বগুড়া শহরের মনস্তত্ত্ব: সিটি করপোরেশনের আড়ালে তাড়া, অবিশ্বাস ও নাগরিক সংকট

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যাচাইযোগ্য তথ্য ও সামাজিক বিশ্লেষণের আলোকে বগুড়ার নাগরিক আচরণ, তাড়াহুড়ো, অবিশ্বাস, জলাবদ্ধতা, অপরাধ ও উন্নয়নের মনস্তত্ত্ব।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ২
বগুড়া শহরের মনস্তত্ত্ব: সিটি করপোরেশনের আড়ালে তাড়া, অবিশ্বাস ও নাগরিক সংকট
বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বগুড়ার সাতমাথার আবছা নগরদৃশ্য, সড়কে রিকশা ও যানবাহনের আলোর প্রতিফলন এবং বাঁ পাশে “বগুড়া” শিরোনামসহ শহরের আচরণ, অপেক্ষা, ক্ষোভ, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে বাংলা লেখা

Urban Psychology • Civic Life • Bogura

বগুড়া শহরের মনস্তত্ত্ব

সিটি করপোরেশনের আড়ালে তাড়া, অবিশ্বাস, সীমিত সুযোগ এবং নাগরিক হয়ে ওঠার অসমাপ্ত সংগ্রাম

পাঠকের জন্য সতর্কতা

এই প্রবন্ধটি বগুড়া শহরে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, স্থানীয়ভাবে শোনা অভিযোগ এবং প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত একটি বিশ্লেষণ। এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা, জনমত জরিপ বা শহরের সব মানুষের চরিত্র সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কোনো ব্যক্তি, পেশা বা গোষ্ঠীকে মানসিকভাবে অসুস্থ, অপরাধী বা অনৈতিক হিসেবে চিহ্নিত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। অপ্রমাণিত অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়, সামাজিক বিশ্বাস ও নিরাপত্তাবোধের সংকট বোঝার উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

একটি শহরকে বোঝার জন্য শুধু তার রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, বাজার কিংবা বিখ্যাত খাবারের দিকে তাকালে হয় না। দেখতে হয় সেখানকার মানুষ কীভাবে হাঁটে, কথা বলে, অপেক্ষা করে, রাগ প্রকাশ করে, দরদাম করে এবং অপরিচিত মানুষের সঙ্গে আচরণ করে। কারণ শহরের মনস্তত্ত্ব কোনো অদৃশ্য মস্তিষ্কের নাম নয়। এটি তার বাসিন্দাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ এবং তাদের ঘিরে থাকা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি।

আমি বগুড়াকে দেখেছি সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে। এটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা নয়, জরিপও নয়। এটি নিজের শহরে চলাফেরা করতে গিয়ে দেখা কিছু দৃশ্য, কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কিছু শোনা অভিযোগ এবং সেসব থেকে তৈরি হওয়া প্রশ্নের হিসাব-নিকাশ।

বগুড়া আমার নিজের শহর। তাই এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে লিখতে গেলে বিষয়টি শুধু সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত হতাশা, ক্ষোভ এবং একধরনের কষ্টও যুক্ত হয়। বাইরের কোনো শহর হলে হয়তো কিছুটা দূরত্ব রেখে লেখা যেত। কিন্তু নিজের শহরের সমস্যা চোখে পড়লে তা শুধু দেখা হয় না, ভেতরেও অনুভূত হয়। কারণ আমি চাই শহরটি এগিয়ে যাক। অথচ প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় এমন অনেক আচরণ ও অব্যবস্থা চোখে পড়ে, যা উন্নয়নের অর্থকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

মর্যাদা বদলেছে, নাগরিক অভ্যাস কি বদলেছে?

২০২৬ সালের ১৪ মে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বিদ্যমান পৌরসভা ও সম্প্রসারিত এলাকা নিয়ে বগুড়াকে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে ২১টি ওয়ার্ড রাখা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বগুড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কিন্তু প্রশাসনিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং নাগরিক শহর হয়ে ওঠা একই ঘটনা নয়। একটি সাইনবোর্ড বদলাতে কয়েক ঘণ্টা লাগে, কিন্তু নাগরিক অভ্যাস, সেবাব্যবস্থা ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতা বদলাতে বহু বছরও লেগে যেতে পারে।

আমার অভিজ্ঞতায় শহরের বহু জায়গায় যত্রতত্র ময়লা ফেলা এখনো পরিচিত দৃশ্য। তবে দায়টি শুধু নাগরিকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয় না। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, কার্যকর ড্রেনেজ এবং নাগরিক সচেতনতা একে অন্যের বিকল্প নয়। একদিকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে আবর্জনা ফেলা, অন্যদিকে দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এই দুইয়ের সমন্বয়ে শহরজুড়ে নোংরার সঙ্গে একধরনের অস্বস্তিকর সহাবস্থান তৈরি হয়েছে।

