দত্ত পরিবার | পর্ব ২১: যে বিশৃঙ্খলা আমি লিখেছিলাম
পশ্চিমঘরের অজ্ঞাত নথি পরীক্ষা করতে গিয়ে হাসান স্বীকার করে, হারানো পাণ্ডুলিপিগুলো প্রকাশের জন্যই লেখা হয়েছিল। কিন্তু তার পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা যখন মানুষের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে, তখন স্নেহা তার সামনে ভালোবাসা, সত্য ও দায়ের কঠিন সীমা টেনে দেয়।
‘দত্ত পরিবার’ ধারাবাহিক প্রসঙ্গে
সকাল আটটায় পূর্ণ পাণ্ডুলিপির প্রকাশ থামানো গেলেও অজ্ঞাত তৃতীয় কেন্দ্রের পৃষ্ঠা বাইরে চলে গেছে। নদিয়ার প্রথম আসন খালি, পশ্চিমঘরের দরজা বন্ধ এবং দরজার নিচে বেরিয়ে থাকা কাগজের অক্ষর হাসানের পোড়ানো একটি নথির স্মৃতি জাগিয়েছে। এবার প্রশ্ন পরিচয়ের চেয়েও বড়। হারানো পাণ্ডুলিপিগুলো কি সত্যিই হারিয়েছিল, নাকি বহু বছর আগে হাসান নিজেই তাদের জন্য একাধিক পথ খুলে রেখেছিল?
সকাল আটটার পর নদিয়ার গোল কক্ষটি পেছনে ফেলে বেরিয়ে এলেও খালি চেয়ারটি আমার সঙ্গে রয়ে গেল।
কিছু আসনে বসতে হয় না। মানুষ একবার সেগুলোর দিকে তাকালেই আসনগুলো তার আকাঙ্ক্ষার ভেতরে জায়গা করে নেয়।
পাথরের সিঁড়ির প্রথম ধাপে নেমেই ডান দিকে শরীরের ভার সরে গেল। স্নেহা আমার হাত ধরে টেনে তুলল না। পিঠের কাছে হাত রেখে ভারসাম্য ফিরে আসার অপেক্ষা করল।
“ব্যথা বেড়েছে?” সে জিজ্ঞেস করল।
“ব্যথা নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে।”
“তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি। ব্যথাকে নয়।”
“বেড়েছে।”
ডান বাহু স্লিংয়ের ভেতর ভারী। তর্জনী সামান্য নড়ছে। মধ্যমা নড়ছে না। ছোট আঙুলের অনুভূতি প্রায় নেই। নদিয়ার কেন্দ্র আমাকে কোনো পরিচয় দেয়নি। কিন্তু শরীর তার নিজস্ব অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে।
আমি অসুস্থ।
অসহায় কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন।
প্রথম আসনের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর
ক্ষমতা গ্রহণ করিনি।
ক্ষমতা সম্পর্কে যা জানি, তাও এখনো বলিনি।
মাইক্রোবাসের কাছে স্মৃতি দত্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন। ডান অনামিকায় নীল পাথরের আংটি। স্নেহা মায়ের সামনে গিয়ে থামল।
“তুমি কেন ফিরছ, এখন বলবে,” স্নেহা বলল। “শুধু সময় হয়েছে বললে হবে না।”
স্মৃতি দত্ত কয়েক মুহূর্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“পশ্চিমঘরের কাগজে যে অক্ষরটি দেখা গেছে, তার কাছাকাছি একটি চিহ্ন বাবার নথিতে দেখেছিলাম।”
“কোন নথিতে?”
“যেটি এখন নেই।”
সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল, “হারিয়েছে?”
স্মৃতি দত্ত এবার আমার দিকে তাকালেন।
“পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।”
সকালের বাতাস ঠান্ডা ছিল। তবু কপালের পাশে ঘাম জমল।
অমিত যন্ত্রের ব্যাগটি গাড়িতে রেখে বলল, “কে পুড়িয়েছিল?”
