দত্ত পরিবার | পর্ব ১৭: যে ভাষণ সীমান্ত মানেনি
দত্ত ভবনের চিকিৎসা-কক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি তীরের সম্মেলনে পৌঁছে হাসান বাংলা ভাগের অর্থনীতি ও স্মৃতি নিয়ে প্রথম প্রকাশ্য ভাষণ দেয়। তখনই সুবর্ণার মিছিল পাল্টে দেয় পুরো আয়োজন।
একটি ভাষণ সীমান্ত পার হয় না। মানুষের ভয়, ক্ষুধা, স্মৃতি ও অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষা পার হয়। বক্তা শুধু সেগুলোকে এমন একটি কণ্ঠ দেয়, যাকে পরে সে নিজেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
জানালার কাচে শেষ টোকাটি পড়ার পর স্মৃতি দত্ত বলেছিলেন, “তারা জেনে গেছে, এজেন্ট এখনো বেঁচে আছে... আর আসল খেলাটা এবার দত্ত ভবনের ভেতরেই শুরু হবে।”
কথাটির প্রতিধ্বনি থামার আগেই স্নেহা আমার বাঁ হাত ছেড়ে দিয়েছিল।
হাত ছেড়ে দেওয়া খুব ছোট ঘটনা। কোনো যন্ত্র শব্দ করে না। হাসপাতালের আলো বদলায় না। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষও বুঝতে পারে না। তবু কিছু শূন্যতা গুলির আঘাতের চেয়েও নির্দিষ্ট জায়গায় লাগে।
স্নেহা প্রথমে জানালার দিকে তাকিয়েছিল। বাইরে আর কোনো ছায়া নেই। সাউন্ডপ্রুফ কাচের নিচের অংশে শুধু তিনটি ছোট দাগ। নখের নয়। ধাতব কিছুর চাপ।
তারপর সে মায়ের দিকে ফিরল।
“মা, তুমি ‘ঘুড়ি-সাত’ নামটা জানলে কী করে?”
স্মৃতি দত্ত জানালার দিকে তাকালেন না। তাঁর ডান অনামিকার নীল পাথরটি সাদা চিকিৎসা-আলোর নিচে গাঢ় দেখাচ্ছে।
“এই মুহূর্তে ওর বিশ্রাম প্রয়োজন।”
“আমি চিকিৎসক,” স্নেহা বলল। “ওর কী প্রয়োজন, সেটা জানি। আমি জানতে চেয়েছি, তুমি ওর পরিচয় জানলে কী করে?”
“যে দুর্ঘটনার পর তোমরা এখানে এসেছ, সেটি শুধু হামলা ছিল না।”
“তা হলে?”
“একটি সতর্কতা। একটি ব্যর্থ উদ্ধারচেষ্টা। আর একটি রাজনৈতিক বার্তা।”
“কার রাজনীতি?”
স্মৃতি দত্ত এবার আমার দিকে তাকালেন।
“ওকে জিজ্ঞেস করো।”
ভাঙা শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে মানুষের একটি সুবিধা আছে। প্রশ্নের উত্তর না দিলেও সবাই ধরে নেয়, সে দুর্বল। সমস্যা হলো, স্নেহা এখন জানে দুর্বলতার অভিনয় আমি কত নিখুঁতভাবে করতে পারি।
সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার কতটুকু মনে ছিল?”
আমি ঠোঁট ভেজানোর চেষ্টা করলাম।
“সব প্রশ্নের উত্তর একই সময়ে দেওয়া নিরাপদ নয়।”
“নিরাপদ কার জন্য?”
“তোমার জন্য।”
স্নেহা খুব ধীরে মাথা নাড়ল।
“আবার আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছ?”
“অভ্যাস।”
“অভ্যাস বদলানো যায়।”
“সব অভ্যাস নয়।”
“তা হলে সম্পর্ক বদলে যায়।”
শব্দটি বলার পর সে থামল। সম্পর্ক। নামটি প্রথম আমাদের মাঝে উচ্চারিত হলো, অথচ কোন সম্পর্ক, সেটি বলল না।
আমি বললাম, “যা অনুভব করেছি, তার কিছুই মিথ্যা ছিল না।”
“অনুভূতি সত্য হলেই পরিচয় গোপন করার অধিকার পাওয়া যায়?”
উত্তর খুঁজতে সময় লাগল।
কারণ উত্তরটি জানা ছিল। উচ্চারণ করার সাহস ছিল না।
“না,” বললাম।
স্নেহার চোখে সামান্য পরিবর্তন হলো। ক্ষমা নয়। অন্তত আরেকটি মিথ্যা না শোনার স্বস্তিও সম্ভবত নয়। শুধু কথাটি নথিভুক্ত হলো।
স্মৃতি দত্ত বললেন, “তোমাদের ব্যক্তিগত হিসাব শেষ হলে আমাদের রওনা হতে হবে।”
“কোথায়?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“পশ্চিমবঙ্গ।”
দত্ত ভবনের অন্য দরজা
দত্ত ভবনের প্রাইভেট চিকিৎসা-কক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের দূরত্ব শুধু মানচিত্রে মাপা যায় না। মাঝখানে ছিল আমার ক্ষত, সীমান্তের কাগজ, স্মৃতি দত্তের অপ্রকাশিত পরিচয় এবং স্নেহার এমন একটি নীরবতা, যার ভেতর প্রবেশের অনুমতি আমি হারিয়েছি।
ডা. তাহমিনা রশীদ দুপুরের দিকে কেবিনে এলেন। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। কথা কম বলেন। আমার ডান বাহুর নতুন বাঁধন পরীক্ষা করতে গিয়ে পুরোনো ক্ষতচিহ্নগুলোর দিকে একবার তাকালেন।
“এই দাগগুলো আগের চিকিৎসা-নথিতে ছিল?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“আমার আগের চিকিৎসা-নথি আছে?”
