সঞ্চয়ের অর্থ যখন হারিয়ে যায়: ফিন্যান্সিয়াল নিহিলিজম, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎহীনতার মনোবিজ্ঞান

মানুষ কেন সঞ্চয়ে আগ্রহ হারান? আয়, মূল্যস্ফীতি, অসম্ভব সামাজিক স্বপ্ন, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, ভোগবাদ ও ডিজিটাল ঋণ কীভাবে ফিন্যান্সিয়াল নিহিলিজম তৈরি করে, তার গভীর বিশ্লেষণ।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ১
সঞ্চয়ের অর্থ যখন হারিয়ে যায়: ফিন্যান্সিয়াল নিহিলিজম, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎহীনতার মনোবিজ্ঞান
বৃষ্টিভেজা শহরের রাতে টেবিলে রাখা অল্প কয়েনের সঞ্চয়পাত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন একজন ব্যক্তি; পাশে ক্যালকুলেটর, স্মার্টফোন ও হিসাবের কাগজ, আর জানালার ওপারে বাড়ি, গাড়ি, বিদেশভ্রমণ ও উচ্চশিক্ষার অধরা স্বপ্নের প্রতীক

Society, Money and the Psychology of the Future

সঞ্চয়ের অর্থ যখন হারিয়ে যায়: ফিন্যান্সিয়াল নিহিলিজম, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎহীনতার মনোবিজ্ঞান

মানুষ কি সত্যিই সঞ্চয়বিমুখ হয়ে পড়ছেন, নাকি তাঁদের কাছে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিই আর বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না?

সঞ্চয়কে আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি উত্তম গুণ হিসেবে দেখে এসেছি। যিনি হাতে টাকা ধরে রাখতে পারেন, প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন এবং আগামী দিনের জন্য কিছু রেখে দিতে পারেন, তাঁকে আমরা বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল বলে মনে করি। বিপরীতে যিনি আয় হাতে আসার পরপরই ব্যয় করে ফেলেন, তাঁকে সহজেই অপচয়ী অথবা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন বলে বিচার করি।

কিন্তু বিচারটি কি সব সময় এত সরল? একজন মানুষের হাতে মাস শেষে এমন পরিমাণ অর্থ থাকে, যা দিয়ে বর্তমানের প্রয়োজনই ঠিকমতো মেটে না। সেখানে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় না করতে পারা কি শুধু তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা? নাকি এমনও হতে পারে যে ভবিষ্যতের লক্ষ্যগুলো তাঁর আয় থেকে এত দূরে সরে গেছে যে সঞ্চয় আর একটি বাস্তব পথ বলে মনে হচ্ছে না?

মানুষ কি সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন, নাকি তাঁরা এমন এক ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা হারিয়েছেন, যেখানে সঞ্চয় সত্যিই তাঁদের কোথাও পৌঁছে দেবে?

সাম্প্রতিক জনপ্রিয় অর্থনৈতিক আলোচনায় এই হতাশা ও আচরণের একটি নাম দেওয়া হয়েছে: Financial Nihilism বা আর্থিক নিহিলিজম। এটি বিষণ্নতা বা উদ্বেগজনিত ব্যাধির মতো কোনো স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল রোগনির্ণয় নয়। বরং এমন একটি সামাজিক ও আচরণগত মানসিকতার বর্ণনা, যেখানে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে প্রচলিত আর্থিক পথ অনুসরণ করেও বাড়ি, নিরাপত্তা, অবসর, সামাজিক উন্নতি কিংবা সম্পদ গঠনের মতো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি সঞ্চয়, ধীর বিনিয়োগ ও দীর্ঘ অপেক্ষার বদলে বর্তমানের ভোগ, তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতা অথবা কখনো উচ্চ ঝুঁকির আর্থিক সিদ্ধান্তকে বেশি অর্থবহ মনে করতে পারেন।

তবে এই ধারণাকে একটি সর্বজনীন সত্য হিসেবে ব্যবহার করাও ভুল হবে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত আরবান ইনস্টিটিউটের একটি জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপে দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার অনুভূতি ও ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক কৌশলের প্রবণতা থাকলেও অনেকে একই সঙ্গে প্রচলিত সঞ্চয় ও বিনিয়োগও করছেন। অর্থাৎ একজন মানুষ একই সময়ে আশাবাদী, সঞ্চয়ী, উদ্বিগ্ন এবং ঝুঁকিপ্রবণ হতে পারেন। মানুষকে শুধু ‘নিহিলিস্ট’ অথবা ‘দায়িত্বশীল’ এই দুই বাক্সে ভাগ করলে তাঁর বাস্তবতা ধরা পড়ে না।

মানুষ কাজ করেন কেন?

