দত্ত পরিবার | পর্ব ০৭: শিকড়ে ফেরার পথ

মায়ের চিকিৎসার জন্য স্নেহাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামে ফেরে হাসান। কিন্তু শৈশবের পরিচিত পথ, মাটির বাড়ি এবং মানুষের উষ্ণতার আড়ালে অপেক্ষা করছে বিস্মৃত ইতিহাসের একটি পুরোনো ডাক।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ১
দত্ত পরিবার | পর্ব ০৭: শিকড়ে ফেরার পথ
সূর্যাস্তের আলোয় পুকুর, ধানক্ষেত ও মাটির বাড়ির পাশে শিকড়ে ফেরার পুরোনো গ্রামীণ পথ
অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস

দত্ত পরিবার

পর্ব ০৭: শিকড়ে ফেরার পথ

লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান

‘দত্ত পরিবার’ ধারাবাহিক প্রসঙ্গে

১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা ও পরিচয়ের সংগ্রাম এবং ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত অভিঘাত বহন করে চলেছে দত্ত ভবন। একই মুখের পুনরাবৃত্তি, মুছে দেওয়া একটি নাম, সাড়ে বারোটায় থেমে থাকা ঘড়ি এবং নিষিদ্ধ পশ্চিমঘরের মধ্যে হাসান ধীরে ধীরে এমন এক ইতিহাসে প্রবেশ করছে, যেখানে জীবিত ও মৃতের সীমারেখা কোনো স্থায়ী নিয়ম মানে না।

যে বাক্যটি আমি লিখিনি

টাইপরাইটারের প্রথম চাবিটি চাপার পর আমার মনে হয়েছিল, শব্দটি আমি লিখেছি। দ্বিতীয় চাবির পর সেই বিশ্বাস সামান্য দুর্বল হলো। পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ শব্দে পৌঁছে মনে হতে লাগল, বাক্যগুলো আমার আঙুলের নিচে জন্ম নিচ্ছে না। তারা বহুদিন ধরে যন্ত্রটির ধাতব শরীরের ভেতর অপেক্ষা করছিল। আমি শুধু তাদের বেরিয়ে আসার পথ খুলে দিয়েছি।

ঘরের জানালা সামান্য খোলা। বাইরে বাগানের ওপর পাতলা কুয়াশা জমেছে। কুয়াশার মধ্যে বাঁশের মাথা ও আমগাছের ডালগুলোকে মনে হচ্ছে কালো কালিতে আঁকা অসম্পূর্ণ রেখা। দূরে কোথাও রাতজাগা পাখি একবার ডেকে থেমে গেল। তারপর আবার সেই নীরবতা। দত্ত ভবনের নীরবতা কখনো শব্দের অনুপস্থিতি নয়। এটি এমন এক অপেক্ষা, যার ভেতরে কেউ শ্বাস আটকে রাখে।

টাইপরাইটারের প্রতিটি আঘাতে ঘরের বাতাস সামান্য কেঁপে উঠছিল।

টক। টক। টক।

একসময় মনে হলো, পশ্চিমঘরের দিক থেকেও একই ছন্দে শব্দ আসছে। আমি লেখা থামালাম। সঙ্গে সঙ্গে ওদিকের শব্দও থেমে গেল।

আবার একটি চাবি চাপলাম।

টক।

কয়েক মুহূর্ত পর দেয়ালের ওপাশ থেকে একটি ভারী কাঠের আঘাত ফিরে এল।

ঠক।

আমার আঙুল অক্ষরের ওপর স্থির হয়ে রইল। পশ্চিমঘর কি আমার লেখার উত্তর দিচ্ছে, নাকি দীর্ঘ জাগরণের পর ক্লান্ত মস্তিষ্ক দুটি বিচ্ছিন্ন শব্দের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করছে?

মানুষ অন্ধকারে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় অদৃশ্য বস্তুকে নয়, নিজের ব্যাখ্যাকে।

টেবিলের বাঁ পাশে ফোনটি রাখা। মায়ের কণ্ঠ এখনো কানে বাজছে। রাতে জ্বর আসে। বুক ব্যথা করে। কিছু পরীক্ষা করাতে হবে। কথাগুলো টাইপরাইটারের শব্দের চেয়ে বেশি বাস্তব, অথচ সেই বাস্তবতার সামনে আমি সবচেয়ে অসহায়।

তার পাশে পঞ্চাশ হাজার টাকার অনাগত ঋণ। স্নেহা বলেছে, যতদিন প্রয়োজন ততদিনে শোধ করব। কথাটির মধ্যে অর্থের হিসাবের চেয়ে দীর্ঘতর কোনো সময়ের ইঙ্গিত ছিল। আমি সেটি বুঝেছি। বুঝেও এমন ভান করেছি, যেন এটি কেবল একজন চিকিৎসকের সহানুভূতি।

টাইপরাইটারের পেছনে আঁকা মানুষটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাতির আলোয় তার মুখের এক পাশ উজ্জ্বল, অন্য পাশ ছায়ায় ডুবে। ১৭১৫ সালে মৃত একজন মানুষের মুখ আমার মুখের এত কাছে কেন, সেই প্রশ্ন থেকে রক্ষা পেতে আবার লেখায় মন দিলাম।

কয়েকটি বাক্য লেখার পর চোখ ভারী হয়ে এল। কপাল টেবিলের কিনারায় ঠেকিয়ে কতক্ষণ বসেছিলাম, জানি না। ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় মনে হলো, আমার আঙুল স্থির থাকলেও টাইপরাইটারের চাবিগুলো নড়ছে।