রাস্তায় হাঁটলে তাই শুধু গাড়ি, রিকশা আর পথচারীর দিকে খেয়াল রাখলেই চলে না। কখন কোনো আবর্জনার স্তূপ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ এসে নাক-মুখ ঢাকতে বাধ্য করবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন। আরও অস্বস্তিকর হলো, দুর্গন্ধে মানুষ বিরক্ত হলেও খুব বেশি বিস্মিত হয় না। যেন নোংরা এখানে সাময়িক অব্যবস্থাপনা নয়, শহুরে জীবনের স্বীকৃত অংশ।

শহরের একটি সমস্যা যখন মানুষকে আর বিস্মিত করে না, তখন সমস্যাটি শুধু অবকাঠামোয় থাকে না। সেটি ধীরে ধীরে মানুষের প্রত্যাশার মধ্যেও জায়গা করে নেয়।

বসার জায়গার বদলে জলাবদ্ধতার স্মৃতি

শহরে একটু নিরিবিলি বসার জায়গা খুঁজে পেতেও হিমশিম খেতে হয়। সরকারি আজিজুল হক কলেজের ক্যাম্পাস ছাড়া সহজে এমন উন্মুক্ত জায়গা চোখে পড়ে না, যেখানে মানুষ হাঁটতে পারে, কিছুক্ষণ বসতে পারে কিংবা শহরের কোলাহল থেকে সামান্য বিরতি নিতে পারে। অথচ বর্ষায় সেই পরিচিত ক্যাম্পাসের বড় অংশই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

২০২৫ ও ২০২৬ সালে প্রকাশিত সংবাদচিত্রে ক্যাম্পাসের মাঠ, শহীদ মিনারের সামনের অংশ, বিভিন্ন একাডেমিক ভবনের আশপাশ এবং চলাচলের পথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এসেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পরীক্ষার্থীদের জন্য জমে থাকা পানির ওপর বেঞ্চ সাজিয়ে অস্থায়ী পথ তৈরির ছবিও প্রকাশিত হয়েছে। দৃশ্যটি একই সঙ্গে সৃজনশীল অভিযোজনের এবং নাগরিক ব্যর্থতার প্রতীক। মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যে চলার পথ বানিয়েছে, কিন্তু তাদের কেন বেঞ্চের ওপর দিয়ে পরীক্ষার হলে যেতে হলো, সেই প্রশ্নটি রয়ে গেছে।

জলাবদ্ধতার দৃশ্যকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো হাস্যরস, কখনো মাছ ধরার রসিকতা কিংবা তাৎক্ষণিক বিনোদনে পরিণত হতে দেখা যায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে হাসিতে রূপান্তর করা মানুষের মানসিক অভিযোজন হতে পারে। কিন্তু হাসি যেন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি মুছে না দেয়। কারণ সেই হাসির নিচে থাকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা, ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা।

চা আছে, স্বস্তি নেই

বগুড়ায় চায়ের দোকানের অভাব নেই। রাস্তার মোড়ে, বাজারের পাশে কিংবা ব্যস্ত এলাকার একচিলতে জায়গায় চায়ের স্টল চোখে পড়বেই। আমার মতো চা-খোর মানুষের জন্য সমস্যাটি চা খুঁজে পাওয়া নয়। ভালো চাও পাওয়া যায়। সমস্যা শুরু হয় কাপ হাতে নেওয়ার পর।

অনেক দোকানে বসার জায়গা এত সীমিত এবং ভিড় এত বেশি যে চায়ের স্বাদ নিতে গিয়ে দমবন্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। চা তখন ধীরে ধীরে উপভোগ করার বিষয় থাকে না। কোনোভাবে কাপ শেষ করে ভিড় থেকে বের হওয়ার তাড়া শুরু হয়। শহরে চা পাওয়া সহজ, কিন্তু চায়ের সঙ্গে একটু অবসর ও ব্যক্তিগত পরিসর পাওয়া দুর্লভ।

সম্ভবত এই স্বস্তির অভাব শুধু চায়ের দোকানে নয়, শহরের সামগ্রিক আচরণেও ছড়িয়ে আছে। আমার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় রিকশাচালক থেকে দাপ্তরিক কিংবা করপোরেট কর্মী, অনেকের শরীরী ভাষায় একটি তাড়া দেখা যায়। যেন কারও হাতে সময় নেই। সবাই অদৃশ্য কোনো দৌড়ের অংশ। অথচ কে কোথায় যাচ্ছে এবং কেন এত তাড়া, সেটি অনেক সময় স্পষ্ট নয়।

