দত্ত পরিবার | পর্ব ১৫: সূর্যাস্তের আগে

মূল প্রমাণ নিরাপদ রেখে হাসান ও স্নেহা সূর্যাস্তের আগে দত্ত ভবনের পথে যাত্রা করে। কিন্তু পথ, প্রতিলিপি ও তিন আঁচড়ের সংকেত ঘিরে এক অদৃশ্য পরিকল্পনা তাদের ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে ঠেলে দেয়।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ২
দত্ত পরিবার | পর্ব ১৫: সূর্যাস্তের আগে
সূর্যাস্তের সময় পুরোনো সেতুর কাছে কাদাময় গ্রামীণ সড়কে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির ভেতর ডান বাহুতে রক্তচিহ্নযুক্ত ব্যান্ডেজসহ হাসান ও কালো প্রমাণের ব্যাগ রক্ষাকারী স্নেহা; পেছনে আলো জ্বালানো রহস্যময় বড় গাড়ি এবং সামনে কাদায় পড়ে থাকা তিন আঁচড়ের ধাতব পাত

অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস

দত্ত পরিবার

পর্ব ১৫: সূর্যাস্তের আগে

লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান

মানুষ যখন কোনো বাড়িতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়, তখন পথের দূরত্ব মাপে। আমরা মাপছিলাম অন্য কিছু। কোন কাগজটি সঙ্গে নেওয়া হবে, কার কাছে পথের খবর থাকবে, কোন কণ্ঠ বিশ্বাস করা যাবে এবং সূর্যাস্তের আগে পৌঁছানোর নির্দেশটি আসলে আমন্ত্রণ, না ফাঁদ।

দরজায় প্রথমবার শব্দ হতেই ঘুম ভেঙে গেল।

একবার।

একটু বিরতি।

তারপর পরপর দুবার।

বিছানায় উঠে বসে কয়েক মুহূর্ত দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাইরে সকাল হয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলো মাটির দেয়ালে বাঁশঝাড়ের ছায়া এঁকেছে। উঠোনে ঝাড়ু দেওয়ার খসখস শব্দ। দূরের কোনো বাড়ি থেকে হাঁসের ডাক। রান্নাঘরের দিক থেকে পোড়া কাঠ, পেঁয়াজ আর গরম ভাতের গন্ধ।

সাধারণ একটি গ্রামের সকাল।

অথচ সাধারণ সকাল এখন আমাকে সবচেয়ে বেশি সন্দেহে ফেলে। কারণ অস্বাভাবিক ঘটনার একটি সুবিধা আছে। সেটি নিজেকে লুকায় না। সাধারণ ঘটনা মানুষের পাশে বসে এমনভাবে চা খায়, যেন তার ভেতরে কোনো গোপন উদ্দেশ্য নেই।

দরজার বাইরে থেকে স্নেহা বলল, “তুমি ধরে রাখলে দাঁড়ানো সহজ।”

আমাদের ব্যক্তিগত সংকেত।

অন্ধকার থেকে তার কণ্ঠ শুনলে দরজা খোলার আগে তিনবার ডাক এবং এমন একটি বাক্য, যা শুধু আমাদের জানা। ব্যবস্থাটি স্নেহার। বিপদের মধ্যে নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য আবেগকে সংকেতে পরিণত করার অদ্ভুত দক্ষতা তার আছে।

দরজা খুললাম।

স্নেহার পরনে গাঢ় নীল শাড়ি। পাড়ে সরু সাদা রেখা। চুল শক্ত করে পেছনে বাঁধা। চোখের নিচে ঘুমহীনতার গাঢ় ছায়া থাকলেও মুখে রাতের ক্লান্তি নেই। তার এক হাতে চিকিৎসার কালো ব্যাগ, অন্য হাতে তিনটি বাদামি খাম।

“তুমি ঘুমিয়েছিলে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“কিছুক্ষণ।”

“কতক্ষণ?”

“তোমার মতো মানুষের পাশে থাকলে ঘুমের হিসাব রাখা যায় না।”

“এটি অভিযোগ?”

