দত্ত পরিবার | পর্ব ২০: সকাল আটটার আগে
পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩ প্রকাশের আগে হাসান, স্নেহা, সুবর্ণা ও অমিতকে এর তিনটি পরিবর্তিত পাঠ শনাক্ত করতে হবে। নদিয়ার পুরোনো H কেন্দ্র, স্মৃতি দত্তের সংকট এবং রহস্যময় SNEHA নথি তাদের সামনে পরিচয় ও ক্ষমতার নতুন প্রশ্ন তোলে।
একটি লেখা প্রকাশের আগে লেখককে জিজ্ঞেস করা যায়, লেখাটি তাঁর কি না। কিন্তু লেখকের নামটিই যখন ধার করা, তাঁর স্মৃতি যখন নিজের কাছেও সম্পূর্ণ উন্মুক্ত নয় এবং একই পাণ্ডুলিপির তিনটি অসম্পূর্ণ পাঠ তিনটি আলাদা ভবিষ্যৎ দাবি করে, তখন অনুমতি চাওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য মানুষ আর কে থাকে?
ছাপা হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ
আমার ১০১টি উপস্থিত পাণ্ডুলিপির কোনোটি নয়।
এটি অনুপস্থিত ছয়টির একটি।
পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩।
শিরোনাম: দুই বাংলার প্রথম গোপন রাজধানী।
ল্যাপটপের পর্দায় সংবাদপত্রের পরীক্ষামূলক পৃষ্ঠাটি স্থির হয়ে ছিল। ওপরে আমার ছবি। ডান দিকে সামান্য ঘোরানো মুখ। চোখের নিচে ক্লান্তির রেখা। ঠোঁটের পাশে ছোট দাগ। ছবিটি সাম্প্রতিক নয়, আবার এত পুরোনোও নয় যে অন্য কোনো হাসানের বলে অস্বীকার করা যায়।
ছবিতে আমার ডান হাত দেখা যাচ্ছে না। ফলে ছবিটি দেখে বোঝার উপায় নেই, হাতটি এখন স্লিংয়ের ভেতর ভারী হয়ে ঝুলছে। কয়েক মিনিট পরপর বাহুর গভীর থেকে ব্যথার একটি উত্তপ্ত রেখা কাঁধ পর্যন্ত উঠে আসছে। তর্জনী সামান্য নড়ছে। মধ্যমায় ঝিনঝিনি। অন্য আঙুলগুলো কখনো আমার নির্দেশ বোঝে, কখনো নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে।
একটি রাজনৈতিক ছবির সবচেয়ে বড় সুবিধা সম্ভবত এই যে, আহত হাতটি ফ্রেমের বাইরে রাখা যায়। মানুষ তখন ভাষণ দেখে। ক্ষত নয়।
পৃষ্ঠার নিচে প্রকাশের সময় দেওয়া:
নির্ধারিত প্রকাশ
সকাল আটটা
ঘড়িতে রাত বারোটা সাতাশ।
নিজের জীবন সম্পর্কে এমন একটি লেখা প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, যেটি নিজের কাছেই নেই। অথচ হাতে সাত ঘণ্টা তেত্রিশ মিনিট। সাধারণ মানুষের জন্য সময়টি দীর্ঘ। যারা নিজের জন্মনাম জানে না, তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।
সুবর্ণা ল্যাপটপের খুব কাছে গিয়ে পৃষ্ঠাটি দেখছিল। দুই হাত টেবিলের কিনারায়। নদীর দিকের ভাঙা জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে তার চুলের একটি অংশ কপালের কাছে এনে দিচ্ছে। সে সরাচ্ছে না। কোনো লেখা পড়ার সময় পৃথিবীর ছোট অসুবিধাগুলোকে অবজ্ঞা করার অভ্যাস তার কৈশোরেও ছিল। বহু বছরের ব্যবধান সেই অভ্যাসের ওপর কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
“প্রকাশ বন্ধ করতে হবে,” বললাম।
সুবর্ণা পর্দা থেকে চোখ সরাল না। “কেন?”
“কারণ লেখাটি আমার নামে।”
“সেটা প্রকাশ বন্ধ করার কারণ নয়। সত্যতা যাচাই করার কারণ।”
“আমি লিখেছি কি না জানি না।”
“তা হলে নিজের নাম দেখে মালিকানা দাবি করছ কেন?”
কোনো তর্কে সুবর্ণা প্রথম প্রশ্নেই মূল দুর্বলতায় আঘাত করলে তাকে অপছন্দ করা সহজ হয়। দুর্ভাগ্য হলো, সহজ জিনিসে আমার আগ্রহ কম।
মৈত্রেয়ী বসু সংবাদপত্রের ছবিটি বড় করলেন। মুদ্রিত পাতার বাঁ পাশের নিচে ক্ষুদ্র একটি চিহ্ন দেখা গেল। তিনটি বৃত্ত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাঝখানে ফাঁকা জায়গা রেখেছে। কোনো পরিচিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের চিহ্ন নয়। অন্তত মৈত্রেয়ী চিনলেন না।
“এই চিহ্নটি পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের পুরোনো তালিকাতেও ছিল,” তিনি বললেন। “তবে সেখানে মাঝের অংশটি ফাঁকা ছিল না।”
“অর্থ?”
“জানি না। তিনটি কেন্দ্র, তিনজন হেফাজতকারী বা তিনটি অনুলিপি, যেকোনো কিছু বোঝাতে পারে। চিহ্ন দেখে অর্থ বানালে সেটি নথি পড়া হবে না।”
অমিত তখনো নিরাপদ দৃশ্যসংযোগে ছিল। তার পেছনের অন্ধকার কক্ষের ছোট আলোটি একবার নিভে আবার জ্বলে উঠল। সে মাথা নিচু করে কিছু পরীক্ষা করছিল। সামনে কয়টি পর্দা আছে দেখা যাচ্ছে না। চোখের ছোট ছোট নড়াচড়ায় বোঝা যায়, একটির বেশি।
“প্রকাশনা দুটি জায়গা থেকে নির্ধারিত হয়নি,” সে বলল। “তিনটি প্রকাশনা-প্রতিলিপি কেন্দ্র সক্রিয়।”
চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে যুক্ত হওয়া স্নেহার কণ্ঠ এল, “কোথায়?”
“ঢাকা, কলকাতা এবং পরিচয় গোপন রাখা তৃতীয় একটি কেন্দ্র।”
“নদিয়া?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“সহজ উত্তরগুলোর প্রতি তোর আকর্ষণ বেড়েছে দেখছি।”
“সাত ঘণ্টার মধ্যে বৌদ্ধিক উন্নতি সম্ভব নয়।”
অমিত বলল, “তৃতীয় কেন্দ্র পুরোনো হস্তান্তর-সংকেত ব্যবহার করছে। তবে মূল সংকেত নদিয়া থেকে আসছে না।”
“তা হলে?”
“বাংলাদেশ।”
গুদামের টিনের ছাদে বাতাসের চাপ বদলাল। আলগা একটি পাত কেঁপে উঠে আবার স্থির হলো।
সুবর্ণা ধীরে আমার দিকে তাকাল। “যশোরের কেন্দ্র?”
উত্তরটি আমার জানা ছিল। বলা উচিত কি না, সেই পুরোনো প্রশ্নও সঙ্গে ছিল। আগে হলে নিশ্চিত হওয়ার আগেই উত্তরটি বলতাম। তারপর অন্য সবাইকে নিজের নিশ্চয়তার ভেতর জায়গা দিতাম।
“সম্ভবত,” বললাম। “ছবির উৎস যাচাই না করে নিশ্চিত করছি না।”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “এই উত্তরটা ঠিক আছে।”
সুবর্ণা ভ্রু কুঁচকাল। “কোন অংশ? সম্ভবত বলা, না সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্যদের জানানো?”
“দুটোই,” স্নেহা বলল।
একই ঘরে না থেকেও দুজন আমাকে নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এর চেয়ে উদ্বেগজনক কূটনৈতিক সাফল্য কমই ঘটেছে।
মৈত্রেয়ী বললেন, “ছাপাখানায় যেটি গেছে, ঢাকার নির্ধারিত ফাইল এবং পরিচয়-গোপন তৃতীয় কেন্দ্রের পাঠ, তিনটিই দরকার। একই শিরোনাম মানেই একই লেখা নয়।”
“কত সময়?”
“প্রথম পাঠ পেতে আধঘণ্টাও লাগতে পারে। তৃতীয়টির ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা। তাড়াহুড়ো করে মূল পাঠ ঘোষণা করব না।”
স্নেহা বলল, “এর মধ্যে কেউ পূর্ণ প্রকাশ বন্ধ করার চেষ্টা করবে না। আগে বুঝি, বন্ধ করলে কী সক্রিয় হতে পারে।”
“সকাল আটটা অপেক্ষা করবে না।”
“সত্যও তোমার তাড়াহুড়োর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে না,” সে বলল।
পর্দার নিচে হঠাৎ নতুন একটি বার্তা উঠল। ঢাকা ও কলকাতার দুই প্রকাশনাপথের পাশে সবুজ আলো। তৃতীয়টির পাশে কোনো অবস্থান নেই। শুধু তিনটি শব্দ:
প্রথম আসন পুনরুদ্ধার
শব্দগুলো কোনো যাচাইকৃত নিয়মের প্রমাণ নয়। অজ্ঞাত ব্যবস্থাটি একটি দাবি আমাদের সামনে রেখেছে। দাবি যতটা স্পষ্ট, তার উৎস ততটাই অন্ধকার। তবু সেটি এমনভাবে লেখা, যেন সকালের প্রকাশনা শুধু একটি লেখা প্রকাশের ঘটনা নয়। পুরোনো কোনো অবস্থান পুনরুদ্ধারের অনুষ্ঠান।
প্রথম আসন সম্পর্কে আমাদের তথ্য খুব কম। নওশাদের পুরোনো খাতায় একটি শব্দ। স্মৃতি দত্তের ঘোষণায় রাজনৈতিক ইঙ্গিত। ছেঁড়া জুতার বহনকারীদের কাছে সম্ভবত অন্য অর্থ।
কেউ পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করছে না শুধু। একটি লেখাকে ব্যবহার করে পুরোনো কোনো কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে চাইছে।
শওকত চাচার শেষ নয়
রাত বারোটা বিয়াল্লিশে শিহাবের কল এল। হাসপাতালের সাদা দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে সে প্রথমেই বলল, “শওকত চাচা বেঁচে আছেন।”
বুকের ভেতরের একটি শক্ত অংশ আলগা হয়ে গেল। এতক্ষণ বুঝিনি, সেটি আটকে ছিল।
“অবস্থা?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“গুরুতর। পাঁজরে আঘাত। বাঁ পায়ের হাড় ভেঙেছে। মাথায়ও আঘাত আছে। তবে জ্ঞান ফিরেছে। চিকিৎসক বেশি কথা বলতে দেননি।”
শিহাব ফোনটি কেবিনের দিকে ঘোরাল। শওকত চাচাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা গেল। বুকের ওপর বাঁধন। বাঁ পা উঁচু করে রাখা। মুখের ডান পাশে ক্ষত। চোখ পুরো খুলতে পারছেন না।
“চাচা, আমি হাসান।”
তিনি খুব নিচু কণ্ঠে বললেন, “তোমার নাম হাসানই থাক। গাড়ির লোকেরা অন্য নামে ডাকতেছিল।”
“কোন নামে?”
শওকত চাচার ঠোঁট নড়ল। শব্দ বের হলো না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
স্নেহা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আর প্রশ্ন নয়।”
শওকত চাচা চোখ বন্ধ করার আগে বললেন, “তোমার মায়েরে বলো, আমি গাড়ি সামলাইতে পারি নাই।”
“এটা আপনার ভুল ছিল না।”
“তাহলে সত্যি কইরাই বলবা।”
গুরুতর আহত একজন মানুষকে রহস্যের তথ্যভাণ্ডার বানানো যায় না। তাঁর সীমিত কথার সবচেয়ে বড় সত্য ছিল, তিনি বেঁচে আছেন।
সংযোগ শেষ হওয়ার পরও পর্দার একটি অংশে হাসপাতালের ফাঁকা করিডর রয়ে গেল। মানুষ চলে গেলে জায়গা তার অনুপস্থিতির ভাষা শেখে। শওকত চাচার ঘটনাস্থল থেকে বেঁচে ফেরা আমাদের কোনো বিজয় নয়। তিনি নিজের গাড়ি, পেশা ও মায়ের কাছে সম্মান হারানোর ভয় নিয়ে হাসপাতালে পড়ে আছেন। আর আমরা তাঁর শোনা অজানা নামের ভেতর রাজনৈতিক সূত্র খুঁজছি।
স্নেহা আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, “ওঁর বক্তব্য পরে, চিকিৎসকের অনুমতিতে, নিরপেক্ষভাবে নথিভুক্ত করতে হবে। আজ নয়।”
“জানি।”
“জানা আর মানা এক নয়।”
“আজ মানছি।”
“আজ শেষ হয়নি।”
রাতও নয়।
অস্ত্র, তদন্ত ও দায়
রাত বারোটা আটান্নে শিহাব হাসপাতালের করিডরে ফিরে এল। অমিতের পাঠানো MP-443 Grach তার নিরাপদ হেফাজতে আছে। সিল অক্ষত। অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়নি। কোথায় রেখেছে, দৃশ্যসংযোগে বলল না। সেটি ঠিক কাজ।
আমার ব্যক্তিগত রিভলভার পুলিশ ঘটনাস্থলের কাদা থেকে উদ্ধার করেছে। অস্ত্র ও ব্যবহৃত গুলির খোসা উদ্ধার-তালিকায় আছে। ঘটনাস্থলে আহত বা নিস্তেজ অবস্থায় পাওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও আঘাতের উৎস নিয়ে তদন্ত চলছে। কার মৃত্যু আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত, সে তথ্য শিহাবের কাছে তখনো ছিল না।
তদন্তকারী কর্মকর্তার পাঠানো লিখিত বার্তার একটি অংশ শিহাব দেখাল। আমার বর্তমান অবস্থান তাঁরা জানেন। পশ্চিমবঙ্গযাত্রার নথি সংঘর্ষের আগেই প্রস্তুত ছিল। আমাকে তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়নি। দেশে ফিরে বক্তব্য দিতে হবে এবং চিকিৎসার নথিও জমা দিতে হবে।
এ তথ্য কোনো ছাড় নয়। শুধু বর্তমান আইনগত অবস্থার সীমা। নতুন প্রমাণ এলে অবস্থাও বদলাতে পারে।
GHURI-7 শনাক্তকারী রূপালি যন্ত্রটি পুলিশের তালিকায় নেই। শিহাবের কাছেও নেই। দত্ত ভবনের চিকিৎসাকক্ষের সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রবেশতথ্য ডা. তাহমিনা রশীদ গোপনীয়তা রক্ষা করে আলাদা করছেন। যন্ত্রটি দুর্ঘটনাস্থল থেকে দত্ত ভবনে এসেছিল কি না, কিংবা অন্য কেউ পরে এনেছিল কি না, কোনোটিই নিশ্চিত নয়।
সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল, “তুমি কতজনকে হত্যা করেছ?”
প্রস্তুত উত্তর ছিল। তারা আমাদের হত্যা করতে এসেছিল। স্নেহাকে টেনে বের করার চেষ্টা করেছিল। আমার কাছে সময় ছিল না। আত্মরক্ষা। পুরোনো প্রশিক্ষণ।
প্রস্তুত উত্তরগুলো সাধারণত সত্যের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন পোশাক।
“যতটুকু মনে আছে, আমার গুলির পর তিনজনকে আর নড়তে দেখিনি,” বললাম। “তাঁদের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক তথ্য আমার কাছে নেই। প্রথম প্রতিরোধ আত্মরক্ষা ছিল। শেষ মুহূর্তের সবকিছুকে একইভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছি না।”
সুবর্ণা বলল, “তোমার নিজের নথিতে লেখা ছিল, নাম রক্ষার জন্য মানুষ হত্যা করা যাবে না।”
“মনে আছে।”
“এখন?”
“এখন মনে হচ্ছে, নিয়মটি লিখেছিলাম নিজের কোনো অংশকে ঠেকানোর জন্য।”
স্নেহা বলল, “এটা ব্যাখ্যা। দায় স্বীকার নয়।”
“তদন্ত এড়িয়ে যাব না।”
“কারণ অস্ত্রটি পুলিশ পেয়েছে?” সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল।
“কারণ আমি কী করেছি, তার স্মৃতি নিজের সুবিধামতো সাজাতে চাই না।”
স্নেহা কোনো ক্ষমা দিল না। শুধু বলল, “এই কথাটাও নথিভুক্ত থাকবে।”
আমি চেয়ারের পিঠে বাঁ হাত রাখলাম। ডান বাহুতে ব্যথার তরঙ্গ কাঁধ পর্যন্ত উঠে গেল। স্নেহা সেটি লক্ষ্য করল।
“বসো।”
“আমি ঠিক আছি।”
“এই বাক্যের কোনো চিকিৎসামূল্য নেই।”
আমি বসে পড়লাম। মাথা সামান্য ঘুরছিল। ওষুধ, রক্তক্ষরণ ও রাতজাগা শরীরকে রাজনৈতিক মতবাদ বোঝায় না। শরীরের একটাই নীতি। সীমা অতিক্রম করলে থামো।
স্নেহা তাপমাত্রা পরীক্ষা করল। জ্বরের সীমায় পৌঁছাইনি, কিন্তু ক্ষতের চারপাশে উত্তাপ বেড়েছে। নতুন করে রক্ত বের হয়নি। আঙুলের সাড়া অসম।
“আজকের পর স্নায়ু ও পেশির পরীক্ষা দরকার,” সে বলল। “তার আগে আর কোনো অভিযান নয়।”
“দত্ত ভবনে ফিরতে হবে।”
“ফেরা আর অভিযান এক নয়। তুমি যাত্রী হবে।”
“বাক্যটি অপমানজনক।”
“শারীরিক অবস্থাও।”
বাবার বাক্স খোলা হলো না
রাত একটা বারো মিনিটে শিহাব গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাল। ক্যামেরায় মাটির দেয়াল, মায়ের ঘরের পরিচিত আলো এবং টেবিলের ওপর বাবার টিনের বাক্স দেখা গেল। বাক্সটি খোলা হয়নি। ওপরে মরচে। তালার পাশে নতুন আঁচড় নেই। নিচের অংশে আর্দ্রতার দাগ।
মা পাশে বসেছিলেন। তিনি বললেন, “তোর বাবা অসুস্থ হওয়ার পর কাগজ আলাদা করছিল। সব নিজে রাখে নাই। কিছু আমারে দিছিল। কিছু আবার নিতে আসছিল।”
“কে নিতে এসেছিল?”
“নাম মনে নাই। তোর বাবা চিনত কি না বুঝি নাই। কথা হইছিল বাইরে।”
“লোকটির কোনো চিহ্ন?”
মা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “হাঁটার সময় বাঁ পা একটু টানত। তবে এখন যা শুনতেছ, সব আমার পুরোনো স্মৃতির মধ্যে বসাইও না।”
মায়ের এই সতর্কতা নথির অনেক শিক্ষিত মানুষের চেয়ে নির্ভুল।
“বাবার অবস্থা সম্পর্কে শেষ খবর কবে পেয়েছিলাম?”
মা সরাসরি উত্তর দিলেন না। “তোরে খবর দেওয়া হইছিল। কোন খবর কবে দিছি, ফোনে বলব না। আগে বাড়ি আয়।”
আমি আরও জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম। স্নেহা ধীরে মাথা নাড়ল। মা কথা থামাতে চাইছেন। তাঁর না বলার অধিকারও তথ্যের অংশ।
“বাক্সটি এখন খুলবেন না,” স্নেহা বলল। “কেউ সরাবেনও না। শিহাব বাইরে থেকে নিরাপত্তা রাখবে। বাক্সের চারদিকের ছবি নাও, কিন্তু তালা ছুঁয়ো না।”
শিহাব বাক্সের চারপাশের ছবি নিল। নতুন কোনো পত্র, সিল বা পরিচয়চিহ্ন পাওয়া গেল না। বাক্সটি মায়ের ঘরেই থাকল। জন্ম, মৃত্যু, অভিভাবকত্ব বা বাবার গোপন পরিচয় নিয়ে কোনো নতুন সত্য ঘোষণা করা হলো না।
সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল, “বাক্স নিজের কাছে আনছ না?”
“আমার অজানা নাম সেখানে থাকলেই বাক্সটি আমার হয়ে যায় না।”
স্নেহা নিচু স্বরে বলল, “এই উত্তরটাও রাখা হলো।”
“আমার ভালো উত্তরগুলোর আলাদা তালিকা হচ্ছে?”
