লেখক কেন ভয়ংকর? প্লট, মিথ্যা ন্যারেটিভ ও ম্যানিপুলেশনের অন্ধকার মনস্তত্ত্ব

সিনেমায় লেখক কেন রহস্যময়, প্ররোচক কিংবা হত্যাকারী? লেখকের কল্পনা, পর্যবেক্ষণ ও ভাষার শক্তি কীভাবে বাস্তব জীবনে বিষাক্ত ন্যারেটিভ ও ম্যানিপুলেশনে রূপ নিতে পারে?

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৬
লেখক কেন ভয়ংকর? প্লট, মিথ্যা ন্যারেটিভ ও ম্যানিপুলেশনের অন্ধকার মনস্তত্ত্ব
রাতের অল্প আলোয় ডেস্কে বসে লিখছেন এক লেখক; সামনে ছড়ানো পাণ্ডুলিপি, বই ও টাইপরাইটার, আর জানালার ওপারে কয়েকটি অস্পষ্ট মানব অবয়ব লেখকের ন্যারেটিভে বাস্তব মানুষকে চরিত্রে রূপ দেওয়ার প্রতীক

সিনেমা, ন্যারেটিভ ও মানুষের অন্ধকার প্রভাবক্ষমতা

লেখক কেন ভয়ংকর? প্লট, মিথ্যা ন্যারেটিভ ও ম্যানিপুলেশনের অন্ধকার মনস্তত্ত্ব

একজন মানুষ একা থাকেন। শান্ত পরিবেশ তার পছন্দ। শব্দ নির্বাচনে তিনি সূক্ষ্ম, মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণে তীক্ষ্ণ এবং নিজের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু প্রকাশ করেন না। তাকে সহজে বিচলিত হতে দেখা যায় না। জীবনটাও খুব রঙিন নয়। যতটুকু প্রয়োজন, তিনি যেন ঠিক ততটুকুই করেন। অথচ হঠাৎ দেখা যায়, সেই মানুষটিই কাউকে বিপদে ফেলছেন, কারও জন্য ফাঁদ তৈরি করছেন, এমনকি মানুষ খুন করতে শুরু করেছেন!

হলিউডে এমন অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যেখানে একজন লেখক মানেই তিনি সহজ মানুষ নন। তিনি ধুরন্ধর, রহস্যময়, প্ররোচক কিংবা ক্ষতিকর। কখনো তিনি হত্যাকারী, কখনো হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন, কখনো আবার এমন একটি গল্পের নির্মাতা, যে গল্প বাস্তবতার সীমানা ভেঙে অন্য মানুষের জীবনেও প্রবেশ করে।

প্রশ্ন হলো, এই চলচ্চিত্রগুলো কি নিছক বিনোদনের জন্য এমনভাবে নির্মিত? নাকি লেখকের ভেতরে থাকা বিশেষ কিছু ক্ষমতার অন্ধকার সম্ভাবনাকে চলচ্চিত্রকারেরা বহু আগেই চিনে ফেলেছেন?

একজন লেখক কেন চলচ্চিত্রের জন্য এত কার্যকর ভয়ংকর চরিত্র? কেন তাকে প্রায়ই একাকী, সংযত, রহস্যময় ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক হিসেবে দেখানো হয়? কেন তার লেখা অপরাধের সঙ্গে মিলে যায়? কেন কখনো মনে হয়, তিনি শুধু কাগজের চরিত্র নয়, বাস্তব মানুষকেও নিজের গল্পের চরিত্রের মতো পরিচালনা করতে চাইছেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত কেবল সিনেমার মধ্যে নেই। উত্তরটি লুকিয়ে আছে প্লট, ন্যারেটিভ, ভাষা, কল্পনা এবং মানুষের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করার ক্ষমতার মধ্যে।

সিনেমায় লেখক যখন সহজ মানুষ নন

১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া Basic Instinct-এর ক্যাথেরিন ট্রামেল একজন অপরাধকাহিনির ঔপন্যাসিক। একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার লেখা উপন্যাসের অস্বস্তিকর মিল পাওয়া যায়। তিনি শুধু সন্দেহভাজন নন, তিনি যেন তদন্তকারীদের আগেই জানেন, তারা কী ভাববেন, কোন দিকে তাকাবেন এবং কোন ব্যাখ্যায় আটকে যাবেন।

একজন লেখক যদি আগে থেকেই একটি অপরাধ লিখে রাখেন এবং পরে একই ধরনের অপরাধ ঘটে, তাহলে সেই লেখা কি তার বিরুদ্ধে প্রমাণ? নাকি সেটিই তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রতিরক্ষা? কারণ তিনি সহজেই বলতে পারেন, বাস্তব অপরাধী তার লেখা অনুসরণ করেছে। এখানে কল্পনা ও বাস্তবতা একে অন্যকে এমনভাবে আড়াল করে, যেন সত্যের কাছে পৌঁছাতে গেলেই আরেকটি গল্প সামনে এসে দাঁড়ায়।

