দত্ত পরিবার | পর্ব ১০: যে দরজা আমাকে চিনত

সুবর্ণার নাম ফিরে আসতেই আহত হাসানের সামনে খুলতে থাকে পুরোনো স্কুল, চেয়ারম্যানবাড়ি ও শিশুশিহাবের ভাঙা স্মৃতি। কিন্তু H Library-এর বন্ধ দরজা তার সম্পর্কে এমন কিছু জানে, যা সে নিজেই ভুলে গেছে।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ২
দত্ত পরিবার | পর্ব ১০: যে দরজা আমাকে চিনত
রাতে দীঘির পাশের পরিত্যক্ত পাঠাগারের গোপন দরজায় পিতলের চাবি হাতে দাঁড়িয়ে আহত হাসান; পাশে চিকিৎসার ব্যাগসহ স্নেহা ও আলো হাতে অমিত, দরজার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ঠান্ডা আলো ও কুয়াশা
অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস

দত্ত পরিবার

পর্ব ১০: যে দরজা আমাকে চিনত

লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান

‘দত্ত পরিবার’ ধারাবাহিক প্রসঙ্গে

১৭১৫ সালের আলোকচিত্রের খোঁজে যারা এসেছিল, তারা সবাই একই কারণে আসেনি। কেউ এসেছিল ঘৃণা নিয়ে, কেউ অদৃশ্য কোনো নির্দেশে এবং কেউ এমন একটি অতীতের সন্ধানে, যা হাসান নিজেই ভুলে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু অতীত সব সময় স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে না। কখনো পুরোনো কোনো নাম হয়ে অপেক্ষা করে। কখনো একটি বন্ধ দরজা হয়ে।

সুবর্ণার নাম

“H খুলতে হবে। সুবর্ণা তোমাকে খুঁজছে।”

অমিত কথাটি খুব নিচু স্বরে বলেছে। তবু মনে হলো, কড়ইগাছের নিচে মাটিতে বসে থাকা মানুষগুলোও শুনেছে। ভাঙা বাঁশ, ভেজা পথ এবং বাতাসে উড়তে থাকা ছোট ছোট জোনাকিও সম্ভবত শুনেছে।

কিছু নাম মানুষের কানে পৌঁছায় না। বুকের ভেতর এমন একটি জায়গায় গিয়ে আঘাত করে, যেটি বহু বছর ধরে বন্ধ ছিল।

সুবর্ণা।

নামটি মাথার মধ্যে উচ্চারণ হতেই কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। পুরোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা। দীঘির পাড়। সাইকেলের পেছনের আসনে বসে থাকা একটি মেয়ে। চেয়ারম্যানবাড়ির কালো ফটক। তার সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া ছোট শিহাব।

দৃশ্যগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগেই মিলিয়ে গেল।

মুখের মধ্যে আবার লোহার স্বাদ পেলাম। ব্যান্ডেজের নিচে জমে থাকা উষ্ণতা কনুইয়ের দিকে নামছে। ক্ষত থেকে রক্ত পড়ছে বুঝতে খুব বেশি চিকিৎসাজ্ঞান লাগে না।

স্নেহা আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে এবার শুধু রাগ বা কৌতূহল নেই। আছে এমন একটি নীরবতা, যার ভেতরে অসংখ্য প্রশ্ন জমে আছে।

“সুবর্ণা কে?”

“পুরোনো একজন পরিচিত।”

“পরিচিত?”

“শব্দটি নিরাপদ।”

“আমি নিরাপদ শব্দ চাইনি। সত্য জানতে চেয়েছি।”

রক্তভেজা ব্যান্ডেজের ওপর সে চাপ দিল। ব্যথা বাহু থেকে কাঁধ হয়ে মাথার ভেতর উঠে গেল। চোখের সামনে অন্ধকারের মধ্যে কয়েকটি সাদা বিন্দু জ্বলে উঠল।

“ব্যথা দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।”

“আইন ডাকতে চাইলে ডাকো। সঙ্গে হাসপাতালও ডেকো।”

অমিত মাটি থেকে নকল খামটি তুলে নিচ্ছিল। খামের এক কোণে কাদা লেগেছে। সে কাপড় দিয়ে কাদা মুছতে মুছতে বলল, “এখানে দাঁড়িয়ে আলোচনা করা যাবে না। যারা চলে গেছে, তারা সবাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে না।”

“তুমি কীভাবে জানো?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

“কারণ তিনজন এখনো আমাদের দেখছে।”

অমিত বাঁশঝাড়ের দিকে তাকাল না। আমরাও তাকালাম না। অন্ধকারে লুকানো কাউকে জানিয়ে দেওয়া উচিত নয় যে তার অবস্থান আপনি বুঝে ফেলেছেন।

স্নেহা আমার ব্যান্ডেজের নিচে পরিষ্কার কাপড় ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “আগে বাড়িতে ফিরতে হবে। ওর ক্ষত আবার খুলে গেছে।”

“বাড়িতে যাওয়া যাবে না,” অমিত বলল।

স্নেহার হাত থেমে গেল।

“কেন?”