রিকশায় উঠলে মাঝেমধ্যে মনে হয়, চালক রিকশা নয়, Yamaha V3 চালাচ্ছেন। রাস্তা সরু, সামনে পথচারী, পাশে গাড়ি, হঠাৎ মোড় কিংবা ভাঙা অংশ, কোনো কিছুতেই যেন প্রত্যাশিত সতর্কতা আসে না। এটি সব রিকশাচালকের আচরণ নয়। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে নিরাপত্তার যে সংঘাত প্রায়ই অনুভব করি, তা শহরের তাড়াহুড়োর একটি দৃশ্যমান রূপ।

একই অস্থিরতা পথচারীর হাঁটা, গাড়ির হর্ন, লাইনে দাঁড়ানো মানুষের শরীরী ভাষা এবং দৈনন্দিন কথাবার্তায়ও দেখা যায়। দ্রুত চলা মানেই বেশি কাজ করা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি অপেক্ষা করতে না পারা, অন্যকে জায়গা দিতে অনীহা এবং কয়েক মুহূর্ত থামলেই পিছিয়ে পড়ার ভয়। শহরটি শুধু চলমান নয়, সারাক্ষণ তাড়াহুড়োর মধ্যে চলমান। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর শেষ গন্তব্য কোথায়, সম্ভবত শহর নিজেও জানে না।

স্বার্থপরতা, নাকি জীবিকা হারানোর ভয়?

শহরের মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখতে গেলে পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে, ব্যবসায় কিংবা দৈনন্দিন লেনদেনে আমার প্রায়ই মনে হয়েছে, এখানে অপেক্ষা করাকে অনেকে সরাসরি ক্ষতি হিসেবে দেখেন।

একদিন এক রিকশাচালককে গন্তব্যের কাছে মাত্র দুই মিনিট অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। তিনি অপেক্ষা না করে নতুন যাত্রী নিয়ে চলে গেলেন। ঘটনাটি বড় নয়। তাঁর হয়তো জরুরি অর্থনৈতিক প্রয়োজন ছিল, হয়তো আমার অপেক্ষার সময়টি তাঁর কাছে সম্ভাব্য আয় হারানোর সমান ছিল। তবু ঘটনাটি একটি প্রশ্ন তৈরি করে: আমাদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কি ধীরে ধীরে প্রতিটি মানবিক সম্পর্ককে তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির হিসাবে নামিয়ে আনছে?

বগুড়ায় কর্মসংস্থান রয়েছে, কিন্তু অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরির বেতন দিয়ে একজন মানুষ কীভাবে মাস পার করেন, সেই হিসাব মেলানো কঠিন। কখনো মনে হয়, হিসাবটি বের করতে জীবনযাপনের জ্ঞান নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য প্রয়োজন হবে। তাও স্বচ্ছন্দে বাঁচার জন্য নয়, শুধু আয় ও ব্যয়ের অমিলটি দেখার জন্য।

সীমিত সুযোগ, কম আয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মানুষকে আত্মরক্ষামূলক করে তুলতে পারে। মানুষ ভাবতে শেখে, আমি যদি এখনই নিজের অংশ নিশ্চিত না করি, অন্য কেউ সেটি নিয়ে যাবে। ফলে পাশাপাশি বাস করেও প্রত্যেকে যেন আলাদা একটি যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে অর্থনৈতিক সংকট কোনো আচরণকে ব্যাখ্যা করতে পারে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধতা দেয় না।

হারিয়ে যাওয়া একটি ছাতা এবং বিশ্বাসের সংকট

এই সপ্তাহে আমি একটি ছাতা হারিয়েছি। ছাতা হারানো বড় কোনো ঘটনা নয়। বাজারে ছাতা পাওয়া যায়, আবার কেনাও যায়। কিন্তু ছাতাটি আমার স্ত্রীর ছিল এবং তার সঙ্গে স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। সন্ধ্যায় একটি চায়ের দোকানে ভুল করে রেখে এসেছিলাম। পরদিন সকালে খুঁজতে গিয়ে আর পাইনি। দোকানদারও ছাতাটি সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানালেন।

ছাতাটি দোকানদার, কোনো ক্রেতা নাকি অন্য পথচারী নিয়েছেন, আমার কাছে তার প্রমাণ নেই। তাই কাউকে অভিযুক্ত করা ন্যায়সংগত হবে না। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়। সন্ধ্যায় ফেলে আসা ছাতাটি সকাল হওয়ার আগেই কোথায় অদৃশ্য হলো? আমার কাছে যা স্মৃতি, অন্য কারও কাছে সেটিই হয়তো বিনা মূল্যে পাওয়া একটি ব্যবহারযোগ্য বস্তু।