২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া জনি ডেপ অভিনীত Secret Window আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে, হত্যাকারী আসলে কে? মর্ট রেইনি একজন রহস্যলেখক। নির্জন কেবিনে থাকা এই মানুষটির কাছে এক অচেনা ব্যক্তি এসে গল্প চুরির অভিযোগ তোলে। দুজনের গল্পের নাম আলাদা, কিন্তু কাহিনিতে অস্বাভাবিক মিল। চৌর্যবৃত্তি, স্মৃতি, পরিচয়, অপরাধ ও লেখকসত্তার দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে একই অন্ধকারে মিশে যায়।

২০১০ সালের The Ghost Writer-এ একজন নামহীন ঘোস্ট রাইটার সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর স্মৃতিকথা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। তিনি সরাসরি হত্যাকারী নন। বরং অন্য কারও জীবনকে গ্রহণযোগ্য গল্পে পরিণত করতে গিয়ে এমন কিছু অসংগতি ও গোপন সংযোগের মুখোমুখি হন, যা তাকে বিপদের মধ্যে টেনে নেয়। এখানে লেখকের ক্ষমতা অন্য জায়গায়। তিনি শব্দের আড়ালে লুকানো তথ্য পড়তে পারেন। কারও সাজানো আত্মজীবনী থেকে অনুপস্থিত সত্যের চিহ্ন খুঁজে বের করতে পারেন। আর সেই পথ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও গোয়েন্দা সংযোগের অন্ধকারে পৌঁছায়।

২০২১ সালের Alter Ego-তে একজন নিভৃতচারী ও সন্দেহপ্রবণ লেখক বিশ্বাস করেন, তারই কোনো সৃষ্টি তাকে ধ্বংস করতে আসছে। তার ভয় সত্য, নাকি নিজের মনের নির্মাণ, সেটি স্পষ্ট নয়। কিন্তু লেখক, তার তৈরি চরিত্র এবং সংঘটিত অপরাধের মধ্যকার সীমা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২০২২ সালের পরীক্ষামূলক টিভি চলচ্চিত্র The Chronic Adventure Story-তে লেখক স্যামুয়েল গিবসন একটি চৌর্যবৃত্তির মামলায় জড়িয়ে পড়েন। চলচ্চিত্রটির গল্প বিভিন্ন ক্রমে সাজালে ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাব্য সংস্করণ তৈরি হয়। মনে হতে থাকে, লেখক শুধু কাগজে গল্প লিখছেন না। তিনি যেন নিজের জীবনের মানুষ, ঘটনা ও সম্ভাব্য পরিণতিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন।

বলিউডের Kaun?, BaazigarKhamosh-এর মতো চলচ্চিত্রেও প্রতারণা, পরিচয় গোপন, সাজানো আত্মহত্যা, মিথ্যা ব্যাখ্যা, অপরাধ এবং মানুষের সামনে একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্করণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা যায়। এসব চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় ভয়ংকর চরিত্র লেখক নন। তাই এগুলোকে সরাসরি “খুনি লেখকের চলচ্চিত্র” বলা যথাযথ হবে না। তবে একটি সত্যকে আড়াল করে অন্য একটি গল্প প্রতিষ্ঠা করার যে মনস্তত্ত্ব, তা এসব চলচ্চিত্রকেও আলোচনার বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করে।

অর্থাৎ চলচ্চিত্রের এই লেখক চরিত্রটি শুধু একটি পেশার উপস্থাপন নয়। তিনি এমন একজন মানুষের প্রতীক, যিনি গল্পের কাঠামো বোঝেন, মানুষের প্রতিক্রিয়া অনুমান করতে পারেন এবং জানেন কখন কোন তথ্যটি প্রকাশ করলে পাঠক বা দর্শক কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন।

প্লটিং কিছুই নয়, আবার অনেক কিছু

একটি গল্পকে প্রাণ দেয় তার শক্তিশালী কাঠামো। চরিত্র কে, সে কী চায়, তার পথে বাধা কোথায়, কোন তথ্যটি পাঠক জানেন এবং কোন সত্যটি গোপন রাখা হয়েছে, এসবই প্লটের অংশ। একটি সাধারণ ঘটনাও সঠিকভাবে সাজানো হলে রহস্যময়, মর্মান্তিক কিংবা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

একজন লেখক মনের আকাশে এমন অনেক কিছু নির্মাণ করতে পারেন, যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি। তিনি একটি কাল্পনিক মানুষ সৃষ্টি করেন, তাকে অতীত দেন, ভয় দেন, আকাঙ্ক্ষা দেন। তারপর এমনভাবে তার জীবন সাজান যে পাঠক ওই মানুষটির জন্য কাঁদেন, তার ওপর রাগ করেন কিংবা তার মৃত্যুকে সত্যি কোনো মানুষের মৃত্যুর মতো অনুভব করেন।

