচ্চিত্রবিষয়ক উৎসে তাঁর পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একসময় চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি এমনভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল যে নির্মাতারা শুধু কৌতুক চরিত্রের প্রয়োজন অনুভব করতেন না। প্রয়োজন অনুভব করতেন স্বয়ং দিলদারকে।
তখন দিলদার আর একজন ব্যক্তিমানুষ বা অভিনয়শিল্পীর নাম ছিলেন না। তিনি নিজেই বাংলা সিনেমার একটি স্বতন্ত্র উপাদান, একটি দর্শক-আহ্বান, একটি বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা এবং একটি সামাজিক ভাষায় পরিণত হয়েছিলেন।
একটি সিনেমায় কেন “দিলদার” লাগত?
নায়ক যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতেন, খলনায়ক যখন ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে মেতে উঠতেন, মা যখন অশ্রুসিক্ত চোখে সন্তানের জন্য প্রার্থনা করতেন, তখন দিলদার এসে কী করতেন? তিনি কি শুধু অতিরিক্ত কান্নার মধ্যে হাসির বিরতি দিতেন, নাকি সেই কান্নার সামাজিক সত্যকে অন্য এক ভাষায় প্রকাশ করতেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তাঁকে শুধু কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দেখলে চলে না। তাঁকে পড়তে হয় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হাসির শরীর হিসেবে। এমন এক সামাজিক শরীর হিসেবে, যাকে রাষ্ট্র সংখ্যায় গণনা করেছে, শহর শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করেছে, চিত্রনাট্য গল্পের প্রান্তে রেখেছে, অথচ দর্শক হৃদয়ের কেন্দ্রে বসিয়েছে।
দিলদার বারবার কাজের মানুষ হয়েছেন। কখনো দরিদ্র কামার, কখনো ছোট কনস্টেবল, কখনো নায়কের সহকারী, কখনো বাড়ির অধস্তন কর্মী, কখনো গৃহশিক্ষকের ছদ্মবেশে প্রেমিক, কখনো শহরে নতুন আসা দিশাহীন মানুষ। তাঁর চরিত্রের পোশাক, উচ্চারণ, পেশা, দাঁড়ানোর ভঙ্গি ও সামাজিক অবস্থান প্রায়ই বলে দিয়েছে, এই মানুষটি গল্পের ক্ষমতার কেন্দ্রে নেই।
এখানেই বাংলা সিনেমার শ্রেণিগত রাজনীতি উন্মোচিত হয়। দর্শকের কাছে যাঁর জনপ্রিয়তা বহু নায়ক-নায়িকার সমতুল্য হয়ে উঠেছিল, চিত্রনাট্য তাঁকে বারবার ক্ষমতার নিচের ধাপে রেখেছিল কেন? তিনি নায়কের সমান মর্যাদাসম্পন্ন বন্ধু হতে পারতেন না কেন? তাঁর প্রেম কেন আত্মত্যাগের মহাকাব্য না হয়ে হাসির ঘটনায় পরিণত হতো? নায়ক ভয় পেলে সেটি মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, আর দিলদার ভয় পেলে সেটি কৌতুক কেন?
