দত্ত পরিবার | পর্ব ১৩: আমার মুখের মানুষটি

চেয়ারম্যানবাড়ির অন্ধকারে উদ্ধার করা খাতা, বন্ধ দ্বিতীয় কক্ষ এবং হাসানের মুখের ছায়াময় মানুষটি দত্ত পরিবারের দুই বাংলায় বিভক্ত পরিচয়ের চাপা ইতিহাস সামনে আনতে শুরু করে।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৩
দত্ত পরিবার | পর্ব ১৩: আমার মুখের মানুষটি
চেয়ারম্যানবাড়ির স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার করিডরে ব্যান্ডেজ বাঁধা ডান হাত নিয়ে হাসান দূরের ছায়াময় প্রতিরূপের দিকে তাকিয়ে আছে; পাশে স্নেহা হারিকেন ও পুরোনো নথি হাতে বন্ধ দ্বিতীয় কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে, আর ভেজা মেঝেতে দুই ধরনের জুতার ছাপ দেখা যাচ্ছে

অভিযাত্রী ধারাবাহিক

দত্ত পরিবার

পর্ব ১৩: আমার মুখের মানুষটি

মানুষ নিজের মুখ প্রতিদিন দেখে, কিন্তু খুব কম সময়ই চিনতে চেষ্টা করে। কারণ নিজের মুখকে সন্দেহ করতে শুরু করলে আয়না আর সাধারণ কাচ থাকে না। সেটি সাক্ষী হয়ে যায়।

লোকটা জানত, খাতাটি পাওয়া গেছে।

কথাটি এসেছিল চেয়ারম্যানবাড়ির করিডরের শেষ প্রান্ত থেকে। সেখানে আলো ছিল না। কেবল ভাঙা একটি জানালা দিয়ে বৃষ্টিহীন রাতের ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে চুন, পুরোনো কাঠ এবং বহুদিন বন্ধ থাকা কাপড়ের গন্ধ।

প্রথমে কণ্ঠ শুনেছিলাম।

তারপর ছায়াটি নড়েছিল।

মুখটি পুরো দেখা যায়নি। জানালার কাচে অল্প সময়ের জন্য একটি প্রতিবিম্ব পড়েছিল। গালের রেখা, কপালের বাঁক এবং ঠোঁটের পাশের ছোট দাগ। দাগটি আমার মুখেও আছে।

তবে কাচে ডান আর বাঁ বদলে যায়।

সে ঘাড় সামান্য কাত করে বলল, “একশ একটি পেয়েছেন। ছয়টি পাননি।”

কণ্ঠটি আমার নিজের মতো নয়। কিন্তু কথা বলার আগে ছোট বিরতিটি পরিচিত। আমি কোনো প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে না চাইলে ঠিক এভাবে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করি।

“আপনি কে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ছায়াটি উত্তর দিল না।

পেছন থেকে স্নেহা বলল, “হাসান, সামনে যাবেন না।”

“লোকটা আমার সম্পর্কে জানে।”

“তাই সামনে যাবেন না।”

উপদেশটি যুক্তিসংগত ছিল। ফলে আমি অগ্রাহ্য করলাম।

প্রথম পা ফেলতেই ডান বাহুর ক্ষত টেনে উঠল। ব্যান্ডেজের নিচে ধুকপুক শব্দ। রক্ত বের হচ্ছে কি না বুঝতে পারলাম না, কিন্তু ক্ষতের চারপাশের ত্বক গরম হয়ে উঠেছে।

ছায়াটি দ্রুত ডান পাশের অন্ধকারে সরে গেল।

আমি তার পেছনে এগিয়ে যেতেই মেঝের একটি আলগা তক্তা চাপা শব্দ করল। সঙ্গে সঙ্গে সামনে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার ঝনঝন শব্দ।

তারপর নীরবতা।

“থামুন,” স্নেহা এবার নিচু কণ্ঠে বলল। “মেঝের দিকে তাকান।”