“খুব ছোট তালিকা।”
একটি শিরোনাম, তিনটি অসম্পূর্ণ পাঠ
রাত একটা ছত্রিশে ঢাকা কেন্দ্রের সাময়িক সংরক্ষণ থেকে প্রথম পাঠ পাওয়া গেল। শুরুটি পরিচিত। একটি গ্রামের পাঠাগার, নদীর গন্ধ এবং একই নকশার দুটি ভবনের বর্ণনা। তারপর সীমান্তের দুই পাশে আলাদা নামে বেঁচে থাকা মানুষ, নথির ভেতর মৃত্যু এবং বই বহনের পুরোনো পথ।
কিছু বাক্য পড়ার আগেই পরের শব্দ মনে পড়ল। লেখাটির অন্তত প্রথম অংশ একসময় আমার ছিল।
পৃষ্ঠা বারোর পরে সরাসরি পৃষ্ঠা সতেরো। পাঁচটি পৃষ্ঠা নেই। শেষ অংশ যেখানে থাকার কথা, সেখানে শুধু একটি বাক্য:
একটি কেন্দ্র তৈরি করলে প্রথম কাজ হবে কেন্দ্রটির নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য রাখার ব্যবস্থা করা।
বাক্যটি আমার হাতের লেখায় ছিল কি না, ডিজিটাল প্রতিলিপি থেকে নিশ্চিত হওয়া গেল না।
রাত একটা আটান্নে কলকাতার ছাপাখানায় যাওয়া পাঠ পাওয়া গেল। প্রথম এগারো পৃষ্ঠা প্রায় একই। তারপর নতুন কয়েকটি অনুচ্ছেদ। সেখানে বলা হয়েছে, একটি কেন্দ্রীয় গোপন পরিষদ ইতিহাস, নদী ও সীমান্তবিষয়ক সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব না নিলে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সহযোগিতা ব্যর্থ হবে।
“এই অংশ আমার নয়,” বললাম।
সুবর্ণা পড়ল। “বাক্য নয়। কিন্তু কেন্দ্রের প্রয়োজন নিয়ে ধারণাটি তোমার পুরোনো।”
“ধারণা আর এই প্রস্তাব এক নয়।”
“রাজনীতিতে পুরোনো ধারণাকে নতুন বাক্যে লিখেই সবচেয়ে বেশি অপরাধ করা হয়।”
রাত দুইটা সতেরো মিনিটে তৃতীয় পাঠের মাত্র নয়টি পৃষ্ঠা দৃশ্যমান হলো। শুরু আমার। মাঝখানে সুবর্ণার পুরোনো প্রান্তলিখনের অংশ। কয়েকটি বাক্য অমিতের পর্যবেক্ষণ-নোটের ভাষার মতো। শেষ দৃশ্যমান পৃষ্ঠায় অজ্ঞাত সম্পাদকের ঘোষণা:
প্রথম গোপন রাজধানী কোনো শহর নয়। এটি এমন একটি পরিচয়, যার নামে দুই পাশের মানুষ একই নির্দেশ মানে। প্রথম আসন পুনরুদ্ধার না হলে দুই কেন্দ্রই অকার্যকর হবে।
কোনো স্বাক্ষর নেই। তিনটি অক্ষরের জায়গা ফাঁকা।
তিনটি পাঠের কোনোটিই পূর্ণ নয়। কোনোটিকে মূল পাণ্ডুলিপি বলার প্রমাণ নেই। পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩ উদ্ধার হয়নি। পাওয়া গেছে তার তিনটি অসম্পূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী প্রতিলিপি।
মৈত্রেয়ী প্রতিটি পাঠের ভাষা, পৃষ্ঠা, ফাঁক ও ভিন্ন বাক্য আলাদা তালিকায় রাখলেন। তিনি বললেন, “ঢাকার কপিতে যে পাঁচটি পৃষ্ঠা নেই, কলকাতারটিতে তার মধ্যে দুটি আছে। কিন্তু তৃতীয় পাঠে সেই দুইটির ভাষা আবার আলাদা।”
“কোনো একটি সম্পূর্ণ করা যায়?”
“তিনটি জোড়া লাগিয়ে একটি পাঠ বানানো যাবে। সেটি আমাদের সম্পাদিত চতুর্থ পাঠ হবে, মূল নয়।”
সুবর্ণা বলল, “ঠিক এভাবেই ইতিহাসে নতুন মূল তৈরি হয়।”
আমার দিকে তাকিয়ে যোগ করল, “তুমি একসময় এই ঝুঁকি নিয়ে লিখেছিলে। এখন নিজের পাণ্ডুলিপিতে প্রমাণ পাচ্ছ।”
“যদি সত্যিই লিখে থাকি।”
স্নেহা বলল, “স্মৃতি লেখকত্বের সহায়ক হতে পারে। প্রমাণ নয়।”
আমার নিজের বাক্যগুলো অন্যের মুখে শুনলে মনে হয়, বহু বছর আগে আমি ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে কিছু ফাঁদ রেখে গিয়েছিলাম। সমস্যা হলো, সেই ফাঁদে প্রথমে আমিই পা দিচ্ছি।
স্নেহা কেন অমিতের নাম জানত
রাত দুইটা আটাশে স্নেহা জানাল, অর্ক স্থিতিশীল। অন্য চিকিৎসক দায়িত্ব নিয়েছেন। চিকিৎসাকেন্দ্র ছাড়ার আগে সে বলল, “অমিতের বিষয়ে আমি নিজেই বলব। তোমাদের কেউ আমার স্মৃতি ব্যাখ্যা করবে না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য আলাদা একটি স্বাস্থ্যশিবিরের পরিকল্পনা ছিল। নিরাপদ চিকিৎসা, পরামর্শ এবং জরুরি সহায়তা। আমি বৃহৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নজরদারির কথা বলে সময় পিছিয়েছিলাম। একবার। তারপর আরেকবার। শেষে প্রকল্পটি কাগজে রয়ে যায়।
অমিত ঝুঁকির কথা বলেছিল, তারপর সিদ্ধান্তটি স্নেহার হাতে রেখেছিল। অমিত সব জায়গায় পূর্ণ নাম ব্যবহার না করলেও স্নেহা নামটি জানত। পরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। বহু বছর পর দত্ত ভবনে নামটি মুখে আসার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় তার কাছে স্পষ্ট স্মৃতি ছিল না। কিছু জায়গা, শব্দ ও মুখের টুকরো ছিল।
“H Library-এর স্মৃতি-উদ্দীপনা ব্যবস্থার সঙ্গে তুমি যুক্ত ছিলে?” জিজ্ঞেস করলাম।
“নিশ্চিতভাবে বলার মতো নথি নেই,” স্নেহা বলল। “গন্ধ, আঘাত ও স্মৃতির সম্পর্ক নিয়ে কয়েকটি গবেষণা-আলোচনায় ছিলাম। আলোচনা আর আমার ওপর পরীক্ষা এক কথা নয়।”
সুবর্ণা বলল, “আমি জানতাম H-এর প্রযুক্তিগত স্তর স্নেহার পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কীভাবে, জানতাম না।”
স্নেহা আমার দিকে তাকাল। “তুমি?”
স্বাস্থ্যশিবিরের কাগজ, প্রশাসনিক ভবনের সিঁড়ি, সুবর্ণার সঙ্গে ঝগড়া এবং অমিতের হিসাবখাতা মনে পড়ল। স্নেহার নামে কোনো অনুমোদন মনে পড়ল না।
“তোমাকে পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিল, সম্ভবত জানতাম। তোমার সম্মতির সীমা কী ছিল, জানি না। আমি কোনো অনুমোদন দিয়েছিলাম কি না, এখন নিশ্চিত নই।”
“মনে পড়লে?”
“তুমি জানতে চাইলে বলব। নিজের সুবিধামতো ফাঁকা জায়গা পূরণ করব না।”
“আমি জানতে চাইব কি না, সেটাও আমার সিদ্ধান্ত।”
“ঠিক।”
অমিত বলল, “আমিও পরে তথ্য বেছে দিয়েছিলাম। সিদ্ধান্ত স্নেহার হাতে রেখেছিলাম, কিন্তু সব তথ্য নয়।”
স্নেহা বলল, “তোমরা দুজন একই নও। নিজেদের পার্থক্য দিয়ে দায় কমানোর চেষ্টা কোরো না।”
একটি বাক্যে দুই পুরোনো কৌশলী মানুষকে নীরব করার ক্ষমতা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোন শাখায় পড়ে, জানা নেই।
দল এখনো দল নয়
রাত দুইটা পঁয়ত্রিশে অনিরুদ্ধ সেন ও নওশাদ রহমান গুদামে পৌঁছালেন। অনিরুদ্ধের হাতে দুটি আলাদা নথি।
বঙ্গীয় প্রজা স্বরাজ
নাগরিক ইতিহাস, হারানো পরিচয়, সীমান্তবিচ্ছিন্ন পরিবার, শ্রম ও নারী উত্তরাধিকার নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম।
বঙ্গীয় প্রজা স্বরাজ দল
সম্ভাব্য রাজনৈতিক শাখার অসম্পূর্ণ খসড়া। আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন হয়নি। হাসান ও স্নেহার নামে ঘর রাখা হলেও কোনো স্বাক্ষর নেই। স্মৃতি দত্তের ঘোষণা ঘটেছে, কিন্তু কোনো পদ আইনগতভাবে কার্যকর হয়নি।
অনিরুদ্ধবাবু বললেন, “সম্মেলনের অনুমোদিত নথিতে ‘দল’ শব্দটি ছিল না। প্ল্যাকার্ডে আর কয়েকটি প্রচারপত্রে পরে যোগ হয়েছে। কে করেছে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।”
সুবর্ণা বলল, “নাগরিক প্ল্যাটফর্মকে দল বানালে বিরোধিতা সহজ হয়। দলকে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বললে ক্ষমতা নেওয়া সহজ হয়।”
প্রথম আসনের পুরোনো উল্লেখ নওশাদের পারিবারিক খাতায় আছে। সেখানে এটি নির্বাচনী এলাকা নয়, নথির প্রধান হেফাজতের অবস্থান। পূর্ণ নিয়ম নেই। চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ছিল কি না, জানা যায় না।
“প্রথম আসন GHURI-7-এর বলে যে সংকেত এল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
নওশাদ বললেন, “সেটা কোন সময়ের নিয়ম ব্যবহার করছে, আমরা জানি না। আমাদের খাতায় শুধু হেফাজতের কথা আছে।”
এ কারণে প্রথম আসন সম্পর্কে নতুন কোনো নিয়ম বানানো হলো না। রহস্যকে উত্তর দেওয়ার ভান করে বিধান তৈরি করাও নথি পরিবর্তনের সমান।
স্নেহা ও সুবর্ণার সিদ্ধান্ত
রাত তিনটার কিছু আগে স্নেহা গুদামে পৌঁছাল। অর্ক স্থিতিশীল। অন্য চিকিৎসক দায়িত্ব নিয়েছেন। স্নেহা নিজের সিদ্ধান্তে এসেছে। কেউ তাকে ডেকে আনেনি।
গুদামে ঢুকে প্রথমে আমার ডান হাত পরীক্ষা করল। তর্জনী সামান্য নড়ছে, মধ্যমায় ঝিনঝিনি এবং অন্য আঙুলে সাড়া কম। ক্ষতের চারপাশের উত্তাপ আগের চেয়ে বেশি।
“দুর্ঘটনার পরে তুমি যা করেছ বলে মনে করছ, তার সব শারীরিকভাবে সম্ভব ছিল না,” সে বলল। “বেশির ভাগ নড়াচড়া বাঁ হাতে হয়েছিল। ডান হাত দিয়ে সব করার স্মৃতি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। পূর্ণ তদন্ত ছাড়া ঘটনাপুনর্গঠন করা যাবে না।”
আমার বর্ণনাও প্রমাণ নয়। এই নীতিটি অন্য মানুষের ক্ষেত্রে খুব পছন্দ করতাম। নিজের ক্ষেত্রে নয়।
স্নেহা ও সুবর্ণা কিছু সময় পাশের বন্ধ কক্ষে কথা বলল। আমি তাদের কথা শুনিনি। দরজার বাইরে দাঁড়াইওনি। এই ছোট কাজটি কেউ লক্ষ্য করেনি। সম্ভবত উন্নতির সবচেয়ে সঠিক রূপ সেটিই, যার জন্য হাততালি পাওয়া যায় না।
বের হয়ে তারা দুটি সিদ্ধান্ত জানাল:
১. বিতর্কিত পূর্ণ পাঠ এখন প্রকাশ করা যাবে না।
২. পাঠটির একাধিক পরিবর্তিত সংস্করণ থাকার কথা জনসাধারণকে জানাতে হবে।
বিস্তারিত প্রকাশনা-নীতি পরে লেখা হবে। জরুরি রাতের মধ্যে তারা আরেকটি পূর্ণ প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলল না।
“তোমরা একমত?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সুবর্ণা বলল, “এই বিষয়ে।”
স্নেহা যোগ করল, “একই পক্ষ হইনি।”
“এই ঘরে আমি কোন পক্ষ?”
স্নেহা বলল, “যে পক্ষ নিজের লেখা চিনতে পারছে না।”
সুবর্ণা বলল, “এবং তবু শিরোনামের মালিকানা চাইছে।”
“অসুস্থ মানুষের বিরুদ্ধে যৌথ আক্রমণ খুব ভদ্র নয়।”
স্নেহা আমার স্লিং ঠিক করতে করতে বলল, “তুমি অসুস্থ। নির্দোষ নও।”
রাত তিনটা সাত মিনিটে অমিত ঢাকা ও কলকাতার দুই প্রকাশনাপথের পরীক্ষামূলক নিয়ন্ত্রণ পেল। পূর্ণ প্রকাশ বন্ধ করার মতো নিয়ন্ত্রণ নয়। নির্ধারিত প্রকাশের আগে যাচাইকরণ বার্তা বসানোর মতো।
তৃতীয় কেন্দ্র তখনো অন্ধকার।
মৈত্রেয়ী যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তির প্রথম বাক্য লিখলেন। সুবর্ণা দ্বিতীয় বাক্য বদলাল। স্নেহা জীবিত মানুষ ও ব্যক্তিগত নথির সুরক্ষার শর্ত যোগ করল। আমি শিরোনাম লিখতে চেয়েছিলাম। তারা আমাকে লিখতে দিল না।
“কেন?”
সুবর্ণা বলল, “যে ব্যক্তি নিজের লেখার মালিকানা প্রমাণ করতে পারেনি, সে আপাতত প্রকাশনা-বিজ্ঞপ্তিরও একক লেখক হবে না।”
অন্যায় নয়। তবু অপমানজনক। ন্যায়বিচারের এই দিকটির বিজ্ঞাপন কম হয়।
রাত তিনটা উনিশে নদিয়ার ছবির অবস্থান দ্বিতীয় উৎসে আংশিকভাবে মিলল। ভবন, দুটি শিরীষগাছ ও পাথরের সিঁড়ির অবস্থান পুরোনো মানচিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু ছবির চারজন একই সময়ে সেখানে ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।
অমিত বলল, “আমি পশ্চিমবঙ্গেই আছি। তোমরা নদিয়ার দিকে গেলে আমি অন্য পথ নেব। আমার অবস্থান স্নেহা ও অনিরুদ্ধকে আলাদাভাবে পাঠাচ্ছি।”
“আমাকে নয়?”
“তুই এখন সন্দেহভাজন উৎস, আহত মানুষ এবং সম্ভাব্য লক্ষ্য, তিনটাই। সব তথ্য তোর কাছে রাখা নিরাপত্তা নয়।”
আগে হলে প্রতিবাদ করতাম। এবার স্নেহার দিকে তাকালাম।
সে বলল, “অমিতের পথ আমি রাখব। আমার পথ অনিরুদ্ধ রাখবেন। কেউ সম্পূর্ণ চলাচল জানবে না।”
“আমার পথ?”
“তুমি আমার গাড়িতে থাকবে।”
“তা হলে অন্তত নিজের পথ জানব?”
“জানালা দিয়ে দেখলে।”
রাত তিনটা বিয়াল্লিশে আমরা তিনটি আলাদা পথে একই জায়গার দিকে রওনা দিলাম। সমস্যা ছিল, নদিয়ার কেন্দ্রটি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল কি না, তা তখনো জানতাম না।
কিন্তু সকাল আটটা অপেক্ষা করছিল না।
নদিয়ার পথে
মুক্তারঙের সাত আসনের পুরোনো মাইক্রোবাসটি গুদামের সীমানা পেরিয়ে মূল রাস্তায় ওঠার সময় রাত তিনটা বিয়াল্লিশ। প্রদীপ পাল চালকের আসনে। সামনে কোনো দৃশ্যমান অনুসরণকারী গাড়ি নেই। পেছনের কাচে নদীর অন্ধকার ও গুদামের শেষ আলো কয়েক সেকেন্ড ভেসে থেকে মিলিয়ে গেল।
স্নেহা আমার বাঁ পাশে। সুবর্ণা মাঝের সারির অন্য প্রান্তে। আমাদের মধ্যে একটি খালি আসন।
দুটি সম্পর্কের দূরত্ব মাপতে ফুট বা ইঞ্চি লাগে না। একটি খালি আসন যথেষ্ট।
স্নেহার কোলে কালো প্রমাণের ব্যাগ। ব্যাগের ভেতরে পাণ্ডুলিপির কোনো মূল পৃষ্ঠা নেই। সেখানে আছে গুদাম থেকে সংগৃহীত প্রাথমিক তালিকা, পৃথক সংরক্ষণমাধ্যম, অর্কের আঘাতের সময়সংক্রান্ত নোট এবং আমার চিকিৎসার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। মূল কাগজ ও ডিজিটাল অনুলিপি একই জায়গায় রাখা হয়নি।
সুবর্ণার হাতে পাতলা বাদামি ফোল্ডার। পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩-এর তিনটি পাঠের ভিন্ন বাক্য ও অনুপস্থিত পৃষ্ঠার তালিকা। মৈত্রেয়ীর কাছে অন্য অনুলিপি। অনিরুদ্ধের গাড়িতে রাজনৈতিক নথির অংশ। একটি গাড়ি থামালেই কেউ পূর্ণ গল্প পাবে না।
অনেক বছর আগে আমি এমন ব্যবস্থা পছন্দ করতাম। কারণ এতে সংগঠন বাঁচে। এখন বুঝি, একই ব্যবস্থায় দায়ও টুকরো হয়ে যায়। সবাই সামান্য জানে। তাই কেউ পুরো অপরাধের মালিক নয়।
প্রদীপবাবু আয়নায় তাকিয়ে বললেন, “রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। তবে বড় রাস্তাটা না ধরে একটু ঘুরে যাব। অনিরুদ্ধবাবু তাই বলেছেন।”
“কতটা ঘুরে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“আপনি যদি ঘুমিয়ে পড়েন, সময়টা কম মনে হবে।”
স্নেহা বলল, “চেষ্টা করতে পারো।”
“জন্মনাম, গোপন কেন্দ্র আর সকাল আটটার প্রকাশনা রেখে ঘুমানো অভদ্রতা।”
“অচেতন হলে অন্তত কম কথা বলবে।”
সুবর্ণা জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল, “নিশ্চিত নই।”
দুজনের মধ্যে আবার মতের মিল হলো। আমি চোখ বন্ধ করলাম।
ঘুম এল না। চোখের অন্ধকারে প্রথমে কাদা দেখা গেল। তারপর গাড়ির ভাঙা কাচ। স্নেহার কণ্ঠ। একটি আলো। কারও হাত। রিভলভারের ওজন বাঁ হাতে, অথচ স্মৃতিতে ডান হাতের আঙুল শক্ত হয়ে আছে।
চোখ খুললাম।
স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল না। তবু বলল, “আবার দেখলে?”
“কী?”
“যেটা দেখলে শ্বাস বদলে যায়।”
“দুর্ঘটনার কিছু অংশ।”
“মনে পড়েছে, না নতুন করে তৈরি হয়েছে?”
“পার্থক্য বুঝতে পারছি না।”
স্নেহা নোটবুক খুলল না। শুধু বলল, “তা হলে এখন নথিতে লিখব না।”
সবকিছু লিখে রাখা আর সবকিছুকে প্রমাণ হিসেবে রাখা এক নয়। এই পার্থক্যটি স্নেহা আগে থেকেই জানত। আমি শিখছি। ধীরগতিতে। কারণ আমার শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সমস্যা ছাত্র।
যে বাধা ছিল কি না
রাত চারটা দশ মিনিটে সরু রাস্তার সামনে একটি ছোট ট্রাক আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। পেছনের দুটি চাকা কাদার মধ্যে। চালকের কেবিনের দরজা খোলা। একজন মানুষ হাত তুলে সাহায্য চাইছে। আরেকজন রাস্তার ডান পাশে দাঁড়িয়ে ফোন দেখছে।
প্রদীপবাবু গতি কমালেন।
সুবর্ণা সামনে ঝুঁকে বলল, “থামবেন না।”
প্রদীপবাবু আয়নায় তাকালেন। “কেন?”