শ্রেণি ও শরীরের রাজনীতি
বাড়ির মালিক গুরুগম্ভীর, কাজের মানুষ হাস্যকর। ধনী বাবার সিদ্ধান্ত কাহিনির সংকট, দরিদ্র সহচরের সিদ্ধান্ত কৌতুক। নায়কের প্রেম পবিত্র, নিচুতলার পুরুষের প্রেম অশোভন। নায়কের ক্রোধ ন্যায়বিচারের ভাষা, কাজের মানুষের ক্রোধ বেয়াদবি। নায়কের শরীর আকাঙ্ক্ষার, দিলদারের শরীর হাসির।
কিন্তু দিলদারের শিল্পীসত্তার সবচেয়ে বড় বিজয় এখানেই। চিত্রনাট্য তাঁকে যতবার ছোট করেছে, তিনি সেই ছোট চরিত্রের মধ্যে ততবার একটি পূর্ণ মানুষ ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
তাঁর চরিত্র ভয় পেত, কিন্তু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণও করত। প্রতারিত হতো, কিন্তু নির্বোধ থাকত না। ক্ষমতাবানের সামনে মাথা নিচু করত, আবার সুযোগ পেলে সেই ক্ষমতাবানের ভণ্ডামিও প্রকাশ করে দিত। প্রেমে ধরা পড়ত, তবু প্রেমের অধিকার ত্যাগ করত না। অপমানিত হতো, কিন্তু হাসি দিয়ে নিজের অস্তিত্বের শেষ অংশটুকু রক্ষা করত।
তাঁর ভয় ছিল শ্রেণিগত। তাঁর লজ্জা ছিল সামাজিক। তাঁর চাতুর্য ছিল আত্মরক্ষামূলক। আর তাঁর হাসি ছিল ক্ষমতাহীন মানুষের ক্ষুদ্র স্বাধীনতা।
শহরে এসে যে মানুষটি “কিছুই চেনে না”
বাংলা সিনেমায় গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষটি দীর্ঘদিন একটি পরিচিত চরিত্র ছিল। তার হাতে ছোট ব্যাগ, চোখে বিস্ময়, মুখে আঞ্চলিক ভাষা। শহরের রাস্তা, বাস, দালাল, দপ্তর ও প্রতারণার নিয়ম সম্পর্কে তার ধারণা সীমিত।
“বিচার হবে” চলচ্চিত্রের দৃশ্য হিসেবে অনলাইনে প্রচারিত ভিডিওর শিরোনামে “ঢাকা শহরে নতুন আইছি” এবং “আমি এই শহরে কিছুই চিনি না” বাক্য দুটি ব্যবহৃত হয়েছে। ভিডিওগুলোর পরিচিতিতে সালমান শাহ, শাবনূর, হুমায়ূন ফরীদি ও দিলদারের নাম পাওয়া যায়। তবে বাক্য দুটি মূল চিত্রনাট্যের হুবহু সংলাপ ছিল কি না, তার প্রাথমিক দলিল পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে চলচ্চিত্রের নিশ্চিত সংলাপের বদলে অনলাইনে প্রচারিত দৃশ্যের শিরোনাম হিসেবে পড়াই নিরাপদ।
তবু “আমি এই শহরে কিছুই চিনি না” কথাটি এত জনপ্রিয় হলো কেন? এটি কি শুধু একটি চরিত্রের দিশাহীনতা, নাকি গ্রাম থেকে শহরে আসা লক্ষ মানুষের সম্মিলিত স্বীকারোক্তি?
গ্রামের মানুষ কি সত্যিই কিছু চেনে না? সে ফসলের ঋতু, জমির সীমানা, নদীর স্রোত, হাটের বাকি, আত্মীয়তার ক্ষমতা, গ্রামের সালিশ, পুরোনো ঋণ এবং মান-সম্মানের অদৃশ্য সম্পর্ক বোঝে। কার সামনে কতটা কথা বলা নিরাপদ, কার বাড়িতে কীভাবে বসতে হয় এবং কাকে কোন নামে ডাকতে হয়, নিজের সামাজিক পরিসরে সে এসব জানে।
তার জ্ঞান আছে। কিন্তু শহর সেই জ্ঞানকে জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
শহর বাসের পথ জানাকে বুদ্ধি মনে করে, নদীর গতিপথ বোঝাকে নয়। দপ্তরের ফরম পূরণকে যোগ্যতা বলে, জমির উর্বরতা বোঝাকে নয়। শহুরে উচ্চারণে প্রতারণা করলে মানুষ চতুর, আঞ্চলিক ভাষায় বিশ্বাস করলে সরল। শহর নিজের নিয়মকে সর্বজনীন নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ফলে গ্রামের মানুষ শহরে এসে বোকা হয়ে যায় না। শহরের ক্ষমতা তাকে বোকা বলে ঘোষণা করে।
“গ্রামের মানুষ সহজ-সরল” কথাটি তাই সব সময় প্রশংসা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি আধিপত্যের ভাষা। শব্দবন্ধটি গ্রামের মানুষকে শিশুসুলভ করে, যেন সে সিদ্ধান্ত নিতে বা নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। অথচ গ্রামের সমাজও জমি, বংশ, ধর্ম, দল, লিঙ্গ, ঋণ, সালিশ ও মান-সম্মানের জটিল ক্ষমতাকাঠামোয় গঠিত। গ্রামের মানুষ নিষ্পাপ নয়, আবার জন্মগতভাবে ধূর্তও নয়। সে শুধু অন্য এক সামাজিক ব্যাকরণে প্রশিক্ষিত।
