দত্ত পরিবার | পর্ব ০৬: ১৭১৫ সালের মানুষ
দত্ত ভবনের ভূগর্ভস্থ আর্কাইভে হাসান আবিষ্কার করে নিজের মতো দেখতে ১৭১৫ সালে মৃত এক মানুষের প্রতিকৃতি। কিন্তু মায়ের অসুস্থতার খবর তাকে ফিরিয়ে আনে জীবনের কঠিন বাস্তবতায়।
অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস
দত্ত পরিবার
পর্ব ০৬: ১৭১৫ সালের মানুষ
লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান
‘দত্ত পরিবার’ ধারাবাহিক প্রসঙ্গে
১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা ও পরিচয়ের সংগ্রাম এবং ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত অভিঘাত বহন করে চলেছে দত্ত ভবন। একই মুখের পুনরাবৃত্তি, মুছে দেওয়া একটি নাম, সাড়ে বারোটায় থেমে থাকা ঘড়ি এবং নিষিদ্ধ পশ্চিমঘরের মধ্যে হাসান ধীরে ধীরে এমন এক ইতিহাসে প্রবেশ করছে, যেখানে জীবিত ও মৃতের সীমারেখা কোনো স্থায়ী নিয়ম মানে না।
বরফের মতো ঠান্ডা হাত
স্নেহার হাতের শীতলতা আমার আঙুল পেরিয়ে ধীরে ধীরে কবজি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল।
আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। বাঁ ভ্রুর পাশে ছোট তিলটি আছে। চোখের পাতায় ক্লান্তির ছাপ, কপালের কাছে কয়েকটি এলোমেলো চুল এবং ঠোঁটের কোণে জমে থাকা অপ্রকাশিত ভয়ও যথারীতি চেনা।
কিন্তু কাচের আলমারিতে যে স্নেহাকে দেখা যাচ্ছে, সে আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই।
প্রতিবিম্বের স্নেহা স্থির দৃষ্টিতে পশ্চিমঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমার প্রতিবিম্বটি দাঁড়িয়ে আছে উত্তর দেয়ালের ষষ্ঠ প্রতিকৃতির সামনে। মাথা সামান্য উঁচু করে ছবির মানুষটির চোখে চোখ রেখেছে।
আমরা বাস্তবে যেখানে দাঁড়িয়ে নেই।
টাইপরাইটারটি তখন নিশ্চুপ। কাগজের ওপর মুছে দেওয়া নামের শেষ অংশ এবং আজকের তারিখ পাশাপাশি ফুটে আছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও সব কটি চাবি একসঙ্গে নেমে এসেছিল। এখন যন্ত্রটির ধাতব শরীর এমন নিরীহভাবে স্থির হয়ে আছে, যেন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনায় তার অংশগ্রহণ ছিল না।
পশ্চিমঘরের ভেতর থেকেও আর কোনো ডাক আসছে না।
নীরব হয়ে যাওয়া মানেই অবশ্য চলে যাওয়া নয়। দরজার ওপাশে কেউ আরও কাছে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছে, এমন একটি অনুভূতি ঘরের বাতাসে রয়ে গেল।
“স্নেহা?”
সে উত্তর দিল না।
তার হাতটি নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে আলতোভাবে চেপে ধরলাম। উষ্ণ করার জন্য আঙুলের ওপর আঙুল বুলাতেই সে চমকে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে কয়েক মুহূর্তের জন্য এমন বিস্ময় ফুটে উঠল, যেন সে ভুলেই গিয়েছিল আমি পাশে আছি।
“তোমার কী হয়েছে?”
“কিছু হয়নি।”
“তোমাদের পরিবারের এই উত্তরটি নিষিদ্ধ করা উচিত।”
“কেন?”
“তোমরা যতবার ‘কিছু হয়নি’ বলো, তার পরপরই এমন কিছু ঘটে, যার ব্যাখ্যা দিতে একজন সুস্থ মানুষের অন্তত তিনটি জীবন প্রয়োজন।”
স্নেহার ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য হাসি ফুটল। ভয় পুরোপুরি সরল না, কিন্তু মুখটি আবার পরিচিত হয়ে উঠল।
“আগেও তোমার হাত এমন ঠান্ডা হয়েছে?”
সে হাতটি সরিয়ে নিল না। বরং নিজের আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কিছু পুরোনো জিনিস কখনো কখনো মানুষকে চিনতে পারে। তখন শরীরের তাপমাত্রা বদলে যায়।”
“এই যন্ত্রটি তোমাকে চিনেছে?”
“সম্ভবত আপনাকে।”
কথাটি বলেই সে ধীরে নিজের হাত সরিয়ে নিল। তার আঙুলের স্পর্শ চলে যাওয়ার পর তালুর মধ্যে অদ্ভুত একটি শূন্যতা অনুভব করলাম।
সম্পর্কের কিছু মুহূর্ত সম্ভবত এভাবেই তৈরি হয়। কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না। কোনো স্বীকারোক্তিও থাকে না। শুধু হাত সরে যাওয়ার পর মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটুকু হঠাৎ প্রয়োজনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
স্নেহা কাচের আলমারির দিকে তাকাল।
আলমারির ভেতরের প্রতিবিম্বগুলো আর নেই। সেখানে এখন শুধু ঘরের অস্পষ্ট প্রতিফলন। ষষ্ঠ প্রতিকৃতি, কাপড়ে ঢাকা কয়েকটি বাক্স আর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের দুজনের স্বাভাবিক ছায়া।
আমি চোখ মুছে আবার তাকালাম। দৃশ্যটি বদলাল না।
“এর ব্যাখ্যা কী?”
“জানি না।”
“আবার সেই উত্তর।”
“মিথ্যা ব্যাখ্যার চেয়ে এটিই নিরাপদ।”
এ বিষয়ে তার সঙ্গে দ্বিমত করার কারণ পেলাম না।
স্নেহা খুব সাবধানে টাইপরাইটারের রোলার ঘোরাল। এবার কাগজটি বাধা দিল না। ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এল। সে কাগজের দুই প্রান্ত ধরে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল, তারপর যন্ত্র থেকে বের করে আলোয় ধরল।
কাগজের ওপর লেখা বাক্য, মুছে যাওয়া নাম এবং আজকের তারিখের বাইরে আর কিছু নেই। পেছনের দিকও ফাঁকা।
“এটি মায়ের কাছে রাখতে হবে,” স্নেহা বলল।
“তোমার মা তো বাড়িতে নেই।”
সে এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমরা দুজনই জানি, বাড়িতে না থাকা এবং এই বাড়িতে উপস্থিত না থাকা এক বিষয় নয়।
“যন্ত্রটির ইতিহাস ওপরে নেই,” স্নেহা বলল। “এর বাক্স, নথি এবং পুরোনো হিসাব সব নিচের আর্কাইভে রাখা।”
“এই ঘরেরও নিচে কিছু আছে?”
