দত্ত পরিবার | পর্ব ১৪: সাতচল্লিশের আগে
সীমান্তের কালি, হারানো ছয় পাণ্ডুলিপি ও সুবর্ণার সাংকেতিক নির্দেশ অনুসরণ করতে গিয়ে হাসান ফিরে দেখে অমিতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্চের চাপা স্মৃতি। এর মধ্যেই মিসেস দত্তের আহ্বান তাদের আবার দত্ত ভবনের পথে ডাকে।
অভিযাত্রী ধারাবাহিক
উপন্যাস: দত্ত পরিবার
পর্ব ১৪: সাতচল্লিশের আগে
ইতিহাসে পৌঁছানোর সবচেয়ে ছোট পথটি সাধারণত একটি সাল। কিন্তু সাল দিয়ে শুরু করলে মানুষগুলো হারিয়ে যায়। তাদের ক্ষুধা, প্রেম, ভয়, উচ্চাশা ও বিশ্বাসঘাতকতা বাদ পড়ে থাকে কেবল মানচিত্রের একটি রেখা।
কাচের মানুষটি আমার আগে হাত নামিয়ে ফেলেছিল।
খুব দ্রুত ঘটেছিল ঘটনাটি। এত দ্রুত যে চোখের ভুল বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়। বাইরে তখন ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়ায়নি। ঘরের হারিকেনও নিভিয়ে রাখা হয়নি। দুটি আলোর মাঝখানে দাঁড়ালে জানালার কাচে একাধিক প্রতিবিম্ব তৈরি হতে পারে। তার ওপর সারা রাত ঘুমাইনি। ডান বাহুর ক্ষত আবার ভিজেছে। চেয়ারম্যানবাড়িতে নিজের মুখের মতো একজনকে দেখেছি। বন্ধ দ্বিতীয় কক্ষের ভেতর থেকে এমন একটি কণ্ঠ শুনেছি, যে আমার চেয়ে আমার মুখের ইতিহাস বেশি জানে।
স্বাভাবিক ভুলের পক্ষে প্রয়োজনীয় সব যুক্তি উপস্থিত ছিল।
শুধু একটি সমস্যা ছিল।
আমি হাত নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই প্রতিবিম্বটি হাত নামিয়েছিল।
“স্নেহা।”
সে টেবিলের পাশে বসে বাদামি দাগযুক্ত কাগজটি দেখছিল। আমার কণ্ঠ শুনে মুখ তুলল।
“কী হয়েছে?”
“একবার এখানে আসুন।”
শব্দটি মুখ থেকে বের হওয়ার পর নিজেই থমকে গেলাম।
স্নেহাও থামল।
গত কয়েক মাসে আমাদের সম্বোধনের মধ্যেও একটি পথ তৈরি হয়েছিল। প্রথমে সেই পথের দুই পাশে যথেষ্ট দূরত্ব ছিল। পরে ঘটনাগুলো দূরত্ব কমিয়েছে। দত্ত ভবন, নিষিদ্ধ পশ্চিমঘর, আমার মায়ের অসুস্থতা, পঞ্চাশ হাজার টাকার লিখিত ঋণ, ডান বাহুর ক্ষত এবং অসংখ্য রাতের ভয় আমাদের দুজনকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করেছিল, যেখানে ‘আপনি’ শব্দটি মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক দেয়ালের মতো শোনাত।
তবু পুরোনো অভ্যাস ভয় পেলে ফিরে আসে। মানুষ বিপদে কখনো শৈশবে ফেরে, কখনো আনুষ্ঠানিকতায়।
স্নেহা ধীরে বলল, “আবার আপনি কেন?”
“ভয় পেলে মানুষ ভদ্র হয়ে যায়।”
“তাহলে ভয় না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব?”
তার ঠোঁটের কোণে খুব ছোট একটি রেখা উঠল। পুরো হাসি নয়। রাতের ক্লান্তির মধ্যে সামান্য আলো।
আমি বললাম, “এখানে এসো।”
সে এবার এগিয়ে এল।
শব্দটির পরিবর্তনে পৃথিবীর কিছু বদলে গেল না। কাচে একই আলো, টেবিলে একই নথি, বাইরে একই ভোর। তবু আমাদের মাঝখানের অদৃশ্য দূরত্বের একটি অংশ যেন সরে গেল।
“কী দেখেছ?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“আমার প্রতিবিম্বটা আমার আগে হাত নামিয়েছে।”
“নিশ্চিত?”
“ঘটনা যদি আমাকে নিয়ে হয়, তাহলে আমার নিশ্চিত হওয়াটাই আজকাল সবচেয়ে দুর্বল প্রমাণ।”
“তারপরও জানতে চাইলাম।”
“দেখেছি। অথবা মনে হয়েছে দেখেছি। এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি নিরাপদ, জানি না।”
স্নেহা কাচের সামনে দাঁড়াল। প্রথমে ডান হাত তুলল। প্রতিবিম্বও তুলল। তারপর হাত নামাল। একই সঙ্গে নামল। সে বাঁ হাত তুলল, মাথা ঘোরাল, সামনে ঝুঁকল, দ্রুত পেছনে সরে এল। প্রতিটি নড়াচড়া স্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত হলো।
“কাচে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখছি না,” সে বলল।
“সমস্যা তাহলে আমার।”
“আমি সেটাও বলিনি।”
সে জানালার কাঠ, কাচের কোণ এবং বাইরে পড়া আলো পরীক্ষা করল। কাচটি সাধারণ জানালার কাচ। বাইরে উঠোন, আমগাছ, ভাঙা চেয়ার এবং বাঁশের বেড়া। গাছের একটি ডাল বাতাসে নড়ছে। সেটির ছায়া কাচের বাঁ দিকে পড়ে মানুষের কাঁধের মতো একটি রেখা তৈরি করছে।
স্নেহা হারিকেনটি জানালার ডান পাশে রেখে বলল, “এখানে দাঁড়াও।”
আমি তার পাশে দাঁড়ালাম। কাচে আমাদের দুজনের প্রতিবিম্ব। হারিকেনের আলো সরাতেই আমগাছের ডালের ছায়া আমাদের মাঝখানে তৃতীয় একটি আকৃতি তৈরি করল।
স্নেহা আলো আবার সরাল। ছায়াটি মিলিয়ে গেল।
“আলোর বিভ্রম সম্ভব,” সে বলল। “তোমার হাত আগে নামার ঘটনাও ক্লান্তি, ভিন্ন প্রতিফলন বা চোখের সাময়িক ভুল হতে পারে।”
“তুমি বিশ্বাস করছ না?”