দিলদারের অভিনয় আমাদের এই ভুলটি ধরিয়ে দেয়। তিনি শহরে এসে ভুল করেন, কিন্তু তাঁর ভুলের মধ্য দিয়ে শহরের নিষ্ঠুরতাও প্রকাশিত হয়। তিনি প্রতারিত হন, কিন্তু প্রতারণার দৃশ্যটি শহরের সভ্যতার মুখোশ খুলে দেয়। ক্ষমতাবানের সামনে তাঁর কাঁপতে থাকা শরীর দেখে আমরা হাসি। অথচ সেই কাঁপুনিই বলে দেয় ক্ষমতা কার হাতে এবং ভয় কার শরীরে বাস করে।
নগরায়ণ, শ্রম ও অসম্পূর্ণ নাগরিকত্ব
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর জাতীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৩১.৬৬ শতাংশ মানুষ নগর এলাকায় এবং ৬৮.৩৪ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ এলাকায় বাস করত। আন্তর্জাতিক মডেলভিত্তিক কিছু হিসাবে নগর জনসংখ্যার হার বেশি দেখা যায়, কারণ সেখানে নগর এলাকার সংজ্ঞা ও পরিমাপপদ্ধতি ভিন্ন। সরকারি জনশুমারির উপাত্ত ব্যবহার করলে তাই বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যা ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে বলে দাবি করা সঠিক হবে না।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পুরোনো উপাত্ত অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাংলাদেশের নগর জনগোষ্ঠীর ২১.৩ শতাংশ জাতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল এবং ২০০৯ সালে প্রায় ৬২ শতাংশ নগরবাসী বস্তিতে বাস করত। একই প্রতিবেদনে সরকারি সীমানার বাইরে নগর বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বসতির বিস্তারকে অপরিকল্পিত ও “গোপন” নগরায়ণের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। উপাত্তগুলো বর্তমান পরিস্থিতির পরিমাপ নয়, কিন্তু নব্বই ও পরবর্তী দশকের নগর রূপান্তরের পটভূমি বুঝতে সাহায্য করে।
মানুষ শহরে এসেছে দারিদ্র্য, কৃষিতে সীমিত কর্মসংস্থান, জমির স্বল্পতা, ভূমিহীনতা, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিক্ষা ও চিকিৎসার কেন্দ্রীকরণ এবং ভালো আয়ের আশায়। কিন্তু শহর তাদের শ্রম গ্রহণ করলেও সবাইকে পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা দেয়নি।
রিকশাচালকের শ্রম ছাড়া শহর চলে না, কিন্তু নগরপরিকল্পনায় তার মর্যাদা সীমিত। গৃহকর্মীর শ্রম ছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্মজীবন কঠিন, কিন্তু তার নিজের সন্তানের যত্নের নিশ্চয়তা নেই। পোশাকশ্রমিকের হাতে রপ্তানির পোশাক তৈরি হয়, কিন্তু তার নিরাপদ বাসস্থান ও যাতায়াত অনিশ্চিত থাকে।
আশির দশকের মাঝামাঝি শুরু হওয়া বাণিজ্য উদারীকরণ নব্বইয়ের দশকে বিস্তৃত হয়। একই সময়ে তৈরি পোশাকশিল্প দ্রুত বাড়ে। বিজিএমইএর ধারাবাহিক উপাত্ত অনুযায়ী, ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অংশ ছিল ৩.৮৯ শতাংশ। ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬০.৬৪ শতাংশে পৌঁছায়।
এই শিল্প বিপুলসংখ্যক গ্রামীণ নারীকে শহুরে শ্রমবাজারে প্রবেশের পথ দিয়েছিল। কিন্তু আয় ও স্বাধীনতার সঙ্গে নতুন শাসনও এসেছিল। গ্রামের পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হওয়া নারী কারখানার তত্ত্বাবধান, কম মজুরি, অনিরাপদ যাতায়াত ও অস্বাস্থ্যকর বাসস্থানের নিয়ন্ত্রণে ঢুকে পড়েছিলেন। অর্থনৈতিক আয় তাঁকে কণ্ঠ দিয়েছিল, আবার একই সঙ্গে তাঁর শ্রমকে সস্তা রপ্তানি-সুবিধায় পরিণত করেছিল।