প্রশ্নটির উত্তর আমার জানা ছিল।
সব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে মানুষ সৎ হয় না। শুধু মিথ্যা বেছে নেওয়ার সুযোগ বাড়ে।
“আমি,” বললাম।
স্নেহার দৃষ্টি আমার মুখে স্থির হলো।
“এখন মনে পড়েছে?”
“পোড়ানোর ঘটনাটি কখনো পুরোপুরি ভুলিনি।”
“তাহলে মনে নেই বলেছিলে কেন?”
“কারণ নথির পূর্ণ বিষয় মনে নেই। আর যা জানি, তার সব বলার সিদ্ধান্ত নিইনি।”
স্নেহা বলল, “এই দুটো এক কথা নয়।”
“আমি জানি।”
“জানার পরও গুলিয়ে বলেছ।”
“হ্যাঁ।”
আত্মপক্ষসমর্থনের জন্য অনেক বাক্য প্রস্তুত ছিল। অন্যদের নিরাপত্তা, অসম্পূর্ণ স্মৃতি, অজ্ঞাত শত্রু এবং তথ্যের হেফাজত। সব কটি বাক্যের মধ্যে কিছু সত্য ছিল। অর্ধসত্যের সবচেয়ে বড় সুবিধা এটিই। তাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সময় লাগে।
পাণ্ডুলিপিগুলো হারায়নি
গাড়ি চলতে শুরু করার পর নদিয়ার কেন্দ্র দ্রুত গাছপালার আড়ালে হারিয়ে গেল। স্নেহা আমার বাঁ পাশে। সুবর্ণা ডান পাশে। মাঝখানে আমাকে বসানো হয়েছে। শারীরিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা কখনো কখনো জিজ্ঞাসাবাদের বিন্যাসও তৈরি করে।
সুবর্ণা বলল, “পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩-ও কি ইচ্ছা করে হারিয়েছিলে?”
“হারাইনি। এমন পথে রেখেছিলাম, যেখানে আমার অনুমতি ছাড়াও সেটি চলতে পারে।”
“প্রকাশিত হওয়ার জন্য?”
“হ্যাঁ।”
“বদলে যাওয়ার জন্যও?”
“পাঠ বদলাতে পারে, জানতাম। কারা বদলাবে অথবা কতদূর বদলাবে, জানতাম না।”
অমিত সামনের আসন থেকে ঘুরে তাকাল।
“মিথ্যা বলছিস?”
“এই উত্তরটুকুতে না।”
“বাকি অংশে?”
“তুই প্রশ্ন শেষ করিসনি।”
অমিত সামনের দিকে ফিরে গেল। পুরোনো বন্ধুত্ব মানুষকে বিশ্বাস করতে শেখায় না। কোথায় সন্দেহ করতে হবে, সেটি শেখায়।
স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “কেন লিখেছিলে?”
“প্রকাশের জন্য।”
“এটা উদ্দেশ্য নয়। ফলাফল।”
“একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় নিজের ভদ্র মুখ দেখায়। পরস্পরবিরোধী নথির সামনে ফেললে দেখা যায়, সে কোন সত্য বেছে নেয়, কাকে চুপ করায় এবং কার পরিচয় নিজের প্রয়োজনমতো লিখে দেয়।”
সুবর্ণা বলল, “তুমি বিশৃঙ্খলা তৈরি করে রাজনীতি বুঝতে চেয়েছিলে।”
“তথ্যগত বিশৃঙ্খলা।”
স্নেহা বলল, “তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছায়। মানুষ রাস্তায় নামে। রাস্তার মানুষকে তোমার সংজ্ঞা রক্ষা করে না।”
“তুমি আগুন ধরাতে বলোনি,” স্নেহা বলল।
“কিন্তু ঘরে শুকনো খড় রেখে দেখতে চেয়েছিলে,
কে দিয়াশলাই নিয়ে আসে।”
প্রস্তুত উত্তরগুলো মাথায় এলো। কাউকে আঘাতের নির্দেশ দিইনি। কোনো সম্প্রদায়কে শত্রু বলিনি। নথির পরিচয় প্রকাশ করতে বলিনি।
কোনো কথাই স্নেহার প্রশ্নটিকে বাতিল করে না।
“দায় থেকে পুরো বের হতে পারব না,” বললাম।
স্নেহা আমার দিকে তাকিয়েই বলল, “এটাই স্বীকারোক্তির শুরু। শেষ নয়।”
চার সময়ের চার প্রান্তলিখন
মৈত্রেয়ীর নিরাপদ সংযোগ এল। পাণ্ডুলিপি নম্বর ৩-এর তিনটি পাঠে মূল বাক্যের পাশে চার সময়ের চার ধরনের প্রান্তলিখন শনাক্ত হয়েছে। এক হাতের লেখা কি না, নিশ্চিত নয়। মূল কাগজও নেই।
১৯৪৭
মানুষ কোন ভূখণ্ডে থাকবে এবং কোন নামে নথিভুক্ত হবে?