“নথিভুক্ত পর্যবেক্ষণ।”

সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তারপর আমার ডান বাহুর দিকে তাকাল। নতুন ব্যান্ডেজের নিচে ক্ষতটি তুলনামূলক শান্ত। তবে আঙুল নাড়ালেই গভীরে সরু একটি টান জেগে উঠছে। মনে হচ্ছে, ক্ষতের মধ্যে কেউ ধৈর্য ধরে গিঁট খুলছে।

“হাত?”

“শরীরের সঙ্গে আছে।”

“প্রশ্নের উত্তর দাও।”

“ব্যথা আছে। আগের চেয়ে কম।”

স্নেহা ব্যান্ডেজের কিনারা পরীক্ষা করল। আঙুলের চাপ খুব হালকা। তারপরও ক্ষতের গভীরে উষ্ণ একটি রেখা কাঁধ পর্যন্ত উঠে গেল।

“আজ ডান হাত ব্যবহার করবে না।”

“গত কয়েক দিনেও করিনি। তারপরও হাতটির ব্যস্ততা কমছে না।”

“গাড়ির ঝাঁকুনিতেও সমস্যা হতে পারে।”

“দত্ত ভবনের পথে ঝাঁকুনির চেয়ে বড় সমস্যা আছে।”

“তাই বলে ছোট সমস্যাকে অবহেলা করা যায় না।”

যে প্রমাণ সঙ্গে যাবে না

টেবিলের ওপর সারিবদ্ধ কাগজগুলো দেখে মনে হলো, আমরা কোনো রহস্যময় বাড়িতে যাচ্ছি না। আদালতে যাচ্ছি।

সীমান্তের কালির পাতার দুইটি প্রতিলিপি। পূর্ববঙ্গে অসম্পূর্ণ `...নাথ দত্ত` জীবিত, পশ্চিমবঙ্গে একই অসম্পূর্ণ নাম মৃত এবং উত্তরাধিকার হস্তান্তরিত। মূল পাতার বাঁ কোণে বাদামি দাগ। স্নেহার নোটে পরিষ্কার লেখা, পরীক্ষা ছাড়া দাগটিকে রক্ত বা কালি, কোনোটি বলা যাবে না।

‘চেয়ারম্যানবাড়ির রাত’ খাতার নির্বাচিত পাতার ছবি। সেখানে আমার হাতের লেখায় এমন কথোপকথন, যা আমার প্রত্যক্ষভাবে শোনার কথা নয়।

এডগার অ্যালান পো-র বইয়ে সুবর্ণার পাঁচ, এগারো ও সাতচল্লিশের চিহ্ন। একাদশ পাতার সম্ভাব্য পাঠচক্র। বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম, অঞ্চল ও শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অসম সুযোগের হিসাব।

স্মৃতি দত্তের নামে পাঠানো চিঠির প্রতিলিপি। সূর্যাস্তের আগে ফিরতে হবে। পশ্চিমঘর খোলা হবে না। খাতা, পাতা ও পো-র বই সঙ্গে নিতে হবে। কোনো পাণ্ডুলিপি নয়। কোনো অস্ত্র নয়। স্নেহাকে সঙ্গে নিতে হবে।

আর তিনটি আঁচড়যুক্ত ক্ষুদ্র ধাতব পাতটির মাপ ও অঙ্কন।

মূল প্রমাণগুলোর কোনোটি টেবিলে নেই।

“কোথায় রেখেছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“নিরাপদ জায়গায়।”

“এটি দত্ত পরিবারের উত্তর।”

“তোমার কাছ থেকেই শিখেছি।”

“মা জানেন?”

“তিনি জানেন কয়েকটি কাগজ রাখতে হবে। কাগজের বিষয় জানেন না।”

“তাঁকে না জানিয়ে ঝুঁকির মধ্যে রাখলে না?”

