সম্পর্কে সহমর্মিতার গুরুত্ব: অন্যের কষ্ট বুঝে পাশে থাকার শিক্ষা
সহমর্মিতা কী, কীভাবে তা প্রকাশ করতে হয় এবং পরিবার, বন্ধুত্ব ও অন্যান্য সম্পর্কে অন্যের কষ্ট বুঝে পাশে থাকা কেন জরুরি, জানুন সহজ একটি গল্পের মাধ্যমে।
অভিযাত্রী সম্পর্কের সাতরঙ
সম্পর্কে সহমর্মিতার গুরুত্ব: অন্যের কষ্ট বুঝে পাশে থাকার শিক্ষা
সহমর্মিতা শুধু অন্যের দুঃখে দুঃখিত হওয়ার নাম নয়। এটি সেই মানবিক গুণ, যা আমাদের অন্যের কষ্ট বুঝতে এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়াতে শেখায়।
পাঠকের জন্য সতর্কতা
এই নিবন্ধটি মানবিক সম্পর্ক ও সহমর্মিতা সম্পর্কে সাধারণ শিক্ষামূলক আলোচনা। মানুষের অনুভূতি, প্রয়োজন ও সম্পর্কের অভিজ্ঞতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। সহমর্মিতার অর্থ নিজের নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা বা ব্যক্তিগত সীমারেখা উপেক্ষা করা নয়। কোনো সম্পর্কে নিয়মিত অপমান, ভীতি, নিয়ন্ত্রণ বা নির্যাতন থাকলে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা উপযুক্ত পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
মানুষের কষ্ট সব সময় দূর করা যায় না। কিন্তু তাঁর কষ্টকে একা বহন করতে না দেওয়ার চেষ্টা করা যায়।
আমাদের দৈনন্দিন জীবন অসংখ্য সম্পর্কের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। পরিবার, বন্ধুত্ব, প্রতিবেশী কিংবা কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক, প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যেই আনন্দের পাশাপাশি দুঃখ, ভুল বোঝাবুঝি, অসুস্থতা ও বিপদের সময় আসে। আনন্দের সময়ে পাশে থাকা সহজ। কিন্তু একজন মানুষ বিপদের মধ্যে পড়লে আমরা তাঁর কষ্ট কতটা বুঝতে চেষ্টা করি, সেটিই সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে।
সহমর্মিতা মানুষকে অন্যের অভিজ্ঞতার দিকে মনোযোগ দিতে শেখায়। আমরা তখন শুধু নিজের অবস্থান থেকে ঘটনাটি দেখি না। অন্য মানুষটির চোখ দিয়ে ঘটনাটি কেমন, সেটিও বোঝার চেষ্টা করি।
সহমর্মিতা নিয়ে একটি শিক্ষণীয় গল্প
আসাদ সাহেব ও হাসান সাহেব পরস্পরের প্রতিবেশী। তাঁরা দুজন ভালো বন্ধুও। পাশাপাশি বসবাস করতে করতে তাঁদের দুই পরিবারের মধ্যেও একটি আন্তরিক বন্ধন তৈরি হয়েছে। একে অপরের পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা তাঁদের সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ।
আসাদ সাহেবের সন্তানদের সঙ্গে হাসান সাহেবের সন্তানদেরও সুন্দর সম্পর্ক। দুই পরিবারের মধ্যে এমন আন্তরিকতা ছিল যে, তাঁদের আনন্দের আয়োজনগুলোও অনেক সময় যৌথ হয়ে উঠত।
এক শীতে আসাদ সাহেব পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে ভ্রমণের পরিকল্পনা করলেন। তিনি হাসান সাহেবকে বললেন, “চলুন, আমরা সবাই মিলে কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসি।”
কিন্তু জরুরি কাজ থাকায় হাসান সাহেব যেতে পারলেন না। তিনি বললেন, “আপনারা ঘুরে আসুন। সামনেরবার আশা করি আমরা সবাই একসঙ্গে যেতে পারব।”
আসাদ সাহেব পরিবার নিয়ে কক্সবাজার গেলেন। কয়েকটি দিন তাঁরা আনন্দের সঙ্গে কাটালেন। ভ্রমণ শেষে বাসে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন। কিন্তু ফেরার পথে বাসটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ল।
পরিবারের কয়েকজন সদস্য আঘাত পেলেন। সবচেয়ে বেশি আহত হলো আসাদ সাহেবের ছোট সন্তান। দুর্ঘটনায় শিশুটির বাম পা ভেঙে গেল। স্থানীয় মানুষ আহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে গেলেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন।
