দত্ত পরিবার | পর্ব ১৬: মৃত মানুষ গুলি চালায় না
দুর্ঘটনার পর ভাঙা গাড়িতে আটকে থাকা হাসান মোর্স কোডে স্নেহাকে সতর্ক করে। শত্রুদের ঘেরাটোপে জেগে ওঠে তার গোপন এজেন্ট-সত্তা, আর হাসপাতালে চোখ খুলে সামনে পায় স্নেহা ও স্মৃতি দত্তকে।
দুর্ঘটনার পর মানুষ প্রথমে নিজের আক্ষরিক অস্তিত্ব খুঁজবে নাকি হারানো স্মৃতি, তা নিয়ে কোনো বই লেখা নেই। কিন্তু ভাঙা গাড়ির অন্ধকার কফিনে বসে আমি খুঁজছিলাম শুধু শব্দ। কারণ চারপাশের বিষাক্ত নীরবতার মানে একটাই, বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তারা দুর্ঘটনাস্থলে সাহায্য পাঠাতে আসেনি। তারা নিশ্চিত হতে এসেছে, বহু বছর আগে ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া একজন গোপন এজেন্টের লাশ শেষ পর্যন্ত কাদায় মিশে গেল কি না।
ধাতব পাতটি আমরা সঙ্গে আনিনি।
কথাটি মনে হওয়ার পর আমার নিভে আসতে থাকা মস্তিস্কের স্নায়ুগুলো প্রথমবার এক অদ্ভুত বার্তা পাঠাল। চেতনার প্রথম ধাক্কায় যেটা নাকে এসে তীব্রভাবে বিঁধল, তা কোনো স্বাভাবিক গ্রামের হাওয়া নয়। তা হলো পোড়া রেডিয়েটরের তরল, ইঞ্জিনের গরম ক্ষারীয় তেল, পোড়া রাবার এবং তামাটে তাজা রক্তের এক গা গুলিয়ে ওঠা বিদঘুটে মিশেল।
তার আগে পর্যন্ত দৃশ্য বা আলো বলতে কিছুই ছিল না। ছিল কেবল শব্দের কতগুলো ধারালো টুকরো।
গাড়ির কঙ্কালের ভেতর থেকে পকপক করে তেল গড়িয়ে পড়ার একঘেয়ে শব্দ। কোনো এক অজানা ফাঁক দিয়ে ভাঙা কাচের খাঁজের ওপর দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ার তরল ধ্বনি। চালকের আসনে বসে থাকা শওকত চাচার বিকট, হাঁপানিগ্রস্ত ও রুদ্ধশ্বাস জীবনের শেষ টানের শব্দ। আর আমার বাঁ হাতের মুঠোর ভেতর হিম হয়ে আসা স্নেহার অবশ আঙুল।
আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে পেশির প্রাথমিক অনমনীয়তা বা জমানো রক্ত সঞ্চালনের স্থবিরতা।
আমি প্রথমবার চোখ খোলার চেষ্টা করলাম। ডান চোখের ওপর লাল জমাট বাঁধা রক্তের একটি ভারী আস্তরণ পর্দা তৈরি করে রেখেছে। পলক ফেলতেই পাপড়ির কাচের মতো কুচিগুলো চোখে বিঁধল। দ্বিতীয়বার চোখের পাতা জোর করে ওপরের দিকে তুলে ধরতেই বিকেলের এক টুকরো মলিন ধূসর আলো দৃষ্টিসীমায় ফুটে উঠল। ভাঙা দরজার ছাই হয়ে যাওয়া কাঠামোর ভেতর দিয়ে সেই আলো এসে পড়ছে।
আমাদের ব্যবহৃত পুরোনো সেডানটি এখন পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে ডান দিকে কাত হয়ে নিচু ধানক্ষেতের আঠালো কাদায় দেবে আছে। পেছনের ডান পাশের অংশটি মূল আঘাতের চোটে দুমড়েমুচড়ে চ্যাপ্টা হয়ে একেবারে পেছনের সিটের সাথে মিশে গেছে। আর আমাদের বাঁ পাশের দরজাটি এখন মাথার অন্তত তিন ফুট ওপরে, মহাশূন্যের কোনো অবরুদ্ধ ঢাকনার মতো ঝুলে আছে।
নব্বইয়ের দশকের ভারী চ্যাসিসের এই যানবাহনটি যখন রাজপথ থেকে তীব্র বেগে ছিটকে খাদে গিয়ে তিনবার উল্টো পাক খেয়েছিল, তখন এর ছাদ ও মেঝের হাড়গোড় চূর্ণ হয়ে গেছে। গাড়ি বলতে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এটা এখন স্রেফ একখানা ধাতব কফিন।
চালকের আসনে শওকত চাচা অদ্ভুত এক ভঙ্গিমায় পেঁচিয়ে আটকে আছেন। তাঁর স্টিয়ারিং হুইলটি তাঁর বুকের পাঁজর ভেদ করে ড্যাশবোর্ডের স্টিলে চেপে বসেছে। সেখান থেকে ঘন, কালচে রক্ত এসি ভেন্টের খাঁজে চুইয়ে পড়ছে। সামনের বাঁ আসনটি সম্পূর্ণ উপড়ে গিয়ে পেছনের দিকে হেলে পড়েছে। পেছনের আসনে আমি আর স্নেহা পরস্পর চেপে বসে আছি। আমাদের দুজনকে পেঁচিয়ে থাকা সিটবেল্টের চামড়ার ফিতাগুলো বুকের হাড় ছিঁড়ে ফেলার মতো টানটান হয়ে আটকে আছে।
আমার ডান বাহুটি কোথায় আছে, প্রথমে তা বুঝতে পারিনি। শরীর থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোথাও কাদায় পড়ে গেল কি না, সেই অনুভূতিটুকুর ওপর অবশতার ভার চেপে বসেছিল।
ঠিক তার পর মুহূর্তেই বিস্ফোরণের মতো যন্ত্রণাটা আঘাত করল।
যন্ত্রণাটা বাইর থেকে ভেতর দিকে আসেনি। তা ফুটে বের হলো হাড়, মাংসপেশি এবং বহু পুরোনো স্নায়ুর একেবারে গভীরতম স্তূপ থেকে। যেন তিন দিন আগের গুলির ক্ষতের মধ্যে যত্ন করে লুকিয়ে রাখা তপ্ত কাচ কেউ নতুন করে ধরে মুচড়ে দিল।
আমার বুক ফেটে একটি রুদ্ধশ্বাস চিৎকার বের হয়ে আসার উপক্রম হলো। আমি দাঁতে দাঁত চেপে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলাম। নোনা রক্তের তিতা স্বাদ জিবের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।
আমার মুঠোর ভেতরে থাকা স্নেহার অবশ আঙুলগুলো মুহূর্তে মোচড় দিয়ে শক্ত হয়ে বসল।
"হাসান...?"