হারিকেনের আলো নিচে ধরতেই তিন ধরনের চিহ্ন দেখা গেল।

প্রথমটি আমাদের জুতার। দ্বিতীয়টি তুলনামূলক নতুন, পরিচ্ছন্ন তলার ছাপ। তৃতীয়টির সামনের অংশ ক্ষয়ে যাওয়া এবং গোড়ালির পাশে অসম চাপ।

ছেঁড়া জুতার মানুষটির ছাপ।

“দুজন ছিল,” স্নেহা বলল।

“অথবা একজন জুতা বদলেছে।”

“মুখ বদলাতে পারলে জুতা বদলানো কঠিন নয়, এটাই বলবেন?”

“আপনি আমাকে খুব ভালোভাবে চিনে ফেলেছেন।”

“সেটিই এখন আমার দুশ্চিন্তা।”

সামনে গিয়ে দেখি করিডরটি একটি অন্ধ দেয়ালে শেষ হয়েছে। ডান দিকে ভাঙা জানালা। বাইরে কাঁটা আর বুনো লতায় ভরা নিচু জমি। মানুষ বের হওয়ার মতো জায়গা নেই।

পরিচ্ছন্ন জুতার ছাপ দেয়ালের সামনে এসে শেষ।

ছেঁড়া জুতার ছাপ সেখানে শুরু হয়েছে।

স্নেহা নিচু হয়ে দেয়ালের গায়ে হাত রাখল। আঙুলে ধুলো লেগে গেল। তারপর একটি অংশে চাপ দিয়ে বলল, “এখানে ধুলো কম।”

আমি কানে লাগালাম। ওপাশে কিছু নেই। শুধু নিজের শ্বাস।

“গোপন দরজা?” আমি বললাম।

“হতে পারে। আবার কেউ ইচ্ছা করে ধুলো মুছেও রাখতে পারে, যেন আমরা গোপন দরজা ভাবি।”

“আপনি এখন আমার চেয়েও বেশি সন্দেহ করেন।”

“আপনাকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করতে করতে অভ্যাস হয়েছে।”

কথাটি সাধারণ স্বরে বললেও তার ভেতরের অভিমান সাধারণ ছিল না।

নিজের মুখধারী কাউকে হারানোর মধ্যে ভয় আছে। কিন্তু আপনার পাশে দাঁড়ানো মানুষটি যখন বুঝতে শুরু করে, আপনার বলা প্রতিটি সত্যের নিচে আরেকটি সত্য চাপা আছে, তখন ভয়টি ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।

মূল করিডরে ফিরে দ্বিতীয় কক্ষের সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে আঁচড়ের শব্দ এল।

একবার।

বিরতি।

তারপর পরপর তিনবার।

দরজার কাঠে নখ নয়। ধাতব কোনো বস্তু টানলে যেমন শব্দ হয়।

স্নেহা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “ভেতরে কেউ থাকলে কথা বলুন।”

উত্তর নেই।

আমি কড়া নাড়লাম।

“অমিত?”

ভেতর থেকে কোনো কণ্ঠ এল না। বরং খুব ধীরে তিনটি স্বর ভেসে এল। কেউ গুনগুন করছে। চতুর্থ স্বরে যাওয়ার আগেই থেমে আবার প্রথম থেকে শুরু করছে।

আমার বুকের ভেতর পুরোনো একটি মিলনায়তন খুলে গেল।

অমিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে। সাদা আলো তার চোখের ওপর। দর্শকদের গুঞ্জন থেমে যাচ্ছে। মঞ্চের এক পাশে সুবর্ণা দাঁড়িয়ে, হাতে কাগজ, মুখে সেই পরিচিত বিরক্তি। যেন গান শেষ হওয়ার আগেই সে জানে, এরপর আমার সঙ্গে তার ঝগড়া হবে।

“সুরটা চেনেন?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

“বিশ্ববিদ্যালয়ে অমিত গেয়েছিল।”

“আর কে জানত?”

