দত্ত পরিবার | পর্ব ১১: যে পাঠাগারে আমার অতীত রাখা ছিল
H Library-তে প্রবেশ করে হাসান খুঁজে পায় নিজের অজানা ছবি, সাংকেতিক নথি, পুরোনো বই ও একটি পিস্তলের পরিচিত স্থান। কিন্তু নিজের হাতের লেখায় রাখা সতর্কবার্তা তার স্মৃতি ও পরিচয়কে আরও সন্দেহজনক করে তোলে।
দত্ত পরিবার
পর্ব ১১: যে পাঠাগারে আমার অতীত রাখা ছিল
লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান
দত্ত ভবনের নিষিদ্ধ পশ্চিমঘর, ভূগর্ভস্থ আর্কাইভ, মুছে দেওয়া নাম এবং ১৭১৫ সালের অসম্ভব আলোকচিত্র হাসানকে এমন একটি অতীতের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা সে নিজেই আর মনে করতে পারে না। এবার বহু বছর বন্ধ থাকা H Library তাকে চিনে দরজা খুলেছে। কিন্তু দরজার ভেতরে শুধু বই নেই। সেখানে ছবি, দলিল, অস্ত্র, মানচিত্র এবং হাসানের নিজের হাতের লেখায় রাখা এমন কিছু সতর্কবার্তা আছে, যা তার স্মৃতির চেয়েও তার পরিচয়কে বেশি সন্দেহজনক করে তোলে।
দরজার ওপাশে যে কণ্ঠ ছিল
“দরজা পুরোপুরি খুলো না, হাসান। আমি এখনো ভেতরে আছি।”
কণ্ঠটি আমার।
বর্তমানের আমার কি না, নিশ্চিত নই। বয়সে কিছুটা কম। স্বরে রসিকতার চেয়ে সতর্কতা বেশি। ঠিক যেন এমন একজন হাসান কথা বলছে, যে ভয় পেলে বেশি কথা বলত না।
নিজের কণ্ঠ অন্য কারও মুখে শুনলে মানুষ ভয় পায়। নিজের কণ্ঠ কোনো মুখ ছাড়াই অন্ধকারের ভেতর থেকে এলে ভয়টির জন্য আলাদা নাম প্রয়োজন।
সরু দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছে। সেই বাতাসে ভেজা ইট, পুরোনো কাঠ, কর্পূর, ধাতু এবং বহু বছর বন্ধ থাকা কাগজের দমবন্ধ করা গন্ধ।
গন্ধটি দত্ত ভবনের ভূগর্ভস্থ আর্কাইভের মতো। তবে পুরোপুরি এক নয়। দত্ত ভবনের নিচে সময় জমে ছিল। এখানে মনে হচ্ছে কেউ এখনো সেই সময়ের মধ্যে বাস করে।
ডান বাহুর ব্যান্ডেজের নিচে ক্ষতটি ধুকপুক করছে। প্রতিটি স্পন্দন হৃদস্পন্দনের চেয়ে সামান্য দেরিতে আসে। কাপড়ের নিচে নতুন রক্তের উষ্ণতা অনুভব করছি।
স্নেহা আমার বাঁ হাত ধরে রেখেছে। অন্য হাতে সে ব্যান্ডেজের ওপর চাপ দিল।
“আমরা ভেতরে যাচ্ছি না।”
“দরজাটি আমাকে এত দিন পর চিনেছে। সৌজন্য সাক্ষাৎ না করলে খারাপ দেখাবে।”
“তুমি ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারছ না।”
“আমি দাঁড়িয়ে আছি। অবস্থানের সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে।”
“হাসান।”
এবার নামটি সতর্কতা হিসেবে নয়, আদেশের মতো শোনাল।
অমিত দরজার ফাঁকের কাছে নিচু হয়ে আলো ধরল। কয়েকটি ভেজা পাথরের ধাপ দেখা গেল। তারপর আলো যেন সামনে যেতে অস্বীকার করল। অন্ধকার আলোটিকে গিলে ফেলেছে।
“দরজাটি বেশিক্ষণ খোলা থাকবে না,” অমিত বলল।
স্নেহা তার দিকে ফিরল।
“আপনি কীভাবে জানেন?”
“আগেও খুলেছিল।”
“আপনি তখন ভেতরে গিয়েছিলেন?”