“বিশ্বাস আর নথিভুক্ত করা এক নয়। তুমি যা দেখেছ, সেটা লিখে রাখব। ব্যাখ্যা এখনই ঠিক করব না।”
“সবকিছুকে প্রমাণে পরিণত করছ।”
“কারণ তোমাদের সবাই গল্প বলতে ভালোবাসো। পরে গল্পই সত্যের জায়গা নিয়ে নেয়।”
মাথার ভেতর হঠাৎ অন্ধকার জমল। জানালার কাঠ ধরতে গিয়ে ডান হাতে চাপ পড়ে গেল। ক্ষতের ভেতর ধারালো ব্যথা ছড়িয়ে উঠল। ভারসাম্য হারিয়ে সামনে ঝুঁকতেই স্নেহা আমাকে ধরে ফেলল।
তার এক হাত আমার কাঁধে, অন্যটি বুকের পাশে। মুখ এত কাছে যে তার শ্বাসের উষ্ণতা টের পেলাম। চুলের সঙ্গে কর্পূর, ধুলো এবং অল্প কোনো পরিচিত তেলের গন্ধ।
কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বললাম না।
আমি বললাম, “নিজের প্রতিবিম্বের কাছে হারার আগে তোমার হাতে ধরা পড়লাম।”
“চুপ থাকো।”
“তুমি ধরে রাখলে দাঁড়ানো সহজ।”
স্নেহা হাত সরিয়ে নিল। আমি আবার দুলে উঠতেই সে কনুই ধরে সামলে দিল।
“রসিকতা করে ব্যথা কমে?”
“কিছু ব্যথা বোঝা যায় না বলে রসিকতা করি।”
“সবকিছু নিয়ে?”
“যেগুলো নিয়ে বেশি ভয় পাই, সেগুলো নিয়ে বেশি।”
স্নেহার চোখে প্রশ্ন এল। সে প্রশ্ন করল না। দৃষ্টি নামিয়ে আমার ব্যান্ডেজের দিকে তাকাল।
“আবার রক্ত বের হয়েছে। বসো।”
আমি বিছানার ধারে বসলাম। সে চিকিৎসার বাক্স খুলে পুরোনো ব্যান্ডেজ কাটতে শুরু করল। কাপড় খুলে আসার সঙ্গে সঙ্গে শুকনো রক্তের ধাতব গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। ক্ষতের কিনারা লাল। গভীর অংশ বন্ধ হচ্ছে, কিন্তু চেয়ারম্যানবাড়ির করিডরে দৌড়ানোর চাপ ভালো হয়নি।
“কাল রাতে তোমাকে সামনে যেতে নিষেধ করেছিলাম,” স্নেহা বলল।
“লোকটা আমার মুখের মতো ছিল।”
“তাই বলে তোমার আহত হাত নতুন হয়ে যায়নি।”
“তুমি হলে যেতে না?”
তুলা ক্ষতের কাছে ছোঁয়াতেই শরীর শক্ত হয়ে গেল। স্নেহা হাত থামাল না।
“আমি গেলে আগে ভাবতাম, পেছনের প্রমাণগুলো কে দেখবে।”
“তুমি হিসাব করে সাহস দেখাও?”
“হিসাব না করে বিপদে যাওয়া সাহস নয়।”
“তাহলে কী?”
“কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ধীর সংস্করণ।”
সাহস সব সময় দরজা ভাঙে না। কখনো সাহস দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্বীকার করে, ভেতরে কী আছে তা এখনো জানা হয়নি।
নতুন ব্যান্ডেজ জড়ানোর সময় স্নেহা বলল, “সুবর্ণার লেখাটা নিজের কাছে রেখেছি বলে রাগ করেছ?”
“না।”
“মিথ্যা।”
“ঠিক আছে, করেছি।”
“কেন?”
“লেখাটা আমার বইয়ের ভেতর ছিল।”
“লেখাটা তোমার ছিল না।”
“স্মৃতিটা আমার।”
স্নেহা গিঁট বাঁধা থামাল।
“স্মৃতি আর মালিকানা একই জিনিস?”
“দত্ত পরিবারের মধ্যে থেকে মনে হচ্ছে কোনো কিছুর মালিকানাই সরল নয়।”
“তবু তুমি সবকিছু নিজের কাছে রাখতে চাও।”
“সব নয়।”
“আর কী নিজের কাছে রাখতে চাও?”