“সেখানে কয়েকশ মানুষ ছিল।”

“আমি উপস্থিত মানুষের সংখ্যা জানতে চাইনি। জানতে চেয়েছি, এই সুর আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটা কে জানত?”

আমি উত্তর দিতে দেরি করলাম।

“সুবর্ণা,” বললাম। “সম্ভবত অমিতও।”

“সম্ভবত?”

“সেদিন গানের পরে অনেক কিছু ঘটেছিল।”

“কী ঘটেছিল?”

“এখন মনে নেই।”

“নাকি এখন বলতে চান না?”

উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার নিচের ফাঁকে কাগজের সাদা প্রান্ত দেখা গেল।

কাগজটি বাইরে এল না। যেন ভেতরের কেউ অর্ধেক ঠেলে দিয়ে দ্বিধায় হাত সরিয়ে নিয়েছে।

স্নেহা রুমাল দিয়ে কাগজটি টেনে নিল।

ভাঁজ খোলার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো কাগজ, লোহা এবং ভেজা মাটির মিশ্র গন্ধ বের হলো। বাঁ কোণে গাঢ় বাদামি দাগ। শুকনো রক্তের মতো, তবে রক্তের স্বাভাবিক কালচে জমাট ভাব নেই।

কাগজে দুটি শিরোনাম:

পূর্ববঙ্গ

...নাথ দত্ত • জীবিত • স্থায়ী ঠিকানা অনির্ধারিত

পশ্চিমবঙ্গ

...নাথ দত্ত • মৃত • উত্তরাধিকার হস্তান্তরিত

স্নেহা বলল, “একই মানুষ?”

“নামটি সম্পূর্ণ নেই। নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই।”

“দুই জায়গাতেই একই অংশ কেন মুছে গেছে?”

আমি বাদামি দাগের কাছে কাগজটি আলোর দিকে ধরলাম। ভাঁজের দুই পাশে দাগ ছড়ানো। কাগজ ভাঁজ করার সময় তরলটি ভেজা ছিল।

তালিকার নিচে ছোট অক্ষরে লেখা:

“মানুষটি সীমান্ত পার হয়নি। কাগজে তার নাম পার হয়েছিল।”

দরজার ওপাশে হঠাৎ নিঃশ্বাসের শব্দ হলো।

আমি দরজার খুব কাছে গিয়ে বললাম, “আপনি কে?”

কয়েক মুহূর্ত পর একজন পুরুষ ফিসফিস করে বলল, “যার নাম দুইবার লেখা হয়েছিল, কিন্তু কোনোবারই ঠিক লেখা হয়নি।”

“দরজা খুলুন।”

“দরজা খুললে মুখ দেখবেন। উত্তর পাবেন না।”

“আমার মুখ পরে থাকা লোকটা কে?”

ভেতরের মানুষটি বলল, “মুখটাকে নিজের ভাবছেন কেন?”

আমার আঙুল দরজার কাঠে শক্ত হয়ে গেল।

“কারণ আমি এই মুখ নিয়ে জন্মেছি।”

“আপনি জন্মের সময় নিজের মুখ দেখেছিলেন?”

স্নেহা আমার কাঁধে হাত রাখল।

“ও আপনাকে উত্তেজিত করতে চাইছে।”

ভেতরের কণ্ঠ বলল, “আমি ওকে থামাতে চাইছি। আগে যাকে থামাতে পারিনি।”

“কাকে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

কোনো উত্তর এল না।

বরং ভেতরে চেয়ার অথবা ভারী বাক্স সরানোর শব্দ হলো। তারপর একবার ধাতব আঘাত। সুর, নিঃশ্বাস এবং উপস্থিতির সব চিহ্ন থেমে গেল।

আমি দরজায় জোর দিতে চাইলাম।

স্নেহা সামনে এসে দাঁড়াল।

“না।”

“ভেতরে কেউ আছে।”

