দত্ত পরিবার | পর্ব ০৯: যে মানুষটি ফিরে এসেছিল
স্নেহার পরিচর্যায় আহত হাসানের চাপা অতীত ধীরে প্রকাশিত হয়। পরদিন একই পথে ফাঁদ পেতে ফিরে আসে তার বহুদিন ভুলে থাকা তীব্র ও বিধ্বংসী সত্তা।
অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস
দত্ত পরিবার
পর্ব ০৯: যে মানুষটি ফিরে এসেছিল
লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান
‘দত্ত পরিবার’ ধারাবাহিক প্রসঙ্গে
১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা ও পরিচয়ের সংগ্রাম এবং ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত অভিঘাত বহন করে চলেছে দত্ত ভবন। একই মুখের পুনরাবৃত্তি, মুছে দেওয়া নাম, ১৭১৫ সালের অসম্ভব আলোকচিত্র এবং নিষিদ্ধ পশ্চিমঘরের মধ্যে হাসান এত দিন নিজেকে রহস্যের শিকার বলে দেখিয়েছে। কিন্তু তার দৃশ্যমান জীবনের নিচে চাপা পড়ে আছে এমন একটি অতীত, যাকে সে নিজেই ভুলে থাকতে চেয়েছিল।
জোনাকির পথ থেকে ফিরে
গাড়ির দরজায় হাত রাখার পরও পেছনের পথ থেকে নিজের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম।
“জোনাকিরা এখনো ঘুমায়নি।”
বাক্যটি আমি একবার বলেছি। অন্ধকার সেটি দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে দিয়েছে।
স্নেহা আমাকে গাড়িতে বসানোর সময় একবারও পেছনে তাকাল না। তার দুই হাত আমার ডান বাহুর চারপাশে স্থির। গজের ওপর দিয়ে রক্ত উঠে এসে আঙুলের ফাঁক ভিজিয়ে দিচ্ছে।
“হাতটা নাড়াবে না।”
“আমারও তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই।”
“চুপ করো।”
শিহাব সামনের আসনে উঠে চালককে শহরের দিকে যেতে বলল। গাড়ি চলতে শুরু করতেই প্রথম গর্তে চাকা পড়ল। বাহুর গভীরে আটকে থাকা ধাতব ফলাটি সামান্য নড়ে উঠল।
চোখের সামনে আলো সাদা হয়ে গেল। মুখের ভেতর লোহার স্বাদ। কানের ভেতর নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পেলাম।
স্নেহা আমার চিবুক ধরে মুখটি নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল।
“আমার দিকে তাকাও।”
“এত কাছে থেকে তাকালে সামাজিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।”
“তোমার রসিকতা বন্ধ না হলে চিকিৎসার আগে অন্য ব্যবস্থা করব।”
তার কণ্ঠ কঠিন। কিন্তু বাহু ধরে রাখা আঙুলগুলো কাঁপছে।
গাড়ি শহরের রাস্তার দিকে ঘুরতে যাচ্ছিল। আমি চালককে থামতে বললাম।
“বাড়িতে ফিরে চলুন।”
স্নেহা প্রথমে ভেবেছিল, ভুল শুনেছে।
“কোথায়?”
“আমাদের বাড়িতে।”
“তোমাকে হাসপাতালে নিতে হবে।”
“শহরে যাওয়ার খবর ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে।”
“কীভাবে জানো?”
“জানি না। অনুমান করছি।”
সামনের আসনে শিহাবের কাঁধ সামান্য শক্ত হয়ে উঠল।
“শিহাব,” বললাম। “তুই ওদের কাউকে চিনেছিস?”
“মুখ ঢাকা ছিল, ভাইয়া।”
“মুখই কি মানুষ চেনার একমাত্র উপায়?”
সে উত্তর দিল না।
স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে রইল। সে সম্ভবত প্রথমবার বুঝল, আঘাত পাওয়ার পরও আমি শুধু ব্যথার কথা ভাবছি না। মানুষ, পথ, সময় ও নীরবতার হিসাব করছি।
“হাসপাতালে না গেলে বিপদ হতে পারে।”
“হাসপাতালে গেলেও হতে পারে।”
“তুমি আসলে কাকে ভয় পাচ্ছ?”