শহরের মনস্তত্ত্ব সব সময় বড় ঘটনায় ধরা পড়ে না। একটি ফেলে যাওয়া ছাতা, একটি নির্বিকার মুখ এবং একটি না-জানা উত্তরের মধ্যেও পারস্পরিক বিশ্বাসের অবস্থা ফুটে উঠতে পারে। তবে একটি ঘটনার ভিত্তিতে পুরো শহরকে অসৎ বলা যায় না। বরং ঘটনাটি দেখায়, শহুরে জীবনে অপরিচিত মানুষের সততার ওপর আমাদের প্রত্যাশা কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ক্ষোভের জন্ম এক জায়গায়, বিস্ফোরণ আরেক জায়গায়

এই শহরের মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ কি না, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো ভিত্তি বা যোগ্যতা আমার নেই। একটি শহরের কঠোর ভাষা কিংবা আক্রমণাত্মক আচরণকে সরাসরি মানসিক রোগের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলাও অনুচিত। কিন্তু সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, যানবাহনের হালকা ধাক্কা, ভাড়া নিয়ে তর্ক কিংবা লাইনে আগে-পরে হওয়াকে কেন্দ্র করে যেভাবে ব্যক্তিগত ও পরিবারকে লক্ষ্য করে অশালীন গালি বেরিয়ে আসে, সেটি আমাকে ভাবায়।

গালি এখানে হয়তো সঞ্চিত হতাশা প্রকাশের সহজ ও তাৎক্ষণিক মাধ্যম। কিন্তু হতাশাটি আসলে কার ওপর, সেটি সব সময় বোঝা যায় না। রাগ তৈরি হতে পারে কর্মক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক সংকটে, পারিবারিক চাপে, সামাজিক অসম্মানে কিংবা প্রতিদিনের অপমানে। বিস্ফোরণ ঘটে রাস্তায় পাওয়া সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষের ওপর। ক্ষোভ জমে এক জায়গায়, কিন্তু বের হয় আরেক জায়গায়।

এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি আক্রমণাত্মক আচরণের পেছনে গভীর সামাজিক ব্যাখ্যা থাকলেই দায় কমে যায়। বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করেছি যেখানে অসহিষ্ণুতা দ্রুত প্রকাশ করা শক্তির লক্ষণ, আর সংযমকে দুর্বলতা বলে মনে হয়?

অপরাধের চেয়েও ভয়ংকর তার স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া

বগুড়ায় হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই এবং সহিংসতার সংবাদ নিয়মিত সামনে আসে। জেলা পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছরের প্রথম চার মাসে বগুড়া জেলায় ৩০টি এবং ২০২৫ সালে ৫৭টি হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছিল। তবে জেলার পরিসংখ্যানকে শুধু বগুড়া শহরের পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিটি ঘটনার কারণও এক নয়। পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক আধিপত্য, মাদক, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং অন্যান্য প্রেক্ষাপট আলাদা করে দেখতে হয়।

তবু এ ধরনের সংবাদ বারবার সামনে এলে মানুষের নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে রাতের ছোট ও নির্জন গলিতে হাঁটার সময় ফোন কোথায় রাখতে হবে, কোন পথ এড়িয়ে চলতে হবে এবং কখন বাড়ি ফিরতে হবে, এসব প্রশ্ন চলাফেরার অলিখিত নিয়ম হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় শুধু অপরাধ নয়, অপরাধকে ঘিরে তৈরি হওয়া স্বাভাবিকতা। কোনো এলাকায় ছিনতাইয়ের কথা শুনলে মানুষ বিস্মিত না হয়ে বলে, “ওই জায়গায় তো এমন হয়ই।” এই “এমন হয়ই” কথাটির মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক আত্মসমর্পণ আছে। একটি নিরাপদ শহরে মানুষ ভাবে সে কোথায় যাবে। নিরাপত্তাহীন শহরে মানুষকে আগে ভাবতে হয়, কোন পথে গেলে বিপদ কম হবে। রাতের শহর তখন আর সবার থাকে না।

দক্ষতা নয়, দক্ষতার অভিনয়

এই শহরে দক্ষতার পাশাপাশি দক্ষতার প্রদর্শনও একটি বাজার তৈরি করেছে। অনেকে যতটুকু কাজ জানেন, তার চেয়ে বেশি জানেন বলে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। কাজ পাওয়ার জন্য নিজেকে তুলে ধরা স্বাভাবিক। সমস্যা শুরু হয় যখন আত্মবিশ্বাসের নিচে প্রকৃত দক্ষতার অভাব চাপা দেওয়া হয়।