“ওরা হাসানের অবস্থান জানে। এখন ওর বাড়িও জানে। আমরা সরাসরি সেখানে গেলে ওর মা ঝুঁকিতে পড়বেন।”

কথাটি শোনার পর মায়ের মুখ মনে পড়ল। ঘরের বাইরে বসে থাকা, চাপা প্রার্থনা করা মানুষটি। আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। জানেন না, আমি চা খাওয়ার কথা বলে প্রায় বিশজন মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে বের হয়েছিলাম।

মায়ের কাছে সত্য বলার সঠিক সময় পৃথিবীতে সম্ভবত কখনো আসে না।

“তাহলে কোথায়?” স্নেহা বলল।

অমিত আমার পকেটের দিকে তাকাল। পিতলের ছোট চাবিটি সেখানে রাখা।

“H-এর পুরোনো স্থানে।”

“H কী?”

“একটি বন্ধ পাঠাগার। অন্তত বাইরে থেকে।”

“ভেতর থেকে?”

অমিত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

“ভেতর থেকে কী, সেটি হাসান আমাদের চেয়ে ভালো জানত।”

“জানত?” আমি বললাম।

“হ্যাঁ। অনেক বছর আগে।”

“তারপর?”

অমিত এবার আমার চোখে চোখ রাখল।

“তারপর তুই সেটি বন্ধ করে দিয়েছিলি।”

আমার হাতে এমন একটি দরজার চাবি দেওয়া হয়েছে, যেটি নাকি আমি নিজেই বন্ধ করেছিলাম। সমস্যা হলো, দরজাটির কথা আমার মনে নেই।

ফেরার বদলে অন্য পথে

শিহাব গ্রামের একজন পরিচিত মানুষের ছোট গাড়ি ডেকে রেখেছিল। অমিত মোটরসাইকেল নিয়ে সামনে চলল। শিহাব চালকের পাশে। আমি আর স্নেহা পেছনের আসনে।

গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, ভেজা কাপড়, পুরোনো আসনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ এবং স্নেহার চিকিৎসার ব্যাগ থেকে বের হওয়া জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ একসঙ্গে নাকে এল।

স্নেহা হারিকেনটি নিজের পায়ের কাছে রাখল। তারপর আমার জামার ডান হাতার কিছু অংশ কেটে ব্যান্ডেজের গিঁট খুলতে শুরু করল।

কাপড় ক্ষতের সঙ্গে লেগে গেছে। সে খুব সাবধানে আলাদা করছিল। তবু প্রতিটি টানে বাহুর ভেতর গরম একটি রেখা ছড়িয়ে পড়ছে।

“স্থির থাকো।”

“আমি যথেষ্ট স্থির। রাস্তার সঙ্গে আলোচনা করো।”

গাড়ির চাকা ঠিক তখন একটি গর্তে পড়ল।

দাঁত চেপেও গলা থেকে চাপা শব্দ বেরিয়ে গেল। মুখের মধ্যে আবার লোহার স্বাদ। কিছুক্ষণ বাইরের সব শব্দ দূরে চলে গেল। শুধু নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি।

স্নেহা আমার চিবুক ধরে মুখটি নিজের দিকে ফেরাল।

“আমার দিকে তাকাও।”

“এই সংলাপটি তুমি গতকালও বলেছিলে। নতুন কিছু চেষ্টা করতে পারো।”

“চুপ করো।”

তার মুখ খুব কাছে। কপালের পাশে কয়েকটি চুল নেমে এসেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছায়া। সম্ভবত গত রাত থেকে ঠিকমতো ঘুমায়নি।

আমার জন্য কেউ ঘুমাতে না পারলে বিষয়টি ভালো লাগার কথা। কিন্তু স্নেহার চোখে যে আঘাত দেখছি, তার সামনে ভালো লাগার অনুভূতিটি খানিকটা অপরাধের মতো মনে হলো।

সে ক্ষতের ওপর নতুন কাপড় চেপে ধরল।

“তুমি জানতেই ওরা আসবে।”

“সম্ভাবনা ছিল।”

“তাই আহত অবস্থায় সেখানে গেলে?”

“ওরা ছবিটি চায় কি না, নিশ্চিত হতে হতো।”

“নিজেকে টোপ বানিয়ে?”

“নকল খামটি টোপ ছিল। আমি শুধু পরিবহন করেছি।”

স্নেহা ব্যান্ডেজের গিঁট স্বাভাবিকের চেয়ে একটু শক্ত করে বাঁধল।

“ব্যথা পেলাম।”

“ভালো। অন্তত এ বিষয়ে সত্য বললে।”

তার হাত আমার বাহু থেকে সরে গেল। কিন্তু প্রশ্নটি সরল না।

“সুবর্ণার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী ছিল?”