একটির পর একটি।

খুব ধীরে।

যেন অদৃশ্য কেউ শব্দ বেছে নিতে কষ্ট করছে।

“যে নিজের শিকড় ভুলে যায়, বাড়ি একদিন তাকে ফিরিয়ে নেয়।”

বাক্যটি পড়েছিলাম কি স্বপ্নে দেখেছিলাম, নিশ্চিত হওয়ার আগেই ঘুম আমাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করল।

সকালে জেগে দেখি, জানালার ফাঁক দিয়ে আসা আলো সরাসরি আমার চোখে পড়েছে। আলোটি উজ্জ্বল নয়। পুরোনো হলুদের সঙ্গে ধূসর রং মিশে আছে। বালিশের পাশে কাগজের গন্ধ, শুকনো কালির গন্ধ এবং খুব সামান্য কর্পূরের গন্ধ।

দ্রুত টেবিলের দিকে তাকালাম।

টাইপরাইটারটি যথাস্থানে। কাগজও রোলারে আটকানো। আমার লেখা বাক্যগুলো আছে। শুধু শেষের সেই বাক্যটি নেই। সেখানে ফাঁকা সাদা জায়গা।

আঙুল দিয়ে কাগজটি ছুঁয়ে দেখলাম। যেখানে বাক্যটি থাকার কথা, সেখানে তিনটি ক্ষুদ্র চাপের দাগ। যেন অক্ষর উঠে এসেছিল, পরে কেউ কালি মুছে দিয়েছে।

দরজার বাইরে কাপ রাখার ক্ষীণ শব্দ হলো। তারপর খুব নরম কড়া নাড়া।

দরজা খুলতেই কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে ভুলে গেলাম।

স্নেহা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা জমিনের ওপর গাঢ় লাল পাড়ের শাড়ি। ভেজা চুল কাঁধ পেরিয়ে নেমে এসেছে। চুলের ডগা থেকে ছোট ছোট পানির ফোঁটা শাড়ির আঁচলে পড়ছে। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। কফির তেতো গন্ধের সঙ্গে স্নানের সাবান ও ভেজা চুলের পরিচ্ছন্ন গন্ধ মিশে ঘরের কর্পূর-কালির আবহকে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে দিল।

তাকে খুব জীবিত মনে হলো।

দত্ত ভবনে কাউকে খুব জীবিত দেখালেই আমি এখন ভয় পাই।

“এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?” সে জিজ্ঞেস করল।

“নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি।”

“কী বিষয়ে?”

“তুমি আগুনে জ্বলছ না, তোমার প্রতিবিম্ব অন্যদিকে তাকিয়ে নেই এবং হাতটি সম্ভবত স্বাভাবিক উষ্ণ।”

স্নেহা কিছু না বলে বাঁ হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আঙুল দিয়ে তার কবজি ছুঁলাম। চামড়ার নিচে নিয়মিত স্পন্দন। হাত উষ্ণ।

“পরীক্ষা শেষ?”

“আপাতত।”

সে হাত সরিয়ে নিল, কিন্তু মুখের ওপর বিরক্তির চেয়ে স্বস্তিই বেশি ছিল।

কফির কাপটি টেবিলে রেখে টাইপরাইটারের দিকে তাকাল।

“কতদূর লিখেছ?”

“গল্পের চেয়ে সন্দেহ বেশি এগিয়েছে।”

সে কাগজ পড়ার জন্য ঝুঁকতেই আমি কাপড় দিয়ে টাইপরাইটার ঢেকে দিলাম।

“লেখকের অনুমতি ছাড়া পাণ্ডুলিপি পড়া নিষেধ।”

“যে যন্ত্র নিজেই লেখা শুরু করে, তার লেখক কে, সেটি আগে নির্ধারণ করো।”

“মালিকানা ষষ্ঠ পূর্বপুরুষের সূত্রে আমার।”

“কার ষষ্ঠ পূর্বপুরুষ?”

“সকালে নাশতার আগে এত বড় প্রশ্ন করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।”

স্নেহা হাসল। তারপর মুখের হাসি সামলে টেবিলের ড্রয়ারের দিকে ইঙ্গিত করল।

“চেকটি সেখানে রেখেছি। পঞ্চাশ হাজার। নাম লিখে দিয়েছি। তারিখ বসিয়ে আজই ব্যাংকে জমা দেবে।”

গত রাতের সিদ্ধান্তটি সকালের আলোয় ভারী হয়ে উঠল। মনে হলো, ড্রয়ারের ভেতরে একটি কাগজ নয়, আমার সমস্ত অক্ষমতা ভাঁজ করে রাখা আছে।

“লিখিত হিসাব থাকবে,” বললাম।

“থাকবে।”

“আমি শোধ করব।”

“সেটিও জানি।”

“এত বিশ্বাস বিপজ্জনক।”

“আর সব সাহায্যকে অপমান মনে করা?”

তার প্রশ্নে গত রাতের কথোপকথনের ধারটি ফিরে এল। উত্তরের বদলে কফির কাপ তুলে নিলাম। তেতো স্বাদের নিচে সামান্য দারুচিনির গন্ধ। সে হয়তো খেয়াল রেখেছে, অতিরিক্ত চিনি আমি পছন্দ করি না।

মানুষ কখন অন্য একজনের জীবনে প্রবেশ করে, তা বড় কোনো ঘোষণায় ধরা পড়ে না। কখনো সে শুধু মনে রাখে, কফিতে কতটুকু চিনি লাগে।

নীল আংটি পরা নারী

নিচতলায় নামতেই রান্নাঘরের দিক থেকে গরম ভাত, ঘি ও ভাজা জিরার গন্ধ এল। করিডরের জানালা দিয়ে সকালের আলো ঢুকেছে, কিন্তু আলো মেঝের মাঝামাঝি এসে যেন শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। দেয়ালের প্রতিকৃতিগুলোর ওপর এখনো পাতলা অন্ধকার জমে আছে।