“হ্যাঁ।”
“তোমার মা আমাকে তার কথা বলেননি।”
“মা আপনাকে বাড়িটি দেখিয়েছেন। বাড়ির প্রতিটি স্মৃতি নয়।”
“আর তুমি এখন দেখাবে?”
স্নেহা কাগজটি ভাঁজ না করে দুটি পুরোনো বইয়ের মাঝখানে রাখল। তারপর নিচের তাকগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।
“টাইপরাইটারটি আপনাকে দেওয়ার কথা অনেক আগে থেকেই ছিল,” সে বলল। “মা সময় ঠিক করেননি। আজ যন্ত্রটি নিজেই তারিখ লিখেছে। আমার মনে হয়, অপেক্ষা করার কারণ আর নেই।”
দেয়ালের আড়ালের পথ
সংরক্ষণকক্ষটি আমার এমনিতেই ভালো লাগে।
পুরোনো বই, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, বিবর্ণ সংবাদপত্র, ভাঙা বাদ্যযন্ত্র, ধুলোমাখা প্রতিকৃতি আর অচেনা মানুষের ব্যবহৃত জিনিসপত্রে ঠাসা ঘরটি বাইরে থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই, একসময় এই বাড়িতে শিল্প ও সাহিত্যের চর্চা কতটা সমৃদ্ধ ছিল।
তবে এত দিন যে ঘরটিকে সম্পূর্ণ বলে ভেবেছি, তার নিচেও আরেকটি অংশ লুকিয়ে আছে।
স্নেহা সর্বনিম্ন তাক থেকে পাশাপাশি রাখা তিনটি মোটা পুঁথি বের করল। প্রতিটির মলাট কালচে বাদামি, কাঠের মতো শক্ত। পুঁথি সরাতেই পেছনের প্যানেলে ছোট একটি পিতলের হাতল দেখা গেল।
সে হাতলটি ধরে টানল।
তাকের নিচের অংশ মৃদু ঘর্ষণের শব্দ তুলে সামনে এগিয়ে এল। বহুদিন বন্ধ থাকা কাঠের ফাঁক দিয়ে ধুলো ঝরে পড়ল মেঝেতে।
কাঠের প্যানেলের পেছনে একটি সংকীর্ণ দরজা।
দরজাটি এত নিচু যে মাথা ঝুঁকিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। বাইরে থেকে এর অস্তিত্ব বোঝার কোনো উপায় নেই। কাঠ, দেয়াল ও বইয়ের তাক এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে মিশে আছে, যেন বাড়িটি নিজের শরীরের একটি অঙ্গ বহুদিন ধরে পোশাকের নিচে লুকিয়ে রেখেছে।
“মিসেস দত্ত আমাকে এই জায়গার কথা বলেননি কেন?”
“সব ঘর অতিথিদের দেখানো হয় না।”
“ছয় মাস পরও আমি অতিথি?”
স্নেহা দরজার খিল খুলতে গিয়ে থেমে গেল। পেছনে ফিরে আমার দিকে তাকাল।
বাতির হলুদ আলোয় তার চোখের ভেতরে কঠিন রহস্যের বদলে কয়েক মুহূর্তের জন্য নরম কিছু দেখা দিল।
“আপনি নিজেকে এখনো অতিথি মনে করেন?”
প্রশ্নটির সহজ উত্তর ছিল না।
এই বাড়ির প্রায় প্রতিটি দরজা আমাকে ভয় দেখায়। তবু বাইরে চলে যাওয়ার কথা ভাবলে অদ্ভুত একটি শূন্যতা অনুভব করি। স্মৃতি দত্তের যত্ন, স্নেহার উপস্থিতি, পশ্চিমঘরের কাশি, থেমে থাকা ঘড়ি, এমনকি আমার মতো দেখতে মৃত মানুষের ছবিগুলোও ধীরে ধীরে জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
“জানি না,” বললাম। “তবে তুমি পাশে থাকলে বাড়িটাকে কম অচেনা লাগে।”
স্নেহা চোখ সরিয়ে নিল। গালে বাতির আলো পড়ে তার মুখের রং সামান্য বদলে গেল।
“কথা দিয়ে কাজ আদায় করার চেষ্টা করছেন?”
“সত্য কথা বলার অপবাদ দিও না। আমার সুনাম নষ্ট হবে।”
“সুনাম থাকার প্রমাণ আগে দিন।”
সে দরজাটি খুলে দিল।
ওপাশে সরু একটি প্যাসেজ ক্রমাগত নিচের দিকে নেমে গেছে। শুরুতে ইটের তিনটি ধাপ। তারপর মৃদু ঢাল। ছাদ এত নিচু যে কয়েক জায়গায় মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁটতে হবে। দুই পাশের দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ। কোথাও কোথাও পুরোনো চুনসুরকি খসে লাল ইট বেরিয়ে পড়েছে।
স্নেহা দেয়ালের কুলুঙ্গি থেকে ছোট একটি কেরোসিন বাতি তুলে জ্বালাল। হলুদ আলোয় পথের শেষ দেখা গেল না। মনে হলো, এটি বাড়ির নিচে নয়, বহু পুরোনো কোনো সময়ের দিকে নেমে গেছে।
স্নেহা সামনে, আমি তার পেছনে। প্যাসেজ এত সরু যে পাশাপাশি হাঁটার সুযোগ নেই। দেয়ালে আমাদের দীর্ঘ ছায়া পড়ছে। ছায়াগুলো কখনো সামনে চলে যাচ্ছে, কখনো পেছনে।
কয়েকবার মনে হলো, দেয়ালে দুটি নয়, তিনটি ছায়া নড়ছে।
তৃতীয়টি আমাদের মাঝখানে নয়। অনেকটা পেছনে।
আমি থামলাম।
ছায়াটিও থেমে গেল।
পেছনে ফিরে তাকালাম। প্রবেশপথের ক্ষীণ আলো ছাড়া কিছু নেই।
“কী হয়েছে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“কিছু না।”
কথাটি বলেই বুঝলাম, দত্ত পরিবারের মানুষদের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি তাঁদের মতো উত্তর দিতে শিখে যাচ্ছি।