অমিত আমার দিকে তাকাল।
“হাসান গিয়েছিল।”
“একা?”
অমিতের উত্তরের আগে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই আমি উত্তরটি বুঝে ফেললাম।
“সুবর্ণা সঙ্গে ছিল,” অমিত বলল।
স্নেহার হাত আমার বাঁ হাত ছেড়ে দিল না। তবে আঙুলের চাপ বদলে গেল।
“দুজনই বের হয়েছিলে?”
অমিত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “হাসান বের হয়েছিল।”
“সুবর্ণা?”
“তাকে বের হতে দেখিনি।”
“দেখনি, নাকি সে বের হয়নি?”
স্নেহার প্রশ্নে অমিতের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“দুটোর পার্থক্য আমি জানি। তাই দ্বিতীয়টি বলিনি।”
দূরে শিহাব টর্চের আলো তিনবার জ্বালিয়ে নিভিয়ে দিল।
কেউ পাঠাগারের দিকে আসছে।
কয়েক মুহূর্ত পর ভেজা পাতার ওপর পায়ের শব্দ শোনা গেল। প্রথমে একটি। তারপর আরেকটি। একটি পা স্বাভাবিকভাবে উঠছে। অন্যটি মাটিতে সামান্য ঘষা খাচ্ছে।
ছেঁড়া জুতার মানুষটি আমাদের অনুসরণ করেছে।
অথবা এমন কেউ এসেছে, যে চায় আমরা একই মানুষ বলে ধরে নিই।
দরজাটি কয়েক ইঞ্চি বন্ধ হয়ে গেল।
ইটের গভীরে ধাতব দাঁত একটির সঙ্গে আরেকটি ঘষা খাচ্ছে।
অমিত বলল, “এখন সিদ্ধান্ত নে।”
“বাইরে দুজন। ভেতরে অন্তত একজন আমি। সিদ্ধান্তটি বেশ মানবিক।”
স্নেহা চিকিৎসার ব্যাগ কাঁধে তুলল।
“আগে তুমি।”
“আহত মানুষকে সামনে পাঠানো চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোন শাখা?”
“যে শাখায় রোগী কথা বেশি বলে।”
বাইরে যারা আমাকে খুঁজছে, তারা আমার বর্তমান জানে। দরজার ওপাশে যা আছে, সেটি আমার অতীত জানে। আমার কাছে কোন পক্ষটি বেশি বিপজ্জনক, বুঝে ওঠার মতো স্মৃতি নেই।
শরীর যে পথ মনে রেখেছিল
অমিত প্রথমে ঢুকল। তারপর আমি। স্নেহা সবশেষে।
শরীর পাশ ফিরিয়ে দরজার ফাঁক পার হওয়ার সময় ডান বাহুর ব্যান্ডেজ পুরোনো ইটের ধার ঘেঁষে গেল। ক্ষতের গভীরে গরম কিছু ছিঁড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলো। মুখের ভেতর আবার ধাতব স্বাদ।
বাঁ হাতে দেয়াল ধরলাম।
দেয়াল বরফের মতো ঠান্ডা। আঙুলের নিচে শ্যাওলার পিচ্ছিল স্তর। তার নিচে ক্ষীণ কম্পন, যেন দেয়ালের অনেক গভীরে কোনো যন্ত্র এখনো সচল।
স্নেহা পেছন থেকে আমার জামা ধরে ফেলল।
“ব্যথা করছে?”
“না বললে বিশ্বাস করবে?”
“না।”
“তাহলে প্রশ্নটি প্রশাসনিক ছিল?”
স্নেহা কোনো উত্তর দিল না। ব্যান্ডেজের ওপর হাত রেখে আমাকে সামনে ঠেলে দিল।
ভেতরে পা রাখার পর দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল।
বাইরের জোনাকি, দীঘির কালো পানি, নিমপাতা থেকে ঝরে পড়া ফোঁটা এবং অনুসরণকারীদের পদশব্দ একটি সরু রেখার মধ্যে আটকে গেল। তারপর রেখাটিও নিভে গেল।
সম্পূর্ণ অন্ধকারে প্রথমে নিজের শ্বাস শুনলাম।
তারপর স্নেহার।
তারপর অমিতের।
চতুর্থ শ্বাসটি কার, জানি না।
অমিতের আলো জ্বলে উঠল।
সামনে পাথরের সিঁড়ি।
“বারোটি ধাপ,” মুখ থেকে বেরিয়ে গেল।
আলো তখনো নিচ পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
স্নেহা বলল, “তুমি গুনেছ?”