“ডান পাশে দাঁড়ানো মানুষটির জুতায় কাদা নেই।”
স্নেহা জানালার কাচ নামাল না। কাচের ভেতর থেকেই দেখল। “ট্রাকের পেছনের চাকা কাদায়। মানুষটি যদি ধাক্কা দিয়ে সাহায্য করত, জুতা পরিষ্কার থাকার কথা নয়।”
মানুষটি আমাদের গাড়ির দিকে তাকাল। ফোনটি কানের কাছে তুলল না। পর্দার দিকে তাকিয়েই কিছু বলল।
রাস্তার বাঁ পাশে একটি সরু ইটবিছানো পথ ছিল। প্রদীপবাবু গাড়ি সেখানে নামালেন। মাইক্রোবাসটি কেঁপে উঠল। ডান বাহুতে হঠাৎ চাপ পড়তেই বুকের ভেতর পর্যন্ত ব্যথা উঠল। আমি দাঁত চেপে বাঁ হাত দিয়ে স্লিং ধরে রাখলাম।
স্নেহা সঙ্গে সঙ্গে আমার কাঁধ স্থির করল। “শরীর ঘোরাবে না।”
“গাড়ি ঘুরছে।”
“গাড়ির সঙ্গে তোমাকেও স্বাধীনভাবে ঘুরতে হবে না।”
পেছনের আয়নায় ট্রাকের মানুষগুলোকে দেখা গেল। কেউ গাড়িতে উঠল না। কেউ আমাদের অনুসরণও করল না। শুধু ফোনধারী মানুষটি রাস্তার অন্য দিকে হেঁটে গেল।
পাঁচ মিনিট পরে অনিরুদ্ধ দৃশ্যসংযোগে জানালেন, তাঁর গাড়ি একই জায়গায় কোনো ট্রাক পায়নি।
“তা হলে ওটা আমাদের জন্য ছিল,” সুবর্ণা বলল।
স্নেহা বলল, “অথবা ট্রাকটি উঠে গেছে।”
“পাঁচ মিনিটে?”
“সম্ভব। আমরা থামিনি। কীভাবে উঠল, দেখিনি।”
একটি বাধা অদৃশ্য হলে তার অর্থ দুটি হতে পারে। ভুল সন্দেহ। অথবা সঠিক সন্দেহ। প্রমাণ ছাড়া কোনোটিই বেছে নেওয়া হলো না। তবু প্রদীপবাবু পরের মোড়ে আবার পথ বদলালেন।
মানুষ প্রমাণের অপেক্ষায় থাকতে পারে। গাড়িকে সব সময় অপেক্ষা করতে হয় না।
শরীরের আপত্তি
রাত চারটা আটাশ মিনিটে প্রথমে কানের ভেতর চাপ অনুভব করলাম। তারপর রাস্তার আলো দুটি হয়ে গেল। সামনে বসা প্রদীপবাবুর মাথা একবার ডান দিকে, একবার বাঁ দিকে সরে যাচ্ছে বলে মনে হলো।
স্নেহা আমার কপালে হাত রাখল। “গাড়ি থামান।”
“থামতে হবে না,” বললাম।
প্রদীপবাবু ইতিমধ্যে রাস্তার পাশে আলো আছে এমন একটি বন্ধ দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়েছেন। চিকিৎসকের নির্দেশ ও রোগীর মতামতের মধ্যে পেশাদার চালকের ভোট সাধারণত চিকিৎসকের দিকে যায়।
স্নেহা গাড়ির ভেতরের আলো জ্বালাল। আমার চোখ দেখল। নাড়ি গুনল। স্লিংয়ের গিঁট খুলে বাহুর অবস্থান সামান্য বদলাল। বাঁধন সরানোর সময় অল্প চাপ পড়তেই আঙুলের ডগা পর্যন্ত বিদ্যুতের মতো ব্যথা ছড়িয়ে গেল।
“মধ্যমা নড়াও।”
নড়ল না।
“তর্জনী?”
সামান্য।
“অনুভূতি?”
“মধ্যমায় ঝিনঝিনি। ছোট আঙুল প্রায় অসাড়।”
স্নেহার মুখে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। সে ক্ষতের ওপর নতুন চাপ দিল না। বাঁধন পরীক্ষা করে আবার স্থির করল।
“রক্তক্ষরণ নেই। তবে স্নায়ুতে চাপ বা ক্ষতি থাকতে পারে। নদিয়ায় পৌঁছে তুমি অপ্রয়োজনে হাঁটবে না। সিঁড়ি থাকলে একা উঠবে না। মাথা আবার ঘুরলে সঙ্গে সঙ্গে বলবে।”
“আদেশগুলো লিখিত দিলে আপিল করতে সুবিধা হয়।”
“তোমার আপিল শুনবে কে?”
সুবর্ণা বলল, “আমি শুনতে পারি। রায় স্নেহার পক্ষেই যাবে।”
“বিচারব্যবস্থা পুরো দখল হয়ে গেছে।”
স্নেহা পানি ও নির্ধারিত ওষুধ দিল। আমি প্রশ্ন না করে খেলাম।
“এত বাধ্য কখন হলে?” সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল।
“শরীর যখন বিরোধী দলে যোগ দিল।”
সাত মিনিট পরে গাড়ি আবার চলল। এবার আমাকে জানালার পাশে না রেখে মাঝের দিকে বসানো হলো। স্নেহা বাঁ দিকে। সুবর্ণা ডান দিকে। খালি আসনটি আর আমাদের মাঝখানে নেই।
এতে সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। শুধু আমি দুই দিক থেকে পড়ে যাওয়ার সুযোগ হারালাম।
সতেরো বছরের ভুল
ওষুধের প্রভাবে চোখ ভারী হচ্ছিল। রাস্তার নিয়মিত দুলুনির মধ্যে একটি পুরোনো কক্ষ ফিরে এল।
টেবিলের ওপর একই নকশার দুটি ভবনের আঁকা ছবি। একটির পাশে পূর্ববঙ্গ। অন্যটির পাশে নদিয়া। দেয়ালে ঝুলছে বাংলা অঞ্চলের পুরোনো নদীপথ। লাল কালি দিয়ে কয়েকটি পথ কাটা। নীল কালি দিয়ে নতুন রেখা।
সুবর্ণা বলছে, “একই প্রতিষ্ঠান দুই জায়গায় থাকলে কোনো পক্ষ পূর্ণ নথির মালিক হতে পারবে না।”
অমিত টেবিলের ওপর ঝুঁকে বলছে, “দুই কপি থাকলে দুটি মিথ্যাও তৈরি হতে পারে।”
আমি তৃতীয় যাচাইয়ের কথা বলছি। এমন কাউকে, যে দুই কেন্দ্রের তথ্য মিলিয়ে দেখবে, কিন্তু কোনো কেন্দ্রের আদেশ মানবে না।
দৃশ্যের সমস্যাটি কথায় নয়। মুখে।
আমাদের বয়স অমিতের বলা সতেরো বছর আগের ঘটনার সঙ্গে মেলে না। আমি শিশু নই। সুবর্ণাও নয়। কক্ষটি বিশ্ববিদ্যালয়-পরবর্তী সময়ের মতো। অথবা স্মৃতিটি অন্য সময়ের মুখ নিয়ে এসেছে।
চোখ খুলে বললাম, “সতেরো বছর ঠিক নয়।”
সুবর্ণা সঙ্গে সঙ্গে ফিরল। “কী?”
“H Library-এর যে ঘটনায় অমিত আমাদের একসঙ্গে ঢুকতে দেখেছে, সেই সময়ের হিসাব। আমাদের মুখের বয়স সতেরো বছরের সঙ্গে মেলে না। অথবা আমি যে কক্ষ দেখছি, সেটি ওই ঘটনার নয়।”
স্নেহা নোটবুক খুলল। “কী নিশ্চিত?”
“আমি দুটি কেন্দ্রের নকশা নিয়ে আলোচনার একটি দৃশ্য মনে করতে পারছি। সেখানে আমি, সুবর্ণা ও অমিত আছি। সময় জানি না।”
“কী অনুমান?”
“অমিতের সতেরো বছরের হিসাব ভুল। অথবা সে যে ঘটনার কথা বলেছে, এটি সেই ঘটনা নয়।”
সুবর্ণা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছু পুরোনো নথিতে ঘটনার তারিখ ছিল না। ছিল নথি হস্তান্তরের তারিখ। আমরা দুটোকে এক ধরে নিয়ে থাকতে পারি।”
“তুমি আগে বলোনি কেন?”
“কারণ আমিও এখন দৃশ্যটা মনে করতে পারছি। অথবা তোমার বর্ণনা শুনে তৈরি করছি। এই মুহূর্তে কোনটা, জানি না।”
স্মৃতি ছোঁয়াচে হতে পারে। একজনের বলা দৃশ্য অন্যজনের মনের ভেতর ছবি তৈরি করে। এরপর সেই ছবির উৎস আলাদা করা কঠিন।
স্নেহা লিখল:
প্রত্যক্ষ স্মৃতি: হাসান দুটি H কেন্দ্রের নকশা নিয়ে আলোচনার একটি দৃশ্য বর্ণনা করেছে।
সমর্থন: সুবর্ণা আংশিক পরিচিতি অনুভব করেছে, কিন্তু উৎস নিশ্চিত নয়।
অমীমাংসিত: অমিতের সতেরো বছরের হিসাব ঘটনার সময়, না নথি হস্তান্তরের সময়।
সতেরো বছরের সময়গত অসংগতি মিটল না। তবে প্রথমবার সেটি ফাঁক থেকে আনুষ্ঠানিক প্রশ্নে পরিণত হলো।
“তৃতীয় যাচাই কী ছিল?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
সুবর্ণা বলল, “সব সময় ভবন নয়। কখনো স্বাধীন সাক্ষী। যে দুই কেন্দ্রের নথি মিলিয়ে দেখবে, কিন্তু কোনো পক্ষের নির্দেশ মানবে না।”
“SNEHA কি সেই সাক্ষীর পরিচয়?”
“জানি না। যে নথিতে শব্দটি দেখেছিলাম, সেখানে পূর্ণরূপ ছিল না। আমি তখনও বর্তমান স্নেহার নাম ধরে নিইনি।”
“কেন নাওনি?”
“নথিটির সময় নিশ্চিত ছিল না। আর বড় হাতের ইংরেজি অক্ষরে লেখা একটি শব্দ দেখলেই পরিচিত মানুষের নাম ভাবা নিরাপদ নয়।”
এটি অগ্রগতি। উত্তর নয়। পুরোনো অনুমানের সীমা জানা কখনো নতুন তথ্য পাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একই নকশার অন্য ভবন
ভোর পাঁচটা আঠারো মিনিটে নদিয়ার পুরোনো H কেন্দ্রের কাছে পৌঁছালাম।
প্রথমে দেখা গেল দুটি শিরীষগাছ। তারপর দীর্ঘ বারান্দা, উঁচু স্তম্ভ, পাথরের সিঁড়ি এবং ডান পাশে গোল জানালা। ভবনের গায়ে কোনো নামফলক নেই। পুরোনো প্লাস্টারের নিচে কয়েক জায়গায় ইট বেরিয়ে আছে। ছাদের কিনারা ধরে শ্যাওলা।
যশোরের কেন্দ্রের স্মৃতির সঙ্গে মূল নকশায় মিল আছে। হুবহু নয়। নদিয়ার বারান্দা বেশি লম্বা। গোল জানালার নিচের পাথর ভিন্ন। আমার স্মৃতিতে যশোরের সিঁড়ির পাশে সরু জলনালা ছিল। এখানে নেই। নদিয়ার বাঁ পাশের স্তম্ভও পরে মেরামত করা হয়েছে বলে মনে হয়।
একই স্থপতি, অনুলিপি করা নকশা, পরবর্তী সংস্কার অথবা স্মৃতি দুটি ভবনকে মিশিয়েছে। চারটি সম্ভাবনাই খোলা।
প্রধান দরজা সামান্য খোলা। ভেতরে ক্ষীণ আলো। কোনো মানুষের শব্দ নেই।
আমি নামতে গেলে স্নেহা আগে নেমে দাঁড়াল। হাত বাড়াল না। শুধু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “ধীরে।”
“আমি সিঁড়ি দেখতে পাচ্ছি।”
“তোমার শরীরও কি পাচ্ছে?”
প্রথম ধাপে পা রাখতেই বুঝলাম, প্রশ্নটি অপমানের জন্য নয়। হাঁটুতে শক্তি কম। মাথা ভারী। ডান হাতের ওজন শরীরের ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। স্নেহা আমার কনুই ধরল না। পিঠের কাছে হাত রেখে শুধু পড়ে যাওয়ার পথ বন্ধ রাখল।
যত্নের সবচেয়ে কঠিন রূপ সম্ভবত সেটিই, যেখানে মানুষকে দাঁড়াতে সাহায্য করা হয়, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার কৃতিত্ব কেড়ে নেওয়া হয় না।
আমরা ভেতরে ঢুকলাম না। অনিরুদ্ধ ও নওশাদের গাড়ি তখনো আসেনি। প্রদীপবাবু গাড়ির পাশে থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমাদের সংকেত না পেলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
স্নেহা সিঁড়ি, দরজার হাতল ও মাটির ছবি নিল। সুবর্ণা জানালার কাচে প্রতিফলন পরীক্ষা করল। আমি শব্দ শুনলাম।
ভেতরে একটি ঘড়ি চলছে।
টিক।
টিক।
টিক।
তারপর থেমে গেল।
ভোর পাঁচটা ছাব্বিশে অনিরুদ্ধ ও নওশাদ পৌঁছালেন। তাঁদের গাড়িতে দৃশ্যমান অনুসরণকারী ছিল না। অনিরুদ্ধ প্রথমেই প্রদীপবাবুর সঙ্গে পরবর্তী যোগাযোগের সময় মিলিয়ে নিলেন। তারপর পাঁচজন একসঙ্গে প্রধান দরজা পেরোলাম।
ভবনের ভেতরের পথ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো। প্রথমে প্রকাশ্য পাঠককক্ষ। কাঠের লম্বা টেবিল, ধুলোমাখা তাক এবং দেয়ালে বন্ধ কাচের ফ্রেম। তার পেছনে সরু নিবন্ধনপথ। আরও ভেতরে ধাতব সুরক্ষাদরজা। ডান পাশের সিঁড়ি নিচের নথিকক্ষে নেমেছে। বাঁ পাশের বন্ধ করিডরটি পেছনের সেবা-প্রবেশপথে গেছে। গোল কক্ষটি সুরক্ষাদরজারও ভেতরে।
প্রকাশ্য পাঠককক্ষের দেয়ালে ঘড়ি। কাঁটা সাড়ে বারোটায়।
সুবর্ণা চেয়ার টেনে ঘড়ির নিচে দাঁড়াতে গেলে অনিরুদ্ধ বললেন, “একটু দাঁড়ান। আগে চারপাশের ছবি নিই।”
ছবি নেওয়ার পর ঘড়ির নিচের ঢাকনা না খুলেই পাশ থেকে দেখা গেল, পেছনের একটি সরু ধাতব পিন কাঁটার চলাচল আটকে রেখেছে।
স্নেহা বলল, “অর্থাৎ এই ঘড়ির থেমে থাকা মানুষের তৈরি হতে পারে।”
“দত্ত ভবনেরটাও?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“পরীক্ষা না করে না।”
মৈত্রেয়ী তখন আমাদের সঙ্গে নেই। তবু তাঁর ভাষা যেন স্নেহার মুখে এসে বসেছে। ভুল নয়। প্রমাণের ভাষার মালিকানা থাকা উচিতও নয়।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ: নদিয়ার কেন্দ্রের ঘড়ির কাঁটা ধাতব পিন দিয়ে সাড়ে বারোটায় আটকানো। পিনটি কে, কখন এবং কেন বসিয়েছে, অজানা। দত্ত ভবনের ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্ক যাচাই হয়নি।
ঠিক তখন ধাতব সুরক্ষাদরজার ওপার থেকে টোকা এল।
একবার।
বিরতি।
দুবার।
আমাদের ব্যক্তিগত দরজা-সংকেতের প্রথম অংশ। কিন্তু ব্যক্তিগত বাক্যটি নেই।
স্নেহা বলল, “কেউ টোকার অংশ জানে। পূর্ণ সংকেত নয়।”
আমি দরজার কাছে এগোলাম। দ্বিতীয় ধাপেই মাথা আবার ভারী হয়ে গেল। স্নেহা সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি এখানে থাকবে।”
“ভেতরে আমার নাম জানা একজন আছে।”
“তাই প্রথমে তুমি দরজায় যাবে না।”
সুবর্ণা বলল, “এই সিদ্ধান্তে আমি একমত।”
“এই ঐক্য কি স্থায়ী?”
“তুমি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত,” সুবর্ণা বলল।
“অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি।”
দরজা খোলা হলো না। ভেতর থেকে স্মৃতি দত্তের কণ্ঠ এল।
“অনিরুদ্ধের পরিচয়পত্র নিবন্ধনখোপে রাখো।”
স্নেহা ধাতব দরজার সামনে দাঁড়াল। “মা, এমন কিছু বলো, যা আজকের আগে শুধু আমরা জানতাম।”
ভেতর থেকে উত্তর এল, “পশ্চিমঘরের প্রথম রাতের পরে তুমি আমার ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাওনি।”
স্নেহা বলল, “বাকিটা?”
“কারণ তুমি বলেছিলে, আলো জ্বালালে জানালার কাচে দুজন দেখা যায়।”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ রইল। তথ্যটি সত্য কি না আমার জানা নেই। তাই তার মুখের পরিবর্তনেরও অর্থ বানালাম না।
অনিরুদ্ধ নিজের পরিচয়পত্র স্বচ্ছ খোপে রাখলেন। ভেতরে কাগজ সরানোর শব্দ হলো। তারপর যান্ত্রিক তালা খুলল।
দরজা স্নেহার নাম, আমার মুখ বা কোনো রহস্যময় সংকেতে খোলেনি। ভেতরের কেউ খুলেছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষটি নিরাপদ, সভানেত্রী নন
স্মৃতি দত্ত ধাতব দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে। সাদা শাড়ি। ডান অনামিকায় নীল পাথরের আংটি। তাঁর পেছনে গোপাল নস্কর। একটু দূরে ছেঁড়া জুতার বর্তমান দায়িত্বধারী।
ছবিতে থাকা চতুর্থ অজ্ঞাত মানুষ দৃশ্যমান নয়।
স্নেহা প্রথমে মায়ের মুখ নয়, হাত দেখল। কবজিতে বাঁধনের দাগ নেই। পোশাক অক্ষত। হাঁটার ভঙ্গিতেও বাধ্য করে নিয়ে আসার স্পষ্ট চিহ্ন নেই। তারপর সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “তুমি স্বেচ্ছায় এসেছ?”
“হ্যাঁ।”
“বের হতে পারবে?”
স্মৃতি দত্ত উত্তর দিতে দেরি করলেন। “মানুষ হিসেবে আমার পথ বন্ধ নয়। সভানেত্রী হিসেবে আমার প্রবেশাধিকার স্থগিত বলে আমাকে জানানো হয়েছে।”
“কে জানিয়েছে?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।
“ভেতরের নথিসংযোগে একটি বার্তা এসেছে। আনুষ্ঠানিক কাগজ দেখিনি।”
অনিরুদ্ধ বললেন, “তা হলে আপাতত এটিকে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। এটি একটি অজ্ঞাত বার্তার দাবি।”
মানুষটি নিরাপদ। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেই।
“পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩ ছাপার অনুমতি দিয়েছিলে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“১০১টি পাণ্ডুলিপির ডিজিটাল সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ যাচাইভিত্তিক প্রকাশে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছিলাম। নম্বর ৩-এর বর্তমান কোনো পাঠে নয়।”
“ছাপা পৃষ্ঠা হাতে দাঁড়িয়েছিলে কেন?”
“কে আমার প্রতিক্রিয়া দেখছে, জানতে।”
“আমাদের না জানিয়ে আরেকটি পরীক্ষা?”
“হ্যাঁ।”
“তা হলে সমস্যা শুধু হাসানের নয়।”
স্মৃতি দত্ত বললেন, “কখনো বলিনি শুধু ওর।”
“নিজের অসুখ চিনলেই চিকিৎসা শুরু হয় না।”
স্মৃতি দত্ত উত্তর দিলেন না। নীল আংটি পরা হাতটি অন্য হাত দিয়ে ঢেকে রাখলেন।
আমি দেয়ালের পাশের কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলাম। দাঁড়িয়ে থাকলে কথোপকথনের গুরুত্ব বাড়ত না। শুধু আমার পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ত।
“আপনি কাকে খুঁজছিলেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
স্মৃতি দত্ত আমার দিকে তাকালেন। “যে মানুষটি পরীক্ষামূলক পৃষ্ঠা আমাকে দিয়েছিল, তাকে।”
“সে কি ছবির চতুর্থ ব্যক্তি?”
“আমি নিশ্চিত নই। ছবিটি দেখার আগে লোকটি চলে যায়।”
“মুখ?”
“আংশিক ঢাকা ছিল। কণ্ঠ পরিবর্তিত হতে পারে। আমার সামনে নিজের নাম বলেনি।”
“আমার পুরোনো নাম জানে?”