এই ক্ষমতা নিঃসন্দেহে সাহিত্যিক। কিন্তু এর একটি অন্ধকার সম্ভাবনাও আছে। একজন লেখক যদি কাল্পনিক মানুষকে সত্য বলে অনুভব করাতে পারেন, তাহলে তিনি চাইলে কোনো বাস্তব মানুষকে ঘিরেও এমন একটি ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারেন, যা পুরোপুরি সত্য নয়, কিন্তু পাঠক বা শ্রোতার কাছে সত্য বলে মনে হবে।

একটি কার্যকর মিথ্যা ন্যারেটিভ সাধারণত শতভাগ মিথ্যা দিয়ে তৈরি হয় না। তার মধ্যে কিছু সত্য থাকে। বাস্তব ঘটনা থাকে। পরিচিত নাম থাকে। এমন কিছু তথ্য থাকে, যা সহজেই যাচাই করা যায়। তারপর সেই সত্যগুলোর মাঝখানে এমন কিছু ব্যাখ্যা বসানো হয়, যা সরাসরি প্রমাণিত নয়। কিছু তথ্য সুবিধামতো বাদ দেওয়া হয়। ঘটনাগুলোর ক্রম বদলে দেওয়া হয়। শেষে একটি আবেগময় উপসংহার যোগ করা হয়।

সবচেয়ে শক্তিশালী মিথ্যা সেটি নয়, যার মধ্যে কোনো সত্য নেই। সবচেয়ে শক্তিশালী মিথ্যা হলো সেটি, যেখানে এতটুকু সত্য রাখা হয় যে তার পাশে দাঁড়ানো অসত্যকেও সত্যের আত্মীয় বলে মনে হয়।

একটি ঘটনার সব তথ্য একসঙ্গে বলা হলে যে অর্থ তৈরি হতো, নির্বাচিত অংশ বললে তার অর্থ বদলে যেতে পারে। ঘটনাটি মিথ্যা হয়ে যায় না, কিন্তু গল্পটি অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। আর সেই অসম্পূর্ণতাকে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি নিছক গল্প বলা থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে প্রভাব বিস্তারের কৌশল।

একজন লেখকের ছয়টি শক্তি এবং তাদের অন্ধকার সম্ভাবনা

১. কল্পনাশক্তি

একজন লেখক যা ঘটেনি, তা কল্পনা করতে পারেন। একটি ঘটনার সম্ভাব্য কারণ, তার পরিণতি এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের উদ্দেশ্য নির্মাণ করতে পারেন। এই কল্পনাই গল্পের জন্ম দেয়।

কিন্তু কোনো বাস্তব মানুষের আচরণের পেছনে কল্পিত উদ্দেশ্য বসিয়ে দিলে কী ঘটে? ধরুন, একজন মানুষ আপনার ফোন ধরেননি। এটি একটি ঘটনা। আপনি যদি বলেন, তিনি ইচ্ছা করে আপনাকে অপমান করেছেন, সেটি একটি ব্যাখ্যা। সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে আগের কয়েকটি ঘটনা যোগ করলে একটি প্লট তৈরি হয়। এরপর আপনি যদি অন্যদের বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে আপনাকে ছোট করছেন, তাহলে একটি পূর্ণ ন্যারেটিভ দাঁড়িয়ে যায়।

হতে পারে আপনার ধারণাই সত্য। আবার এটিও হতে পারে, কিছু সত্যের সঙ্গে আপনার ভয়, সন্দেহ ও কল্পনা মিশে গেছে। কিন্তু গল্পটি একবার বিশ্বাসযোগ্যভাবে তৈরি হয়ে গেলে মানুষ প্রায়ই ঘটনা ও ব্যাখ্যার পার্থক্য ভুলে যায়।

২. বিশ্বাসযোগ্য অসত্য নির্মাণের ক্ষমতা

একজন লেখক প্রচুর মিথ্যা বলতে পারেন। তবে অবশ্যই তাকে মিথ্যা বলতে হবে, এমন নয়। সাহিত্যিক কল্পনা এবং প্রতারণামূলক মিথ্যা এক বিষয়ও নয়। পাঠক জানেন উপন্যাসের ঘটনা নির্মিত। কিন্তু একজন লেখক যদি বাস্তব জীবনে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চান, তবে তার ভাষা ও কাঠামো একটি সাধারণ মিথ্যাকে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

তিনি মিথ্যার জন্য প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারেন। চরিত্রের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে পারেন। আগের নিরীহ ঘটনাকে নতুন অর্থ দিতে পারেন। কোথায় আবেগ বাড়াতে হবে এবং কোথায় নীরব থাকতে হবে, সেটিও বুঝতে পারেন। তিনি সরাসরি মিথ্যা না বলেও এমনভাবে সত্য সাজাতে পারেন, যাতে আপনি তার কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তেই পৌঁছান।