তার কথা বলার আওয়াজটি মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে ছিল। কিন্তু সেই আকুল ডাকার গভীরে কোনো স্বস্তি ছিল না। সেখানে ছিল এক চুরমার হয়ে যাওয়া গভীর আতঙ্ক, বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা আর অশুভ নীরবতার চাপ।
"আছি," অত্যন্ত শুকনো ও ভাঙা স্বরে উত্তর দিলাম।
নিজের কণ্ঠস্বর শুনে আমার নিজেরই খটকা লাগল। এই কণ্ঠ কি সত্যিই আমার, নাকি বহু বছর আগে মারা যাওয়া কোনো ছায়ামানব আমার স্বরযন্ত্র ব্যবহার করে কথা বলে উঠল?
স্নেহা খুব ধীরে, ফুসফুসের সমস্ত জোর একত্র করে একটা গরম শ্বাস ছাড়ল। তার শ্বাসের উত্তাপ আমার ঘাড়ের উন্মুক্ত ক্ষতে এসে লাগল।
"আমার দিকে তাকাও। হাসান, দয়া করে তাকাও!"
"চেষ্টা করছি... পুরো পৃথিবীটা ঘোরের ভেতর ঘুরছে। অক্ষরেখা থমকে দাঁড়ায়নি।"
"বাজে কথা বন্ধ করো। তোমার ডান হাত... ওটার তর্জনী নাড়াতে পারছ?"
ডান হাতের তর্জনী সামান্য বাঁকানোর চেষ্টা করতেই কনুইয়ের ওপরের পুরোনো সেলাইগুলো একে একে চটচট শব্দে ছিঁড়ে খসে গেল। ব্যান্ডেজের নিচে আটকে থাকা জমাট রক্ত গলে আবার তাজা গরম রক্তের নদী বইতে শুরু করল। শার্টের সুতির হাতা ভিজে তা বাহু বেয়ে ককনুইয়ে নামল।
"পারছি," কপালে ঘাম আর রক্তের ফোঁটা জমিয়ে উত্তর দিলাম।
"তুমি মিথ্যা বলছ," স্নেহার গলার ভেতরটা কান্নায় মুচড়ে উঠল।
"পুরোপুরি নয়।"
"এই পরিস্থিতিতে মিথ্যা বলা মানে নিজের কবর খুঁড়ে ফেলা।"
আমার দুই চোখ আস্তে আস্তে ঘরের ভেতরের কালচে ধূসর আলোর সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। স্নেহার কপালের বাঁ পাশে অন্তত দুই ইঞ্চি দীর্ঘ এক ভয়ংকর চেরা ক্ষত তৈরি হয়েছে। সেখানে চামড়া হাঁ হয়ে ভেতরে সাদা হাড়ের রূপালি আভা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে ঘন লাল রক্ত গালের ওপর দিয়ে নেমে তার থুতনিতে এসে জমে এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা করে আমার বুকের ওপর পড়ছে।
তবে এত যন্ত্রণার মাঝেও তার ডান হাতটি নিজের ফার্স্ট এইড ও ডকুমেন্টের কালো ব্যাগটিকে নিজের বুক ও পেছনের চূর্ণ হওয়া সিটের মাঝে পশুর মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। সে জানে, এই ব্যাগের ভেতর থাকা কাগজপত্রের মূল্য তার বা আমার জীবনের চেয়ে অনেক বেশি।
"তোমার কপাল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে..." অত্যন্ত নিচু স্বরে বললাম।
"সামান্য ক্ষত।"
"এই সামান্য শব্দটা দত্ত পরিবারের মেয়েদের এক পুরোনো অভ্যাস।"
"চুপ করো। তোমার হাতের ব্যান্ডেজ কাদায় ভিজে ইনফেকশন ছড়িয়ে যাবে।"
সে তার রক্তে মাখা হাত আমার মোড়ানো ব্যান্ডেজের ওপর রাখল। কাপড়ের উপরিভাগ ততক্ষণে থকথকে তাজা রক্তে লাল হয়ে গেছে। গত তিন দিন ধরে ডাক্তার হিসেবে সে যে ক্ষতের যত্ন নিয়েছিল, এই দুর্ঘটনাকালীন প্রচণ্ড চাপে তা পুরোপুরি ছাল ছাড়িয়ে উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই গাড়ির বাইরের দুমড়ানো পেছনের বাম্পারে একটা ভারী ধাতব বুটের আওয়াজ হলো।
খট!
স্নেহার পুরো শরীর মুহূর্তে কাঠ হয়ে গেল। তার চোখের তারায় যেটুকু জীবন বাকি ছিল, তা স্থির হয়ে আমার মুখের ওপর আটকে রইল।
কারো একখানা ভারী চামড়ার গ্লাভস পরা হাত এসে পেছনের ভেঙে যাওয়া গ্লাসের বাঁকা ফ্রেমে বসল। চামড়া আর ধাতুর ঘর্ষণের কর্কশ শব্দ পুরো গাড়ির কঙ্কালে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।
তারপর ভারী লোহার রড বা রিভলভারের বাট দিয়ে গাড়ির ছাদের শক্ত পাতের ওপর তিনবার সজোরে আঘাত করা হলো।
ঠক!
এক সেকেন্ডের থমথমে বিরতি।
ঠক, ঠক!
"বাইরে লোক দাঁড়িয়ে আছে..." স্নেহা একদম শ্বাস চেপে ধরে ফিসফিস করে উঠল।
"একজন নয়।"
"তুমি নিশ্চিত হলে কীভাবে?"
উত্তর দেওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। বাইরের ভিজে কাদা আর ধানক্ষেতের নরম মাটিতে দুটি ভিন্ন ধরনের পদধ্বনি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
প্রথম ব্যক্তি ভারী সামরিক গ্রেডের বুট পরে মেপে মেপে কাদার ওপর দ্রুত হাঁটছে। এটি পেশাদার ঘাতক বা ফিল্ড ট্র্যাকারের হাঁটার ধরন। দ্বিতীয় ব্যক্তির পদক্ষেপ দোদুল্যমান; তার বাঁ পা মাটি থেকে পুরোপুরি উঠছে না। প্রতি পদক্ষেপে কাদায় একটি ভারী বস্তু টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ঘর্ষণের শব্দ হচ্ছে।
"কমপক্ষে দুজন," অস্ফুট স্বরে বললাম। "একজন ডান দিকে গাড়ির পেছনের চাকার কভারের আড়ালে। অন্যজন বাঁ দিকের বাঁকা দরজার ঠিক নিচে। দ্বিতীয় ব্যক্তির বাঁ পায়ের লিগামেন্ট ভাঙা বা মারাত্মকভাবে ক্ষতের শিকার।"
স্নেহা অবিশ্বাস্য চোখে আমার কাদা আর রক্তে মাখা চেহারার দিকে তাকাল।
"তুমি কি গাড়ির ধাতুর ওপার দিয়ে চোখ না চালিয়ে দেখতে পাচ্ছ?"
"না।"
"তাহলে এত নিখুঁত হিসাব কী করে পাচ্ছ?"