প্যাসেজের একটি জায়গায় মেঝে আচমকা নিচু হয়ে গেছে। স্নেহা সেটি পেরিয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
“সাবধানে।”
তার হাত ধরে নিচে নামলাম। কয়েক মুহূর্ত আগে যে হাত বরফের মতো ঠান্ডা ছিল, সেটি এখন স্বাভাবিক উষ্ণ।
নিচে নামার পরও আমরা কেউ সঙ্গে সঙ্গে হাত সরালাম না। বাতির আলোয় স্নেহা আমার দিকে তাকাল। চোখে একটি নিঃশব্দ প্রশ্ন। আমি উত্তর জানতাম না, কিন্তু হাতটি ছেড়ে দিতেও ইচ্ছা করছিল না।
দূরে কোথাও ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।
আমরা দুজনই চমকে উঠে হাত ছেড়ে দিলাম।
“ইঁদুর?” আমি ফিসফিস করে বললাম।
“ইঁদুর হলে বেশ শক্তিশালী।”
সামনের পথটি প্রথমে বাঁ দিকে, তারপর ডান দিকে ঘুরেছে। প্রতিটি বাঁকের পর মনে হচ্ছে এবার শেষ হবে। কিন্তু প্যাসেজ আবারও নিচের দিকে এগিয়ে গেছে।
দত্ত ভবনের বাইরে থেকে দেখা আয়তনের সঙ্গে এই পথের দৈর্ঘ্য মেলে না। আমরা বাড়ির ঠিক কোন অংশের নিচে আছি, তার হিসাব করার চেষ্টা করলাম। কয়েক মিনিট পর সেই চেষ্টা ছেড়ে দিলাম। এই বাড়িতে দূরত্ব ও সময় দুটিই নিজের নিয়মে চলে।
শেষ মাথায় পুরু সেগুনকাঠের দরজা। দরজার মাঝখানে পদ্ম, লতা, খোলা বই ও কলমের নিবের সূক্ষ্ম কারুকাজ। কাঠের গায়ে বয়সের অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন, কিন্তু তালাটি তুলনামূলক নতুন।
স্নেহা আঁচলের ভাঁজ থেকে পিতলের চাবি বের করল।
“তুমি সবসময় এত চাবি সঙ্গে রাখো?”
“যে বাড়িতে দরজার সংখ্যা ঘরের চেয়ে বেশি, সেখানে চাবি সঙ্গে রাখাই নিরাপদ।”
“পশ্চিমঘরের চাবিও আছে?”
তার হাত এক মুহূর্ত থেমে গেল।
“ওটা চাবি দিয়ে খোলে না।”
এর বেশি কিছু বলল না।
চাবি ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে তালার ভেতর কয়েকটি ধাতব অংশ একের পর এক সরে যাওয়ার শব্দ হলো। দরজা ধীরে ভেতরের দিকে খুলে গেল।
মাটির নিচের আর্কাইভ
দরজা পেরিয়েই আমি থেমে গেলাম।
সামনে বিশাল একটি হলঘর।
এটিকে স্টোররুম বলা অন্যায়। এটি একই সঙ্গে পারিবারিক আর্কাইভ, পাঠাগার, শিল্পকক্ষ, সংগ্রহশালা এবং কয়েক প্রজন্মের নীরব স্মৃতির আশ্রয়।
উঁচু ছাদ থেকে সারি সারি পিতলের বাতি ঝুলছে। স্নেহা দরজার পাশে একটি সুইচের মতো পিতলের হাতল নামাতেই কয়েকটি বাতি একসঙ্গে জ্বলে উঠল। এগুলোতে বিদ্যুৎ আছে কি না বুঝলাম না। আলো স্থির, কিন্তু তার রং কেরোসিনের শিখার মতো হলুদ।
ঘরের দুই পাশের দেয়ালজুড়ে কাঠের বিশাল আলমারি। কাচের ভেতরে সারি সারি পাণ্ডুলিপি, হাতে লেখা চিঠি, পুরোনো মানচিত্র, মুদ্রা, ডাকটিকিট, জমির খতিয়ান, রাজস্বের হিসাব, রৌপ্যপাত্র, পিতলের দূরবীন, মাটির সিলমোহর, পালকির অলংকরণ এবং নাম না জানা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সাজানো।
একটি পূর্ণ দেয়ালজুড়ে শুধু বই।
বাংলা, সংস্কৃত, ইংরেজি, ফারসি ও উর্দু ভাষার বই পাশাপাশি রাখা। কিছু বইয়ের মলাটে সোনালি অক্ষর এখনো চকচক করছে। কিছু বইয়ের নাম সময় ঘষে মুছে দিয়েছে। তাদের মেরুদণ্ডে শুধু চামড়া, সেলাইয়ের সুতো এবং আঙুলের বহু পুরোনো দাগ।
পাশের তাকে নাটকের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। কিছু সংলাপের পাশে লাল কালিতে নির্দেশ লেখা। কোথায় আলো কমবে, কোথায় অভিনেতা থামবেন, কোন মুহূর্তে বাঁশি বাজবে। আরেকটি তাকে গানের স্বরলিপি, অসমাপ্ত কবিতার খাতা এবং ছোট ছোট গল্পের পাণ্ডুলিপি।
একটি কাচের আলমারিতে কয়েকটি তেলচিত্র। বর্ষার মাঠ, নদীর ঘাট, উঠোনে নাটকের মহড়া, আলো হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী এবং পালকির পাশে জমায়েত হওয়া কয়েকজন মানুষ। সময় রং ফিকে করে দিয়েছে, কিন্তু মুখগুলোর অভিব্যক্তি মুছতে পারেনি।
এক কোণে কাঠের তৈরি বীণা, সেতার, তানপুরা আর কয়েকটি বাঁশি রাখা। কিছু বাদ্যযন্ত্রের তার ছিঁড়ে গেছে। কিছু অক্ষত। মনে হলো, এখনই কেউ এসে ধুলো ঝেড়ে বসলে ঘরটি আবার সুরে ভরে উঠবে।
বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই, দত্ত ভবনের মাটির নিচে শিল্প ও সাহিত্যচর্চার এত বড় সাক্ষ্য লুকিয়ে আছে।
আমার কাছে জায়গাটি পার্থিব স্বর্গ বলে মনে হলো।