জরুরি নয় যে তিনি আপনার মাথা বিগড়ে দেবেন। কিন্তু তিনি যদি অসৎ উদ্দেশ্যে তা করতে চান, তাহলে ভাষার শক্তি, গল্পের কাঠামো এবং আপনার আবেগ সম্পর্কে তার ধারণা কাজটিকে সহজ করে দিতে পারে।

৩. পর্যবেক্ষণক্ষমতা

লেখকেরা সাধারণত মানুষের কথা, বিরতি, অঙ্গভঙ্গি, শব্দচয়ন, পোশাক, ভয়, অস্বস্তি ও আচরণের পরিবর্তন মনোযোগ দিয়ে দেখেন। চর্চার কারণে কারও পর্যবেক্ষণক্ষমতা গড়পড়তা মানুষের চেয়ে তীক্ষ্ণ হতে পারে।

আপনার কথা বলার ধরন, ব্যবহৃত শব্দ, উচ্চারণ এবং নির্দিষ্ট প্রশ্নে আপনার প্রতিক্রিয়া থেকে তিনি আপনার শিক্ষা, সামাজিক অবস্থান, আত্মবিশ্বাস কিংবা দুর্বলতা সম্পর্কে কিছু অনুমান করতে পারেন। অবশ্যই সব অনুমান সঠিক হবে না। কোনো মানুষকে কয়েকটি শব্দে সম্পূর্ণ বুঝে ফেলা সম্ভবও নয়।

কিন্তু কেউ যদি আপনার স্বীকৃতির প্রয়োজন, হীনম্মন্যতা, ভয়, একাকিত্ব কিংবা ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা লক্ষ করেন, তাহলে সেই জ্ঞান মানবিক সম্পর্ক তৈরিতেও ব্যবহার করা যায়। আবার একই জ্ঞান দিয়ে আপনার দুর্বল জায়গায় চাপও দেওয়া যায়।

৪. অভিজ্ঞতা ও অভিযানের প্রতি আকর্ষণ

নতুন গল্পের জন্য নতুন মানুষ, নতুন স্থান ও নতুন সংঘাত প্রয়োজন। সব গল্প চার দেয়ালের মধ্যে বসে আসে না। তাই অনেক লেখক মানুষের সঙ্গে মিশতে চান, ভ্রমণ করেন, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং এমন অভিজ্ঞতার দিকে এগিয়ে যান, যেখান থেকে গল্প জন্ম নিতে পারে।

You সিরিজের জো গোল্ডবার্গ পেশাগত অর্থে ঔপন্যাসিক নন। তিনি বইয়ের জগতের মানুষ, পাঠক এবং নিজের জীবন সম্পর্কে ভয়ংকর রকমের দক্ষ এক কথক। তার পর্যবেক্ষণক্ষমতা তীক্ষ্ণ। সে মানুষের আচরণ পড়ে, তথ্য সংগ্রহ করে এবং নিজের অপরাধ ও নিয়ন্ত্রণকে ভালোবাসার গল্পে রূপ দেয়।

দর্শক জোয়ের কাজকে নৈতিকভাবে সমর্থন না করেও তার কথকসত্তা ও বুদ্ধিমান উপস্থাপনায় আকৃষ্ট হতে পারেন। এখানেই ন্যারেটিভের বিপদ। একজন মানুষ কী করছেন, তা চোখের সামনে দেখা যায়। তবু তিনি কেন করছেন, তার নিজের বলা মধুর ব্যাখ্যা কখনো কখনো কাজটির ভয়াবহতাকে আড়াল করে।

৫. বাহ্যিকতার বদলে অন্তর্জগৎ দেখার ক্ষমতা

বহু লেখক মানুষের পোশাক, অর্থ কিংবা বাহ্যিক সাজসজ্জার চেয়ে তার ভেতরের দ্বন্দ্ব, আলো, অন্ধকার ও সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দেন। তারা মানুষকে কেবল নির্দিষ্ট আর্থিক বা সামাজিক মাপকাঠিতে বিচার করতে চান না।

এই দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক। যে মানুষকে সমাজ তুচ্ছ করছে, একজন লেখক তার ভেতরে পূর্ণাঙ্গ একটি জগৎ দেখতে পারেন। কিন্তু যে ব্যক্তি আপনার অন্তর্জগৎ বোঝেন, তিনি আপনার ভেতরের দরজাগুলোও চিনে ফেলেন। কোন কথায় আপনি নরম হন, কোন স্মৃতি আপনাকে দুর্বল করে, কোন স্বীকৃতির জন্য আপনি অপেক্ষা করছেন, তা বুঝে গেলে সেই জ্ঞান দুইভাবে ব্যবহার করা যায়।

একজন মানুষ সেই জ্ঞান দিয়ে আপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারেন। আবার চাইলে সেই একই জ্ঞান দিয়ে আপনাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারেন।

৬. আবেগকে শব্দে বন্দী করার ক্ষমতা

আবেগ আমাদের সবার আছে। কিন্তু সেই আবেগ প্রকাশ করার জন্য প্রয়োজনীয় শব্দ কি সবার আছে?