মানুষের কাজ করার পেছনে অর্থ, পরিচয়, সৃজনশীলতা, সামাজিক অবদান, মর্যাদা ও আত্মমর্যাদার মতো বহু কারণ থাকতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাছে কাজের প্রথম বাস্তব অর্থ হলো আয়। টাকা থাকলে মানুষ খাবার কিনতে পারেন, বাসাভাড়া দিতে পারেন, চিকিৎসা নিতে পারেন, পরিবারকে সাহায্য করতে পারেন এবং কিছুটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

সমস্যা শুরু হয় যখন উপার্জিত অর্থের প্রায় পুরোটাই দায়িত্ব ও অনিবার্য ব্যয়ে চলে যায়। তখন টাকা আর নতুন জীবন নির্মাণের উপকরণ থাকে না। টাকা হয়ে ওঠে কেবল পুরোনো জীবনটিকে আরেক মাস টেনে নেওয়ার জ্বালানি। মানুষের শ্রম বর্তমানকে ধরে রাখে, কিন্তু ভবিষ্যৎকে বদলাতে পারে না।

মানুষ আশায় বাঁচে, কথাটি আবেগময় হলেও এর বাস্তব ভিত্তি আছে। আশা মানে শুধু অলৌকিক কিছু ঘটার অপেক্ষা নয়। আশা হলো আজকের ত্যাগ ও আগামী দিনের ফলের মধ্যে একটি বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক। আমি আজ কিছু আনন্দ স্থগিত রাখব, কারণ আগামীকাল সেই ত্যাগ আমাকে আরও নিরাপদ বা স্বাধীন করবে। কিন্তু যদি আজকের ত্যাগের সঙ্গে আগামীকালের উন্নতির সম্পর্কটি অস্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সঞ্চয়ের নৈতিক ভাষাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সঞ্চয় আসলে বর্তমানের নিজের কাছ থেকে ভবিষ্যতের নিজের কাছে পাঠানো একটি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ভবিষ্যতের সেই মানুষটির কাছে অর্থটি নিরাপদে পৌঁছাবে কি না, সেটি নিয়েই যখন সন্দেহ তৈরি হয়, তখন প্রতিশ্রুতিটি ভেঙে পড়তে শুরু করে।

স্বপ্নের তালিকা কে লিখে দেয়?

বাংলাদেশের একজন মধ্যবিত্ত মানুষের সম্ভাব্য স্বপ্নের তালিকায় শহরে একটি বাড়ি, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিয়ে, ব্যক্তিগত গাড়ি, উন্নত প্রযুক্তিপণ্য, উচ্চশিক্ষা, বিদেশভ্রমণ, জনহিতকর কাজ এবং সন্তানের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। তালিকাটি সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কেউ বাড়ির বদলে গ্রামে একটি খামার চান, কেউ বিয়ে করতে চান না, কেউ গাড়ির বদলে স্বাধীন পেশা চান, কেউ বিদেশি ডিগ্রির বদলে নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে চান।

তা সত্ত্বেও সাধারণ স্বপ্নগুলোর মধ্যে একটি মিল আছে। এগুলোর বড় অংশ শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, সামাজিক স্বীকৃতির ভাষাও। বাড়ি শুধু আশ্রয় নয়, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ। গাড়ি শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়, শ্রেণিগত অবস্থানের দৃশ্যমান চিহ্ন। দামি ফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়, রুচি, সক্ষমতা ও আধুনিকতার সংকেত। বিদেশি ডিগ্রি শুধু জ্ঞান নয়, নামের আগে বা পরে যুক্ত হওয়া সামাজিক মর্যাদাও।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়োর ধারণায় অর্থনৈতিক পুঁজির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও symbolic capital বা প্রতীকী পুঁজিও মানুষের অবস্থান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। আমরা শুধু বস্তু কিনি না। কখনো কখনো বস্তুটির মাধ্যমে অন্যের চোখে নিজের একটি গ্রহণযোগ্য সংস্করণ কিনতে চেষ্টা করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই তুলনাকে আরও ঘন করে তোলে। আগে প্রতিবেশীর জীবন দেখা যেত। এখন প্রতিদিন পরিচিত ও অপরিচিত শত মানুষের বাছাই করা সাফল্য দেখা যায়।