“অনুমান করেছি।”
অমিত প্রথম ধাপে পা রাখল।
“আগেও বারোটি ছিল।”
ধাপগুলো অসমান। মাঝখানে ক্ষয়ে গেছে। কোথাও শুকনো কাদার স্তর। দাগগুলো এত পুরোনো যে পায়ের ছাপ বোঝার উপায় নেই। কিন্তু সপ্তম ধাপে নতুন কাদা।
কেউ সম্প্রতি এখানে নেমেছে।
অমিতও দাগটি দেখল। আলো কয়েক সেকেন্ড সেখানে স্থির রাখল।
“দরজা তো বন্ধ ছিল,” স্নেহা বলল।
“এই দরজাটি বন্ধ ছিল,” অমিত উত্তর দিল।
“অন্য পথ আছে?”
“ছিল।”
“এখন?”
“জানি না।”
অমিতের “জানি না” কথাটি আগে কখনো এত নিয়মিত শুনিনি। হয় সে সত্যিই কম জানে, নয়তো আজ রাতে সত্যের মজুত কমে গেছে।
দুই পাশের দেয়ালে একসময় নাম লেখা ছিল। এখন ধারালো কিছুর আঁচড়ে অধিকাংশ মুছে দেওয়া।
কোথাও শুধু পদবি। কোথাও একটি অক্ষর। কোথাও নাম নেই, শুধু বছর।
১৯৪৭।
১৯৫০।
১৯৫২।
১৯৭১।
মানুষের নাম মুছে গেছে। যে বছরগুলো তাদের জীবন ভেঙেছিল, সেগুলো থেকে গেছে।
ইতিহাস প্রায়ই মানুষের চেয়ে তার ক্ষতকে বেশি দিন মনে রাখে।
বারোতম ধাপে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের ভেতর থেকে সাইকেলের ঘণ্টা বেজে উঠল।
ক্রিং।
পুরোনো স্কুলের দুপুর। সাইকেলের পেছনের আসন। সুবর্ণার দুটি বই। কানের পাশে তার বিরক্ত কণ্ঠ।
“অপেক্ষা করতে বলেছিলাম।”
দৃশ্যটি মুহূর্তেই ভেঙে গেল।
“তোমরা শুনেছ?”
অমিত ও স্নেহা দুজনই না বলল।
শব্দটি শুধু আমাকে শোনানো হয়েছে।
অথবা শব্দটি আদৌ হয়নি।
বইয়ের চেয়ে বেশি কিছু
সিঁড়ির নিচের পথটি একটি ভারী কাঠের দরজায় গিয়ে শেষ হয়েছে। দরজায় তালা নেই। অমিত হাত রাখতেই ভেতর থেকে ক্ষীণ ক্লিক শব্দ হলো।
দরজাটি নিজে থেকে কয়েক ইঞ্চি খুলে গেল।
পুরোনো বইয়ের মিষ্টি, শুষ্ক গন্ধ প্রথমে নাকে এল। তারপর চামড়া, কালি, তামাক এবং পোড়া কাপড়ের ক্ষীণ গন্ধ।
কক্ষটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বড়।
মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বইয়ের তাক। মাঝে তিনটি ভারী কাঠের টেবিল। একদিকে লোহার জালঘেরা নথিকক্ষ। অন্য পাশে দেয়ালজুড়ে পুরোনো মানচিত্র।
বাংলার একাধিক মানচিত্র। নদীর গতিপথ আলাদা। জেলার সীমানা আলাদা। কোথাও লাল কালি দিয়ে গ্রাম চিহ্নিত। কোথাও কোনো পরিবারের নাম কেটে তার পাশে অন্য নাম বসানো।
দেয়ালের নিচু অংশে কাচের বাক্সে ক্ষীণ হলুদ আলো জ্বলছে। বৈদ্যুতিক তার অনেক জায়গায় ছেঁড়া। তবু আলো নিভছে না।
প্রায় সব টেবিলে ধুলোর স্তর। কিন্তু মাঝের টেবিলের সামনে একটি চেয়ার পরিষ্কার। চেয়ারটি সামান্য পেছনে টানা।
যেন কেউ কিছুক্ষণ আগে উঠে দাঁড়িয়েছে।
টেবিলের ওপর কালি শুকিয়ে যাওয়া দোয়াত, একটি বন্ধ চামড়ার খাতা এবং ছোট পিতলের সাইকেল-ঘণ্টা।
ঘণ্টাটির পাশে আঙুলের নতুন দাগ।
ধুলোর ওপর রেখা এখনো পুরোপুরি বসেনি।
কেউ আমাদের আগে এখানে ছিল।
“অমিত,” বললাম, “তুই কি কাউকে আগে পাঠিয়েছিস?”