একজন লেখক এমন একটি অনুভূতিকে ভাষা দিতে পারেন, যা আপনি বহুদিন ধরে অনুভব করেছেন কিন্তু কখনো বলতে পারেননি। তিনি আপনার একাকিত্ব, অভিমান, প্রত্যাখ্যান, অপমান কিংবা ভালোবাসাকে এমনভাবে প্রকাশ করতে পারেন যে আপনার মনে হবে, এই মানুষটি আপনাকে অন্য সবার চেয়ে বেশি বোঝেন।

মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। কারণ যে আমাদের অব্যক্ত অনুভূতির নাম জানে, তাকে আমরা সহজেই আপন ভাবতে শুরু করি। এই আকর্ষণ সত্যিকারের সহমর্মিতা থেকে তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রকাশভঙ্গির এই ক্ষমতা যদি অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তাহলে একই মানুষ আপনার আবেগকে আপনার বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে পারেন।

যে মানুষ আপনার অনুভূতিকে সবচেয়ে সুন্দর ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন, তিনিই যে আপনার অনুভূতির প্রতি সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। সুন্দর শব্দ সহমর্মিতার পরিচয় হতে পারে, আবার সুন্দর শব্দ একটি নিখুঁত ফাঁদের দরজাও হতে পারে।

একটি পরীক্ষামূলক প্রস্তাব

এখন যদি আমি আপনাকে বলি:

“পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লেখক এখন পর্যন্ত তার লেখা প্রকাশই করেননি।”

বাক্যটি শোনার পর আপনি হয়তো অনেকক্ষণ ভাববেন। কেউ সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেবেন। কেউ বলবেন, “হ্যাঁ, আংশিক সত্য হতে পারে।” কেউ আবার এক বাক্যে মেনে নেবেন।

কেন মেনে নেবেন?

কারণ কথাটি পুরোপুরি অসম্ভব নয়। পৃথিবীতে এমন কোনো প্রতিভাবান মানুষ থাকতে পারেন, যিনি কখনো লেখা প্রকাশ করেননি। আবার তাকে “সবচেয়ে বড় লেখক” প্রমাণ করার কোনো উপায়ও নেই। তিনি যদি অপ্রকাশিতই থাকেন, তাহলে আমরা তার সঙ্গে প্রকাশিত লেখকদের তুলনা করব কীভাবে?

কিন্তু বাক্যটি প্রথমে প্রমাণ চায় না। এটি আগে আপনার কল্পনায় একটি সম্ভাবনা তৈরি করে। অজানা প্রতিভা, স্বীকৃতি না পাওয়া মহত্ত্ব এবং সমাজের দৃষ্টির বাইরে থাকা একজন অসাধারণ মানুষের ছবি আপনার মনে গড়ে ওঠে। এরপর আপনি সেই ছবির সম্ভাব্য সত্যতা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।

এটাই ন্যারেটিভের শক্তি। একটি দক্ষ ন্যারেটিভ সব সময় আপনাকে সরাসরি বিশ্বাস করতে বলে না। কখনো সে শুধু আপনার মনের ভেতরে একটি দরজা খুলে দেয়। তারপর আপনি নিজেই সম্ভাবনার ঘরে প্রবেশ করেন।

যারা বাক্যটি সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করবেন, তাদের আমি এক অর্থে বিজ্ঞ বলেছিলাম, কারণ তারা দৃশ্যমান প্রকাশনা ও স্বীকৃতির বাইরে সম্ভাবনার অস্তিত্ব মেনে নিতে পারেন। কিন্তু আরেক ধরনের বিজ্ঞতাও প্রয়োজন। সেটি হলো মুগ্ধ হওয়ার পরও প্রশ্ন করতে পারা। কথাটি কি সম্ভাবনা, অলংকার, নাকি যাচাইযোগ্য সত্য?

কারণ একটি সুন্দর সম্ভাবনা আর একটি প্রমাণিত সত্য একই বিষয় নয়।

প্লটিং কি শুধু লেখক করেন?

এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক। প্লটিং কি শুধু গল্প আর উপন্যাসে থাকে? আপনার সম্পর্কের মধ্যে থাকে না? আপনার পরিবারে থাকে না? আপনার কর্মক্ষেত্রে থাকে না? আপনার সমাজে থাকে না?

একটু বুকে হাত দিয়ে বলুন।

আমরা কি কখনো নিজের ভুলের এমন ব্যাখ্যা তৈরি করিনি, যেখানে পরিস্থিতিই সবকিছুর জন্য দায়ী? আমরা কি অন্যের আচরণের পেছনে উদ্দেশ্য বসাইনি? আমরা কি নিজের পক্ষে সুবিধাজনক তথ্যগুলো মনে রেখে অসুবিধাজনক অংশ ভুলে যাইনি? আমরা কি কখনো অন্যদের বোঝাতে চাইনি যে আমাদের সংস্করণটিই পুরো সত্য?