প্রেক্ষাগৃহ ছিল অঘোষিত গণসংসদ
এই শহরমুখী ও শ্রমজীবী মানুষেরা নব্বইয়ের মূলধারার চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দর্শক ছিল। প্রেক্ষাগৃহ তাদের কাছে শুধু বিনোদনের স্থান ছিল না। সেখানে কয়েক ঘণ্টার জন্য তারা গল্পের বিচারক হয়ে উঠত। নায়ক কার পক্ষে দাঁড়াবে, খলনায়ক কখন শাস্তি পাবে, মা কখন সন্তান ফিরে পাবে এবং প্রেম কখন শ্রেণিবাধা অতিক্রম করবে, দর্শক শিস, হাততালি, কান্না ও ক্রোধ দিয়ে তার রায় জানাত।
প্রেক্ষাগৃহ ছিল তাদের অঘোষিত গণসংসদ।
সেখানে আইন তৈরি হতো না, কিন্তু অন্যায়ের বিচার হতো। বাজেট পাস হতো না, কিন্তু ধনী-গরিবের দ্বন্দ্বে দর্শক নিজের পক্ষ বেছে নিত। ভোটের বাক্স ছিল না, কিন্তু হাততালি ছিল সমর্থনের ভাষা। বাস্তব রাষ্ট্র যে ন্যায়বিচার দিতে পারেনি, মেলোড্রামা কয়েক ঘণ্টার জন্য তার প্রতীকী ব্যবস্থা করত।
১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের পতন এবং সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন মানুষের মধ্যে প্রতিনিধিত্ব, অধিকার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছিল। নব্বইয়ের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক, মাস্তান, ক্ষমতাবান পরিবার, ব্যর্থ পুলিশ এবং প্রতিবাদী নায়কের পুনরাবৃত্ত উপস্থিতিকে সেই আকাঙ্ক্ষার সাংস্কৃতিক প্রতিধ্বনি হিসেবে পড়া যায়।
কিন্তু চলচ্চিত্রের বিচার প্রায়ই আদালত বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো না। বিচার আসত নায়কের পেশী, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ কিংবা পারিবারিক পুনর্মিলনের মাধ্যমে। গণতন্ত্র ফিরে এলেও প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা কতটা নড়বড়ে ছিল, এই ব্যক্তিনির্ভর বিচার সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
“গরিব কিন্তু ভালো” দর্শনের ফাঁদ
বাংলা সিনেমা দীর্ঘদিন জিজ্ঞেস করেছে, “মানুষটি গরিব হয়েও কত ভালো?” কিন্তু খুব কম জিজ্ঞেস করেছে, “মানুষটি গরিব কেন?”
গরিব নায়ক সৎ। গরিব মা ত্যাগী। গরিব প্রেমিক বিশ্বস্ত। গরিব পরিবার মর্যাদাবান। বিপরীতে ধনী বাবা অহংকারী, মহাজন নিষ্ঠুর, জমিদার লোভী এবং শহুরে ব্যবসায়ী প্রতারক। এই নৈতিক বিভাজন দর্শকের আবেগকে সহজ করেছে, কিন্তু দারিদ্র্য উৎপাদনের কাঠামোগত কারণকে আড়াল করেছে।
আমরা বলেছি, গরিবের মন বড়। কিন্তু তার ঘর ছোট কেন, জিজ্ঞেস করিনি।
আমরা বলেছি, গরিবের দোয়া লাগে। কিন্তু গরিবের অধিকার লাগে, বলিনি।
আমরা বলেছি, অল্পে সুখী হও। কিন্তু কেন তার ভাগে শুধু অল্প পড়ল, জানতে চাইনি।
“গরিব কিন্তু ভালো” দর্শন আমাদের সহানুভূতিশীল করেছে, কিন্তু সব সময় ন্যায়বিচারমুখী করেনি। এটি দরিদ্র মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, কিন্তু দরিদ্রতা উৎপাদনকারী ব্যবস্থা বদলানোর রাজনৈতিক প্রশ্ন শেখায়নি। তার ত্যাগকে পবিত্র করেছে, কিন্তু ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ বাসস্থান, বিশ্রাম, ক্ষোভ এবং উন্নত জীবনের অধিকারকে কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত করেনি।
দিলদার এই ব্যবস্থার অংশও ছিলেন, আবার তার ভেতরের ফাটলও ছিলেন। তাঁকে কাজের মানুষ করা হয়েছে, কিন্তু দর্শক তাঁকে ঘরের মানুষ বানিয়েছে। তাঁকে হাস্যকর প্রেমিক করা হয়েছে, কিন্তু তাঁর প্রেমের দৃশ্য মানুষ মনে রেখেছে। তাঁকে নায়কের সহকারী করা হয়েছে, কিন্তু অনেক সময় নায়কের দৃশ্যের চেয়েও তাঁর দৃশ্য বেশি প্রত্যাশিত হয়েছে।