তাহমিনা রশীদ গ্লাভস খুলতে খুলতে বললেন, “প্রশ্নটা মিসেস দত্তকে করুন।”
“আপনি আমাকে আগে দেখেছেন?”
তিনি থামলেন। তারপর বললেন, “এই মুখ আগে দেখেছি। মানুষটি আপনি কি না, নিশ্চিত নই।”
দত্ত ভবনে এমন উত্তরকে এখন প্রায় স্বাভাবিক চিকিৎসা-পরামর্শ মনে হয়।
তাহমিনা রশীদ জানালেন, যাত্রা করা উচিত নয়। স্মৃতি দত্ত জানালেন, যাত্রা পিছিয়ে দেওয়া যাবে না। স্নেহা বলল, আমি গেলে সে সঙ্গে যাবে। আমার মতামত জানতে চাইলে বললাম, আহত রোগীর মতামতের মূল্য নেই বলে সবাই আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিকেলের আগে আমরা দত্ত ভবনের পশ্চিম পাশের একটি করিডর দিয়ে বের হলাম। যে করিডর আগে দেখিনি। শেষ মাথায় পশ্চিমঘরের দরজা নয়, পাথরে বাঁধানো একটি নিচু উঠান।
সেখানে অপেক্ষা করছিল মুক্তারঙের সাত আসনের একটি পুরোনো মাইক্রোবাস। কাচ গাঢ় নয়। নম্বরপ্লেট স্পষ্ট। সব কাগজ বৈধ। চালকের নাম প্রদীপ পাল। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার মানুষ।
প্রদীপবাবু দরজা খুলে বললেন, “আপনারা একটু তাড়াতাড়ি বসুন। রাস্তার অবস্থা মন্দ নয়, তবে সীমান্তের ওধারে সন্ধের পর কুয়াশা পড়ছে।”
`সন্ধ্যা` নয়, `সন্ধে`।
একটি ছোট শব্দ। তবু সীমান্ত পার হওয়ার আগেই অন্য বাংলার ছন্দ গাড়ির ভেতরে এসে বসে পড়ল।
স্মৃতি দত্ত মাঝের সারির বাঁ পাশে। স্নেহা আমার পাশে ডান দিকে। চিকিৎসার ব্যাগ তার পায়ের কাছে। শেষ সারিতে তিনটি সিল করা নথির বাক্স।
“ওগুলো কী?” জিজ্ঞেস করলাম।
স্মৃতি দত্ত বললেন, “যে ইতিহাস মঞ্চে বলা হবে না।”
“মঞ্চ?”
“আজ হুগলি নদীর তীরে একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন আছে।”
“আপনি সেখানে যাচ্ছেন?”
“আমরা যাচ্ছি।”
“আমি কি দর্শক?”
“তুমি বক্তা।”
স্নেহা আমার দিকে তাকাল। তারপর মায়ের দিকে।
“ও জানত?”
“জানার প্রয়োজন ছিল না।”
স্নেহা খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “মানুষকে না জানিয়ে তার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অসুখটা তোমাদের দুজনেরই আছে।”
স্মৃতি দত্ত জানালার বাইরে তাকালেন।
“ফারাক হলো, আমি অসুখটার কথা অস্বীকার করি না।”
সীমান্তের অন্য উচ্চারণ
বৈধ নথিতেই সীমান্ত পার হলাম। পাসপোর্ট, অনুমতিপত্র, চিকিৎসার নথি এবং সম্মেলনের আমন্ত্রণ। কোনো গোপন পথ নয়। তবু কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মকর্তার চোখ আমার মুখে কয়েক সেকেন্ড বেশি স্থির ছিল।
পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর রাস্তার দুই পাশে দোকানের নাম, যানবাহনের নম্বর এবং মানুষের উচ্চারণে পরিচিত বাংলা অন্য ছন্দে চলতে শুরু করল।
ভাষা একই। স্মৃতির ভাঁজ আলাদা।
পেট্রাপোল পেরিয়ে বনগাঁর দিকে যেতে যেতে প্রদীপবাবু বললেন, “চা খাবেন? সামনে একটা বেশ ভালো দোকান আছে।”
শিহাব হলে বলত, সামনে ভালো একটা দোকান আছে।
সীমান্ত কখনো বড় শব্দে শুরু হয় না। `একটা ভালো দোকান` আর `বেশ ভালো দোকান`-এর মাঝেও তার ছোট ছায়া থাকে।
বনগাঁ থেকে বারাসাত, তারপর কলকাতার উত্তর দিক এড়িয়ে আমরা হুগলি জেলার দিকে উঠলাম। শহরের ঘন ভবন পেছনে সরে গেলে পুরোনো শিল্পাঞ্চলের চিমনি দেখা গেল। কয়েকটি বন্ধ। কয়েকটির গায়ে লতা। কোথাও নতুন গুদাম, কোথাও মরচেধরা লোহার ফটক।
মাইক্রোবাসটি শ্রীরামপুর পেরিয়ে চন্দননগরের উত্তরের দিকে নদীতীরবর্তী একটি বড় মাঠের কাছে থামল। পশ্চিমে হুগলি নদী। দূরে পুরোনো জুট মিলের গাঢ় কাঠামো। নদীর জল শেষ বিকেলের আলোয় তামাটে।
মাঠের প্রবেশপথে আমাদের স্বাগত জানালেন অনিরুদ্ধ সেন।
ধূসর পাঞ্জাবি, কালো ফ্রেমের চশমা, হাতে নথির ফোল্ডার। স্মৃতি দত্তকে নমস্কার জানিয়ে তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“ইনিই হাসান?”