একজন লেখক সচেতনভাবে কাগজে যে কাজটি করেন, সাধারণ মানুষ বাস্তব জীবনে প্রায়ই সেই কাজটিই করেন। আমরা চরিত্র নির্ধারণ করি। কে ভালো, কে খারাপ, কে অকৃতজ্ঞ, কে নির্দোষ, কে বিশ্বাসঘাতক, তা ঠিক করি। তারপর আগের ঘটনাগুলোকে নতুন পরিচয়ের সঙ্গে মানিয়ে ব্যাখ্যা করি।

একটি সম্পর্কে একজন বলতে পারেন, “তুমি আমাকে কখনো বোঝোনি।” হয়তো অভিযোগটি সত্য। আবার হয়তো অন্য মানুষটির বহু চেষ্টা, যত্ন ও ত্যাগ গল্প থেকে বাদ পড়ে গেছে। পরিবারে বলা হতে পারে, “আমরা তোমার ভালোর জন্যই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” এর মধ্যে সত্যিকারের উদ্বেগ থাকতে পারে। আবার ভালো থাকার সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষাও থাকতে পারে।

কর্মক্ষেত্রে বলা হতে পারে, “আমরা সবাই একটি পরিবার।” এই বক্তব্য পারস্পরিক সহযোগিতার পরিচয় হতে পারে। আবার একই ন্যারেটিভ ব্যবহার করে অতিরিক্ত দায়িত্ব, অস্পষ্ট কর্তৃত্ব এবং ন্যায্য স্বীকৃতির অভাবও স্বাভাবিক করে তোলা যায়।

রাজনীতিতে এই প্রক্রিয়া আরও বড় হয়। এখানে একটি জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, শ্রেণি বা প্রজন্মকে একটি নির্দিষ্ট চরিত্র দেওয়া হয়। কাউকে চিরস্থায়ী নায়ক, কাউকে জন্মগত শত্রু এবং কাউকে অনিবার্য ভুক্তভোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। নির্বাচিত ইতিহাস, পুনরাবৃত্ত স্লোগান ও আবেগময় প্রতীকের মাধ্যমে সেই ন্যারেটিভকে মানুষের পরিচয়ের অংশ বানানো হয়।

কিন্তু ন্যারেটিভ নির্মাণ শুধু ওপরতলার রাজনীতিবিদেরা করেন না। রিকশাচালক থেকে চা-বিক্রেতা, শিক্ষক থেকে কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী থেকে লেখক, আমরা সবাই নিজের জীবনের ব্যাখ্যা তৈরি করছি। পরিসর ও ক্ষমতা আলাদা, কিন্তু আত্মপক্ষসমর্থনের প্রবণতাটি মানুষের।

যখন নিজের স্বার্থে আঘাত লাগে, তখন আমরাও নিজের পক্ষে ওকালতি করি। নিজের উদ্দেশ্যকে মহৎ, নিজের ভুলকে পরিস্থিতির ফল এবং অন্যের ভুলকে তার চরিত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখাই। আমরা এমন ন্যারেটিভ তৈরি করি, যা হয়তো পুরোপুরি মিথ্যা নয়, কিন্তু সব সময় পুরো সত্যও নয়।

সত্যের সঙ্গে সঙ্গ দেওয়া মিথ্যা

একটি বিষাক্ত ন্যারেটিভের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সেটি সত্যের বিরুদ্ধে সব সময় দাঁড়ায় না। কখনো সেটি সত্যের হাত ধরেই আসে।

ধরুন, আপনার একটি ভুল হয়েছে। ম্যানিপুলেটিভ ন্যারেটিভ সেই সত্যটুকু গ্রহণ করবে। তারপর বলবে, এই ভুল প্রমাণ করে আপনি সব সময়ই অবিশ্বস্ত ছিলেন। এরপর আপনার আগের দু-একটি ভুল যোগ করা হবে। যেসব ক্ষেত্রে আপনি দায়িত্বশীল ছিলেন, সেগুলো বাদ যাবে। শেষে বলা হবে, সবাই বহুদিন ধরেই আপনার প্রকৃত চরিত্র জানত।

একটি সত্য থেকে শুরু করে একটি সম্পূর্ণ পরিচয় নির্মাণ করা হলো। আপনি ভুল করেছিলেন, এটি সত্য। আপনি জন্মগতভাবে অবিশ্বস্ত, এটি ব্যাখ্যা। সবাই জানত, এটি হয়তো প্রমাণহীন সামাজিক চাপ। কিন্তু তিনটি একসঙ্গে বলা হলে ন্যারেটিভটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে।

এর সঙ্গে যদি থাকে মিষ্টি ভাষা, সংযত কণ্ঠ, পরিমিত আবেগ এবং নিখুঁত শব্দচয়ন, তাহলে ফাঁদটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ মানুষ সব সময় চিৎকার করা ব্যক্তিকেই বিপজ্জনক মনে করে। শান্ত, যুক্তিসংগত ও মার্জিত ভাষায় বলা নির্মম কথাকে আমরা অনেক সময় সত্যের কাছাকাছি বলে ধরে নিই।

কথায় আছে, “দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথা।” কিন্তু বিপদ শুধু কথার মিষ্টতায় নয়। বিপদ তখন, যখন মিষ্টি কথার ভেতরে এমন একটি গল্প রাখা হয়, যেখানে আপনি ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতি, বিচারবোধ এবং পরিচয়ের ওপরই সন্দেহ করতে শুরু করেন।

ডার্ক সাইকোলজির দুনিয়ায় প্লটিং কেন বিষ?