“না।”
“কেউ পাঠাতে পারে?”
“আমি ছাড়া চাবির কথা আর কেউ জানত না।”
স্নেহা বলল, “দরজা যদি হাসানকে চিনে খুলতে পারে, অন্য কাউকেও চিনতে পারে।”
অমিতের দৃষ্টি তার দিকে গেল।
“আপনি কীভাবে জানলেন?”
“জানিনি। অনুমান করেছি।”
এবার আমার উত্তর অন্য কারও মুখে শুনে অস্বস্তি হলো।
স্নেহা ঘণ্টাটি ছুঁতে হাত বাড়াল। আমি তাকে থামাতে চেয়েও থামালাম না।
তার আঙুল ধাতুতে লাগার আগেই ঘণ্টাটি বেজে উঠল।
ক্রিং।
এবার দুজনই শুনেছে।
স্নেহা হাত সরিয়ে নিল।
অমিতের মুখে কোনো শব্দ নেই।
পাঠাগারের দূরের কোনো তাক থেকে একটি বই মেঝেতে পড়ে গেল।
ভারী শব্দটি ঘরের ভেতর কয়েকবার প্রতিধ্বনিত হলো।
আমরা তিনজনই স্থির।
কোনো বাতাস নেই।
তাকটি আমাদের থেকে প্রায় বিশ হাত দূরে।
বইটি মলাট নিচের দিকে রেখে পড়ে আছে।
কাছে গিয়ে বাঁ হাতে তুলে নিলাম। মলাটে কোনো নাম নেই। শুধু নীল বৃত্তের মধ্যে H-সদৃশ প্রতীক।
মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “এটি তৃতীয় তাকে থাকার কথা নয়।”
স্নেহা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় থাকার কথা?”
না ভেবেই উত্তর দিলাম।
“পূর্ব দেয়ালের দ্বিতীয় আলমারি। স্মৃতি ও পর্যবেক্ষণ অংশে।”
ঘরের পূর্ব দেয়ালে সত্যিই আরেকটি আলমারি আছে। ছোট পিতলের ফলকে মস্তিষ্ক ও চোখের প্রতীক।
অমিত বলল, “তুই এখানকার শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করেছিলি।”
“কখন?”
“বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই শুরু করেছিলি। পরে আবার বদলেছিলি।”
“আমি এত কাজ করেছি, অথচ বর্তমানে বেকার কেন?”