“সেটা আমরা জানি না। শব্দ আছে। মানুষ আছে কি না জানি না।”

“কাগজটা নিজে থেকে বের হয়নি।”

“দরজাটা খুললেই যে সত্য বের হবে, সেটাও জানি না।”

“সব বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে কোনো গল্প এগোয় না।”

“আর সব দরজা ভাঙলে গল্পের মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে না।”

তার গলায় ভয় ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্তটিকে ভয় নিয়ন্ত্রণ করছে না। স্নেহা আমার আহত হাত, বন্ধ দরজা এবং বেরিয়ে আসা নথি, তিনটিকেই একসঙ্গে বিবেচনা করেছে।

শেষ পর্যন্ত দরজা বন্ধই থাকল।

এবার স্নেহা ‘চেয়ারম্যানবাড়ির রাত’ খাতাটি খুলল। প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা দ্রুত দেখে মাঝামাঝি একটি জায়গায় থামল।

“এখানে আপনি চেয়ারম্যানকে ছুরি দেখানোর ঘটনা লিখেছেন।”

“ঘটনাটি সত্যি।”

“আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। তারপরের অনুচ্ছেদে চেয়ারম্যানের ঘরের ভেতরের কথোপকথন আছে। তখন আপনি উঠোনে ছিলেন।”

আমি খাতা নিয়ে পড়লাম।

চেয়ারম্যান ঘরের ভেতরে একজনকে বলছে:

“ছেলেটি নিজের পরিকল্পনাকে বিশ্বাস করে। এই বয়সে বিশ্বাস আর উন্মাদনার পার্থক্য থাকে না। ওকে এখন থামিও না। কে কে ওর পাশে দাঁড়ায়, আগে দেখো।”

কথোপকথনটি আমার জানার কথা নয়।

স্নেহা বলল, “এটা আপনি লিখেছেন?”

“হাতের লেখা আমার।”

“আমি হাতের লেখা জিজ্ঞেস করিনি।”

“মনে নেই।”

“আপনি সেদিন কী পরিকল্পনা করেছিলেন?”

খাতার শব্দগুলো চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে গেল।

চেয়ারম্যানের জমি, শ্রমিকদের মজুরি, গ্রামের ধর্মীয় উত্তেজনা, সুবর্ণার রাগ, অমিতের অস্বাভাবিক নীরবতা। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ছবি মনে পড়ল। কোনোটি পুরো নয়।

“সেটা তখন রাজনৈতিক কিছু ছিল,” বললাম।

“কী ধরনের?”

“আমি ভাবতাম, মানুষকে ধর্ম দিয়ে আলাদা করে যারা শাসন করে, তাদের বিরুদ্ধে ভাষা আর জীবিকার প্রশ্নে মানুষকে এক করা যায়।”

“সুবর্ণা একমত ছিল?”

“লক্ষ্য নিয়ে ছিল। পদ্ধতি নিয়ে নয়।”

“আপনার পদ্ধতি কী ছিল?”

“ক্ষমতা অর্জন।”

“তারপর?”

“ক্ষমতা পাওয়ার পর কী করা সম্ভব, তা ভাবা।”

স্নেহা দীর্ঘ সময় আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

“সুবর্ণা কী বলেছিল?”

এবার মনে পড়ল।

সে বলেছিল, “তুমি ইতিহাস বদলাতে ক্ষমতা চাও না, হাসান। তুমি প্রথমে ক্ষমতা চাও। ইতিহাসকে কারণ হিসেবে ব্যবহার করছ।”

তখন কথাটি অপমান মনে হয়েছিল।

এখনো হয়।

পার্থক্য শুধু, এখন আমি নিশ্চিত নই সে ভুল ছিল কি না।

খাতাটি সম্পূর্ণ জাল নয়। আবার সম্পূর্ণ আমারও নয়। নিজের হাতের লেখায় এমন একটি ঘটনার বিবরণ পেলাম, যা আমার চোখে দেখা সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ কেউ আমার কণ্ঠে লিখেছে, অথবা আমি এমন কারও স্মৃতি লিখেছি, যাকে এখন আর মনে নেই।