স্মৃতি দত্ত বললেন, “হ্যাঁ।”
অনিরুদ্ধবাবু আমার ডান বাহুর সাপোর্টের দিকে তাকালেন।
“এ অবস্থায় বক্তৃতা দেবেন?”
“আমি নিজেও প্রশ্নটা এখনই জানতে পারলাম।”
তিনি হাসলেন না।
“দেখুন, মিসেস দত্ত, একজন মানুষকে আমরা চিনি না। তাঁর কাজের নথি নেই। সম্মেলনের ছাপানো সূচিতেও নাম নেই। অথচ মূল বক্তব্য উনিই রাখবেন?”
স্মৃতি দত্ত বললেন, “সব কাজ ছাপানো নথির জন্য করা হয় না, অনিরুদ্ধ।”
“রাজনীতিতে এমন উত্তর খুব বিপজ্জনক।”
“এটি রাজনৈতিক সমাবেশ নয়।”
অনিরুদ্ধ সেন চশমা খুলে পরিষ্কার করলেন।
“জনতা আছে, মঞ্চ আছে, ইতিহাসের দাবি আছে। নাম যা-ই দিন, ফল রাজনীতিই হবে।”
মানুষটিকে অপছন্দ করার কারণ পেলাম না। সাধারণত সত্য কথা বলা মানুষকে পছন্দ করা কঠিন। কারণ সে আমাদের পছন্দমতো মুহূর্তে সত্য বলে না।
নওশাদ রহমান আমাদের মঞ্চের পেছনের অংশে নিয়ে গেল। বয়স ত্রিশের কম। উত্তর চব্বিশ পরগনার সীমান্তবর্তী এক পরিবারের সন্তান। তাঁর ঠাকুরদার ভাই পূর্ববঙ্গে থেকে গিয়েছিলেন। পরিবারের পুরোনো পাট ব্যবসা দেশভাগের পর দুই পাশে আটকে পড়ে।
তিনি বললেন, “আমাদের বাড়িতে এখনও দুটো হিসাবের খাতা আছে। একটা এপারের, একটা ওপারের। লাভের অঙ্ক মেলে না, কিন্তু মানুষের নাম মিলে যায়।”
স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “খাতাগুলো দেখতে পারি?”
“অবশ্যই। তবে আজ নয়। ওগুলো মা কাউকে সহজে ছুঁতে দেন না।”
“কেন?”
নওশাদ একটু থামলেন।
“একটা নাম দুটো খাতাতেই আছে। একজনের জন্মের তারিখ আলাদা, মৃত্যুর তারিখও আলাদা।”
আমার ও স্নেহার চোখ একই সঙ্গে তাঁর মুখে উঠল।
“নামটা কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“পুরোটা পড়া যায় না। শেষটা শুধু... নাথ।”
একটি নাম, একাধিক মানুষ
মৈত্রেয়ী বসুর সঙ্গে দেখা হলো মঞ্চের পেছনের ছোট নথি-তাঁবুতে। সাদা-কালো শাড়ি, ছোট চুল, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। টেবিলে পুরোনো দলিলের প্রতিলিপি, উদ্বাস্তু পরিবারের মৌখিক ইতিহাস এবং জমির নকশা।
স্নেহা সীমান্তের কালির পাতার প্রতিলিপিটি দেখাল।
মৈত্রেয়ী কাগজটি হাতে নিলেন না। টেবিলের ওপর রেখেই আলো কাত করলেন।
“এটা কোথায় পেয়েছেন?”
স্নেহা বলল, “চেয়ারম্যানবাড়ির একটি বন্ধ কক্ষের দরজার নিচ থেকে।”
মৈত্রেয়ীর চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্মৃতি দত্তের দিকে গেল।
“নামটা একজনের নাও হতে পারে,” তিনি বললেন।
“একাধিক মানুষ?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“মানুষ নয়। আইনি পরিচয়।”
তাঁবুর বাইরে জনতার শব্দ বাড়ছিল। মাইক্রোফোন পরীক্ষা করা হচ্ছে। নদীর দিক থেকে আসা বাতাসে কাগজের কোণ কেঁপে উঠল।
মৈত্রেয়ী নিচু স্বরে বললেন, “দেশভাগের পর কিছু সম্পত্তি, উত্তরাধিকার এবং অনুপস্থিত মানুষের দাবিতে একই অসম্পূর্ণ পরিচয় বিভিন্ন নথিতে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সন্দেহ করি। মানুষটি না থাকলেও নামটি কাজ করত। কেউ জীবিত, কেউ মৃত, কেউ উদ্বাস্তু, কেউ উত্তরাধিকারী। অথচ নামের শেষ অংশ একই।”
“কে ব্যবহার করত?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“যাদের দুই পাশের নথিতে প্রবেশাধিকার ছিল।”
“দত্ত পরিবার?”
স্মৃতি দত্ত নিজেই উত্তর দিলেন।
“শুধু দত্ত পরিবার নয়।”
“আর কারা?”