গাড়ির জানালার বাইরে তাকালাম। সামনে অমিতের মোটরসাইকেলের লাল আলো ভেজা পাতার ওপর পড়ে উঠছে আর নামছে।

“আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি।”

“শুধু এটুকু?”

“সেই সময়ে এটুকুই অনেক ছিল।”

“তুমি তাকে ভালোবাসতে?”

প্রশ্নটি সরাসরি এল। প্রস্তুত হওয়ার সময় দিল না।

“আমরা তখন খুব ছোট ছিলাম।”

“আমি বয়স জানতে চাইনি।”

এবার উত্তর দিলাম না।

স্নেহা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। কাচে তার মুখের অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব। সেখানে রাগ আছে, কষ্ট আছে, কিন্তু আরও কিছু আছে। বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়।

আমি হয়তো তার কাছে পুরো সত্য বলিনি। কিন্তু সত্যের ভেতরে তাকে প্রবেশ করার দরজাও কখনো দেখাইনি।

“তোমার অতীতের সবাই তোমাকে চিনতে পারে, হাসান। শুধু আমি কেন পারি না?”

“আমি নিজেই যদি না চিনি?”

স্নেহা এবার আমার দিকে তাকাল।

“তাহলে সত্য আর মিথ্যার মাঝখানে লুকিয়ে থেকে লাভ কী?”

“অভ্যাস।”

“অভ্যাস বদলানো যায়।”

“সব অভ্যাস নয়।”

“তাহলে অন্তত স্বীকার করো, তুমি বদলাতে চাইছ না।”

তার সঙ্গে তর্ক করার মতো যুক্তি আমার কাছে ছিল। কিন্তু সব যুক্তি উচ্চারণ করার জন্য নয়। বিশেষ করে যখন বিপরীত পাশে বসে থাকা মানুষটি আপনার ক্ষত থেকে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে।

পুরোনো স্কুল

গাড়িটি বড় রাস্তা ছেড়ে সরু ইটের পথে উঠল। কিছুদূর যেতেই পুরোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দেখা গেল।

লোহার ফটকের নীল রং উঠে মরচে বেরিয়ে এসেছে। মাঠের এক পাশে নতুন একটি ভবন। অন্য পাশে পুরোনো কক্ষগুলো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। বারান্দার সামনে মরচে ধরা একটি দোলনা বাতাস ছাড়াই সামান্য নড়ছে।

ধাতব শিকলের ঘর্ষণের শব্দ গাড়ির কাচ ভেদ করে কানে এল।

শব্দটি ধীরে ধীরে সাইকেলের ঘণ্টায় বদলে গেল।

চোখের সামনে তখন আর রাতের পরিত্যক্ত বিদ্যালয় নেই।

দুপুরের আলোয় একই মাঠ। বারান্দার সামনে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দৌড়াচ্ছে। একটি মেয়ে হাতে দুটি বই নিয়ে আমার দিকে আসছে। চুল দুটি বেণিতে বাঁধা। মুখে বিরক্তি।

“তুমি আবার আমার জন্য অপেক্ষা করোনি।”

কিশোর আমি সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে দাঁড়িয়ে আছি।

“অপেক্ষা করলে মানুষ দুর্বল হয়ে যায়।”

মেয়েটি পেছনের আসনে উঠে বসে বলল, “মানুষের জন্য অপেক্ষা করতে জানো না বলেই তোমার কোনো বন্ধু নেই।”

“তুমি তো আছ।”

“আমি বন্ধু বলেছি। সমস্যা বলিনি।”

স্মৃতির সুবর্ণা হাসল।

সেই হাসি আমার পরিচিত। এত পরিচিত যে বুকের ভেতর বহুদিন বন্ধ থাকা কোনো জানালা খুলে গেল।

“আজ কোথায় যাব?” কিশোর আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“লাইব্রেরিতে।”

“ওটা তো বন্ধ।”

“সব বন্ধ দরজা সবার জন্য বন্ধ থাকে না।”

গাড়ির একটি ঝাঁকুনিতে দৃশ্যটি ভেঙে গেল।

কাচে আবার নিজের জ্বরাক্রান্ত মুখ দেখতে পেলাম। বাঁ হাত আসনের কিনারা শক্ত করে ধরে আছে।

স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে।

“কী দেখলে?”

“আমাদের স্কুল।”

“আর?”