প্রশ্নটি প্রমাণ নিয়ে ছিল না।
আমি তার আঙুলের দিকে তাকালাম। বাঁ হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। ছুঁইনি।
“যে জিনিসকে নিজের বললে হারানোর ভয় বাড়ে, তার নাম না দেওয়াই ভালো।”
স্নেহার হাত স্থির হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পর সে বাক্স বন্ধ করে বলল, “নাম না দিলেও জিনিস হারায়।”
সে টেবিলের কাছে গিয়ে নোটবুক খুলল। গত রাতে লেখা দুটি তালিকার নিচে তৃতীয় একটি শিরোনাম যোগ করল:
যাচাই না করে যা বিশ্বাস করা যাবে না
১. ছেঁড়া জুতার মানুষটির বক্তব্য।
২. দ্বিতীয় কক্ষের অজ্ঞাত পুরুষকণ্ঠের পরিচয়।
৩. সীমান্তের কালি সম্পর্কে মিসেস দত্তের ব্যাখ্যা।
৪. পাঁচ, এগারো ও সাতচল্লিশের অর্থ।
৫. হাসানের অসম্পূর্ণ স্মৃতি।
৬. মুখসদৃশ ব্যক্তিকে দেখার ঘটনার পূর্ণ ব্যাখ্যা।
“আমার স্মৃতিকে আলাদা করে অপমান করতে হলো?” আমি বললাম।
“তোমার স্মৃতি প্রমাণ নয়। আমার স্মৃতিও নয়।”
“তাহলে আমরা কী নিয়ে কাজ করব?”
“যে জিনিস একই অবস্থায় আবার পরীক্ষা করা যায়। কাগজ, কালি, পাণ্ডুলিপি, সময়, অন্য সাক্ষীর বক্তব্য।”
স্নেহা রুমালের ভেতর থেকে দ্বিতীয় কক্ষের পাতাটি বের করল। পাতার বাঁ কোণে গাঢ় বাদামি দাগ। পূর্ববঙ্গের তালিকায় `...নাথ দত্ত` জীবিত। পশ্চিমবঙ্গের তালিকায় একই অসম্পূর্ণ নাম মৃত এবং উত্তরাধিকার হস্তান্তরিত।
একই মানুষ কি না আমরা জানি না। একই নামও সম্পূর্ণ নয়। তবু কোনো এক সিদ্ধান্তের ফলে সীমান্তের দুই পাশে দুটি বিপরীত সত্য লিখিত হয়েছে।
স্নেহা পাতাটি আলোর দিকে ধরে বলল, “দুটি আলাদা ধরনের কালি দেখা যাচ্ছে।”
“কীভাবে বুঝলে?”
“মূল লেখার কালি গাঢ়। নাম মুছে দেওয়ার অংশ বাদামি। আর দাগটি ভাঁজের দুই পাশে ছড়িয়েছে। কাগজ ভাঁজ করার সময় দাগ ভেজা ছিল।”
“রক্ত নয়?”
“দেখে রক্ত বলা যাবে না। আবার পরীক্ষা ছাড়া কালি বলাও যাবে না।”
“মিসেস দত্ত বলেছেন, তাদের পরিবার একে সীমান্তের কালি বলত।”
“সেটা কোনো রাসায়নিক নাম নয়। পারিবারিক পরিভাষা হতে পারে। এমন নথির নামও হতে পারে, যেখানে সীমান্তের পরে পরিচয় বদলানো হয়েছিল।”
“নাকি মানুষকে বদলে দেওয়া হয়েছিল?”
“পাতাটি তা প্রমাণ করছে না।”
সে কাগজটি পৃথক খাপে রেখে তারিখ, সময় ও প্রাপ্তিস্থান লিখল। তারপর ‘চেয়ারম্যানবাড়ির রাত’ খাতাটি খুলল।
আমরা জানি খাতাটি পুরো জাল নয়। আবার এটিও জানি, এর মধ্যে এমন কথোপকথন আছে যা আমার প্রত্যক্ষভাবে শোনার কথা নয়। এই দুই সত্যকে একসঙ্গে রাখতে হবে।
স্নেহা পৃষ্ঠাগুলো গুনল। লেখার ধরন, কালির রং এবং কাগজের ক্ষয় দেখে তিনটি ভাগ করল। কোনো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়, কেবল পর্যবেক্ষণ।
প্রথম ভাগে আঠারো বছর বয়সের ঘটনার বিবরণ। দ্বিতীয় ভাগে চেয়ারম্যানবাড়ির ভেতরের এমন কথোপকথন, যা আমি শুনিনি। তৃতীয় ভাগে পরবর্তী মন্তব্য, যেখানে কয়েকটি বাক্যের ভাষা আমার বর্তমান লেখার মতো।
“তিন সময়ে লেখা হতে পারে,” স্নেহা বলল।
“একজন লিখেছে?”
“জানি না। তোমার হাতের লেখা বলেই তোমার লেখা ধরে নেব না। আবার তোমার মনে নেই বলেই অন্যের লেখা বলব না।”
“তুমি কোনো উত্তরই দাও না।”
“ভুল উত্তর দিয়ে স্বস্তি দেওয়ার চেয়ে উত্তর না দেওয়া ভালো।”
আমরা ১০১টি পাণ্ডুলিপির তালিকা সামনে রাখলাম। ছয়টি অনুপস্থিত। কিন্তু অনুপস্থিত মানেই ছয়টি ফাঁকা জায়গা নয়। আগের তালিকা থেকে সংখ্যাগুলো ঘষে সরানো হয়েছে কি না, সেটিও এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। তাই অনুমানকে তথ্য বানালাম না।
এডগার অ্যালান পো-র বইটি খুলে সুবর্ণার চিহ্নগুলো আবার দেখলাম।
পাঁচ।
এগারো।
সাতচল্লিশ।
আর সতর্কতা:
“সাতচল্লিশ দিয়ে শুরু কোরো না। একটি দেশ ভাগ হওয়ার আগে মানুষকে শেখানো হয়, পাশের মানুষটি আর তার মতো নয়। সেই শেখানোর ইতিহাস খুঁজে না পেলে সীমান্তের ইতিহাস বুঝবে না।”
“পাঁচ ও এগারো সাল হতে পারে,” আমি বললাম। “১৯০৫ আর ১৯১১।”
“হতে পারে,” স্নেহা বলল। “আবার পাণ্ডুলিপি, পৃষ্ঠা বা মানুষের সংখ্যাও হতে পারে।”
“সাতচল্লিশের সঙ্গে বাংলা ভাগের সম্পর্ক এত সরাসরি যে অন্য অর্থ ভাবা কঠিন।”
“সুবর্ণা হয়তো এই সরাসরি অর্থ ধরেই তোমাকে সতর্ক করেছে। তুমি যেন ঘটনার আগে ফলাফল দিয়ে শুরু না করো।”
“তুমি সুবর্ণাকে আমার চেয়ে বেশি বুঝতে শুরু করেছ?”
