ব্যর্থতার পর্দা পেরিয়ে মহানায়ক: উত্তমকুমারের জীবন, অভিনয় ও উত্তরাধিকার
কেরানির চাকরি ও ধারাবাহিক ব্যর্থতা পেরিয়ে উত্তমকুমার কীভাবে বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক হলেন? জানুন তাঁর জীবন, অভিনয়, চলচ্চিত্র ও উত্তরাধিকার।
পাঠকের জন্য সতর্কতা
এই নিবন্ধটি উত্তমকুমারের জীবন ও চলচ্চিত্র-উত্তরাধিকার সম্পর্কে শিক্ষামূলক ও গবেষণাভিত্তিক আলোচনা। তাঁকে ঘিরে প্রচলিত বহু স্মৃতি, সংলাপ, ব্যক্তিগত ঘটনা ও চলচ্চিত্রজগতের গল্পের নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক উৎস পাওয়া কঠিন। তাই এখানে যাচাইযোগ্য তথ্য, বহুল প্রচলিত স্মৃতি এবং বিশ্লেষণ যথাসম্ভব পৃথক রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গ কৌতূহল বা চাঞ্চল্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়, তাঁর জীবনের প্রকাশ্য ও প্রাসঙ্গিক অংশ বোঝার প্রয়োজনে সংযতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোনো কোনো অভিনেতা চরিত্রে অভিনয় করেন। কোনো কোনো অভিনেতা একটি সময়কেই নিজের চরিত্রে পরিণত করেন।
উত্তমকুমার দ্বিতীয় ধরনের অভিনেতা। তাঁর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো, সংযত হাসি, মাপা সংলাপ, বিরতির ভেতর লুকিয়ে রাখা দ্বিধা এবং পর্দার অপর প্রান্তের মানুষের সঙ্গে অদৃশ্য আত্মীয়তা তাঁকে শুধু জনপ্রিয় নায়ক করেনি। তিনি ক্রমে বাঙালির কল্পিত আত্মপ্রতিকৃতির অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
অথচ এই যাত্রার শুরুতে বিজয়ের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। ছিল কেরানির চাকরি, অসমাপ্ত চলচ্চিত্র, একের পর এক ব্যর্থতা, নাম পরিবর্তন এবং আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার মতো মন্তব্য। যাঁকে একসময় বিদ্রূপ করে ব্যর্থতার প্রতীক বানানো হয়েছিল, তিনিই পরে এমন এক তারকায় পরিণত হন, যাঁর অনুপস্থিতিও বাংলা চলচ্চিত্রে আজ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক উপস্থিতি হয়ে আছে।
অরুণ থেকে উত্তম
উত্তমকুমারের জন্মনাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং মা চপলা দেবী। পরিবারের নাট্যচর্চার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। তাঁদের পারিবারিক নাট্যদল ‘সুহৃদ সমাজ’ অভিনয়ের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
অভিনয়ের পাশাপাশি গান, সংগীত ও শরীরচর্চার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। কিন্তু আগ্রহ আর পেশাজীবনের মধ্যে তখন বিস্তর দূরত্ব। পারিবারিক আর্থিক প্রয়োজনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ না করেই তাঁকে কলকাতা পোর্ট কমিশনারের কার্যালয়ে কেরানির চাকরি নিতে হয়। দিনের চাকরির পাশে চলতে থাকে অভিনয়জগতে প্রবেশের চেষ্টা।
একই মানুষের একাধিক নাম
চলচ্চিত্রজীবনের প্রথম পর্যায়ে অরুণ কুমার, অরূপ কুমার, উত্তম চ্যাটার্জি এবং শেষ পর্যন্ত উত্তমকুমার নাম ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। নামের এই পরিবর্তন শুধু প্রচারণার কৌশল ছিল না। এটি এমন একজন সংগ্রামী অভিনেতার পরিচয় অনুসন্ধানেরও চিহ্ন, যিনি বারবার ব্যর্থতার পর নিজের পর্দার পরিচয় পুনর্গঠন করছিলেন।
যে ছবি মুক্তিই পেল না