কানের ভেতর বহু বছর আগের কোনো ট্রেনিং বাঙ্কার থেকে ঠান্ডা এক কমান্ডারের প্রতিধ্বনি ভেসে এল: 'শুনতে শেখো, দেখতে যাওয়া তোমাকে বিভ্রান্তির খাদে ফেলবে।'
কিন্তু আমি তাকে সেই স্মৃতির কথা জানালাম না। শরীরের স্পর্শ ও রুদ্ধসংকেত
স্নেহার বাঁ হাতটি এখনো আমার বাঁ হাতের তালুতে শক্ত করে চেপে ধরা ছিল। আমি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে, কোনো শারীরিক চাঞ্চল্য না ছড়িয়ে, আমার আঙুলের অগ্রভাগ দিয়ে তার তালুতে চাপ দিতে লাগলাম।
একটি অতি সংক্ষিপ্ত ও হালকা চাপ। (ডট)
আধা সেকেন্ডের নীরব বিরতি।
আরেকটি সংক্ষিপ্ত চাপ। (ডট)
তারপর প্রায় এক সেকেন্ডের একটি দীর্ঘ, সুনির্দিষ্ট চাপ। (ড্যাশ)
স্নেহার দুই চোখ মুহূর্তে সরু হয়ে এল। তার বুকের ভেতরের ওঠা-নামা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
আমি আবার সংকেত দিলাম। এবার একটু দ্রুত এবং মিলিটারি গ্রেড রিদম বজায় রেখে।
সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। দীর্ঘ।
স্নেহার শুকনো ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। তার চোখ দুটোতে এবার ভয়ের চেয়ে শতগুণ বেশি বিস্ময় আর অবিশ্বাস ফুটে উঠেছে।
সে কেবল ঠোঁট নেড়ে ফিসফিস করে বলল, কোনো আওয়াজ হতে দিল না, "তুমি... তুমি আমাকে আঙুলের চাপে সাংকেতিক সংকেত দিচ্ছ?"
আমি আবার তার তালুতে সংক্ষিপ্ত তিনটি চাপ দিলাম।
সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। (S - Stay)
"তুমি এটা শিখলে কোথায়?" স্নেহার গলার স্বর কাঁপা সুরে নেমে এল। "একজন সাধারণ সাহিত্যিক বা মহাফেজখানার গবেষণাকারীর তো স্পর্শ সংকেত জানার কথা নয়!"
উত্তর না দিয়ে আমি তার তালুতে পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সাংকেতিক স্পর্শ দিয়ে গেলাম:
'একদম নড়বে না।'
'ব্যাগটি বুকের সঙ্গে চেপে রাখো।'
'বাইরে তৃতীয় লোক গাছে থাকতে পারে।'
স্নেহা আর কোনো মৌখিক তর্ক করল না। একজন অভিজ্ঞ সার্জনের মতো সে আমার পেশির কাঠামোগত পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল। সে অতি সাবধানে তার ব্যাগের মোটা চামড়ার বেল্টটি নিজের অবশ ডান কবজিতে পেঁচিয়ে দুটি শক্ত গিট দিয়ে নিল। তারপর সে নিজের বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে আমার তালুতে একটি সুনির্দিষ্ট পাল্টা সংকেত ফুটিয়ে তুলল।
সংক্ষিপ্ত। দীর্ঘ। সংক্ষিপ্ত। (R - Received)
সেও সংকেত চেনে। দত্ত পরিবারের উত্তরাধিকারিণী কিংবা হাসপাতালের একজন তুখোড় সার্জন হিসেবে তার গভীরতা ঠিক কতদূর বিস্তৃত, তা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ রইল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে গাড়ির ভাঙা পেছনের অংশের বাইর থেকে এক কর্কশ, চড়া পুরুষালি গলা ভেসে এল, "ভেতরে যারা জীবিত আছেন, শুনুন! ব্যাগটি বাইরে ছুঁড়ে দিন! আমরা গাড়ির ছাদের চাদর কেটে আপনাদের জীবিত বের করব! আমাদের নির্দেশ শুধু কাগজপত্র উদ্ধারের, আপনাদের প্রাণ নেওয়া আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য নয়!"
আমি পেছনের কুশন সিটের সাথে নিজের কাদা মাখা মাথা শক্ত করে চেপে ধরলাম। বুক ভরে পোড়া তেলের গন্ধযুক্ত বাতাস ফুসফুসে টেনে নিয়ে সাধারণ ভয়ার্ত মানুষের মতো চিৎকার করে বললাম, "আগে পরিচয় দিন! কার নির্দেশে আমাদের গাড়ি খাদের ভেতর রাম করে ফেলে দেওয়া হলো?"
বাইরে প্রায় চার সেকেন্ডের এক ভারী নিস্তব্ধতা জমে রইল।
"পরিচয় জানলে কি মৃত্যুর ধরন পালটে যাবে, এজেন্ট?" বাইর থেকে বরফশীতল উত্তর এল।
"আপনার উত্তর দেওয়ার মাঝে এই চার সেকেন্ডের নীরবতা প্রমাণ করে, আপনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন।"
বাইরের লোকটির শ্বাস নেওয়ার শব্দ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
তারপর আমার অবচেতন মনের কোনো সুদূর অন্ধ কুঠুরি থেকে বহু বছর আগের অফিশিয়াল পাসওয়ার্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে জিবের ওপর চলে এল:
"তৃতীয় জানালা বন্ধ রাখা হয়েছে। উত্তর দিকে কোনো পথ খোলা নেই।"
স্নেহা চমকে উঠে আমার চেহারার দিকে তাকাল। তার চোখের তারায় এক অদ্ভুত হরর সিনেমার মতো ভীতি ফুটে উঠেছে।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোক দুটিও যেন আচমকা বিদ্যুতায়িত হয়ে জমে গেল। চারপাশের বিকেলের মাতাল বাতাসের উত্তাপ এক ধাক্কায় যেন শূন্যের নিচে নেমে গেল।
তারপর গাড়ির বাঁ দিক থেকে সেই পঙ্গু লোকটি অতি নিচু, যান্ত্রিক আর থমথমে গলায় কাউন্টার-পাসওয়ার্ড উচ্চারণ করল:
"দক্ষিণে কোনো দিন কোনো জানালা তৈরি করা হয়নি, স্যার।"
আমার বুকের ভেতর বছরের পর বছর ধরে শক্ত করে শিকল দিয়ে বেধে রাখা স্মৃতির তালাগুলো যেন একে একে বিকট শব্দে খসে পড়তে লাগল।
কিন্তু আমি কৌশলগতভাবে মুহূর্তের মধ্যে মুখের পেশি শিথিল করে দিলাম। চেহারায় আনলাম চরম বিভ্রান্তি আর অজ্ঞতার ছাপ, যেন ভুলবশত মুখ দিয়ে কিছু অসংলগ্ন কথা বের হয়ে গেছে। শ্বাসের গতি হঠাৎ বাড়িয়ে দিয়ে কাঁপতে শুরু করলাম, ঠিক যেমন একজন সাধারণ নাগরিক চরম ভয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হলে কাঁপে।
এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলটি আমার মস্তিস্কের অতি গভীরে গেঁথে আছে। নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সেরা উপায় হলো শত্রুকে বিশ্বাস করানো যে তুমি তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি দুর্বল ও দিশেহারা।
স্নেহা অতি ভয়ার্ত স্বরে বলল, "হাসান... ওটা কীসের সাংকেতিক কথা ছিল? তুমি ওদের কী বললে?"