“আমি তার লেখাটা পড়ছি। তুমি তার সঙ্গে তর্ক করছ।”
“অনুপস্থিত মানুষের সঙ্গে তর্কে সুবিধা আছে। সে নতুন যুক্তি দিতে পারে না।”
“তবু তুমি জিতছ না।”
কথাটি শুনে হেসে ফেললাম। স্নেহাও ঠোঁটের কোণে হাসি চাপল।
বইয়ের যে পাতায় পাঁচের চিহ্ন ছিল, সেখানে একটি বাক্যের নিচে খুব ছোট আরেকটি দাগ দেখা গেল। সরাসরি পড়লে কোনো অর্থ নেই। কিন্তু পাতাটি আলোয় কাত করলে দেখা যায়, দাগটি তীরের মতো একাদশ পাতার দিকে নির্দেশ করছে।
আমরা একাদশ পৃষ্ঠা খুললাম।
সেখানে প্রকাশিত লেখার নিচে পেন্সিলে কয়েকটি নামের আদ্যক্ষর। পাশে জেলার নাম, পারিবারিক পেশা, শিক্ষার মাধ্যম এবং আবাসনের অবস্থা নিয়ে ছোট নোট।
একটির পাশে লেখা, কৃষক পরিবারের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া সদস্য।
আরেকটির পাশে, শহরে নিজস্ব বাসা, রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান।
আরেকজন মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে এসেছে। অন্যজন ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছে। একজন ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের। একজন ছোট ব্যবসায়ীর সন্তান। একজনের পরিবারের পক্ষে মাসে টাকা পাঠানো সম্ভব। অন্যজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়।
ওপরে লেখা:
সম্ভাব্য পাঠচক্র
আমার হাতের লেখার মতো একটি মন্তব্য:
“একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সবাই একই সুযোগ পায় না। তবে প্রথমবার তারা দেখতে পায়, তাদের অসমতা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়।”
নিচে সুবর্ণার হাতের লেখা:
“দেখা আর বোঝা এক নয়। একই ঘরে বসানো আর সমান করা তো নয়ই।”
আরেক পাশে তৃতীয় হাতের লেখা:
“একই মঞ্চে দাঁড়ালেও সবার বাড়ি ফেরার পথ সমান দীর্ঘ নয়।”
বাক্যটি পড়তেই মাথার ভেতর দূরের গিটারের শব্দ উঠল।
আলোয় ভরা একটি মঞ্চ।
দর্শকদের গুঞ্জন।
পুরোনো একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। নামটি এখনো স্মৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে। আমি স্থাপত্যের রেখা মনে করতে পারি, আবাসিক ভবনের জানালা, বড় মাঠ, দেয়ালে পোস্টার, বিভিন্ন জেলার উচ্চারণ এবং রাত পর্যন্ত চলা রাজনৈতিক তর্ক। কিন্তু নামটি মনে করতে গেলেই ছবির ওপর অন্ধকার পড়ে।
মঞ্চে অমিত দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে গিটার। সাদা আলো তার চোখের কাছে এসে থেমেছে। দর্শকদের কেউ গানের নাম বলে উঠেছিল।
‘বাবা বলে ছেলে নাম করবে’।
বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর পরিচিত গান। চলচ্চিত্রটি তখন নতুন ছিল না। গানটির স্বপ্ন, পারিবারিক প্রত্যাশা ও অজানা ভবিষ্যতের আবহ প্রজন্ম পেরিয়েও তরুণদের মধ্যে বেঁচে ছিল।
অমিত প্রথমে হেসেছিল।
মঞ্চের আলোয় সেই হাসি আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছিল। গিটারের তালে শরীর সামান্য দুলছিল। সামনের সারির কয়েকজন বন্ধু হাততালি দিচ্ছিল। কেউ প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, কেউ সরকারি চাকরির, কেউ ব্যবসার, কেউ রাজনীতির। প্রত্যেকেই ভবিষ্যৎকে এমনভাবে কল্পনা করছিল, যেন সেটি সবার জন্য সমান জায়গা নিয়ে অপেক্ষা করছে।
সুবর্ণা আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে হাততালি দেয়নি।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “গান পছন্দ হয়নি?”
সুবর্ণা মঞ্চের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “গান পছন্দ। হাসিটা না।”
“অমিতের হাসিতেও রাজনীতি খুঁজবে?”
“তুমি দর্শকের হাততালিতেও সংগঠন খুঁজছ।”
“মানুষকে এক জায়গায় আনতে হয়।”
“একটি পরিচিত গান একসঙ্গে শুনলেই মানুষ এক হয়?”
“শুরুর জন্য যথেষ্ট।”
“তোমার প্রতিটি শুরু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার দিকে যায় কেন?”