“সুবর্ণা।”

এবার তার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিলাম।

স্নেহা কোনো মন্তব্য করল না। তার নীরবতায় কৌতূহলের সঙ্গে খুব সামান্য ঈর্ষা থাকতে পারে। আবার সেটি আমার কল্পনাও হতে পারে।

পুরুষেরা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে গিয়ে নারীদের নীরবতার মধ্যে প্রায়ই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ খুঁজে নেয়।

সামনের আসনে বসা শিহাব হঠাৎ বলল, “ভাইয়া।”

“বল।”

“আমার একটি কথা মনে পড়ছে।”

গাড়ির ভেতর সবাই তার দিকে মনোযোগ দিল।

“ছোটবেলায় একদিন আমি আপনার ঘরে গিয়েছিলাম। তখন কাঁদতেছিলাম।”

“বলেছিলি, সুবর্ণার সঙ্গে দেখা করলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।”

শিহাব ধীরে মাথা নাড়ল।

“কে বলেছিল?”

“আমি এত দিন ভাবতাম চেয়ারম্যান বলেছিল।”

“এখন?”

“এখন মনে হয়, আমি চেয়ারম্যানের ঘরে ঢুকিই নাই। দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম। ভেতরে দুইজন মানুষ কথা বলছিল।”

“তাদের দেখেছিলি?”

“পুরো মানুষ না। একজনের শুধু পা দেখছিলাম।”

শরীরের ভেতর ব্যথার বাইরেও কিছু ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কেমন জুতা?”

শিহাব উত্তর দিতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল।

“বাঁ পায়ের জুতার সামনের অংশ ছেঁড়া ছিল।”

যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সুবর্ণার নাম বলেছে, সে শুধু আজকের হামলার সঙ্গে যুক্ত নয়। বহু বছর আগে চেয়ারম্যানবাড়িতেও সে উপস্থিত ছিল।

কালো ফটকের সামনে

স্কুল পেরিয়ে রাস্তা দীঘির দিকে বাঁক নিল। বাঁ পাশে চেয়ারম্যানবাড়ি।

দেয়াল আগের চেয়ে উঁচু। পুরোনো কালো ফটক বদলে নতুন লোহার দরজা বসানো হয়েছে। তবু দেয়ালের মাথায় ভাঙা কাচের টুকরোগুলো আগের মতো। গাড়ির আলো পড়তেই ভেজা কাচগুলো ছোট ছোট চোখের মতো জ্বলে উঠল।

ফটকের পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।

সাদা পাঞ্জাবি। মাথা সামান্য নিচু। মুখ অন্ধকারে ঢাকা।

গাড়ি কাছে আসতেই সে এক পা পেছনে গেল।

বাঁ পায়ের জুতার সামনের অংশ ছেঁড়া।

“গাড়ি থামান।”

চালক ব্রেকে পা দেওয়ার আগেই স্নেহা আমার বাঁ হাত ধরে ফেলল।

“তুমি কোথাও নামছ না।”

“লোকটিকে দেখেছ?”

“দেখেছি। তাই নামতে দেব না।”

সামনে থাকা অমিতের মোটরসাইকেল হঠাৎ গতি কমিয়ে গাড়ির পাশে এল।

“থামবি না,” সে চিৎকার করল। “সামনে চল।”

গাড়ি থামল না।

পেছনের কাচ দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, মানুষটি ফটকের সামনে নেই।

এত অল্প সময়ে ভেতরে চলে যাওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু ফটকের দুটি পাল্লাই বন্ধ।

তারপর ফটকের ভেতর থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

“হাসান!”

গাড়ির ভেতর সবাই শুনেছে কি না নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্নেহার দিকে তাকালাম।

সে বলল, “আমিও শুনেছি।”

“ভালো। পাগল হলে একা হওয়ার ভয় কমল।”

“কণ্ঠটি কার?”

“জানি না।”

কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা নয়। আবার সত্যও নয়।

কণ্ঠটি সুবর্ণার কি না নিশ্চিত নই। কিন্তু আমার শরীর সেটিকে চিনেছে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এমনভাবে বদলে গেছে, যেন বহু বছর বন্ধ থাকা কোনো ঘড়ি আবার চলতে শুরু করেছে।

H Library

গ্রামের শেষ প্রান্তে এসে গাড়ি থামল।

সামনে সুবর্ণ দীঘি। রাতের অন্ধকারে পানি আর আকাশ আলাদা করা যাচ্ছে না। পাড়ের গাছগুলো পানির ওপর ঝুঁকে আছে। ভেজা মাটি থেকে কাদা, শ্যাওলা ও পচা পাতার মিষ্টি অথচ ভারী গন্ধ উঠছে।

দূরে একটি ব্যাঙ ডেকে থেমে গেল। তারপর চারপাশ এমন নীরব হলো, মনে হলো অন্ধকার নিজেই আমাদের কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে।