উত্তর দিলাম না।
আমার ভয় কোনো এক ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। ভয়টি ছিল বহুদিন বন্ধ রাখা একটি জীবনের দরজা আবার খুলে যাওয়া নিয়ে।
রক্ত, হলুদ আলো ও পুরোনো দাগ
বাড়িতে পৌঁছানোর পর মা প্রথমে আমার মুখ দেখলেন। তারপর রক্তে ভেজা গজ। সবশেষে বাহুতে আটকে থাকা ফলার কালচে হাতল।
তাঁর মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। দুই হাত বুকের সামনে উঠে স্থির হয়ে গেল।
“কিছু হয়নি,” বললাম।
স্নেহা আমার দিকে তাকাল।
“তোমাদের পরিবারের এই উত্তরটি নিষিদ্ধ করা দরকার।”
আমাকে ঘরে নেওয়া হলো। মাটির দেয়াল, শুকনো খড়, পুরোনো কাঠ ও মায়ের কাপড়ে লেগে থাকা হলুদের পরিচিত গন্ধ নাকে এল। এত দিনের মধ্যে প্রথমবার দত্ত ভবনের কর্পূর ও স্যাঁতসেঁতে কাগজের গন্ধ থেকে দূরে এসেছি।
তবু ঘরটিকে নিরাপদ মনে হলো না।
নিরাপত্তা শুধু জায়গার বৈশিষ্ট্য নয়। কারা আপনার অবস্থান জানে, সেটিও নিরাপত্তার অংশ।
স্নেহা দরজা বন্ধ করল। শিহাবকে পানি, আলো, পরিষ্কার কাপড় ও চিকিৎসার ব্যাগ আনতে বলল। মাকে পাশের ঘরে পাঠাতে সময় লাগল। মা যেতে চান না।
শেষ পর্যন্ত বললাম, “আপনি সামনে থাকলে ভয় পেয়ে যাব।”
মা চোখ মুছে বললেন, “এতক্ষণ ভয় পাওনি?”
“আপনাকে দেখার পর মনে পড়েছে আমি মানুষ।”
মা চলে গেলেন। দরজার বাইরে তাঁর চাপা প্রার্থনা শোনা যাচ্ছিল।
এরপর ঘরে শুধু আমি, স্নেহা, বাতির শিখা এবং রক্তের ধাতব গন্ধ।
চিকিৎসার মুহূর্তগুলো পরে টুকরো টুকরো মনে ছিল। কিছু স্মৃতি শরীর নিজের কাছে রেখে দেয়। মানুষকে শুধু ব্যথার ছায়াটুকু ফিরিয়ে দেয়।
মনে আছে, স্নেহা আমার বাঁ হাত শক্ত করে ধরেছিল।
মনে আছে, হারিকেনের শিখাটি একবার লম্বা হয়ে উঠেছিল।
মনে আছে, ব্যথার সবচেয়ে তীব্র মুহূর্তে চোখের সামনে প্রথমে অন্ধকার এবং পরে অসংখ্য সাদা বিন্দু জ্বলে উঠেছিল।
তবু চিৎকার করিনি। মাটির দেয়ালের একটি ফাটলের দিকে তাকিয়ে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ছিলাম।
স্নেহা থেমে গেল।
“শ্বাস এভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখলে কোথায়?”
“বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার হলে।”
“হাসান।”
তার কণ্ঠে বিরক্তি ছিল না। ছিল সতর্কতা।
স্নেহার চোখ আমার কাঁধের ফিকে ক্ষতচিহ্নে গেল। তারপর পাঁজরের কাছে আরেকটি দাগে।
“এটি কীসের?”
“সাইকেল থেকে পড়েছিলাম।”
“আর এটি?”
“বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।”
“তোমাদের অনুষ্ঠানে কি অস্ত্র ব্যবহার করা হতো?”