সন্তানের অবস্থা দেখে আসাদ সাহেব ভেঙে পড়েছিলেন। চিকিৎসার প্রাথমিক ব্যবস্থা হওয়ার পর তিনি হাসান সাহেবকে ফোন করে দুর্ঘটনার খবর জানালেন।
সংবাদটি শোনার সময় হাসান সাহেব একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক বৈঠকে ছিলেন। কিন্তু আহত শিশুটির কথা শুনে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হলেন। শিশুটিকে তিনি শুধু প্রতিবেশীর সন্তান হিসেবে দেখলেন না। তাঁর মনে হলো, বিপদটি যেন তাঁর নিজের পরিবারের ওপরই এসেছে।
তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন, পরিবারের সবাই চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না এবং এই মুহূর্তে তাঁদের কী প্রয়োজন। এরপর প্রয়োজনীয় দায়িত্ব অন্য একজনের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলেন।
হাসপাতালে পৌঁছে তিনি আসাদ সাহেবের পরিবারের পাশে দাঁড়ালেন। চিকিৎসাসংক্রান্ত যোগাযোগে সহযোগিতা করলেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দিলেন এবং আহত শিশুটির প্রয়োজনের প্রতি যত্নশীল থাকলেন।
হাসান সাহেব শুধু মুখে বলেননি যে তাঁর খারাপ লাগছে। তিনি নিজের অনুভূতিকে বাস্তব সহযোগিতায় পরিণত করেছিলেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর এই উপস্থিতিই আসাদ সাহেবের পরিবারকে সাহস দিয়েছিল।
সম্পর্কের গভীরতা সব সময় আনন্দের দিনে বোঝা যায় না। কখনো একটি অসময়ের ফোনকল, হাসপাতালে ছুটে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনের মুহূর্তে বাড়িয়ে দেওয়া হাতই সম্পর্কের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করে।
হাসান সাহেব আসাদ সাহেবের কষ্টকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর অবস্থাটি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন এবং নিজের সামর্থ্যের মধ্যে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই অনুভব, বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভেতরেই সহমর্মিতার সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়েছে।
সহমর্মিতা কী?
সহমর্মিতা বা Empathy হলো অন্য একজন মানুষের অবস্থান, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা। একজন মানুষ কী কারণে দুঃখিত, ভীত, আহত কিংবা হতাশ, তা শুধু বাইরে থেকে বিচার না করে তাঁর অবস্থানে নিজেকে কল্পনা করার ক্ষমতাও সহমর্মিতার অংশ।
এর অর্থ এই নয় যে অন্যের কষ্ট হুবহু একইভাবে অনুভব করতে হবে। প্রত্যেক মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা। অন্যের অনুভূতি পুরোপুরি অনুভব করা সম্ভব না হলেও মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁর অবস্থান বোঝা এবং তাঁর কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব।
“আমি আপনার সব কষ্ট বুঝে গেছি” বলার চেয়ে “আমি হয়তো পুরোটা বুঝতে পারছি না, কিন্তু আপনার কথা শুনতে চাই” বলা অধিক সৎ ও সহমর্মিতাপূর্ণ।
সহমর্মিতা ও সমবেদনা কি এক?
দৈনন্দিন কথাবার্তায় সহমর্মিতা ও সমবেদনা প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে ধারণা দুটির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
অন্য মানুষটির জায়গা থেকে তাঁর অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা। এর ভাষা হতে পারে, “আপনার কাছে ঘটনাটি কেমন, আমি তা বুঝতে চাই।”
অন্যের দুঃখ বা দুর্দশার কথা জেনে তাঁর জন্য মমতা, উদ্বেগ কিংবা দুঃখ অনুভব করা। এর ভাষা হতে পারে, “আপনার কষ্টের কথা শুনে আমার খারাপ লাগছে।”
অন্যের কষ্ট বুঝে সেই কষ্ট কমাতে নিজের সামর্থ্যের মধ্যে কিছু করার চেষ্টা। এর ভাষা হতে পারে, “এই মুহূর্তে কীভাবে পাশে থাকলে আপনার উপকার হবে?”