তাঁকে গল্পের বিরতি হিসেবে লেখা হয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি যুগের স্মৃতি।
সালমান শাহ ও দিলদার: আকাঙ্ক্ষা এবং পরিচয়
সালমান শাহ ও দিলদারের যুগল উপস্থিতি এই বৈপরীত্যকে আরও গভীর করে। সালমান শাহ ছিলেন নব্বইয়ের পরিবর্তনশীল বাংলাদেশের নাগরিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাঁর পোশাক, চুল, প্রেম, প্রতিবাদ ও চলনে আধুনিকতার ছাপ ছিল। তাঁর সংক্ষিপ্ত চলচ্চিত্রজীবনে মোট ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের তথ্য বহুলভাবে স্বীকৃত।
দিলদার ছিলেন সেই আধুনিকতার নিচে চাপা পড়া মানুষের ইতিহাস।
সালমান শাহকে দেখে দর্শক ভাবত, “আমি এমন হতে চাই।”
দিলদারকে দেখে ভাবত, “এই মানুষটি আমাদেরই একজন।”
সালমান ছিলেন সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ। দিলদার ছিলেন ফেলে আসা গ্রাম এবং কঠিন বর্তমান। সালমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রতিবাদ করতেন। দিলদার দেখাতেন, প্রতিবাদের জায়গায় পৌঁছানোর আগেও মানুষকে রাস্তা, মুখ ও দালাল চিনতে হয়; ভয় সামলাতে হয়; অপমান গিলতে হয়।
সালমানের আধুনিকতা দর্শককে স্বপ্ন দেখাত। দিলদারের উপস্থিতি সেই স্বপ্নকে মাটির সঙ্গে যুক্ত রাখত। একজন ছিলেন আকাঙ্ক্ষা, অন্যজন পরিচয়। একজন দর্শককে আকাশের দিকে তুলতেন, অন্যজন তাকে পরিচিত উঠানে ফিরিয়ে আনতেন।
“আব্দুল্লাহ”: সাধারণ মুখের নায়ক হয়ে ওঠা
তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত “আব্দুল্লাহ” চলচ্চিত্রে দিলদার আর কাজের মানুষ, সহকারী বা হাসির বিরতি নন। তিনি নিজেই কেন্দ্রীয় নায়ক। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন নূতন। তাঁকে নায়ক করা নিয়ে সংশয় ছিল এবং কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত নায়িকা প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। কিন্তু মুক্তির পর দর্শক তাঁকে গ্রহণ করে।
চলচ্চিত্রটির ব্যবসার অঙ্ক নিয়ে উৎসে পার্থক্য আছে। কোনো প্রতিবেদনে প্রযোজকের ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, আবার অন্য প্রতিবেদনে সাড়ে তিন কোটি টাকার ব্যবসার কথা বলা হয়েছে। তৎকালীন স্বচ্ছ ও নিরীক্ষিত কেন্দ্রীয় বক্স অফিস ব্যবস্থা না থাকায় এসব অঙ্ককে আনুমানিক ভাষ্য হিসেবে দেখা উচিত। তবে চলচ্চিত্রটি বড় বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছিল, এ বিষয়ে বিভিন্ন উৎস একমত।
“আব্দুল্লাহ” কেবল একটি সফল চলচ্চিত্র ছিল না। এটি প্রতিষ্ঠিত নায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ দর্শকের সাংস্কৃতিক রায়।
দর্শক বলেছিল, নায়ক হতে রাজপুত্রের মতো চেহারা, নাগরিক উচ্চারণ কিংবা প্রচলিত তারকাসুলভ শরীর লাগে না। সাধারণ মুখ, পরিচিত ভাষা এবং মেহনতি মানুষের শরীরও পর্দার কেন্দ্র দখল করতে পারে। যে মানুষটি এতদিন অন্যের গল্পে হাসির বিরতি ছিল, সে নিজেই একটি পূর্ণ গল্পের কেন্দ্র হতে পারে।
কিন্তু এই সাফল্যের পর শ্রমজীবী মানুষের জীবন, গ্রাম-শহরের সংঘর্ষ, নিচুতলার প্রেম এবং সাধারণ মানুষের নায়কত্ব নিয়ে ধারাবাহিক চলচ্চিত্র তৈরি হলো না কেন? শুধু দিলদারের অসুস্থতা কি এর কারণ? নাকি বিনিয়োগকারীর ভয়, তারকা-রাজনীতি, শ্রেণিগত সৌন্দর্যবোধ এবং চলচ্চিত্রশিল্পের সীমিত কল্পনা তাঁকে আবার প্রান্তে ফিরিয়ে দিয়েছিল?