দীঘির ডান পাশে গাছপালায় ঢাকা নিচু একটি ভবন।

ছোটবেলায় এখানে একটি পাঠাগার ছিল। টিনের চাল। সামনে সরু বারান্দা। মাটির কাছাকাছি দুটি জানালা। গ্রামের অন্য ছেলেমেয়েরা খুব কম আসত। আমি আর সুবর্ণা আসতাম।

নামটি মনে করার চেষ্টা করলাম।

মাথার ভেতর একটি শব্দ উঠেও মিলিয়ে গেল।

এখন ভবনটির টিনের চাল দেবে গেছে। জানালার ফাঁক ইট দিয়ে বন্ধ। সামনের দরজায় মরচে ধরা শিকল। দেয়ালের নীল রং ঘষে তুলে ফেলা হয়েছে। শুধু অসম্পূর্ণ কয়েকটি চিহ্ন রয়ে গেছে।

গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে পা ঠিক জায়গায় পড়লেও শরীর অন্য দিকে হেলে গেল। স্নেহা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ধরে ফেলল।

তার আঙুল আমার কপালে এসে থামল।

“জ্বর বেড়েছে।”

“স্মৃতি ফিরে আসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।”

“অথবা রক্তক্ষরণ ও সংক্রমণ। পৃথিবীর সবকিছু রহস্য নয়।”

“এই গ্রামে কথাটি বলার আগে দুবার ভাবতে হবে।”

স্নেহা আমার বাঁ হাত নিজের কাঁধে রাখল। ডান হাত শরীরের সঙ্গে স্থির। কয়েক পা হাঁটতেই ক্ষতের ভেতর গরম টান জেগে উঠল।

অমিত মোটরসাইকেলের আলো নিভিয়ে আমাদের কাছে এল। শিহাবকে গাড়ির সঙ্গে থাকতে বলল।

“কেউ এলে ফোন করবি। পাঠাগারের কাছে আসবি না।”

শিহাব বলল, “আপনারা ভেতরে যাবেন?”

“দরজা খুললে।”

“না খুললে?”

অমিত আমার দিকে তাকাল।

“তাহলে বুঝব, ভুল মানুষকে চাবি দিয়েছি।”

“ভুল মানুষ হিসেবে রাতটি আমার জন্য বেশ সফল,” বললাম।

অমিত হাসল না।

“পিস্তলটি কোথায়?”

“ব্যাগে।”

“ব্যবহার করিসনি?”

“তুমি কি হতাশ?”

“স্বস্তি পেয়েছি।”

“তাহলে পাঠালে কেন?”

অমিত ভবনটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই বস্তুটি চিনিস কি না, দেখতে চেয়েছিলাম।”

“চিনেছি।”

“সেটিই সমস্যা।”

স্নেহা আমাদের দুজনের দিকে তাকাল।

“কেউ কি আজ রাতে পুরো একটি বাক্যে সত্য বলবেন?”

অমিত উত্তর দিল না।

আমিও না।

স্নেহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“অসাধারণ। আমি দুজন অসুস্থ মানুষের সঙ্গে একটি বন্ধ পাঠাগারে যাচ্ছি। একজনের শরীরে জ্বর, অন্যজনের চরিত্রে।”

এত অস্বস্তির মধ্যেও আমার হাসি পেল।

সম্ভবত এই প্রথম বুঝলাম, স্নেহার রাগ আমার রসিকতার চেয়ে ভালো।

যে দরজা আমাকে চিনত

অমিত সামনের দরজার কাছে গেল না। ভবনের ডান পাশ ধরে পেছনের দিকে এগোল।

দেয়াল ঘেঁষে হাঁটার সময় ভেজা আগাছা পায়ে লেগে ঠান্ডা পানি ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিচে কাদা। কোথাও পচা পাতার স্তর। কয়েকবার পা পিছলে যাচ্ছিল। স্নেহা আমার বাঁ হাত আরও শক্ত করে ধরে রেখেছে।

পাঠাগারের পেছনে একটি পুরোনো নিমগাছ। তার মোটা শিকড় দেয়ালের ভেতর ঢুকে কয়েকটি ইট আলাদা করে ফেলেছে।

অমিত হাঁটু গেড়ে শিকড়ের নিচের কিছু শুকনো পাতা সরাল। তারপর দুটি আলগা ইট টেনে বের করল।

নিচে ছোট একটি কালো ধাতব পাত দেখা গেল।

পাতটির মাঝখানে চাবির গর্ত। তার ওপরে খোদাই করা একটি অক্ষর।

H

পকেট থেকে পিতলের চাবিটি বের করলাম।

এতক্ষণ ধাতুটি ঠান্ডা ছিল। হাতের তালুতে রাখতেই ধীরে গরম হয়ে উঠল।

প্রথমে ভেবেছিলাম জ্বরের কারণে এমন মনে হচ্ছে। কিন্তু চাবিটি অমিতের হাতে দিতেই সে দ্রুত আঙুল সরিয়ে নিল।

“গরম,” সে বলল।

“আমাকে দেখে আবেগপ্রবণ হয়েছে।”

“প্রতিটি বিপদের সামনে রসিকতা না করলে তোর চলে না?”