১৯৫২
রাষ্ট্র মানুষের ভাষাকে স্বীকার না করলে তার পরিচয়ের সাক্ষ্য রাখবে কে?
১৯৭১
জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছা অস্বীকার করা হলে রাষ্ট্রের বৈধতা কোথায় থাকে?
২০২৪
পুরোনো কর্তৃত্ব ভাঙার পর নতুন ক্ষমতার বিরুদ্ধে স্বাধীন সাক্ষ্য রাখবে কে?
মৈত্রেয়ী বললেন, “চারটি সময়কে একই ঘটনা হিসেবে পড়া যাবে না। শুধু প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিকতা তুলনা করা যায়।”
সুবর্ণা জিজ্ঞেস করল, “এই প্রশ্নগুলো তোমার?”
“প্রথম দুটির ভাষা আমার নয়। তৃতীয়টির ভাব পরিচিত। চতুর্থটি পরে লেখা হয়ে থাকতে পারে।”
“কিন্তু পাণ্ডুলিপি তুমি প্রকাশের জন্য রেখেছিলে।”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ একটি বিপ্লব পুরোনো কেন্দ্র ভাঙতে পারে। কিন্তু পরের কেন্দ্রটি নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য রাখবে কি না, সেটি বিপ্লব নিজে ঠিক করে না।”
স্নেহা বলল, “মানুষের মৃত্যু ও আঘাতকে তোমার রাজনৈতিক সূত্রের উদাহরণ বানাবে না।”
“বানাচ্ছি না।”
“তুমি উদ্দেশ্য বোঝাচ্ছ। আমি প্রভাবের কথা বলছি।”
জানালার বাইরে পথ বদলাচ্ছিল। কথোপকথনের ভেতরও।
পশ্চিমঘরের নিচে
দত্ত ভবনে পৌঁছাতে দুপুর পেরিয়ে গেল। পশ্চিমঘরের করিডরে প্রবেশ সীমিত। ডা. তাহমিনা রশীদ আগের সময়ের প্রবেশতথ্য আলাদা করেছেন। দরজা বন্ধ। তালা অক্ষত। কাগজের সাদা প্রান্ত আগের মতোই নিচের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে।
স্নেহা বলল, “দরজা খোলা হবে না।”
স্মৃতি দত্ত জিজ্ঞেস করলেন, “কাগজটি ভেতরে ফিরে গেলে?”
“তাহলে সেটিও পর্যবেক্ষণ হবে,” স্নেহা বলল। “ফাঁকের ভেতর কিছু ঢোকানো হবে না।”
অমিত আলো, জানালার ভাঙা অংশ এবং দেয়ালের সম্ভাব্য শব্দপথ পরীক্ষা করল। কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দিল না। সুবর্ণা পর্ব ২০-এর ছবি ও বর্তমান অবস্থার সময় মিলিয়ে রাখল। মৈত্রেয়ী দূরের সংযোগ থেকে কাগজের দৃশ্যমান অংশ পর্যবেক্ষণ করলেন।
বাদামি কালিতে অধিকাংশ লেখা ঢেকে দেওয়া। একটি অক্ষর দৃশ্যমান। তার নিচে পরস্পরের দিকে বাঁকানো দুটি রেখা।
“ছবিটি উল্টো করো,” বললাম।
অমিত আমার দিকে তাকাল।
“কেন?”