স্নেহা প্রতিলিপিগুলো আলাদা খামে রাখছিল। কোনো খামের ওপর নাম, সাল বা দত্ত ভবনের উল্লেখ নেই। শুধু ছোট কিছু সাধারণ চিহ্ন।

“যারা আমাদের অনুসরণ করছে, তারা ভাববে মূল প্রমাণ আমাদের সঙ্গে,” সে বলল। “গ্রামের বাড়িতে কাগজ থাকার কথা তারা জানবে না।”

“তার মানে আমরা টোপ?”

“না। প্রতিলিপি টোপ। আমরা শুধু বহন করব।”

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

“আমার সংলাপ চুরি করেছ।”

“তোমার ভুল থেকে শেখার অধিকার আমার আছে।”

স্নেহা ব্যাগের ভেতরের আলাদা অংশে প্রতিলিপিগুলো রাখল। চিকিৎসার সামগ্রী অন্য পাশে। বাইরে থেকে এটি সাধারণ চিকিৎসার ব্যাগ। ভেতরে ওষুধ, প্রমাণ এবং তার নোটবুক।

অমিতের পাঠানো পিস্তলটি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে না। আগের রাতে শিহাব সেটি অন্যত্র সরিয়ে রেখেছে। কোথায়, আমাকে জানায়নি। স্নেহার যুক্তি, এই মুহূর্তে সব বস্তুর অবস্থান আমার জানা নিরাপদ নয়।

আমার বিরুদ্ধে একটি ছোট জোট তৈরি হয়েছে।

অস্বস্তিকর।

একই সঙ্গে স্বস্তিদায়কও। দীর্ঘদিন পর কেউ আমাকে আমার নিজের পরিকল্পনা থেকেও রক্ষা করতে চাইছে।

দুটি পথ, তিনটি খবর

উঠোনের এক পাশে দাঁড়িয়ে শিহাব ফোনে কথা বলছিল। আমাদের দেখেই কল কেটে এগিয়ে এল।

“গাড়ি ঠিক হয়েছে,” সে বলল। “শওকত চাচা চালাবেন। এই এলাকার পুরোনো পথগুলো চেনেন।”

“কোন পথ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“প্রধান সড়কে গেলে সময় কম লাগবে। পশ্চিমের বাঁধ দিয়ে গেলে প্রায় এক ঘণ্টা বেশি।”

“প্রধান সড়ক বাদ,” স্নেহা বলল।

“স্মৃতি দত্ত সূর্যাস্তের আগে যেতে বলেছেন,” আমি মনে করিয়ে দিলাম।

“তিনি পথ ঠিক করেননি।”

“সময় ঠিক করেছেন।”

“আমরা তাঁর সময়ও পুরোপুরি মানব না।”

স্নেহার পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা সূর্যাস্তের আগেই দত্ত ভবনের আশপাশে পৌঁছাব। সরাসরি ফটকে যাব না। আগে দূর থেকে বাড়ির বাইরে নজর রাখা হবে। পরিচিত গাড়ি বা লোক দেখা গেলে পথ বদলানো হবে।

শিহাব প্রতি বিশ মিনিটে ফোন করবে। কল না ধরলে আমাদের সর্বশেষ অবস্থান ধরে পেছনে আসবে। সে আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে না। বাড়ি, মূল প্রমাণ এবং পেছনের যোগাযোগ রক্ষার জন্য কাউকে থাকতে হবে।

“অমিত?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“ফোন বন্ধ।”

“সাংগঠনিক যোগাযোগ?”

“কেউ বলছে না যে ও নিখোঁজ। কেউ জানেও না কোথায় আছে।”

“দুটি কথা একসঙ্গে সত্য হয়?”

শিহাব শান্তভাবে বলল, “তোমার কাছ থেকে শিখেছি, হয়।”

আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। ছোটবেলায় যে ছেলে কাঁদতে কাঁদতে আমার ঘরে এসে সুবর্ণার সঙ্গে দেখা না করতে বলেছিল, সে এখন পথ, সময়, অবস্থান এবং যোগাযোগের হিসাব করছে। আমার অনুপস্থিতি তাকে শুধু বড় করেনি। সতর্ক করেছে।

“চেয়ারম্যানবাড়ির খবর?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“রাতে বাইরের দরজায় নতুন কোনো পরিবর্তন হয়নি। রফিক নামে যে লোক চিঠি দিয়েছিল, গাড়ির নম্বর দেখে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। নম্বরটি অন্য একটি গাড়ির।”

“চুরি?”

