মাসে ১৭৫ টাকার চাকরি থেকে মেঘনা গ্রুপ: মোস্তফা কামালের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প
১৭৫ টাকার চাকরি, ছোট ব্যবসা, লোকসান ও ঋণের সংকট পেরিয়ে মোস্তফা কামাল কীভাবে মেঘনা গ্রুপ গড়ে তুললেন, পড়ুন তাঁর উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প।
উদ্যোক্তার জীবন ও সাফল্যের গল্প
মাসে ১৭৫ টাকার চাকরি থেকে মেঘনা গ্রুপ: মোস্তফা কামালের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প
ছোট চাকরি, সীমিত পুঁজি, ব্যবসায়িক লোকসান এবং ঋণের সংকট পেরিয়ে কীভাবে গড়ে উঠল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী?
সম্পাদকীয় নোট: নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২ জানুয়ারি ২০২৪। প্রাসঙ্গিক তথ্য ও করপোরেট পরিসংখ্যান সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য উৎসের ভিত্তিতে যাচাই ও হালনাগাদ করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে এসব পরিসংখ্যান পরিবর্তিত হতে পারে।
আজ মোস্তফা কামাল বাংলাদেশের পরিচিত শিল্পোদ্যোক্তাদের একজন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ করেন হাজার হাজার মানুষ। দেশের অসংখ্য পরিবার প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানটির কোনো না কোনো পণ্য ব্যবহার করে। অথচ তাঁর কর্মজীবনের শুরুটা হয়েছিল মাসে প্রায় ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকার একটি সাধারণ চাকরি দিয়ে।
ছোট চাকরি থেকে পণ্য কেনাবেচা, সেখান থেকে নিজস্ব ব্যবসা এবং পরে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। ব্যবসায় লোকসান হয়েছে, ঋণ পরিশোধে সংকট তৈরি হয়েছে এবং শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাংকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাতও হতে হয়েছে। তবু তিনি থেমে যাননি।
দীর্ঘ কয়েক দশকের পরিশ্রম, বাজার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ব্যবসাকে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের মাধ্যমে তাঁর ছোট উদ্যোগটি পরিণত হয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: কোনো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার বা মোট লেনদেন সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের ব্যক্তিগত সম্পদের সমান নয়। ২০২৪ সালে মেঘনা গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হলেও মোস্তফা কামালের ব্যক্তিগত সম্পদের নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য হিসাব পাওয়া যায় না। তাই তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ সম্পর্কে এই নিবন্ধে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ করা হয়নি।
অভাবের মধ্যে বেড়ে ওঠা
মেঘনা গ্রুপের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পরিচিতি অনুযায়ী, মোস্তফা কামালের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। তাঁর বাবা নূর মিয়া এবং মা আয়েশা খাতুন। পরিবারটি ছিল সাধারণ। শৈশব ও কৈশোরে অভাব এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তাঁর জীবনকে কাছ থেকে প্রভাবিত করেছিল।
নিজের জীবনের শুরুর সময় নিয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি গ্রামে কেরোসিন, লবণ ও খাবারের সংকটের কথা স্মরণ করেছেন। অনেক পরিবারের মতো তাঁদের পরিবারকেও সীমিত খাবারের মধ্যে দিন কাটাতে হতো। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে ব্যবসা করার চিন্তায় তাঁকে প্রভাবিত করেছিল বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
অভাবের কারণে জীবনের পথ যে সব সময় পরিকল্পনামতো এগোয়নি, তা তাঁর যাত্রা থেকেই বোঝা যায়। তবে সীমাবদ্ধতাগুলোকে তিনি কেবল দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখেননি। বাস্তব জীবনের প্রয়োজন, বাজারের সংকট এবং মানুষের চাহিদাকে বুঝতে শেখার সুযোগ হিসেবেও গ্রহণ করেছিলেন।
মাসে ১৭৫ টাকার চাকরি
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় এসে মোস্তফা কামাল একটি দোকানে চাকরি শুরু করেন। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরিতে মাসিক বেতন ছিল প্রায় ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা। টাকার অঙ্কটি ছোট হলেও চাকরিটি তাঁকে পাইকারি বাজার, পণ্য সরবরাহ, ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দেয়।