"আমি জানি না, ঈশ্বরের দোহাই স্নেহা! আমার মাথার ভেতর অদ্ভুত সব ভুলভাল বাক্য ভেসে আসছে!"
আমার কণ্ঠ থেকে নিখুঁত এক অসহায় কান্নার সুর ফুটল। কিন্তু স্নেহার চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি দেখে বুঝলাম, বছরের পর বছর ধরে যে সাধারণ গবেষণাকারীর রূপক বর্ম আমি পরেছিলাম, সেই বর্মে এবার এক অপূরণীয় ফাটল তৈরি হয়ে গেছে। সে আর এই অসহায়ত্বের ভান বিশ্বাস করছে না।
বাইরের লোকটির ভারী বুট কাদায় ডেবে বসল। সে গাড়ির পেছনের ভাঙা কাচের ফ্রেমের কাছে এসে সেই ঘাতক গোপন কোডনেম উচ্চারণ করল, যা গত সাত বছর ধরে কোনো অফিশিয়াল নথিতে আর উপস্থিত ছিল না:
"ঘুড়ি-সাত... এই সাধারণ মানুষের নাটক বন্ধ করো। তোমার সময় শেষ।"
ঘুড়ি-সাত (GHURI-7)।
আমার আসল প্রাতিষ্ঠানিক কোডনেম। আমার স্নায়ু ও রক্তে খোদাই করা এক অভিশপ্ত পরিচয়। আমি কোনো দিন এটি ভুলিনি। গোপন অস্ত্র ও কসাইখানার এগারো সেকেন্ড
অমিতের পাঠানো সামরিক অস্ত্রটি আমাদের সঙ্গে নেই, এই কথাটা স্নেহা আর শওকত চাচাকে বলেছিলাম। সেটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য ছিল।
তবে অর্ধসত্যের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মানুষ একটা সত্য শোনার পর তার আড়ালে থাকা দ্বিতীয় গোপন সম্ভাবনাটি নিয়ে আর মাথা ঘামায় না।
অমিতের অস্ত্র সঙ্গে ছিল না। কিন্তু আমার নিজস্ব রিভলভারটি শুরু থেকেই আমার কাছেই ছিল।
এই ভ্রমণের আগে মা যখন আমার বাবার পুরোনো কাঠের আলমারির তলার ডাবল-বটম দেওয়া জং ধরা টিনের বাক্সের কথা বলেছিলেন, তখন ঘরের সবাই ভেবেছিল সেখানে পুরোনো কোনো জমির দলিল রাখা আছে। কিন্তু সেই বাক্সের পেছনের বিশেষ ড্রয়ারটি আমি নিজে আজ থেকে বারো বছর আগে তৈরি করেছিলাম। বাবার মৃত্যুর পর সেখানে কিছু কাগজ রাখা হলেও, তার পেছনের গোপন চেম্বারে ছিল গ্রীস মাখানো চামড়ার খাপে মোড়ানো একটি পয়েন্ট-থার্টি-এইট ওয়াদেবসন স্পেশাল স্নাব-নোজ রিভলভার এবং আট রাউন্ড কাস্টম কেভলার-পিয়ার্সিং বুলেট।
যাত্রার আগের রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, তখন আমি চুপিচুপি সেই বাক্সের তালা খুলে অস্ত্রটি বের করে নিই। স্নেহা বা পরিবারের কাউকে তা ঘুণাক্ষরেও জানতে দিইনি।
অস্ত্রটি এতক্ষণ আমার পেছনের সিটের ছিঁড়ে যাওয়া ফোমের গভীর গহ্বরে, আমার বাঁ উরুর সাথে একদম সেঁটে রাখা ছিল।
বাইরের প্রথম লোকটি ধমকে উঠল, "ব্যাগটি বাইরে ছুঁড়ে দিন! নতুবা আমরা দরজার খাঁজে গ্রেনড ঝুলিয়ে দেব!"
সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির উল্টো পাশে থাকা অন্য পঙ্গু লোকটি ক্রুদ্ধ হয়ে চিৎকার করে বলল, "বোকামি বন্ধ করো, রানা! ব্যাগের ভেতরের ১৭১৫ সালের সিল করা কাগজ নষ্ট হলে হেডকোয়ার্টারের বস আমাদের চামড়া ছাড়িয়ে নেবে! আগে ওদের পা দুটো ধরে টেনে বাইরে বের করো!"
দুই ঘাতকের দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
তারা একই মাস্টারমাইন্ডের সরাসরি লোক নয়। তাদের পেছনের স্পন্সর ভিন্ন। প্রথমজন এসেছে ১৭১৫ সালের গোপন খামটির সন্ধানে, আর অন্যজন এসেছে ঘুড়ি-সাত অর্থাৎ আমাকে জীবন্ত অথবা মৃত অবস্থায় তুলে নিয়ে যেতে।
আমি স্নেহার তালুতে শেষবার একটি দ্রুত চাপ দিলাম:
'চোখ বন্ধ করো।'
সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে উপচে পড়া শঙ্কা আর অনুচ্চারিত প্রশ্ন।
"তুমি কী করতে যাচ্ছ হাসান? তোমার ডান হাত তো পুরোপুরি বিকল হয়ে আছে!"
"যে কাজটা আমি সবচেয়ে নিখুঁতভাবে করতে পারি।"
"কোন কাজ...?"
কথা বলার সময় শেষ হয়ে এসেছিল। বাইরে থেকে একটি মোটা, কালচে চামড়ার গ্লাভস পরা ভারী হাত ভাঙা কাচের ফ্রেম টপকে ভেতরে ঢুকল। লোকটি স্নেহার চুল খামচে ধরে বাইরে টানার জন্য হাত বাড়াচ্ছিল।
পরমুহূর্তেই সময় যেন তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে এক ভয়ংকর, নৃশংস কসাইখানায় রূপান্তরিত হলো।
আমার আহত ডান হাতের তীব্র যন্ত্রণা মস্তিস্ক থেকে নিঃসৃত ক্ষিপ্র অ্যাড্রেনালিনের তোড়ে এক সেকেন্ডে বাষ্প হয়ে উবে গেল। আমি আমার সুস্থ বাঁ হাত দিয়ে লোকটির কবজি পশুর মতো খামচে ধরলাম। তারপর শরীরের পুরো ওজন পেছনের দিকে ফেলে লোকটির হাতটিকে ভেতরের দিকে টেনে এনে ভাঙা জানালার খাঁজকাটা তীক্ষ্ণ কাচের ওপর সজোরে আছড়ে ফেললাম।
মচাক!