“সে যে নাম বলেছে, তুমি সেটি ব্যবহার করতে কি না, আমি জানি না।”
স্মৃতি দত্ত এবার নামটি উচ্চারণ করলেন না। ভালো। আরেকজনের মুখে নতুন নাম শুনে সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার রাত এটি নয়।
“আপনি সব জানেন না,” বললাম।
“তোমার হতাশ হওয়া উচিত?”
“কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।”
স্মৃতি দত্তের পরিকল্পনা ও অজ্ঞাত পক্ষের পরিকল্পনা এক জায়গায় মিলেছে। অন্য জায়গায় সংঘর্ষে গেছে। তিনি খেলাটি শুরু করে থাকতে পারেন। কিন্তু সব চাল তাঁর নয়।
নদী ও স্থলপথের বহনকারী
গোপাল নস্কর একটি মোটা কাপড়ের মলাটযুক্ত নিবন্ধনখাতা খুললেন। পাতাগুলোর কিনারায় পুরোনো জলদাগ। ভেতরে নদীপথ, ঘাট, রেলসংযোগ ও পাটের গুদামের হিসাব। কয়েকটি গন্তব্য দুই নামে লেখা। একটি পূর্ববঙ্গের, অন্যটি পশ্চিমবঙ্গের।
“আমার পরিবার প্রয়োজনমতো নদীপথে নথি বহন করত,” তিনি বললেন। “ছেঁড়া জুতার বহনকারীরা স্থলপথে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের সব মানুষকে চিনত না।”
মৈত্রেয়ী আমাদের সঙ্গে নেই। তাঁর অনুপস্থিতিতে অনিরুদ্ধ নথির ছবি নিলেন। গোপালবাবুর অনুমতি নিয়েই।
নওশাদ একটি নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় আঙুল রাখলেন। সেখানে একই চালানের জন্য দুই তারিখ। প্রথমটি বাংলা অঞ্চলের পূর্ব পাশের ঘাটে। দ্বিতীয়টি নদিয়ার একটি গুদামে। মাঝখানে এগারো দিনের ব্যবধান। বহন করা বস্তুর ঘরে লেখা শুধু “কাগজ”। পরিমাণের জায়গায় সংখ্যা নেই।
“এটি মানুষ বহনের প্রমাণ নয়,” নওশাদ বললেন। “শুধু একই চালান দুই পাশে নথিভুক্ত হয়েছিল।”
গোপালবাবু বললেন, “নথির ভাষায় সবকিছু কাগজ হতে পারে। আবার সত্যিই কাগজও হতে পারে।”
“আপনাকে গুদাম থেকে অপহরণ করা হয়নি?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।
“আমাকে এখানে আসতে বলা হয়েছিল। আমি রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু গুলি চালিয়ে আলো আর নজরদারি নষ্ট করার কথা জানতাম না।”
“কে গুলি চালিয়েছে?”
“জানি না। আমাকে নিয়ে আসা মানুষ একা ছিল। অন্ধকার হওয়ার পরে আরেকটি পদশব্দ শুনেছিলাম। তারপর কাচ ভাঙার শব্দ।”
“আপনি পালানোর চেষ্টা করেননি?”
“কোথা থেকে পালাব? আমি তো নিজের ইচ্ছাতেই বেরিয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, আমার যাত্রার আড়ালে অন্য কাজ হয়েছে।”
একজন মানুষকে অপহরণ না করেও তার উপস্থিতি ব্যবহার করা যায়। সম্মতি একটি কাজের জন্য নেওয়া হয়। সেই সম্মতির ছায়ায় অন্য কাজ সম্পন্ন হয়।
স্নেহা বলল, “আপনার পরিবার মানুষও বহন করত?”
গোপালবাবু খাতার একটি বন্ধ পৃষ্ঠার ওপর হাত রাখলেন। “আমার সময়ে না। পুরোনো নথিতে দাবি আছে। কতটা সত্য জানি না।”
তিনি নিজের জ্ঞানের সীমা বললেন। ফলে তাঁর গুরুত্ব কমল না। বরং বিশ্বাসযোগ্য হলো।
দরজার পাশে দাঁড়ানো ছেঁড়া জুতার মানুষটিকে স্নেহা বলল, “আপনার নাম নয়। কাজ বলুন।”
লোকটি উত্তর দিল, “GHURI-7 পরিচয়ের সম্ভাব্য দাবিদারকে সংশ্লিষ্ট নথির সামনে উপস্থিত করা।”
“নির্দেশের উৎস?”
“পুরোটা জানি না।”
“আপনি কি প্রথম আসনের নিয়ম জানেন?”
“না। পুরোনো নির্দেশে শুধু পৌঁছে দেওয়ার কথা।”
সুবর্ণা তার জুতার দিকে তাকাল। বাঁ জুতার সামনের দিক কাটা। কাটাটি পুরোনো নয়, কিন্তু ইচ্ছাকৃত।
“চিহ্নটি অন্য গোষ্ঠীও ব্যবহার করছে,” সে বলল।
লোকটি নিজের জুতার দিকে তাকাল। “যে চিহ্ন সবাই চেনে, সেটি আর নিরাপদ পরিচয় নয়। আমার দাবি বিশ্বাস করবেন না। আমি যা করি, তা পরীক্ষা করুন।”
“ছবির চতুর্থ মানুষ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“আমাদের সঙ্গে ভেতরে আসেনি।”
“ছবিতে ছিল।”
“ছবিটি একই মুহূর্তের কি না, আমি জানি না।”
এর বেশি সে বলল না। রহস্যময় মানুষ তথ্যকেন্দ্রে পরিণত হলো না।
যে কক্ষকে প্রথম আসনের বলা হয়
গোল কক্ষে যাওয়ার পথে নিচু তিনটি ধাপ। প্রথম ধাপেই পায়ের নিচে ভারসাম্য হারালাম। স্নেহা পিঠের কাছে হাত রেখে থামাল।
“আমি বলেছিলাম, সিঁড়িতে একা নয়।”
“তুমি পাশে ছিলে।”
“আর তুমি সেটা পরীক্ষা করলে?”
“বৈজ্ঞানিক কৌতূহল।”
“পরেরবার কৌতূহল বসে থাকবে।”
গোল কক্ষে সাধারণ কাঠের একটি চেয়ার। কোনো সিংহাসন নয়। দেয়ালের পাশে খালি আলমারি। মেঝেতে ভারী নথির বাক্স সরিয়ে নেওয়ার চারটি আয়তাকার দাগ। বাক্স নেই। ধুলোর রেখা দেখে মনে হয়, একই সময়ে সব সরানো হয়নি। তবে সময় নির্ধারণের মতো পরীক্ষা তখন করা সম্ভব নয়।
চেয়ারের পেছনে আংশিক খোদাই:
প্রথম আসন মালিকের নয়...
শেষ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। নওশাদের খাতা হেফাজতের কথা বলে, কিন্তু কক্ষের খোদাই পূর্ণ প্রমাণ দেয় না। ঘরটিকে প্রথম আসনের কক্ষ বলা হয়, সেটিও বর্তমান মানুষের ভাষা। স্থাপত্য নিজে কোনো নাম বলেনি।
চেয়ারের সামনে দাঁড়ালাম না। পাশের বেঞ্চে বসে দেখলাম। আমার বসে থাকা অবস্থান নিয়ে কারও রাজনৈতিক আপত্তি না থাকলেও শারীরিক অনুমোদন ছিল।
সুবর্ণা চেয়ারটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার ওখানে বসতে ইচ্ছা করছে।”
“হ্যাঁ।”
স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “সব জানতে, না সব নিয়ন্ত্রণ করতে?”
“দুটোই।”
ঘরের ভেতর কেউ নড়ল না। সত্য সঠিকভাবে বললে মানুষ ভালো হয়ে যায় না। শুধু পরিষ্কার হয়।
“কিন্তু আমি বসব না,” বললাম। “কী সক্রিয় হবে জানি না। আমার সম্মতি ছাড়া কোনো পরীক্ষা হবে না। আর যাদের নথি এর সঙ্গে যুক্ত, তাদের মত ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নয়।”
সুবর্ণা বলল, “একটি চেয়ারেও কমিটি বসিয়ে দিলে।”
“ক্ষমতা ভাগ করার প্রথম চেষ্টা। সুন্দর হবে আশা কোরো না।”
স্মৃতি দত্ত বললেন, “আমি ভেবেছিলাম তুমি বসবে।”
“আপনি চেয়েছিলেন?”
“চেয়েছিলাম তুমি নিজের আকর্ষণটা বুঝতে পারো।”
“আবার আমার জন্য পথ ঠিক করেছিলেন।”
“হ্যাঁ।”
স্নেহা মায়ের দিকে তাকাল। “এবার তোমাকেও অভ্যাস বদলাতে হবে।”
স্মৃতি দত্ত নীল আংটি পরা হাতটি চেয়ারের পিঠ থেকে সরিয়ে নিলেন। উত্তর দিলেন না।
আমার মাথা আবার ভারী হচ্ছিল। স্নেহা পানির বোতল দিল। আমি নিলাম। চেয়ারটি খালি রইল। খালি জিনিসেরও উপস্থিতি আছে। বিশেষ করে সবাই যখন অপেক্ষা করে, কে গিয়ে সেটি পূর্ণ করবে।
অমিতের ফিরে আসা
ভোর ছয়টা দুই মিনিটে অমিতের নির্ধারিত সংযোগ বন্ধ হয়ে গেল। স্নেহার ফোনে শুধু একটি অসম্পূর্ণ অবস্থানসংকেত পৌঁছাল। অনিরুদ্ধের কাছে পাঠানো পথের তথ্যের সঙ্গে শেষ অবস্থানের দূরত্ব প্রায় বারো কিলোমিটার।
“সে থেমেছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
অনিরুদ্ধ বললেন, “না কি সংযোগ কেটেছে, সেটা বলা যাচ্ছে না।”
সুবর্ণা দরজার দিকে তাকাল। “অমিত নিজের সংযোগ নিজেও কাটতে পারে।”
“কেন?”
“অনুসরণ হচ্ছে মনে করলে।”
ছয়টা সাত মিনিটে অমিতের যন্ত্র থেকে একটি অসম্পূর্ণ পৃষ্ঠা এল। ছবির নিচের অর্ধেক নেই। ওপরের অংশে পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩-এর পুরোনো শিরোনাম ও একটি সময়চিহ্ন। সালটির প্রথম দুই অঙ্ক ক্ষতিগ্রস্ত। শেষ দুই অঙ্ক অমিতের সতেরো বছরের হিসাবের সঙ্গে মেলে না।
ছয়টা বারো মিনিটে আরেকটি বার্তা এল:
পথ বদলেছি। পেছনের সেবা-প্রবেশপথে আসছি। দরজা খুলবে মানুষ। কোনো যন্ত্র নয়।
ভোর ছয়টা উনিশ মিনিটে পেছনের সেবা-প্রবেশপথে পরিচিত তিনটি সুর শোনা গেল। অমিতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্চের সেই অসম্পূর্ণ সুর।
সুরটি কোনো যান্ত্রিক তালা খোলেনি। সুবর্ণাকে বাইরে থাকা মানুষের পরিচয় যাচাই করতে সাহায্য করেছে।
সুবর্ণা দরজার কাছে গিয়ে বলল, “পরের অংশ?”
বাইরে তারে একটি দীর্ঘ অসম্পূর্ণ স্বর উঠল। তারপর অমিতের কণ্ঠ:
“শেষ অংশটা তোমরা কোনো দিন আমাকে বাজাতে দাওনি।”
অনিরুদ্ধ ভেতর থেকে দরজার তালা খুললেন। দরজা মানুষ খুলল। যন্ত্র নয়।
অমিতের পোশাকে রাস্তার ধুলো। বাঁ হাতের জামার অংশ সামান্য ছেঁড়া। কোনো দৃশ্যমান রক্ত নেই। হাতে ছোট যন্ত্রের ব্যাগ। অন্য হাতে পুরোনো গিটার নয়, ছোট তারযন্ত্র বহনের সরু কালো খাপ।
“তোমাকে অনুসরণ করা হয়েছিল?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“একই সাদা গাড়ি তিনটি মোড়ে ছিল। নম্বর প্রতিবার আলাদা। একই গাড়ি কি না নিশ্চিত নই। তাই মূল পথ ছেড়েছি।”
“ছেঁড়া জামা?”
“তারকাঁটা বেড়া। কোনো মানুষ নয়।”
স্নেহা তাকে দাঁড় করিয়ে বাহু পরীক্ষা করল। চামড়ায় ছোট আঁচড়। গভীর নয়। অমিত আপত্তি করল না। সম্ভবত আমার উপস্থিতিতে অন্য কারও বাধ্য চিকিৎসা দেখা তার ভালো লাগছিল।
সে প্রথমে স্নেহার দিকে তাকাল। “অর্ক?”
“স্থিতিশীল।”
তারপর আমার দিকে। “তোর হাত?”
“সবার আগ্রহ একই অঙ্গে।”
“কারণ মাথার চিকিৎসা আমাদের কারও সাধ্যে নেই।”
পুরোনো বন্ধুত্ব সব সময় আলিঙ্গনে ফিরে আসে না। যথাযথ একটি অপমানই যথেষ্ট।
অমিত যন্ত্রের ব্যাগ থেকে পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩-এর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের প্রতিলিপি বের করল। পূর্ণ অনুলিপি নয়। সময়চিহ্ন আংশিক নষ্ট। দৃশ্যমান সাল আমাদের বয়সের সঙ্গে মেলে না।
স্নেহা বলল, “তুমি এত দিন ঘটনাটিকে সতেরো বছর আগের বলেছ।”
অমিত মাথা নিচু করল। “সম্ভবত নথি হস্তান্তরের সময়কে ঘটনার সময় ধরে নিয়েছিলাম। নথি ছাড়া নিশ্চিত বলতে পারছি না। আমি যা দেখেছি, সেটুকু বদলায়নি।”
“কী দেখেছিলে?”
“হাসান আর সুবর্ণাকে একসঙ্গে ঢুকতে। হাসানকে একা বের হতে। তবে তারিখটি আমি পরে খাতা থেকে নিয়েছিলাম।”
প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও সময়ের দাবি আলাদা করা হলো। অমিতের দেখা ঘটনা সত্য হতে পারে। সতেরো বছরের হিসাব ভুলও হতে পারে। কোনো একটিকে ধরে অন্যটি বাতিল করা হলো না।
উদ্ধার করা অংশে লেখা:
রাজধানী সেই জায়গা নয়, যেখানে ক্ষমতা বসে। রাজধানী সেই জায়গা, যেখানে বিভক্ত মানুষের নথি একে অন্যকে অস্বীকার না করে পাশাপাশি রাখা যায়।
যে ব্যক্তি শেষ সিদ্ধান্তের অধিকার দাবি করবে, তার নিজের নথিও অন্যদের সামনে খোলা থাকবে।
ভাষাটি আমার ও সুবর্ণার পুরোনো বিতর্কের মিশ্রণ হতে পারে। প্রথম বাক্যের ছন্দ আমার পরিচিত। দ্বিতীয়টির আঘাত সুবর্ণার। কিন্তু পূর্ণ পৃষ্ঠা নেই। হাতের লেখা দেখা যাচ্ছে না। তাই এটিকেও মূল পাঠ বলা গেল না।
“এই অংশ কোথায় ছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“সংযোগবিচ্ছিন্ন তালিকাভাণ্ডারে। মূল পৃষ্ঠা নেই। শুধু একবার পাঠানো ছবির ভাঙা অনুলিপি।”
“কাকে পাঠানো হয়েছিল?”
“প্রাপকের ঘর নষ্ট। শেষ তিনটি অক্ষর ছিল। তার মধ্যে একটি H।”
আরেকটি H। কিন্তু অক্ষরটি History, Haven, Handover, Hasan অথবা অন্য কোনো পরিচয়, এখনই বেছে নেওয়া হলো না। একই অক্ষর বহু দরজায় থাকলে সব দরজা একই ঘরে যায় না।
সকাল সাতটার আগে শেষ নীরবতা
ছয়টা বত্রিশে নদিয়ার কেন্দ্রের পুরোনো সংযোগপর্দা জ্বলে উঠল। পর্দায় কোনো ছবি নেই। শুধু তিনটি প্রকাশনাপথের অবস্থা। ঢাকা সক্রিয়। কলকাতা সক্রিয়। তৃতীয় কেন্দ্র প্রস্তুত।
অমিত তার নিজের যন্ত্র সরাসরি সংযোগ দিল না। প্রথমে আলাদা একটি বিচ্ছিন্ন পরীক্ষাযন্ত্র ব্যবহার করল। পর্দা থেকে কোনো তথ্য আমাদের যন্ত্রে ঢুকছে কি না, তা দেখল। ঝুঁকি পুরো বোঝা যায়নি। তাই শুধু দৃশ্যধারণ করা হলো।
ছয়টা চল্লিশে মৈত্রেয়ী নিরাপদ সংযোগে যুক্ত হলেন। তাঁর কাছে তিনটি পাঠের তুলনামূলক তালিকা প্রস্তুত। তিনি জানালেন, ঢাকা ও কলকাতার প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ পূর্ণ লেখা স্থগিত করতে নীতিগতভাবে রাজি। তবে সকাল সাতটা পনেরোর মধ্যে যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তির চূড়ান্ত পাঠ চাই।
তৃতীয় কেন্দ্রের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ নেই।
স্নেহা কালো ব্যাগ থেকে আগের খসড়া বের করল। সুবর্ণা নিজের সংশোধন খুলল। অমিত প্রকাশনাপথের প্রযুক্তিগত সীমা জানাল। অনিরুদ্ধ রাজনৈতিক নাম ও পদ সম্পর্কে আপত্তিকর অংশ চিহ্নিত করলেন। নওশাদ সীমান্তবিচ্ছিন্ন পরিবারের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্ত যোগ করলেন।
আমি বললাম, “লেখকত্ব অস্বীকার করা যাবে না। প্রথম অংশ হয়তো আমার।”
সুবর্ণা বলল, “অস্বীকার নয়। অনির্ধারিত।”
স্নেহা লিখল, “পাঠগুলোর কয়েকটি অংশ হাসানের স্মৃতির সঙ্গে মেলে। এটি পূর্ণ লেখকত্বের প্রমাণ নয়।”
“আমার নাম থাকবে?”