উত্তর দেওয়ার আগেই অমিতের কণ্ঠ বদলে গিয়েছিল।
পরিচিত আশাবাদী সুরের মধ্যে হঠাৎ ছোট একটি বিরতি। অমিতের আঙুল গিটারের তারে স্থির। দর্শকদের গুঞ্জন নিভে গেল। সে মাথা সামান্য নিচু করল।
কয়েক মুহূর্ত পর সুর আবার শুরু হলো। কিন্তু কণ্ঠে আগের হাসি রইল না। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে পরিচিত স্বপ্ন দর্শকেরা আনন্দ হিসেবে শুনছিল, সেটিই তার গলায় এসে এমন এক মানুষের চাপা স্বীকারোক্তি হয়ে উঠল, যার জন্য অন্যরা ইতিমধ্যেই ভবিষ্যৎ ঠিক করে রেখেছে।
গান শেষ হলে সবাই দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছিল।
অমিত মাথা নিচু রেখে হাসছিল।
সুবর্ণা বলেছিল, “মানুষ কাঁদলে তুমি বুঝতে পারো। হাসির মধ্যে ব্যথা রাখলে বুঝতে পারো না।”
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি বুঝেছ?”
সে আমার দিকে তাকায়নি।
“আমি অন্তত দেখেছি।”
স্মৃতি কেটে গেল।
দেখি স্নেহা আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তার বাঁ হাত আমার কাঁধে।
“কোথায় চলে গিয়েছিলে?”
“মঞ্চে।”
“অমিতের?”
মাথা নাড়লাম।
“গানের নাম মনে পড়েছে?”
“‘বাবা বলে ছেলে নাম করবে’।”
“দ্বিতীয় কক্ষ থেকে এই গানের সুরই শুনেছিলে?”
চোখ বন্ধ করে স্মৃতির শব্দগুলো আলাদা করার চেষ্টা করলাম। দরজার ভেতরের আঁচড়। ধাতব আঘাত। তারপর তিনটি পরিচিত স্বর।
“একই সুরের অংশ বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত অমিত যেখানটায় থেমেছিল, তার আগের অংশ। তবে আমি নিশ্চিত নই।”
স্নেহা কথাগুলো ঠিক এই ভাষায় নোট করল। ‘নিশ্চিত নয়’ অংশটিও বাদ দিল না।
দ্বিতীয় কক্ষ থেকে শোনা তিনটি পরিচিত সুর অমিতের বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ-পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ভেতরে অমিত ছিল, পুরোনো কোনো রেকর্ড বাজানো হয়েছিল, নাকি হাসানের স্মৃতি সক্রিয় করার জন্য অন্য কেউ সুরটি ব্যবহার করেছে, তা এখনো অজানা।
আমরা একাদশ পৃষ্ঠার পাঠচক্রের দিকে ফিরে গেলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশ নামও মুছে ফেলা। কিন্তু তাদের সামাজিক অবস্থান নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
“তোমরা কী করতে চেয়েছিলে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“যতটুকু মনে পড়ছে, বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম, অঞ্চল ও শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা।”
“কেন?”
“একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও সবার বাস্তবতা এক নয়। কেউ হলে থেকে টিউশন করে বাড়িতে টাকা পাঠায়। কেউ পরিবারের গাড়িতে আসে। কেউ নিজের আঞ্চলিক উচ্চারণ লুকায়। কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সব সময় প্রমাণ করতে থাকে, সে বিপজ্জনক নয়। কেউ রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান বলে ব্যর্থ হলেও সুযোগ পায়। অন্য কেউ মেধাবী হয়েও সুপারিশ ছাড়া দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।”
“তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় সমতা আনে না?”
“জানি না। একই জায়গায় আসার সুযোগ দেয়।”
“সেটা সমতা নয়।”
“না। কিন্তু অসম মানুষগুলো প্রথমবার একে অন্যকে দেখতে পায়। সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।”
“দেখে কী করে?”
“কেউ বন্ধু হয়। কেউ প্রেমে পড়ে। কেউ সংগঠন করে। কেউ অন্যের দুর্বলতা শিখে তাকে ব্যবহার করে।”
“তুমি কোনটা করেছিলে?”
“সম্ভবত সবগুলোই কিছুটা।”
স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
“সুবর্ণাকে ভালোবেসেছিলে, নাকি হারাতে চেয়েছিলে?”
প্রশ্নটি এত সরাসরি যে কয়েক মুহূর্ত উত্তর খুঁজে পেলাম না।
“কিছু মানুষকে হারাতে গেলে আগে খুব কাছে যেতে হয়,” বললাম।
“এটা উত্তর নয়।”
“যেটা ছিল, তার নাম তখনও দিইনি। এখন দিলে মিথ্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে।”
“তুমি সব সম্পর্ককে নামহীন রাখো?”
“নাম দিলে হারানোর ভয় বাড়ে।”
“আর নাম না দিলে অন্য মানুষটি জানেই না, সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।”
স্নেহা কথাটি বলে জানালার দিকে তাকাল। সকালের আলো এখন পরিষ্কার। কাচে আমাদের দুজনের অবয়ব। কোনো তৃতীয় ছায়া নেই।
“তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
“তোমার সামনে,” শেষ পর্যন্ত বলল। “কিন্তু তোমার পাশে থাকব কি না, সেটা তোমার সত্য বলার ওপর নির্ভর করবে।”
“যদি সত্য বললে তুমি চলে যাও?”