হাড় মচড়ে গিয়ে চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসার এক গা শিউরে ওঠা শব্দ হলো। লোকটির গলার ভেতর থেকে এক ভয়ংকর চিৎকার বের হওয়ার আগেই আমি তার কনুই মোচড় দিয়ে ধরে গালটি সোজা গাড়ির ধারালো বডির দরজার ওপর চেপে ধরলাম। ভাঙা কাচের ফালটি তার গলার ডান রগ কেটে ভেতরে ঢুকে গেল। স্প্রেয়ারের মতো গরম, নোনা রক্তের ফিনকি পেছনের সিটে আর স্নেহার শাড়ির আঁচলে ছড়িয়ে পড়ল।
একই সাথে আমার ডান হাত ফোমের ভেতর থেকে স্নাব-নোজ রিভলভারটি এক টানে বের করে এনেছিল। রক্তে পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া মেকানিজম আমার বহু বছরের অভ্যস্ত আঙুল এক মুহূর্তে আনলক করল।
গাড়ির পাতলা টিনের দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য লোকটির তলপেটের উচ্চতা মেপে নিয়ে আমি রিভলভারের মুখ চেপে ধরলাম।
ঠাস! ঠাস!
বদ্ধ গাড়ির কফিনে বিকট বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো। পয়েন্ট-থার্টি-এইট বুলেটের প্রচণ্ড ধাক্কায় গাড়ির দরজার টিন ফুটো হয়ে ওপাশে থাকা লোকটির তলপেট আর ঊরু ছিন্নভিন্ন করে দিল। সে কাদার ওপর ছিটকে পড়ে তীব্র যন্ত্রণায় কুকুরের মতো কোঁকাতে লাগল।
"কোদাল! ও ব্যাটার কাছে অস্ত্র আছে! ফায়ার করো!" বাইরে থেকে গলার রগ ছিঁড়ে পঙ্গু ঘাতকটি চেঁচিয়ে উঠল।
কিন্তু একজন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিল্ড ক্লিনারের গতি আর দূরদর্শিতার সামনে সাধারণ ভাড়াটে ঘাতকের সমকক্ষ হওয়া অসম্ভব। আমি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে গাড়ির ভাঙা সিটের তলা দিয়ে গড়িয়ে পেছনের চূর্ণ কাচের খোলা অংশ দিয়ে বাইরের ভিজে কাদার ওপর ছিটকে বের হয়ে গেলাম। শরীর কাদায় আছড়ে পড়ার আগেই আমার ডান হাতের রিভলভারের ট্রিগার আবার প্রস্তুত।
পঙ্গু লোকটি তার শটগান তোলার আগেই আমার রিভলভারের বুলেট তার সুস্থ ডান হাঁটু গুঁড়িয়ে দিল।
ঠাস!
হাঁটুর প্যাটেলা হাড় চূর্ণ হয়ে সে কাদার ওপর হাঁটু গেড়ে পড়ে গেল। তার হাতের শটগানটি হাতঘেঁষে ছিটকে গিয়ে পাশের ধানক্ষেতের পানির নিচে ডুবে গেল।
আমি কাদায় হাঁটু গেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। শরীরের সমস্ত রক্তের ভেজা মাখামাখি এড়িয়ে আমি লোকটির একদম মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। রিভলভারের গরম নলটি তার বাঁ চোখের চোখের কোটরে চেপে ধরলাম।
"কাউকে দয়া করা ঘুড়ি-সাতের নিয়মে নেই," অতি নিচু, বরফশীতল স্বরে বললাম।
পফ!
পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের গুলিতে লোকটির মাথার পেছনের খুলি উড়ে গেল। মগজ, রক্ত আর হাড়ের কুচি চারপাশের ধানক্ষেতের কাদায় আর ছাই-ধূসর গাড়ির গায়ে ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
অন্য যে লোকটি দরজার ওপাশে পেটে গুলি খেয়ে কাদায় ছটফট করছিল, সে হাত বাড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করছিল। তার মুখ দিয়ে লাল ফেনা বের হচ্ছিল।
আমি কোনো কথা না বলে আমার কাদা মাখা ভারী মিলিটারি বুটজোড়া তুলে সজোরে তার শ্বাসনালীর ওপর আছড়ে ফেললাম।
ক্র্যাচ!
গলার তরুণাস্থি চূর্ণ হওয়ার এক শুষ্ক শব্দ হলো। লোকটির চোখ দুটি কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো, তারপর পুরো শরীরটা কয়েকবার খিঁচুনি দিয়ে একদম নিস্তেজ হয়ে গেল।
চারপাশে আবার এক ভয়ংকর, নিস্তব্ধ নীরবতা নেমে এল।
শুধু বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ, তাজা কসাইখানার মতো কাঁচা রক্তের গন্ধ আর ইঞ্জিনের ধোঁয়া বিকেলের মিষ্টি বাতাসে মিশে এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করছিল। পুরো মুখোমুখি সংঘর্ষটি শুরু থেকে শেষ হতে সময় লেগেছে মাত্র এগারো সেকেন্ড।
আমি ধুঁকতে ধুঁকতে গাড়ির দিকে ফিরলাম।
ভাঙা জানালার খোলা ফাঁক দিয়ে স্নেহা বাইরে তাকিয়ে রয়েছে। তার ফ্যাকাশে, রক্তহীন মুখে দুটি তাজা রক্তের ফোঁটা লেপ্টে আছে। তার চোখ দুটোতে কোনো অশ্রু ছিল না, ছিল এক পরম বিস্ময় আর অজানা আতঙ্ক। সে তার সারা জীবনে কোনো মানুষকে এত ঠান্ডা মাথায়, এত সুনির্দিষ্ট হিসাব মেনে দুটো জীবন্ত প্রাণীকে কসাইয়ের মতো জবাই করতে দেখেনি।
"তুমি... তুমি ওদের একে একে..." স্নেহার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।
"ওরা আমাদের মারতে এসেছিল," নিরাসক্ত গলায় উত্তর দিলাম।
"তুমি বলেছিলে তোমার কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না! তুমি আমার সাথে মিথ্যা কথা বলেছ! তুমি একটা নির্মম খুনি!"
"আমি অমিতের দেওয়া অস্ত্রের কথা বলেছিলাম। এটি আমার নিজের গোপন ব্যবস্থা ছিল।"
"এটা তুমি পালে কোথায়? কত দিন ধরে এই অস্ত্র তুমি আড়ালে রেখেছিলে? তুমি কি শুরু থেকেই দত্ত পরিবারের সবাইকে ধোঁকা দিয়ে আসছিলে?"
"আমি অস্ত্রটি নিরাপদ জায়গায় রেখে এসেছিলাম। পরিস্থিতি বাধ্য করায় বের করেছি।"
স্নেহার মুখের সমস্ত রঙ যেন এক লহমায় মুছে গেল। সে তার শরীরটি পেছনের ধ্বংসস্তূপের সাথে ঠেলে সরাতে লাগল।
"তোমার স্মৃতি কোনো দিন হারায়নি, তাই না হাসান?" সে থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটে উচ্চারণ করল। "তুমি এই স্মৃতি হারানোর নাটক সাজিয়েছিলে যাতে দত্ত পরিবারের সবাই তোমাকে নিরীহ ভেবে দয়া করে? যাতে আমরা তোমাকে বাড়িতে স্থান দিই?"