স্নেহা এবার মৃদু স্বরে বলল, “হয়তো বেকার হওয়াটিও তোমার তৈরি পরিচয়ের অংশ।”
রসিকতা করার জন্য মুখ খুলেছিলাম।
কোনো শব্দ বের হলো না।
যে ছবিতে আমি অন্য মানুষ
পাঠকক্ষের শেষ প্রান্তে কালচে পর্দা ঝুলছিল। কাপড়ের নিচের দিক স্যাঁতসেঁতে। স্পর্শ করতেই ধুলো ও পুরোনো তামাকের গন্ধ উঠল।
পর্দা সরানোর পর পুরো দেয়ালজুড়ে ছবি দেখা গেল।
শতাধিক।
কোনোটি সাদা-কালো। কোনোটি রঙিন। কয়েকটি আগুনে পোড়া। কয়েকটি ছবি থেকে নির্দিষ্ট মানুষের মুখ ধারালো কিছু দিয়ে কেটে সরানো।
প্রথম সারিতে দেশত্যাগী পরিবার। ট্রাঙ্ক হাতে রেলস্টেশন। নৌকার ভেতর গাদাগাদি মানুষ। ফাঁকা উঠান। নতুন তালা দেওয়া দরজা। একটি শিশুর হাতে বাড়ির চাবি, কিন্তু পেছনে আর কোনো বাড়ি নেই।
দ্বিতীয় সারিতে ধ্বংস হওয়া বসতি, পোড়া বিদ্যালয় এবং নদীর পাশে অপেক্ষা করা মানুষের ছবি।
তারপর আমাদের গ্রাম।
পুরোনো স্কুল। সুবর্ণ দীঘি। চেয়ারম্যানবাড়ির আগের কালো ফটক। দত্ত ভবনের পশ্চিমঘরের জানালা।
একটি ছবিতে কিশোর আমি ও সুবর্ণা পাঠাগারের সামনে দাঁড়িয়ে।
আমার হাতে নামহীন বই। সুবর্ণার হাতে পিতলের চাবি। আমরা কেউ হাসছি না। দুজনই ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ানো মানুষের দিকে তাকিয়ে।
ছবির পেছনে লেখা:
দুজন প্রবেশ করেছিল। একজন স্মৃতি নিয়ে ফিরেছিল।
“ছবিটি কে তুলেছে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“মনে নেই।”
“ছবির মধ্যে তোমরা সেই মানুষটিকে দেখছ। তার মানে তখন চিনতে।”
ছবির কিশোর হাসানের চোখে ভয় নেই। আছে অবিশ্বাস। সুবর্ণার চোখে রাগ।
দ্বিতীয় ছবিতে আমি ও অমিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মিছিলের পাশে। অমিত সামনে তাকিয়ে। আমি তাকিয়ে আছি রাস্তার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন মানুষের দিকে।
মানুষটির বাঁ পায়ের জুতার সামনের অংশ দেখা যাচ্ছে না। ছবির নিচের সেই অংশটি ছিঁড়ে নেওয়া।
তৃতীয় ছবির সামনে এসে স্নেহা থেমে গেল।
ছবিতে আমি এই পাঠাগারের মাঝের টেবিলে বসে। সামনে মানচিত্র, ছবি, নথি এবং কালো একটি পিস্তল।
ছবির মানুষটির মুখ আমার। কিন্তু স্বরূপটি পরিচিত নয়।
সেই মানুষের চোখে রসিকতা নেই। নিজের জীবন নিয়ে দ্বিধা নেই। কোনো অসহায়তাও নেই।
আছে এমন একজন মানুষের স্থিরতা, যে আগে থেকেই জানে অন্যরা কী করবে।
জামার হাতা গুটানো। কাঁধ ও বাহুতে পুরোনো ক্ষতচিহ্ন। স্নেহা আমার শরীরে যে দাগগুলো দেখেছে, ছবিতেও সেগুলো আছে।
“তোমার শরীরের দাগগুলো দুর্ঘটনার নয়, তাই তো?”
“আমি যদি বলি জানি না, তুমি বিশ্বাস করবে?”
“আগে করতাম।”
স্নেহার শেষ দুটি শব্দ পুরো পাঠাগারের চেয়ে ভারী মনে হলো।
সত্য লুকানো এবং সত্য মনে না থাকা এক বিষয় নয়। কিন্তু যার কাছে সত্য পৌঁছায় না, তার জন্য পার্থক্যটি খুব বেশি নয়।
পিস্তল, টেবিল ও পুরোনো পরীক্ষা
অমিত আমার ব্যাগ থেকে কালো কাপড়ে মোড়া পিস্তলটি বের করল।
স্নেহা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “এটি হাতে নেবেন না।”
“নিচ্ছি না।”
অমিত কাপড়সহ অস্ত্রটি ছবিতে দেখানো টেবিলের নির্দিষ্ট জায়গায় রাখল। কাঠের ওপর পুরোনো চাপের দাগ।
অস্ত্রটির নিচের অংশ দাগের মধ্যে ঠিকভাবে বসে গেল।
পাশে আরও দুটি সরু খোপ। বর্তমানে খালি।
“এটি আগে এখানে ছিল,” বললাম।
“মনে পড়েছে?” অমিত জিজ্ঞেস করল।
“না। টেবিলের দাগ বলছে।”
স্নেহা ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি সবকিছু দেখে ব্যাখ্যা করতে পারো। শুধু নিজের বিষয়ে এসে অন্ধ হয়ে যাও।”
কথাটির উপযুক্ত রসিক উত্তর পেলাম না।
অমিত টেবিলের নিচে ছোট একটি ধাতব ফলক দেখাল। তার ওপর কিছু সাংকেতিক চিহ্ন। পিস্তলের গায়ে থাকা পুরোনো কারখানা-চিহ্নের একটি অংশের সঙ্গে মেলে।
“অস্ত্রটি পেয়েছিলাম সিল করা বাক্সে,” অমিত বলল। “সঙ্গে এই চাবি এবং তোর লেখা নির্দেশ।”
“নির্দেশটি কী ছিল?”