“বিষয় হিসেবে,” সুবর্ণা বলল। “একক অনুমোদনকারী হিসেবে নয়।”
স্মৃতি দত্ত বললেন, “আমার সম্মতির সীমাও লিখবে।”
স্নেহা মায়ের দিকে তাকাল। “তোমার দাবি হিসেবে। যাচাইকৃত নথি হিসেবে নয়।”
স্মৃতি দত্ত কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন, “ঠিক আছে।”
এই দুই শব্দ তাঁর জন্য কতটা কঠিন, তা তিনি জানেন। আমিও। সম্ভবত স্নেহাই সবচেয়ে ভালো জানে।
সকাল ছয়টা ছাপ্পান্নে বিজ্ঞপ্তির মূল অংশ প্রস্তুত হলো।
“দুই বাংলার প্রথম গোপন রাজধানী” শিরোনামে অন্তত তিনটি অসম্পূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী পাঠ শনাক্ত হয়েছে।
বর্তমানে কোনো পাঠকে সম্ভাব্য মূল লেখকের পূর্ণ ও অনুমোদিত পাণ্ডুলিপি হিসেবে যাচাই করা যায়নি। পরবর্তী সম্পাদনার পরিচয় ও সীমাও অনির্ধারিত।
লেখকত্ব, সম্পাদনা, সম্মতি, নথির হেফাজত এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের নিরাপত্তা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ প্রকাশ স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হচ্ছে।
এই বিজ্ঞপ্তি কোনো পাঠকে সত্য, মিথ্যা বা চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করছে না। এটি শুধু বর্তমান প্রমাণের সীমা জানাচ্ছে।
সকাল সাতটা তিন মিনিটে মৈত্রেয়ী ভাষার শেষ অস্পষ্টতা চিহ্নিত করলেন। “লেখক” শব্দটি একবচনে থাকলে অজ্ঞাত সম্পাদকের ভূমিকা আড়াল হতে পারে। সেটি বদলে লেখা হলো “সম্ভাব্য মূল লেখক ও পরবর্তী সম্পাদকদের পরিচয়”।
সাতটা আট মিনিটে অমিত জানাল, ঢাকা ও কলকাতার পথে বিজ্ঞপ্তি বসানো যাবে। পূর্ণ প্রকাশ থামাতে তাদের আলাদা সম্মতি লাগবে। তৃতীয় কেন্দ্র তখনো নীরব।
সাতটা এগারো মিনিটে নদিয়ার পর্দায় এক মুহূর্তের জন্য বড় হাতের পাঁচটি অক্ষর দেখা গেল:
SNEHA
তারপর অক্ষরগুলো অদৃশ্য হলো। কোনো ব্যাখ্যা এল না।
স্নেহা নিজের নামের দিকে তাকানো মানুষের মতো পর্দার দিকে তাকাল না। একজন সাক্ষী যেমন অচেনা নথির দিকে তাকায়, তেমনভাবে। তারপর নোটবুকে লিখল:
সকাল ৭:১১। নদিয়ার সংযোগপর্দায় SNEHA প্রদর্শিত। উৎস, অর্থ, সময়স্তর ও বর্তমান স্নেহা দত্তের সঙ্গে সম্পর্ক অজানা।
“তুমি ঠিক আছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“এই মুহূর্তে উত্তরটি প্রাসঙ্গিক নয়।”
“আমার কাছে প্রাসঙ্গিক।”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “আমি তথ্যটি দেখেছি। এর মানে এখনো জানি না। এটুকুই বলতে পারি।”
আমি আর চাপ দিলাম না। যত্ন আর জিজ্ঞাসাবাদের মাঝখানে একটি সরু সীমানা আছে। অতীতে আমি সেটি বহুবার মুছে ফেলেছি।
দুই মিনিট পরে মৈত্রেয়ী জানালেন, বিজ্ঞপ্তির সব সংশোধন এক জায়গায় এসেছে। এবার আমাদের ঠিক করতে হবে, কোন বক্তব্যটি প্রমাণের সীমা জানাবে এবং কোন বক্তব্যটি অনিচ্ছায় আরেকটি সত্য তৈরি করবে।
নদিয়ার পথে
মুক্তারঙের সাত আসনের পুরোনো মাইক্রোবাসটি গুদামের সীমানা পেরিয়ে মূল রাস্তায় ওঠার সময় রাত তিনটা বিয়াল্লিশ। প্রদীপ পাল চালকের আসনে। সামনে কোনো দৃশ্যমান অনুসরণকারী গাড়ি নেই। পেছনের কাচে নদীর অন্ধকার ও গুদামের শেষ আলো কয়েক সেকেন্ড ভেসে থেকে মিলিয়ে গেল।
স্নেহা আমার বাঁ পাশে। সুবর্ণা মাঝের সারির অন্য প্রান্তে। আমাদের মধ্যে একটি খালি আসন।
দুটি সম্পর্কের দূরত্ব মাপতে ফুট বা ইঞ্চি লাগে না। একটি খালি আসন যথেষ্ট।
স্নেহার কোলে কালো প্রমাণের ব্যাগ। ব্যাগের ভেতরে পাণ্ডুলিপির কোনো মূল পৃষ্ঠা নেই। সেখানে আছে গুদাম থেকে সংগৃহীত প্রাথমিক তালিকা, পৃথক সংরক্ষণমাধ্যম, অর্কের আঘাতের সময়সংক্রান্ত নোট এবং আমার চিকিৎসার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। মূল কাগজ ও ডিজিটাল অনুলিপি একই জায়গায় রাখা হয়নি।
সুবর্ণার হাতে পাতলা বাদামি ফোল্ডার। পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩-এর তিনটি পাঠের ভিন্ন বাক্য ও অনুপস্থিত পৃষ্ঠার তালিকা। মৈত্রেয়ীর কাছে অন্য অনুলিপি। অনিরুদ্ধের গাড়িতে রাজনৈতিক নথির অংশ। একটি গাড়ি থামালেই কেউ পূর্ণ গল্প পাবে না।
অনেক বছর আগে আমি এমন ব্যবস্থা পছন্দ করতাম। কারণ এতে সংগঠন বাঁচে। এখন বুঝি, একই ব্যবস্থায় দায়ও টুকরো হয়ে যায়। সবাই সামান্য জানে। তাই কেউ পুরো অপরাধের মালিক নয়।
প্রদীপবাবু আয়নায় তাকিয়ে বললেন, “রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। তবে বড় রাস্তাটা না ধরে একটু ঘুরে যাব। অনিরুদ্ধবাবু তাই বলেছেন।”
“কতটা ঘুরে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“আপনি যদি ঘুমিয়ে পড়েন, সময়টা কম মনে হবে।”
স্নেহা বলল, “চেষ্টা করতে পারো।”
“জন্মনাম, গোপন কেন্দ্র আর সকাল আটটার প্রকাশনা রেখে ঘুমানো অভদ্রতা।”
“অচেতন হলে অন্তত কম কথা বলবে।”
সুবর্ণা জানালার বাইরে তাকিয়েই বলল, “নিশ্চিত নই।”
দুজনের মধ্যে আবার মতের মিল হলো। আমি চোখ বন্ধ করলাম।
ঘুম এল না। চোখের অন্ধকারে প্রথমে কাদা দেখা গেল। তারপর গাড়ির ভাঙা কাচ। স্নেহার কণ্ঠ। একটি আলো। কারও হাত। রিভলভারের ওজন বাঁ হাতে, অথচ স্মৃতিতে ডান হাতের আঙুল শক্ত হয়ে আছে।
চোখ খুললাম।
স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল না। তবু বলল, “আবার দেখলে?”
“কী?”
“যেটা দেখলে শ্বাস বদলে যায়।”
“দুর্ঘটনার কিছু অংশ।”
“মনে পড়েছে, না নতুন করে তৈরি হয়েছে?”
“পার্থক্য বুঝতে পারছি না।”
স্নেহা নোটবুক খুলল না। শুধু বলল, “তা হলে এখন নথিতে লিখব না।”
সবকিছু লিখে রাখা আর সবকিছুকে প্রমাণ হিসেবে রাখা এক নয়। এই পার্থক্যটি স্নেহা আগে থেকেই জানত। আমি শিখছি। ধীরগতিতে। কারণ আমার শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সমস্যা ছাত্র।
যে বাধা ছিল কি না
রাত চারটা দশ মিনিটে সরু রাস্তার সামনে একটি ছোট ট্রাক আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। পেছনের দুটি চাকা কাদার মধ্যে। চালকের কেবিনের দরজা খোলা। একজন মানুষ হাত তুলে সাহায্য চাইছে। আরেকজন রাস্তার ডান পাশে দাঁড়িয়ে ফোন দেখছে।
প্রদীপবাবু গতি কমালেন।
সুবর্ণা সামনে ঝুঁকে বলল, “থামবেন না।”
প্রদীপবাবু আয়নায় তাকালেন। “কেন?”
“ডান পাশে দাঁড়ানো মানুষটির জুতায় কাদা নেই।”
স্নেহা জানালার কাচ নামাল না। কাচের ভেতর থেকেই দেখল। “ট্রাকের পেছনের চাকা কাদায়। মানুষটি যদি ধাক্কা দিয়ে সাহায্য করত, জুতা পরিষ্কার থাকার কথা নয়।”
মানুষটি আমাদের গাড়ির দিকে তাকাল। ফোনটি কানের কাছে তুলল না। পর্দার দিকে তাকিয়েই কিছু বলল।
রাস্তার বাঁ পাশে একটি সরু ইটবিছানো পথ ছিল। প্রদীপবাবু গাড়ি সেখানে নামালেন। মাইক্রোবাসটি কেঁপে উঠল। ডান বাহুতে হঠাৎ চাপ পড়তেই বুকের ভেতর পর্যন্ত ব্যথা উঠল। আমি দাঁত চেপে বাঁ হাত দিয়ে স্লিং ধরে রাখলাম।
স্নেহা সঙ্গে সঙ্গে আমার কাঁধ স্থির করল। “শরীর ঘোরাবে না।”
“গাড়ি ঘুরছে।”
“গাড়ির সঙ্গে তোমাকেও স্বাধীনভাবে ঘুরতে হবে না।”
পেছনের আয়নায় ট্রাকের মানুষগুলোকে দেখা গেল। কেউ গাড়িতে উঠল না। কেউ আমাদের অনুসরণও করল না। শুধু ফোনধারী মানুষটি রাস্তার অন্য দিকে হেঁটে গেল।
পাঁচ মিনিট পরে অনিরুদ্ধ দৃশ্যসংযোগে জানালেন, তাঁর গাড়ি একই জায়গায় কোনো ট্রাক পায়নি।
“তা হলে ওটা আমাদের জন্য ছিল,” সুবর্ণা বলল।
স্নেহা বলল, “অথবা ট্রাকটি উঠে গেছে।”
“পাঁচ মিনিটে?”
“সম্ভব। আমরা থামিনি। কীভাবে উঠল, দেখিনি।”
একটি বাধা অদৃশ্য হলে তার অর্থ দুটি হতে পারে। ভুল সন্দেহ। অথবা সঠিক সন্দেহ। প্রমাণ ছাড়া কোনোটিই বেছে নেওয়া হলো না। তবু প্রদীপবাবু পরের মোড়ে আবার পথ বদলালেন।
মানুষ প্রমাণের অপেক্ষায় থাকতে পারে। গাড়িকে সব সময় অপেক্ষা করতে হয় না।
শরীরের আপত্তি
রাত চারটা আটাশ মিনিটে প্রথমে কানের ভেতর চাপ অনুভব করলাম। তারপর রাস্তার আলো দুটি হয়ে গেল। সামনে বসা প্রদীপবাবুর মাথা একবার ডান দিকে, একবার বাঁ দিকে সরে যাচ্ছে বলে মনে হলো।
স্নেহা আমার কপালে হাত রাখল। “গাড়ি থামান।”
“থামতে হবে না,” বললাম।
প্রদীপবাবু ইতিমধ্যে রাস্তার পাশে আলো আছে এমন একটি বন্ধ দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়েছেন। চিকিৎসকের নির্দেশ ও রোগীর মতামতের মধ্যে পেশাদার চালকের ভোট সাধারণত চিকিৎসকের দিকে যায়।
স্নেহা গাড়ির ভেতরের আলো জ্বালাল। আমার চোখ দেখল। নাড়ি গুনল। স্লিংয়ের গিঁট খুলে বাহুর অবস্থান সামান্য বদলাল। বাঁধন সরানোর সময় অল্প চাপ পড়তেই আঙুলের ডগা পর্যন্ত বিদ্যুতের মতো ব্যথা ছড়িয়ে গেল।
“মধ্যমা নড়াও।”
নড়ল না।
“তর্জনী?”
সামান্য।
“অনুভূতি?”
“মধ্যমায় ঝিনঝিনি। ছোট আঙুল প্রায় অসাড়।”
স্নেহার মুখে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। সে ক্ষতের ওপর নতুন চাপ দিল না। বাঁধন পরীক্ষা করে আবার স্থির করল।
“রক্তক্ষরণ নেই। তবে স্নায়ুতে চাপ বা ক্ষতি থাকতে পারে। নদিয়ায় পৌঁছে তুমি অপ্রয়োজনে হাঁটবে না। সিঁড়ি থাকলে একা উঠবে না। মাথা আবার ঘুরলে সঙ্গে সঙ্গে বলবে।”
“আদেশগুলো লিখিত দিলে আপিল করতে সুবিধা হয়।”
“তোমার আপিল শুনবে কে?”
সুবর্ণা বলল, “আমি শুনতে পারি। রায় স্নেহার পক্ষেই যাবে।”
“বিচারব্যবস্থা পুরো দখল হয়ে গেছে।”
স্নেহা পানি ও নির্ধারিত ওষুধ দিল। আমি প্রশ্ন না করে খেলাম।
“এত বাধ্য কখন হলে?” সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল।
“শরীর যখন বিরোধী দলে যোগ দিল।”
সাত মিনিট পরে গাড়ি আবার চলল। এবার আমাকে জানালার পাশে না রেখে মাঝের দিকে বসানো হলো। স্নেহা বাঁ দিকে। সুবর্ণা ডান দিকে। খালি আসনটি আর আমাদের মাঝখানে নেই।
এতে সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। শুধু আমি দুই দিক থেকে পড়ে যাওয়ার সুযোগ হারালাম।
সতেরো বছরের ভুল
ওষুধের প্রভাবে চোখ ভারী হচ্ছিল। রাস্তার নিয়মিত দুলুনির মধ্যে একটি পুরোনো কক্ষ ফিরে এল।
টেবিলের ওপর একই নকশার দুটি ভবনের আঁকা ছবি। একটির পাশে পূর্ববঙ্গ। অন্যটির পাশে নদিয়া। দেয়ালে ঝুলছে বাংলা অঞ্চলের পুরোনো নদীপথ। লাল কালি দিয়ে কয়েকটি পথ কাটা। নীল কালি দিয়ে নতুন রেখা।
সুবর্ণা বলছে, “একই প্রতিষ্ঠান দুই জায়গায় থাকলে কোনো পক্ষ পূর্ণ নথির মালিক হতে পারবে না।”
অমিত টেবিলের ওপর ঝুঁকে বলছে, “দুই কপি থাকলে দুটি মিথ্যাও তৈরি হতে পারে।”
আমি তৃতীয় যাচাইয়ের কথা বলছি। এমন কাউকে, যে দুই কেন্দ্রের তথ্য মিলিয়ে দেখবে, কিন্তু কোনো কেন্দ্রের আদেশ মানবে না।
দৃশ্যের সমস্যাটি কথায় নয়। মুখে।
আমাদের বয়স অমিতের বলা সতেরো বছর আগের ঘটনার সঙ্গে মেলে না। আমি শিশু নই। সুবর্ণাও নয়। কক্ষটি বিশ্ববিদ্যালয়-পরবর্তী সময়ের মতো। অথবা স্মৃতিটি অন্য সময়ের মুখ নিয়ে এসেছে।
চোখ খুলে বললাম, “সতেরো বছর ঠিক নয়।”
সুবর্ণা সঙ্গে সঙ্গে ফিরল। “কী?”
“H Library-এর যে ঘটনায় অমিত আমাদের একসঙ্গে ঢুকতে দেখেছে, সেই সময়ের হিসাব। আমাদের মুখের বয়স সতেরো বছরের সঙ্গে মেলে না। অথবা আমি যে কক্ষ দেখছি, সেটি ওই ঘটনার নয়।”
স্নেহা নোটবুক খুলল। “কী নিশ্চিত?”
“আমি দুটি কেন্দ্রের নকশা নিয়ে আলোচনার একটি দৃশ্য মনে করতে পারছি। সেখানে আমি, সুবর্ণা ও অমিত আছি। সময় জানি না।”
“কী অনুমান?”
“অমিতের সতেরো বছরের হিসাব ভুল। অথবা সে যে ঘটনার কথা বলেছে, এটি সেই ঘটনা নয়।”
সুবর্ণা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছু পুরোনো নথিতে ঘটনার তারিখ ছিল না। ছিল নথি হস্তান্তরের তারিখ। আমরা দুটোকে এক ধরে নিয়ে থাকতে পারি।”
“তুমি আগে বলোনি কেন?”
“কারণ আমিও এখন দৃশ্যটা মনে করতে পারছি। অথবা তোমার বর্ণনা শুনে তৈরি করছি। এই মুহূর্তে কোনটা, জানি না।”
স্মৃতি ছোঁয়াচে হতে পারে। একজনের বলা দৃশ্য অন্যজনের মনের ভেতর ছবি তৈরি করে। এরপর সেই ছবির উৎস আলাদা করা কঠিন।
স্নেহা লিখল:
প্রত্যক্ষ স্মৃতি: হাসান দুটি H কেন্দ্রের নকশা নিয়ে আলোচনার একটি দৃশ্য বর্ণনা করেছে।
সমর্থন: সুবর্ণা আংশিক পরিচিতি অনুভব করেছে, কিন্তু উৎস নিশ্চিত নয়।
অমীমাংসিত: অমিতের সতেরো বছরের হিসাব ঘটনার সময়, না নথি হস্তান্তরের সময়।
সতেরো বছরের সময়গত অসংগতি মিটল না। তবে প্রথমবার সেটি ফাঁক থেকে আনুষ্ঠানিক প্রশ্নে পরিণত হলো।
“তৃতীয় যাচাই কী ছিল?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
সুবর্ণা বলল, “সব সময় ভবন নয়। কখনো স্বাধীন সাক্ষী। যে দুই কেন্দ্রের নথি মিলিয়ে দেখবে, কিন্তু কোনো পক্ষের নির্দেশ মানবে না।”
“SNEHA কি সেই সাক্ষীর পরিচয়?”
“জানি না। যে নথিতে শব্দটি দেখেছিলাম, সেখানে পূর্ণরূপ ছিল না। আমি তখনও বর্তমান স্নেহার নাম ধরে নিইনি।”
“কেন নাওনি?”
“নথিটির সময় নিশ্চিত ছিল না। আর বড় হাতের ইংরেজি অক্ষরে লেখা একটি শব্দ দেখলেই পরিচিত মানুষের নাম ভাবা নিরাপদ নয়।”
এটি অগ্রগতি। উত্তর নয়। পুরোনো অনুমানের সীমা জানা কখনো নতুন তথ্য পাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একই নকশার অন্য ভবন
ভোর পাঁচটা আঠারো মিনিটে নদিয়ার পুরোনো H কেন্দ্রের কাছে পৌঁছালাম।
প্রথমে দেখা গেল দুটি শিরীষগাছ। তারপর দীর্ঘ বারান্দা, উঁচু স্তম্ভ, পাথরের সিঁড়ি এবং ডান পাশে গোল জানালা। ভবনের গায়ে কোনো নামফলক নেই। পুরোনো প্লাস্টারের নিচে কয়েক জায়গায় ইট বেরিয়ে আছে। ছাদের কিনারা ধরে শ্যাওলা।
যশোরের কেন্দ্রের স্মৃতির সঙ্গে মূল নকশায় মিল আছে। হুবহু নয়। নদিয়ার বারান্দা বেশি লম্বা। গোল জানালার নিচের পাথর ভিন্ন। আমার স্মৃতিতে যশোরের সিঁড়ির পাশে সরু জলনালা ছিল। এখানে নেই। নদিয়ার বাঁ পাশের স্তম্ভও পরে মেরামত করা হয়েছে বলে মনে হয়।
একই স্থপতি, অনুলিপি করা নকশা, পরবর্তী সংস্কার অথবা স্মৃতি দুটি ভবনকে মিশিয়েছে। চারটি সম্ভাবনাই খোলা।
প্রধান দরজা সামান্য খোলা। ভেতরে ক্ষীণ আলো। কোনো মানুষের শব্দ নেই।
আমি নামতে গেলে স্নেহা আগে নেমে দাঁড়াল। হাত বাড়াল না। শুধু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “ধীরে।”
“আমি সিঁড়ি দেখতে পাচ্ছি।”
“তোমার শরীরও কি পাচ্ছে?”
প্রথম ধাপে পা রাখতেই বুঝলাম, প্রশ্নটি অপমানের জন্য নয়। হাঁটুতে শক্তি কম। মাথা ভারী। ডান হাতের ওজন শরীরের ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। স্নেহা আমার কনুই ধরল না। পিঠের কাছে হাত রেখে শুধু পড়ে যাওয়ার পথ বন্ধ রাখল।
যত্নের সবচেয়ে কঠিন রূপ সম্ভবত সেটিই, যেখানে মানুষকে দাঁড়াতে সাহায্য করা হয়, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার কৃতিত্ব কেড়ে নেওয়া হয় না।
আমরা ভেতরে ঢুকলাম না। অনিরুদ্ধ ও নওশাদের গাড়ি তখনো আসেনি। প্রদীপবাবু গাড়ির পাশে থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমাদের সংকেত না পেলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
স্নেহা সিঁড়ি, দরজার হাতল ও মাটির ছবি নিল। সুবর্ণা জানালার কাচে প্রতিফলন পরীক্ষা করল। আমি শব্দ শুনলাম।
ভেতরে একটি ঘড়ি চলছে।
টিক।
টিক।
টিক।
তারপর থেমে গেল।
ভোর পাঁচটা ছাব্বিশে অনিরুদ্ধ ও নওশাদ পৌঁছালেন। তাঁদের গাড়িতে দৃশ্যমান অনুসরণকারী ছিল না। অনিরুদ্ধ প্রথমেই প্রদীপবাবুর সঙ্গে পরবর্তী যোগাযোগের সময় মিলিয়ে নিলেন। তারপর পাঁচজন একসঙ্গে প্রধান দরজা পেরোলাম।
ভবনের ভেতরের পথ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো। প্রথমে প্রকাশ্য পাঠককক্ষ। কাঠের লম্বা টেবিল, ধুলোমাখা তাক এবং দেয়ালে বন্ধ কাচের ফ্রেম। তার পেছনে সরু নিবন্ধনপথ। আরও ভেতরে ধাতব সুরক্ষাদরজা। ডান পাশের সিঁড়ি নিচের নথিকক্ষে নেমেছে। বাঁ পাশের বন্ধ করিডরটি পেছনের সেবা-প্রবেশপথে গেছে। গোল কক্ষটি সুরক্ষাদরজারও ভেতরে।
প্রকাশ্য পাঠককক্ষের দেয়ালে ঘড়ি। কাঁটা সাড়ে বারোটায়।
সুবর্ণা চেয়ার টেনে ঘড়ির নিচে দাঁড়াতে গেলে অনিরুদ্ধ বললেন, “একটু দাঁড়ান। আগে চারপাশের ছবি নিই।”
ছবি নেওয়ার পর ঘড়ির নিচের ঢাকনা না খুলেই পাশ থেকে দেখা গেল, পেছনের একটি সরু ধাতব পিন কাঁটার চলাচল আটকে রেখেছে।
স্নেহা বলল, “অর্থাৎ এই ঘড়ির থেমে থাকা মানুষের তৈরি হতে পারে।”
“দত্ত ভবনেরটাও?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“পরীক্ষা না করে না।”
মৈত্রেয়ী তখন আমাদের সঙ্গে নেই। তবু তাঁর ভাষা যেন স্নেহার মুখে এসে বসেছে। ভুল নয়। প্রমাণের ভাষার মালিকানা থাকা উচিতও নয়।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ: নদিয়ার কেন্দ্রের ঘড়ির কাঁটা ধাতব পিন দিয়ে সাড়ে বারোটায় আটকানো। পিনটি কে, কখন এবং কেন বসিয়েছে, অজানা। দত্ত ভবনের ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্ক যাচাই হয়নি।
ঠিক তখন ধাতব সুরক্ষাদরজার ওপার থেকে টোকা এল।
একবার।
বিরতি।
দুবার।
আমাদের ব্যক্তিগত দরজা-সংকেতের প্রথম অংশ। কিন্তু ব্যক্তিগত বাক্যটি নেই।
স্নেহা বলল, “কেউ টোকার অংশ জানে। পূর্ণ সংকেত নয়।”
আমি দরজার কাছে এগোলাম। দ্বিতীয় ধাপেই মাথা আবার ভারী হয়ে গেল। স্নেহা সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি এখানে থাকবে।”
“ভেতরে আমার নাম জানা একজন আছে।”
“তাই প্রথমে তুমি দরজায় যাবে না।”
সুবর্ণা বলল, “এই সিদ্ধান্তে আমি একমত।”
“এই ঐক্য কি স্থায়ী?”