উত্তমকুমারের অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে ‘মায়াডোর’-এর নাম উল্লেখ করা হয়। ১৯৪৭ সালে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়নি। ফলে দর্শকের সামনে তাঁর আনুষ্ঠানিক আবির্ভাব ঘটে নীতিন বসু পরিচালিত ‘দৃষ্টিদান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, ১৯৪৮ সালে।
শুরুটা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। ‘দৃষ্টিদান’-এর পর ‘কামনা’, ‘মর্যাদা’, ‘সহযাত্রী’সহ তাঁর প্রথম দিকের একাধিক চলচ্চিত্র প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। একজন নতুন অভিনেতার ব্যর্থতা চলচ্চিত্রশিল্পে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা তাঁকে এমন একটি বিদ্রূপাত্মক পরিচয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যা জনপ্রিয় স্মৃতিতে “ফ্লপ মাস্টার জেনারেল” নামে রয়ে গেছে।
ঠিক কে প্রথম এই অভিধা ব্যবহার করেছিলেন অথবা তাঁর কতটি চলচ্চিত্র পরপর ব্যর্থ হয়েছিল, সে বিষয়ে বিভিন্ন বিবরণ রয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: তাঁর প্রাথমিক চলচ্চিত্রজীবন ছিল অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাখ্যানে পূর্ণ। চেহারা, উচ্চারণ, অভিনয়ক্ষমতা এবং পর্দায় গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। পরিচিতজনের অবজ্ঞা এবং স্টুডিওপাড়ার নিরুৎসাহও তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল।
ব্যর্থতা তাঁকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি তাঁকে বুঝতে শিখিয়েছিল যে, শুধু সুদর্শন উপস্থিতি নয়, ক্যামেরার জন্য আলাদা অভিনয়ভাষা নির্মাণ করতে হয়।
মঞ্চের তুলনায় চলচ্চিত্রে অঙ্গভঙ্গি, দৃষ্টি, কণ্ঠ, বিরতি ও মুখের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের গুরুত্ব আলাদা। উত্তমকুমারের পরবর্তী অভিনয়ে যে স্বাভাবিকতা ও সংযম দেখা যায়, তার পেছনে শুরুর এই কঠিন শিক্ষাকালকে উপেক্ষা করা যায় না।
‘বসু পরিবার’: অন্ধকারে প্রথম আলো
১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ উত্তমকুমারের চলচ্চিত্রজীবনে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য নিয়ে আসে। এর আগে দীর্ঘ ব্যর্থতায় ক্লান্ত অভিনেতার সামনে চাকরিতে ফিরে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনাও ছিল। ‘বসু পরিবার’ সেই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পথ বন্ধ করে তাঁকে নতুন করে চলচ্চিত্রে টিকে থাকার ভিত্তি দেয়।
চলচ্চিত্রটি তাঁর চূড়ান্ত তারকাখ্যাতি এনে দেয়নি, কিন্তু প্রমাণ করেছিল যে তিনি দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। পরিচালক ও প্রযোজকেরা তাঁর মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে শুরু করেন। একজন ব্যর্থ অভিনেতার পরিচয়ের নিচে যে পরিশ্রমী ও ক্রমশ পরিণত হতে থাকা অভিনয়শিল্পী ছিলেন, সেই মানুষটি প্রথমবার দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন।
‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এবং এক নতুন জুটির জন্ম
১৯৫৩ সালে নির্মল দে পরিচালিত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মোড় পরিবর্তনকারী ছবি। এই চলচ্চিত্রে উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন প্রথমবার একসঙ্গে পর্দায় উপস্থিত হন। ছবিটির প্রাণশক্তির বড় অংশ এসেছিল তুলসী চক্রবর্তী, মলিনা দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও জহর রায়ের মতো অসাধারণ কৌতুকাভিনেতাদের কাছ থেকে। তবু উত্তম ও সুচিত্রার উপস্থিতি একটি সম্ভাব্য নতুন পর্দাজুটির দিকে দর্শকের দৃষ্টি নিয়ে যায়।