“ওটা অক্ষর নয়। দুই পথের মাঝের ফাঁক।”
সুবর্ণা বলল, “দেখার আগেই তুমি জানলে?”
“পোড়ানো নথিতে একই বিন্যাস ছিল।”
“নথির বিষয় মনে নেই। বিন্যাস মনে আছে?”
“হ্যাঁ।”
“সুবিধাজনক স্মৃতি।”
“সন্দেহটি নথিভুক্ত করো।”
অমিত ছবিটি ঘোরাল। দৃশ্যমান চিহ্নটি আর অক্ষর মনে হলো না। দুই পাশ থেকে আসা দুটি রেখা মাঝখানে সরু একটি পথ তৈরি করেছে। একপাশে নদীর বাঁকের মতো চিহ্ন। অন্য পাশে ভাঙা স্থলপথ।
নওশাদের খাতার কোনো চিহ্নের সঙ্গে হুবহু মিলল না। তবে নদী ও স্থলপথের পৃথক হেফাজতরীতির সঙ্গে গঠনগত সাদৃশ্য আছে।
কাগজটি বাতাসের চাপে আরও সামান্য বাইরে এল। আগে থেকে ফাঁকে আটকে থাকার সম্ভাবনা রইল। নতুন দৃশ্যমান অংশে একটি অসম্পূর্ণ বাক্য পাওয়া গেল।
অজ্ঞাত নথিতে আংশিক দৃশ্যমান দাবি
“প্রথম নাম সংরক্ষণ করবে সে,
যে দ্বিতীয় পরিচয় নিজে প্রত্যাখ্যান করতে পারে।”
ইকবাল হাসান আমার ব্যবহৃত পরিচয়।
জন্মনাম নয়।
এই পার্থক্য আমি শুরু থেকেই জানতাম।
কখন থেকে জানতাম, সেটিই বলিনি।
স্নেহা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি অক্ষরের চেয়ে বেশি কিছু চিনেছ।”
“হ্যাঁ।”
“কতটা?”
“এতটা, যাতে জানি এটি আমার জন্মনাম নয়। একটি সিদ্ধান্তের চিহ্ন।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
উত্তর দেওয়ার আগেই ডান বাহুর গভীর থেকে বিদ্যুতের মতো ব্যথা উঠল। করিডরের দেয়াল কাত হয়ে গেল।
দেয়াল নড়েনি। আমি নড়েছি।
স্নেহা আমাকে ধরে দাঁড় করাল না। দেয়ালের পাশের চেয়ারে বসিয়ে বলল, “আজ তোমার তদন্ত শেষ।”
“কাগজটি এখনো পুরো বের হয়নি।”
“তুমিও পুরো সুস্থ নও।”
দশ দিন পরে
ক্ষত শুকিয়েছে। ডান হাতের মৌলিক নড়াচড়া ফিরেছে। তর্জনী ও মধ্যমা নির্দেশ মানছে। ছোট আঙুলে ঝিনঝিনি রয়ে গেছে। হাতের শক্তি আগের মতো নয়। ভারী কাজ, সংঘর্ষ ও দীর্ঘ সময় অস্ত্র ধরার অনুমতি নেই। আমি চিকিৎসাগতভাবে স্থিতিশীল এবং সীমিত কাজে সক্ষম। সম্পূর্ণ সুস্থ নই।
দশম দিনের সকালে ডান হাতে শার্টের শেষ বোতামটি লাগালাম।
প্রথমবার ফসকে গেল। দ্বিতীয়বারও। তৃতীয়বার বোতামটি ঘরের ভেতর ঢুকল।
স্বাধীনতা কখনো রাষ্ট্র দিয়ে শুরু হয়। কখনো একটি আঙুল আবার নিজের নির্দেশ বুঝতে শুরু করলেও মানুষ তার স্বাদ পায়।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে স্নেহা বলল, “পরীক্ষার সময় এতটা নড়াতে পারোনি।”
“পরীক্ষার পরিবেশ অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল না।”
“তোমার হাত যতটা অসুস্থ, তুমি তার চেয়ে দুর্বল দেখিয়েছ।”
“ব্যথা সত্যি ছিল। অসহায়ত্ব পুরোটা নয়।”
“কেন?”