“তুমি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত,” সুবর্ণা বলল।
“অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি।”
দরজা খোলা হলো না। ভেতর থেকে স্মৃতি দত্তের কণ্ঠ এল।
“অনিরুদ্ধের পরিচয়পত্র নিবন্ধনখোপে রাখো।”
স্নেহা ধাতব দরজার সামনে দাঁড়াল। “মা, এমন কিছু বলো, যা আজকের আগে শুধু আমরা জানতাম।”
ভেতর থেকে উত্তর এল, “পশ্চিমঘরের প্রথম রাতের পরে তুমি আমার ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাওনি।”
স্নেহা বলল, “বাকিটা?”
“কারণ তুমি বলেছিলে, আলো জ্বালালে জানালার কাচে দুজন দেখা যায়।”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ রইল। তথ্যটি সত্য কি না আমার জানা নেই। তাই তার মুখের পরিবর্তনেরও অর্থ বানালাম না।
অনিরুদ্ধ নিজের পরিচয়পত্র স্বচ্ছ খোপে রাখলেন। ভেতরে কাগজ সরানোর শব্দ হলো। তারপর যান্ত্রিক তালা খুলল।
দরজা স্নেহার নাম, আমার মুখ বা কোনো রহস্যময় সংকেতে খোলেনি। ভেতরের কেউ খুলেছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষটি নিরাপদ, সভানেত্রী নন
স্মৃতি দত্ত ধাতব দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে। সাদা শাড়ি। ডান অনামিকায় নীল পাথরের আংটি। তাঁর পেছনে গোপাল নস্কর। একটু দূরে ছেঁড়া জুতার বর্তমান দায়িত্বধারী।
ছবিতে থাকা চতুর্থ অজ্ঞাত মানুষ দৃশ্যমান নয়।
স্নেহা প্রথমে মায়ের মুখ নয়, হাত দেখল। কবজিতে বাঁধনের দাগ নেই। পোশাক অক্ষত। হাঁটার ভঙ্গিতেও বাধ্য করে নিয়ে আসার স্পষ্ট চিহ্ন নেই। তারপর সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “তুমি স্বেচ্ছায় এসেছ?”
“হ্যাঁ।”
“বের হতে পারবে?”
স্মৃতি দত্ত উত্তর দিতে দেরি করলেন। “মানুষ হিসেবে আমার পথ বন্ধ নয়। সভানেত্রী হিসেবে আমার প্রবেশাধিকার স্থগিত বলে আমাকে জানানো হয়েছে।”
“কে জানিয়েছে?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।
“ভেতরের নথিসংযোগে একটি বার্তা এসেছে। আনুষ্ঠানিক কাগজ দেখিনি।”
অনিরুদ্ধ বললেন, “তা হলে আপাতত এটিকে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। এটি একটি অজ্ঞাত বার্তার দাবি।”
মানুষটি নিরাপদ। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেই।
“পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩ ছাপার অনুমতি দিয়েছিলে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“১০১টি পাণ্ডুলিপির ডিজিটাল সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ যাচাইভিত্তিক প্রকাশে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছিলাম। নম্বর ৩-এর বর্তমান কোনো পাঠে নয়।”
“ছাপা পৃষ্ঠা হাতে দাঁড়িয়েছিলে কেন?”
“কে আমার প্রতিক্রিয়া দেখছে, জানতে।”
“আমাদের না জানিয়ে আরেকটি পরীক্ষা?”
“হ্যাঁ।”
“তা হলে সমস্যা শুধু হাসানের নয়।”
স্মৃতি দত্ত বললেন, “কখনো বলিনি শুধু ওর।”
“নিজের অসুখ চিনলেই চিকিৎসা শুরু হয় না।”
স্মৃতি দত্ত উত্তর দিলেন না। নীল আংটি পরা হাতটি অন্য হাত দিয়ে ঢেকে রাখলেন।
আমি দেয়ালের পাশের কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলাম। দাঁড়িয়ে থাকলে কথোপকথনের গুরুত্ব বাড়ত না। শুধু আমার পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ত।
“আপনি কাকে খুঁজছিলেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
স্মৃতি দত্ত আমার দিকে তাকালেন। “যে মানুষটি পরীক্ষামূলক পৃষ্ঠা আমাকে দিয়েছিল, তাকে।”
“সে কি ছবির চতুর্থ ব্যক্তি?”
“আমি নিশ্চিত নই। ছবিটি দেখার আগে লোকটি চলে যায়।”
“মুখ?”
“আংশিক ঢাকা ছিল। কণ্ঠ পরিবর্তিত হতে পারে। আমার সামনে নিজের নাম বলেনি।”
“আমার পুরোনো নাম জানে?”
“সে যে নাম বলেছে, তুমি সেটি ব্যবহার করতে কি না, আমি জানি না।”
স্মৃতি দত্ত এবার নামটি উচ্চারণ করলেন না। ভালো। আরেকজনের মুখে নতুন নাম শুনে সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার রাত এটি নয়।
“আপনি সব জানেন না,” বললাম।
“তোমার হতাশ হওয়া উচিত?”
“কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি।”
স্মৃতি দত্তের পরিকল্পনা ও অজ্ঞাত পক্ষের পরিকল্পনা এক জায়গায় মিলেছে। অন্য জায়গায় সংঘর্ষে গেছে। তিনি খেলাটি শুরু করে থাকতে পারেন। কিন্তু সব চাল তাঁর নয়।
নদী ও স্থলপথের বহনকারী
গোপাল নস্কর একটি মোটা কাপড়ের মলাটযুক্ত নিবন্ধনখাতা খুললেন। পাতাগুলোর কিনারায় পুরোনো জলদাগ। ভেতরে নদীপথ, ঘাট, রেলসংযোগ ও পাটের গুদামের হিসাব। কয়েকটি গন্তব্য দুই নামে লেখা। একটি পূর্ববঙ্গের, অন্যটি পশ্চিমবঙ্গের।
“আমার পরিবার প্রয়োজনমতো নদীপথে নথি বহন করত,” তিনি বললেন। “ছেঁড়া জুতার বহনকারীরা স্থলপথে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের সব মানুষকে চিনত না।”
মৈত্রেয়ী আমাদের সঙ্গে নেই। তাঁর অনুপস্থিতিতে অনিরুদ্ধ নথির ছবি নিলেন। গোপালবাবুর অনুমতি নিয়েই।
নওশাদ একটি নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় আঙুল রাখলেন। সেখানে একই চালানের জন্য দুই তারিখ। প্রথমটি বাংলা অঞ্চলের পূর্ব পাশের ঘাটে। দ্বিতীয়টি নদিয়ার একটি গুদামে। মাঝখানে এগারো দিনের ব্যবধান। বহন করা বস্তুর ঘরে লেখা শুধু “কাগজ”। পরিমাণের জায়গায় সংখ্যা নেই।
“এটি মানুষ বহনের প্রমাণ নয়,” নওশাদ বললেন। “শুধু একই চালান দুই পাশে নথিভুক্ত হয়েছিল।”
গোপালবাবু বললেন, “নথির ভাষায় সবকিছু কাগজ হতে পারে। আবার সত্যিই কাগজও হতে পারে।”
“আপনাকে গুদাম থেকে অপহরণ করা হয়নি?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।
“আমাকে এখানে আসতে বলা হয়েছিল। আমি রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু গুলি চালিয়ে আলো আর নজরদারি নষ্ট করার কথা জানতাম না।”
“কে গুলি চালিয়েছে?”
“জানি না। আমাকে নিয়ে আসা মানুষ একা ছিল। অন্ধকার হওয়ার পরে আরেকটি পদশব্দ শুনেছিলাম। তারপর কাচ ভাঙার শব্দ।”
“আপনি পালানোর চেষ্টা করেননি?”
“কোথা থেকে পালাব? আমি তো নিজের ইচ্ছাতেই বেরিয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, আমার যাত্রার আড়ালে অন্য কাজ হয়েছে।”
একজন মানুষকে অপহরণ না করেও তার উপস্থিতি ব্যবহার করা যায়। সম্মতি একটি কাজের জন্য নেওয়া হয়। সেই সম্মতির ছায়ায় অন্য কাজ সম্পন্ন হয়।
স্নেহা বলল, “আপনার পরিবার মানুষও বহন করত?”
গোপালবাবু খাতার একটি বন্ধ পৃষ্ঠার ওপর হাত রাখলেন। “আমার সময়ে না। পুরোনো নথিতে দাবি আছে। কতটা সত্য জানি না।”
তিনি নিজের জ্ঞানের সীমা বললেন। ফলে তাঁর গুরুত্ব কমল না। বরং বিশ্বাসযোগ্য হলো।
দরজার পাশে দাঁড়ানো ছেঁড়া জুতার মানুষটিকে স্নেহা বলল, “আপনার নাম নয়। কাজ বলুন।”
লোকটি উত্তর দিল, “GHURI-7 পরিচয়ের সম্ভাব্য দাবিদারকে সংশ্লিষ্ট নথির সামনে উপস্থিত করা।”
“নির্দেশের উৎস?”
“পুরোটা জানি না।”
“আপনি কি প্রথম আসনের নিয়ম জানেন?”
“না। পুরোনো নির্দেশে শুধু পৌঁছে দেওয়ার কথা।”
সুবর্ণা তার জুতার দিকে তাকাল। বাঁ জুতার সামনের দিক কাটা। কাটাটি পুরোনো নয়, কিন্তু ইচ্ছাকৃত।
“চিহ্নটি অন্য গোষ্ঠীও ব্যবহার করছে,” সে বলল।
লোকটি নিজের জুতার দিকে তাকাল। “যে চিহ্ন সবাই চেনে, সেটি আর নিরাপদ পরিচয় নয়। আমার দাবি বিশ্বাস করবেন না। আমি যা করি, তা পরীক্ষা করুন।”
“ছবির চতুর্থ মানুষ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“আমাদের সঙ্গে ভেতরে আসেনি।”
“ছবিতে ছিল।”
“ছবিটি একই মুহূর্তের কি না, আমি জানি না।”
এর বেশি সে বলল না। রহস্যময় মানুষ তথ্যকেন্দ্রে পরিণত হলো না।
যে কক্ষকে প্রথম আসনের বলা হয়
গোল কক্ষে যাওয়ার পথে নিচু তিনটি ধাপ। প্রথম ধাপেই পায়ের নিচে ভারসাম্য হারালাম। স্নেহা পিঠের কাছে হাত রেখে থামাল।
“আমি বলেছিলাম, সিঁড়িতে একা নয়।”
“তুমি পাশে ছিলে।”
“আর তুমি সেটা পরীক্ষা করলে?”
“বৈজ্ঞানিক কৌতূহল।”
“পরেরবার কৌতূহল বসে থাকবে।”
গোল কক্ষে সাধারণ কাঠের একটি চেয়ার। কোনো সিংহাসন নয়। দেয়ালের পাশে খালি আলমারি। মেঝেতে ভারী নথির বাক্স সরিয়ে নেওয়ার চারটি আয়তাকার দাগ। বাক্স নেই। ধুলোর রেখা দেখে মনে হয়, একই সময়ে সব সরানো হয়নি। তবে সময় নির্ধারণের মতো পরীক্ষা তখন করা সম্ভব নয়।
চেয়ারের পেছনে আংশিক খোদাই:
প্রথম আসন মালিকের নয়...
শেষ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। নওশাদের খাতা হেফাজতের কথা বলে, কিন্তু কক্ষের খোদাই পূর্ণ প্রমাণ দেয় না। ঘরটিকে প্রথম আসনের কক্ষ বলা হয়, সেটিও বর্তমান মানুষের ভাষা। স্থাপত্য নিজে কোনো নাম বলেনি।
চেয়ারের সামনে দাঁড়ালাম না। পাশের বেঞ্চে বসে দেখলাম। আমার বসে থাকা অবস্থান নিয়ে কারও রাজনৈতিক আপত্তি না থাকলেও শারীরিক অনুমোদন ছিল।
সুবর্ণা চেয়ারটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার ওখানে বসতে ইচ্ছা করছে।”
“হ্যাঁ।”
স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “সব জানতে, না সব নিয়ন্ত্রণ করতে?”
“দুটোই।”
ঘরের ভেতর কেউ নড়ল না। সত্য সঠিকভাবে বললে মানুষ ভালো হয়ে যায় না। শুধু পরিষ্কার হয়।
“কিন্তু আমি বসব না,” বললাম। “কী সক্রিয় হবে জানি না। আমার সম্মতি ছাড়া কোনো পরীক্ষা হবে না। আর যাদের নথি এর সঙ্গে যুক্ত, তাদের মত ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নয়।”
সুবর্ণা বলল, “একটি চেয়ারেও কমিটি বসিয়ে দিলে।”
“ক্ষমতা ভাগ করার প্রথম চেষ্টা। সুন্দর হবে আশা কোরো না।”
স্মৃতি দত্ত বললেন, “আমি ভেবেছিলাম তুমি বসবে।”
“আপনি চেয়েছিলেন?”
“চেয়েছিলাম তুমি নিজের আকর্ষণটা বুঝতে পারো।”
“আবার আমার জন্য পথ ঠিক করেছিলেন।”
“হ্যাঁ।”
স্নেহা মায়ের দিকে তাকাল। “এবার তোমাকেও অভ্যাস বদলাতে হবে।”
স্মৃতি দত্ত নীল আংটি পরা হাতটি চেয়ারের পিঠ থেকে সরিয়ে নিলেন। উত্তর দিলেন না।
আমার মাথা আবার ভারী হচ্ছিল। স্নেহা পানির বোতল দিল। আমি নিলাম। চেয়ারটি খালি রইল। খালি জিনিসেরও উপস্থিতি আছে। বিশেষ করে সবাই যখন অপেক্ষা করে, কে গিয়ে সেটি পূর্ণ করবে।
অমিতের ফিরে আসা
ভোর ছয়টা দুই মিনিটে অমিতের নির্ধারিত সংযোগ বন্ধ হয়ে গেল। স্নেহার ফোনে শুধু একটি অসম্পূর্ণ অবস্থানসংকেত পৌঁছাল। অনিরুদ্ধের কাছে পাঠানো পথের তথ্যের সঙ্গে শেষ অবস্থানের দূরত্ব প্রায় বারো কিলোমিটার।
“সে থেমেছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
অনিরুদ্ধ বললেন, “না কি সংযোগ কেটেছে, সেটা বলা যাচ্ছে না।”
সুবর্ণা দরজার দিকে তাকাল। “অমিত নিজের সংযোগ নিজেও কাটতে পারে।”
“কেন?”
“অনুসরণ হচ্ছে মনে করলে।”
ছয়টা সাত মিনিটে অমিতের যন্ত্র থেকে একটি অসম্পূর্ণ পৃষ্ঠা এল। ছবির নিচের অর্ধেক নেই। ওপরের অংশে পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩-এর পুরোনো শিরোনাম ও একটি সময়চিহ্ন। সালটির প্রথম দুই অঙ্ক ক্ষতিগ্রস্ত। শেষ দুই অঙ্ক অমিতের সতেরো বছরের হিসাবের সঙ্গে মেলে না।
ছয়টা বারো মিনিটে আরেকটি বার্তা এল:
পথ বদলেছি। পেছনের সেবা-প্রবেশপথে আসছি। দরজা খুলবে মানুষ। কোনো যন্ত্র নয়।
ভোর ছয়টা উনিশ মিনিটে পেছনের সেবা-প্রবেশপথে পরিচিত তিনটি সুর শোনা গেল। অমিতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্চের সেই অসম্পূর্ণ সুর।
সুরটি কোনো যান্ত্রিক তালা খোলেনি। সুবর্ণাকে বাইরে থাকা মানুষের পরিচয় যাচাই করতে সাহায্য করেছে।
সুবর্ণা দরজার কাছে গিয়ে বলল, “পরের অংশ?”
বাইরে তারে একটি দীর্ঘ অসম্পূর্ণ স্বর উঠল। তারপর অমিতের কণ্ঠ:
“শেষ অংশটা তোমরা কোনো দিন আমাকে বাজাতে দাওনি।”
অনিরুদ্ধ ভেতর থেকে দরজার তালা খুললেন। দরজা মানুষ খুলল। যন্ত্র নয়।
অমিতের পোশাকে রাস্তার ধুলো। বাঁ হাতের জামার অংশ সামান্য ছেঁড়া। কোনো দৃশ্যমান রক্ত নেই। হাতে ছোট যন্ত্রের ব্যাগ। অন্য হাতে পুরোনো গিটার নয়, ছোট তারযন্ত্র বহনের সরু কালো খাপ।
“তোমাকে অনুসরণ করা হয়েছিল?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
“একই সাদা গাড়ি তিনটি মোড়ে ছিল। নম্বর প্রতিবার আলাদা। একই গাড়ি কি না নিশ্চিত নই। তাই মূল পথ ছেড়েছি।”
“ছেঁড়া জামা?”
“তারকাঁটা বেড়া। কোনো মানুষ নয়।”
স্নেহা তাকে দাঁড় করিয়ে বাহু পরীক্ষা করল। চামড়ায় ছোট আঁচড়। গভীর নয়। অমিত আপত্তি করল না। সম্ভবত আমার উপস্থিতিতে অন্য কারও বাধ্য চিকিৎসা দেখা তার ভালো লাগছিল।
সে প্রথমে স্নেহার দিকে তাকাল। “অর্ক?”
“স্থিতিশীল।”
তারপর আমার দিকে। “তোর হাত?”
“সবার আগ্রহ একই অঙ্গে।”
“কারণ মাথার চিকিৎসা আমাদের কারও সাধ্যে নেই।”
পুরোনো বন্ধুত্ব সব সময় আলিঙ্গনে ফিরে আসে না। যথাযথ একটি অপমানই যথেষ্ট।
অমিত যন্ত্রের ব্যাগ থেকে পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩-এর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের প্রতিলিপি বের করল। পূর্ণ অনুলিপি নয়। সময়চিহ্ন আংশিক নষ্ট। দৃশ্যমান সাল আমাদের বয়সের সঙ্গে মেলে না।
স্নেহা বলল, “তুমি এত দিন ঘটনাটিকে সতেরো বছর আগের বলেছ।”
অমিত মাথা নিচু করল। “সম্ভবত নথি হস্তান্তরের সময়কে ঘটনার সময় ধরে নিয়েছিলাম। নথি ছাড়া নিশ্চিত বলতে পারছি না। আমি যা দেখেছি, সেটুকু বদলায়নি।”
“কী দেখেছিলে?”
“হাসান আর সুবর্ণাকে একসঙ্গে ঢুকতে। হাসানকে একা বের হতে। তবে তারিখটি আমি পরে খাতা থেকে নিয়েছিলাম।”
প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও সময়ের দাবি আলাদা করা হলো। অমিতের দেখা ঘটনা সত্য হতে পারে। সতেরো বছরের হিসাব ভুলও হতে পারে। কোনো একটিকে ধরে অন্যটি বাতিল করা হলো না।
উদ্ধার করা অংশে লেখা:
রাজধানী সেই জায়গা নয়, যেখানে ক্ষমতা বসে। রাজধানী সেই জায়গা, যেখানে বিভক্ত মানুষের নথি একে অন্যকে অস্বীকার না করে পাশাপাশি রাখা যায়।
যে ব্যক্তি শেষ সিদ্ধান্তের অধিকার দাবি করবে, তার নিজের নথিও অন্যদের সামনে খোলা থাকবে।
ভাষাটি আমার ও সুবর্ণার পুরোনো বিতর্কের মিশ্রণ হতে পারে। প্রথম বাক্যের ছন্দ আমার পরিচিত। দ্বিতীয়টির আঘাত সুবর্ণার। কিন্তু পূর্ণ পৃষ্ঠা নেই। হাতের লেখা দেখা যাচ্ছে না। তাই এটিকেও মূল পাঠ বলা গেল না।
“এই অংশ কোথায় ছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“সংযোগবিচ্ছিন্ন তালিকাভাণ্ডারে। মূল পৃষ্ঠা নেই। শুধু একবার পাঠানো ছবির ভাঙা অনুলিপি।”
“কাকে পাঠানো হয়েছিল?”