ফলে স্বপ্ন আর নিভৃত ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা থাকে না। সেটি একটি দৃশ্যমান প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে নির্মম বৈশিষ্ট্য হলো, আমরা অন্য মানুষের সম্পূর্ণ আর্থিক জীবন দেখি না। দেখি তাঁর নতুন ফোন, গাড়ি, ডিগ্রি বা ভ্রমণ। কিন্তু দেখি না ঋণ, পারিবারিক সহায়তা, উত্তরাধিকার, অনিশ্চয়তা, ব্যর্থ বিনিয়োগ অথবা সেই দৃশ্যমান সাফল্যের আড়ালের মূল্য।

জনাব করিমের নির্মম গণিত

ধরা যাক, জনাব করিম বাংলাদেশ সরকারের দশম গ্রেডের একটি পদে কর্মরত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সীমা মনে রাখা দরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী দশম গ্রেডের মূল বেতনসীমা ১৬,০০০ টাকা থেকে ৩৮,৬৪০ টাকা। মূল বেতনের সঙ্গে প্রযোজ্য ভাতা ও কর্তন যুক্ত হলে হাতে পাওয়া অর্থ পদ, কর্মস্থল, চাকরির পর্যায় এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুসারে বদলাবে। তাই একটি কাল্পনিক ‘মোট আয়’কে সব দশম গ্রেডের কর্মচারীর বাস্তব আয় হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।

তবু সমস্যাটি বোঝার জন্য একটি সরল চিন্তা-অনুশীলন করা যায়। ধরা যাক, প্রয়োজনীয় সব খরচের পরে করিম সাহেব মাসে ১০,০০০ টাকা সঞ্চয় করতে পারেন। কোনো মুনাফা, বিনিয়োগ-রিটার্ন বা মূল্যস্ফীতি হিসাব না করলে এক কোটি টাকা জমাতে তাঁর লাগবে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস। মাসে ২০,০০০ টাকা সঞ্চয় করলেও সময় লাগবে প্রায় ৪১ বছর ৮ মাস। বাস্তবে আয় বাড়তে পারে এবং সঞ্চয়ে রিটার্ন আসতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ি, জমি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য লক্ষ্যের মূল্যও বাড়তে পারে।

এই হিসাবের উদ্দেশ্য জনাব করিমের পক্ষে বাড়ি কেনা অসম্ভব ঘোষণা করা নয়। উত্তরাধিকার, যৌথ পারিবারিক আয়, ব্যাংকঋণ, চাকরির অগ্রগতি, ব্যবসা, বিনিয়োগ, অবস্থান নির্বাচন এবং লক্ষ্য পরিবর্তন তাঁর সম্ভাবনাকে বদলে দিতে পারে। হিসাবটি শুধু একটি মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দেখায়। লক্ষ্য যখন মাসিক সঞ্চয়ের তুলনায় কয়েক দশক দূরে চলে যায়, তখন সঞ্চয়ের প্রতিটি ছোট অঙ্ক মানুষের চোখে অকার্যকর বলে মনে হতে পারে।

এখানে গণিতের আসল প্রশ্নটি ‘কত টাকা লাগবে’ নয়।

আসল প্রশ্ন হলো, আজকের ছোট ত্যাগটি কি ভবিষ্যতের কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত? মানুষ যখন সেই সংযোগ দেখতে পান না, তখন ছোট সঞ্চয়ও তাঁর কাছে অর্থহীন মনে হতে শুরু করে।

মূল্যস্ফীতি এই অসহায়ত্বকে আরও বাড়ায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.১৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.২৮ শতাংশ। আয় যদি একই গতিতে না বাড়ে, তবে মানুষ আগের জীবনযাত্রা বজায় রাখতেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে বাধ্য হন। তখন কম সঞ্চয় সব সময় অনিয়ন্ত্রিত ভোগের ফল নয়। এটি সংকুচিত বাস্তব সক্ষমতার ফলও হতে পারে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান: ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা কি ব্যক্তিগত বিষয়?