"স্নেহা, এটি কোনো নাটক ছিল না, পরিস্থিতিটা অনেক বেশি জটিল—"
"এখনই সত্যিটা বলো! কারণ যে হাসানকে আমি ভালোবাসতাম, যে হাসান সামান্য ভীতি দেখলে রসিকতা করে কথা বাড়াত, সে এইমাত্র দুজন মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে! তুমি কে? জবাব দাও আমাকে!"
আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে ভয়ের চেয়ে বেশি ফুটে উঠছিল প্রতারিত হওয়ার এক অসীম, হৃদয়বিদারক যন্ত্রণা। শেষ জীবিত শত্রু ও ধ্বংসের চাবি
আমি বাঁ হাত দিয়ে দরজার দুমড়ানো স্টিলের চাদরটি সজোরে ধাক্কা দিয়ে পুরোটা খুলে ফেললাম। তারপর টেনে হেঁচড়ে নিজের আধমরা শরীরটা গাড়ির ভেতর থেকে কাদায় নামিয়ে আনলাম। ডান বাহুর চামড়া ছিঁড়ে নতুন করে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
স্নেহা ভেতর থেকে কাতর কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, "বাইরে যেও না! তোমার শরীর থেকে রক্ত ঝরে তুমি মরে যাবে!"
"শওকত চাচাকে বের করতে হবে। গাড়িটার জ্বালানি ট্যাংকে ফাটল ধরেছে, যেকোনো মুহূর্তে আগুন ধরে যাবে।"
বিকেলের সূর্যাস্তটি এখন রক্তিম আভা ছড়িয়ে দূরে ধানক্ষেতের দিগন্তে ডুব দিচ্ছে। আমাদের ছাই-ধূসর সেডানটির সামান্য দূরে, প্রধান সড়কের ঢালে ঘাতকদের ব্যবহৃত সেই বড় গাড়িটি চোখে পড়ল।
ওটা একটি ভারী মিলিটারির মতো দেখতে গাঢ় সবুজ রঙের টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার। এর সামনে পুরু লোহার বাম্পার লাগানো, যা দিয়ে আমাদের গাড়িটিকে পেছন থেকে সরাসরি ট্র্যাক করে খাদে ফেলা হয়েছিল। গাড়িটির নম্বরপ্লেট কালো মোটা কাদায় ঢাকা। সংঘর্ষের তীব্রতায় সেটিরও ইঞ্জিনের ঢাকা দুমড়ে গেছে।
সেই ল্যান্ড ক্রুজারের দরজার নিচে কাদায় এক লোক পড়ে ছটফট করছিল।
সে ঘাতক দলের চালক বা ব্যাকআপ ড্রাইভার। মূল অ্যাক্সিডেন্টের সময় স্টিয়ারিংয়ের চোট লেগে তার বুকের পাজর চূর্ণ হয়ে ফুসফুসে ঢুকে গেছে। লোকটির বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, পরনে অফ-রোড জ্যাকেট। তার চিবুক বেয়ে রক্ত গড়িয়ে কাদায় মিশছে। সে হাত বাড়িয়ে কাদায় পড়ে থাকা একটি ছোট রূপালি ধাতব বস্তুকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল।
আমার বুটের কাদা মাখা শব্দ শুনে সে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে মৃত্যুর হিমশীতল ছায়া।
"ঘুড়ি... সাত..." সে হাঁপাতে হাঁপাতে ফুসফুসের পুরো জোর দিয়ে বলল।
আমি তার কপালে রিভলভারের গরম নল চেপে ধরলাম। "তোমার নাম আর ফিল্ড আইডি বলো।"
"রায়হান... রায়হান কবির... বিশেষ উইং থ্রি..."
"তোমাদের কে পাঠিয়েছে? দত্ত পরিবারের ভেতরের কোনো সদস্য, নাকি আমাদের পুরোনো কেন্দ্রীয় বাঙ্কার?"
রায়হান ভিজে কাদার ওপর রক্তের দলা থুতু করে ফেলল। "আমরা... আমরা এক নির্দেশে আসিনি স্যার! ল্যান্ড ক্রুজারের মূল ঘাতকরা ছিল 'H' গ্রুপের লোক... তারা ১৭১৫ সালের নথিপত্র আর ব্যাগ নিতে এসেছিল। আর আমি..."
"তুমি কার হয়ে কাজ করছিলে?"
"আপনার পুরোনো বসের নির্দেশে... আমাদের কড়া নির্দেশ ছিল, যেকোনো মূল্যে ঘুরি-সাতকে জীবন্ত বন্দি করে নিয়ে যেতে হবে। দত্ত ভবনে সে পৌঁছানোর আগেই।"
স্নেহা ততক্ষণে গাড়ি থেকে কোনোমতে কষ্ট করে কাদায় নেমে এসেছে। ব্যাগটি নিজের বুকে শক্ত করে চেপে ধরে সে আমাদের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল।
"তোমরা ওকে দত্ত ভবনে যেতে দিতে চাও না কেন?" স্নেহার গলায় কঠিন প্রশ্ন। "তোমরা কী গোপন রাখার চেষ্টা করছ?"
রায়হান কষ্ট করে মাথা ঘুরিয়ে স্নেহার দিকে তাকাল। তার মুখে এক কুৎসিত, মৃত্যু যন্ত্রণার হাসি ফুটে উঠল।
"কারণ... ম্যাডাম... উনি যদি দত্ত ভবনে পা রাখেন, তবে সত্তর বছরের পুরো ইতিহাস ধ্বংস হয়ে যাবে। যা এত দিন ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখা হয়েছিল, তা সত্য হয়ে বেরিয়ে আসবে। আপনার বাবা... স্মৃতি দত্ত... সবাই আপনাদের কাছে মিথ্যা বলেছেন।"
"কিসের মিথ্যা?" আমি রিভলভারের চাপ বাড়ালাম। "স্পষ্ট করে বলো রায়হান! সময় শেষ হয়ে আসছে!"
"আমাদের অর্গানাইজেশনের আসল প্রধান... এখন দত্ত ভবনের ভেতরেই অবস্থান করছেন স্যার... উনি আপনাকে চেনার ভান করবেন না... উনি আপনাকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার সব ছক তৈরি করে রেখেছেন..."