এডগার অ্যালান পো-র বইটি খুলতেই কয়েকটি পুরোনো কাগজের কণা ঝরে পড়ল। সুবর্ণার প্রান্তলিখনগুলো এবার স্নেহা একে একে পরীক্ষা করল।

পাঁচ। এগারো। সাতচল্লিশ।

চিহ্নগুলো গোল করে রাখা।

“সাল?” আমি বললাম।

“হতে পারে। আবার পাণ্ডুলিপির নম্বরও হতে পারে।”

“৫২ আর ৭১ থাকলে সাল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ত।”

“তাই এখনো নেই। কেউ হয়তো চায়, আমরা নিজেরাই বাকি সংখ্যাগুলো বসিয়ে সিদ্ধান্ত নিই।”

বইয়ের মলাটের ভেতরে আঙুল চালিয়ে স্নেহা ছোট একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করল।

সুবর্ণার হাতের লেখা:

“সাতচল্লিশ দিয়ে শুরু কোরো না। একটি দেশ ভাগ হওয়ার আগে মানুষকে শেখানো হয়, পাশের মানুষটি আর তার মতো নয়। সেই শেখানোর ইতিহাস খুঁজে না পেলে সীমান্তের ইতিহাস বুঝবে না।”

স্নেহা বলল, “সে আপনাকে সতর্ক করেছিল।”

“অথবা নির্দেশ দিয়েছিল।”

“আপনি তার প্রতিটি সতর্কতাকে নিয়ন্ত্রণ ভাবতেন?”

“সে আমার প্রতিটি পরিকল্পনাকে ক্ষমতার লোভ ভাবত।”

“দুজনের কেউ ভুলও হতে পারেন।”

“দুজনই ভুল হতে পারি।”

“তাহলে এখনো তার ওপর এত রাগ কেন?”

“কারণ সে ভুল হলেও এমনভাবে বলত, যেন আমার চেয়ে আমাকে বেশি চেনে।”

স্নেহা কাগজটি ভাঁজ করে নিজের ব্যাগে রাখল।

“ওটা আমাকে দিন।”

“না।”

“এটা আমার বই থেকে পাওয়া।”

“বইটা আপনার। লেখাটা সুবর্ণার। প্রমাণটি আপাতত আমার কাছে থাকবে।”

“আপনি আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন?”

“আমি আপনার চারপাশের ঘটনার তদন্ত করছি। আপনি যদি ঘটনার অংশ হন, আপনাকেও করব।”

স্নেহা কথাটি বলার সময় চোখ সরায়নি।

সেই মুহূর্তে বুঝলাম, এই রহস্যে সে আর আমার আহত হাতের চিকিৎসক বা বিপদের সঙ্গী মাত্র নয়। প্রয়োজন হলে সে আমার স্মৃতি, বক্তব্য ও উদ্দেশ্য, সবকিছুকেই প্রশ্ন করবে।

চেয়ারম্যানবাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে উঠোনে ছেঁড়া জুতার মানুষটিকে দেখলাম।

তিনি শুকনো কুয়োর পাশে বসে দুই হাতের মধ্যে একটি মাটির দলা চেপে রেখেছেন। আমার পায়ের শব্দে তাকালেন না।

“দ্বিতীয় কক্ষে কে ছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“আপনি কার কণ্ঠ শুনেছেন?”

“একজন পুরুষের।”

“তাহলে একজন পুরুষ ছিল, এই উত্তরটি আপনার নিজের। আমার নয়।”

স্নেহা বাদামি দাগযুক্ত কাগজটি তার সামনে ধরল।

“এটা কী?”

লোকটি দাগটির দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল।

“রক্ত নয়।”

“তাহলে?”