রাজনৈতিক দর্শনে সামাজিক চুক্তির ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের বৈধতা শুধু আইন প্রয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা, সম্পত্তি এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রত্যাশাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আধুনিক নাগরিকের আর্থিক নিরাপত্তা কোনো একক দার্শনিকের একটি বাক্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। চাকরির আয়, আবাসন, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পেনশন, সামাজিক সুরক্ষা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের সম্মিলিত কাঠামো নির্ধারণ করে একজন মানুষ ভবিষ্যৎকে কতটা বিশ্বাস করবেন।

মানুষ যদি মনে করেন অসুস্থতার একটি ঘটনা বহু বছরের সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে, সন্তানের শিক্ষাব্যয় অনিশ্চিতভাবে বাড়বে অথবা কর্মজীবন শেষে তাঁর নিরাপত্তা দুর্বল থাকবে, তবে তিনি শুধু ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ভবিষ্যৎকেও অনির্ভরযোগ্য ভাবতে শেখেন। তখন বর্তমানের ভোগ সব সময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়। কখনো সেটি অবিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থার মধ্যে নিশ্চিত ছোট আনন্দ বেছে নেওয়া।

তবে এখানেও একটি সীমা আছে। রাষ্ট্রীয় নীতির দুর্বলতা দেখিয়ে সব ব্যক্তিগত ব্যয়কে যৌক্তিক ঘোষণা করা যায় না। আবার ব্যক্তিগত বাজেটের দুর্বলতা দেখিয়ে আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মজুরির কাঠামোগত সংকটও অস্বীকার করা যায় না। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পরস্পরের বিকল্প অপরাধী বানালে সমস্যাটি বোঝা যায় না। তারা একই ব্যবস্থার ভিন্ন স্তর।

সমাজবিজ্ঞান: আকাঙ্ক্ষা ও সামর্থ্যের ব্যবধান

সমাজবিজ্ঞানে এমিল দুর্খাইমের anomie ধারণা এমন এক সামাজিক অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে পুরোনো নিয়ামক ও আকাঙ্ক্ষার সীমা দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে রবার্ট মার্টন দেখান, সমাজ যখন সাফল্যের কিছু সর্বজনীন লক্ষ্য সামনে রাখে, কিন্তু সেগুলো অর্জনের বৈধ ও বাস্তব পথ সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত রাখে না, তখন লক্ষ্য ও উপায়ের মধ্যে চাপ তৈরি হয়।

মধ্যবিত্ত মানুষকে বলা হয় পরিশ্রম করো, শিক্ষিত হও, ভালো চাকরি নাও, সঞ্চয় করো, তাহলেই বাড়ি, গাড়ি, সম্মান ও নিরাপত্তা আসবে। কিন্তু তিনি যদি দেখেন নিয়ম মেনে এগিয়েও লক্ষ্যগুলো ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে, তখন তিনি শুধু ব্যর্থ বোধ করেন না। তাঁর কাছে নিয়মটির বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট হতে থাকে।

এখানেই আত্মদোষারোপের জন্ম হতে পারে। মানুষ আবাসন বাজার, মূল্যস্ফীতি, পারিবারিক দায়, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আয়ের সীমা না দেখে নিজেকেই বলেন, ‘আমি যথেষ্ট পরিশ্রমী নই’, ‘আমি টাকা ধরে রাখতে পারি না’ অথবা ‘আমার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে’। কাঠামোগত বাধা যখন ব্যক্তিগত চরিত্রের ব্যর্থতা হিসেবে অনুবাদ হয়, তখন মানুষ শুধু অর্থ হারান না, আত্মমর্যাদাও হারান।

দর্শন: ভবিষ্যৎ কি সত্যিই মরে যায়?

নীৎশের নিহিলিজমকে কেবল ‘কিছুতেই কোনো অর্থ নেই’ এই বাক্যে নামিয়ে আনা ভুল। তাঁর কাজের কেন্দ্রে ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মূল্যবোধের কর্তৃত্ব ভেঙে গেলে মানুষ নতুন অর্থ কীভাবে নির্মাণ করবে, সেই সংকট। আর্থিক নিহিলিজমে অনুরূপ প্রশ্নটি দাঁড়ায়: সঞ্চয়, স্থির চাকরি ও ধৈর্যের মাধ্যমে উন্নতির পুরোনো প্রতিশ্রুতি যদি আর বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তবে অর্থনৈতিক জীবনের নতুন অর্থ কী?