“শিল্পের প্রতি আমাদের আন্তরিকতা একটু বেশি ছিল।”
স্নেহা হাসল না।
আমার রসিকতা প্রথমবার আমাকে আড়াল করতে ব্যর্থ হলো।
স্নেহা ধীরে জিজ্ঞেস করল
“তোমার অন্য পরিচয় কী ছিল?”
“যে পরিচয় ভুলে যেতে চাইছি।”
“কার কাছ থেকে পালাচ্ছিলে?”
“নিজের কাছ থেকে।”
স্নেহা আর কিছু বলল না। তবে তার নীরবতা বলে দিল, জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়নি। শুধু স্থগিত হয়েছে।
অমিতের পাঠানো প্যাকেট
রাত গভীর হওয়ার পর জ্বর এল। স্নেহা আমার পাশে বসে রইল। কখনো কবজির স্পন্দন পরীক্ষা করছে, কখনো কপালে ভেজা কাপড় রাখছে।
মাঝরাতে উঠানে মোটরসাইকেলের শব্দ হলো।
শব্দটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলো। কেউ ইঞ্জিন বন্ধ করল না।
শিহাব বাইরে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এল কালো কাপড়ে মোড়া একটি প্যাকেট হাতে।
“অমিত ভাই দিয়েছে।”
স্নেহার হাত থেমে গেল।
“অমিত?”
আমি তার দিকে তাকালাম।
নামটি শোনার পর তার মুখে বিস্ময়ের বদলে পরিচিত আশঙ্কা। পর্ব ০৮-এর সেই প্রশ্ন আবার ফিরে এল। আমি কখনো নামটি না বললেও স্নেহা কীভাবে অমিতকে জানত?
শিহাব প্যাকেটটি টেবিলে রাখল।
“বলছে, শুধু ভাইয়া খুলবে।”
“আর কিছু?”
“H এখনো বন্ধ আছে।”
স্নেহার চোখ এবার আমার মুখে।
“H কী?”
“একটি ইংরেজি অক্ষর।”
“সেটা আমি জানি।”
“তাহলে প্রশ্নের অর্ধেক উত্তর তোমার জানা।”
শিহাব চলে যাওয়ার পর প্যাকেটটি খুললাম।
কালো কাপড়ের ভেতর কালচে ধাতব একটি পিস্তল। রুশ নির্মিত। পাশে ছোট একটি পিতলের চাবি ও অমিতের হাতের লেখা কাগজ।
রুশ নির্মিত পিস্তল
MP-443 Grach
অস্ত্রটি হাতে নিইনি। কাপড়ের ওপর রেখেই দেখলাম।
স্নেহা আমার মুখ দেখছিল। অস্ত্র নয়।
“তুমি অবাক হওনি।”
“এই বাড়িতে আসার পর বিস্ময়ের ক্ষমতা কমে গেছে।”
“রুশ পিস্তলও এখন সাধারণ ঘটনা?”
“সাধারণ নয়। পরিচিত।”
ভুল শব্দটি মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে।
স্নেহা সেটি ধরে ফেলল।
“কীভাবে পরিচিত?”