“আগে সত্য বলো। থাকার সিদ্ধান্তটা আমার।”
একজন মানুষের চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিজের হাতে না থাকা ক্ষমতালোভী মানুষের জন্য কঠিন শিক্ষা।
আমরা দুপুর পর্যন্ত নথি মিলিয়ে গেলাম। নতুন কোনো নিশ্চিত পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেল না। পাঁচ, এগারো ও সাতচল্লিশের পূর্ণ অর্থও জানা গেল না। তবে সুবর্ণার নির্দেশ সম্পর্কে একটি সম্ভাব্য কাঠামো তৈরি হলো।
সম্ভাব্য অনুসন্ধানক্রম
১. পাঁচ হয়তো মানুষ, দলিল, পাণ্ডুলিপি বা ১৯০৫ সালের স্তর নির্দেশ করে।
২. এগারো হয়তো ১৯১১, পৃষ্ঠা, নথি বা পাঠচক্রের অন্য স্তর নির্দেশ করে।
৩. সাতচল্লিশের সঙ্গে বাংলা ভাগের সম্পর্ক শক্তিশালী, কিন্তু সরাসরি সেখান থেকে শুরু করলে পূর্ববর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হারিয়ে যাবে।
৪. কোনো অর্থই এখনো যাচাইকৃত নয়।
দুপুরের পর শিহাব এল। চেয়ারম্যানবাড়ির দিকে নজর রাখতে গিয়ে সে কয়েকটি নতুন পর্যবেক্ষণ এনেছে, কিন্তু কোনো চূড়ান্ত উত্তর নয়।
দ্বিতীয় কক্ষের বাইরের দরজা আগের মতো বন্ধ। তালার অবস্থাও বদলায়নি। বাড়ির পেছনে নিশ্চিত গোপন পথ সে খুঁজে পায়নি। ভাঙা দেয়াল, পুরোনো নালা ও গাছের শিকড় আছে, কিন্তু মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করেছে এমন প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ পূর্বের শব্দ শুনে গোপন পথ আছে বলে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেটি এখনো শুধু সম্ভাবনা।
শিহাব আরও জানাল, ছেঁড়া জুতার মানুষটিকে গ্রামের দুজন আলাদা নামে চেনে। একজন বলে বহু বছর আগে তাকে অন্য গ্রামে দেখা গেছে। অন্যজন দাবি করে, তার বাবা ছোটবেলায় একই রকম একজনকে দেখেছিলেন।
কোনো বক্তব্যের পক্ষে নথি নেই।
“মানে মানুষটা বয়স বাড়ায় না?” আমি বললাম।
স্নেহা বলল, “মানে একই বর্ণনা বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অতিপ্রাকৃত সিদ্ধান্তে যেও না।”
শিহাব আমার ব্যান্ডেজের দিকে তাকাল।
“আপনি আবার দৌড়েছিলেন?”
স্নেহা বলল, “তুমি ওকে আপনি বললে ও আবার ভদ্র হয়ে যাবে।”
শিহাব আমাদের দুজনের দিকে তাকাল। মুখে এমন একটি ভাব, যেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বুঝেছে কিন্তু বেঁচে থাকার স্বার্থে বলবে না।
“ঠিক আছে,” সে বলল। “তুমি আবার দৌড়েছিলে?”
“এই পরিবর্তনের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।”
স্নেহার চোখে আবার সেই ছোট হাসি দেখা দিল।
বিকেলে অমিতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলো। ফোন বন্ধ। শিহাবের পরিচিত একটি সাংগঠনিক যোগাযোগও তার বর্তমান অবস্থান জানে না। তবে কেউ অমিতকে নিখোঁজ বলছে না। সে ইচ্ছা করেই যোগাযোগ এড়িয়ে যাচ্ছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।
অমিতের গান, দ্বিতীয় কক্ষের তিনটি সুর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠচক্র, তিনটি তথ্য এখন একই কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরছে। কিন্তু কেন্দ্রটি কী, তা আমরা জানি না।
সন্ধ্যার আগে স্নেহা আবার সীমান্তের কালির পাতাটি পরীক্ষা করছিল। আলো কমে গেলে দাগটির রং বদলে গাঢ় দেখায়। সে হারিকেন কাছে আনল না। অতিরিক্ত তাপে কাগজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
“নামটা কেন একই জায়গা থেকে মুছে ফেলা?” সে বলল।
“একই মানুষের পরিচয় লুকাতে।”
“অথবা দুই নথিকে একই মানুষের বলে মনে করাতে।”
আমি থেমে গেলাম।
এতক্ষণ আমরা ধরে নিয়েছিলাম, একই অসম্পূর্ণ নাম মানে একই মানুষ। কিন্তু নামের একই অংশ মুছে দিয়ে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দুটি আলাদা মানুষকেও একই পরিচয়ের বলে দেখাতে পারে।
এটি নতুন রহস্য নয়। পুরোনো অনুমানের ভাঙন।
`...নাথ দত্ত` একজনও হতে পারেন। একাধিক মানুষও হতে পারেন। অথবা এমন একটি ব্যবহৃত পরিচয়, যা প্রয়োজন অনুযায়ী দুই পাশে বসানো হয়েছে।
“মিসেস দত্ত জানেন,” আমি বললাম।
“হয়তো জানেন। আবার তিনিও পরিবারের পাওয়া ব্যাখ্যা বিশ্বাস করছেন।”
“তুমি তাকে বিশ্বাস করো না?”
“যিনি আমাদের না দেখে পৃষ্ঠার দাগের অবস্থান জানেন, তাকে অবিশ্বাসও করছি না। আমি জানতে চাই, তিনি এত কিছু জানলেন কীভাবে।”
সন্ধ্যা নেমে এলে বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘরে হারিকেন জ্বালানো হলো। শিহাব বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। স্নেহা পাশের ঘরে যাবে।
দরজার কাছে গিয়ে সে বলল, “আজ কাচের সামনে একা দাঁড়িয়ো না।”
“তুমি পাশে থাকলে?”