“প্রাপকের ঘর নষ্ট। শেষ তিনটি অক্ষর ছিল। তার মধ্যে একটি H।”
আরেকটি H। কিন্তু অক্ষরটি History, Haven, Handover, Hasan অথবা অন্য কোনো পরিচয়, এখনই বেছে নেওয়া হলো না। একই অক্ষর বহু দরজায় থাকলে সব দরজা একই ঘরে যায় না।
সকাল সাতটার আগে শেষ নীরবতা
ছয়টা বত্রিশে নদিয়ার কেন্দ্রের পুরোনো সংযোগপর্দা জ্বলে উঠল। পর্দায় কোনো ছবি নেই। শুধু তিনটি প্রকাশনাপথের অবস্থা। ঢাকা সক্রিয়। কলকাতা সক্রিয়। তৃতীয় কেন্দ্র প্রস্তুত।
অমিত তার নিজের যন্ত্র সরাসরি সংযোগ দিল না। প্রথমে আলাদা একটি বিচ্ছিন্ন পরীক্ষাযন্ত্র ব্যবহার করল। পর্দা থেকে কোনো তথ্য আমাদের যন্ত্রে ঢুকছে কি না, তা দেখল। ঝুঁকি পুরো বোঝা যায়নি। তাই শুধু দৃশ্যধারণ করা হলো।
ছয়টা চল্লিশে মৈত্রেয়ী নিরাপদ সংযোগে যুক্ত হলেন। তাঁর কাছে তিনটি পাঠের তুলনামূলক তালিকা প্রস্তুত। তিনি জানালেন, ঢাকা ও কলকাতার প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ পূর্ণ লেখা স্থগিত করতে নীতিগতভাবে রাজি। তবে সকাল সাতটা পনেরোর মধ্যে যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তির চূড়ান্ত পাঠ চাই।
তৃতীয় কেন্দ্রের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ নেই।
স্নেহা কালো ব্যাগ থেকে আগের খসড়া বের করল। সুবর্ণা নিজের সংশোধন খুলল। অমিত প্রকাশনাপথের প্রযুক্তিগত সীমা জানাল। অনিরুদ্ধ রাজনৈতিক নাম ও পদ সম্পর্কে আপত্তিকর অংশ চিহ্নিত করলেন। নওশাদ সীমান্তবিচ্ছিন্ন পরিবারের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্ত যোগ করলেন।
আমি বললাম, “লেখকত্ব অস্বীকার করা যাবে না। প্রথম অংশ হয়তো আমার।”
সুবর্ণা বলল, “অস্বীকার নয়। অনির্ধারিত।”
স্নেহা লিখল, “পাঠগুলোর কয়েকটি অংশ হাসানের স্মৃতির সঙ্গে মেলে। এটি পূর্ণ লেখকত্বের প্রমাণ নয়।”
“আমার নাম থাকবে?”
“বিষয় হিসেবে,” সুবর্ণা বলল। “একক অনুমোদনকারী হিসেবে নয়।”
স্মৃতি দত্ত বললেন, “আমার সম্মতির সীমাও লিখবে।”
স্নেহা মায়ের দিকে তাকাল। “তোমার দাবি হিসেবে। যাচাইকৃত নথি হিসেবে নয়।”
স্মৃতি দত্ত কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন, “ঠিক আছে।”
এই দুই শব্দ তাঁর জন্য কতটা কঠিন, তা তিনি জানেন। আমিও। সম্ভবত স্নেহাই সবচেয়ে ভালো জানে।
সকাল ছয়টা ছাপ্পান্নে বিজ্ঞপ্তির মূল অংশ প্রস্তুত হলো।
“দুই বাংলার প্রথম গোপন রাজধানী” শিরোনামে অন্তত তিনটি অসম্পূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী পাঠ শনাক্ত হয়েছে।
বর্তমানে কোনো পাঠকে সম্ভাব্য মূল লেখকের পূর্ণ ও অনুমোদিত পাণ্ডুলিপি হিসেবে যাচাই করা যায়নি। পরবর্তী সম্পাদনার পরিচয় ও সীমাও অনির্ধারিত।
লেখকত্ব, সম্পাদনা, সম্মতি, নথির হেফাজত এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের নিরাপত্তা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ প্রকাশ স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হচ্ছে।
এই বিজ্ঞপ্তি কোনো পাঠকে সত্য, মিথ্যা বা চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করছে না। এটি শুধু বর্তমান প্রমাণের সীমা জানাচ্ছে।
সকাল সাতটা তিন মিনিটে মৈত্রেয়ী ভাষার শেষ অস্পষ্টতা চিহ্নিত করলেন। “লেখক” শব্দটি একবচনে থাকলে অজ্ঞাত সম্পাদকের ভূমিকা আড়াল হতে পারে। সেটি বদলে লেখা হলো “সম্ভাব্য মূল লেখক ও পরবর্তী সম্পাদকদের পরিচয়”।
সাতটা আট মিনিটে অমিত জানাল, ঢাকা ও কলকাতার পথে বিজ্ঞপ্তি বসানো যাবে। পূর্ণ প্রকাশ থামাতে তাদের আলাদা সম্মতি লাগবে। তৃতীয় কেন্দ্র তখনো নীরব।
সাতটা এগারো মিনিটে নদিয়ার পর্দায় এক মুহূর্তের জন্য বড় হাতের পাঁচটি অক্ষর দেখা গেল:
SNEHA
তারপর অক্ষরগুলো অদৃশ্য হলো। কোনো ব্যাখ্যা এল না।
স্নেহা নিজের নামের দিকে তাকানো মানুষের মতো পর্দার দিকে তাকাল না। একজন সাক্ষী যেমন অচেনা নথির দিকে তাকায়, তেমনভাবে। তারপর নোটবুকে লিখল:
সকাল ৭:১১। নদিয়ার সংযোগপর্দায় SNEHA প্রদর্শিত। উৎস, অর্থ, সময়স্তর ও বর্তমান স্নেহা দত্তের সঙ্গে সম্পর্ক অজানা।
“তুমি ঠিক আছ?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“এই মুহূর্তে উত্তরটি প্রাসঙ্গিক নয়।”
“আমার কাছে প্রাসঙ্গিক।”
স্নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “আমি তথ্যটি দেখেছি। এর মানে এখনো জানি না। এটুকুই বলতে পারি।”
আমি আর চাপ দিলাম না। যত্ন আর জিজ্ঞাসাবাদের মাঝখানে একটি সরু সীমানা আছে। অতীতে আমি সেটি বহুবার মুছে ফেলেছি।
দুই মিনিট পরে মৈত্রেয়ী জানালেন, বিজ্ঞপ্তির সব সংশোধন এক জায়গায় এসেছে। এবার আমাদের ঠিক করতে হবে, কোন বক্তব্যটি প্রমাণের সীমা জানাবে এবং কোন বক্তব্যটি অনিচ্ছায় আরেকটি সত্য তৈরি করবে।
যে বিজ্ঞপ্তির একক লেখক নেই
সকাল সাতটা তেরো মিনিটে সবাই বিজ্ঞপ্তির শেষ পাঠটি আরেকবার পড়ল। কোনো একক স্বাক্ষর যোগ করা হলো না।
মৈত্রেয়ী দূরের নিরাপদ কেন্দ্র থেকে প্রতিটি বাক্যের পরিবর্তন নথিভুক্ত করেছেন। অনিরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক পদ সম্পর্কে দাবি সীমিত করেছেন। নওশাদ সীমান্তবিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করার শর্ত বসিয়েছেন। সুবর্ণা নিশ্চিত করেছে, পরিবর্তিত পাঠের অস্তিত্ব যেন প্রযুক্তিগত ত্রুটির আড়ালে চাপা না পড়ে। স্নেহা জীবিত মানুষ, চিকিৎসা-তথ্য ও অসম্মত ব্যক্তির পরিচয় সুরক্ষার বিষয়টি রেখেছে।
আমি কী করেছি?
তিনটি বাক্যের পাশে আপত্তি লিখেছি। দুটির ভাষা বদলানোর প্রস্তাব দিয়েছি। একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
সভ্যতার ইতিহাসে আমার অংশগ্রহণ এত ছোট আগে কখনো মনে হয়নি। সম্ভবত এই কারণেই প্রথমবার সেটিকে পুরোপুরি বাস্তব মনে হলো।
“দুই বাংলার প্রথম গোপন রাজধানী” শিরোনামে অন্তত তিনটি অসম্পূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী পাঠ শনাক্ত হয়েছে।
বর্তমানে কোনো পাঠকে সম্ভাব্য মূল লেখকের পূর্ণ ও অনুমোদিত পাণ্ডুলিপি হিসেবে যাচাই করা যায়নি। পরবর্তী সম্পাদনার পরিচয় ও সীমাও অনির্ধারিত।
লেখকত্ব, সম্পাদনা, সম্মতি, নথির হেফাজত এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের নিরাপত্তা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ প্রকাশ স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হচ্ছে।
এই বিজ্ঞপ্তি কোনো পাঠকে সত্য, মিথ্যা বা চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করছে না। এটি শুধু বর্তমান প্রমাণের সীমা জানাচ্ছে।
অমিত বিজ্ঞপ্তির প্রতিটি অনুলিপির জন্য আলাদা ডিজিটাল স্বাক্ষরচিহ্ন তৈরি করল। মৈত্রেয়ী পাঠ মিলিয়ে দেখলেন। সুবর্ণা সময় লিখল। স্নেহা নিজের নোটে প্রেরকদের নাম নয়, দায়িত্ব লিখল।
“এখন পাঠাও,” অনিরুদ্ধ বললেন।
অমিত সঙ্গে সঙ্গে বোতাম চাপল না। “ঢাকা ও কলকাতায় পাঠালে স্থানীয় সম্পাদকরা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা অনুরোধ পাঠাচ্ছি। আদেশ নয়।”
সুবর্ণা বলল, “ঠিক সেটাই পাঠাও।”
আমি বললাম, “তৃতীয় কেন্দ্র?”
“তাদের কাছে বিজ্ঞপ্তি পৌঁছাবে কি না জানি না,” অমিত বলল। “পথটি একমুখীও হতে পারে।”
“তা হলে আগে তাদের বন্ধ করা দরকার।”
স্নেহা তাকাল। “আবার সিদ্ধান্ত?”
“প্রস্তাব।”
“প্রস্তাবটি নথিভুক্ত হলো। আপাতত গৃহীত নয়।”
নিজের ভাষার ওপর কর্তৃত্ব হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মতো অনেক কিছু আছে। বিশেষ করে যখন অন্যেরা কেবল ভাষাটিকে তার সঠিক নামে ডাকছে।
সকাল সাতটা পনেরো মিনিটে বিজ্ঞপ্তি ঢাকা ও কলকাতায় পাঠানো হলো।
তৃতীয় কেন্দ্রের জন্য একই বিজ্ঞপ্তি আলাদা পথে পাঠানোর চেষ্টা করল অমিত। পর্দায় কোনো গ্রহণ-স্বীকার এল না। পাঁচটি অক্ষর শুধু একবার জ্বলে নিভল।
স্নেহা পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের নাম শুনে সাড়া দেওয়া মানুষের মতো নয়। একজন সাক্ষী যেমন অচেনা নথির দিকে তাকায়, তেমনভাবে।
“তুমি এই শব্দটি আর কোথায় দেখেছ?” সে সুবর্ণাকে জিজ্ঞেস করল।
সুবর্ণা বলল, “H Library-এর দ্বিতীয় কক্ষের কাছে পাওয়া একটি কাগজে। পুরো নথি নয়। অক্ষরগুলো বড় হাতের ছিল।”
“কাগজটি এখন কোথায়?”
অমিত বলল, “মূল কাগজ উদ্ধার হয়নি। আগের ছবির একটি অনুলিপি আছে।”
“আগের ছবি বলতে?”
“দ্বিতীয় কক্ষের দরজার নিচে পাওয়া কাগজের নথিভুক্ত ছবি। ছবিটি সম্পূর্ণ নয়। নিচের অংশ অন্ধকারে।”
“ছবিটি কে তুলেছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
অমিত বলল, “ফাইলের উৎসের নাম কাটা। আমি তখন শুধু অনুলিপি পেয়েছিলাম।”
একটি প্রমাণের ছবি আছে। ছবির মূল উৎস নেই। মূল কাগজ নেই। ছবিটি কে তুলেছে, জানা নেই। রহস্যের জন্য যথেষ্ট। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রায় কিছুই নয়।
স্নেহা বলল, “দুটি ছবি পাশাপাশি রাখো। তুলনা হবে। সিদ্ধান্ত নয়।”
যে প্রকাশনা থামানো গেল
সকাল সাতটা বাইশ মিনিটে ঢাকা থেকে প্রথম উত্তর এল। সম্পাদকীয় দল পূর্ণ পাঠ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে রাজি। তাঁদের শর্ত, যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তি একই সময়ে দৃশ্যমান থাকতে হবে।
সাতটা সাতাশে কলকাতার উত্তর এল। প্রাথমিক ছাপা বন্ধ করা হয়েছে। যেসব পরীক্ষামূলক পৃষ্ঠা বেরিয়েছে, সেগুলো আলাদা করে রাখা হবে। তবে ছাপাখানার একজন কর্মী পৃষ্ঠার ছবি বাইরে পাঠিয়েছে কি না, নিশ্চিত নয়।
সুবর্ণা বলল, “প্রকাশনা বন্ধ হওয়া মানে লেখা অদৃশ্য হয়নি। ছবিটি ইতিমধ্যে বাইরে থাকতে পারে।”
“তা হলে সব পাঠ প্রকাশ করে দিই,” আমি বললাম। “মানুষ নিজেরাই পার্থক্য দেখুক।”
স্নেহা বলল, “পাঠে যাদের পরিচয় আছে, তাদের অনুমতি ছাড়া?”
“নাম বাদ দিয়ে।”
মৈত্রেয়ী দৃশ্যসংযোগে বললেন, “শুধু নাম মুছলেই পরিচয় গোপন হয় না। স্থান, সম্পর্ক, সময় ও ঘটনার সংমিশ্রণ থেকেও মানুষকে চেনা যায়।”
সুবর্ণা বলল, “তিনটি বিকৃত পাঠ একসঙ্গে দিলে আমরা নিজেরাই সেগুলোর প্রচার বাড়াব।”
আমি বললাম, “তা হলে অজ্ঞাত পক্ষ সুবিধা পাবে।”
“সব প্রতিক্রিয়া প্রতিপক্ষকে ঠেকানোর জন্য হতে হবে না,” স্নেহা বলল। “কিছু সিদ্ধান্ত মানুষের ক্ষতি না করার জন্যও নেওয়া যায়।”
আমাদের পুরোনো রাজনীতির সমস্যা সম্ভবত এখানেই ছিল। প্রতিটি মানুষের আগে প্রতিপক্ষকে দেখা। প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে সংঘর্ষকে রাখা।
সকাল সাতটা ত্রিশে সিদ্ধান্ত হলো, পূর্ণ পাঠ নয়। শুধু যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তি, তিনটি পাঠের অস্তিত্ব এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণের ঘোষণা প্রকাশিত হবে। পাঠগুলোর ভাষা থেকে কোনো উত্তেজক অংশ উদ্ধৃত করা হবে না।
আমি আপত্তি লিখলাম। আপত্তির কারণও লিখলাম। পরে কেউ যেন না বলে, সবাই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম।
স্নেহা আমার লিখিত আপত্তির নিচে যোগ করল:
হাসান পূর্ণ পাঠ প্রকাশের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। তার আপত্তি সংরক্ষণ করা হলো। পূর্ণ পাঠ প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মত, অসম্মত ব্যক্তিদের গোপনীয়তা এবং সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে।
আমি তার দিকে তাকালাম। “আমার আপত্তি মুছে দাওনি?”
“তোমার সঙ্গে একমত নই। তাই বলে তোমার বক্তব্য মুছে ফেলব কেন?”
সুবর্ণা আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা সম্পর্ক ঠিক করছ, না সংবিধান লিখছ?”
স্নেহা বলল, “কোনোটাই না।”
আমি বললাম, “অন্তত সংবিধানটি ছোট হতো।”
সুবর্ণার ঠোঁট সামান্য নড়ল। সেটিকে হাসি বললাম না। প্রমাণের ভাষা শিখছি।
SNEHA: একই লেখা, না অনুকরণ
সকাল সাতটা আটত্রিশে অমিত দ্বিতীয় কক্ষের কাছে পাওয়া কাগজের পুরোনো ছবিটি খুলল। একই পর্দায় নদিয়ার নথিসংযোগে প্রদর্শিত SNEHA-এর স্থিরচিত্র রাখা হলো।
প্রথম দৃষ্টিতে অক্ষরগুলো এক। বড় হাতের ইংরেজি অক্ষর। সমান দূরত্ব। শেষ A সামান্য ডান দিকে হেলে আছে।
মৈত্রেয়ী বললেন, “বড় হাতের পাঁচটি অক্ষর দেখে একই লেখক বলা যায় না। তবু গঠনগত মিল আলাদা করে রাখা যায়।”
তিনি একে একে বৈশিষ্ট্যগুলো বললেন:
১. প্রথম S-এর নিচের বাঁক ওপরের অংশের চেয়ে চওড়া।
২. N-এর ডান দিকের রেখায় অল্প অতিরিক্ত চাপ আছে।
৩. E-এর মাঝের রেখা অন্য দুই রেখার তুলনায় ছোট।
৪. শেষ A-এর ওপরের মিলনবিন্দু সামান্য অসমান।
দুটি ছবিতেই চারটি বৈশিষ্ট্যের তিনটি মেলে। শেষ A পুরোপুরি মেলে না।
“একই হাত?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
মৈত্রেয়ী বললেন, “সম্ভাবনা আছে। একটি দেখে অন্যটি অনুকরণ করার সম্ভাবনাও আছে। ছবির কোণ ও মান ভিন্ন। মূল কাগজ ছাড়া সিদ্ধান্ত নয়।”
স্নেহা বলল, “কালি?”
“নদিয়ার মূল নথি পরীক্ষা করা যায়। দ্বিতীয় কক্ষের মূল কাগজ নেই। ফলে সময়ের সম্পর্ক নিশ্চিত করা যাবে না।”
সুবর্ণা বলল, “কেউ আগের লেখাটি অনুকরণ করে থাকলে সে দ্বিতীয় কক্ষের ছবিতে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল।”
অমিত বলল, “অথবা দুটি একই পুরোনো নকশা অনুসরণ করে লেখা। কোনো নির্দিষ্ট মানুষের হাত নয়।”
SNEHA প্রথমবার একটি পরীক্ষাযোগ্য সংযোগ পেল। উত্তর পেল না।
স্নেহা নোটে লিখল:
নদিয়ার প্রদর্শিত SNEHA এবং দ্বিতীয় কক্ষের কাছে নথিভুক্ত SNEHA-এর অক্ষরগঠনে প্রাথমিক মিল আছে। একই লেখক, অনুকরণ, পূর্বনির্ধারিত নকশা অথবা পরবর্তী সম্পাদনা, সব সম্ভাবনা খোলা। বর্তমান স্নেহা দত্তের সঙ্গে সম্পর্ক অপ্রমাণিত।
নিজের নামের সম্ভাব্য পুরোনো রূপ নিয়ে লেখা শেষ করেও তার হাত কাঁপল না। অথবা কাঁপলেও আমি দেখিনি। মানুষের অদৃশ্য অংশ নিয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার শিক্ষা এই রাতেই অনেকবার নিতে হচ্ছে।
সাতটা সাতচল্লিশ
সকাল সাতটা ছত্রিশে ঢাকা থেকে নিশ্চিত বার্তা এল। পূর্ণ পাণ্ডুলিপির নির্ধারিত প্রকাশ স্থগিত। যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সারিতে আছে।
সাতটা পঁয়তাল্লিশে কলকাতা থেকেও একই সংবাদ এল। পরীক্ষামূলক ছাপা আলাদা করে রাখা হয়েছে। কোনো পৃষ্ঠা বাইরে গেছে কি না, তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা চলছে।
দুটি প্রকাশনাপথ থামল। তৃতীয়টি নয়।
সাতটা সাতচল্লিশে নদিয়ার পর্দা কালো হলো। তারপর মাঝখানে একটি পাতার সাদা অবয়ব ফুটে উঠল। লেখা তখনো ঢাকা। ওপরে শুধু শিরোনামের প্রথম তিনটি শব্দ:
দুই বাংলার প্রথম...