পর্দার শোষিত মানুষ, পর্দার বাইরের বঞ্চিত শ্রমিক
দিলদারের বড় মেয়ে মাসুমা আক্তার রুমার ভাষ্য অনুযায়ী, “আব্দুল্লাহ” সফল হলে দিলদারকে ১০ লাখ টাকা পারিশ্রমিক দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল। ছবিটি সফল হলেও তিনি সেই অর্থ পাননি। তাঁর মেয়ের আরও দাবি, মৃত্যুর সময় বিভিন্ন প্রযোজকের কাছে দিলদারের আনুমানিক ৮০ লাখ টাকা পাওনা ছিল এবং পরিবারের কাছে থাকা প্রায় ৩৫ লাখ টাকার চেকও নগদায়িত হয়নি।
এসব অঙ্ক স্বাধীনভাবে নিরীক্ষিত আর্থিক নথি নয়। তাই এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত আর্থিক সত্য না বলে পরিবারের অভিযোগ ও সাক্ষাৎকারভিত্তিক ভাষ্য হিসেবে দেখা প্রয়োজন। তবু অভিযোগটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক শ্রমের একটি নির্মম প্রশ্ন সামনে আনে।
পর্দায় দিলদার শোষিত মানুষের চরিত্র করেছেন। পরিবারের বক্তব্য সত্য হলে, পর্দার বাইরেও একজন সাংস্কৃতিক শ্রমিক হিসেবে তিনি নিজের শ্রমের মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
যে শিল্পীর নাম ব্যবহার করে দর্শক ডাকা হয়েছে, চলচ্চিত্র বিক্রি হয়েছে এবং প্রেক্ষাগৃহে ভিড় হয়েছে, সেই শিল্পী যদি নিজের পারিশ্রমিক না পান, তবে চলচ্চিত্রশিল্পও কি একই শোষণব্যবস্থার অংশ নয়, যাকে তার চলচ্চিত্রগুলো পর্দায় নিন্দা করত?
রাষ্ট্রের দেরিতে স্বীকৃতি
দিলদারের চলচ্চিত্রজীবনের শুরুর বছর নিয়ে উৎসে অসামঞ্জস্য রয়েছে। বহু সংবাদসূত্রে ১৯৭২ সালে তাঁর চলচ্চিত্রে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু উৎসে অমল বোস পরিচালিত “কেন এমন হয়”কে ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে সহজলভ্য উৎসের ভিত্তিতে এর চেয়ে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
তাঁর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও প্রচলিত ভুল রয়েছে। দিলদার ১৯৯৩ সালে কোনো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাননি। সঠিক তথ্য হলো, ২০০৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আবুল কালাম আজাদ পরিচালিত “তুমি শুধু আমার” চলচ্চিত্রে গিট্টু চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ২৮তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে কৌতুক চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পীর সম্মান লাভ করেন। পুরস্কারটি তাঁকে মরণোত্তরভাবে দেওয়া হয়েছিল।
যে শিল্পীকে দর্শক কয়েক দশক আগেই নিজের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, রাষ্ট্র তাঁকে চিনল জীবনের শেষ দৃশ্যের পরে।
পুরস্কারটি মূল্যবান। কিন্তু তার বিলম্বও অর্থবহ। রাষ্ট্র প্রায়ই প্রান্তের শিল্পভাষাকে তখনই গ্রহণ করে, যখন সাধারণ মানুষের ভালোবাসা তাকে আর অস্বীকার করার সুযোগ রাখে না। দিলদারের পুরস্কার তাই শুধু সম্মানের দলিল নয়। এটি রাষ্ট্রের দেরিরও দলিল।
প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে গেলে কী হারায়?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহের মানচিত্র দ্রুত বদলে গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে দেশে প্রায় ১,২০০টি প্রেক্ষাগৃহ থাকার কথা বলা হয়েছে। বছরভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব সহজলভ্য না হওয়ায় সংখ্যাটিকে আনুমানিক হিসেবে দেখা উচিত। তবে বহু পুরোনো প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়েছে এবং কোনো কোনো স্থানে সেগুলো ভেঙে বিপণিবিতান, আবাসিক ভবন বা অন্য স্থাপনা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু শুধু ভবন কি ভেঙেছে?