স্বর্গে সম্ভবত এত ধুলো থাকার কথা নয়। তবে আমার মতো বেকার লেখক হওয়ার প্রার্থীর জন্য ধুলোমাখা বইয়ের স্বর্গই যথেষ্ট।
আমি এক আলমারি থেকে অন্য আলমারির দিকে তাকাতে তাকাতে এগোচ্ছিলাম। প্রতিটি পাণ্ডুলিপি খুলে দেখতে ইচ্ছা করছে। প্রতিটি প্রতিকৃতির মানুষের পরিচয় জানতে ইচ্ছা করছে। প্রতিটি খাতার ভেতরে কে নিজের জীবন অসমাপ্ত রেখে গেছে, সেই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল।
স্নেহা আমাকে পর্যবেক্ষণ করছিল।
“আপনার চোখ দেখে মনে হচ্ছে, এখানে রেখে গেলে আর ওপরে ফিরবেন না।”
“খাবারের ব্যবস্থা থাকলে বিষয়টি বিবেচনা করা যায়।”
“মানুষ বই না খেয়ে বাঁচে।”
“লেখকদের বিষয়ে নিশ্চিত নই।”
সে হেসে ঘরের ডান পাশের শেষ আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। নিচের অংশে রাখা দুটি কাঠের বাক্স সরিয়ে কালো চামড়ায় মোড়ানো একটি ভারী বাক্স বের করল।
আমার সাহায্য নিতে প্রথমে রাজি হলো না। পরে বাক্সটি তুলতে গিয়ে তার মুখের অবস্থা দেখে এগিয়ে গেলাম। দুজন মিলে সেটি মাঝখানের লম্বা টেবিলে রাখলাম।
কালো আবরণ সরাতেই পালিশ করা গাঢ় কাঠের বাক্স দেখা গেল। ঢাকনার ওপর পিতলের একটি ফলক। ফলকের মাঝখানে নাম থাকার কথা, কিন্তু ধারালো কিছু দিয়ে ঘষে মুছে দেওয়া হয়েছে।
শুধু শেষ অংশের কয়েকটি অক্ষর অস্পষ্টভাবে টিকে আছে।
“...নাথ”
আমার ডান হাতের তালুর কালচে দাগটি সামান্য জ্বলে উঠল।
স্নেহা ঢাকনার দুপাশের ক্লিপ খুলে বাক্সটি উন্মুক্ত করল। ভেতরে মখমলের আস্তরণ। মাঝখানে টাইপরাইটার রাখার নির্দিষ্ট খোপ। পাশে কালির ফিতা, কয়েকটি ধাতব অক্ষর, ছোট তেলের শিশি, পরিষ্কারের ব্রাশ এবং চামড়ায় বাঁধানো পাতলা একটি নথি।
“ওপরের যন্ত্রটির বাক্স?”
স্নেহা মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। যন্ত্রটি সংরক্ষণকক্ষে রাখা হলেও এর বাক্স আর পারিবারিক হিসাব এখানে থাকে।”
“এত যত্ন করে রাখলে যন্ত্রটি খোলা টেবিলে কেন?”
“কারণ মা বলেছিলেন, একদিন কাউকে এটি দিতে হবে। বাক্সের ভেতর বন্ধ করে রাখলে সে হয়তো তার মানুষটিকে চিনতে পারবে না।”
“তার মানুষ?”
স্নেহা উত্তর দিল না।
আমরা আবার ওপরের কক্ষে ফিরে গেলাম। এবার প্যাসেজটি আগের চেয়ে ছোট মনে হলো। হয়তো পথ চিনে ফেলেছি বলে। অথবা বাড়িটি নিজেই আমাদের দ্রুত ফিরিয়ে দিতে চেয়েছে।
টাইপরাইটারটি দুই হাতে তুলেও সুবিধা করতে পারলাম না। স্নেহা একপাশ ধরল। দুজন মিলে যন্ত্রটি নিচে নিয়ে গিয়ে কাঠের বাক্সের নির্দিষ্ট খোপে বসালাম।
বাক্সে বসানোর সময় টাইপরাইটারের পেছনের অংশ প্রথমবার ভালোভাবে আলোয় এল।
১৭১৫ সালের প্রতিকৃতি
কালো ধাতুর ওপর ক্ষুদ্র একটি প্রতিকৃতি আঁকা।
একজন পুরুষ। বয়সে আমার চেয়ে কিছুটা বড়। উঁচু কপাল, গভীর চোখ, সোজা নাক ও দৃঢ় চোয়াল। চুল পেছনে আঁচড়ানো। পোশাকটি অষ্টাদশ শতকের কোনো শিক্ষিত কিংবা অভিজাত ব্যক্তির বলে মনে হয়।
মুখটি আমার।
পুরোপুরি নয়। কিন্তু এতটাই মিল যে অপরিচিত কেউ দেখলে আমাদের একই পরিবারের মানুষ বলে ধরে নেবে। এমনকি লোকটির বাঁ চোখের নিচে যে সামান্য রেখা, আমার মুখেও ঠিক একই জায়গায় ঘুমের অভাবের একটি দাগ আছে।
প্রতিকৃতির নিচে দুটি সাল থাকার কথা। বাঁ পাশের জন্মসালটি ঘষে মুছে দেওয়া। ডান পাশের মৃত্যুসাল স্পষ্ট।
প্রতিকৃতির নিচে লেখা
১৭১৫ খ্রিস্টাব্দ
“এখানে আমার ছবি কেন?”
“আপনার ছবি নয়। আপনার মতো দেখতে আরেকজন মানুষের প্রতিকৃতি।”
“লোকটি শুধু আমার মতো দেখতে নন। তিনি মরেও গেছেন। তাও ১৭১৫ সালে।”
“মৃত্যু সাধারণত অতীতেই ঘটে।”
“সেটি নিয়ে অভিযোগ করছি না। কিন্তু টাইপরাইটার তো উনিশ শতকের আবিষ্কার। ১৭১৫ সালে মৃত একজন মানুষের প্রতিকৃতি এর গায়ে এল কীভাবে?”
স্নেহা প্রতিকৃতির চারপাশে আঙুল না ছুঁইয়ে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করল।
“যন্ত্রটি আমার দাদুর ছিল। এই প্রতিকৃতিটি আরও পুরোনো এক পূর্বপুরুষের। পরে আঁকানো হয়েছিল বলে শুনেছি।”
“কার কাছে শুনেছ?”
“মায়ের কাছে।”
প্রতিকৃতির চারপাশে আঙুল বুলিয়ে দেখলাম। রঙের কিনারা ধাতুর তুলনায় সামান্য উঁচু। অর্থাৎ যন্ত্রটি তৈরির সময় ছবিটি আঁকা হয়নি। পরে যোগ করা সম্ভব।
এতে কালানুক্রমের সমস্যাটি কিছুটা কমল। রহস্য কমল না।
“এই লোকটির নাম কী?”