“সাতচল্লিশ,” সুবর্ণা বলল।
“সময়টি কাকতালীয় হতে পারে,” স্নেহা বলল।
“অথবা আমাদের কাকতালীয় ভাবাতে বেছে নেওয়া।”
পাঁচ, এগারো ও সাতচল্লিশ। সুবর্ণার পুরোনো প্রান্তলিখনের তিনটি সংখ্যা। সাতচল্লিশ দিয়ে অনুসন্ধান শুরু না করার সতর্কতা। আমরা পাঁচ ও এগারোর অর্থ সম্পূর্ণ জানি না। তবু অজ্ঞাত পক্ষ সরাসরি সাতচল্লিশ সামনে আনছে।
আমি বললাম, “এটি আমাদের ভুল ক্রমে নিতে বাধ্য করছে।”
সুবর্ণা বলল, “অথবা জানে, আমরা ইতিমধ্যে পাঁচ ও এগারো পার হয়ে এসেছি।”
“কখন?”
“সেটাই তো প্রশ্ন।”
নতুন উত্তর তৈরি হলো না। একটি পুরোনো সতর্কতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
অমিত তৃতীয় পথের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না দিয়ে শুধু পর্দার ছবি নিচ্ছিল। “আটটার আগে এটি খুলবে না। অন্তত যে সময়চিহ্ন দেখাচ্ছে, তা-ই বলছে।”
“সময়ের ঘড়ি বদলানো যায়?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“যায়। কিন্তু ঢাকা ও কলকাতার সময়ের সঙ্গে এতক্ষণ মিলছে।”
নওশাদ নথির পুরোনো খাতা বন্ধ করলেন। “সকাল আটটায় শুধু লেখা প্রকাশ হবে, না প্রথম আসন নিয়ে আর কিছু?”
কেউ উত্তর দিল না।
খালি চেয়ারটি গোল কক্ষের মাঝখানে। সকালবেলার আলো জানালা পেরিয়ে তার এক পাশ ছুঁয়েছে। অন্ধকারের মধ্যে বস্তুটি আর রহস্যময় দেখাচ্ছে না। সাধারণ কাঠ। পুরোনো হাতল। পিঠে অসম্পূর্ণ খোদাই।
তবু কেউ কাছে গেল না।
পশ্চিমঘরের নিচে আলো
সকাল সাতটা বাহান্নে ডা. তাহমিনা রশীদের কল এল। দৃশ্যসংযোগ চালু হতে কয়েক সেকেন্ড লাগল। তারপর দত্ত ভবনের পরিচিত করিডর দেখা গেল।
পশ্চিমঘরের দরজা বন্ধ। তালা অক্ষত। দরজার নিচ দিয়ে সরু হলুদ আলো বের হচ্ছে।
“কেউ ভেতরে গেছে?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
তাহমিনা বললেন, “আমার জানা মতে না। করিডরের দুই প্রান্তে মানুষ আছে। আমি আসার আগের সময়ের নথি পরীক্ষা করছি।”
“দরজার কাছে যাবেন না। আগে পুরো করিডর ধীরে দেখান।”
ক্যামেরা বাঁ দিকে ঘুরল। খালি দেয়াল। বন্ধ জানালা। মেঝেতে কোনো দৃশ্যমান তার নেই। তারপর ডান দিকে। দূরে একজন কর্মী দাঁড়িয়ে। দরজার সামনে কেউ নেই।
“আলোটি স্থির?” অমিত জিজ্ঞেস করল।
“না। একটু আগে কমে গিয়েছিল। এখন বেড়েছে।”
“দরজার ফাঁক বাইরে থেকে ব্যবহার করা যায় কি না দেখবেন না,” স্নেহা বলল। “শুধু ছবি নিন। কোনো বস্তু ঢোকাবেন না।”
তাহমিনা দূর থেকে ছবি নিলেন। পরে ক্যামেরা একটু বড় করে দেখালে দরজার নিচের কাঠে তিনটি নতুন দাগ দেখা গেল।
আগের ধাতব পাতের তিনটি আঁচড় প্রায় সমান্তরাল ছিল। এখানে প্রথম দাগ গভীর, দ্বিতীয়টি ছোট, তৃতীয়টি বাঁ দিকে বেঁকে গেছে। একই সংখ্যার দাগ। একই যন্ত্রের প্রমাণ নয়।
“কোন দিক থেকে টানা?” সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল।
স্নেহা বলল, “ছবি থেকে নিশ্চিত নয়। বাইরে বা ভেতর, দুটোই হতে পারে।”
অমিত দরজার পুরোনো নকশা খুঁজল। “নিচে বায়ু চলাচলের ফাঁক ছিল। পরে কাঠ বসিয়ে সরু করা হয়েছে। পাতলা কাগজ দুই দিক থেকেই যেতে পারে।”
মানবসৃষ্ট সম্ভাবনা পাওয়া গেল। কে এবং কীভাবে, পাওয়া গেল না।
আমি বললাম, “টাইপরাইটারের কোনো শব্দ?”
তাহমিনা মাথা নাড়লেন। “এখনো না।”
“এখনো” শব্দটি তাঁর মুখে স্বাভাবিকভাবে এসেছে, না পশ্চিমঘরের ইতিহাস জানার কারণে, জিজ্ঞেস করলাম না। প্রতিটি শব্দকে গোপন সংকেত বানালে ভাষা ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে যায়।
স্মৃতি দত্ত এতক্ষণ পর্দার বাইরে ছিলেন। এবার সামনে এসে বললেন, “আলোটি প্রথমবার নয়।”
স্নেহা তাকাল। “কখন দেখেছ?”
“বহু বছর আগে। সময় মনে নেই। দরজা তখনও বন্ধ ছিল।”
“কাকে জানিয়েছিলে?”
“আমার বাবাকে।”
“তিনি কী বলেছিলেন?”
স্মৃতি দত্ত নীল আংটির দিকে তাকালেন। “আলো দেখলে দরজা নয়, জানালার প্রতিফলন দেখবে।”
তাহমিনা ক্যামেরা পশ্চিমঘরের পাশের জানালার দিকে ঘোরালেন। কাচে করিডরের প্রতিফলন। দরজা। আলো। তাহমিনা। দূরের কর্মী।
প্রতিফলনে অতিরিক্ত কোনো মানুষ দেখা গেল না। আলোও দরজার ফাঁকেই সীমাবদ্ধ।
“এটুকুই নথিভুক্ত করুন,” স্নেহা বলল। “কোনো ব্যাখ্যা নয়।”
সকাল আটটা
সকাল আটটা বাজতে সাত সেকেন্ড বাকি।
ঢাকার প্রকাশনাপথে যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রস্তুত। কলকাতাতেও। নদিয়ার পর্দায় তৃতীয় পৃষ্ঠার লেখাগুলো এখনো ঢাকা।
অমিত সময় গুনছিল না। পর্দা দেখছিল। সুবর্ণা নিজের ঘড়ির সঙ্গে সময় মিলিয়ে নিচ্ছে। স্নেহা দত্ত ভবনের দৃশ্যসংযোগ ও নদিয়ার পর্দা, দুটো একসঙ্গে দেখছে।
আমি খালি চেয়ারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
সাত সেকেন্ডে একটি চেয়ারে গিয়ে বসা যায়।
পাঁচ সেকেন্ডে হয়তো কোনো অজ্ঞাত ব্যবস্থা আমাকে গ্রহণ করবে। তিন সেকেন্ডে ছবি উঠবে। এক সেকেন্ডে একটি নাম প্রকাশিত হবে।
আমি উঠলাম না।
ঠিক সকাল আটটায় ঢাকা ও কলকাতায় পূর্ণ পাণ্ডুলিপির বদলে যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলো।
নদিয়ার পর্দা সাদা হয়ে উঠল। তারপর অজ্ঞাত নথির চারটি ঘর দৃশ্যমান হলো:
অজ্ঞাত নথিতে প্রদর্শিত দাবি
প্রথম পরিচয়: অসম্পূর্ণ
দ্বিতীয় পরিচয়: ইকবাল হাসান
কার্যকর পরিচয়: GHURI-7
স্বাধীন সাক্ষ্য: SNEHA
এগুলো কোনো যাচাইকৃত পরিচয় নয়। অজ্ঞাত নথির দাবি।
ইকবাল হাসান আমার ব্যবহৃত একটি পরিচয়, জন্মনাম নয়। GHURI-7 একটি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকর পরিচয়। প্রথম পরিচয়ের ঘর অসম্পূর্ণ। আর SNEHA কী বোঝায়, অজ্ঞাত নথিটি তা ব্যাখ্যা করে না।
নথির সময়চিহ্নের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। কাগজটি পুরোনো বলে মনে হয়, কিন্তু ডিজিটাল ছবিতে কাগজের বয়স নিশ্চিত করা যায় না। কোনো অজ্ঞাত সম্পাদক পুরোনো নথির ছবি পরিবর্তনও করতে পারে।
চারটি ঘরের নিচে একটি বাক্য:
দ্বিতীয় পরিচয় ব্যর্থ হলে স্বাধীন সাক্ষ্য প্রথম নামটি পুনরুদ্ধার করবে।
কোনো পুনরুদ্ধার ঘটল না। কোনো জন্মনাম উঠল না। খালি চেয়ারও সাড়া দিল না।
অমিত বলল, “এই পৃষ্ঠাটি সরাসরি সংরক্ষণ করছি। কোনো ঘর পূরণ করার চেষ্টা করবে না।”
“আমি কিছু করিনি,” বললাম।
সুবর্ণা বলল, “এই প্রথম তোমার নিষ্ক্রিয়তাও প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগল।”
সকাল আটটা এক মিনিটে ডা. তাহমিনা বললেন, “দরজার নিচে কিছু নড়ছে।”
সবাই দত্ত ভবনের দৃশ্যসংযোগের দিকে ফিরল।
পশ্চিমঘরের দরজার নিচ দিয়ে একটি কাগজের সাদা প্রান্ত বাইরে আসছে। খুব ধীরে। ধাক্কা দিয়ে নয়। যেন আগে থেকেই ফাঁকে আটকে থাকা কাগজ বাতাসে সরে আসছে।
“করিডরের জানালা খোলা?” অমিত জিজ্ঞেস করল।
তাহমিনা ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেখালেন। জানালা বন্ধ। তবে নিচের পুরোনো কাঠের একটি অংশ ভাঙা। বাইরে বাতাস থাকলে ভেতরে চাপ তৈরি হতে পারে।
“কাগজ আগে থেকেই আটকে থাকতে পারে,” স্নেহা বলল। “কেউ কাছে যাবেন না।”
কাগজের আরও অংশ বেরিয়ে এল। সেখানে একটি অক্ষর। বাকি অংশ বাদামি কালি দিয়ে মুছে দেওয়া।
অক্ষরটি আমার জানা কোনো বর্তমান নামের প্রথম অক্ষর নয়।
কিন্তু অচেনাও নয়।
বহু বছর আগে নিজের হাতে পোড়ানো একটি নথিতে একই অক্ষর দেখেছিলাম। নথিটির বিষয় মনে পড়ল না। শুধু আগুনের গন্ধ, একটি বন্ধ জানালা এবং পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কারও নিঃশ্বাস মনে পড়ল।
সুবর্ণা আমার মুখের দিকে তাকাল। “তুমি চিনেছ।”
স্নেহাও তাকাল। “কী চিনেছ?”
আগের আমি ঠিক করতাম, এই সত্য তাদের জানানো নিরাপদ কি না।
“অক্ষরটি আগে দেখেছি,” বললাম। “নিজের হাতে পোড়ানো একটি নথিতে। নথির নাম, সময় বা উদ্দেশ্য মনে নেই। এটুকুর বেশি বললে অনুমান হবে।”
স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “কেন পোড়িয়েছিলে?”
“জানি না।”
“সত্যিই?”
তার প্রশ্নে অভিযোগ নেই। সহজ পথও নেই।
“সত্যিই।”
স্নেহা নোটবুকে লিখল:
হাসানের বক্তব্য: অজ্ঞাত অক্ষরটি আগে নিজের হাতে পোড়ানো একটি নথিতে দেখেছে। নথির নাম, সময় ও উদ্দেশ্য মনে নেই। অক্ষরটিকে জন্মনাম বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় হিসেবে এখনো গণ্য করা যাবে না।
পশ্চিমঘরের ভেতর থেকে একবার শব্দ এল।
টক।
টাইপরাইটারের অক্ষর পড়ার মতো। অথবা কাঠের ভেতরে ধাতব অংশ সরে যাওয়ার শব্দ।
অমিত বলল, “শব্দের উৎস সরাসরি দরজার ভেতর বলে মনে হচ্ছে না। করিডরের দেয়ালেও পুরোনো শব্দবহনকারী ফাঁপা অংশ থাকতে পারে।”
“তুমি এখনই নিশ্চিত?” সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল।
“না। সম্ভাবনা বলছি।”
কাগজটি আর এগোল না। দরজাও খুলল না। আলো ধীরে কমে আবার স্থির হলো।
স্নেহা বলল, “আমাদের দত্ত ভবনে ফিরতে হবে।”
“দরজা খুলতে?”
“না। কাগজটি পরীক্ষা করতে। দরজার ফাঁক, দেয়ালের শব্দপথ এবং করিডরের পূর্ণ প্রবেশতথ্য দেখতে। আর কেউ তাড়াহুড়ো করে দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে থামাতে।”
সুবর্ণা বলল, “আমি যাব।”
আমি তাকালাম। “আমাদের সঙ্গে?”
“একই পথে। একই পরিকল্পনায় নয়।”
অমিত যন্ত্র গুছাতে গুছাতে বলল, “আমিও যাব। তবে সীমান্তে আমার পথ আলাদা হতে পারে।”
অনিরুদ্ধ বললেন, “নদিয়ার নথিগুলো এখান থেকে সরানো যাবে না। মৈত্রেয়ী ও আমাদের দুজন প্রতিনিধি এসে হেফাজত নেবেন।”
নওশাদ নদীপথের নিবন্ধনখাতা গোপাল নস্করের সামনে বন্ধ করলেন। “এটাও এখানেই থাকবে। ছবি আলাদা হবে। মূল নয়।”
স্মৃতি দত্ত নীল পাথরের আংটির দিকে তাকালেন। “আমিও ফিরব।”
স্নেহা বলল, “তুমি কেন ফিরছ, পথে বলবে। শুধু ‘সময় হয়েছে’ বললে হবে না।”
স্মৃতি দত্ত মেয়ের দিকে তাকালেন। “ঠিক আছে।”
এই রাতের দ্বিতীয় সবচেয়ে অস্বাভাবিক ঘটনা। প্রথমটি এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।
খালি আসন
সকাল আটটা ছয় মিনিটে নদিয়ার পর্দা নিভে গেল। তৃতীয় কেন্দ্রের পৃষ্ঠা ইতিমধ্যে বাইরে গেছে। কত মানুষের কাছে পৌঁছেছে, জানা যায়নি। ঢাকা ও কলকাতায় যাচাইকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত। অজ্ঞাত পৃষ্ঠার সত্যতা নিয়ে জনসমক্ষে আরেকটি লড়াই শুরু হবে।
কিন্তু অন্তত পূর্ণ বিকৃত পাণ্ডুলিপি আমাদের নামে প্রকাশিত হয়নি। এটি বিজয় নয়। ক্ষতি সীমিত করার একটি সাময়িক ফল।
গোল কক্ষের মাঝখানে কাঠের চেয়ারটি খালি। কেউ কোনো পরিচয় গ্রহণ করেনি। কোনো যন্ত্র আমাদের নেতা, হেফাজতকারী বা সাক্ষী ঘোষণা করে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারেনি।
প্রথম আসনের অর্থ আমরা জানি না। শুধু জানি, তার সামনে বসার জন্য একটি চেয়ার রাখা আছে। মানুষকে ক্ষমতা দেওয়ার সবচেয়ে পুরোনো পদ্ধতি সম্ভবত এই। আগে চেয়ার রাখা হয়। তারপর অপেক্ষা করা হয়, কে নিজের ইচ্ছায় বসে।
আমি বসিনি।
এই ঘটনাকে নৈতিক জয়ের মতো বললে মিথ্যা হবে। বসতে ইচ্ছা করেছিল। এখনো করছে। শুধু ইচ্ছার সঙ্গে সিদ্ধান্তের পার্থক্য প্রথমবার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছি।
দরজার বাইরে এসে প্রথম সিঁড়িতে ডান পায়ের ভার সামান্য সরে গেল। স্নেহা পাশে ছিল। সে আমার হাত ধরল না। পিঠের কাছে হাত রেখে ভারসাম্য ফেরার অপেক্ষা করল।
“ব্যথা?”
“আছে।”
“মাথা?”
“ভারী।”
“ভয়?”
উত্তর দিতে একটু সময় নিলাম। আগে হলে হাসতাম। অন্য প্রশ্ন করতাম। অথবা বলতাম, ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই।
“সেটাও আছে।”
“এবার অন্তত দুটো আলাদা করতে পারছ।”
“তুমি পাশে থাকলে সহজ।”
স্নেহা আমার দিকে তাকাল। “পাশে আছি কি না, সেই সিদ্ধান্ত এখনো শেষ হয়নি।”
“জানি।”
“তবু ধীরে হাঁটো।”
আমি ধীরে হাঁটলাম।
সুবর্ণা আমাদের পেছনে ছিল। খুব কাছে নয়। খুব দূরেও নয়। তার হাতে পাণ্ডুলিপির তুলনামূলক তালিকা। চোখে সেই পুরোনো প্রশ্ন, ক্ষমতা ভাগ করার কথা বলা মানুষটি সুযোগ পেলে আসলেই ভাগ করবে কি না।
অমিত সেবা-প্রবেশপথের তালা আবার পরীক্ষা করছিল। স্মৃতি দত্ত অনিরুদ্ধের সঙ্গে তাঁর অযাচাইকৃত প্রবেশাধিকার-বার্তা নিয়ে কথা বলছেন। গোপাল নস্কর নিবন্ধনখাতার পাশে। ছেঁড়া জুতার দায়িত্বধারী যে জায়গায় দাঁড়িয়েছিল, সেখানে এখন কেউ নেই।
সে কখন চলে গেছে, কেউ দেখেনি।
তবে তার চলে যাওয়া নতুন কেন্দ্রীয় রহস্য নয়। মানুষটির কাজ ছিল সম্ভাব্য দাবিদারকে নথির সামনে আনা। আমি এসেছি। চেয়ারে বসিনি। এরপর সে চলে যেতে পারে।
প্রতিটি অনুপস্থিতিকে অতিপ্রাকৃত বানানো দরকার নেই। কিছু মানুষ দরজা দিয়েই বের হয়। আমরা শুধু অন্য দিকে তাকিয়ে থাকি।
প্রদীপবাবু মাইক্রোবাসের দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলেন। পূর্ব আকাশে আলো উঠেছে। কুয়াশা পাতলা। দুটি শিরীষগাছের ছায়া এখন আলাদা বোঝা যায়। রাতে একটি ছায়া মনে হচ্ছিল।
রাতের অনেক রহস্য দিনের আলোয় আলাদা বস্তু হয়ে যায়। তাই বলে তাদের ইতিহাস সহজ হয় না।
গাড়িতে ওঠার আগে দত্ত ভবনের দৃশ্যসংযোগ আবার দেখলাম। পশ্চিমঘরের দরজা বন্ধ। আলো কমেছে। কাগজের একাংশ বাইরে। ডা. তাহমিনা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ কিছু স্পর্শ করেনি।
পর্দায় অজ্ঞাত অক্ষরটি খুব ছোট। তবু চিনতে ভুল হলো না। কোনো মানুষের বর্তমান নাম থেকে নয়। বহু বছর আগে নিজের হাতে পোড়ানো একটি নথি থেকে।
সেই স্মৃতিতে একটি বন্ধ জানালা, আগুনের আলো এবং পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কারও নিঃশ্বাস আছে।
যে নথিতে অক্ষরটি প্রথম দেখেছিলাম, সেটি পোড়ানোর সময় স্নেহা আমার জীবনে ছিল না।
অন্তত আমার স্মৃতি এত দিন সেটাই বলে এসেছে।
চলবে...
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘দত্ত পরিবার’ ঐতিহাসিক আবহ, রহস্য, পারিবারিক নাটক ও রোমাঞ্চনির্ভর একটি মৌলিক কাল্পনিক উপন্যাস। উপন্যাসের চরিত্র, প্রতিষ্ঠান, পাণ্ডুলিপি, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, স্থানান্তরযোগ্য পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো সৃজনশীল কাহিনির অংশ। প্রযুক্তি, নথি বিশ্লেষণ, স্মৃতি পুনর্গঠন ও তদন্তের উপাদানগুলো কাহিনিগত সম্ভাবনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নয়। কোনো চরিত্রের রাজনৈতিক বক্তব্যকে লেখকের চূড়ান্ত অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0