আমার একটি Chromebook ল্যাপটপের অপারেটিং সিস্টেম পরিবর্তন করতে গিয়ে আমি ও আমার এক বন্ধু প্রায় ৫০টি সার্ভিস সেন্টারে গিয়েছি। এটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আনুমানিক হিসাব। এতগুলোর মধ্যে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের কথা শুনে মনে হয়েছিল, তারা সমস্যাটির প্রযুক্তিগত প্রকৃতি বুঝেছে। অন্য অনেকেই সমাধানের সীমা ব্যাখ্যা করার বদলে বলেছেন, ক্রোমবুক কাজের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের জন্য।

কোনো কাজ না জানা অপরাধ নয়। পৃথিবীর সব কাজ সবার জানার কথাও নয়। কিন্তু “আমি জানি না” বলার বদলে গ্রাহকের প্রয়োজন বা ডিভাইসকেই ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা ভিন্ন বিষয়। যিনি কাজটি জানেন, তিনি সমস্যা শনাক্ত করেন, সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করেন এবং সম্ভাব্য সমাধান বলেন। যিনি জানেন না কিন্তু তা স্বীকার করতে পারেন না, তিনি অনেক সময় সমস্যাটির সংজ্ঞাই বদলে দেন।

একটি শহরে দক্ষ সেবা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে “আমি জানি না” বলার পেশাগত সততাও নাগরিক আস্থার অংশ।

বাজার যেখানে ব্যক্তিত্বও যাচাই করে

বগুড়ার বাজারে কেনাকাটার সময় প্রায়ই দীর্ঘ দরদামের প্রয়োজন হয়। কোনো পোশাকের প্রাথমিক দাম ১২০০ টাকা বলা হলেও আলোচনার পর সেটি ৫০০ টাকায় বিক্রি হতে পারে। তখন প্রশ্ন ওঠে, প্রকৃত দাম কোনটি? ১২০০ টাকা, ৫০০ টাকা, নাকি এর মধ্যবর্তী এমন কোনো সংখ্যা, যা শুধু বিক্রেতা জানেন?

চূড়ান্ত মূল্য অনেক সময় পণ্যের পাশাপাশি ক্রেতার আচরণের ওপর নির্ভর করে। তিনি কতটা অনভিজ্ঞ, কতটা লাজুক, কত দ্রুত পণ্যটি চান এবং কতক্ষণ দরদাম করতে পারবেন, সেগুলোও লেনদেনের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে একই পণ্যের মূল্য একেক ক্রেতার জন্য একেক রকম হতে পারে।

দরদাম একটি স্বীকৃত বাজারচর্চা হতে পারে। কিন্তু যখন ঘোষিত মূল্য ও গ্রহণযোগ্য মূল্যের ব্যবধান অস্বাভাবিক হয়, তখন লেনদেনটি আস্থার বদলে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। ক্রেতাকে একই সঙ্গে পণ্যের মান, বিক্রেতার দাবি, নিজের বাজেট এবং ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামলাতে হয়।

ভিক্ষায় ব্যবহৃত শৈশব

শুক্রবার জুমার সময় শহরের কিছু এলাকায় সাহায্যপ্রার্থী মানুষের উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে। কেউ অসুস্থতার কথা বলেন, কেউ চিকিৎসার কাগজ দেখান, কেউ সন্তান সঙ্গে নিয়ে বসেন, আবার কেউ সরাসরি হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁদের প্রত্যেকের পরিস্থিতি যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ধর্মীয় আবেগের দিনে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলেই হয়তো অনেকে ওই সময়টি বেছে নেন। দৃশ্যটি একই সঙ্গে দারিদ্র্য, অনানুষ্ঠানিক সহায়তা এবং ধর্মীয় দানের সংস্কৃতির উপস্থিতি দেখায়।

বেশি অস্বস্তিকর হলো শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে দেখা। শহরে শিশুদের ব্যবহার করে সংগঠিতভাবে ভিক্ষা করানোর চক্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমার কাছে যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই একে নিশ্চিত তথ্য বলা যাবে না। কিন্তু কিছু শিশুর পুনরাবৃত্ত আচরণ দেখে তাদের কেউ নির্দিষ্ট কৌশল শিখিয়ে দিচ্ছেন কি না, সেই প্রশ্ন তৈরি হয়।