উত্তর না দিয়ে চাবিটি তুলে নিলাম। গায়ে খোদাই করা একটিমাত্র অক্ষর।
H
অমিতের কাগজে লেখা:
“একই পথে ফিরলে ওরা আবার আসবে।
তবে সবাই একই কারণে আসবে না।
H খুলিস না, যতক্ষণ না বুঝছিস কে ছবিটা চায়।”
স্নেহা বলল, “আগামীকাল কোথাও যাবে না।”
“ঠিক আছে।”
“কথা দাও।”
“দিলাম।”
স্নেহা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, প্রতিশ্রুতিটির আয়ু সকাল পর্যন্তও নয়।
পরদিন সন্ধ্যার চা
বিকেলের শেষ আলোয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যান্ডেজের ওপর জামার ঢিলেঢালা অংশ নামিয়ে দিলাম।
ডান হাত প্রায় অকার্যকর। জ্বর পুরোপুরি ছাড়েনি। মাথায় সামান্য ভার। দ্রুত হাঁটলে ক্ষতের ভেতরে গরম টান জেগে ওঠে।
তবু বাইরে থেকে আমাকে শুধু দুর্বল দেখাচ্ছে।
দুর্বল দেখানো এবং দুর্বল হওয়া এক বিষয় নয়।
মাকে বললাম, লোকনাথ দাদার দোকান থেকে চা খেয়ে ফিরব। স্নেহাকে বললাম, উঠানের বাইরে যাচ্ছি না।
দুটি কথার কোনোটিই পুরো সত্য নয়।
পিস্তলটি কাপড়ে মোড়া অবস্থায় ব্যাগের নিচে রাখলাম। ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেই। কিন্তু অমিত কেন এটি পাঠিয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বস্তুটির উপস্থিতি প্রয়োজন।
১৭১৫ লেখা আসল খামটি মায়ের পুরোনো আলমারির এমন একটি অংশে রেখে দিলাম, যেখানে শৈশবে নিজের পরীক্ষার খাতা লুকাতাম। সঙ্গে নিলাম একই রকম দেখতে একটি খালি খাম।
লোকনাথ দাদার দোকানে ঢুকতেই পোড়া চা-পাতা, আদা, দুধ, কয়লার ধোঁয়া ও ভেজা কাঠের ভারী গন্ধ নাকে এল। কেতলির ঢাকনাটি বাষ্পের চাপে বারবার কেঁপে উঠছে।
দোকানে চারজন অপরিচিত মানুষ। আমাকে দেখার পরও তারা তাকাল না। এই অতিরিক্ত সতর্কতাই প্রথম সন্দেহ।
একজনের আঙুল টেবিলের কিনারায় অনিয়মিত ছন্দ তুলছে। অন্যজনের পা দরজার দিকে ঘোরানো। তৃতীয়জনের চা ঠান্ডা, তবু গ্লাসটি মুখের কাছে ধরে আছে।
“কড়া লিকার, চিনি কম,” বললাম।
চায়ের প্রথম চুমুকে জিভ পুড়ে গেল। ভালো হলো। ব্যথা মানুষকে বর্তমান সময়ে ফিরিয়ে আনে।
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বললাম, “১৭১৫ সালের ছবিটা আজ শহরে পাঠিয়ে দেব।”
চারজনের মধ্যে একজনের হাত থেমে গেল।
কেউ জানতে চাইল না, কোন ছবি।
অর্থাৎ তারা জানে।
একজন চা শেষ না করেই বেরিয়ে গেল।
টোপ কাজ করেছে।
লোকনাথ দাদা নিচু স্বরে বললেন, “অন্য পথ দিয়া যাইয়ো।”
“আজ রাস্তা বদলালে ওরা ভাববে ভয় পেয়েছি।”
“ভয় পাওয়া লজ্জার না।”
“জানি। কিন্তু ভয়টাকে কারা ব্যবহার করছে, তা না জানাটা লজ্জার।”
স্নেহার অনুসরণ
আমি চলে যাওয়ার প্রায় দশ মিনিট পর স্নেহা বুঝেছিল, উঠানে হাঁটতে বের হওয়া মানুষ পিতলের চাবি ও কালো ব্যাগ সঙ্গে নেয় না।
টেবিলের নিচে অমিতের কাগজটিও নেই।
সে শিহাবকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, আমি কোথায় যেতে পারি।
শিহাব প্রথমে জানে না বলল। পরে স্নেহার চোখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত বদলাল।
“লোকনাথ দাদার দোকান। তারপর সম্ভবত পুরোনো রাস্তা।”
“সম্ভবত?”
“ভাইয়া গতকাল যে জায়গায় হামলা হইছিল, সেখানে আবার যাবে।”
“তুমি জানলে কীভাবে?”