স্নেহা কাঠের বাক্সের পিতলের ফলকের দিকে তাকাল।
“মুছে দেওয়া হয়েছে।”
“ষষ্ঠ প্রতিকৃতির নামের মতো?”
“সম্ভবত।”
“আর তোমার মা এটিকে আমাকে দিতে চান কেন?”
স্নেহা চামড়ায় বাঁধানো নথিটি খুলল। প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা ফাঁকা। পরের পাতায় বাদামি কালিতে কয়েকটি অস্পষ্ট হিসাব ও তারিখ। বেশির ভাগ লেখাই সময়ের সঙ্গে মুছে গেছে।
“মা বলেছেন, ষষ্ঠ পূর্বপুরুষের সূত্র অনুযায়ী এটি আপনার পাওনা।”
“কার ষষ্ঠ পূর্বপুরুষ? তোমার, নাকি আমার?”
“আমি একই প্রশ্ন করেছিলাম।”
“তিনি কী বলেছেন?”
“প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় হয়নি।”
“তিনি কি সব প্রশ্নের জন্য একই উত্তর সংরক্ষণ করে রেখেছেন?”
স্নেহা হেসে বলল, “কিছু প্রশ্ন বারবার করলে উত্তর আরও দেরিতে পাওয়া যায়।”
টাইপরাইটারের পেছনের প্রতিকৃতিতে আবার চোখ রাখলাম। লোকটির স্থির দৃষ্টি আমার অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, সে আমার মুখ ধার করেনি। বরং আমিই তার মুখ নিয়ে জন্মেছি।
“ঠিক আছে,” বললাম। “তোমার মাকে আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দেবে। অন্তত এখন লেখালেখি চালিয়ে যেতে পারব।”
“নিজেই বলবেন।”
“তিনি কখন ফিরবেন?”
“আগামীকাল ফেরার কথা।”
আজ সন্ধ্যায় তাঁর মুখ নিয়ে যে নারী আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল, সেই স্মৃতি আবার শিরদাঁড়া বেয়ে উঠল। স্নেহা আমার মুখের পরিবর্তন লক্ষ করল, কিন্তু প্রশ্ন করল না।
দুজন মিলে টাইপরাইটারের বাক্সটি আমার ঘরে নিয়ে এলাম। যন্ত্রটি এমন ভারী, যেন ধাতব শরীরের ভেতর অক্ষরের বদলে কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি জমা আছে।
দূরত্বের সম্বোধন
টাইপরাইটারটি টেবিলে রাখার পর মনে হলো, ঘরের মধ্যে নতুন একজন বাসিন্দা এসেছে। তাকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সে আমাদের দেখছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।
স্নেহা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে অন্ধকার বাগানের ওপর পাতলা কুয়াশা জমেছে। জানালার কাচে তার মুখের অস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এবার প্রতিবিম্বটি তার সঙ্গে একই দিকে তাকিয়ে আছে।
“রুমে যাবেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
“কার রুমে?”
স্নেহা কটমট করে তাকাল।
“আপনি তো নিজের ঘরেই আছেন।”
“তোমার মা বাড়িতে নেই। তাই ভাবলাম নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল হয়েছে।”
“বিপদ থেকে ফিরে এসেও আপনার দুষ্টুমি কমেনি।”
“মৃত মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বুঝেছি, জীবন খুব ছোট।”
“আপনার ক্ষেত্রে প্রমাণটি এখনো চূড়ান্ত নয়।”
শুষ্ক কথাটি বললেও তার মুখে কোমল হাসি। কয়েক মুহূর্ত সে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন ভয় কাটিয়ে নিশ্চিত হতে চাইছে আমি সত্যিই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
“আচ্ছা, আপনার বাড়িতে কে কে থাকেন, মি. হাসান?”
“বলব। তবে একটি শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“এই ‘মি. হাসান’ আর ‘আপনি’ বাদ দিতে হবে। শুধু হাসান।”
“হঠাৎ কেন?”
“একসঙ্গে মৃত মানুষের ডোবা, নকল মা, পশ্চিমঘরের ডাক আর নিজে লেখা টাইপরাইটার সামলানোর পরও যদি আমাদের মধ্যে ‘মি.’ থেকে যায়, তাহলে সম্পর্কের অগ্রগতি খুব হতাশাজনক।”
স্নেহা চোখ নামিয়ে ফেলল।
“অভ্যাস হয়ে গেছে।”
“নতুন অভ্যাস তৈরি করো।”
“চেষ্টা করব।”
তার কণ্ঠে এমন একটি সংকোচ ছিল, যা ভয় থেকে আসেনি। একটি সাধারণ সম্বোধন বদলে ফেলা কখনো কখনো মানুষের মধ্যকার দূরত্ব নতুন করে নির্ধারণ করে।
“আমার বাড়িতে বৃদ্ধা মা আছেন,” বললাম। “একা থাকেন।”
“অনেকদিন তাঁর খোঁজ নেননি, তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“তাঁকে মনে পড়ে না?”
“পড়ে। প্রতিদিনই পড়ে।”
কথাটি উচ্চারণ করার পর বুকের ভেতরের অপরাধবোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“তোমার মা সেই অভাব কিছুটা কমিয়েছেন,” বললাম। “সময়মতো খেতে দেন, অসুস্থ হলে খোঁজ নেন। প্রয়োজন হলে বকাঝকাও করেন।”
স্নেহার দৃষ্টি নরম হলো।
“অন্য কারও যত্ন পেয়ে নিজের মায়ের খোঁজ নেওয়া বন্ধ করা যায় না।”
“জানি।”
“জানলেই হয় না।”
“তুমি সব সময় এত কঠিনভাবে সত্য কথা বলো?”
“আপনি সব সময় এত সহজে জরুরি কথা এড়িয়ে যান?”
“আবার আপনি?”
স্নেহা সামান্য থেমে বলল, “তুমি সব সময় এত সহজে জরুরি কথা এড়িয়ে যাও?”
শব্দটির প্রভাব আমার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলো। একই কণ্ঠ, একই প্রশ্ন। শুধু একটি সম্বোধন বদলে গিয়ে পুরো বাক্যটি ব্যক্তিগত হয়ে উঠল।
আমি কিছু বলার আগেই স্নেহা চোখ সরিয়ে ফেলল।
“তোমার হাতে একটা ফোন দেখেছিলাম,” বললাম। “ওটা কোথায়?”
“পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে থাকার কথা।”
“থাকার কথা?”