চাকরির পাশাপাশি তিনি পণ্য কেনাবেচার কাজে যুক্ত হতে শুরু করেন। চট্টগ্রাম থেকে আসা আমদানি করা দুধের গুঁড়া, চিনি এবং অন্যান্য পণ্য ঢাকার বাজারে বিক্রির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। প্রথমে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করলেও পরে মূল ডিলারদের অধীনে উপবিক্রেতা হওয়ার সুযোগ পান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উপবিক্রেতা হিসেবে কাজ শুরু করার পর সাপ্তাহিক আয় প্রায় দেড় হাজার টাকায় পৌঁছেছিল। চাকরির মাসিক বেতনের তুলনায় এই আয় ছিল অনেক বেশি। বাজার সম্পর্কে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং বাড়তে থাকা আয়ের ওপর ভর করে তিনি চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ব্যবসার প্রথম শিক্ষা: ছোট চাকরিটি তাঁকে বিপুল অর্থ না দিলেও বাজারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছিল। পরবর্তী ব্যবসার ভিত্তি তৈরিতে সেই অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কামাল ট্রেডিং কোম্পানির সূচনা
১৯৭৬ সালে মোস্তফা কামাল Kamal Trading Company প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করেন। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসার প্রাথমিক মূলধন ছিল প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। এই অর্থের একটি অংশ পারিবারিক জমি বন্ধক রেখে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
ব্যবসার জন্য তখন বড় কোনো কার্যালয় ছিল না। পরিচিত একজনের রাস্তার পাশের ছোট দোকানের ঠিকানা ব্যবহার করে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছিল। সেই ছোট ঠিকানা থেকেই পণ্য কেনাবেচা, চাহিদাপত্র সংগ্রহ এবং সরবরাহের কাজ শুরু হয়।
ব্যবসার প্রথম পর্যায়ে তাঁর প্রধান শক্তি ছিল বাজারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। কোন পণ্যের চাহিদা আছে, কোথা থেকে পণ্য আসছে, কার কাছে বিক্রি করা যাবে এবং কীভাবে পাওনা সংগ্রহ করতে হবে, এসব বিষয় তিনি কাজ করতে করতেই শিখেছিলেন।
সব সিদ্ধান্ত সফল হয়নি
মোস্তফা কামালের ব্যবসায়িক পথ শুধু লাভ এবং সাফল্যে ভরা ছিল না। আশির দশকের শুরুতে পাম অয়েল আমদানি করে তিনি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন। আমদানি করা পণ্যের মান প্রত্যাশা পূরণ না করায় কম দামে বিক্রি করতে হয়। ফলে ব্যাংকের ঋণ সময়মতো পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মোস্তফা কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় তিনি ঋণখেলাপি হয়েছিলেন। পরবর্তী ব্যবসা থেকে পাওয়া আয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বকেয়া ঋণ পরিশোধ করেন। এটি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, কারণ একজন উদ্যোক্তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত যে সফল হবে না, সেই বাস্তবতাও এখানে স্পষ্ট হয়।
লোকসান তাঁকে ব্যবসা থেকে সরিয়ে দেয়নি। বরং পণ্যের মান, আমদানির ঝুঁকি, ঋণের দায় এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কে আরও বাস্তব শিক্ষা দিয়েছিল। পরে তিনি শুধু আমদানিনির্ভর ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজস্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যান।
বাণিজ্য থেকে শিল্প স্থাপনের পথে
দীর্ঘদিন পণ্য কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর মোস্তফা কামাল ভোজ্যতেল উৎপাদনের নিজস্ব কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু একজন ব্যবসায়ী শিল্পকারখানা সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ব্যাংকগুলোর সংশয় ছিল। ফলে প্রথম শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সহজে অর্থায়ন পাননি।
শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট এলাকায় মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর শিল্পযাত্রা শুরু হয়। এটিই পরবর্তী সময়ে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ব্যবসার নামের সঙ্গে মেঘনা নদীর সম্পর্কও এখানেই। মেঘনার তীরবর্তী এলাকায় প্রথম শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়ায় গড়ে ওঠা শিল্পগোষ্ঠীর নাম রাখা হয় মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ।