“তুই যদি কোনোদিন ১৭১৫ সালের খাম খুঁজতে গ্রামে ফিরিস, প্যাকেটটি দিতে হবে। কিন্তু যতক্ষণ না তুই অস্ত্রটি নিজে চিনিস, বাক্স খোলা যাবে না।”
“এটি পরীক্ষা ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“আমি পাস করেছি?”
অমিত কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
“সেটিই ভয় পাচ্ছি।”
আমার নামে রাখা ফাইল
লোহার জালঘেরা নথিকক্ষে সারি সারি ধাতব আলমারি। কাপড়ে মোড়া দলিল, জমির খতিয়ান, ভোটার তালিকা, আদালতের নথির অনুলিপি, হাতে লেখা বংশতালিকা, সংবাদপত্রের কাটিং এবং অসংখ্য সাংকেতিক ফাইল।
কিছু ফাইলে সরকারি সিল। কিছুতে একই তারিখের দুটি বিপরীত তথ্য। কোথাও একই জমির তিনজন মালিক। কোথাও মৃত ঘোষিত মানুষের কয়েক বছর পরের স্বাক্ষর।
ইতিহাস শুধু অতীত নয়। সঠিক কাগজের অভাবে বর্তমানও অন্যের সম্পত্তি হয়ে যেতে পারে।
আমার নামের আলমারিটি সামান্য খোলা ছিল।
ভেতরে মোটা একটি ফাইল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রের অনুলিপি। কয়েকটি ভিন্ন জায়গার মানচিত্র। কিছু মানুষের ছবি। ছবির পেছনে আমার হাতের লেখায় আচরণ, হাঁটার ধরন ও কথার বৈশিষ্ট্য নিয়ে ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ।
একটি নামের পাশে লেখা:
মুখের চেয়ে হাঁটা নির্ভরযোগ্য।
ছেঁড়া জুতার মানুষটিকে চিনতে মুখ প্রয়োজন হয়নি।
অর্থাৎ এই অভ্যাস নতুন নয়।
অন্য একটি নথিতে লেখা:
নাম রক্ষার জন্য মানুষ হত্যা করা যাবে না।
কোনো ব্যতিক্রম গ্রহণযোগ্য নয়।
নিচে আমার স্বাক্ষর।
পাশের পাতায় ইংরেজিতে ছোট নোট:
Operation cancelled by H.
Two missing.
“H কে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“হাসান হতে পারে। পাঠাগার হতে পারে। অন্য কেউও হতে পারে।”
“নিখোঁজ দুজন কারা?”
“একজন সুবর্ণা হতে পারে।”
“অন্যজন?”
অমিত আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই।”
“আমি তো এখানে।”
“দরজার ভেতরের কণ্ঠও দাবি করেছে, সে এখানে।”
অমিতের উত্তরটি রসিকতার সুযোগ দিল না।
ফাইলের নিচে সিল করা একটি খাম।
ওপরে আমার হাতের লেখায়:
আমি ফিরে এসে নিজেকে চিনতে না পারলে
খাম খুলতেই এক পৃষ্ঠার নির্দেশ পাওয়া গেল।
আমি যদি H Library-তে ফিরে এসে নিজের কাজ, ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত মনে করতে না পারি, অমিতকে সম্পূর্ণ সত্য বলতে দেবে না।
১৭১৫ সালের খাম খুলবে না।
দ্বিতীয় কক্ষ কোনো অবস্থায় খুলবে না।
স্নেহা খুব ধীরে অমিতের দিকে ফিরল।
“আপনাকে সম্পূর্ণ সত্য বলতে নিষেধ করেছিল কেন?”