একদিন একটি পার্কে বসে থাকার সময় একটি ছোট শিশু টাকা চেয়ে আমার পা ধরে বসে পড়ে। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত সে ছাড়তে চাইছিল না। তখন মনে হয়েছিল, তাকে হয়তো শুধু হাত বাড়াতে নয়, মানুষকে এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে শেখানো হয়েছে যেখানে টাকা দেওয়াই মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়।

কিন্তু এর জন্য শিশুটিকেই দায়ী করা কঠিন। সে হয়তো পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে অসহায় অংশ। একদিকে একটি শিশু আমার পা ধরে টাকা চাইছে। অন্যদিকে তাকে টাকা দিলে এমন কোনো ব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারে, যা তাকে স্কুল, খেলাধুলা ও নিরাপদ শৈশব থেকে সরিয়ে মানুষের করুণাকে আয়ের উপকরণে পরিণত করেছে। শিশুটির পেছনের মানুষদের আমরা দেখি না। দিনের শেষে সে কোথায় যায়, কত টাকা জমা দেয় বা টাকা কম হলে কী ঘটে, এসব প্রশ্ন অদৃশ্য থেকে যায়।

অপরাধী চক্রের চেয়েও বড় হতে পারে তাদের অদৃশ্যতার ভয়

স্থানীয়ভাবে শোনা কথা এবং প্রকাশিত অভিযানের সংবাদ থেকে বগুড়ায় মাদক ব্যবসা ও সংঘবদ্ধ অপরাধের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্যে নিয়মিত মাদক জব্দ এবং গ্রেপ্তারের খবর রয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে বগুড়া সদরে নদীর তীরের একটি আস্তানায় অভিযানের পর পুলিশ দাবি করে, সেখানে মাদক বিক্রি, মানুষকে জিম্মি করা, মুক্তিপণ দাবি এবং নারীকে ব্যবহার করে ফাঁদ তৈরিসহ বিভিন্ন অপরাধ চালানো হতো। এগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ও মামলাসংশ্লিষ্ট দাবি। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অভিযুক্তদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।

এর পাশাপাশি মানুষের মুখে এমন অভিযোগও শোনা যায় যে কোনো নারীকে ব্যবহার করে একজন পুরুষকে আপত্তিকর বা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে সামাজিক সম্মানহানির ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হয়। নির্দিষ্ট ঘটনা, অভিযোগকারী, মামলা বা নথি ছাড়া এ ধরনের বক্তব্যকে সাধারণ সত্য হিসেবে বলা যায় না। তবে এমন কৌশলের আশঙ্কা কেন বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, সেটি সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক সম্মান এবং আইনি জটিলতার ভয় মানুষের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের শক্তিশালী উপকরণ হতে পারে।

আরও গুরুতর হলো অপরাধী চক্রের সঙ্গে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে বলে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া সন্দেহ। আমার কাছে এ বিষয়ে কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই অভিযোগটিকে সত্য বলা যাবে না। কিন্তু মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে অভিযোগ জানিয়ে লাভ নেই, তাহলে সেই বিশ্বাস নিজেই আইনশৃঙ্খলার জন্য সংকট। অপরাধী গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা তখন অস্ত্র বা অর্থ নয়। সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি করা যে তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো ফল হবে না।

“মিনি ঢাকা” হওয়ার আকাঙ্ক্ষা

বগুড়ার অনেক মানুষ শহরটিকে “মিনি ঢাকা” বলেন। কেন বলেন, তা কিছুটা বোঝা যায়। রাস্তায় তাড়াহুড়ো আছে, যানজট আছে, হর্ন আছে, ভিড় আছে এবং একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা আছে। চলাফেরার ধরন দেখে কখনো ঢাকার ছোট সংস্করণ মনে হতে পারে। কিন্তু শুধু ব্যস্ততা, যানজট ও অধৈর্য দিয়ে কোনো শহর ঢাকা হয় না।

নাগরিক সুযোগ, বিশেষায়িত চিকিৎসা, বৈচিত্র্যময় কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত সেবা, বিনোদন, নিরাপদ উন্মুক্ত স্থান এবং পেশাগত বিকাশের সুযোগ বিবেচনা করলে দুই শহরের ব্যবধান বড়। ঢাকার অস্থিরতা অনুকরণ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু একটি বড় শহরকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে যে দক্ষতা, সেবা, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, সেগুলো তৈরি করা কঠিন।

আমরা কি তবে মহানগরের সুযোগ অর্জনের আগে তার অস্থিরতা অনুকরণ করেছি? ঢাকার তাড়াহুড়ো শিখেছি, যানজট তৈরি করেছি এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতা গ্রহণ করেছি। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতাকে উৎপাদনশীল করতে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান, দক্ষ কর্মসংস্থান ও নাগরিক অবকাঠামো কতটা গড়ে তুলেছি?