The Business Standard-এর ২০২৫ সালের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে দুগ্ধজাত ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে Fresh ব্র্যান্ড চালু করা হয়। সময়ের সঙ্গে Fresh বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে পরিচিত একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
একটি কারখানা থেকে বহুমুখী শিল্পগোষ্ঠী
ভোজ্যতেলের কারখানা দিয়ে শিল্পযাত্রা শুরু হলেও মেঘনা গ্রুপ শুধু খাদ্যপণ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে চিনি, দুধ, চা, বিস্কুট, পানি, মসলা ও পানীয়সহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে।
এরপর সিমেন্ট, নির্মাণসামগ্রী, কাগজ, টিস্যু, স্টেশনারি, রাসায়নিক পণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, প্যাকেজিং, জাহাজ নির্মাণ, নৌপরিবহন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আরও বিভিন্ন খাতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা সম্প্রসারণ করে।
এই সম্প্রসারণের পেছনে একটি বাস্তব ব্যবসায়িক চিন্তা কাজ করেছে। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো উপাদান বা সেবা সময়মতো পাওয়া না গেলে প্রতিষ্ঠানটি সেই খাতে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করেছে। মোস্তফা কামাল এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, কার্টন পেতে দেরি হওয়ায় কার্টনের কারখানা এবং আমদানি-রপ্তানির প্রয়োজনে ড্রাম, প্যাকেজিং ও জাহাজসংক্রান্ত ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
বর্তমান বিস্তারের একটি চিত্র
১. ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনে মেঘনা গ্রুপের ৫৪টি কারখানার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
২. সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে ৫৭টি শিল্প ইউনিটের তথ্য রয়েছে।
৩. প্রতিষ্ঠানটি ৬৫ হাজারের বেশি কর্মীর তথ্য প্রকাশ করেছে।
৪. মেঘনা গ্রুপের দাবি অনুযায়ী, তাদের পণ্য ৫২টি দেশে রপ্তানি হয়।
৫. গ্রুপটির চারটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে।
২০২৫ সালের প্রতিবেদন এবং প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ওয়েবসাইটে শিল্প ইউনিটের সংখ্যার পার্থক্য সময়ের সঙ্গে নতুন ইউনিট যুক্ত হওয়ার ফল হতে পারে। করপোরেট পরিসংখ্যান নিয়মিত পরিবর্তিত হওয়ায় প্রকাশনার সময় উল্লেখ করা প্রয়োজন।
বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশ
পণ্য উৎপাদন এবং শিল্প ইউনিট স্থাপনের পাশাপাশি মেঘনা গ্রুপ বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায়ও বিনিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল হলো মেঘনা ইকোনমিক জোন, মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন, কুমিল্লা ইকোনমিক জোন এবং তিতাস ইকোনমিক জোন।
একটি ভোজ্যতেল কারখানা থেকে চারটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছানো প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণের একটি বড় উদাহরণ। এটি দেখায়, মোস্তফা কামাল শুধু একটি পণ্য বা একটি বাজারের ওপর নির্ভর না করে ব্যবসাকে বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা
ব্যবসায়িক সাফল্যের পর মোস্তফা কামাল শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়েছেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা ও সামাজিক কল্যাণে অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর জন্মস্থান কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নূর মিয়া ডিগ্রি কলেজ, মোস্তফা কামাল হাইস্কুল এবং আয়েশা নূর ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি শিক্ষা ও কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁর অর্থায়ন, প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনাগত ভূমিকার বিস্তারিত তথ্য সব উৎসে সমানভাবে পাওয়া যায় না। তাই তাঁর সামাজিক অবদানকে মূল্যায়নের সময় প্রমাণিত তথ্য এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দাবির মধ্যে পার্থক্য রাখা প্রয়োজন।
নিজের জন্মস্থানের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার এই দিকটি তাঁর জীবনের মানবিক অংশকে সামনে আনে। কারণ সাফল্যের পর নিজের শিকড় ও শুরুর জীবনের মানুষের কথা মনে রাখা সহজ নয়।
মোস্তফা কামালের জীবন থেকে কী শেখা যায়?