কেউ এর উত্তর খোঁজেন বর্তমানের অভিজ্ঞতায়। তিনি ভাবেন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তাই এখনই ভ্রমণ করব, পছন্দের ফোন কিনব বা ভালো খাবার খাব। কেউ উচ্চ ঝুঁকির বিনিয়োগে যান, কারণ ধীর পথে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তাঁর কাছে খুব কম। কেউ আবার সব আকাঙ্ক্ষা গুটিয়ে শুধু দায়িত্ব পালন করেন।

আলবেয়ার কামুর দর্শন এখানে একটি ভিন্ন সম্ভাবনা দেখায়। অর্থের অনিশ্চয়তা অবধারিত আত্মসমর্পণ দাবি করে না। বরং মানুষ সীমাবদ্ধতা জেনেও নিজের মূল্যবোধ ও কর্মের অর্থ নির্মাণ করতে পারেন। সব স্বপ্ন পূরণ হবে না, এই স্বীকৃতি আর কোনো স্বপ্নই অর্থবহ নয়, এই সিদ্ধান্ত এক নয়।

পৃথিবীর সামগ্রিক অনিশ্চয়তাও ব্যক্তির ভবিষ্যৎবোধে প্রভাব ফেলতে পারে। ইউপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রাম ২০২৫ সালে রাষ্ট্র জড়িত এমন ৬৫টি সশস্ত্র সংঘাত নথিভুক্ত করেছে, যা তাদের ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু হওয়া পরিসংখ্যানে সর্বোচ্চ। কিন্তু অসংজ্ঞায়িতভাবে ‘১০০টির বেশি যুদ্ধ’ বলার বদলে সংঘাতের সংজ্ঞা ও তথ্যের উৎস স্পষ্ট করা জরুরি। পৃথিবী অনিশ্চিত বলেই পরিকল্পনা অর্থহীন নয়। বরং অনিশ্চয়তার ধরন বুঝে নমনীয় পরিকল্পনা আরও জরুরি হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞান: মানুষ কেন আজকের আনন্দকে বেছে নেন?

আচরণগত অর্থনীতিতে present bias বলতে এমন প্রবণতাকে বোঝায়, যেখানে দূরের বড় লাভের তুলনায় কাছের ছোট আনন্দ মানুষের সিদ্ধান্তে অসামঞ্জস্যপূর্ণ গুরুত্ব পায়। কিন্তু এটি শুধু দুর্বল চরিত্রের প্রমাণ নয়। ভবিষ্যৎ পুরস্কার যত অনিশ্চিত হয়, বর্তমান পুরস্কার তত যৌক্তিক বলে মনে হতে পারে।

বিখ্যাত মার্শম্যালো পরীক্ষাকে একসময় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ সাফল্যের সরল পরীক্ষা হিসেবে জনপ্রিয় করা হয়েছিল। পরবর্তী গবেষণা চিত্রটিকে জটিল করেছে। পরীক্ষক আগে বিশ্বাসযোগ্য আচরণ করেছেন কি না, সেটিও শিশুর অপেক্ষা করার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ অপেক্ষা কেবল ইচ্ছাশক্তির বিষয় নয়। প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে কি না, সেই বিশ্বাসেরও বিষয়।

করিম সাহেবের জন্য প্রশ্নটি তাই শুধু তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, তিনি কি বিশ্বাস করেন যে আজকের সঞ্চয় আগামীকালের জীবনকে সত্যিই বদলাবে? অতীতে মূল্যস্ফীতি, চিকিৎসা, পারিবারিক জরুরি ব্যয় অথবা আকস্মিক দায় তাঁর সঞ্চয় বারবার শেষ করে দিলে বর্তমানের নিশ্চিত আনন্দ বেছে নেওয়াকে তাঁর কাছে নির্বুদ্ধিতা মনে নাও হতে পারে।

মার্টিন সেলিগম্যানের learned helplessness ধারণা দেখায় যে মানুষ যখন বারবার এমন নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যা তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না বলে মনে হয়, তখন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ উপস্থিত হলেও উদ্যোগ কমে যেতে পারে। তবে প্রতিটি সঞ্চয়হীন মানুষকে শিখিত অসহায়তার শিকার বলা যাবে না। কম আয়, জরুরি ব্যয়, ঋণ, পারিবারিক দায়িত্ব, দুর্বল পরিকল্পনা, তাৎক্ষণিক তৃপ্তি এবং সামাজিক চাপ বিভিন্ন অনুপাতে একই ফল তৈরি করতে পারে।