“ভয় পেলে আমি বেশি কথা বলি।”

“তুই এখন ভয় পেয়েছিস?”

চাবিটি আবার হাতে নিলাম। ধাতুটির গরমভাব তালুর গভীরে ঢুকে যাচ্ছে।

“খুব।”

অমিত চুপ করে গেল।

আমি ভয় স্বীকার করি না। অন্তত তার সামনে নয়। সম্ভবত এ কারণেই তার মুখে প্রথমবার অনিশ্চয়তা দেখা দিল।

“চাবিটি কোথায় পেয়েছিলে?” স্নেহা অমিতকে জিজ্ঞেস করল।

“আমার কাছে রাখা ছিল।”

“কে দিয়েছিল?”

অমিত আমার দিকে তাকাল।

“হাসান।”

“কখন?”

“সতেরো বছর আগে।”

নিমপাতা থেকে এক ফোঁটা পানি পড়ে আমার গালে লাগল। ঠান্ডা পানিটুকু ঘাম না বৃষ্টি, বুঝতে কিছু সময় লাগল।

“সতেরো বছর আগে তোকে চিনতাম?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“চিনতি।”

“কীভাবে?”

“সেটি এই দরজা খুললে মনে পড়তে পারে।”

“না খুললে?”

“তাহলে হয়তো মনে না পড়াই ভালো।”

চাবিটি গর্তের সামনে ধরলাম।

ঠিক তখন মাটির নিচ থেকে ক্ষীণ একটি শব্দ এল।

টিক।

দীর্ঘ বিরতি।

টিক।

অনেক দিন বন্ধ থাকা কোনো যন্ত্রের ভেতরে একটি চাকা আরেকটি চাকাকে ছুঁয়ে দেখছে।

স্নেহা ফিসফিস করে বলল, “ভেতরে কেউ আছে?”

“থাকার কথা নয়,” অমিত বলল।

“আপনার কোনো উত্তরই আশ্বস্ত করে না।”

অমিত আমার কবজি ধরে থামাল।

“একটি নিয়ম মনে রাখিস।”

“যে জায়গার কথা মনে নেই, তার নিয়ম মনে রাখব কীভাবে?”

“ভেতর থেকে পরিচিত কারও কণ্ঠ শুনলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিবি না।”

“কেন?”

“কারণ কণ্ঠ আর মানুষ সব সময় একই জিনিস নয়।”

স্নেহা বলল, “আপনি কি আগে এমন কণ্ঠ শুনেছেন?”

অমিত উত্তর দিল না।

দূরে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শিহাব হঠাৎ টর্চের আলো তিনবার জ্বালিয়ে নিভিয়ে দিল।

সংকেত।

কেউ আসছে।

বাতাসের ভেতর খুব ক্ষীণ পায়ের শব্দ শোনা গেল। ভেজা পাতার ওপর ধীর পদক্ষেপ। একজন নয়। সম্ভবত দুইজন।

সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।

চাবিটি গর্তে ঢোকালাম।

ধাতব পাতের নিচে কিছু একটা নড়ে উঠল। সেই কম্পন চাবি হয়ে আমার আঙুলে, সেখান থেকে কবজি ও বাহুতে ছড়িয়ে গেল।

ডান বাহুর ক্ষতের ভেতর তীব্র টান জেগে উঠল। হাঁটু দুর্বল হয়ে এল। স্নেহা পাশ থেকে আমাকে ধরে রাখল।

“পারবে?”

“এই প্রশ্নটি করার সময় আরেকটু আগে ছিল।”

চাবি ঘোরানোর চেষ্টা করলাম।

নড়ল না।

আবার চাপ দিলাম।

কিছুই হলো না।

অমিতের মুখে হতাশা নয়, ভয় দেখা দিল।

“কী হয়েছে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

অমিত খুব নিচু স্বরে বলল, “দরজা চাবি নিচ্ছে না।”

“ভুল চাবি?”

“না। ভুল হলে গর্তে ঢুকত না।”

পেছনের পদশব্দ আরও কাছে এসেছে।

শিহাব এবার ফোন করল। অমিত কল গ্রহণ করতেই ওপাশ থেকে তার চাপা কণ্ঠ শোনা গেল।

“দুইজন মানুষ রাস্তা থেকে নামছে। একজনের হাতে লাঠি। অন্যজনকে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না।”

“গাড়ির ভেতরে যা। দরজা বন্ধ কর।”

অমিত ফোন রেখে আবার আমার দিকে ফিরল।

“হাসান, মনে করার চেষ্টা কর। তুই কীভাবে এটি বন্ধ করেছিলি?”