“নিজের পূর্ণ সক্ষমতা সবাইকে জানানো নিরাপদ নয়।”
স্নেহা বলল, “চিকিৎসকের কাছে সক্ষমতা লুকালে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থাকে।”
“ভুল হয়েছে।”
“এই স্বীকারোক্তিটি তোমার জন্য অস্বাভাবিক দ্রুত।”
“সুস্থতার লক্ষণ।”
স্মৃতি দত্তের আসন-মানচিত্র
দুপুরে স্মৃতি দত্ত আমাদের সংরক্ষণকক্ষের পাশের দীর্ঘ টেবিলে ডাকলেন। টেবিলের ওপর পশ্চিমবঙ্গের পূর্ণ আসনভিত্তিক মানচিত্র। কোনো আসনকে দখল বা বিজয়ের রঙে চিহ্নিত করা হয়নি। তবু প্রতিটি এলাকার পাশে একটি নাম, দায়িত্ব, যাত্রাপথ এবং বিকল্প প্রত্যাহারপথ লেখা।
প্রার্থী তালিকা নয়।
অন্তত স্মৃতি দত্ত সেটিই দাবি করলেন।
তালিকায় পাঁচ ধরনের পথ:
Public Lane: প্রকাশ্য নাগরিক সংযোগ ও স্থানীয় মত শোনা
Archive Lane: পরিবার, দলিল ও ঐতিহাসিক সাক্ষ্য
Relief Lane: ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়
Dialogue Lane: স্থানীয় বিরোধ, গুজব যাচাই ও সংলাপ
Silent Lane: প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ
স্মৃতি দত্ত বললেন, “পূর্ণ তালিকা এখনো কার্যকর নয়।”
স্নেহা নিজের নাম খুঁজে পেল। তার পাশে লেখা চিকিৎসা, স্বাধীন সাক্ষ্য এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জরুরি প্রতিক্রিয়া।
“আমাকে জিজ্ঞেস করোনি,” স্নেহা বলল।
“তোমার সক্ষমতা অনুযায়ী পরিকল্পনা করেছি,” স্মৃতি দত্ত বললেন।
“সক্ষমতার তথ্য তোমার কাছে থাকতে পারে। সম্মতি নয়।”
“রাজনীতি প্রতিটি দায়িত্বের আগে ব্যক্তিগত অনুমতির অপেক্ষা করে না।”
“তাহলে সেই দায়িত্ব আমার নামে চলবে না।”
স্মৃতি দত্ত আমার দিকে তাকালেন।
“তোমার ও হাসানের ভবিষ্যৎ আমি আলাদা করে দেখিনি।”
স্নেহা মানচিত্রটি ধীরে ভাঁজ করল।
“ভবিষ্যৎ এক হতে পারে,” সে বলল। “সিদ্ধান্ত একজনের হবে না।”
অখণ্ড বাংলা কী চায়?
সুবর্ণা মানচিত্রের ভাঁজের ওপর হাত রাখল।
“তোমার অখণ্ড বাংলা কী?” সে জিজ্ঞেস করল। “একটি রাষ্ট্র, একটি সাংস্কৃতিক অঞ্চল, না একই নির্দেশ মানা দুই কেন্দ্র?”
“প্রথমে একটি নথিগত শর্ত,” বললাম। “দুই পাশের ইতিহাস যেন একে অন্যকে অস্বীকার না করে।”
“তারপর?”