দূরের মঞ্চ থেকে অনিরুদ্ধ সেনের কণ্ঠ এল। সম্মেলন শুরু হচ্ছে।
স্মৃতি দত্ত বললেন, “আজকের মঞ্চ হয়তো সেই প্রশ্নের একটি উত্তর দেবে।”
উত্তর না দিয়ে উত্তর দেওয়ার এই পারিবারিক দক্ষতা উত্তরাধিকারসূত্রে স্নেহাও পেয়েছে কি না, এখনো নিশ্চিত নই। পার্থক্য হলো, স্নেহা উত্তর না জানলে বলে জানে না। স্মৃতি দত্ত জানেন, কিন্তু বলেন না।
মঞ্চের নিচে সংকেত
মঞ্চে ওঠার সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই ধাতব কাঠামোর নিচে টোকা পড়ল।
ছোট। দীর্ঘ। ছোট।
বিরতি।
তিনটি ছোট।
আমি থামলাম।
স্নেহা পেছন থেকে বলল, “কী হয়েছে?”
“কেউ মঞ্চের নিচে মোর্স সংকেত দিল।”
“অর্থ?”
“পরিচয় গোপন রাখো।”
স্নেহার চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এল।
“কার কাছ থেকে পরিচয় গোপন করবে?”
“সবাইয়ের কাছ থেকে।”
“আমার কাছ থেকেও?”
প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার আগেই অনিরুদ্ধ সেন মাইক্রোফোনে আমার নাম ঘোষণা করলেন।
“বাংলাদেশ থেকে আগত লেখক, গবেষক এবং দুই বাংলার ইতিহাসের অনুসন্ধানী বক্তা, মোঃ মেহেদি হাসান।”
জনতার হাততালি উঠল।
তারা জানে না, কয়েক ঘণ্টা আগে আমি রক্তাক্ত অবস্থায় একটি চিকিৎসা-কক্ষে ছিলাম। জানে না, আমার ডান হাতের সাপোর্টের নিচে তিন দিনের পুরোনো ক্ষত আবার খুলেছে। জানে না, আমার সাংকেতিক পরিচয় শুনলে কয়েকটি অদৃশ্য সংগঠন একই সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তাদের কাছে আমি শুধু একজন বক্তা।
মানুষের সামনে দাঁড়ানোর জন্য কখনো কখনো এই পরিচয়ই যথেষ্ট বিপজ্জনক।
যে ভাষণ সীমান্ত মানেনি
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে হুগলি নদীর দিকে তাকালাম।
নদীটি বহমান। তার ওপর কোনো কাঁটাতার নেই। শুধু মানচিত্রে মানুষের আঁকা রেখা।
“আমার উচ্চারণ আপনাদের চেয়ে একটু আলাদা,” বললাম। “আপনারা জল বলেন। আমরা পানি বলি। কিন্তু তৃষ্ণার কোনো পূর্ববঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গ নেই।”
জনতার মধ্যে হালকা হাসি উঠল।
“আজ আমাকে বাংলা ভাগ নিয়ে বলতে বলা হয়েছে। সমস্যা হলো, বাংলা ভাগ নিয়ে আমরা সাধারণত একটি সাল দিয়ে শুরু করি। উনিশশো সাতচল্লিশ।”
“কিন্তু সাতচল্লিশ দিয়ে শুরু করলে মানুষেরা হারিয়ে যায়। থেকে যায় শুধু মানচিত্রের রেখা।”
“বাংলা ভাগ আমাদের ইতিহাসের একটি যৌথ ব্যর্থতা ছিল। তবে দায় সবার সমান ছিল না। সীমান্তে মাকে হারানো শিশুর দায় আর মানুষের ভয়কে রাজনৈতিক ক্ষমতায় বদলে দেওয়া নেতার দায় কখনো এক হতে পারে না।”
মাঠের শব্দ ধীরে কমে এল।
“আমাদের বলা হয়েছে, শুধু ধর্ম বাংলাকে ভাগ করেছে। কথাটি পুরো মিথ্যা নয়। কিন্তু পুরো সত্যও নয়। ধর্ম ছিল দৃশ্যমান রেখা। রেখাটির নিচে ছিল জমি, চাকরি, শিক্ষা, প্রতিনিধিত্ব, বন্দর, পাটকল, কৃষকের ঋণ, শহরের পুঁজি এবং ক্ষমতার হিসাব।”
“পূর্ব বাংলার মাঠে পাট জন্মাত। এই বাংলার কলে সেই পাট সুতা ও বস্তায় পরিণত হতো। কৃষকের ঘাম এক পাশে, কলের চাকা আর বন্দর অন্য পাশে। মানচিত্র যখন মাঝখানে রেখা টানল, তখন শুধু একটি ভূখণ্ড ভাগ হয়নি। একটি অর্থনীতির শ্বাসনালি কেটে দেওয়া হয়েছিল।”
দূরের বন্ধ জুট মিলের চিমনির দিকে কয়েকজন ফিরে তাকাল।
“তারও আগে ক্ষুধা বাংলাকে দুর্বল করেছিল। দুর্ভিক্ষের সময় চাল ছিল, তবু বহু মানুষের কেনার ক্ষমতা ছিল না। খাদ্য ছিল, অধিকার ছিল না। আবার মানুষকে বোঝানো হলো, তার ক্ষুধার জন্য পাশের সম্প্রদায়ের মানুষ দায়ী। অর্থনৈতিক ব্যর্থতাকে ধর্মীয় অভিযোগে বদলানো খুব সহজ। কারণ ক্ষুধার্ত মানুষ হিসাবের খাতা দেখে না। সে শত্রুর মুখ খোঁজে।”
“সাতচল্লিশের আগেও বাংলা ভাগ হয়েছিল। আবার জোড়া লেগেছিল। কিন্তু মানচিত্র জোড়া লাগলেই মানুষের রাজনৈতিক ভয় জোড়া লাগে না। প্রতিনিধিত্ব, শিক্ষা, চাকরি ও সম্মানের প্রশ্ন থেকে যায়।”
আমি একটু থামলাম।
“বাংলা ভাগ অবশ্যম্ভাবী ছিল না। কিন্তু আমরা যে অসম অর্থনীতি, বৈষম্যমূলক প্রতিনিধিত্ব এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করেছিলাম, তার ওপর শুধু কবিতা আর আবেগ দিয়ে ঐক্য টিকিয়ে রাখাও সম্ভব ছিল না।”
“দেশভাগের আগে অবিভক্ত বাংলার বিকল্প প্রস্তাব ছিল। কেউ সার্বভৌম বাংলা চেয়েছিলেন, কেউ সমাজতান্ত্রিক বাংলা, কেউ বৃহত্তর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু তখন বিশ্বাসের ভাণ্ডার প্রায় শূন্য। একপক্ষ ভয় পেয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতা। অন্যপক্ষ ভয় পেয়েছিল শিল্প, বন্দর ও প্রশাসন হারানোর। দুই পক্ষই নিজের ভয়কে সত্য মনে করেছিল। অন্যের ভয়কে ষড়যন্ত্র।”
জনতার পেছন দিক থেকে একজন বললেন, “তা হলে ভুলটা কার ছিল?”