“যে কালি দিয়ে মানুষকে এক দেশে জীবিত আর অন্য দেশে মৃত লেখা হতো।”

“আপনি ‘...নাথ দত্ত’কে চিনতেন?”

তিনি মাটির দলাটি ভেঙে ফেললেন।

“কাগজে কোনজনকে?”

“কতজন ছিল?”

“একজন মানুষ। দুইটি নথি। তিনটি পরিবার। চারটি দাবি।”

“আর সত্য?”

“সত্যের তখন কোনো দেশ ছিল না। তাই কেউ তাকে আশ্রয় দেয়নি।”

আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

“আমার মতো দেখতে মানুষটিকে চেনেন?”

এবার তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন। দীর্ঘ সময়। এমনভাবে, যেন আমার মুখ নয়, তার নিচে চাপা অন্য একটি মুখ দেখছেন।

“এই বাড়িতে আপনার মুখ আগেও এসেছে।”

“কখন?”

“আপনার আগে।”

“মানে?”

তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

“মুখ দেখে মানুষ চিনলে দেশভাগের পর অর্ধেক মানুষকেই ভুল নামে ডাকতে হতো।”

তিনি ধীরে হাঁটতে শুরু করলেন।

“আপনার নাম কী?” স্নেহা পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল।

মানুষটি থামল না।

“যে নাম বলব, খুঁজতে গেলে দেখবেন মানুষটি বহু বছর আগে মারা গেছে।”

কুয়াশা তখনো নামেনি। অথচ উঠোনের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর আগেই তাকে আর দেখা গেল না।

বাড়িতে ফেরার সময় কেউ কথা বলিনি।

ভোরের বাতাসে কাঁচা ধানের গন্ধ। দূরে প্রথম আজান শুরু হলো। প্রায় একই সময়ে অন্য দিকের মন্দিরে ঘণ্টা বাজল। দুটি শব্দ একে অপরকে থামাল না। একই ভোরের মধ্যে পাশাপাশি চলল।

মানুষও হয়তো এভাবে থাকতে পারত।

তারপর কেউ তাদের শব্দের আলাদা মালিকানা বুঝিয়ে দেয়।

ফেরার পর স্নেহা আমার ব্যান্ডেজ বদলাল। তুলায় লাল দাগ উঠতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।

“আর একটু রক্ত গেলে আজই হাসপাতালে নেব।”

“চেয়ারম্যানবাড়িতে দ্বিতীয় কক্ষে ঢুকতে দিলেন না, এখন হাসপাতালে বন্দি করবেন?”

“আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা আর আপনার স্বাধীনতা রক্ষা করা মাঝে মাঝে বিপরীত কাজ হয়ে যায়।”

“আপনি সব সময় এত নির্মম?”

“না। আগে মানুষকে বিশ্বাস করতাম।”

কথাটি বলে সে গিঁট শক্ত করল। প্রয়োজনের চেয়ে সামান্য বেশি।

তারপর একটি নোটবুক খুলে দুইটি শিরোনাম লিখল:

যা কিছুটা জানা গেছে

১. ‘চেয়ারম্যানবাড়ির রাত’ খাতাটি সম্পূর্ণ জাল নয়।

২. খাতার সব বিবরণ হাসানের প্রত্যক্ষ জ্ঞানের মধ্যে পড়ে না।

৩. ছয়টি পাণ্ডুলিপি সম্ভবত পরিকল্পিতভাবে সরানো হয়েছে।

৪. পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের নথিতে একই অসম্পূর্ণ নামের বিপরীত পরিচয় রয়েছে।

৫. সুবর্ণার সংখ্যাচিহ্নগুলো ইতিহাস বা পাণ্ডুলিপির অনুসন্ধানক্রম নির্দেশ করতে পারে।