সহমর্মিতা
সমবেদনা
সহানুভূতিশীল সহায়তা
হাসান সাহেবের আচরণে এই তিনটি দিকই ছিল। তিনি বন্ধুর কষ্ট বুঝেছিলেন, সংবাদটি শুনে ব্যথিত হয়েছিলেন এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে বাস্তব সহায়তা করেছিলেন।
সহমর্মিতা কীভাবে প্রকাশ করতে হয়?
অন্যের কষ্টের কথা শুনে শুধু “খারাপ লাগছে” বলাই সহমর্মিতার পূর্ণ প্রকাশ নয়। আন্তরিক অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ, তবে সম্ভব হলে সেই অনুভূতিকে দায়িত্বশীল আচরণেও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কারও পাশে দাঁড়ানোর অর্থ সব সময় অর্থ দিয়ে সাহায্য করা নয়। কখনো মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শোনা, হাসপাতালে সঙ্গে যাওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে দেওয়া, দৈনন্দিন একটি কাজের দায়িত্ব নেওয়া কিংবা নীরবে পাশে বসে থাকাও মূল্যবান সহায়তা হতে পারে।
১. মানুষটির কথা বাধা না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
২. তাঁর অনুভূতিকে ছোট বা অপ্রয়োজনীয় বলে উড়িয়ে দেবেন না।
৩. অনুমান না করে জানতে চান, এই মুহূর্তে তাঁর কী প্রয়োজন।
৪. সামর্থ্য থাকলে নির্দিষ্ট ও বাস্তব সহযোগিতা করুন।
৫. তাঁর ব্যক্তিগত কথা অনুমতি ছাড়া অন্যের কাছে প্রকাশ করবেন না।
৬. সাহায্যের নামে তাঁর সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করবেন না।
সহমর্মিতা প্রকাশের কয়েকটি সহজ উপায়
সহযোগিতা করার আগে মানুষটির প্রয়োজন জানা জরুরি। কারণ আমরা যেটিকে সাহায্য মনে করছি, সেটি তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে। তাই সহমর্মিতার সঙ্গে শ্রদ্ধা, সম্মতি ও মনোযোগও থাকতে হয়।
সহমর্মিতা একটি মহান মানবিক গুণ
সহমর্মিতা মানুষকে নিজের সংকীর্ণ জগতের বাইরে তাকাতে শেখায়। মানুষ তখন বুঝতে পারে, তাঁর আশপাশে আরও মানুষ আছেন, যাঁদের কষ্ট, ভয়, স্বপ্ন ও প্রয়োজন রয়েছে।
এই গুণ মানুষের মধ্যে উদারতা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে সাহায্য করে। একজন মানুষ যখন অন্যের কষ্টকে গুরুত্ব দেন, তখন কষ্টে থাকা মানুষটি শুধু সাহায্যই পান না, নিজের মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতিও অনুভব করেন।
গবেষণায় সহমর্মিতা ও অন্যের উপকারে আসা আচরণের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে সহমর্মিতা থাকলেই প্রত্যেক মানুষ সব পরিস্থিতিতে সাহায্য করবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। সামর্থ্য, মূল্যবোধ, সামাজিক শিক্ষা ও পরিস্থিতিও মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে।
সহমর্মিতা একজন মানুষকে নিখুঁত করে না। তবে এটি তাঁকে অন্য মানুষের কষ্টের প্রতি অন্ধ না থাকার শিক্ষা দেয়।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় সহমর্মিতা
বিশ্বের বহু ধর্মীয় ও নৈতিক ঐতিহ্যে দয়া, করুণা, দান, প্রতিবেশীর দায়িত্ব এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে মূল্যবান কাজ হিসেবে দেখা হয়েছে। ধর্মগুলোতে এসব শিক্ষার ভাষা, ভিত্তি ও অনুশীলন এক নয়। তবু মানুষের দুর্দশার প্রতি উদাসীন না থাকার আহ্বান বহু ধর্মীয় শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
ইসলামে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্য ধর্মীয় ও মানবিক ঐতিহ্যেও দয়া, করুণা ও মানবসেবার শিক্ষা পাওয়া যায়।
ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে হোক কিংবা সাধারণ মানবিক বিবেচনা থেকে, অন্যের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া মানুষে মানুষে দূরত্ব কমাতে সাহায্য করে। এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ একা নয়। প্রত্যেকের জীবন কোনো না কোনোভাবে অন্য মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