“সব জিনিসের অবস্থান সব সময় মনে থাকে না।”
“নিজের ফোন কোথায় রেখেছ ভুলে যাও, আবার কয়েক শ বছরের আর্কাইভের প্রতিটি চাবি সঙ্গে রাখো। অগ্রাধিকারের প্রশংসা করতে হয়।”
স্নেহা ফোন আনতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর কালো রঙের একটি ফোন হাতে ফিরে এল। যন্ত্রটি বন্ধ। পর্দার এক পাশে সূক্ষ্ম চিড়।
আমাকে দেওয়ার বদলে সে ফোনটি নিজের কাছে ধরে রাখল।
“একটি শর্ত আছে।”
“তোমাদের পরিবারের সব জিনিসের সঙ্গে শর্ত থাকে কেন?”
“মাকে এখনই ফোন করতে হবে। আর আজ রাতে একা কোথাও যাওয়া যাবে না। পশ্চিমঘর ডাকলেও না, জঙ্গল থেকে কেউ ডাকলেও না।”
“মেনে চললে কী পাব?”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমি কাছের ঘরে থাকব। প্রয়োজন হলে ডাকবে।”
কথাটি খুব সাধারণ। তবু তার কণ্ঠের কোমলতা মুহূর্তটিকে অন্যরকম করে দিল।
“শুধু কাছের ঘরে?”
“শর্তটি বাতিল করে দেব?”
“না, না। আমি এখনই ফোন করছি।”
মায়ের কণ্ঠ
ফোনটি চালু হতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। পর্দায় সাদা আলো ফুটে উঠল। তারপর তারিখ, সময় এবং কয়েকটি ছোট চিহ্ন।
সময়টি সাড়ে বারোটা নয়। এই সাধারণ ব্যাপারটিই আশ্চর্যজনকভাবে স্বস্তি দিল।
ফোনটি পুরোপুরি চালু হতেই পর্দা কেঁপে উঠল।
একটি কল আসছে।
Mom is calling...
বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। আমি নম্বরটি ডায়াল করিনি। ফোন চালু করার আগেই মা কীভাবে কল দিলেন, সেই প্রশ্ন মাথায় এলেও গ্রহণ করতে দেরি করলাম না।
“আসসালামু আলাইকুম, মা। তুমি ঠিক আছ?”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। শুধু খুব নিচু শ্বাসের শব্দ।
তারপর পরিচিত কণ্ঠটি প্রায় কেঁপে উঠল।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম, বাবা। তুই?”
একটি মাত্র শব্দের মধ্যে বিস্ময়, স্বস্তি, অভিযোগ আর জমে থাকা ভয় শুনতে পেলাম।
“হ্যাঁ, মা। আমি।”
“কয়েক মাস তোর কোনো খবর নেই। তোর বন্ধুদের ফোন করেছি। কেউ কিছু বলতে পারে না। কোথায় আছিস তুই?”
কয়েক মাস।
দত্ত ভবনে সময়ের হিসাব এমনিতেই গোলমেলে। কখনো একটি রাত কয়েক মাসের মতো দীর্ঘ। কখনো কয়েক মাস একটি আটকে থাকা সন্ধ্যার ভেতর হারিয়ে যায়।
কিন্তু মায়ের কণ্ঠে সময়টি শুনে বুঝলাম, আমার অনুপস্থিতি শুধু নিজের ক্যালেন্ডার থেকে হারায়নি। বাইরের পৃথিবীতে একজন মানুষ প্রতিদিন আমার অপেক্ষায় ছিলেন।
“একটা কাজ পেয়েছি, মা। একটু দূরে আছি। তাই যোগাযোগ করতে পারিনি।”
সত্যের সবচেয়ে দুর্বল অংশটুকু দিয়ে মিথ্যা নির্মাণ করলাম।
স্মৃতি দত্ত আমাকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেন। বিনিময়ে আমার কাজের সুনির্দিষ্ট পদবি নেই। কখনো বাজার করি, কখনো কাগজপত্র গুছিয়ে দিই, আবার কখনো এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলি যারা আইনগতভাবে জীবিত কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
“তোর শরীর ভালো তো?”
“আমি ভালো আছি। তুমি কেমন?”
মা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
“শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, বাবা। রাতে জ্বর আসে। বুকেও ব্যথা করে। সবাই ডাক্তার দেখাতে বলছে। কিছু পরীক্ষা করাতে হবে।”
“আগে বলোনি কেন?”
প্রশ্নটি মুখ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝলাম।
ফোন বন্ধ রেখেছি আমি। খোঁজ নিইনি আমি। তিনি বলবেন কাকে?
“তোর ওপর চাপ দিতে চাইনি। যদি কিছু টাকা পাঠাতে পারিস...”
তিনি বাক্যটি শেষ করলেন না। তবু শেষ অংশটিই সবচেয়ে জোরে শুনলাম।
মা কোনোদিন সরাসরি টাকা চান না। তিনি বলেন, “যদি সম্ভব হয়।” এই তিনটি শব্দের ভেতরে তাঁর প্রয়োজনের চেয়ে আমার অক্ষমতা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা থাকে।
“আমি একটা ব্যবস্থা করছি। কালই টাকা পাঠাব। তুমি আগে ডাক্তার দেখাও।”
প্রতিশ্রুতিটি দেওয়ার সময় আমার কাছে প্রয়োজনীয় টাকা নেই। তবু বললাম। মানুষ কখনো কখনো আশ্বাস দেওয়ার মুহূর্তে ভবিষ্যতের নিজের ওপর ঋণ চাপিয়ে দেয়।
“তুই কবে বাড়ি আসবি?”
“খুব দ্রুত। ছুটি পেলেই আসব।”
“নিজের যত্ন নিস। আর ফোনটা বন্ধ রাখিস না।”
“রাখব না, মা।”
বিপ শব্দে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
ফোনটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। মাথার ভেতর অসংখ্য হিসাব। চিকিৎসক, পরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত। স্মৃতি দত্তের দেওয়া মাসিক পাঁচ হাজার টাকার প্রায় পুরোটাই নিজের সাধারণ খরচে চলে যায়। জমিয়ে রাখার মতো কিছু নেই।
আটাশ বছর বয়সে নিজের মায়ের চিকিৎসার খরচ দিতে না পারা একধরনের নিঃশব্দ ধ্বংস। বাইরে শরীর অক্ষত থাকে। ভেতরে নিজের প্রতি সম্মানের কিছু অংশ প্রতিদিন ভেঙে পড়ে।
স্নেহা এতক্ষণ জানালার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। সে সব শুনেছে বুঝতে পারলাম। ধীরে এসে আমার পাশে বসল। এত কাছে যে তার কাঁধ আমার বাহু ছুঁয়ে আছে।
সে সঙ্গে সঙ্গে কোনো উপদেশ দিল না। আমার দিকে তাকিয়েও থাকল না। শুধু পাশে বসে রইল।
কিছু সান্ত্বনা শব্দ দিয়ে দেওয়া যায় না। মানুষের নীরব উপস্থিতিই কখনো কখনো বলে দেয়, এই ভারটি আপনাকে একা বহন করতে হবে না।
কিছুক্ষণ পর স্নেহা বলল, “আগামীকাল টাকা পাঠিয়ে দেবে।”
প্রথমবার সে স্বচ্ছন্দভাবে আমাকে ‘তুমি’ বলল। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করতে পারলাম না।
“কোথা থেকে?”