যা এখনো জানা যায়নি

১. হাসানের মুখের মানুষটির পরিচয়।

২. দ্বিতীয় কক্ষে সত্যিই কে বা কী ছিল।

৩. বাদামি দাগের প্রকৃতি।

৪. ‘...নাথ দত্ত’ একজন মানুষ নাকি ব্যবহৃত পরিচয়।

৫. সুবর্ণা এখন কোথায় এবং সে কী প্রস্তুতি নিয়েছে।

৬. হাসান নিজের রাজনৈতিক অতীতের কতটুকু ভুলেছে এবং কতটুকু গোপন করছে।

শেষ বাক্যটি পড়ে আমি কিছু বললাম না।

ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।

পর্দায় কোনো নম্বর নেই।

কল ধরতেই মিসেস দত্তের কণ্ঠ শুনলাম।

“দ্বিতীয় কক্ষ থেকে একটি পাতা পেয়েছ?”

আমি স্নেহার দিকে তাকালাম।

“আপনি জানলেন কীভাবে?”

“পাতাটার বাঁ কোণে বাদামি দাগ আছে?”

“আছে। এটা কি রক্ত?”

ওপাশের শ্বাস কয়েক মুহূর্ত ভারী হয়ে উঠল।

“ওটা রক্ত নয়, হাসান। আমাদের পরিবার ওটাকে সীমান্তের কালি বলত।”

“কেন?”

“কারণ ওই কালি দিয়ে একই মানুষকে একদিকে জীবিত, অন্যদিকে মৃত লেখা হয়েছিল।”

“...নাথ দত্ত কে?”

ওপাশে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।

মিসেস দত্ত নিচু কণ্ঠে বললেন, “নামটা ফোনে বলব না। খাতাটা নিরাপদে রাখো। আর যে মানুষটিকে নিজের মুখে দেখেছ, তাকে অনুসরণ কোরো না।”

“সে কে?”

“সে তোমার মুখ পরেনি।”

“তাহলে?”

মিসেস দত্ত উত্তর দেওয়ার আগে পেছনে একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

শব্দগুলো স্পষ্ট নয়। শুধু শেষ অংশটি শুনলাম:

“সময় শেষ।”

মিসেস দত্ত দ্রুত বললেন,

“লোকটা এমন একজনের মুখ ব্যবহার করছে, যার নাম দুই বাংলার কোনো নথিতেই সম্পূর্ণ নেই।”

সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো।

কয়েকবার কল ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করলাম। নম্বর পাওয়া গেল না।

স্নেহা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ভোরের আলো আরও পরিষ্কার। কাচে আমাদের দুজনের প্রতিবিম্ব।

আমি নিজের মুখের দিকে তাকালাম।

ঠোঁটের পাশের ছোট দাগটি ঠিক জায়গায় আছে।

আমি ডান হাত তুলতে চাইলাম। ক্ষতের ব্যথায় হাতটি অর্ধেক উঠে থেমে গেল।

কাচে আমার প্রতিবিম্বটিও থামল।

তারপর আমি হাত নামানোর আগেই প্রতিবিম্বটি নিজের হাত নামিয়ে ফেলল।

চলবে...

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘দত্ত পরিবার’ একটি ঐতিহাসিক উপাদাননির্ভর কাল্পনিক উপন্যা

স। এর দত্ত পরিবার, পাণ্ডুলিপি, পারিবারিক নথি, পরিচয় ব্যবহার, ‘সীমান্তের কালি’ এবং চরিত্রসংযোগ কাহিনির অংশ। কোনো চরিত্রের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক বক্তব্যকে লেখকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান মোঃ মেহেদি হাসান (কলম নাম: মি. বিকেল)—লেখক, ব্লগার, শিক্ষক এবং ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। • শিক্ষা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। • প্রকাশনা: প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে’ (রকমারি.কম-এ উপলব্ধ)। • অন্যান্য: ‘দ্য ব্যাকস্পেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৩ থেকে মাইক্রোসফট ডেভেলপার প্রোগ্রামে যুক্ত। যেকোনো প্রশ্ন বা যৌথ কাজের আগ্রহে যোগাযোগ করুন: [email protected] অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!