ভেঙেছে পাশাপাশি বসে হাসার সংস্কৃতি। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একই সময়ে কাঁদার সংস্কৃতি। নায়ক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে একসঙ্গে হাততালি দেওয়ার অভ্যাস। দিলদার পর্দায় এলে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসার সম্মিলিত মুহূর্ত।
আজ মানুষ ছোট পর্দায় একা দেখে। দৃশ্য এগিয়ে দেয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়, থাকবে নাকি অন্য দৃশ্যে যাবে। কিন্তু দিলদারকে কয়েক সেকেন্ডে পাওয়া যায় না। তাঁর হাসির আগে পরিস্থিতি জমে। মুখ বাঁকানোর আগে অপমান আসে। চিৎকারের আগে ভয় জমা হয়। দৌড়ানোর আগে ক্ষমতার কোনো দরজা তাঁর সামনে বন্ধ হয়।
আরেকজন দিলদার কি জন্ম নেবেন?
প্রতিভাবান কৌতুক অভিনেতা নিশ্চয়ই আসবেন। অসাধারণ শরীরী অভিনয়শিল্পীরও জন্ম হবে। কিন্তু আরেকটি দিলদার তৈরি করতে শুধু একজন শিল্পী যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন এমন একটি সময়, যখন গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা পর্দায় খুঁজবে। প্রয়োজন এমন প্রেক্ষাগৃহ, যেখানে শ্রমজীবী দর্শক সম্মিলিতভাবে হাসবে। প্রয়োজন এমন চলচ্চিত্র, যেখানে নায়ক, খলনায়ক, মা, প্রেম, দারিদ্র্য, অন্যায়, গান ও কৌতুক একই সামাজিক মেলার অংশ হবে। সর্বোপরি প্রয়োজন এমন শিল্পব্যবস্থা, যা নিচুতলার মানুষকে শুধু হাসির উপকরণ নয়, পূর্ণ মানুষ ও নায়ক হিসেবেও কল্পনা করতে পারবে।
দিলদারের জন্ম শুধু ১৯৪৫ সালের ১৩ জানুয়ারি কোনো মায়ের গর্ভে হয়নি। তিনি দ্বিতীয়বার জন্মেছিলেন প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে। তৃতীয়বার জন্মেছিলেন শ্রমজীবী মানুষের সম্মিলিত হাসিতে। আবার জন্মেছিলেন সেই দর্শকের স্মৃতিতে, যে নায়ক-নায়িকার নাম ভুলে গেলেও বলত, “ওই ছবিতে দিলদার ছিল।”
আজও গরিব মানুষ আছে। আজও শহর শ্রমিকের ঘাম নেয়। আজও কাজের মানুষকে পরিবারের সদস্য বলা হয়, কিন্তু সম্পত্তিতে ভাগ দেওয়া হয় না। আজও গ্রামের মানুষকে সহজ-সরল বলা হয়, কিন্তু তার জ্ঞানকে জ্ঞান বলা হয় না। আজও কম বেতনের কর্মীকে দায়িত্ববান বলে বাড়তি কাজ করানো হয়। আজও মানুষের শ্রমের মূল্য আটকে থাকে, অথচ তার আনুগত্যের প্রশংসা করা হয়।
কিন্তু এই মানুষগুলোর ভয়, লজ্জা, ক্ষোভ, প্রেম, চাতুর্য ও আত্মরক্ষাকে কে আবার দিলদারের মতো একটি শরীর দেবে?
আমরা কাকে নিয়ে হেসেছিলাম?
এত বছর পর দিলদারকে নিয়ে ভাবা তাই নিছক স্মৃতিবিলাস নয়। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক অপরাধবোধের সামনে দাঁড়ানো। আমরা কাকে নিয়ে হেসেছিলাম? কাকে ছোট চরিত্র করেছিলাম? কাকে ভালোবেসেও সমান মর্যাদা দিইনি? কোন গ্রাম শহরে এসে হারিয়ে গিয়েছিল? কোন মানুষ “আমি এই শহরে কিছুই চিনি না” বলে দাঁড়িয়ে ছিল, আর আমরা তার ভয় না শুনে শুধু উচ্চারণে হেসেছিলাম?