সম্পর্কের বন্ধনে সহমর্মিতার গুরুত্ব
একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার পাশাপাশি বোঝাপড়া প্রয়োজন। আমরা যদি একজন মানুষের অনুভূতি বুঝতে না চাই, তাঁর কষ্টকে গুরুত্ব না দিই এবং বিপদের সময় পাশে না থাকি, তাহলে সম্পর্কের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
সহমর্মিতা সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মানুষ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে সাহস পান। তিনি জানেন, তাঁর কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বিচার করা হবে না কিংবা তাঁর কষ্টকে অন্য কারও কষ্টের সঙ্গে তুলনা করে ছোট করা হবে না।
পরিবারে সহমর্মিতা থাকলে সদস্যরা একে অপরের প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখেন। বন্ধুত্বে সহমর্মিতা থাকলে শুধু আনন্দ নয়, দুঃখও ভাগ করা সম্ভব হয়। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে সহমর্মিতা থাকলে মতভেদ হলেও একে অপরের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা সহজ হয়।
“আমি আপনার কথা শুনছি। আপনি সময় নিয়ে বলুন।”
“ঘटनাটি আপনার জন্য কঠিন ছিল, সেটি বুঝতে চেষ্টা করছি।”
“আপনার অনুভূতিকে আমি ছোট করে দেখছি না।”
“আপনি কি কোনো পরামর্শ চান, নাকি শুধু চান আমি আপনার কথা শুনি?”
“এই মুহূর্তে কীভাবে পাশে থাকলে আপনার উপকার হবে?”
সহমর্মিতার ছোট কিছু ভাষা
সহমর্মিতার জন্য সব সময় বড় কোনো কাজ করতে হয় না। সঠিক সময়ে বলা একটি বাক্য, ধৈর্য নিয়ে শোনা কয়েকটি কথা কিংবা আন্তরিক একটি উপস্থিতিও সম্পর্কের ভেতরে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সহমর্মিতার অভাব কেন উদ্বেগের?
যখন মানুষ অন্যের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে, তখন সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। অবহেলা, ভুল বোঝাবুঝি ও মানসিক দূরত্ব বাড়তে পারে। পরিবার, সমাজ কিংবা কর্মক্ষেত্রে মানুষ নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও একা অনুভব করতে পারেন।
সহমর্মিতার ঘাটতি কিছু ক্ষতিকর ও নির্মম আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে সমাজের অপরাধ, সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার সব কারণ শুধু সহমর্মিতার অভাব নয়। ব্যক্তিগত ইতিহাস, সামাজিক পরিবেশ, বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাসহ বহু কারণ মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলে।
তাই একটি মানবিক সমাজ গড়তে সহমর্মিতার পাশাপাশি ন্যায়বোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব, জবাবদিহি ও কার্যকর সামাজিক প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন। সহমর্মিতা একা সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কিন্তু সহমর্মিতা ছাড়া অন্য মানুষের কষ্টকে সত্যিকার গুরুত্ব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সহমর্মিতা মানে নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়
অন্যের কষ্ট বোঝার অর্থ তাঁর প্রতিটি আচরণ মেনে নেওয়া নয়। একজন মানুষের রাগ, ভয় কিংবা হতাশার কারণ বোঝার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু সেই অনুভূতির কারণে তিনি অন্যকে অপমান, ভয় দেখানো কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পান না।
একইভাবে, অন্যের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা আর্থিক স্থিতি বিপন্ন করাও সহমর্মিতার শর্ত নয়। প্রত্যেকের সাহায্য করার সামর্থ্য আলাদা। নিজের সীমা সম্পর্কে সচেতন থেকে যতটুকু সম্ভব, ততটুকু দায়িত্বশীলভাবে সাহায্য করাই অধিক কার্যকর।