খাবার টেবিলের পাশে স্মৃতি দত্ত বসে আছেন।

সাদা শাড়ি পরা। চুল পরিপাটি করে বাঁধা। মুখে ভ্রমণশেষের ক্লান্তি। তাঁর সামনে অর্ধেক খাওয়া চা। ডান অনামিকায় নীল পাথরের আংটি সকালের আলোয় গভীর নীল হয়ে জ্বলছে।

গত সন্ধ্যায় তাঁর মুখ নিয়ে যে নারী হেলানচেয়ারে বসে কেঁদেছিলেন, তাঁর আঙুলে আংটি ছিল না। ছিল কাটা ক্ষত।

স্মৃতি দত্ত আমার দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টিতে কোনো বিস্ময় নেই। যেন তিনি জানতেন, আজ সকালে আমি ঠিক এই মুহূর্তে এসে দাঁড়াব।

“শরীর কেমন, হাসান?”

“এখনো জীবিত আছি বলে মনে হচ্ছে।”

“এই বাড়িতে অনুভূতির বদলে প্রমাণের ওপর নির্ভর করা ভালো।”

তিনি কথাটি স্বাভাবিকভাবে বললেন। আমি বুঝতে পারলাম না, এটি রসিকতা নাকি সতর্কতা।

“আপনি কখন ফিরলেন?”

“ভোরের দিকে।”

“গতকাল সন্ধ্যায় একবারও বাড়িতে আসেননি?”

চায়ের কাপের কিনারায় তাঁর আঙুল স্থির হয়ে গেল। হয়তো এক সেকেন্ডেরও কম সময়। তারপর আবার নড়ল।

“না।”

“আপনার মতো দেখতে কেউ আমাকে জঙ্গলে পাঠিয়েছিল।”

স্নেহা নিঃশব্দে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। স্মৃতি দত্তের চোখ প্রথমে আমার মুখে, তারপর স্নেহার মুখে এবং সবশেষে আমার ডান হাতের তালুতে থামল। কালচে দাগটি অনেকটাই ফিকে, কিন্তু তাঁর নজর এড়াল না।

“সে তোমাকে স্পর্শ করেছিল?”

“জড়িয়ে ধরেছিল।”

তাঁর মুখের পেশি শক্ত হয়ে উঠল।

“তার আঙুলে আংটি ছিল না,” বললাম। “এই জায়গায় কাটা দাগ ছিল।”

নীল পাথরের ওপর তাঁর বাঁ হাতের আঙুল চেপে বসল।

“ওই মুখ আবার দেখলে কাছে যেয়ো না।”

“ওই মুখ তো এখন আমার সামনে।”

“মুখ একই হলেই মানুষ একই হয় না।”

কথাটি তিনি নিজের বিষয়ে বললেন, নাকি ১৭১৫ সালের মানুষের সঙ্গে আমার সাদৃশ্য নিয়ে, বোঝা গেল না।

স্নেহা মায়ের অসুস্থতা ও চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা জানাল। পঞ্চাশ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্তও বলল। স্মৃতি দত্ত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। কোনো আপত্তি করলেন না।

“আজই চলে যাও,” তিনি বললেন।

“সন্ধ্যার মধ্যে ফেরার চেষ্টা করব।”

স্নেহা বলল, “পরীক্ষার প্রয়োজন হলে কয়েক দিনও লাগতে পারে।”

স্মৃতি দত্ত তার দিকে তাকালেন। তাঁদের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দ কোনো কথা বিনিময় হলো। তারপর তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “থাকার প্রয়োজন হলে থেকো।”

স্নেহা গাড়ির চাবি নিতে ওপরে গেলে স্মৃতি দত্ত আমাকে থামালেন।

“হাসান।”

তাঁর কণ্ঠ আগের চেয়ে নিচু।

“টাইপরাইটার সঙ্গে নিয়ো না।”

“নেওয়ার কথা ভাবিনি।”

“তার পেছনের মুখটি নিজের পরিবারের কাউকে দেখাবে না।”

“কেন?”

“একই মুখ দুই পরিবারে পাওয়া গেলে মানুষ কাকতালীয় ঘটনা মেনে নিতে পারে। তিনটি সময়ে পাওয়া গেলে পারে না।”

আমার শিরদাঁড়ার নিচ দিয়ে ঠান্ডা কিছু নেমে গেল।

“তিনটি সময় বলতে কী বোঝাচ্ছেন?”

তিনি উত্তর দিলেন না। বরং খুব ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাবার রেখে যাওয়া কাগজপত্র কোথায়?”

“গ্রামের বাড়িতে। পুরোনো আলমারিতে থাকার কথা।”

“আজ সেগুলো দেখো।”

“কী খুঁজব?”