সঞ্চয়-আচরণ নিয়ে বাস্তব তথ্যভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সঞ্চয়ের লক্ষ্য কতটা অর্জনযোগ্য মনে হয়, তা প্রথমবার অর্থ জমা দেওয়ার সম্ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার আত্মনিয়ন্ত্রণ সঞ্চয়ের পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সঞ্চয় শুরু করার সঙ্গে একইভাবে সম্পর্কিত ছিল না। অর্থাৎ ‘ইচ্ছাশক্তি বাড়াও’ একা যথেষ্ট সমাধান নয়। লক্ষ্যকে বিশ্বাসযোগ্য, দৃশ্যমান ও অর্জনযোগ্য করাও প্রয়োজন।

ফিন্যান্সিয়াল নিহিলিজমের ডার্ক সাইকোলজি

এখন আমরা সবচেয়ে অন্ধকার অংশে প্রবেশ করতে পারি। আর্থিক হতাশা শুধু মানুষের মনের ভেতরে জন্ম নেয় না। বাজার, প্রযুক্তি ও বিপণনব্যবস্থা সেই হতাশা, তুলনা এবং তাৎক্ষণিক তৃপ্তির প্রবণতাকে কাজে লাগাতে পারে।

ডিজিটাল দোকানে সীমিত সময়ের ছাড়, কাউন্টডাউন, ‘মাত্র কয়েকটি বাকি’, এক ক্লিকে ক্রয়, বিনামূল্যে ডেলিভারির সীমা এবং আগের আচরণের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন মানুষের সিদ্ধান্তের গতি বাড়ায়। এগুলোর সবই অবৈধ বা প্রতারণামূলক নয়। কিন্তু যখন নকশাটি ব্যবহারকারীকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে দ্রুত সিদ্ধান্তে ঠেলে দেয়, গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় বা শর্ত আড়াল করে অথবা বাতিল করাকে ইচ্ছাকৃতভাবে কঠিন করে, তখন সেটি dark pattern বা প্রতারণামূলক নকশার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

‘এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন’ ধরনের ব্যবস্থা বর্তমান ক্রয়মূল্যকে কয়েকটি ছোট কিস্তিতে ভাগ করে মনস্তাত্ত্বিক ব্যথা কমাতে পারে। পণ্যটির পুরো মূল্য তখন চোখের সামনে থাকে না, থাকে আজ কত কম দিতে হবে সেই অঙ্কটি। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কনজিউমার ফাইন্যান্সিয়াল প্রোটেকশন ব্যুরোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালে তাদের নমুনার ৬৩ শতাংশ ঋণগ্রহীতা বছরের কোনো এক সময়ে একাধিক সমসাময়িক BNPL ঋণ নিয়েছিলেন। তবে এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট বাজারের। এটিকে বাংলাদেশের ভোক্তার সরাসরি পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

ঋণ, ইএমআই বা ক্রেডিট কার্ড নিজে অশুভ নয়। এগুলো প্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা বা উৎপাদনশীল সম্পদ অর্জনে সহায়ক হতে পারে। অন্ধকারটি তৈরি হয় তখন, যখন ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর ধারাবাহিক দাবি বসিয়ে বর্তমানের ক্রয়ক্ষমতাকে কৃত্রিমভাবে বড় দেখানো হয় এবং গ্রাহক সেই দায়ের মোট মূল্য, ঝুঁকি ও সুযোগব্যয় বুঝতে পারেন না।

এখানেই ফিন্যান্সিয়াল নিহিলিজম বাজারের জন্য লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। যে মানুষটি মনে করেন সঞ্চয় করে তিনি কোনো দিন বাড়ি কিনতে পারবেন না, তাঁকে বোঝানো সহজ যে অন্তত আজ একটি উন্নত ফোন তাঁর প্রাপ্য। যে মানুষটি মনে করেন অবসর নিরাপদ হবে না, তাঁকে আজকের অভিজ্ঞতা কিনতে উৎসাহিত করা সহজ। ভবিষ্যৎ যখন সস্তা হয়ে যায়, বর্তমানকে বেশি দামে বিক্রি করা যায়।