“তাহলে কাচে না তাকিয়ে আমার দিকে তাকাবে।”
কথাটি বলে সে নিজেই যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। দ্রুত দরজার দিকে ঘুরল।
আমি বললাম, “এই নির্দেশটা প্রমাণ সংরক্ষণের অংশ?”
“না। তোমার অপ্রয়োজনীয় রসিকতা কমানোর চেষ্টা।”
“সফল হবে না।”
“জানি।”
সে দরজা বন্ধ করার আগে আবার বলল, “অন্ধকার থেকে আমার কণ্ঠ শুনলেও দরজা খুলবে না। আগে তিনবার ডাকবে।”
পূর্বের সতর্কতা ফিরে এল। অন্ধকার থেকে কেউ নাম ধরে ডাকলে সেটি স্নেহা নয়।
“তারপর?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“আমি এমন কিছু বলব, যা শুধু আমরা জানি।”
“আমাদের তেমন কী আছে?”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলল, “তুমি ধরে রাখলে দাঁড়ানো সহজ।”
আমার বুকের ভেতর শব্দ হলো।
“এটা সংকেত?”
“তোমার বাজে কথার শাস্তি।”
“তবু মনে রাখব।”
“দরকারি কথা ভুলে যাও। এগুলো ভালোই মনে রাখবে।”
দরজা বন্ধ হলো।
রাতের প্রথম ভাগ শান্ত ছিল।
হারিকেনের শিখা স্থির। জানালার কাচে কেবল আমার বসে থাকা অবয়ব। টেবিলে `...নাথ দত্ত`-এর নথি এবং সুবর্ণার চিহ্ন। মাথার ভেতর অমিতের গিটারের সেই অসম্পূর্ণ বিরতি।
রাত প্রায় দশটার দিকে উঠোনে একটি গাড়ির শব্দ হলো।
শিহাব বাইরে থেকে ডাকল। তার কণ্ঠ স্বাভাবিক, কিন্তু সতর্ক।
“হাসান, বাইরে এসো। একজন লোক এসেছে।”
স্নেহার দরজা একই সঙ্গে খুলল। তার হাতে হারিকেন এবং ব্যাগ। মনে হলো, ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়নি।
আমরা একসঙ্গে উঠোনে গেলাম।
সেখানে একটি পুরোনো সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে। ইঞ্জিন বন্ধ। চালকের আসনে মাঝবয়সী একজন মানুষ বসে আছেন। তিনি গাড়ি থেকে নামলেন না। কাচ নামিয়ে একটি সিল করা খাম এগিয়ে দিলেন।
“মিসেস দত্ত পাঠিয়েছেন,” তিনি বললেন।
“প্রমাণ?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
লোকটি আমাদের দিকে তাকাল। প্রশ্নটি হয়তো তার প্রত্যাশিত ছিল না।
“খামের ভেতরে আছে।”
“আপনার নাম?”
“রফিক।”
“কোথা থেকে এসেছেন?”
“দত্ত ভবন থেকে।”
‘দত্ত ভবন’ কথাটি শুনে বুকের মধ্যে পুরোনো ঠান্ডা অনুভূতি ফিরে এল। যে বাড়ির পশ্চিমঘর এখনো বন্ধ রহস্য ধারণ করে, যেখানে নকল মুখ এবং আসল মানুষের পার্থক্য কখনো স্থির নয়, সেই বাড়ি আবার ডাকছে।
স্নেহা খামটি সরাসরি হাতে নিল না। একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে গ্রহণ করল। লোকটি আর কিছু বলল না। গাড়ি ঘুরিয়ে অন্ধকার পথে চলে গেল।
“নম্বরটি লিখেছ?” স্নেহা শিহাবকে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ।”
ঘরে ফিরে আমরা খামটি পরীক্ষা করলাম। সামনে আমার নাম শুধু ‘হাসান’। পেছনে নীল পাথরের আংটির একটি অত্যন্ত ছোট চাপচিহ্ন। আংটির নকশা হুবহু কি না নিশ্চিত নয়, কিন্তু পরিচিত।
খাম খুলে পাওয়া গেল একটি চিঠি এবং ক্ষুদ্র একটি ধাতব পাত।
ধাতব পাতের এক পাশে তিনটি সূক্ষ্ম আঁচড়। অন্য পাশে কিছু নেই।
চিঠিটি মিসেস দত্তের হাতের লেখা বলে মনে হলো। তবে হাতের লেখা দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার মতো ভুল আমরা আবার করলাম না।
চিঠিতে লেখা:
“হাসান,
সীমান্তের কালির পাতা চেয়ারম্যানবাড়িতে রাখার জন্য তৈরি হয়নি। যে মানুষটি পূর্ববঙ্গে জীবিত এবং পশ্চিমবঙ্গে মৃত, তার প্রথম নথি দত্ত ভবনে আছে। তোমরা সাতচল্লিশে যাওয়ার আগে সেটি দেখতে হবে।
খাতাটি, পাতাটি এবং এডগার অ্যালান পো-র বইটি সঙ্গে আনবে। কোনো পাণ্ডুলিপি নয়। কোনো অস্ত্র নয়।
তুমি একা আসবে না। স্নেহাকে সঙ্গে আনবে। পাতাটি এখন তোমার চেয়ে তার কাছে নিরাপদ।
আগামীকাল সূর্য ডোবার আগে দত্ত ভবনে ফিরে এসো। পশ্চিমঘরের দরজা খোলা হবে না। তবে তার সামনে যে প্রশ্নটি প্রথম দিন থেকে পড়ে আছে, তার একটি উত্তর তোমরা পাবে।
গাড়ি পাঠাব না। নিজেরা পথ ঠিক করবে।”
নিচে স্বাক্ষর:
স্মৃতি দত্ত
অনেকক্ষণ কেউ কথা বললাম না।
মিসেস দত্ত আমাদের দত্ত ভবনে ফিরতে বলেছেন। কিন্তু তাঁর চিঠির প্রতিটি নির্দেশের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের ভাষা আছে। কোন বস্তু নিতে হবে, কোনটি নয়, কে সঙ্গে যাবে, কখন পৌঁছাতে হবে এবং কোন দরজা খোলা হবে না, সব তিনি ঠিক করেছেন।
“যাব?” আমি স্নেহাকে জিজ্ঞেস করলাম।
“তুমি কি না যেতে পারবে?”