“না। যে গাড়ির আসল নম্বর, সেটি বহু মাস ধরে নষ্ট অবস্থায় আছে।”

স্নেহা নোটবুক বের করল।

“রফিকের পরিচয়?”

“দত্ত ভবনের আশপাশে ওই নামে কয়েকজন আছে। কিন্তু বর্ণনার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে কাউকে মেলানো যায়নি।”

আরেকটি প্রমাণ নয়। আরেকটি সম্ভাবনা।

উঠোনের বাইরে পুরোনো ইঞ্জিনের শব্দ এল। ধূসর রঙের একটি গাড়ি বাঁশের বেড়ার সামনে এসে থামল। কয়েক জায়গায় রং উঠে গেছে। সামনের কাচের এক কোণে পুরোনো ফাটল।

চালকের আসন থেকে শওকত চাচা নামলেন। আমাদের পরিবারের পরিচিত। ছোটবেলায় বাজার থেকে ফেরার পথে তাঁর গাড়িতে উঠেছি। তখন গাড়িটি অন্য রঙের ছিল, নাকি আমার স্মৃতি রং বদলে দিয়েছে, নিশ্চিত নই।

“শহরের দিকে যাবা?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

শিহাব তাঁকে দত্ত ভবনের নাম বলেনি।

“শহরের আগেই নামব,” স্নেহা বলল।

শওকত চাচা সম্মতি জানালেন। অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করলেন না। গ্রামের মানুষের এই গুণটি বিরল। অধিকাংশ মানুষ কৌতূহল থেকে প্রশ্ন করে। কিছু মানুষ প্রশ্ন না করে বুঝিয়ে দেয়, তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জানে।

যাত্রার আগে

গাড়িতে ওঠার আগে মা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

“আবার কবে ফিরবি?”

“কাজ শেষ হলে।”

“কাজ কবে শেষ হবে?”

“যে কাজটি কী, সেটাই পুরো জানি না। শেষের তারিখ বলা কঠিন।”

মা হাসলেন না। বাঁ হাত দিয়ে আমার মুখ ছুঁলেন। তাঁর তালু শুষ্ক ও উষ্ণ। আঙুলে রান্নার হলুদ।

তারপর স্নেহার দিকে তাকালেন।

“ও নিজের শরীরের কথা শোনে না। তুমি দেখো।”

স্নেহা বলল, “দেখব।”

একটি ছোট শব্দ। কিন্তু তার মধ্যে এমন এক দায় ছিল, যা আমি তাকে কখনো দিইনি। সে নিজেই নিয়েছে।

মা ঘরে ফিরে যাওয়ার আগে থামলেন।

“তোর বাবার কাগজগুলোর কথা বলছিলি। পুরোনো আলমারির নিচে আরেকটা টিনের বাক্স আছে। তোর বাবা অসুস্থ হওয়ার পর কাগজগুলো আলাদা করে রাখছিল। সব দেখা হয় নাই।”

আমি স্থির হয়ে গেলাম।

“বাবা নিজে রেখেছিলেন?”

“কিছু নিজে। কিছু আমি। তখন তোকে খবর দিতে চেয়েছিল। পরে শরীর আরও খারাপ হইল।”

স্নেহা আমার দিকে তাকাল। প্রশ্ন করল না।

বাবার ওষুধের জন্য টাকা পাঠানোর স্মৃতি এবং তাঁর রেখে যাওয়া কাগজপত্রের মধ্যে যে ফাঁক এত দিন অন্ধকার ছিল, সেখানে প্রথমবার একটি সরু সময়রেখা দেখা দিল। কিন্তু সময়রেখাটি সম্পূর্ণ নয়। বাবা কখন অসুস্থ হলেন, কী বলতে চেয়েছিলেন এবং কাগজের মধ্যে কী রেখেছিলেন, তার উত্তর এখনো বাকি।

স্নেহা নিচু স্বরে বলল, “আজ আর বাক্সটি খোলা হবে না।”

“কেন?”