কথাটি শেষ হতে পারল না। রায়হানের গলার ভেতর থেকে এক দলা কালচে রক্ত উথলে উঠল। তার চোখের মনি দুটি ওপরের দিকে উঠে স্থির হয়ে গেল। তার হাত দুটো কাদায় এলিয়ে পড়ল।
স্নেহা নিচু হয়ে তার গলার রক্তনালী স্পর্শ করল। দুই সেকেন্ড পর হাত সরিয়ে নিল।
"মারা গেছে," অত্যন্ত যান্ত্রিক শোনাল তার গলা। এনক্রিপ্টেড সংকেত ও রক্তিম সত্য
রায়হানের হাতের কাছে কাদায় পড়ে থাকা সেই রূপালি ধাতব টোকেনটি আমি শার্টের হাতা দিয়ে তুলে নিলাম। টোকেনটি দেখতে একটি মাঝারি কয়েনের মতো, কিন্তু তার উপরিভাগে সূক্ষ্ম কতগুলো জ্যামিতিক রেখা কাটা রয়েছে, আর পেছনে রয়েছে ক্ষুদ্র সাতটি বিন্দুর খোদাই।
এই গোপন টোকেনটি আমি জীবনের বহু বছর পকেটে নিয়ে ঘুরেছি। এটার কোন বিন্দুতে চাপ দিলে কী প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়, তা আমার নখদর্পণে।
তবুও স্নেহার উপস্থিতি টের পেয়ে আমি এমনভাবে টোকেনটি ঘোরাতে লাগলাম, যেন কোনো অচেনা বস্তু পরীক্ষা করছি। কিন্তু আমার সাবকনশাস মাইন্ড আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। আমার তর্জনী এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে টোকেনের তৃতীয় আর পঞ্চম বিন্দুর ওপর সুনির্দিষ্ট চাপে চেপে বসল।
ক্লিক!
ধাতব টোকেনটির মাঝখানে একটি সরু নীল লেজার আলো জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের এনক্রিপ্টেড স্পিকার থেকে এক কৃত্রিম ভয়েস বেজে উঠল:
Identity verified. Field asset GHURI-7 active. Transmitting location to Central Control...
চারপাশের বাতাস থমকে গেল।
স্নেহা ধীর পায়ে আমার দিকে ঘুরল। তার চোখের তারায় এবার আর কোনো ভীতি ছিল না, সেখানে জমা হয়েছিল চরম ঘৃণা আর প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি।
"তুমি ডিভাইসটা হাতে নেওয়ার ঠিক দুই সেকেন্ডের মধ্যে হিডেন সুইচে চাপ দিলে। কোনো চিন্তা ছাড়া, কোনো পরীক্ষা ছাড়া।" সে প্রতিটি শব্দ আলাদা করে উচ্চারণ করল। "তুমি কীভাবে জানলে ওটার ভেতরে সুইচ আছে?"
"কাকতালীয়... হাত লেগে ঢুকে গেছে," মুখ ফিরিয়ে বললাম।
"মিথ্যা!"
শব্দটি চিৎকার করে বলা হলো না, কিন্তু এর তীব্রতা চারপাশের সমস্ত নীরবতাকে চূর্ণ করে দিল।
"তোমার কোনো দিন স্মৃতি হারায়নি, হাসান," স্নেহা সোজা আমার কাদা মাখা বুকের কাছে এসে দাঁড়াল। "তুমি শুরু থেকেই সব জানতে। তুমি জানতে ১৭১৫ সালের নথিতে কী গোপন রহস্য আছে, তুমি জানতে আমার বাবার সাথে তোমার প্রতিষ্ঠানের কী সম্পর্ক ছিল! তুমি শুধু আমাকে ব্যবহার করেছ দত্ত পরিবারের মূল নথির কাছে পৌঁছাতে!"
"স্নেহা, বিষয়গুলো যত সহজ দেখায়, অতটা সহজ নয়। একটা নেটওয়ার্কের ভেতর ঢুকতে হলে ছদ্মবেশ নিতেই হয়—"
"তাহলে আসল সত্যটা কোনটা? তুমি কি শুধুই একজন ছায়ামানব খুনি?"
"এখনো সত্য প্রকাশ করার উপযুক্ত সময় আসেনি স্নেহা," আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম।
কথাটি শেষ করার সাথে সাথে বুঝলাম, আমি সেই পুরোনো ট্রেনিং সেন্টারের শেখানো ভাষাতেই কথা বলে ফেলেছি।
স্নেহা এক অদ্ভুত তিতা হাসি হাসল। "তোমাদের মতো ছায়ামানবদের কাছে সত্য বলার সময় কোনো দিন আসে না। তোমরা চিরকাল মিথ্যার বর্ম পরে বেঁচে থাকো।"
ঠিক তখনই দূর রাজপথের বাঁক থেকে ভারী অফ-রোড বাইকের বিকট ইঞ্জিনের গর্জন ভেসে এল।
প্রথমে একটি, তারপর আরও দুটি সাড়ে চারশো সিসির মোটরসাইকেলের আওয়াজ।
শিহাব।
আমাদের নির্ধারিত সময়ে সেফ হাউসে পৌঁছাতে না পেরে সে তার কন্টিনজেন্সি ব্যাকআপ টিম নিয়ে ট্র্যাক করে এসে পড়েছে।
বাইকগুলোর তীব্র সাদা আলো ধানক্ষেতের কাদায় এসে পড়ার সাথে সাথে আমার চোখের চারপাশের দৃশ্য ঝাপসা হতে শুরু করল। এতক্ষণের অতিরিক্ত অ্যাড্রেনালিনের দাপট থমকে যেতেই আমার ক্ষতগ্রস্ত শরীর তার স্বাভাবিক মূল্য দাবি করে বসল।
পায়ের নিচের পৃথিবীটা লাটিমের মতো ঘুরতে শুরু করেছে। হাত থেকে স্নাব-নোজ রিভলভারটি কাদায় ছিটকে পড়ে গেল। ডান বাহুর ধমনি থেকে রক্ত গড়িয়ে পায়ের বুট ভিজিয়ে দিচ্ছে। মাথার ভেতরে মনে হচ্ছে শত শত ভারী হাতুড়ি পিটছে।
আমি হাঁটু গেড়ে কাদায় ঢলে পড়তে যাচ্ছিলাম, কিন্তু স্নেহা তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে আমাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঘৃণা সত্ত্বেও একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব আর তার অন্তরের জমে থাকা ভালোবাসাকে সে অস্বীকার করতে পারল না।
"বসো! একদম নড়বে না!" সে ধমকে উঠে কেঁদে ফেলল।
"শওকত চাচা... ওনাকে বের করো আগে..." আমার কণ্ঠ নিভে আসছিল।
"শিহাবরা এসে গেছে! ওরা চাচাকে বের করবে! তুমি সোজা হয়ে শ্বাস নাও!"
"ব্যাগটা...?"
"ব্যাগ আমার সাথে আছে, হাসান।"
আমার দৃষ্টিসীমা ধীরে ধীরে এক গভীর গহ্বরে বিলীন হতে শুরু করল। চারপাশের দুমড়ানো গাড়ি, মৃত ঘাতকদের নিথর দেহ আর সূর্যাস্তের আলো এক অন্ধকারের সাগরে ডুবে গেল।
শুধু স্নেহার ফ্যাকাশে, রক্তে মাখা মুখটা আমার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে ভেসে রইল।
"চোখ বন্ধ করবে না হাসান! আমার দিকে তাকিয়ে থাকো!"
"তুমি... এখনো আমাকে ধরে আছো...?"
"ধরে আছি কারণ আমি জানতে চাই তুমি শেষ পর্যন্ত মুখ খোলো কি না!"