অমিতের চোখ কাগজটির ওপর স্থির।
“চিঠিটির কথা আমি জানতাম না।”
“আপনার কথার কোন অংশ বিশ্বাস করা উচিত?” স্নেহা বলল।
অমিত এবার তার দিকে তাকাল।
“যে অংশ যাচাই করতে পারবেন।”
উত্তরটি ভালো।
সম্ভবত এ কারণেই আরও সন্দেহজনক।
কাগজের নিচে অন্য কালি দিয়ে পরে যোগ করা একটি বাক্য:
সুবর্ণা ফিরে এলে নিয়মটি বাতিল।
দরজাটি খুলো না
নথিকক্ষ থেকে বের হয়ে দেখি, টেবিলের ওপর রাখা সাইকেল-ঘণ্টাটি নেই।
পিস্তলটি কালো কাপড়ের ওপর আছে। চামড়ার খাতাটিও আছে। কিন্তু খাতাটি এখন খোলা।
আমরা কেউ খুলি নি।
পাতায় পাঠাগারের হাতে আঁকা মানচিত্র।
প্রথম পাঠকক্ষ। নথিকক্ষ। ছবির দেয়াল। তারপর পেছনের দেয়ালের বাইরে আরেকটি ছোট ঘর।
দ্বিতীয় কক্ষ।
মানচিত্রের পাশে আমার হাতের লেখায়:
আমি ফিরে এলে আমাকে দ্বিতীয় কক্ষ খুলতে দেবে না।
পেছনের দেয়ালে দৃশ্যমান কোনো দরজা নেই।
শুধু দেয়ালের কাঠের ওপর তিনটি পুরোনো গোল দাগ। যেন একসময় সেখানে তিনটি ফলক ছিল। এখন দুটি নেই।
মাঝের দাগটির নিচে নতুন আঁচড়।
কোনো পুরো নাম নয়।
শুধু ছয়টি উল্লম্ব রেখা।
ষষ্ঠ প্রতিকৃতি?
ষষ্ঠ নাম?
নাকি ষষ্ঠ মানুষ?
স্নেহা দাগটির কাছে আলো ধরল।
কাঠের ফাঁকে কিছু আটকে আছে।
চিমটি দিয়ে ছোট কাগজের টুকরোটি বের করল।
কাগজে মাত্র একটি শব্দ:
SNEHA
কালিটি তাজা নয়। কাগজ পুরোনো। তবে কত পুরোনো, শুধু দেখে বোঝা সম্ভব নয়।
“আমার নাম এখানে কেন?” স্নেহা বলল।
অমিত কোনো উত্তর দিল না।
আমিও না।
ঠিক তখন দ্বিতীয় কক্ষের অন্য পাশ থেকে পিতলের ঘণ্টা বেজে উঠল।
ক্রিং।
একবার।
তারপর আবার।
ক্রিং।
দ্বিতীয় শব্দের পর দেয়ালের ভেতর থেকে ক্ষীণ আঁচড়ের শব্দ শুরু হলো।
খস।
খসখস।
মনে হলো, কেউ কাঠের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে নতুন কোনো নাম লিখছে।
তারপর আমার নিজের কণ্ঠ এল।
বর্তমানের নয়।
অনেক কম বয়সী। অনেক বেশি শান্ত।
“চিঠিটি পড়েছ। এবার অন্তত নিজের কথা শোনো। দরজাটি খুলো না। কারণ সুবর্ণা একা নেই।”
চলবে...
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রচনা-সংক্রান্ত ঘোষণা
‘দত্ত পরিবার’ একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। দত্ত পরিবার, দত্ত ভবন, হাসান, স্নেহা, অমিত, সুবর্ণা, শিহাব, লোকনাথ দাদা, H Library, ১৭১৫ সালের আলোকচিত্র এবং সংশ্লিষ্ট পারিবারিক ও রাজনৈতিক রহস্য সৃজনশীল নির্মাণ। ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাস্তব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলেও এই পর্বের গুপ্ত পাঠাগার, ব্যক্তিগত নথি, ছবি, সাংকেতিক নির্দেশ, অস্ত্রসংক্রান্ত সূত্র, স্মৃতি ও অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা কাল্পনিক। চিকিৎসা, অস্ত্র ও সংঘর্ষের উল্লেখ সাহিত্যিক উপস্থাপনা, বাস্তব জীবনে অনুসরণযোগ্য নির্দেশনা নয়।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0