“একটি নতুন নথি খুললে আমাদের যাত্রা পিছিয়ে যাবে। আর তাড়াহুড়ো করে দেখলে প্রমাণ নষ্ট হতে পারে।”

কথাটি ঠিক। তবু বাড়ি ছাড়ার সময় মনে হলো, টিনের বাক্সটির ভেতর থেকে কেউ আমাদের চলে যাওয়া শুনছে।

সাতচল্লিশের আগের মানুষ

প্রথম ঘণ্টা শান্ত ছিল।

গ্রামের পথ পেরিয়ে গাড়ি পুরোনো ইটের সড়কে উঠল। দুই পাশে ধানের ক্ষেত। বাতাসে পাকা ধানের ভারী গন্ধ। কোথাও খড়ের আঁটি বাঁধা হচ্ছে। কোথাও শিশুরা হাঁটু পর্যন্ত পানিতে নেমে মাছ ধরছে।

আমি পেছনের আসনে জানালার পাশে। স্নেহা পাশে। তার ব্যাগ দুই পায়ের মাঝখানে। আমার ডান বাহু শরীরের সঙ্গে স্থির। প্রতিটি ঝাঁকুনিতে ক্ষতের ভেতর ছোট ব্যথা উঠছে।

স্নেহা নোটবুক খুলে পাঁচ, এগারো ও সাতচল্লিশ লিখল।

“পাঁচ যদি ১৯০৫ হয়?” আমি বললাম।

“হতে পারে।”

“এগারো ১৯১১?”

“সেটিও হতে পারে।”

“তুমি উত্তেজিত হচ্ছ না কেন?”

“কারণ ‘হতে পারে’কে আবিষ্কার বলা যায় না।”

“১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ। তারপর ১৯৪৭। ক্রমটি খুব স্বাভাবিক।”

“এতটাই স্বাভাবিক যে কেউ ইচ্ছা করে আমাদের সেই ক্রমে চালাতে পারে।”

“সুবর্ণা?”

“তার লেখাটি সত্যিই তার কি না, সেটিও পুরোপুরি যাচাই হয়নি।”

“হাতের লেখা চিনেছি।”

“তুমি নিজের হাতের লেখা থাকা খাতাকেই পুরো নিজের বলতে পারছ না।”

যুক্তির সমস্যা হলো, অন্যের হাতে থাকলে সেটি প্রায়ই আঘাত করার অস্ত্রের মতো কাজ করে।

“পাঁচ আর এগারো যদি সাল হয়,” আমি বললাম, “তাহলে দত্ত পরিবারের প্রথম নথি সম্ভবত ১৯৪৭-এর আগের কোনো পরিচয় পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত।”

“অথবা জমি, শিক্ষা, চাকরি, শহর বা প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে। একটি দেশ ভাগ হওয়ার আগে মানুষ শুধু ধর্ম দিয়ে আলাদা হয় না। সুযোগ দিয়েও হয়।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠচক্রের নোট মনে পড়ল। একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। একই মাঠ। একই শ্রেণিকক্ষ। কিন্তু একজনের পরিবার তাকে টাকা পাঠাতে পারে, অন্যজনকে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। একজন নিজের উচ্চারণ লুকায়। আরেকজন পারিবারিক নাম বলেই দরজা খোলে।

“আমরা সেই পাঠচক্রে কী করতাম?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

“মানুষের অসমতাকে ভাষা দিতাম। সম্ভবত।”

“তারপর?”

“সংগঠন। রাজনৈতিক শিক্ষা। ক্ষমতা তৈরির চেষ্টা।”

“আর পর্যবেক্ষণ?”

“মানুষ কী বলে, তার চেয়ে কোথায় থামে দেখতাম।”

“সেই তথ্য তাদের সাহায্য করতে ব্যবহার করতে, না নিয়ন্ত্রণ করতে?”