প্রশ্নের উচ্চারণ পশ্চিমবঙ্গের। কণ্ঠে আক্রমণ নয়। উত্তর চাওয়ার দাবি।
বললাম, “যারা লাভ করেছে, তাদের আগে দেখুন। যে কৃষক জমি হারিয়েছে, যে পরিবার উদ্বাস্তু হয়েছে, যে নারী নিজের নামে সম্পত্তি পায়নি, যে শ্রমিক কল বন্ধ হওয়ার পর কাজ হারিয়েছে, তারা ভুলের স্থপতি নয়। তারা মূল্য দিয়েছে।”
“ভুলটি ছিল ক্ষমতার। ভুলটি ছিল এমন এক রাজনীতির, যা মানুষের বাস্তব অর্থনৈতিক প্রশ্নকে সম্প্রদায়ের ভয়ে বদলে দিয়েছিল। ভুলটি ছিল আমাদের মধ্যবিত্ত আত্মপ্রবঞ্চনারও। আমরা একই ভাষায় কবিতা পড়েছি, কিন্তু একই ভাষার কৃষকের ঋণ, শ্রমিকের মজুরি ও সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিইনি।”
এবার হাততালি উঠল না।
ভালো ভাষণ মানুষকে সবসময় আনন্দ দেয় না। কখনো নিজের অবস্থান নিয়ে অস্বস্তিতে ফেলে।
“আমি আজ দুই রাষ্ট্র ভেঙে নতুন মানচিত্র আঁকতে আসিনি। মানচিত্র ভাঙার ভাষা যারা সবচেয়ে সহজে বলে, তারা সাধারণত ভাঙা ঘরের নিচে চাপা পড়ে না।”
“আমি এমন এক বাংলা সভ্যতার কথা বলতে এসেছি, যেখানে বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের সার্বভৌম পরিচয়ে থাকবে, কিন্তু ইতিহাসের সত্য, নদীর ভবিষ্যৎ, ভাষার সম্পদ, শ্রমের মর্যাদা এবং সীমান্তবাসীর অধিকারকে আর বন্দি রাখবে না।”
“এক বাংলা মানে এক সরকার নয়। এক বাংলা মানে এক পতাকাও নয়। এক বাংলা মানে, একই সভ্যতার দুই রাজনৈতিক ভূখণ্ড নিজেদের ক্ষত অস্বীকার না করে সহযোগিতার ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।”
“ভাঙা হয় তাকেই, যার একটি শক্ত অবয়ব আছে। দুর্বল জিনিস ভাঙে না, গুঁড়ো হয়ে যায়। বাংলা ভেঙেও দুই পাশে ভাষা, গান, নদী, স্মৃতি ও আত্মপরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ ভাঙা হয়েছিল দুর্বল কোনো ভূখণ্ডকে নয়। শক্ত একটি সভ্যতাকে।”
এবার হাততালি উঠল।
প্রথমে সামনের কয়েকটি সারিতে। তারপর পেছনে। কয়েক সেকেন্ড পর পুরো মাঠে।
মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধ সেন হাততালি দিলেন না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তাঁর সন্দেহকে অসম্মান করতে পারলাম না।
কারণ জনতার হাততালির মধ্যেই প্রথমবার বুঝলাম, পুরোনো হাসান কেন মঞ্চের আলো পছন্দ করত না। আলো মানুষকে শুধু দৃশ্যমান করে না। মানুষের নিজের শক্তির প্রতিও আসক্ত করে।
স্নেহার প্রশ্ন
অনিরুদ্ধ সেন স্নেহার নাম ঘোষণা করলেন।
সে আমার পাশ দিয়ে মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার সময় আমাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল। দুর্ঘটনার আগের মতো কেউ হাত ধরে রাখল না।
স্নেহা জনতার দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
“হাসান ঐক্যের স্বপ্ন নিয়ে বলেছেন,” সে শুরু করল। “আমি ঐক্যের মূল্য নিয়ে বলতে চাই।”
তার কণ্ঠে বাংলাদেশের উচ্চারণ। কিন্তু বাক্যের গতি ধীর। স্পষ্ট।
“ঐক্যের কথা বলা সহজ। কিন্তু ঐক্যের নামে কার কণ্ঠ আবার চাপা পড়বে, সেই প্রশ্নটি আরও জরুরি।”
“দেশভাগের নথিতে আমরা পুরুষের সম্পত্তি, পুরুষের ঠিকানা, পুরুষের উত্তরাধিকার দেখি। কিন্তু সীমান্ত পেরোনো নারী কোথায় গেলেন, তাঁর সন্তান কোন নামে পরিচিত হলো আর তাঁর জমি কে দখল করল, সেই হিসাব বহু খাতায় নেই।”
মাঠের নারী-শ্রোতাদের কয়েকজন মাথা তুললেন।