স্মৃতি দত্তের আঙুল নীল পাথরের আংটির ওপর স্থির।

“এমন একটি নাম, যেটি তোমাদের পরিবারের কাগজে থাকার কথা নয়।”

ফিরে যাওয়ার তিন ঘণ্টা

দত্ত ভবনের লোহার ফটক পেছনে মিলিয়ে যাওয়ার পরও মনে হচ্ছিল, বাড়িটি আমাদের চলে যাওয়া দেখছে। গাড়ির পাশের আয়নায় কয়েকবার তাকালাম। প্রথমে ফটক, তারপর উঁচু গাছ এবং সবশেষে কুয়াশার ধূসর পর্দা ছাড়া কিছু দেখা গেল না।

স্নেহা গাড়ি চালাচ্ছে। দুই হাত স্টিয়ারিংয়ে। চোখ সামনে। তার মুখের ডান পাশে সকালের আলো পড়ে গালের হাড়ের নিচে কোমল ছায়া তৈরি করেছে।

গাড়ির ভেতরে কফির অবশিষ্ট গন্ধ, চামড়ার আসনের উষ্ণতা এবং স্নেহার ভেজা চুলের মৃদু সুগন্ধ। বাইরে শহরের শব্দ দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। রিকশার ঘণ্টা, বাসের হর্ন, দোকানিদের ডাক, ধাতব শাটারের শব্দ। সবকিছু ধীরে ধীরে কমে এসে ইঞ্জিনের একঘেয়ে গুঞ্জনে মিশে গেল।

“তোমার মা আমার বিষয়ে কী জানেন?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

“জানেন, আমি একটা কাজ পেয়েছি।”

“আমি কি সেই কাজের অংশ?”

“তুমি কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।”

সে হেসে ফেলল। “সঠিক পরিচয় কী দেবে?”

“চিকিৎসক। সহকর্মী। ঋণদাতা। উত্তরাধিকারসূত্রে ধনী রহস্যময় নারী। পরিস্থিতি অনুযায়ী বেছে নেব।”

“শেষের পরিচয়টি বাদ দেবে।”

“কোনটি রাখতে চাও?”

স্নেহা উত্তর দিল না। সামনের একটি ট্রাক অতিক্রম করার সময় গতি বাড়াল। বাতাসের ধাক্কায় গাড়িটি সামান্য কেঁপে উঠল।

“গতি কমাও।”

“ভয় পাচ্ছ?”

“আমি রহস্যজনক মৃত্যুর পক্ষে। সড়ক দুর্ঘটনায় গল্পের মর্যাদা নষ্ট হবে।”

সে গতি কমাল। কিছুক্ষণ পর শহরের পাকা রাস্তা সরু হলো। দুই পাশে ধানক্ষেত শুরু হয়েছে। কাঁচা সবুজের ওপর বাতাস বয়ে গেলে পুরো ক্ষেত একসঙ্গে ঢেউয়ের মতো নুয়ে পড়ছে। দূরে তালগাছগুলো স্থির প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। কোথাও কোথাও ভেজা মাটির গন্ধ গাড়ির বন্ধ কাচ ভেদ করেও ভেতরে ঢুকছে।

আমি জানালা সামান্য নামিয়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে গরম বাতাস, ধুলো, পাকা ধানের গন্ধ এবং দূরের কোনো রান্নাঘরের কাঠের ধোঁয়া ভেতরে ঢুকে পড়ল।

এই গন্ধগুলো আমি ভুলিনি। শুধু বহুদিন সেগুলোর কাছে ফিরিনি।

“চুপ হয়ে গেলে কেন?”

“রাস্তা আমাকে চিনছে কি না, বোঝার চেষ্টা করছি।”

“রাস্তা মানুষকে চেনে?”

“দত্ত ভবনের আলো যদি নিজের হাতে জ্বলতে পারে, গ্রামের রাস্তার স্মৃতি থাকলে আপত্তি কোথায়?”

স্নেহা মাথা সামান্য কাত করল। “তুমি বদলে যাচ্ছ।”

“ভালো দিকে?”

“সেটি এখনো বলা যাচ্ছে না।”

এরপর দীর্ঘ সময় আমরা কেউ কথা বললাম না। গাড়ির ভেতরের নীরবতা অস্বস্তিকর ছিল না। স্নেহা ডান হাতে স্টিয়ারিং ধরে বাঁ হাতটি মাঝখানের জায়গায় নামিয়ে রাখল। তার হাতের পিঠের ওপর সকালের আলো। কবজির কাছে খুব সূক্ষ্ম নীল শিরা দেখা যাচ্ছে।

কোনো পরিকল্পনা ছাড়া নিজের হাতটি তার ওপর রাখলাম।

সে চমকাল না। সরিয়েও নিল না। শুধু আঙুলগুলো সামান্য ঘুরিয়ে আমার আঙুলের সঙ্গে স্থির করল।

দত্ত ভবনের ভূগর্ভস্থ আর্কাইভে নামার সময় এই হাত আমাকে একটি নিচু ধাপ পার করেছিল। আজ একই হাত আমাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিচ্ছে।

তখনো জানতাম না, কোনো কোনো পথ মানুষকে শিকড়ে ফিরিয়ে নেয় না। শিকড়ের নিচে চাপা পড়া জিনিসগুলোর কাছে নিয়ে যায়।

মাটির দেয়ালের ঘ্রাণ

গ্রামের কাঁচা রাস্তায় গাড়ির চাকা উঠতেই ধুলো উড়ে পেছনে সাদা মেঘ তৈরি করল। এবড়োখেবড়ো পথের প্রতিটি গর্তে গাড়ি কেঁপে উঠছে। স্নেহা প্রথম কয়েকবার বিরক্ত মুখে স্টিয়ারিং ধরল। কিছুক্ষণ পর রাস্তার সঙ্গে সমঝোতা করে গতি কমিয়ে দিল।

আমাদের বাড়িটি দূর থেকেই দেখা গেল। মাটির দেয়াল, টিনের ছাউনি, সামনের খোলা উঠান। দক্ষিণ পাশে পুরোনো বাঁশঝাড়। উঠানের এক কোণে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পেয়ারা গাছটি এখনো বেঁচে আছে। শৈশবে গাছটিতে উঠে পড়ে গিয়ে ডান হাঁটু কেটেছিলাম। দাগটি এখনো আছে।