জানালার বাইরে তাকালাম।

“সম্ভবত প্রথমটি বলে শুরু করেছিলাম।”

“শেষে?”

“সুবর্ণা সেটিই জানতে চেয়েছিল।”

স্নেহা নোটবুক বন্ধ করল।

“আমি তার উত্তর জানতে চাইব।”

“সুবর্ণার কাছ থেকে?”

“আগে তোমার কাছ থেকে।”

“যদি মনে না পড়ে?”

“তাহলে সেটুকু বলবে। নিজের সুবিধামতো ফাঁকা জায়গা পূরণ করবে না।”

স্নেহার সঙ্গে কথোপকথনের সবচেয়ে কঠিন দিক হলো, সে আমাকে এমন সত্য বলতে বলে, যা আমার কাছে নেই। আরও কঠিন দিক হলো, সত্য না থাকলে সেটিও স্বীকার করতে বলে।

পেছনের গাড়ি

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সময় পেছনের কাচে প্রথম গাড়িটিকে দেখলাম।

অনেক দূরে। গাঢ় রঙের বড় গাড়ি। আমাদের পথেই আসছে।

গ্রামীণ রাস্তায় বড় গাড়ি অস্বাভাবিক নয়। বাজারের মাল, নির্মাণসামগ্রী, ধান বা গবাদিপশু বহনের জন্য চলে। তবু গাড়িটির সামনের কাচে আলো পড়ার ধরন কোথায় যেন পরিচিত লাগল।

সরাসরি পেছনে ঘুরতে যেতেই স্নেহা বলল, “কাচে দেখো।”

সে আগেই গাড়িটি লক্ষ করেছে।

“কতক্ষণ ধরে?”

“শেষ দুটি বাঁক থেকে।”

“একই দূরত্ব?”

“প্রায়।”

শওকত চাচা সামনের আয়নায় দেখলেন।

“আগে দেখি নাই।”

স্নেহা শিহাবকে বার্তা পাঠাল:

পেছনে বড় গাড়ি। নম্বর অস্পষ্ট। লোকেশন দেখো।

উত্তর এল:

দেখছি। সামনে পুরোনো সেতুর আগে বাজার। প্রয়োজন হলে থামো।

পেছনের গাড়িটি গতি বাড়াল না। কমালও না।

কিছুক্ষণ পর আমাদের পথ নদীর বাঁধের দিকে উঠল। এক পাশে নিচু জলাভূমি। অন্য পাশে ধানক্ষেত ও বাঁশঝাড়। সামনে পুরোনো সেতুর লোহার কাঠামো বিকেলের আলোয় কালচে হয়ে আছে।

আমার ফোন বেজে উঠল।

শিহাব।

“গাড়ির নম্বর দেখেছ?”

“কাদা দিয়ে ঢাকা।”

“রাস্তার পরের অংশে নেটওয়ার্ক কম। বাজারে থামলে জানিও।”

“তুই কোথায়?”

“বাড়িতে। তবে মোটরসাইকেল প্রস্তুত।”

সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে ওপাশে আরেকটি মোটরসাইকেলের শব্দ পেলাম।

“শিহাব একা নয়,” বললাম।

“ভালো,” স্নেহা উত্তর দিল।

তারপর তার চোখ পেছনের কাচে স্থির হয়ে গেল।

বড় গাড়িটি দূরত্ব কমাতে শুরু করেছে।

“শওকত চাচা,” আমি বললাম, “সামনের বাজারে ঢুকবেন।”

বাজার তখনো চোখে পড়ছে না।

স্নেহা আমার দিকে তাকাল।

“পরীক্ষা করছ?”

“ওরা আমাদের সিদ্ধান্ত শুনতে পাচ্ছে কি না।”

পেছনের গাড়িটি সঙ্গে সঙ্গে আরও দ্রুত এগিয়ে এল।

স্নেহা বলল, “শোনেনি। তবে আমাদের সময় কমছে।”

শওকত চাচা বললেন, “সামনের সেতু পার হইলে দুই দিকের রাস্তা আছে।”

“বাঁ দিক,” স্নেহা বলল।

“বাঁ দিকে গেলে দত্ত ভবনে পৌঁছাতে দেরি হবে,” আমি বললাম।

“পেছনের গাড়িকে সঙ্গে নিয়ে সময়মতো পৌঁছানোর ইচ্ছা আছে?”