পরিচয় যখন নিয়মের চেয়ে শক্তিশালী

শহরে এমন মধ্যস্থতাকারীর অভাব নেই, যিনি দাবি করেন প্রায় সব জায়গায় তাঁর পরিচিত মানুষ আছে। অফিসের কাজ, প্রশাসনিক জটিলতা, চাকরি, অনুমোদন, ব্যবসা কিংবা চিকিৎসা, সবকিছুর জন্য কোনো না কোনো মধ্যস্থ ব্যক্তি হাজির হন। কাজটি সত্যিই হবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু টাকা, সময় ও মানসিক শান্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রদর্শন। কোনো ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক পদ না থাকলেও ক্ষমতাবান কারও সঙ্গে ছবি, ফোনে যোগাযোগের দাবি কিংবা নাম ব্যবহারের সুযোগ তাঁকে প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। এই ক্ষমতার লিখিত নিয়োগপত্র নেই। আছে পরিচয়ের প্রদর্শন এবং অন্যদের মনে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা।

নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। কিন্তু নিয়মের চেয়ে পরিচয় কার্যকর বলে যদি সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তিনি নিয়ম মেনে চলার আগ্রহ হারান। তিনি ভাবেন, নিয়ম শুধু পরিচয়হীন মানুষের জন্য। যাঁদের যোগাযোগ আছে, তাঁদের জন্য আলাদা পথ খোলা।

এই সংস্কৃতি যোগ্যতা ও ন্যায্যতার মূল্য কমিয়ে দেয়। মানুষ কাজ শেখার চেয়ে ক্ষমতাবান কারও কাছে পৌঁছানোকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করে। দক্ষতার চেয়ে পরিচয় বড় হয়, সততার চেয়ে আনুগত্য লাভজনক মনে হয় এবং আত্মসম্মানের চেয়ে তোষামোদ দ্রুত ফল দেয়।

শহরের সমস্যার ঠিকানা কোথায়?

আমার এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে বগুড়া এমন একটি শহর, যেখানে মানুষ তাড়া, প্রতিযোগিতা, সীমিত সুযোগ, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বেঁচে আছে। উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু নাগরিক অভ্যাস ও সেবার মান সমান গতিতে এগোয়নি। চায়ের দোকান আছে, কিন্তু স্বস্তি কম। বসার জায়গা আছে, কিন্তু বর্ষায় জলাবদ্ধ হয়। কর্মস্থান আছে, কিন্তু অনেক বেতনে মাসের হিসাব মেলে না। সেবা প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু সত্যিকারের দক্ষ মানুষ খুঁজতে একের পর এক দরজায় যেতে হয়। বাজার আছে, কিন্তু ন্যায্য দাম জানতে মানসিক লড়াই করতে হয়। মানুষ পাশাপাশি আছে, কিন্তু একে অন্যের ওপর ভরসার জায়গা সংকুচিত।

তাই শহরের সমস্যাকে শুধু নাগরিক অসচেতনতা, স্বার্থপরতা কিংবা নৈতিক অবক্ষয় বলে শেষ করলে সম্পূর্ণ সত্য বলা হবে না। মানুষের আচরণের পেছনে কম আয়, সীমিত কর্মসংস্থান, অপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা, নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক বৈষম্য এবং দীর্ঘদিনের হতাশা কাজ করতে পারে।

আবার কাঠামোগত সমস্যা আছে বলেই ব্যক্তিগত দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অভাব কাউকে অধৈর্য করতে পারে, কিন্তু অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বৈধতা দেয় না। সুযোগ সীমিত হতে পারে, কিন্তু প্রতারণাকে পেশায় পরিণত করার অনুমতি দেয় না। প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিক হিসেবে রাস্তায় আবর্জনা ফেলার যৌক্তিকতা তৈরি করে না।

মানুষের আচরণকে শুধু চরিত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করলে কাঠামো আড়ালে থেকে যায়। আবার সব দায় কাঠামোর ওপর দিলে ব্যক্তিগত দায়িত্ব অদৃশ্য হয়ে যায়। একটি নাগরিক শহর তৈরি করতে এই দুই সত্যই একসঙ্গে স্বীকার করতে হয়।

একটি শহর কতটা বড়?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সিটি করপোরেশনের মর্যাদা কিংবা “মিনি ঢাকা” পরিচয়ের নয়। প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ মানুষ এই শহরে কোনো পরিচয়, তদবির কিংবা তোষামোদ ছাড়া কতটা নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেন।

তিনি কি ন্যায্য দামে একটি পণ্য কিনতে পারেন? প্রতারণার ভয় ছাড়া কোনো সেবা নিতে পারেন? রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন? ভুল করে ফেলে যাওয়া একটি ছাতা ফিরে পাওয়ার আশা করতে পারেন? একটি শিশুকে মানুষের পা ধরে টাকা চাইতে না দেখে পার্কে বসতে পারেন? নিজের কাজের যোগ্যতা দিয়ে এগোতে পারেন, নাকি তাঁকে কারও পরিচয়ের ছায়া খুঁজতে হয়?