“সীমান্তবিচ্ছিন্ন পরিবার, বই, নদী, ভাষা, শ্রম ও নাগরিক সহযোগিতার যৌথ কাঠামো।”
“আর মানচিত্র?”
“মানুষ চাইলে পরে প্রশ্নটি উঠবে।”
স্নেহা বলল, “মানুষ না চাইলে?”
“মানচিত্র আঁকা হবে না।”
সুবর্ণা প্রশ্ন করল, “সত্যি?”
তার প্রশ্নে সন্দেহ ছিল। কারণও ছিল।
“অখণ্ড বাংলা যদি মানুষের সম্মতি ছাড়া শুরু হয়,” সে বলল, “তাহলে সেটি তোমার নতুন কেন্দ্রীয় দখল হবে।”
“সেই কারণেই প্রথম আসনে বসিনি।”
“একটি চেয়ারে না বসা সব লুকানো দরজা বন্ধ করে না।”
আমার উত্তর ছিল না।
অথবা ছিল। বললাম না।
নামের আগে সিদ্ধান্ত
রাতে চিকিৎসাকক্ষের জানালা খোলা ছিল। বাইরে বৃষ্টির পর ভেজা মাটির গন্ধ। স্নেহা আমার ডান হাতের নড়াচড়া পরীক্ষা করে নতুন করে কিছু লিখল না।
“আজ নোট নেই?” জিজ্ঞেস করলাম।
“সব কথা চিকিৎসার নথি নয়।”
“তাহলে বিপদ বাড়ছে।”
স্নেহা আমার সামনে বসে বলল, “তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও?”
কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর বহু বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছি। এই প্রশ্নের উত্তর লুকানোর প্রয়োজন ছিল না।
“চাই।”
“হাসান হিসেবে?”
“তুমি যে মানুষটিকে চেনো, সে হিসেবে।”
“আর অন্য পরিচয় ফিরে এলে?”
“সেটিকে আলাদা দাবি হিসেবে যাচাই করবে। আমার জায়গায় বসিয়ে দেবে না।”
স্নেহা জানালার দিকে তাকাল।
“তিনটি শর্ত থাকবে।”
“তিনটি সংখ্যাটি এই পরিবারের প্রিয়। ভয় লাগছে।”
“আমার জীবনকে প্রভাবিত করে এমন তথ্য তুমি একা গোপন করবে না। আমাদের সম্পর্ক কোনো রাজনৈতিক পরিচয় সক্রিয় করার উপায় হবে না। আর বিয়ে কোনো আসন, নথি বা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন হবে না।”
“আমারও একটি শর্ত আছে।”
“বলো।”
“তুমি আমাকে হাসান হিসেবে ভালোবাসবে। অন্য কোনো নাম ফিরে এলে তাকে আমার চেয়ে বেশি সত্য মনে করবে না।”
স্নেহা আমার বাঁ হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। ডান হাতটি তখনো পুরোপুরি আমার নয়।
“নাম নয়,” সে বলল। “তোমার সিদ্ধান্ত যাচাই করব।”
গুজব আলাদা, আতঙ্ক একই
স্নেহার উত্তর শেষ হওয়ার আগেই অমিতের জরুরি সংযোগ এল।
দুটি পরিবর্তিত পাঠ দুই জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। একটিতে অখণ্ড বাংলাকে একটি সম্প্রদায়ের গোপন দখলপরিকল্পনা বলা হয়েছে। অন্যটিতে বিপরীত সম্প্রদায়কে ভবিষ্যৎ শত্রু হিসেবে দেখানো হয়েছে।
কোনো বক্তব্যই মূল পাণ্ডুলিপিতে ছিল না।
অমিত বলল, “দুই জায়গায় দোকান বন্ধ হচ্ছে। কয়েকটি জমায়েতের খবর আছে। কিছু ছবি পুরোনো। কিছু বর্তমান কি না যাচাই হচ্ছে। পূর্ণ পরিস্থিতি এখনো পরিষ্কার নয়।”
স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “আহত?”