“আমি দেব।”
পঞ্চাশ হাজার টাকার ঋণ
“দয়া দেখাচ্ছ?”
কথাটি প্রয়োজনের তুলনায় কঠিন হয়ে গেল। স্নেহার মুখ থেকে কোমলতা সরে গেল।
“তোমার মা অসুস্থ। এখানে দয়া বা অপমানের প্রশ্ন আসে কীভাবে?”
“তোমাদের পরিবার এমনিতেই আমার জন্য অনেক কিছু করছে। থাকার জায়গা, খাবার, প্রতি মাসে টাকা। এই ঋণই কোনোদিন শোধ করতে পারব কি না, জানি না।”
“সব যত্নকে ঋণ বানাতে হবে?”
“যে মানুষের নিজের কিছু নেই, তার হিসাব রাখা উচিত।”
স্নেহা এবার সরাসরি আমার দিকে তাকাল।
“এটা আত্মসম্মান নয়, হাসান। নিজের অসহায়তা অন্য কাউকে দেখতে না দেওয়ার চেষ্টা।”
কথাটি সত্য বলেই বেশি আঘাত করল।
নিজেকে সামলে বললাম, “তা তোমার কাছে কত টাকা আছে? শুনে মনে হচ্ছে তুমি বেশ ধনী।”
“ব্যাংকের হিসাব আর জমানো গহনা মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার মতো হবে।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
“আস্ত জমিদার দেখছি।”
“জমিদারি নেই। কিছু উত্তরাধিকার থেকে গেছে।”
“এক কোটি টাকার উত্তরাধিকার, আর তোমার মা আমাকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেন। এই বাড়ির অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে একদিন আলোচনা করব।”
“তুমি মাসে পাঁচ হাজার টাকার কী কাজ করো, তার তালিকা আগে তৈরি করো।”
“মৃত মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ, জঙ্গলে উদ্ধার অভিযান, পুরোনো যন্ত্র পরীক্ষা, পশ্চিমঘরের শব্দ শোনা। সবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।”
“জঙ্গলে তোমাকে কে উদ্ধার করেছে?”
“কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর সাহায্য নেওয়া যায়।”
স্নেহার ঠোঁটে ধীরে হাসি ফুটল।
“আগামীকাল পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠাবে। আগে চিকিৎসা আর পরীক্ষাগুলো হোক।”
“ঋণ হিসেবে।”
“ঠিক আছে। লিখিত ঋণ হিসেবে থাকবে।”
“শোধ করব কীভাবে?”
“চাকরি পেলে ধীরে ধীরে দেবে। আর তোমার লেখা বই জনপ্রিয় হলেও দিতে পারো।”
“যে বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠাও লেখা হয়নি, সেই বইয়ের আয় দিয়ে ঋণ শোধের পরিকল্পনা করছ?”
সে টাইপরাইটারের দিকে তাকাল।
“প্রথম পৃষ্ঠা লেখার ব্যবস্থা তো হয়ে গেছে।”
“আর বই জনপ্রিয় না হলে?”
“তাহলে ধীরে ধীরে শোধ করবে।”
“কত ধীরে?”
“যতদিন প্রয়োজন।”
তার উত্তরটিতে শুধু টাকার হিসাব ছিল না। আরও কিছু ছিল, যার নাম আমরা কেউ উচ্চারণ করলাম না।
“একদিন আমার সঙ্গে মায়ের কাছে যাবে?”
“যাব।”
উত্তরটি দিতে সে এক মুহূর্তও সময় নিল না।
“কী পরিচয় দেব?”
“ডাক্তার।”
“শুধু ডাক্তার?”
স্নেহা চোখ সরু করে তাকাল।
“আর কিছু বললে তোমার মা ভয় পেতে পারেন।”
“কেন? তুমি কি এত ভয়ংকর?”
“তার ছেলে যে বাড়িতে এসেছে, সে বাড়ির পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশ্নটা বরং তোমাকেই করা উচিত।”
আমি হেসে ফেললাম।
“আর একটি সমস্যা আছে,” বললাম। “তুমি ভিন্ন ধর্মের।”
স্নেহার মুখের হাসি পুরোপুরি মিলল না, তবে চোখ গম্ভীর হলো।
“আমরা কি এখনই বিয়ে করতে যাচ্ছি?”
“না। তবে আমার মা আগাম দুশ্চিন্তা করতে পছন্দ করেন।”
“তাহলে আগে তাঁকে সুস্থ হতে দাও। তারপর তাঁর দুশ্চিন্তার তালিকায় আমাকে যোগ করা যাবে।”
কথাটি রসিকতার মতো বলা হলেও তার কণ্ঠে প্রত্যাখ্যান ছিল না। বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ছোট, খুব সাবধানী একটি সম্মতির ছায়া ছিল।
“তা হলে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিলাম,” বললাম। “কিন্তু লিখিত হিসাব থাকবে।”
“থাকবে।”
“সুদ?”
“সুদ লাগবে না।”
“তোমাকে বিয়ে করলে ঋণ মাফ হবে?”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্তভাবে বলল, “বিয়ের পর হিসাব আরও কঠিন হয় বলে শুনেছি।”
“তাহলে সময়মতো শোধ করাই নিরাপদ।”
“সেটাই ভালো।”
তার ঠোঁটে আবার হাসি ফুটল। আমাদের কাঁধ তখনো পরস্পর ছুঁয়ে আছে। কেউ সরে গেলাম না।
যে বই এখনো লেখা হয়নি
মাথার ভেতর তখন অনেক কিছু ঢেউ খাচ্ছিল।
মায়ের জ্বর। পঞ্চাশ হাজার টাকার ঋণ। নিজের বেকারত্ব। স্নেহার অস্বাভাবিক সম্পদ। ষষ্ঠ পূর্বপুরুষ। মুছে দেওয়া নাম। আর টেবিলের ওপর রাখা ১৭১৫ সালে মৃত আমার মতো দেখতে এক মানুষের প্রতিকৃতি আঁকা টাইপরাইটার।
জীবন আমার সঙ্গে তামাশা করছে কি না, বুঝতে পারলাম না।
যে চাকরি আমি পাইনি, তার নিশ্চয়তা স্নেহা দেখছে। যে বইয়ের প্রথম বাক্যও লিখিনি, তার সম্ভাব্য সাফল্য দিয়ে আমার ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করছে।
“তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো, আমি লিখতে পারব?”