শিহাব উত্তর দিল না।
স্নেহা চিকিৎসার ব্যাগ হাতে নিল। যাওয়ার আগে অমিতের নম্বর চাইল।
শিহাব নম্বরটি মুখস্থ জানত।
এটিও স্নেহা মনে রাখল।
একই পথ, অন্য হাসান
সন্ধ্যা নামার সময় আবার কড়ইগাছের সামনে দাঁড়ালাম।
নিচু জমি থেকে কাদা, ভেজা ঘাস ও পচা পাতার গন্ধ উঠছে। বাঁশঝাড়ের ওপর শেষ আলো মরে গেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দের ভেতরে কোথাও কোথাও মানুষের চাপা শ্বাস।
গত রাতের রক্ত নেই। ছেঁড়া কাপড় নেই। বাঁশের লাঠিও সরানো হয়েছে।
বৃষ্টি হয়নি।
কেউ প্রমাণ মুছে দিয়েছে।
এক মিনিট অপেক্ষা করলাম। তারপর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললাম, “চা শেষ। এবার বেরিয়ে আসতে পারেন।”
প্রথমে বাঁ পাশের ঝোপ নড়ল। একজন বেরিয়ে এল। তারপর তিনজন। পেছন থেকে পাঁচজন। বাঁশঝাড়ের নিচ থেকে বাকিরা।
প্রায় বিশজন।
তবে তারা এক দল নয়।
দুই ধরনের পোশাক। দুই ধরনের সম্ভাষণ। দুই ধরনের রাগ। একই অন্ধকারে দাঁড়িয়েও দুই পক্ষের মাঝখানে অদৃশ্য সীমারেখা।
তাদের অধিকাংশ এসেছে স্নেহাকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক ক্রোধে। কিন্তু তিনজনের চোখ বারবার আমার ব্যাগে যাচ্ছে।
তিনজন ছবিটির জন্য এসেছে।
একজন বলল, “মেয়েটাকে কালকের মধ্যে পাঠিয়ে দিবি।”
অন্য দিক থেকে আরেকজন বলল, “আগে খামটা দে।”
কয়েকজন বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল।
সবাই খামের কথা জানে না।
আমি নকল খামটি মাটিতে রাখলাম।
“আপনাদের মধ্যে কে নেবেন?”
প্রথম পক্ষের একজন এগোতেই দ্বিতীয় পক্ষ তার পথ আটকায়।
“গতকাল ধর্মের জন্য এক ছিলেন,” বললাম। “আজ একটি পুরোনো ছবি আপনাদের আলাদা করে দিল?”
একজন গালি দিয়ে সামনে এল।
তারপর সন্ধ্যার নীরবতা একসঙ্গে অনেক শব্দে ভেঙে গেল।
ভারী পায়ের শব্দ।
বাঁশের সঙ্গে বাঁশের আঘাত।
শুকনো ডাল ভাঙা।
ভেজা মাটিতে শরীর পড়ে যাওয়ার চাপা আওয়াজ।
আর অন্ধকারে কে কাকে আঘাত করছে, তা না বুঝতে পারা মানুষের চিৎকার।
ডান বাহু শরীরের কাছে স্থির। শক্তির প্রতিযোগিতায় নামার উপায় নেই।
তার বদলে আগের রাতের প্রতিটি ভুল মনে রেখেছিলাম। কোন জায়গায় মাটি নরম। কোথায় গাছের শিকড় ওপরে। কে আঘাত করার আগে গালি দেয়। কে নির্দেশের অপেক্ষা করে। আর কে শুধু দলের সাহসে সামনে আসে।
প্রথম মানুষটি তেড়ে এল। শেষ মুহূর্তে আমাকে সামনে না পেয়ে নিজের গতিতেই অন্ধকারে ঢুকে গেল। পেছনের দুজন তাকে সামলাতে গিয়ে একসঙ্গে ভেজা মাটিতে বসে পড়ল।
“একজনকে ধরতে তিনজন,” বললাম। “দলগত কাজ প্রশংসনীয়।”
উত্তরে আমার পূর্বপুরুষদের বিষয়ে অপ্রকাশযোগ্য মন্তব্য এল।
আরেকজন খামের দিকে এগিয়ে যেতেই ভিন্ন পক্ষের লোক তাকে ধাক্কা দিল। মুহূর্তের মধ্যে ছবির মালিকানা নিয়ে নিজেদের মধ্যে টানাটানি শুরু হলো।
একটি লাঠি আমার দিকে উঠেছিল। মাঝপথে অন্য কারও কাঁধে গিয়ে পড়ল। মানুষটি ব্যথার চেয়ে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে বেশি চিৎকার করতে লাগল।
“আমাকে মারতে এসেছেন,” বললাম। “নিজেদের মধ্যে মহড়া পরে করলেও চলত।”
তারা সংখ্যায় অনেক। কিন্তু সংখ্যার সঙ্গে সিদ্ধান্ত ভাগ হয়ে যায়। বিশজন মানুষের বিশটি ভয়, বিশটি রাগ এবং বিশটি আলাদা লক্ষ্য।
আমার লক্ষ্য একটি।
কে তাদের পাঠিয়েছে?