ডার্ক সাইকোলজির সবচেয়ে কার্যকর কৌশল সব সময় মানুষকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা নয়।

কখনো মানুষের ভয়, অসম্পূর্ণতা, সামাজিক তুলনা ও ভবিষ্যৎহীনতার অনুভূতিকে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে এমন কিছু কিনে ফেলেন, যা অন্য কারও মুনাফা বাড়ায় কিন্তু তাঁর স্বাধীনতা কমায়।

তবে এখান থেকে ‘পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে ঋণী করে রাখে’ এমন ষড়যন্ত্রমূলক সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। বাজারে বহু প্রতিষ্ঠান, নীতি, প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তি ও ভোক্তা-পছন্দ একসঙ্গে কাজ করে। শোষণমূলক নকশা ও অসাম্য থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ফলের পেছনে একটি কেন্দ্রীয় গোপন পরিকল্পনা আছে বলে দাবি করতে প্রমাণ প্রয়োজন।

গাই স্ট্যান্ডিংয়ের precariat ধারণা অনিশ্চিত কাজ, দুর্বল নিরাপত্তা ও অস্থিতিশীল পরিচয়ের মধ্যে থাকা শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু স্থায়ী সরকারি চাকরিতে থাকা একজন ব্যক্তিকে সরাসরি একই শ্রেণিতে বসানোও অতিসরলীকরণ হতে পারে। করিম সাহেবের চাকরি তুলনামূলক নিরাপদ হলেও তাঁর ক্রয়ক্ষমতা, স্বপ্ন ও সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে তীব্র ব্যবধান থাকতে পারে। নিরাপদ চাকরি মানেই পর্যাপ্ত আয় নয়। আবার অপর্যাপ্ত আয় মানেই সম্পূর্ণ অনিরাপত্তাও নয়।

তাহলে কি সঞ্চয় অর্থহীন?

না। সমস্যাটি সঞ্চয়ের নৈতিক বা ব্যবহারিক মূল্য হারিয়ে যাওয়া নয়। সমস্যাটি হলো, আমরা ছোট সঞ্চয়কে প্রায়ই শুধু বড় বাড়ি, দামি গাড়ি বা সামাজিক উত্থানের সঙ্গে তুলনা করি। ফলে জরুরি চিকিৎসার খরচ, তিন মাসের জীবনযাত্রা, চাকরি বদলের স্বাধীনতা, ঋণ এড়ানো অথবা একটি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অর্থ হিসেবে সঞ্চয়ের মূল্য অদৃশ্য হয়ে যায়।

এক কোটি টাকার বাড়ি অর্জন করতে না পারলেও এক মাসের জরুরি তহবিল অর্থহীন নয়। গাড়ি কেনার সামর্থ্য না থাকলেও ঋণ ছাড়া একটি জরুরি মেরামত করতে পারা ছোট অর্জন নয়। বিদেশি ডিগ্রি সম্ভব না হলেও একটি দক্ষতা শেখার অর্থ জমাতে পারা ভবিষ্যতের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে।

এখানেই ছোট ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাও ইঙ্গিত করে যে লক্ষ্য অর্জনযোগ্য মনে হলে মানুষ সঞ্চয় শুরু করার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ মানে বড় কাঠামোগত সমস্যাকে ব্যক্তিগত কৌশলে আড়াল করা নয়। ব্যক্তিগতভাবে জরুরি তহবিল, স্বয়ংক্রিয় সঞ্চয়, উচ্চসুদের ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যয়ের সীমা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আয়, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, আর্থিক ভোক্তা সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে নীতিগত আলোচনাও প্রয়োজন।

করিম সাহেবের প্রথম কাজ হয়তো স্বপ্নের পুরো তালিকার মূল্য যোগ করা নয়। তাঁর প্রথম কাজ হতে পারে স্বপ্নগুলোকে তিন ভাগে দেখা: কোনটি সত্যিই তাঁর নিজের, কোনটি সামাজিক প্রদর্শনের চাপ এবং কোনটি আপাতত সামর্থ্যের বাইরে হলেও ধাপে ধাপে এগোনো সম্ভব।