“প্রশ্নটা তোমাকেও করা যায়।”
সে চিঠিটি আবার পড়ল।
“আমার নাম আলাদা করে কেন লিখেছেন?”
“কারণ তিনি জানেন প্রমাণ তোমার কাছে।”
“অথবা তিনি চান আমি যাই।”
“দুটো একই সঙ্গে সত্য হতে পারে।”
স্নেহা চিঠিটি খামের মধ্যে রেখে বলল, “আমরা যাব। কিন্তু তাঁর শর্তে পুরোপুরি নয়।”
“কী বদলাবে?”
“মূল প্রমাণ সঙ্গে নেব না। যাচাই করা প্রতিলিপি নেব। আসল পাতা নিরাপদ জায়গায় থাকবে। যাওয়ার পথ ও সময় আমরা ঠিক করব। শিহাব জানবে আমরা কোথায় যাচ্ছি।”
“মিসেস দত্ত বলেছেন পাতাটি সঙ্গে নিতে।”
“মিসেস দত্ত নির্দেশ দিতে পারেন। আমরা মানতেই বাধ্য নই।”
তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই।
এই প্রথম স্পষ্ট বুঝলাম, দত্ত পরিবারের ভেতরে ফিরলেও আমরা আগের মানুষ হয়ে ফিরব না। আমি আর স্মৃতি দত্তের বেছে আনা নিঃস্ব বহিরাগত মাত্র নই। স্নেহাও শুধু তাঁর পাঠানো বা তাঁর পরিকল্পনার মধ্যে থাকা কেউ নয়।
আমরা প্রশ্ন নিয়ে ফিরব।
এবং অন্তত একজন সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেলে দরজা অক্ষত রাখতে রাজি হবে না।
“তুমি ভয় পাচ্ছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“পাচ্ছি।”
“তারপরও যাবে?”
“সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়, এই ভাষণ শুনতে চাই না।”
“আমি অন্য কথা বলতে যাচ্ছিলাম।”
“কী?”
“তুমি গেলে আমার ভয় কমবে।”
স্নেহা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব নিচু স্বরে বলল, “তোমার ভয় কমানোর দায়িত্ব নিইনি।”
“তবু কমে।”
সে চোখ সরিয়ে নিল।
খামটি গুছিয়ে নিজের ব্যাগে রাখার সময় তার আঙুল আমার বাঁ হাত ছুঁয়ে গেল। দুজনের কেউ সঙ্গে সঙ্গে হাত সরালাম না। কয়েক মুহূর্ত পর স্নেহাই ধীরে হাত সরিয়ে নিল।
“ঘুমাও,” সে বলল। “কাল পথ দীর্ঘ হবে।”
“দত্ত ভবনের পথ তো চিনি।”
স্নেহা হারিকেন হাতে দরজার দিকে এগোল।
“তুমি যে বাড়িতে ফিরছ, সেটাকে চেনো কি না, আমি নিশ্চিত নই।”
দরজা বন্ধ হওয়ার পর আমি একা রইলাম।
জানালার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালাম না। টেবিলে খাম, মিসেস দত্তের নির্দেশ এবং তিন আঁচড়ের ধাতব পাতের একটি প্রতিলিপি পড়ে আছে।
দত্ত ভবনে প্রথমবার যাওয়ার সময় আমার হারানোর মতো প্রায় কিছুই ছিল না।
এবার ছিল।
নিজের নামের অসম্পূর্ণ ইতিহাস।
১০৭টি পাণ্ডুলিপির মধ্যে হারানো ছয়টি লেখা।
অমিতের গানের মধ্যে আটকে থাকা একটি রাত।
সুবর্ণার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত তর্ক।
এবং পাশের ঘরে এমন একজন মানুষ, যাকে এখনো কোনো নাম দিইনি, কিন্তু হারানোর ভয় ইতিমধ্যে শিখে ফেলেছি।
বাইরে দূরে কোনো গাড়ির শব্দ আবার শোনা গেল।
জানালার কাছে গেলাম না।
শুধু অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে গুনলাম।
পাঁচ।
এগারো।
তারপর থেমে গেলাম।
কারণ সাতচল্লিশের আগে আমাদের আবার দত্ত ভবনে ফিরতে হবে।
চলবে...
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘দত্ত পরিবার’ একটি ঐতিহাসিক উপাদাননির্ভর কাল্পনিক উপন্যাস। এতে ব্যবহৃত দত্ত পরিবার, পাণ্ডুলিপি, পারিবারিক নথি, পরিচয়-সংকট, ‘সীমান্তের কালি’, পাঠচক্র এবং চরিত্রের ব্যক্তিগত সংযোগ কাহিনির অংশ। বাস্তব ইতিহাস, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির উল্লেখ চরিত্রের অভিজ্ঞতা ও কাহিনির প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো চরিত্রের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক বক্তব্যকে লেখকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0