অন্ধকারে আমি কখনো গাছের ছায়ায়, কখনো পথের নিচু অংশে, কখনো তাদের দুই দলের মাঝখানে।
একজন সামনে এসে ভারী কিছু ঘোরাল। বাতাসের চাপ মুখে লাগল। পাশে থাকা শুকনো ডাল ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল।
“গাছটির সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল?” জিজ্ঞেস করলাম।
লোকটি আবার এগোল। কয়েক মুহূর্ত পর মাটিতে বসে হাঁটু ধরে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবতে লাগল।
আরেকজন পড়ে থাকা লাঠি তুলতে গিয়ে সেটি পাশের মানুষের পায়ের ওপর ফেলল। দুইজনের মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় ঐক্যের বদলে ব্যক্তিগত গালাগালি শুরু হলো।
দ্রুত নড়াচড়ার প্রতিটি মুহূর্তে ডান বাহুর ভেতর গরম ব্যথা জেগে উঠছে। ব্যান্ডেজের নিচে নতুন রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে। মুখের ভেতর লোহার স্বাদ। চোখের সামনে সাদা বিন্দু।
তবু থামলাম না।
ভয় পেলে আমি সাধারণত বেশি কথা বলি।
আজ ভয় পেয়েও চুপ ছিলাম।
এটিই সম্ভবত তাদের বেশি ভয় পাইয়েছে।
পেছন থেকে একজন নির্দেশ দিচ্ছিল। গত রাতেও একই কণ্ঠ বলেছিল, আমাকে হত্যা নয়, ভয় দেখানোর নির্দেশ আছে।
আমি তার দিকে এগোতে শুরু করলাম।
দুজন পথ আটকাতে এল। কয়েক সেকেন্ড পর একজন কড়ইগাছের নিচে বসে আছে। অন্যজন লাঠি তুলতে গিয়ে হাত থেকে আবার ফেলে দিয়েছে।
“স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছে না?”
উত্তরে লোকটি আমার পূর্বপুরুষ নিয়ে আরেকবার মন্তব্য করল।
“পূর্বপুরুষের পরিচয় বের করতেই তো এত আয়োজন,” বললাম। “সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ।”
নির্দেশদাতা পেছাতে শুরু করল। তার বাঁ জুতার সামনের অংশ ছেঁড়া। এই জুতা আগে দেখেছি। কোথায়, স্মৃতি তখনো পুরো ফিরল না।
“ছবিটা কোথায়?” সে বলল।
“নিরাপদ জায়গায়।”
“H-এ?”
আমার মুখের কোনো পেশি নড়ল না।
কিন্তু ভেতরে একটি হিসাব মিলল।
সে H সম্পর্কে জানে।
আমি উত্তর দিলাম না। লোকটি নিজেই সিদ্ধান্ত নিল, ছবিটি এখানে নেই। সঙ্গীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিল।
চলে যাওয়ার আগে সে থামল।
অন্ধকার থেকে প্রশ্ন এল
“সুবর্ণা জানে তুমি ফিরেছ?”
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা। সুবর্ণ দীঘির পাড়। একটি সাইকেলের পেছনের আসন। চেয়ারম্যানের বাড়ির ফটক। আর শিহাবের শিশুকণ্ঠ।
সব একসঙ্গে মনে পড়ল।
তবু বললাম, “কার কথা বলছেন?”