বাড়িটিকে আগে বিশাল মনে হতো। আজ ছোট লাগল। হয়তো বাড়ি ছোট হয়নি। আমি দূরে থাকতে থাকতে স্মৃতির ভেতর তাকে প্রয়োজনের চেয়ে বড় করে ফেলেছি।

উঠানের সামনে মা দাঁড়িয়ে আছেন। শাড়ির আঁচল মাথায়। মুখ আগের চেয়ে শুকনো। চোখের নিচে গাঢ় ছায়া। তবু গাড়িটি দেখতে পেয়ে তাঁর মুখে এমন আলো ফুটল, যা কোনো অসুস্থতা পুরোপুরি নিভিয়ে দিতে পারেনি।

গাড়ি থামতেই নেমে গেলাম। মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে বহুদিনের পরিচিত উঠানের ধুলো স্যান্ডেলের ফাঁক দিয়ে পায়ের আঙুলে লেগে গেল।

মা কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়ে রইলেন। তারপর দুই হাত দিয়ে আমার মুখ ধরলেন। তাঁর তালু শুষ্ক ও উষ্ণ। আঙুলে রান্নার হলুদ লেগে আছে।

“এত শুকিয়ে গেছিস কেন?”

দীর্ঘদিন পর দেখা হলে পৃথিবীর সব মা সম্ভবত একই অভিযোগ করেন। সন্তান চাকরি পাক, বিয়ে করুক, দেশ শাসন করুক কিংবা মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলুক, মায়ের চোখে সে প্রথমেই শুকিয়ে যায়।

“আমি ভালো আছি, মা।”

“ফোন বন্ধ ছিল কেন?”

“কাজের জায়গায় নেটওয়ার্ক ভালো নয়।”

মিথ্যাটি বলার সময় পশ্চিমঘরের দরজা, সাড়ে বারোটায় থেমে থাকা ঘড়ি, ডোবার মৃত মুখ এবং নকল স্মৃতি দত্তের কান্না মনে পড়ল। তুলনায় নেটওয়ার্কের সমস্যা বেশ গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা।

মায়ের চোখ আমার কাঁধ পেরিয়ে পেছনে চলে গেল।

স্নেহা গাড়ি থেকে নেমেছে। তার সাদা-লাল শাড়ির আঁচল বাতাসে সামান্য দুলছে। হাতে ছোট চিকিৎসার ব্যাগ। উঠানের ধুলোমাখা মাটিতে পা রাখার আগে সে জুতার দিকে একবার তাকাল। তারপর কোনো দ্বিধা ছাড়াই এগিয়ে এল।

“আদাব,” বলে মাথা নিচু করল। তারপর মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম নিল।

মা এতটাই বিস্মিত হলেন যে কয়েক মুহূর্ত হাত তুলতে ভুলে গেলেন। তারপর স্নেহার মাথার ওপর হাত রাখলেন। তাঁর আঙুল ভেজা চুলের ওপর স্থির হলো।

“তুমি স্নেহা?”

এবার বিস্মিত হওয়ার পালা আমার।

“তুমি নাম জানলে কীভাবে?”

মা আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, “তুই ঘুমের মধ্যে নাম বলিস।”

কথাটি শুনে স্নেহার চোখে হাসি ফুটল। আমার মনে পড়ল না, কোনোদিন বাড়িতে থাকার সময় তার নাম জানতাম কি না। দত্ত ভবনে যাওয়ার আগে তো স্নেহার সঙ্গে আমার পরিচয়ই হয়নি।

“কখন বলেছি?”

“অনেক বছর আগে। তখন বুঝিনি কার কথা বলিস।”

উঠানের ওপর দিয়ে এক ঝলক বাতাস বয়ে গেল। বাঁশঝাড়ে শুকনো পাতার ঘষাঘষির শব্দ উঠল।

স্নেহার মুখের হাসি ধীরে মিলিয়ে গেল।

শিহাবের চোখে অচেনা সতর্কতা

বাড়ির ভেতর থেকে পায়ের শব্দ এল। একজন তরুণ দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে উঠানে এসে দাঁড়াল। প্রথম মুহূর্তে চিনতে পারিনি। লম্বা হয়েছে। গালে হালকা দাড়ি। পরনে মলিন নীল শার্ট। চোখের ভেতর বয়সের তুলনায় বেশি সতর্কতা।

“শিহাব?”

সে কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকল। তারপর দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তার শরীরে রোদ, ঘাম ও মোটরসাইকেলের জ্বালানি তেলের মিশ্র গন্ধ।

শিহাব ছোটবেলা থেকে আমাদের বাড়িতেই বড় হয়েছে। তার মা মারা যাওয়ার পর মা তাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন। রক্তের সম্পর্কের নাম দলিলে লেখা যায়। একই হাঁড়ির খাবার, একই উঠানের ধুলো ও একই মানুষের বকুনি ভাগ করে নেওয়ার সম্পর্ক কোনো সরকারি কাগজে লেখা থাকে না।

“ভাইয়া, সত্যিই আপনি?”

“আমার মতো আর কাউকে আশা করছিলি?”

সে আমার মুখের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাল। তারপর খুব দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

“না। মানে, অনেকদিন খোঁজ ছিল না তো।”

স্নেহার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। শিহাব বিনয়ের সঙ্গে সম্ভাষণ জানাল। গাড়ি থেকে ব্যাগ নিতে গিয়ে একবার খুব মনোযোগ দিয়ে স্নেহার মুখের দিকে তাকাল। দৃষ্টিটি অসৌজন্যমূলক নয়। বরং যেন কোথাও দেখা একটি মুখ মনে করার চেষ্টা করছে।

“কোথাও দেখেছ?” জিজ্ঞেস করলাম।

“না, ভাইয়া।”

উত্তরটি প্রয়োজনের তুলনায় দ্রুত এল।

“পড়াশোনা কেমন চলছে?”

“রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দ্বিতীয় বর্ষ।”

“শুধু বই পড়িস?”

তার চোখে আবার সেই সতর্কতা।

“ক্যাম্পাসে একটু সংগঠনের কাজ করি।”

রাজনীতিতে ‘সংগঠনের কাজ’ কথাটি একটি বড় কাপড়ের মতো। এর নিচে মানুষের আদর্শ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আনুগত্য, ভয় কিংবা অপরাধ, যেকোনো কিছু ঢেকে রাখা যায়।

আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থামলাম। আজ মায়ের চিকিৎসার জন্য এসেছি। শিহাবের রাজনৈতিক জীবনের বিচার করতে নয়।

ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় সে হঠাৎ থামল।

“ভাইয়া, আপনার নামে একটা পুরোনো খাম আছে।”

“কোথা থেকে এসেছে?”

“জানি না। ডাকপিয়ন দেয়নি। একদিন সকালে দরজার নিচে পাওয়া গেছে।”

“কবে?”

“তিন-চার মাস হবে।”

“খুলেছিস?”

“না। কিন্তু খামের ওপর একটা তারিখ আছে।”

আমার বুকের ভেতর সংকোচন অনুভব করলাম।

“কী তারিখ?”

শিহাব ভ্রু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করল।

“পুরোটা পড়া যায় না। শেষের দিকে পনেরো লেখা আছে।”

স্নেহার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হলো।

১৭১৫ ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। একাধিক সালের শেষে পনেরো থাকতে পারে। কালি ছড়িয়ে গেলে সংখ্যা বদলে যেতে পারে। শিহাব ভুলও মনে রাখতে পারে।

তবু ডান হাতের তালুর কালচে দাগটিতে খুব মৃদু জ্বালা শুরু হলো।

এক উঠানে দুই বিশ্বাস

স্নেহা মায়ের রক্তচাপ মাপল। স্টেথোস্কোপ বুকে রাখার সময় মা কথা বলা বন্ধ করতে রাজি হলেন না। কখন এসেছি, কোথায় থাকি, কী খাই, স্নেহার বাড়ি কোথায়, তার বাবা-মা কে, সে ঝাল খেতে পারে কি না, সব প্রশ্ন একসঙ্গে চলল।

স্নেহা ধৈর্য ধরে উত্তর দিল। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে এমন একটি দৃষ্টি দিল, যার অর্থ সম্ভবত, তোমার প্রশ্ন করার অভ্যাস কোথা থেকে এসেছে এখন বুঝতে পারছি।

পরীক্ষা শেষে সে বলল, “কিছু পরীক্ষা করাতে হবে। কাল শহরে নিয়ে যাব। বুকের ব্যথাটা অবহেলা করা ঠিক হয়নি।”

মা অপরাধী শিশুর মতো বললেন, “টাকা লাগবে বলে বলিনি।”

কথাটি শুনে বুকের ভেতরের কোনো অংশ আবার ভেঙে পড়ল।

স্নেহা তাঁর হাত ধরল। “টাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আপনি সেটা নিয়ে ভাববেন না।”

মা প্রথমে আমার দিকে তাকালেন, তারপর স্নেহার দিকে। হয়তো তিনি বুঝলেন। কিন্তু আমার আত্মসম্মান রক্ষার জন্য কিছু বললেন না। শুধু তাঁর বৃদ্ধ আঙুল স্নেহার হাতের ওপর রাখলেন।

“তুমি কয়েক দিন থাকবে, মা?”

“প্রয়োজন হলে থাকব।”

“তোমার প্রার্থনা করতে অসুবিধা হবে না তো?”

স্নেহা কয়েক মুহূর্ত নিরুত্তর। তারপর মৃদু স্বরে বলল, “আমি খুব নিয়মিত নই।”

“নিয়মিত হও বা না হও, দরকার হলে জায়গা থাকবে। উত্তর পাশের ছোট ঘরটা পরিষ্কার করে দেব।”

স্নেহার চোখের ভেতর জল চিকচিক করেছিল কি না, নিশ্চিত নই। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে মায়ের ব্যবস্থাপত্র গুছিয়ে ফেলল।

বিকেলের দিকে দুজনকে মাটির চুলার পাশে পাওয়া গেল। জ্বলন্ত কাঠের মিষ্টি ধোঁয়ায় রান্নাঘরের চাল কালচে হয়ে আছে। হাঁড়ি থেকে নারকেল, চালের গুঁড়া ও গরম দুধের গন্ধ বের হচ্ছে। স্নেহা ভাপা পিঠার ঢাকনা তুলতে গিয়ে হাত সরিয়ে নিল। বাষ্প তার মুখের সামনে সাদা পর্দা তৈরি করল।

“স্নেহা একজন ডাক্তার,” বললাম। “তাকে দিয়ে চুলার সামনে কাজ করাচ্ছ কেন?”

মা বললেন, “ডাক্তার মানুষ খায় না?”

স্নেহা হাসতে হাসতে বলল, “চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাটির চুলার কাছে যাওয়া নিষিদ্ধ নয়।”

“তোমরা ভাপা পিঠার ক্লিনিক খোলো। আমি একটু গ্রাম ঘুরে আসি।”

স্নেহা সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলল। চুলার আগুন তার চোখের নিচে কমলা আলো ফেলেছে।

“একা যাবে?”

“এটা আমার নিজের গ্রাম।”

“নিজের জায়গাই সবসময় নিরাপদ হয়?”