“হাসপাতালে রোগীর জীবন বাঁচাতে প্রথমে তার পরিচয় জানতে হয় না। কিন্তু নাগরিক অধিকার পেতে নাম, ঠিকানা, নথি, জন্মস্থান এবং সীমান্তের ইতিহাস দেখাতে হয়। নথির একটি ভুল মানুষকে চিকিৎসা, জমি, শিক্ষা ও উত্তরাধিকার থেকে সরিয়ে দিতে পারে।”
“আমরা এমন কোনো বাংলা চাই না, যেখানে নতুন নেতা পুরোনো জমিদারের জায়গা নেয়। যেখানে মানুষকে ঐক্যের নামে আবার বলা হয়, তোমার হয়ে সিদ্ধান্ত আমরা নেব।”
কথাটি বলার সময় সে একবার আমার দিকে তাকাল।
জনতা বুঝল না, বক্তব্যের একটি অংশ আমার জন্য।
আমি বুঝলাম।
“একটি ন্যায়সংগত বাংলা তৈরি করতে হলে সীমান্তের আগে ক্ষমতার পুরোনো অভ্যাস ভাঙতে হবে। মানুষকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিতে হবে। ঐক্য মানে সবাইকে একই শব্দ বলানো নয়। ঐক্য মানে ভিন্ন স্মৃতি নিয়েও একে অন্যকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকার করা।”
এবার হাততালি আরও ধীরে উঠল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হলো।
হাসানের ভাষণ মানুষকে উত্তেজিত করেছে। স্নেহার বক্তব্য তাদের নিজেদের অবস্থান পরীক্ষা করতে বাধ্য করেছে।
আমি বুঝলাম, সে আমার পাশে দাঁড়ায়নি।
সামনে দাঁড়িয়েছে।
মাঠের মাঝখান দিয়ে
স্নেহা মাইক্রোফোন থেকে সরে আসার পর স্মৃতি দত্তের নাম ঘোষণার কথা ছিল।
অনিরুদ্ধ সেন সামনে এগিয়েছিলেন।
ঠিক তখন মাঠের মাঝখান থেকে একটি নতুন শব্দ উঠল।
স্লোগান নয়।
প্রথমে শুধু পায়ের ছন্দ।
শতাধিক মানুষ দুই সারিতে এগিয়ে আসছে। তাঁদের হাতে সাদা কাপড়ের ব্যানার। কোনো দলীয় প্রতীক নেই। সামনে কয়েকজন নারী। পেছনে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, সীমান্ত অঞ্চলের পরিবার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো পাঠচক্রের সদস্য বলে মনে হয় এমন কয়েকটি মুখ।
মাঝখানে একজন।
আমার শরীর মুখের আগেই তাকে চিনল।
সুবর্ণা।
বহু বছরের অনুপস্থিতি মানুষকে বদলায়। অথচ কিছু ভঙ্গি সময়ের সঙ্গে আপস করে না। হাঁটার সময় মাথা সামান্য উঁচু। কোনো প্রশ্ন শুনলে উত্তর দেওয়ার আগে ভ্রু কুঁচকে যায়। মানুষের ভিড়ের দিকে নয়, ভিড়ের মধ্যে যে ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, তার দিকে তাকায়।
তার হাতে মাইক্রোফোন নেই। প্রয়োজনও হলো না।
মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল, “বাংলা কারও একার পরিকল্পনা নয়।”
পশ্চিমবঙ্গের কিছু চরিত্রের মতো তার উচ্চারণ পুরো নয়। পূর্ব বাংলার টানও আছে। বহু বছর দুই পাশের মানুষের সঙ্গে কথা বললে ভাষা হয়তো নিজের সীমান্ত হারায়।
জনতার ভেতরে গুঞ্জন উঠল।
সুবর্ণা সরাসরি আমার দিকে তাকাল।
“যে মানুষ নিজের পরিচয় লুকিয়ে মঞ্চে ওঠে, সে একটি জাতির সত্যের মুখপাত্র হতে পারে না।”
মাঠের মানুষ জানে না, কোন পরিচয়ের কথা বলা হচ্ছে।
তারা ভাবতে পারে, আমার রাজনৈতিক অতীত। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব। দত্ত পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক। অথবা হঠাৎ বক্তা হয়ে ওঠার কারণ।
স্নেহা ও স্মৃতি দত্ত অন্য অর্থও শুনলেন।
আমি মঞ্চের সামনে এগিয়ে বললাম, “তুমি ঐক্যের বিরোধিতা করতে এসেছ?”
সুবর্ণা হাসল না।
“না। তোমার নেতৃত্বের পদ্ধতির বিরোধিতা করতে এসেছি।”
“দুটোকে আলাদা করতে পেরেছ?”