“ডার্ক সাইকোলজি” কোনো গোপন জাদুবিদ্যা নয়, যার কয়েকটি কৌশল শিখলেই যে কারও মন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মানুষের ওপর প্রভাব নির্ভর করে সম্পর্ক, আস্থা, ভয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, একাকিত্ব, সামাজিক অবস্থান এবং ক্ষমতার পার্থক্যের ওপর।

কিন্তু পরিকল্পিতভাবে আংশিক সত্য ব্যবহার, অপরাধবোধ তৈরি, তথ্য গোপন, সামাজিক চাপ, আবেগগত নির্ভরতা এবং মিষ্টি ভাষার সমন্বয় একজন মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বিষাক্ত প্লটিং সাধারণত একদিনে কাজ শেষ করে না। প্রথমে আপনার সম্পর্কে একটি ছোট ব্যাখ্যা তৈরি হয়। পরে একই ব্যাখ্যা ভিন্ন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এরপর অন্য মানুষদেরও সেই গল্প বলা হয়। কিছুদিন পর আপনি দেখেন, আপনার প্রতিটি কাজকে আগেই নির্ধারিত একটি চরিত্রের প্রমাণ হিসেবে পড়া হচ্ছে।

আপনি প্রতিবাদ করলে বলা হবে, আপনার প্রতিবাদই প্রমাণ করে অভিযোগ সত্য। আপনি চুপ থাকলে বলা হবে, আপনার কাছে উত্তর নেই। আপনি ব্যাখ্যা দিলে বলা হবে, আপনি গল্প বানাচ্ছেন। অর্থাৎ প্লটটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে আপনার প্রতিটি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াই আপনাকে আরও দোষী প্রমাণ করে।

এই জায়গায় এসে মানুষ শুধু অন্যের ন্যারেটিভের শিকার হয় না। সে নিজের চোখ দিয়েও নিজেকে দেখতে ভুলে যায়। অন্যের লেখা চরিত্রের ভেতরে নিজেকে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে।

এখানেই প্লটিং ব্যক্তিজীবনের জন্য বিষ হয়ে ওঠে। বিষ যেমন ধীরে ধীরে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি একটি ম্যানিপুলেটিভ ন্যারেটিভও ধীরে ধীরে সম্পর্ক, সামাজিক পরিচয় ও আত্মবিশ্বাসে প্রবেশ করতে পারে।

আমরা নিজেরাও কি নির্দোষ?

অন্যের ম্যানিপুলেশন নিয়ে কথা বলা সহজ। নিজের তৈরি ন্যারেটিভের দিকে তাকানো কঠিন।

আমরা প্রত্যেকেই নিজের গল্পের প্রধান চরিত্র। স্বাভাবিকভাবেই আমরা নিজের কষ্ট বেশি অনুভব করি, নিজের উদ্দেশ্য বেশি জানি এবং নিজের ভুলের পেছনের পরিস্থিতি দেখতে পাই। কিন্তু অন্যের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই শুধু তার আচরণ দেখি। নিজের ভুলকে পরিস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করি, অন্যের ভুলকে চরিত্র দিয়ে।

তাই ম্যানিপুলেটিভ ন্যারেটিভ শুধু কোনো ধুরন্ধর লেখক, ভয়ংকর প্রেমিক, প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য কিংবা চতুর রাজনীতিক তৈরি করেন না। ক্ষুদ্র পরিসরে আমরাও তৈরি করতে পারি। নিজের দায় কমাতে, সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করতে, সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কিংবা আহত অহংকে সান্ত্বনা দিতে আমরা নিজের পক্ষে গল্প সাজাতে পারি।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজেদের গল্পকে পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাতে প্রস্তুত? আমরা কি স্বীকার করতে পারি যে অন্য পক্ষের কাছেও একই ঘটনার আরেকটি সংস্করণ আছে? আমরা কি কোনো অসুবিধাজনক সত্য সামনে এলে নিজের ন্যারেটিভ পরিবর্তন করতে পারি?