প্রশ্নটির উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারলাম না। দত্ত ভবন কার নিজের জায়গা, সেই প্রশ্নই এখনো মীমাংসিত হয়নি।

“সন্ধ্যার আগে ফিরব,” বললাম। “ফোন চালু থাকবে।”

আমার কপালে কখন যে চালের গুঁড়া লেগেছে, জানি না। স্নেহা আঁচলের কোণ দিয়ে সেটি মুছে দিল। কাজটি এত স্বাভাবিকভাবে করল, যেন বহুদিন ধরে করে আসছে। তারপর নিজেই সচেতন হয়ে চোখ সরিয়ে নিল।

“দেরি করো না।”

“চিন্তা করবে?”

“ঋণগ্রহীতা হারিয়ে গেলে পঞ্চাশ হাজার টাকা ফেরত পাওয়া কঠিন।”

কথাটি রসিকতা। চোখের উদ্বেগটি নয়।

সুবর্ণ দীঘির পাড়ে

বাড়ির সীমানা পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে শৈশব আমাকে চারদিক থেকে জাপটে ধরল।

ধানের ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে সরু পথ। পায়ের নিচে শুকনো মাটির খসখসে স্পর্শ। কোথাও জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে ব্যাঙের ডাক। দূরের বাড়ি থেকে থালা-বাসন ধোয়ার আওয়াজ। গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টার ধীর শব্দ। বাতাসে পাকা ধান, কচি ঘাস, গোবরের জ্বালানি ও সন্ধ্যার রান্নার ধোঁয়া মিশে আছে।

একসময় এই পথ দিয়ে খালি পায়ে দৌড়েছি। বর্ষায় কাদায় পিছলে পড়েছি। শীতে খেজুরের রস চুরি করে খেয়েছি। মেম্বারের বাগান থেকে আম পেড়ে বন্ধুরা মিলে পালিয়েছি। তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ধরা পড়লে কতগুলো বেতের আঘাত সহ্য করতে হবে।

শৈশব আরও কিছুদিন দীর্ঘ হলে মহাবিশ্বের কী ক্ষতি হতো, বুঝি না। সময় সম্ভবত মানুষের সুবিধার জন্য কাজ করে না। সে শিশুদের বড় করে, বড়দের ঋণী করে এবং একসময় সবাইকে স্মৃতিতে পরিণত করে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এসে দাঁড়ালাম। টিনের ছাউনিতে মরচে ধরেছে। বারান্দার একটি খুঁটি বাঁকা। দেয়ালে নতুন রাজনৈতিক স্লোগানের নিচে পুরোনো বর্ণমালার রং দেখা যাচ্ছে।

এখানেই মিজান হুজুর আমাদের ইসলাম ধর্ম পড়াতেন। ভুল করলে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখতেন। আবার দুই লাইন সুন্দর করে কোরআন তিলাওয়াত করলে চোখে জল এনে বলতেন, “ধর্ম শিখবি মানুষকে বাঁচাতে। মানুষকে ছোট করতে নয়।”

তিনি নিজেকে একই সঙ্গে বাঙালি, মুসলমান ও মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দিতেন। তাঁর কথায় অভিমান ছিল, কিন্তু বিদ্বেষ ছিল না। বলতেন, কাগজ তাঁকে স্বীকৃতি দিক বা না দিক, দেশের জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার স্মৃতি তাঁর নিজের কাছে মিথ্যা হয়ে যাবে না।

তিনি চেয়েছিলেন, একদিন আমি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক হব। শিশুদের ভাষা, ধর্ম ও মানুষের মর্যাদা শেখাব।

আমি কিছুই হতে পারিনি।

চাকরিপ্রার্থী হয়েছি। অন্যের প্রতিনিধি হয়েছি। একটি মৃত পরিবারের বাড়িতে অস্পষ্ট দায়িত্বে থেকেছি। আর এখন এমন মানুষের ইতিহাস খুঁজছি, যার নাম কোনো কাগজে নেই।

সুবর্ণ দীঘির কাছে পৌঁছে দেখি, পশ্চিম আকাশ লালচে হয়ে উঠেছে। ডুবন্ত সূর্যের আলো পানির ওপর দীর্ঘ রক্তিম পথ তৈরি করেছে। পাড়ের কচুরিপানার ফাঁকে কয়েকটি সাদা ফুল। বাঁশের পুরোনো মাচাটি এখনো টিকে আছে, যদিও কয়েক জায়গায় নতুন বাঁশ বেঁধে মেরামত করা হয়েছে।

মাচার ওপর বসতে যাব, এমন সময় পেছন থেকে ভাঙা কণ্ঠে কেউ ডাকল।

“এই হাসান...”

পুরো শরীর স্থির হয়ে গেল।

অন্ধকার থেকে কেউ নাম ধরে ডাকলে উত্তর দেওয়া যাবে না। স্নেহা বলেছে। স্মৃতি দত্তও বলেছে।

কিন্তু এটি দত্ত ভবনের জঙ্গল নয়। এটি আমার শৈশবের দীঘি। এ পথের প্রতিটি বাঁক আমার পরিচিত।

তবু পেছনে তাকাতে পারলাম না।

কণ্ঠটি আবার এল। এবার আরও কাছে।

“হাসান, তুই সত্যিই ফিরে এসেছিস?”