পরের বছর, ১৯৫৪ সালে ‘অগ্নিপরীক্ষা’র বিপুল সাফল্য সেই সম্ভাবনাকে সাংস্কৃতিক ঘটনায় রূপান্তরিত করে। উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন আর শুধু দুই অভিনেতা থাকলেন না। তাঁরা বাঙালির রোমান্টিক কল্পনার সম্মিলিত মুখ হয়ে উঠলেন।
উত্তম-সুচিত্রা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
সদ্য স্বাধীন ও দেশভাগে ক্ষতবিক্ষত বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ তখন নতুন পরিচয়, নতুন নাগরিকতা এবং নতুন ব্যক্তিগত স্বপ্নের সন্ধানে ছিল। উত্তম-সুচিত্রার পর্দার সম্পর্ক সেই সমাজকে এমন এক প্রেমের ভাষা দিয়েছিল, যেখানে আকর্ষণের সঙ্গে ভদ্রতা, দ্বিধার সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বিচ্ছেদের সঙ্গে পুনর্মিলনের আশা ছিল।
‘শাপমোচন’, ‘সাগরিকা’, ‘সবার উপরে’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘সপ্তপদী’ ও ‘বিপাশা’র মতো চলচ্চিত্র তাঁদের জুটিকে প্রজন্মের স্মৃতিতে স্থায়ী করে। তাঁদের সাফল্য শুধু দুই তারকার ব্যক্তিগত রসায়নের ফল ছিল না। গল্প, সংগীত, কণ্ঠ, ক্যামেরা, পোশাক, সামাজিক টানাপোড়েন এবং সমকালীন দর্শকের প্রত্যাশা একসঙ্গে সেই পর্দার প্রেম নির্মাণ করেছিল।
রোমান্টিক নায়ক, কিন্তু শুধু রোমান্টিক নন
শুধু রোমান্টিক নায়ক হিসেবে উত্তমকুমারকে মনে রাখলে তাঁর অভিনয়ক্ষমতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। জনপ্রিয় প্রেমের চলচ্চিত্র তাঁকে তারকা বানালেও তিনি বারবার নিজের পরিচিত পর্দার ছবি থেকে বেরিয়ে ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
‘ঝিন্দের বন্দী’তে ক্ষমতা ও পরিচয়ের দ্বন্দ্ব, ‘বিচারক’-এ অপরাধবোধ ও নৈতিক সংকট, ‘নায়ক’-এ তারকাখ্যাতির ভেতরের ভয়, ‘চিড়িয়াখানা’য় অনুসন্ধানী ব্যোমকেশ, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’তে সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সংঘর্ষ, ‘চৌরঙ্গী’তে নগরজীবনের পেশাদার সৌজন্য, ‘অগ্নীশ্বর’-এ কঠোর মানবিকতা এবং ‘সন্ন্যাসী রাজা’য় দ্বৈত পরিচয়ের নাটকীয়তা তাঁর অভিনয়ের বিস্তার দেখায়।
তাঁর অভিনয়ের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ক্যামেরার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক। তিনি অনেক সময় সংলাপের চেয়ে দৃষ্টি, অল্প হাসি, গলার স্বরের ওঠানামা অথবা নীরবতার মাধ্যমে চরিত্রের ভেতরের পরিবর্তন প্রকাশ করতেন। সেই অভিনয় একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও সূক্ষ্ম হতে পারত। দর্শক তাঁর চরিত্রকে দূরের দেবতা হিসেবে শুধু পূজা করত না, নিজের মতো একজন মানুষ হিসেবেও অনুভব করত।
সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’: তারকার মুখের আড়ালে মানুষ
১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ উত্তমকুমারের অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। এখানে তিনি অরিন্দম মুখার্জি নামের একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্রতারকার ভূমিকায় অভিনয় করেন। দিল্লিগামী ট্রেনে এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে অরিন্দমের সাফল্য, ভয়, অপরাধবোধ, আপস এবং অনিরাপত্তা প্রকাশ পায়।