“তুমি কোনো দিন পারোনি।”
পুরোনো পাঠাগারের অন্ধকার, পো-র বইয়ের প্রান্তলিখন এবং চেয়ারম্যানবাড়ির কালো ফটক একই সঙ্গে মনে পড়ল।
সুবর্ণা বলল, “তুমি বলছ, বাংলা ভাগ ছিল যৌথ ব্যর্থতা। কিন্তু যে ক্ষমতার কাঠামো মানুষকে ভাগ করেছিল, সেই কাঠামো নিয়েই তুমি আবার বাংলা জোড়া লাগাতে চাইছ।”
“ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে ক্ষমতা বদলানো যায় না।”
“তুমি বদলাতে চাও, না নিয়ন্ত্রণ করতে চাও? সতেরো বছরেও উত্তরটা দাওনি।”
জনতার সামনে কথাটি রাজনৈতিক বিতর্ক।
আমাদের কাছে পুরোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ।
স্নেহা মঞ্চের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। আমার পাশে নয়। আমাদের দুজনের মাঝখানে।
“এই মিছিলের দাবি কী?” সে সুবর্ণাকে জিজ্ঞেস করল।
সুবর্ণা তাকাল।
দুই নারী প্রথমবার মুখোমুখি।
“ইতিহাসের নামে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করা যাবে না,” সুবর্ণা বলল। “দুই বাংলার কথা বলতে হলে সীমান্তবাসী, কৃষক, শ্রমিক, উদ্বাস্তু পরিবার ও নারীদের সিদ্ধান্তের জায়গা দিতে হবে।”
স্নেহা বলল, “এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য আলাদা নয়।”
“বক্তব্য নয়,” সুবর্ণা বলল। “প্রক্রিয়া।”
তার চোখ আমার দিকে ফিরল।
“ও সব সময় ফল ঠিক করে মানুষকে প্রক্রিয়ার মধ্যে বসিয়ে দেয়।”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল, “জানি।”
একটি ছোট শব্দ।
তবু আমার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য।
স্মৃতি দত্তের পরিচয়
নিরাপত্তাকর্মীরা মিছিলের দিকে এগোতে চাইছিল। আমি বাঁ হাত তুলে থামালাম।
ঠিক তখন স্মৃতি দত্ত মঞ্চের সামনে এলেন।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো আতঙ্ক নেই। যেন সুবর্ণার মিছিলও তাঁর পরিকল্পনার বাইরে নয়।
তিনি মাইক্রোফোন নিলেন।
তারপর জনতার দিকে ডান হাত বাড়ালেন। নীল পাথরের আংটিতে শেষ সূর্যালোক পড়ল।
“আজ পর্যন্ত আপনারা আমাকে দত্ত পরিবারের উত্তরাধিকারী, ইতিহাস সংরক্ষণের একজন পৃষ্ঠপোষক এবং এই সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে জেনেছেন।”
তাঁর পশ্চিমবঙ্গীয় উচ্চারণ অনেক বেশি স্বচ্ছ হলো। শব্দের সঙ্গে অবস্থানও বদলে গেল।
“কিন্তু মানুষ যখন সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন রেখে জনতার সামনে দাঁড়ায়, তখন তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এই প্রশ্ন শুধু হাসানের জন্য নয়। আমার জন্যও।”
অনিরুদ্ধ সেনের মুখ শক্ত হয়ে উঠল।
স্মৃতি দত্ত বললেন, “আমি স্মৃতি দত্ত। বঙ্গীয় প্রজা স্বরাজের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী এবং বাংলা ইতিহাস ও নাগরিক অধিকার পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক।”
মাঠে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
“প্রজা স্বরাজ কোনো পুরোনো রাজনৈতিক দলের পুনর্জন্ম নয়। তবে আমরা সেইসব ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছি, যেখানে কৃষক, প্রজা, শ্রমিক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন ক্ষমতার সামনে তোলা হয়েছিল।”
“আমাদের কাজ কোনো ভূখণ্ড দখল করা নয়। আমাদের কাজ স্মৃতি, দলিল, নদী, ভাষা ও নাগরিক অধিকারের ওপর জমে থাকা একচেটিয়া মালিকানা ভাঙা।”
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
“হাসান আমাদের ইতিহাস ও জনস্মৃতি কর্মসূচির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করবে।”
আমি জানতাম না।
অথবা আমার জানা উচিত ছিল।
“স্নেহা দত্ত সীমান্তবর্তী পরিবারের স্বাস্থ্য, নাগরিক পরিচয় এবং নারী উত্তরাধিকার প্রকল্পের প্রধান সংগঠক হিসেবে কাজ করবে।”
স্নেহা খুব নিচু স্বরে বলল, “তিনি আমাদের অনুমতি নেননি।”
বললাম, “ক্ষমতা প্রথমে ঘোষণা করে। অনুমতি পরে খোঁজে।”
“অভিজ্ঞতা থেকে বলছ?”
উত্তর দিলাম না।
স্মৃতি দত্ত জনতার দিকে হাত বাড়িয়েই বললেন, “আমরা পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলা ও প্রতিটি জনপদে ইতিহাস-শুনানি আয়োজন করব। বাংলাদেশেও সহযোগী নাগরিক মঞ্চের মাধ্যমে হারানো নাম, সম্পত্তি, পরিবার এবং সীমান্তের নথি সংগ্রহ করব।”
“কোনো আসন, কোনো জনপদ, কোনো ইতিহাসকে জন্মগতভাবে কারও সম্পত্তি বলে মেনে নেওয়া হবে না। মানুষের কণ্ঠ যেখানে অনুপস্থিত, আমরা সেখানে যাব।”
বক্তব্যটি সাংস্কৃতিক সম্মেলনের সীমা অতিক্রম করল।
অনিরুদ্ধ সেন ঠিকই বলেছিলেন। জনতা, মঞ্চ এবং ইতিহাসের দাবি একত্র হলে ফল রাজনীতি হয়।
যে নথি মঞ্চে উঠল
স্মৃতি দত্তের বক্তব্য শেষ হওয়ার আগে মঞ্চের পেছনের বড় পর্দা একবার কেঁপে উঠল।
সরাসরি সম্প্রচারের ছবি মিলিয়ে গেল।
পর্দায় একটি পুরোনো সাদা-কালো নথি দেখা দিল।
বাঁ পাশে:
পূর্ববঙ্গ
ডান পাশে:
পশ্চিমবঙ্গ
দুই পাশেই একই অসম্পূর্ণ নাম:
...নাথ দত্ত
তার নিচে নতুন একটি লাইন ফুটে উঠল:
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হস্তান্তরিত
স্মৃতি দত্তের হাত মাইক্রোফোনের পাশে স্থির হয়ে গেল।
প্রথমবার তাঁকে অপ্রস্তুত দেখলাম।
সুবর্ণা পর্দার দিকে ফিরল না।
যেন সে জানত, নথিটি আসবে।
শব্দব্যবস্থায় টোকা শুরু হলো।
মোর্স কোড।
স্নেহা দ্রুত তার নোটবুক খুলল। ছন্দ লিখছে।
আমি আগেই অর্থ বুঝে গেছি।
প্রথম আসন দত্ত পরিবারের নয়। ঘুড়ি-সাতের।
স্নেহা লেখা থামিয়ে আমার দিকে তাকাল।
জনতার কেউ অর্থ জানে না। তাদের কাছে এটি যান্ত্রিক ত্রুটি।
সুবর্ণা এবার বলল, “এবার তাদের বলো, হাসান। তুমি ইতিহাসের মুখপাত্র হতে এসেছ, না পুরোনো কোনো মিশন শেষ করতে?”