- চিত্রনাট্য তাঁকে ছোট করে লিখেছিল।
- শিল্পব্যবস্থা তাঁর জনপ্রিয়তা ব্যবহার করেছিল।
- পরিবারের ভাষ্যমতে, প্রযোজকদের কাছে তাঁর শ্রমের মূল্য আটকে ছিল।
- রাষ্ট্র তাঁকে মরণোত্তর স্বীকৃতি দিয়েছিল।
- শহুরে সংস্কৃতি তাঁর ভাষা ও শরীরকে গেঁয়ো বলে পড়েছিল।
- কিন্তু সাধারণ দর্শক তাঁকে অপেক্ষা করিয়ে রাখেনি।
দর্শক তাঁকে কাজের মানুষ হিসেবে নয়, নিজেদের ঘরের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তাঁর মুখে নিজের বাবার ক্লান্তি দেখেছিল। তাঁর ভয়ে নিজের শহরভীতি দেখেছিল। তাঁর ব্যর্থ প্রেমে নিজের অপূর্ণতা দেখেছিল। তাঁর চাতুর্যে নিজের বেঁচে থাকার কৌশল দেখেছিল। তাঁর হাসির ভেতর নিজের অদেখা কান্নার শব্দ শুনেছিল।
দিলদারকে শুধু কৌতুক অভিনেতা বললে তাই ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায় করা হয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের নগরায়ণের হারিয়ে যাওয়া পথিক, শ্রমজীবী মানুষের অবদমিত আত্মজীবনী, নব্বইয়ের সামাজিক মেলোড্রামার শ্বাস নেওয়ার জায়গা এবং নায়কতন্ত্রের নিচে চাপা পড়ে থাকা সাধারণ মানুষের অসম্ভব তারকাখ্যাতি।
তিনি ছিলেন এমন এক আয়না, যেখানে বাংলাদেশ দেখতে পেত কাকে সে ভালোবাসে, কিন্তু কাকে সমান মর্যাদা দিতে ভয় পায়।
দিলদার শুধু হাসির মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অদেখা কান্নার ওপর রাখা এক পরম উষ্ণ হাত।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, Population and Housing Census 2022: National Report, Volume 1। জাতীয় প্রতিবেদনে নগর জনসংখ্যা ৩১.৬৬ শতাংশ এবং গ্রামীণ জনসংখ্যা ৬৮.৩৪ শতাংশ।
- World Bank, “Leveraging Urbanization in Bangladesh,” 24 September 2015. প্রতিবেদনে ২০১০ সালের নগর দারিদ্র্য, ২০০৯ সালের বস্তিবাসী এবং অপরিকল্পিত ও গোপন নগরায়ণসংক্রান্ত উপাত্ত ব্যবহৃত হয়েছে।
- Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association, Export Performance. মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অংশ ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে ৩.৮৯ শতাংশ এবং ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে ৬০.৬৪ শতাংশ।
- জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০০৩-এর প্রকাশিত বিজয়ী তালিকা এবং চলচ্চিত্রবিষয়ক তথ্যভান্ডার। দিলদার “তুমি শুধু আমার” চলচ্চিত্রের জন্য কৌতুক চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার লাভ করেন।
- দিলদারের জন্ম, মৃত্যু, চলচ্চিত্রজীবন, পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের দাবি এবং “কেন এমন হয়” চলচ্চিত্রের মুক্তিকাল নিয়ে জাগোনিউজ২৪, অবজারভার, রাইজিংবিডি ও চলচ্চিত্রবিষয়ক জীবনীমূলক উৎস।
- দিলদারের বড় মেয়ে মাসুমা আক্তার রুমার সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত করে প্রকাশিত ইত্তেফাক, ঢাকা মেইল ও বাংলা মুভি ডেটাবেজের প্রতিবেদন। পারিশ্রমিক ও পাওনার অঙ্কগুলো পরিবারের ভাষ্য, নিরীক্ষিত আর্থিক তথ্য নয়।
- সালমান শাহের চলচ্চিত্রতালিকা ও জীবনীমূলক উৎস। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৭ বলে প্রচলিত তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে।
- বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহের পতন ও আনুমানিক সংখ্যার জন্য ঢাকা ট্রিবিউনসহ চলচ্চিত্রশিল্পবিষয়ক প্রতিবেদন। প্রায় ১,২০০ প্রেক্ষাগৃহের তথ্যকে নির্দিষ্ট বছরের সরকারি চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে নয়, প্রতিবেদনভিত্তিক আনুমানিক তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0