দূরে শিহাব বাইক থামিয়ে হেলমেট খুলে চিৎকার করে আমার নাম ধরে ছুটে আসছে। কিন্তু তার সেই আওয়ার ছাপিয়ে আমার কানে শেষ একটি শব্দ বাজতে লাগল।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত ল্যান্ড ক্রুজারের ভেতরে থাকা এনক্রিপ্টেড রেডিও স্পিকার থেকে বিপিং শব্দ ভেসে আসছে:
সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। দীর্ঘ। দীর্ঘ। দীর্ঘ।
"অ্যাসেট চিহ্নিত। ঘুড়ি-সাত বেঁচে আছে। চূড়ান্ত প্রটোকল চালু করা হোক।"
অন্ধকার এসে আমাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নিল। চোখ খুলতেই এবং দত্ত ভবনের ছায়া
প্রথমেই যে জিনিসটি চেতনায় ফিরল, তা হলো এক তীব্র চেনা বৈপরীত্য। কোনো রক্ত, কাদা বা বারুদের গন্ধ নেই, তার বদলে ঘরজুড়ে ক্লোরিন, অ্যান্টিসেপটিক আর স্পিরিটের এক তীব্র হাসপাতালঘেঁষা গন্ধ।
চোখ খুলতেই সিলিংয়ের সাদা টিউবলাইটের স্থির আলো চোখে এসে বিধল। সেই আলো কোনো গাড়ির হেডলাইটের মতো কাঁপছে না। পাশে থাকা হার্ট মনিটরের নিয়মিত বিরতির যান্ত্রিক শব্দ, বিপ... বিপ... বিপ...
আমার ডান বাহুটি সম্পূর্ণ প্লাস্টার ও গজ দিয়ে আইভি ক্যাথেটারের সাথে মেডিকেটেড ফ্রেমে বেধে রাখা হয়েছে। গলায় চরম তৃষ্ণা, মনে হচ্ছে শুষ্ক বালু জমে আছে।
দৃষ্টি বাঁ পাশে ঘোরাতেই স্নেহাকে দেখতে পেলাম।
সে কেবিনের কাঠের চেয়ারে একদম স্থির হয়ে বসে আছে। তার কপালের কাটা জায়গায় একটি নিখুঁত সাদা ব্যান্ডেজ। রক্তে মাখা সেই পুরোনো পোশাক সে বদলায়নি, গায়ে এখনো শুকনো কাদা আর কালচে রক্তের দাগ লেগে আছে। তার চোখের নিচে কালি জমে এক থমথমে বলয় তৈরি করেছে।
আমাকে চোখের পাতা নাড়াতে দেখে সে সামান্য এগিয়ে এল।
"হাসান...?"
তার কণ্ঠস্বরে সেই চিরচেনা সংশয় আর দূরত্ব।
আমি শুকনো জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলার চেষ্টা করলাম, "আমি... কোথায় এটা...?"
কিন্তু মুখ থেকে কেবল বাতাস বের হলো, স্পষ্ট কোনো শব্দ বের হলো না।
"দত্ত ভবন প্রাইভেট উইংয়ের ভিআইপি কেবিনে," পেছন থেকে অন্য একটি অতি পরিচিত, গম্ভীর কণ্ঠ উত্তর দিল।
স্মৃতি দত্ত।
তিনি কেবিনের আধখোলা ভারী পর্দার আড়ালে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাদা ধপধপে সুতির শাড়ি, চুলে সুবিন্যস্ত খোঁপা, আর তাঁর ডান হাতের অনামিকায় সেই রাজকীয় নীল পাথরের আংটিটি আলোতে ঝিলমিল করছে। তাঁর মুখে কোনো উদ্বেগ বা আবেগের ছিটেফোঁটা ছিল না; যেন তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে আমি জেগে উঠব।
আমার দৃষ্টি অনামিকার সেই আংটির ওপর স্থাণু হয়ে আটকে রইল।
স্মৃতি দত্ত ধীর পায়ে আমার বিছানার কাছে এগিয়ে এলেন। তিনি স্নেহার কাঁধে একখানা হাত রাখলেন, তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বললেন,
"তোমার স্মৃতি হারানোর অভিনয় এবার বন্ধ হওয়া উচিত, হাসান। নাকি তোমাকে তোমার অফিশিয়াল পরিচয় 'ঘুড়ি-সাত' বলে সম্বোধন করব?"
স্নেহা মাথা তুলে স্মৃতি দত্তের দিকে তাকাল। "মা... তুমিও এই পরিচয়ের কথা জানতে?"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। কারণ এই কেবিনের ভেতরের বাতাস বাইরের সেই ঘাতকদের বুলেটের চেয়েও বেশি বিষাক্ত আর বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
স্মৃতি দত্ত আমার কানের কাছে ঝুঁকে এলেন। তাঁর নীল পাথরের আংটি থেকে বের হওয়া এক পরিচিত প্রাচীন সুবাস আমার নাকে এসে পৌঁছাল।
"তুমি সাত বছর আগে যা হারিয়েছিলে, তা কোনো স্মৃতি ছিল না," তিনি ফিসফিস করে বললেন। "তুমি হারিয়েছিলে তোমার বিশ্বাসভঙ্গের পরিণতি। তাই নয় কি?"
স্নেহার যে হাতটি আমার বেডের কোণ ধরে ছিল, তা ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল।
সেই সামান্য দূরত্ব আর স্পর্শহীনতার শূন্যতা আমাকে কিছুক্ষণ আগের বুলেটের ক্ষতের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাবিদ্ধ করল।
আমি কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই, কেবিনের বাঁ পাশের সাউন্ডপ্রুফ ডাবল-গ্লাস জানালার কাচে বাইর থেকে তিনবার সুনির্দিষ্ট টোকা পড়ল।
সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। (S)
দীর্ঘ। দীর্ঘ। দীর্ঘ। (O)
সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত। (S)
জানালার ওপাশের রাতের অন্ধকারের ভেতর এক বিশাল আকৃতির ছায়ামূর্তি নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
স্নেহা আতঙ্কে জানালার দিকে তাকাল।
স্মৃতি দত্ত কিন্তু একবারও ঘুরে তাকালেন না। তিনি শুধু তাঁর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন,
"তারা জেনে গেছে, এজেন্ট এখনো বেঁচে আছে... আর আসল খেলাটা এবার দত্ত ভবনের ভেতরেই শুরু হবে।"
চলবে...
বিশেষ দ্রষ্টব্য: 'দত্ত পরিবার' একটি ঐতিহাসিক আবহনির্ভর রহস্য ও রোমাঞ্চ উপন্যাস। হাসান, স্নেহা, স্মৃতি দত্ত, শিহাব, রায়হান কবির, দত্ত ভবন, ১৭১৫ সালের গোপন নথি এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী সম্পূর্ণ কাল্পনিক সৃজনশীল রচনার অংশ। স্পর্শ সংকেতের বর্ণনা রচনার প্লটকে জীবন্ত করার জন্য ব্যবহৃত সাহিত্যিক কৌশল।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0