লোকটি হাসল।
“তুমি এখনো ভালো মিথ্যা বলো, হাসান।”
“ধন্যবাদ।”
“কিন্তু চোখ আগের মতোই দুর্বল।”
সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
যে মানুষকে স্নেহা চিনত না
চারপাশে তখন ভাঙা লাঠি, হাঁপাতে থাকা মানুষ, ভেজা মাটি ও নতুন করে জ্বলে ওঠা জোনাকি। কেউ বসে আছে। কেউ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কেউ অন্য পক্ষকে গালি দিচ্ছে।
একজন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই মানুষ না।”
“কালও ছিলেন আপনারা,” বললাম। “তখন প্রশ্নটা মনে হয়নি?”
দূরে মোটরসাইকেলের শব্দ উঠল।
অমিত পৌঁছাল। তার পেছনে স্নেহা ও শিহাব।
অমিত মোটরসাইকেল থেকে নেমে চারপাশ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কমরেড, তোকে কি বিশ্রাম শব্দের অর্থ শেখাতে হবে?”
“লাইব্রেরিতে বই থাকলে দেখে নেব।”
অমিতের মুখে সূক্ষ্ম পরিবর্তন এল।
স্নেহা সেটি দেখল।
তার চোখ প্রথমে আমার রক্তভেজা ব্যান্ডেজে, তারপর অমিতের মুখে এবং সবশেষে ব্যাগ থেকে বেরিয়ে থাকা পিতলের চাবিতে থামল।
চাবিতে খোদাই করা অক্ষরটি হারিকেনের আলোয় স্পষ্ট।
H
“কোন লাইব্রেরি?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
আমার উত্তর দেওয়ার আগেই মাটিতে বসে থাকা একজন হেসে উঠল।
“ও জানে না?”
অমিত একবার তাকাতেই লোকটির হাসি থেমে গেল।
স্নেহা আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি চা খেতে এসেছিলে?”
“চা খেয়েছি।”
“ওদের জন্য অপেক্ষাও করেছ।”
“দুটো কাজ একসঙ্গে করা যায়।”
“তুমি জানতেই ওরা আসবে।”
“সম্ভাবনা ছিল।”
“তুমি আসলে কে, হাসান?”
চারপাশে ছত্রভঙ্গ মানুষ। ডান বাহুতে নতুন রক্ত। ব্যাগের ভেতরে অমিতের দেওয়া রুশ পিস্তল। পকেটে H লেখা চাবি। আর বহুদিন ভুলে থাকতে চাওয়া একটি নাম মাথার মধ্যে জেগে উঠছে।
সুবর্ণা।
“তুমি যাকে চিনেছ,” বললাম, “সে মিথ্যা নয়।”
“কিন্তু সম্পূর্ণও নয়?”
উত্তর দেওয়ার আগেই অমিত বলল, “এখানে আর থাকা যাবে না।”
সে আমার হাতে থাকা চাবির দিকে তাকাল।
অমিত খুব নিচু স্বরে বলল
“H খুলতে হবে। সুবর্ণা তোমাকে খুঁজছে।”
স্নেহা আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে এবার শুধু ভয় বা কৌতূহল নেই। আছে আহত বিশ্বাসের একটি সরু রেখা।
আমি বুঝলাম, পরবর্তী দরজাটি খুললে শুধু H Library-এর গোপন তথ্য বের হবে না।
বের হবে সেই হাসান, যাকে বহু বছর ধরে নিজের ভেতর তালাবদ্ধ রেখেছিলাম।
চলবে...
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রচনা-সংক্রান্ত ঘোষণা
‘দত্ত পরিবার’ একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। দত্ত পরিবার, দত্ত ভবন, হাসান, স্নেহা, অমিত, সুবর্ণা, শিহাব, লোকনাথ দাদা, H Library, ১৭১৫ সালের আলোকচিত্র এবং সংশ্লিষ্ট পারিবারিক ও রাজনৈতিক রহস্য সৃজনশীল নির্মাণ।
১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাস্তব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হলেও এই পর্বের সংঘর্ষ, গোপন সংগ্রহশালা, আলোকচিত্র, চরিত্রের অতীত ও অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা কাল্পনিক। চিকিৎসা, অস্ত্র ও সংঘর্ষের দৃশ্যগুলো সাহিত্যিক উপস্থাপনা, বাস্তব জীবনে অনুসরণযোগ্য নির্দেশনা নয়।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0