এরপর সঞ্চয়ের প্রশ্নটি বদলে যায়। ‘এই সামান্য টাকা দিয়ে কী হবে’ প্রশ্নটির জায়গায় আসে, ‘এই টাকা আমার কোন স্বাধীনতাটি কিনবে?’ একটি জরুরি তহবিল হয়তো বাড়ি কিনবে না, কিন্তু অপমানজনক চাকরি ছাড়ার আগে কিছু সময় কিনতে পারে। একটি ছোট শিক্ষা-তহবিল হয়তো বিদেশি পিএইচডি কিনবে না, কিন্তু একটি নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে। ঋণমুক্ত একটি মাস হয়তো সামাজিক মর্যাদা দেখাবে না, কিন্তু মানসিক শান্তি দিতে পারে।

সঞ্চয়ের নতুন অর্থ

সঞ্চয় সব সময় ধনী হওয়ার পথ নয়।

কখনো সঞ্চয় মানে বিপদের সময় অন্যের সামনে হাত না পাতার সামর্থ্য।

কখনো সঞ্চয় মানে ক্ষতিকর সম্পর্ক, ঋণ অথবা কর্মপরিবেশ থেকে বের হওয়ার সময়।

আর কখনো সঞ্চয় মানে ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা নয়, ভবিষ্যতের হাতে নিজের কিছু সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে দেওয়া।

মানুষ সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহ হারান শুধু তাঁরা অপচয়ী বলে নয়। কেউ হারান কারণ আয় প্রয়োজনের তুলনায় কম। কেউ হারান কারণ লক্ষ্য অসম্ভব বলে মনে হয়। কেউ হারান কারণ অতীত তাঁকে শিখিয়েছে, সঞ্চয় শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো জরুরি ঘটনায় হারিয়ে যাবে। কেউ সামাজিক তুলনা ও তাৎক্ষণিক তৃপ্তির নকশায় আটকে যান। কেউ খরচের মাধ্যমে এমন একটি পরিচয় ধরে রাখতে চান, যা তাঁর আয়ের পক্ষে টেকসই নয়।

তাই ফিন্যান্সিয়াল নিহিলিজমকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা বললে আমরা নিষ্ঠুর হই। আবার সব দায় রাষ্ট্র, করপোরেশন বা সমাজের ওপর চাপিয়ে ব্যক্তির সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত করলে আমরা অসম্পূর্ণ হই। এই সংকট ব্যক্তি, বাজার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের সংযোগস্থলে জন্ম নেয়।

মানুষ সঞ্চয় করেন কেবল ভবিষ্যতে টাকা খরচ করার জন্য নয়। মানুষ সঞ্চয় করেন, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন ভবিষ্যতে তাঁদের একটি অর্থবহ জীবন থাকবে। সঞ্চয়কে ফিরিয়ে আনতে হলে তাই শুধু খরচ কমানোর উপদেশ দিলে হবে না। মানুষের কাছে ভবিষ্যৎকে আবার বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে।

তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ

  1. অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫। সরকারি উৎস
  2. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। জাতীয় মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য, জুলাই ২০২৬। BBS
  3. Urban Institute। Financial Nihilists or Savvy Strategists? Understanding Gen Z’s Financial Attitudes and Behaviors, ৯ জুলাই ২০২৬। গবেষণা নিবন্ধ
  4. Barrafrem, Tinghög ও Västfjäll। Behavioral and Contextual Determinants of Different Stages of Saving Behavior, ২০২৪। Frontiers in Behavioral Economics
  5. Moffett, Flannagan ও Shah। The Influence of Environmental Reliability in the Marshmallow Task: An Extension Study, ২০২০। গবেষণার সারসংক্ষেপ
  6. Consumer Financial Protection Bureau। Consumer Use of Buy Now, Pay Later and Other Unsecured Debt, জানুয়ারি ২০২৫। প্রতিবেদন
  7. Uppsala Conflict Data Program ও Uppsala University। ২০২৫ সালের সংঘাতসংক্রান্ত উপাত্ত, প্রকাশিত ৯ জুন ২০২৬। UCDP প্রতিবেদন

সম্পাদকীয় সতর্কতা: এই নিবন্ধটি আর্থিক আচরণ, সমাজ ও মনোবিজ্ঞান নিয়ে সাধারণ বিশ্লেষণ। এটি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ, ঋণ, চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পেশাগত পরামর্শ নয়। ব্যক্তির আর্থিক সিদ্ধান্ত আয়, দায়, ঝুঁকি, পারিবারিক পরিস্থিতি ও স্থানীয় বিধিবিধান অনুসারে ভিন্ন হতে পারে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!