ধীরে ঘুরে দাঁড়ালাম।

হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে একজন বৃদ্ধ মেঠোপথ ধরে এগিয়ে আসছেন। প্রতিটি পদক্ষেপের আগে লাঠিটি মাটিতে ঠেকছে। তারপর তাঁর পা এগোচ্ছে। পাঞ্জাবির নিচের অংশে ধুলো। মাথায় পুরোনো সাদা টুপি। শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে।

বয়স তাঁর মুখ বদলে দিয়েছে। চোখ দুটি বদলাতে পারেনি।

মিজান হুজুর।

আমি এগিয়ে গেলাম। গলা শুকিয়ে এসেছে। এতদিন পর দেখা হওয়ার আনন্দের নিচে অপরাধবোধের ভার।

“আসসালামু আলাইকুম, হুজুর।”

তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ক্লান্ত মুখে হাসি ফুটল।

“এবার সালামটা ঠিক হইছে।”

আমি তাঁর হাত ধরলাম। চামড়া শুষ্ক। হাড়গুলো স্পষ্ট। তবু চাপের মধ্যে পুরোনো দৃঢ়তা আছে। তাঁকে ধরে বাঁশের মাচায় বসালাম।

“আমাকে চিনলেন কীভাবে?”

“তোর মা কইল তুই আইছিস। চায়ের দোকানে না পাইয়া বুঝলাম এই দীঘির কাছে থাকবি।”

তিনি কথা বলার মাঝখানে বারবার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। একজন বৃদ্ধ শিক্ষক বহুদিন পর ছাত্রকে দেখলে যেমন তাকান, তার চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে। যেন মুখের পরিচিত রেখাগুলোর নিচে অন্য কোনো মুখ খুঁজছেন।

“কী হয়েছে, হুজুর?”

“তুই খুব একটা বদলাস নাই।”

“অনেক বছর হয়ে গেছে। বদলানোর কথা।”

তিনি আমার কথা শুনলেন কি না বোঝা গেল না। লাঠির হাতলের কাছে বাঁধা পুরোনো কাপড়ের ভাঁজ খুললেন। ভেতর থেকে মলিন বাদামি রঙের একটি খাম বের করলেন।

খামটির কিনারা ক্ষয়ে গেছে। ওপরের কালি পানিতে ভিজে ছড়িয়ে পড়েছে। মাঝখানে আমার নাম লেখা, কিন্তু লেখাটি আমার পরিচিত কারও নয়। অক্ষরগুলো পুরোনো দলিলের মতো বাঁকানো।

খামের বাঁ পাশে একটি সাল। প্রথমে আলো কম থাকায় পড়তে পারলাম না।

“এটা কোথায় পেলেন?”

“লোকনাথের চায়ের দোকানে একজন রেখে গেছিল।”

“কে?”

“নাম কয় নাই। তোর মুখের মতো দেখতে ছিল।”

দীঘির চারপাশের শব্দ এক মুহূর্তে মুছে গেল। ব্যাঙের ডাক নেই। পাখি নেই। দূরের মানুষের কথাও নেই।

শুধু নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পেলাম।

“কতদিন আগে?”

“সে হিসাব আমার মনে নাই। কিন্তু আমি লোকটারে আগেও দেখছি।”

“কোথায়?”

মিজান হুজুর দীর্ঘ সময় দীঘির পানির দিকে তাকিয়ে রইলেন। ডুবন্ত সূর্যের লাল আলো তখন প্রায় নিভে এসেছে। কালচে পানির ওপর আমাদের ছায়া পড়েছে।

দুটি নয়।

মনে হলো, আমাদের মাঝখানে তৃতীয় একটি মাথার ছায়া।

চোখের পলক ফেলতেই সেটি মিলিয়ে গেল।

মিজান হুজুর আমার দিকে ফিরে খুব নিচু স্বরে বললেন,

“একাত্তরের একটা ছবিতে।”

আমার আঙুলের ভেতর খামটি কেঁপে উঠল।

খামের কোণে ছড়িয়ে পড়া কালির নিচে এবার সালটি স্পষ্ট হলো।

১৭১৫

ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ডান হাতের তালুর কালচে দাগটি আগুনের মতো জ্বলে উঠল।

ব্যথায় হাত খুলে গেল। খামটি মাচা থেকে পিছলে দীঘির পাড়ের ভেজা মাটিতে পড়ল।

খামের ভেতর থেকে কোনো কাগজ বের হলো না।

বের হলো একটি পুরোনো সাদা-কালো আলোকচিত্র।

ছবিতে কয়েকজন মানুষ একটি মাটির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে পরিচিত বাঁশঝাড়। পরিচিত পেয়ারা গাছ।

বাড়িটি আমাদের।

ছবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের মুখটিও পরিচিত।

আমার মুখ।

তার ডান অনামিকায় একটি আংটি। সাদা-কালো ছবিতেও পাথরটির চারপাশে অস্বাভাবিক গাঢ় আভা।

ছবির পেছনে কাঁপা হাতে লেখা মাত্র একটি বাক্য।

“ছবিটি তোলার দুই শতাব্দীরও আগে মানুষটি মারা গিয়েছিল।”

দীঘির পানি থেকে আবার ঠান্ডা বাতাস উঠল। আমার পাশে বসে থাকা মিজান হুজুর খুব ধীরে বললেন,

“এবার বুঝছিস, আমি তোর এখনকার মুখের কথা বলতেছিলাম না?”

চলবে...

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রচনা-সংক্রান্ত ঘোষণা

‘দত্ত পরিবার’ একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। দত্ত পরিবার, দত্ত ভবন, ভূগর্ভস্থ আর্কাইভ, ১৭১৫ সালে মৃত নামহীন ব্যক্তি, টাইপরাইটার, সুবর্ণ দীঘি, মিজান হুজুরের কাছে পৌঁছানো খাম এবং চরিত্রগুলোর পারিবারিক যোগসূত্র সৃজনশীল নির্মাণ। ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাস্তব ইতিহাসের অংশ হলেও উপন্যাসের অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা, আলোকচিত্র ও পারিবারিক নথিকে যাচাইকৃত ঐতিহাসিক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!