স্নেহা উত্তর দিতে কয়েক মুহূর্ত সময় নিল।
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে কপালের ওপর পড়ে থাকা আমার এলোমেলো চুলের একটি অংশ সরিয়ে দিল। কাজটি এত ছোট ও স্বতঃস্ফূর্ত যে সে নিজেও পরে বুঝতে পারল কি না, জানি না।
“তুমি চারপাশে যা ঘটে, ভয় পাওয়ার মধ্যেও তা খেয়াল করো,” সে বলল। “অন্যেরা যা দেখেও ভুলে যায়, তুমি তা মনে রাখো। একজন লেখকের জন্য এটি খারাপ শুরু নয়।”
আমাদের চোখ কয়েক মুহূর্ত একই জায়গায় আটকে রইল।
বাইরে বাতাসে জানালার কাচ কেঁপে উঠল। স্নেহা ধীরে হাত সরিয়ে নিল।
“এখন লিখতে বসো,” সে বলল। “আমি পাশের ঘরে আছি।”
“যন্ত্রটি আবার নিজে লিখতে শুরু করলে?”
“আগে পড়বে। তারপর ভয় পাবে।”
“আর পশ্চিমঘর ডাকলে?”
“আমাকে ডাকবে।”
“তুমি এলে কী করবে?”
“তোমাকে দরজা থেকে দূরে সরিয়ে রাখব।”
“আজকাল বেশ দায়িত্ব নিচ্ছ।”
স্নেহা দরজার কাছে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকাল।
“কেউ তো নেবে।”
কথাটি শেষ করে সে বেরিয়ে গেল।
দরজা পুরোপুরি বন্ধ করল না। সামান্য ফাঁক রেখে দিল। করিডরের ক্ষীণ আলো সেই ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে মেঝের ওপর সরু একটি রেখা তৈরি করল।
টাইপরাইটারের সামনে বসলাম।
কাঠের বাক্সের ভেতর থেকে একটি পরিষ্কার কাগজ বের করলাম। কাগজটি রোলারে বসিয়ে ধীরে ঘোরালাম। আঙুলগুলো চাবির ওপর রাখতেই অদ্ভুত এক পরিচিত অনুভূতি হলো। যেন বহুদিন পর নয়, বহু বছর কিংবা বহু জন্ম পর কোনো পরিচিত কাজে ফিরে এসেছি।
কী লিখব?
একটি বাড়ির কথা?
একজন নামহীন মৃত মানুষের কথা?
নাকি এমন এক যুবকের কথা, যে নিজের মায়ের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারে না, অথচ মৃত মানুষের ইতিহাস উদ্ধারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়েছে?
অনেকক্ষণ আঙুল চাবির ওপর রেখে বসে রইলাম।
টাইপরাইটার নিজে থেকে নড়ল না।
অস্বাভাবিকভাবে এটিই আমাকে অস্বস্তিতে ফেলল। যেন যন্ত্রটি এবার আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
শেষ পর্যন্ত প্রথম অক্ষরটি চাপলাম।
ধাতব হাত কালির ফিতায় আঘাত করে কাগজে অক্ষর বসাল।
এবার ঠিক সেই অক্ষরটিই উঠেছে, যেটি আমি লিখতে চেয়েছিলাম।
দ্বিতীয় অক্ষর লিখলাম। তারপর তৃতীয়।
কয়েকটি শব্দের বেশি এগোতে পারলাম না। চোখ বারবার টাইপরাইটারের পেছনের প্রতিকৃতির দিকে চলে যাচ্ছে। লোকটির মুখ একই রকম স্থির। তবু মনে হচ্ছে, তার ঠোঁটের রেখাটি আগের চেয়ে সামান্য নরম হয়েছে।
হয়তো আলো বদলেছে।
হয়তো আমার দৃষ্টি।
অথবা লোকটি অবশেষে বুঝেছে, তার মুখ নিয়ে জন্মানো আরেকজন মানুষ প্রথমবার নিজের গল্প লিখতে বসেছে।
টেবিলের এক পাশে মায়ের চিকিৎসার হিসাব।
অন্য পাশে পঞ্চাশ হাজার টাকার অনাগত ঋণ।
সামনে এমন একটি বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা, যার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে লেখকের চেয়ে স্নেহার বিশ্বাস বেশি।
আর তার পাশে নীরবে তাকিয়ে আছে ১৭১৫ সালে মৃত আমার মতো দেখতে একজন মানুষ।
জীবন, তুমি সত্যিই বড় অদ্ভুত তামাশাবাজ।
চলবে...
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রচনা-সংক্রান্ত ঘোষণা
নাটোর রাজবাড়ি, রাজা রামজীবন, রাজা রামকান্ত, রানি ভবানী ও দেওয়ান দয়ারাম রায় বাংলার বাস্তব ইতিহাসের অংশ। নাটোর রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠা, আয়তন এবং সংশ্লিষ্ট শাসকদের কয়েকটি তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক উৎসে ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। স্থানীয় সরকারি বিবরণ অনুযায়ী রাজবাড়িটি ৪৯.১৯২৫ একর জমির ওপর নির্মিত; রামজীবনের প্রতিষ্ঠাকাল ১৭০৬, মতান্তরে ১৭১০; তাঁর রাজত্ব ১৭৩০ সাল পর্যন্ত; ১৭৩০ থেকে ১৭৩৪ সাল পর্যন্ত দয়ারামের সম্ভাব্য তত্ত্বাবধান এবং রামকান্তের ১৭৩৪ থেকে ১৭৪৮ সাল পর্যন্ত রাজত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
‘দত্ত পরিবার’ একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। দত্ত পরিবার, দত্ত ভবন, ভূগর্ভস্থ আর্কাইভ, ১৭১৫ সালে মৃত নামহীন ব্যক্তি, টাইপরাইটার, প্রতিকৃতি এবং বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাল্পনিক পারিবারিক যোগসূত্র সৃজনশীল নির্মাণ। কোনো দর্শন, স্মৃতি, পারিবারিক নথি বা অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতাকে যাচাইকৃত ঐতিহাসিক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0