একটি শহর তার মানুষকে তৈরি করে। আবার সেই মানুষেরাই প্রতিদিন একটু একটু করে শহরটিকে তৈরি করেন। বগুড়ার মনস্তত্ত্বও তাই কোনো একজন মানুষের চরিত্র নয়। এটি শহরের রাস্তা, সরু গলি, আবর্জনার স্তূপ, চায়ের কাপ, জলাবদ্ধ ক্যাম্পাস, দ্রুতগতির রিকশা, কম বেতনের চাকরি, হারিয়ে যাওয়া ছাতা, জমে থাকা ক্ষোভ, দরদামের লড়াই, ভিক্ষায় ব্যবহৃত শৈশব, অপরাধের ভয় এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রদর্শন নিয়ে তৈরি একটি সম্মিলিত মানসিক প্রতিচ্ছবি।

তবে এই প্রতিচ্ছবিই বগুড়ার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। শহরটিতে পরিশ্রমী মানুষ আছেন, সৎ ব্যবসায়ী আছেন, দক্ষ পেশাজীবী আছেন, দায়িত্বশীল নাগরিক আছেন এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশাও আছে। আমার সমালোচনার কারণ শহরটিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়। বরং নিজের শহরের সম্ভাবনাকে তার বর্তমান সীমাবদ্ধতার চেয়ে বড় বলে বিশ্বাস করা।

শেষ প্রশ্ন

বগুড়া এখন প্রশাসনিকভাবে বড় শহর। কিন্তু একটি শহরের প্রকৃত বড় হওয়া তার নাম, গেজেট কিংবা সাইনবোর্ডে ঘটে না। সেটি ঘটে মানুষের চিন্তা, আচরণ, দায়িত্ববোধ, দক্ষতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসে। ব্যস্ততা দিয়ে শহরকে বড় দেখানো যায়, কিন্তু মানবিকতা, নিরাপত্তা ও নাগরিক মর্যাদা ছাড়া কোনো শহর সত্যিকার অর্থে বড় হয় না।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

  1. স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপনসংক্রান্ত প্রতিবেদন, “১৩তম সিটি করপোরেশন হলো বগুড়া, গেজেট প্রকাশ”, কালের কণ্ঠ, ১৫ মে ২০২৬।
  2. “বগুড়ায় ৬২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে সড়ক-কলেজ-ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা”, আজকের পত্রিকা, ২৯ জুন ২০২৬।
  3. “জলাবদ্ধ ক্যাম্পাসে বেঞ্চের ‘সাঁকো’ পেরিয়ে পরীক্ষায়”, প্রথম আলো, ১৫ জুলাই ২০২৬।
  4. “কলেজ ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা”, প্রথম আলো, ১০ আগস্ট ২০২৫।
  5. “বগুড়ায় ৬৪ মাসে খুন ৪৩০, চলতি বছরে ৩০”, দেশ রূপান্তর, ৪ মে ২০২৬। পরিসংখ্যানটি বগুড়া জেলার, শুধু নগর এলাকার নয়।
  6. বগুড়া জেলা কার্যালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ২০২৬ সালের প্রকাশিত অভিযান ও জব্দসংক্রান্ত তথ্য।
  7. “বগুড়ায় নদী তীরের জঙ্গলে তাবু খাটিয়ে আস্তানা, অস্ত্র-মাদকসহ গ্রেপ্তার ৩”, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২ আগস্ট ২০২৬। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত অপরাধসংক্রান্ত বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি হিসেবে বিবেচ্য।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান মোঃ মেহেদি হাসান (কলম নাম: মি. বিকেল)—লেখক, ব্লগার, শিক্ষক এবং ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। • শিক্ষা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। • প্রকাশনা: প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে’ (রকমারি.কম-এ উপলব্ধ)। • অন্যান্য: ‘দ্য ব্যাকস্পেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৩ থেকে মাইক্রোসফট ডেভেলপার প্রোগ্রামে যুক্ত। যেকোনো প্রশ্ন বা যৌথ কাজের আগ্রহে যোগাযোগ করুন: [email protected] অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!