মাঠের কয়েক হাজার মুখ আমার দিকে।
তাদের কেউ গোপন এজেন্ট সম্পর্কে জানে না। কেউ জানে না `ঘুড়ি-সাত` একটি মানুষের নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ-পরিচয়।
ঠিক তখন জনতার ভেতরে সাতজন মানুষ একই সঙ্গে ডান হাত বুকের ওপর রাখল।
কোনো সাধারণ অভিবাদন নয়।
একটি পুরোনো field recognition signal।
সমস্যা হলো, সাতজনের কাউকেই আমি চিনতে পারলাম না।
আমার সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হলে অন্তত একজনকে চেনার কথা।
স্নেহা খুব নিচু স্বরে বলল, “ওরা কারা?”
“জানি না।”
সে আমার চোখের দিকে তাকাল।
এবার কথাটি সত্য।
মঞ্চের নিচে আবার টোকা পড়ল।
ছোট। দীর্ঘ। দীর্ঘ।
বিরতি।
দীর্ঘ। ছোট।
অর্থ:
দ্বিতীয় সীমান্ত খুলুন।
পর্দার নথিটি বদলে গেল।
এবার একটি প্রতিকৃতি।
ছবির মানুষটির মুখ আমার।
নিচে লেখা সাল:
১৯০৫
হাতে নীল পাথরের আংটি।
পেছনে একটি ভবন। দত্ত ভবন নয়। H Library-ও নয়।
ভবনটির দরজার ওপরে একটি নাম।
ছবির ক্ষয়ে যাওয়া অংশের কারণে পুরোটা পড়া যায় না।
শুধু শেষ দুটি শব্দ:
প্রজা স্বরাজ
স্মৃতি দত্ত পেছনে এক পা সরলেন।
অনিরুদ্ধ সেন মাইক্রোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে দৌড়ালেন।
সুবর্ণা এবার প্রথমবার পর্দার দিকে তাকাল।
তার মুখে বিস্ময় নেই।
অপেক্ষার সমাপ্তি আছে।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সাতচল্লিশের আগে যেতে চেয়েছিলে, হাসান?”
“হ্যাঁ।”
সুবর্ণা খুব ধীরে মাথা নাড়ল।
“তা হলে পাঁচে স্বাগতম।”
পর্দা নিভে গেল।
মাঠ অন্ধকার হলো না। সূর্য তখনো অস্ত যায়নি।
তবু কয়েক হাজার মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রথমবার মনে হলো, আমরা একটি আলোকিত মঞ্চে নই।
আমরা এমন একটি বন্ধ কক্ষের ভেতরে ঢুকে পড়েছি, যার দরজা ১৯০৫ সালে বন্ধ হয়েছিল।
জনতার সামনে আমি প্রথমবার বাংলা নিয়ে ভাষণ দিয়েছিলাম।
ভাষণ শেষ হওয়ার আগেই পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, দত্ত পরিবার, সুবর্ণা, প্রজা স্বরাজ এবং আমার গোপন সংগঠন একই ইতিহাসের মালিকানা দাবি করল।
চলবে...
সাতচল্লিশের আগে ছিল এগারো। এগারোর আগে পাঁচ। আর পাঁচের ভেতর অপেক্ষা করছিল হাসানের মুখ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘দত্ত পরিবার’ একটি ঐতিহাসিক আবহ ও উপাদাননির্ভর মৌলিক কাল্পনিক উপন্যাস। হাসান, স্নেহা, স্মৃতি দত্ত, সুবর্ণা, বঙ্গীয় প্রজা স্বরাজ, গোপন সংগঠন, সীমান্তের কালি, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং সংশ্লিষ্ট চরিত্র ও নথি সৃজনশীল কাহিনির অংশ। বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনা চরিত্রের বক্তব্য ও কাহিনির প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো চরিত্রের রাজনৈতিক বক্তব্যকে লেখকের চূড়ান্ত অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
তথ্যসূত্র ও ঐতিহাসিক পাঠ: Banglapedia: United Independent Bengal Movement; Banglapedia: Bengal Pact, 1923; Banglapedia: Krishak Praja Party; Sugata Bose, Agrarian Bengal: Economy, Social Structure and Politics, 1919-1947; ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগবিষয়ক স্বীকৃত ঐতিহাসিক গবেষণা।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0