মোস্তফা কামালের জীবন শুধু একজন দরিদ্র মানুষের ধনী হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি বাজার সম্পর্কে শেখা, ছোট কাজকে গুরুত্ব দেওয়া, ঝুঁকি নেওয়া, লোকসানের দায় বহন করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসাকে বড় করার গল্প।
মাসে ১৭৫ টাকার চাকরিটি তাঁকে রাতারাতি সফল করেনি। কিন্তু সেই চাকরি তাঁকে বাস্তব বাজারের সঙ্গে পরিচিত করেছিল। ছোট ব্যবসা তাঁকে পণ্য কেনাবেচা শিখিয়েছে। লোকসান তাঁকে ঝুঁকির মূল্য বুঝিয়েছে। আর শিল্প স্থাপনের অভিজ্ঞতা তাঁকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথে এগিয়ে দিয়েছে।
১. ছোট কাজকেও শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
২. বাজারকে বুঝতে হলে বাস্তব অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই।
৩. ব্যবসায় লোকসান হলে ভুলের দায় স্বীকার করে পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজতে হয়।
৪. সীমিত পুঁজি দিয়ে শুরু করলেও ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
৫. দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য ব্যক্তিগত পরিশ্রমের পাশাপাশি কর্মী, অর্থায়ন, বাজার, প্রতিষ্ঠান ও অনুকূল সুযোগের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
অবশ্য একজন সফল উদ্যোক্তার জীবনের কিছু সিদ্ধান্ত অনুসরণ করলেই প্রত্যেকে একই ফল পাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। সময়, পুঁজি, বাজার, যোগাযোগ, পারিবারিক অবস্থান ও সুযোগ প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আলাদা। তবু তাঁর জীবন তরুণদের মনে করিয়ে দেয়, ছোট সূচনা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে দেয় না। শেখার মানসিকতা, ধৈর্য এবং ব্যর্থতার পর আবার দাঁড়ানোর সাহসও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষকথা
মাসে প্রায় ১৭৫ টাকার চাকরি দিয়ে শুরু করা মোস্তফা কামালের যাত্রা কয়েক দশক পরে একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে এসে পৌঁছেছে। এই পথের মধ্যে ছিল অভাব, ছোট ব্যবসা, লোকসান, ঋণের চাপ, প্রত্যাখ্যান এবং আবার শুরু করার চেষ্টা। তাঁর গল্প তাই শুধু সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরের কথা বলে না। এটি মনে করিয়ে দেয়, বড় প্রতিষ্ঠানের পেছনে বহু বছরের শেখা, ভুল, পরিশ্রম এবং অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত অবদান থাকে।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
১. Meghna Group of Industries, মোস্তফা কামালের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি ও কর্মজীবন: https://www.mgi.org/directorprofile/mostafa-kamal
২. Meghna Group of Industries, প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস, কার্যক্রম ও বর্তমান পরিসংখ্যান: https://www.mgi.org/about
৩. Meghna Group of Industries, শিল্প ইউনিট, কর্মী, রপ্তানি ও কার্যক্রমের বর্তমান তথ্য: https://www.mgi.org/
৪. The Daily Star, মোস্তফা কামালের ছোট ব্যবসা থেকে মেঘনা গ্রুপ গড়ে তোলার সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন, ৫ জানুয়ারি ২০২৫: https://www.thedailystar.net/business/news/the-mgi-story-tk-600-his-pocket-tk-36000cr-business-empire-3792851
৫. The Business Standard, মেঘনা গ্রুপের ৫০ বছরের যাত্রা, কারখানা ও বার্ষিক টার্নওভার নিয়ে প্রতিবেদন, ৫ জানুয়ারি ২০২৫: https://www.tbsnews.net/features/panorama/50-years-54-factories-and-tk36000cr-annual-turnover-unstoppable-rise-mostafa-kamal
৬. Global FDI Reports, মোস্তফা কামালের ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকার চাকরি, ব্যবসার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা ও শিল্প স্থাপনের সাক্ষাৎকারভিত্তিক বিবরণ, ৭ মে ২০২৬: https://globalfdireports.com/2026/05/07/mostafa-kamal-meghna-group-of-industries/
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0