উত্তর দিলাম না।

গাড়ির ভেতর হঠাৎ খুব নীরব হয়ে গেল। ইঞ্জিনের শব্দ, চাকার নিচে ইটের কাঁপুনি এবং পেছনের গাড়ির ক্রমশ কাছে আসা ভারী গর্জন ছাড়া কিছু নেই।

স্নেহা নিজের ব্যাগের বেল্ট কবজিতে জড়িয়ে নিল।

“কী করছ?”

“ব্যাগ যেন হাতছাড়া না হয়।”

“দুর্ঘটনা ঘটবে ধরে নিয়েছ?”

“সম্ভাবনা অস্বীকার করছি না।”

“তোমার আশাবাদ আমাকে মুগ্ধ করে।”

“সিটে ঠিকভাবে বসো। ডান হাত শরীরের পাশে রাখো।”

“তুমি ভয় পাচ্ছ?”

“পাচ্ছি।”

সে উত্তর দিতে এক মুহূর্তও দেরি করল না।

“তারপরও এত শান্ত?”

“ভয় পেলে তুমি কথা বলো। আমি হিসাব করি।”

“এই কারণেই আমাদের সম্পর্ক টিকে আছে।”

“কোন সম্পর্ক?”

প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেলাম না।

সূর্যাস্তের আগে

সেতুর আগে রাস্তার ডান পাশে একটি মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে ছিল।

প্রথমে সাধারণ মনে হলো। তারপর মোটরসাইকেলটি ধীরে সড়কের দিকে কাত হতে শুরু করল।

পাশে কোনো মানুষ নেই।

শওকত চাচা ব্রেক চাপলেন।

সময় তখন আর সরলভাবে চলছিল না।

সামনে মোটরসাইকেলটি সড়কের মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে।

বাঁ পাশে সেতুর লোহার কাঠামো।

ডান পাশে নিচু জমি।

পেছনের আয়নায় বড় গাড়িটির কালো সামনের অংশ দ্রুত বড় হচ্ছে।

“ধরে থাকো!” শওকত চাচা চিৎকার করলেন।

প্রথম ধাক্কাটি পেছন থেকে এল।

লোহা লোহার সঙ্গে আঘাত করল। পুরো গাড়ি সামনে ছিটকে গেল। পেছনের কাচে সাদা ফাটল মুহূর্তের মধ্যে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে পড়ল।

স্নেহার বাঁ হাত আমার বুকের সামনে এসে আমাকে আসনের সঙ্গে চেপে ধরল। অন্য হাতে ব্যাগ।

দ্বিতীয় ধাক্কাটি পাশ ঘেঁষে এল।

গাড়ির পেছনের অংশ ডান দিকে উঠে গেল। শওকত চাচা সামনে পড়ে থাকা মোটরসাইকেল এড়িয়ে সড়কে ফেরার চেষ্টা করলেন। চাকার নিচে ইটের পথ শেষ হয়ে ভেজা মাটি শুরু হলো।

গাড়িটি ঘুরে গেল।

বাইরের পৃথিবী জানালার সামনে দ্রুত জায়গা বদলাতে লাগল।

ধানক্ষেত।

আকাশ।

সেতুর কালো লোহা।

পেছনের গাড়ির আলো।

স্নেহার মুখ।

তার চোখ তখন আমার দিকে নয়। সামনের দিকে। যেন সে শেষ মুহূর্তেও বুঝতে চাইছে, কোন দিক থেকে পরবর্তী আঘাত আসবে।

“হাসান, মাথা নিচু করো!”