যে মানুষ শুধু অন্যের গল্প ভাঙতে চান কিন্তু নিজের গল্প যাচাই করতে চান না, তিনি সত্য খুঁজছেন না। তিনি শুধু নিজের সংস্করণকে জিতিয়ে দিতে চাইছেন।

শেষ প্রশ্ন

একজন লেখক ভয়ংকর হতে পারেন। কারণ তিনি কল্পনা করতে পারেন, পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, আবেগকে ভাষায় ধরতে পারেন এবং সত্যের মতো শোনায় এমন একটি গল্প তৈরি করতে পারেন। কিন্তু এই ক্ষমতাই তাকে অপরাধী বানায় না। ক্ষমতাটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন, সেটিই নির্ধারণ করে তিনি মানুষের জন্য আলো তৈরি করছেন, নাকি ফাঁদ।

আর লেখক একা নন। আমরা সবাই কমবেশি গল্পকার। আমরা সম্পর্কের ব্যাখ্যা লিখি, পরিবারের চরিত্র নির্ধারণ করি, সমাজে মানুষের পরিচয় তৈরি করি এবং নিজের পক্ষে ওকালতি করি।

তাই অন্যকে ম্যানিপুলেট করবেন না। কোনো মানুষকে ভালো না লাগলে দূরে সরে যান। কোনো সম্পর্ক রাখতে না পারলে সম্মানের সঙ্গে ছেড়ে দিন। কিন্তু তাকে অপরাধবোধ, আংশিক সত্য, মিষ্টি ভাষা ও সাজানো ন্যারেটিভের মধ্যে বন্দি করে যন্ত্রণা দেবেন না।

কাউকে “সাইকোপ্যাথ” বলে রোগনির্ণয় করার প্রয়োজন নেই। তার ক্ষতিকর আচরণই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আর নিজের ক্ষতিকর আচরণকে বুদ্ধিমত্তা, ভালোবাসা, অভিমান কিংবা ন্যায়বিচারের গল্প দিয়ে ঢেকে রাখলেও সেটি কম ক্ষতিকর হয়ে যায় না।

অন্যের জীবনকে নিজের গল্পের প্লট বানাবেন না। মানুষ আপনার উপন্যাসের চরিত্র নয়। আপনি তার ভূমিকা লিখে দেবেন, তার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবেন এবং শেষে নিজের সুবিধামতো পরিণতি টেনে দেবেন, বাস্তব জীবন এতটা বাধ্য নয়।

ওসব সিনেমায় মূল চরিত্রের সঙ্গে গল্পকার, কাকতালীয় ঘটনা কিংবা প্রকৃতি সায় দিতে পারে। চিত্রনাট্য তাকে বারবার রক্ষা করতে পারে। তার অপরাধও দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় বুদ্ধিমত্তা বলে মনে হতে পারে।

কিন্তু আপনি যখন বাস্তব কোনো মানুষকে মিথ্যা ন্যারেটিভের মধ্যে বন্দি করবেন, তখন মনে রাখবেন, তার জীবন আপনার লেখা গল্প নয়। সে একদিন আপনার দেওয়া চরিত্র প্রত্যাখ্যান করতে পারে। আপনার সাজানো প্লটের বাইরে গিয়ে কথা বলতে পারে। আর তখন হয়তো সবাই বুঝতে পারবে, আপনি গল্পের নায়ক ছিলেন না।

আপনি শুধু এমন একজন কথক ছিলেন, যার ওপর আর কেউ বিশ্বাস রাখে না। প্রকৃতি তখনও আপনার পাশে থাকবে তো?

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

  1. Basic Instinct , ক্যাথেরিন ট্রামেল চরিত্র ও চলচ্চিত্রের কাহিনিসংক্রান্ত তথ্য। IMDb
  2. Secret Window , মর্ট রেইনি, চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ও চলচ্চিত্রের কাহিনিসংক্রান্ত তথ্য। IMDb
  3. The Ghost Writer , রাজনৈতিক স্মৃতিকথা, ঘোস্ট রাইটার ও গোপন সংযোগসংক্রান্ত কাহিনি। IMDb
  4. Alter Ego , অ্যালান শেফার চরিত্র ও চলচ্চিত্রের কাহিনিসংক্রান্ত তথ্য। IMDb
  5. The Chronic Adventure Story , পুনর্বিন্যাসযোগ্য কাহিনি ও স্যামুয়েল গিবসন চরিত্রসংক্রান্ত তথ্য। IMDb
  6. Green, Melanie C. এবং Timothy C. Brock। “The Role of Transportation in the Persuasiveness of Public Narratives.” Journal of Personality and Social Psychology , 79(5), 701–721, 2000। PubMed |
Green, Melanie C. এবং Markus Appel। “Narrative Transportation: How Stories Shape How We See Ourselves and the World.” Advances in Experimental Social Psychology , Volume 70, 2024।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান মোঃ মেহেদি হাসান (কলম নাম: মি. বিকেল)—লেখক, ব্লগার, শিক্ষক এবং ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। • শিক্ষা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। • প্রকাশনা: প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে’ (রকমারি.কম-এ উপলব্ধ)। • অন্যান্য: ‘দ্য ব্যাকস্পেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৩ থেকে মাইক্রোসফট ডেভেলপার প্রোগ্রামে যুক্ত। যেকোনো প্রশ্ন বা যৌথ কাজের আগ্রহে যোগাযোগ করুন: [email protected] অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!