অনুভূতি বোঝা এবং ক্ষতিকর আচরণের বিরুদ্ধে সীমারেখা নির্ধারণ করা পরস্পরবিরোধী নয়। সুস্থ সম্পর্কে সহমর্মিতা ও আত্মমর্যাদা পাশাপাশি থাকে।
শেষ কথা
সহমর্মিতা মানুষের একটি মহান মানবিক গুণ। এই গুণ আমাদের নিজেদের বাইরে তাকাতে, অন্যের কষ্ট বুঝতে এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়াতে শেখায়।
আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় দুর্বল হই। কখনো আমাদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানুষ প্রয়োজন হয়, আবার কখনো প্রয়োজন হয় এমন একজনের, যিনি কোনো বিচার না করে শুধু আমাদের কথা শুনবেন। আজ আমরা কারও পাশে দাঁড়ালে আগামীকাল হয়তো আমাদের কঠিন সময়েও কেউ একটি হাত বাড়িয়ে দেবেন।
সহমর্মিতা শুধু বড় সংকটের জন্য নয়। পরিবারের কারও ক্লান্তি বোঝা, বন্ধুর নীরবতার কারণ জানতে চাওয়া, অসুস্থ প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া কিংবা কারও কষ্টকে বিদ্রূপ না করাও সহমর্মিতার অংশ।
আমরা সব কান্না থামাতে পারব না। সব ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও আমাদের নেই। কিন্তু আমরা মানুষের কষ্টকে অদৃশ্য করে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
আমরা শুনতে পারি, প্রয়োজন জানতে পারি এবং সামর্থ্য থাকলে পাশে দাঁড়াতে পারি। সাহায্য করতে না পারলেও মানুষটির কষ্টকে ছোট না করে সম্মান জানাতে পারি।
সহমর্মিতা তখনই সবচেয়ে সুন্দর, যখন অন্যের কষ্ট আমাদের শুধু ব্যথিত করে না, বরং আরও মানবিক হতে শেখায়।
১. American Psychological Association. “Empathy.” APA Dictionary of Psychology. অন্য ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর অনুভূতি, চিন্তা ও উপলব্ধি বোঝার ধারণাগত সংজ্ঞা। ২. American Psychological Association. “Sympathy.” APA Dictionary of Psychology. অন্যের দুঃখ সম্পর্কে উদ্বেগ, মমতা ও সমবেদনার সংজ্ঞা। ৩. Hayakawa, Seisuke and Katsunori Miyahara. “Empathy through Listening.” Journal of the American Philosophical Association, Volume 11, Issue 2, 2025, pp. 287–302. সহমর্মিতামূলক শ্রবণ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ায় মনোযোগ দিয়ে শোনার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা। ৪. Ringwald, Whitney R. and Aidan G. C. Wright. “The Affiliative Role of Empathy in Everyday Interpersonal Interactions.” European Journal of Personality, Volume 35, Issue 2, 2021, pp. 197–211. দৈনন্দিন পারস্পরিক যোগাযোগে সহমর্মিতার সম্পর্কমূলক ভূমিকা নিয়ে গবেষণা। ৫. Yin, Yingying and Yong Wang. “Is Empathy Associated with More Prosocial Behaviour? A Meta-analysis.” Asian Journal of Social Psychology, 2022. সহমর্মিতা ও অন্যের উপকারে আসা আচরণের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বহু গবেষণার সম্মিলিত বিশ্লেষণ। লেখাটির মূল গল্প, মানবিক আবেদন ও নৈতিক অবস্থান সংরক্ষণ করে মনোবৈজ্ঞানিক পরিভাষা এবং কয়েকটি বিস্তৃত দাবি বর্তমান নির্ভরযোগ্য উৎসের আলোকে পরিমার্জিত হয়েছে।
মানুষের কষ্টে মানুষের পাশে
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
https://dictionary.apa.org/empathy
https://dictionary.apa.org/sympathy
https://doi.org/10.1017/apa.2024.12https://doi.org/10.1017/apa.2024.12
https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC8716022/
https://doi.org/10.1111/ajsp.12537https://doi.org/10.1111/ajsp.12537
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0