গাড়িটি রাস্তা ছেড়ে নিচু জমিতে নেমে গেল।

প্রথম আঘাতে সামনের অংশ মাটিতে পড়ল।

আমার ডান বাহু শরীরের পাশ থেকে ছিটকে উঠল। ক্ষতের গভীরে তীব্র কিছু ছিঁড়ে যাওয়ার অনুভূতি হলো। ব্যথা এত দ্রুত এল যে চিৎকার করার আগেই শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।

দ্বিতীয় আঘাতে গাড়ির কাচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল।

স্নেহার কপাল কোথাও আঘাত করল। তার মুখের পাশে লাল একটি রেখা ফুটে উঠতে দেখলাম।

তারপর গাড়িটি পাশ ফিরে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পৃথিবীতে কোনো দিক রইল না।

ছাদ মেঝে হয়ে গেল।

জানালা দরজা হয়ে গেল।

সূর্য এক কাচ থেকে আরেক কাচে লাফিয়ে গেল।

শেষবার একটি ভারী ধাতব শব্দ শুনলাম।

তারপর সব থেমে গেল।

দুর্ঘটনার পর প্রথম যে শব্দটি শুনলাম, সেটি ভাঙা কাচের নয়।

কেউ গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে তিনবার ধাতব শরীরে আঘাত করছিল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

চোখ খুলতে পারছিলাম না। কানের ভেতর দীর্ঘ শোঁ শোঁ শব্দ। মুখে রক্ত না ধুলো, বুঝতে পারলাম না। কোথাও খুব কাছে স্নেহা আমার নাম বলল।

তারপর বাইরে থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ এল।

“ব্যাগটি নাও। সূর্য ডোবার আগেই ওদের পৌঁছাতে হবে।”

আরেকটি কণ্ঠ উত্তর দিল।

কণ্ঠটি খুব নিচু।

খুব পরিচিত।

“দুজনকে, না শুধু কাগজগুলোকে?”

প্রথম মানুষটি কিছু বলল না।

ভাঙা জানালার বাইরে একজোড়া জুতা এসে থামল।

বাঁ পায়ের সামনের অংশ ছেঁড়া কি না দেখার জন্য চোখ খোলা রাখতে চাইলাম।

পারলাম না।

অন্ধকার নেমে আসার ঠিক আগে অনুভব করলাম, স্নেহার আঙুল আমার বাঁ হাত খুঁজে পেয়েছে।

তার মুঠোয় শক্তি ছিল।

কিন্তু কোনো উষ্ণতা ছিল না।

দূরে কোথাও সূর্য তখনো পুরোপুরি ডোবেনি।

আর আমাদের গাড়ির ভেতর, স্নেহার ছিঁড়ে যাওয়া ব্যাগের পাশে, তিন আঁচড়যুক্ত একটি ধাতব পাত খুব ধীরে কেঁপে উঠছিল।

পাতটি আমরা সঙ্গে আনিনি।

চলবে...

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘দত্ত পরিবার’ একটি ঐতিহাসিক উপাদাননির্ভর মৌলিক কাল্পনিক উপন্যাস। দত্ত পরিবার, দত্ত ভবন, হাসান, স্নেহা, সুবর্ণা, শিহাব, স্মৃতি দত্ত, সীমান্তের কালি, তিন আঁচড়ের ধাতব পাত এবং সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা ও পরিচয়-রহস্য কাহিনির সৃজনশীল অংশ। বাস্তব ইতিহাসের উল্লেখ চরিত্রের অভিজ্ঞতা ও কাহিনির প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে। দুর্ঘটনা ও সংঘর্ষের বর্ণনা সাহিত্যিক উপস্থাপনা, বাস্তব জীবনে অনুসরণযোগ্য নির্দেশনা নয়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান মোঃ মেহেদি হাসান (কলম নাম: মি. বিকেল)—লেখক, ব্লগার, শিক্ষক এবং ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। • শিক্ষা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। • প্রকাশনা: প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে’ (রকমারি.কম-এ উপলব্ধ)। • অন্যান্য: ‘দ্য ব্যাকস্পেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৩ থেকে মাইক্রোসফট ডেভেলপার প্রোগ্রামে যুক্ত। যেকোনো প্রশ্ন বা যৌথ কাজের আগ্রহে যোগাযোগ করুন: [email protected] অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!