“নিশ্চিত সংখ্যা নেই। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনার খবর আছে।”
“সংখ্যা নিশ্চিত না হলে সংখ্যা বলবে না,” স্নেহা বলল। “চিকিৎসাকেন্দ্র ও নিরাপদ আশ্রয়ের তথ্য আলাদা করো।”
স্মৃতি দত্ত মানচিত্র খুললেন।
“Relief Lane সক্রিয় করতে হবে।”
স্নেহা বলল, “তালিকার প্রত্যেক মানুষের সম্মতি নেওয়া হবে। তারা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে যাবে না। শুধু চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় এবং যাচাইকৃত তথ্য।”
সুবর্ণা দূরের সংযোগ থেকে দুটি ফাইলের গঠন পরীক্ষা করছিল।
“দুটি বক্তব্য বিপরীত,” সে বলল। “কিন্তু উভয় ফাইলের পরীক্ষামূলক স্তরে একই চিহ্ন আছে।”
পর্দায় তিনটি যুক্ত বৃত্ত দেখা গেল। মাঝখানে ফাঁকা জায়গা।
চিহ্নটি আমার তৈরি।
পরিবর্তিত বাক্যগুলো নয়।
স্নেহা জিজ্ঞেস করল, “চিহ্নটা কার?”
“আমার।”
সুবর্ণা বলল, “তাহলে পথটি তোমার?”
“ছিল।”
“এখন?”
ডান হাতের আঙুলগুলো মুঠো করলাম। ব্যথা হলো। তবু তারা নির্দেশ মানল।
“আমার নিয়ন্ত্রণে নেই।”
দুটি Relief Lane থেকে প্রায় একই সময়ে সংক্ষিপ্ত বার্তা এল।
গুজব আলাদা।
আতঙ্ক একই।
মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।
স্নেহা আমার দিকে তাকাল।
“তোমার পরীক্ষা শেষ।”
“না,” বললাম। “আমার নিয়ন্ত্রণ শেষ।”
রাজনীতিতে এই দুই বাক্যের পার্থক্য বুঝতে যত সময় লাগে, মানুষের ক্ষতি তার আগেই শুরু হয়ে যায়।
ঠিক তখন পশ্চিমঘরের দিক থেকে টাইপরাইটারের মতো একটি শব্দ এল।
টক।
তারপর আরেকটি।
টক।
ডা. তাহমিনা দৃশ্যসংযোগ চালু করলেন। পশ্চিমঘরের দরজা বন্ধ। তালা অক্ষত। নিচের কাগজটি আর এগোয়নি।
কিন্তু দরজার নিচের হলুদ আলো আবার জ্বলে উঠেছে।
অমিত নতুন বার্তাটির দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।
“কী?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।
অমিত পর্দা ঘুরিয়ে দিল।
অজ্ঞাত প্রেরক
“পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন।
বিশৃঙ্খলা এখন লেখকের নয়।”
বার্তাটি আমার লেখা নয়।
কিন্তু শেষ বাক্যের ছন্দ পরিচিত।
এতটাই পরিচিত যে প্রথমবার মনে হলো, বহু বছর আগে পাণ্ডুলিপিগুলোর জন্য শুধু পথ খুলে রাখিনি।
পথের শেষে কার দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেটিও হয়তো জানতাম।
চলবে...
বিশেষ দ্রষ্টব্য
‘দত্ত পরিবার’ ঐতিহাসিক আবহ, রহস্য, পারিবারিক নাটক ও রোমাঞ্চনির্ভর একটি মৌলিক কাল্পনিক উপন্যাস। চরিত্র, প্রতিষ্ঠান, গোপন কেন্দ্র, পাণ্ডুলিপি, রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, পরিচয়, আসন-মানচিত্র এবং বর্তমান কাহিনির ঘটনাগুলো সৃজনশীল নির্মাণ। বাস্তব ঐতিহাসিক সময়গুলো পৃথক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো চরিত্রের বক্তব্যকে লেখকের চূড়ান্ত রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা যাচাইকৃত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0