“তুমি যদি ঘটনাটি জানো, নিজেই বলো।”

“আমি বাইরে ছিলাম। তুই আর সুবর্ণা ভেতরে গিয়েছিলি। বের হয়ে এসে চাবিটি আমার হাতে দিয়েছিলি। শুধু বলেছিলি, কেউ যেন আর দরজাটি না খোলে।”

“সুবর্ণা?”

অমিত উত্তর দিতে দেরি করল।

“সে তোর সঙ্গে বের হয়নি।”

চারপাশের শব্দ থেমে গেল।

পেছনের মানুষের পদক্ষেপ। পাতার ওপর পানি পড়া। দীঘির ব্যাঙ। নিজের শ্বাস। সবকিছু।

শুধু অমিতের বাক্যটি মাথার ভেতর রয়ে গেল।

সুবর্ণা আমার সঙ্গে বের হয়নি।

“তারপর সে কোথায় গেল?”

“আমি জানি না।”

“সতেরো বছর ধরে জানো না?”

“তুইও জানিস না।”

অমিতের জামার কলার বাঁ হাতে চেপে ধরলাম। ডান হাত নাড়তে পারছি না। তবু শরীরের ভেতর জমে থাকা রাগ দুর্বলতার হিসাব মানল না।

“এত দিন বলোনি কেন?”

“তুই নিজেই বলতে নিষেধ করেছিলি।”

“কেন?”

“বলেছিলি, তুই মনে করলে ওরাও মনে করবে।”

“কারা?”

অমিতের উত্তর আসার আগেই পেছনের অন্ধকার থেকে একজন মানুষ ডাকল।

“হাসান!”

সেই একই কণ্ঠ। চেয়ারম্যানবাড়ির ফটকের ভেতর থেকে যে কণ্ঠ শুনেছিলাম।

সুবর্ণার মতো।

অথবা সুবর্ণার স্মৃতির মতো।

ঘুরে তাকাতে যাচ্ছিলাম। স্নেহা আমার মুখ দুই হাতে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল।

“তাকাবে না।”

“যদি সত্যিই সে হয়?”

“তাহলে সে তোমাকে এমন কিছু বলবে, যা শুধু তোমরা দুজন জানো। নাম ধরে ডাকলেই মানুষ সত্যি হয়ে যায় না।”

স্নেহার চোখ আমার চোখের খুব কাছে। সেখানে ভয় আছে। তার চেয়েও বেশি দৃঢ়তা।

“দরজার দিকে তাকাও,” সে বলল। “অতীত যদি সত্যিই তোমাকে চায়, তাকে সামনে দিয়ে আসতে হবে। পেছন থেকে নয়।”

কথাটি শুনে মস্তিষ্কের কোথাও আটকে থাকা একটি স্মৃতি নড়ে উঠল।

কিশোর আমি অন্ধকার একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে। সামনে দরজা। পাশে সুবর্ণা। পেছনে কারও পদশব্দ।

সুবর্ণা আমার বাঁ হাত ধরে বলছে:

“পেছনে তাকাবে না। নামটি মনে করো।”

কোন নাম?

দরজার?

পাঠাগারের?

নাকি সেই মানুষটির, যার নাম ষষ্ঠ প্রতিকৃতি থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল?

ঠোঁটের কাছে একটি শব্দ এসে থেমে গেল।

হরিনাথ?

হেমনাথ?

নাকি অন্য কিছু?

স্মৃতিটি নিশ্চিত হওয়ার আগেই পেছন থেকে আবার নারীকণ্ঠ এল।

“তুমি এবারও আমাকে রেখে চলে যাবে?”

চাবির ওপর রাখা আঙুল শক্ত হয়ে গেল।

স্নেহা বলল, “হাসান, আমার দিকে তাকাও।”

“দরজার দিকে তাকাতে বলেছিলে।”

“এখন আমার দিকে তাকাতে বলছি। পরিস্থিতি বদলেছে।”

তার রাগের ভেতরেও পুরোনো স্নেহাকে খুঁজে পেলাম। যে স্নেহা আমার মিথ্যা ধরেও পাশে থাকে। আঘাত পেয়ে দূরে দাঁড়ায়, কিন্তু বিপদে আবার হাত ধরে।

আমি সম্ভবত অতীতের একটি মানুষকে খুঁজতে গিয়ে বর্তমানের আরেকজনকে হারাতে বসেছি।

“যদি দরজা না খোলে?” জিজ্ঞেস করলাম।

স্নেহা বলল, “তাহলে তুমি বেঁচে থাকবে। আপাতত আমার কাছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।”

কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তালুর নিচে থাকা চাবিটি নিজে থেকে সামান্য নড়ে উঠল।

একবার।

তারপর ধীরে ডান দিকে ঘুরল।

আমি ঘোরাইনি।

মাটির নিচে ভারী কিছু সরে যাওয়ার শব্দ হলো। নিমগাছের শিকড় কেঁপে উঠল। দেয়ালের ভেতরে ধাতব দাঁত একটির পর একটি নড়ছে। পুরোনো ইটের ফাঁক থেকে ধুলো ঝরে পড়ল।

পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও থেমে গেছে।

পুরো গ্রাম যেন সেই শব্দ শুনছে।

ধাতব পাতটির নিচে একটি সরু আলোর রেখা জ্বলে উঠল। আলো ধীরে বাম থেকে ডানে গেল। আমার তালু, কবজি এবং মুখের ওপর কয়েক মুহূর্ত স্থির হলো।

তারপর অন্ধকারের গভীর থেকে একটি যান্ত্রিক শব্দ এল।

শব্দটি বাংলা নয়। ইংরেজিও নয়। তবু আমি তার অর্থ বুঝতে পারলাম।

প্রত্যাবর্তন।

দেয়ালের একটি অংশ খুব ধীরে ভেতরের দিকে ঢুকে গেল। একটি সরু ফাঁক তৈরি হলো।

ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এসে মুখে লাগল।

সেই বাতাসে পুরোনো কাগজ, স্যাঁতসেঁতে কাঠ, ধাতু এবং কর্পূরের গন্ধ।

দত্ত ভবনের গন্ধ।

স্নেহা এক পা পিছিয়ে গেল।

“একই গন্ধ।”

অমিতের মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে। সে দরজার ফাঁকের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “এটি হওয়ার কথা নয়।”

“কোন অংশ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “দরজা খোলা, নাকি আমাকে চিনে ফেলা?”

অমিত উত্তর দিল না।

ফাঁকের ভেতরে কোনো আলো নেই। শুধু অন্ধকার। সেই অন্ধকারের অনেক গভীর থেকে সাইকেলের ঘণ্টা শোনা গেল।

একবার।

দুবার।

তারপর একটি মেয়ের কণ্ঠ।

পরিষ্কার। শান্ত। খুব পরিচিত।

“এত দিন পর দরজাটা মনে পড়ল, হাসান?”

স্নেহার আঙুল আমার বাঁ হাত শক্ত করে ধরল।

অমিত পেছনে সরে গেল।

আর আমার মাথার ভেতর বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি স্মৃতি প্রথমবার সম্পূর্ণ একটি বাক্যে ফিরে এল।

সতেরো বছর আগে সুবর্ণা হারিয়ে যায়নি। আমি তাকে এই দরজার ওপাশে রেখে এসেছিলাম।

কিন্তু কেন?

তাকে বাঁচাতে?

নিজেকে বাঁচাতে?

নাকি দরজার ওপাশে যে মেয়েটি ছিল, সে তখন আর সুবর্ণা ছিল না?

উত্তরটি আসার আগেই অন্ধকারের ভেতর থেকে তিনটি আঘাত এল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

নিষিদ্ধ পশ্চিমঘরের দরজাতেও ঠিক এভাবেই তিনবার আঘাত করা হয়েছিল।

তারপর ভেতরের মেয়েটি আবার ডাকল।

এবার সুবর্ণার কণ্ঠে নয়।

আমার নিজের কণ্ঠে।

“দরজা পুরোপুরি খুলো না, হাসান। আমি এখনো ভেতরে আছি।”

চলবে...

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রচনা-সংক্রান্ত ঘোষণা

‘দত্ত পরিবার’ একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। দত্ত পরিবার, দত্ত ভবন, হাসান, স্নেহা, অমিত, সুবর্ণা, শিহাব, লোকনাথ দাদা, H Library, ১৭১৫ সালের আলোকচিত্র এবং সংশ্লিষ্ট পারিবারিক ও রাজনৈতিক রহস্য সৃজনশীল নির্মাণ। ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাস্তব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলেও এই পর্বের গোপন পাঠাগার, চরিত্রের অতীত, স্মৃতি ও অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা কাল্পনিক। চিকিৎসা, অস্ত্র ও সংঘর্ষের উল্লেখ সাহিত্যিক উপস্থাপনা, বাস্তব জীবনে অনুসরণযোগ্য নির্দেশনা নয়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান মোঃ মেহেদি হাসান (কলম নাম: মি. বিকেল)—লেখক, ব্লগার, শিক্ষক এবং ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। • শিক্ষা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। • প্রকাশনা: প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে’ (রকমারি.কম-এ উপলব্ধ)। • অন্যান্য: ‘দ্য ব্যাকস্পেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৩ থেকে মাইক্রোসফট ডেভেলপার প্রোগ্রামে যুক্ত। যেকোনো প্রশ্ন বা যৌথ কাজের আগ্রহে যোগাযোগ করুন: [email protected] অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!