চরিত্রটি উত্তমকুমারের সরাসরি জীবনী নয়। তবু তাঁর বাস্তব তারকাসত্তা ছাড়া ‘নায়ক’-এর শিল্পগত প্রভাব একই রকম হতো কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। দর্শক একদিকে অরিন্দমকে দেখেছে, অন্যদিকে অরিন্দমের মুখের ওপর উত্তমকুমারের পরিচিত তারকাছবিও অনুভব করেছে। এই দ্বৈততা চলচ্চিত্রটিকে এক অসাধারণ গভীরতা দেয়।
‘নায়ক’ প্রমাণ করেছিল, উত্তমকুমারের তারকাখ্যাতি তাঁর অভিনয়ের বাধা ছিল না। একজন দক্ষ চলচ্চিত্রকারের হাতে সেই খ্যাতিই চরিত্রের মনস্তত্ত্বের উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে উত্তমকুমারের দ্বিতীয় মুক্তিপ্রাপ্ত কাজ ছিল ১৯৬৭ সালের ‘চিড়িয়াখানা’। সেখানে তিনি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। এই দুটি চলচ্চিত্রের অভিনয় তাঁর বহুমাত্রিকতা এবং জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের বাইরে ভিন্ন নির্মাণভাষায় মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা স্পষ্ট করে।
উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: তুলনা, পার্থক্য ও সম্মান
বাংলা চলচ্চিত্রের আলোচনায় উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রায়ই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এই তুলনার বড় অংশ দর্শক, সংবাদমাধ্যম এবং দুই ধরনের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির তৈরি। উত্তমকুমার ছিলেন বাংলা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের সর্ববৃহৎ তারকা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রসহ সাহিত্যনির্ভর ও ভিন্নধারার অভিনয়ে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণ করেছিলেন।
তাঁদের অভিনয়ভাষা, তারকাসত্তা ও চলচ্চিত্র নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য ছিল। তবু পার্থক্য মানেই ব্যক্তিগত বিরোধ নয়। দুই অভিনেতার প্রকাশিত স্মৃতিচারণ এবং সাক্ষাৎকার তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানের ইঙ্গিত দেয়। তাঁরা কয়েকটি চলচ্চিত্রে একসঙ্গে অভিনয়ও করেছেন। ফলে তাঁদের সম্পর্ককে ব্যক্তিগত সংঘাতের বদলে বাংলা চলচ্চিত্রের দুই শক্তিশালী অভিনয়ধারার সহাবস্থান হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত।
হিন্দি চলচ্চিত্রে অসম যাত্রা
বাংলা চলচ্চিত্রে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও হিন্দি চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের যাত্রা একই রকম মসৃণ ছিল না। বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে তাঁর উচ্চাভিলাষী হিন্দি চলচ্চিত্র ‘ছোটি সি মুলাকাত’ ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায়। এটি বাংলা ‘অগ্নিপরীক্ষা’র কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত হলেও প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। ছবিটির আর্থিক ব্যর্থতা উত্তমকুমারের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছিল বলে তাঁর জীবন ও চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণায় আলোচনা রয়েছে।
শক্তি সামন্ত পরিচালিত দ্বিভাষিক চলচ্চিত্র ‘অমানুষ’ তাঁর হিন্দি চলচ্চিত্রজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যগুলোর একটি। মধুসূদন রায়চৌধুরীর ভাঙন, অপমান ও ফিরে আসার গল্পে উত্তমকুমার তাঁর রোমান্টিক পরিচয়ের বাইরে আবেগপূর্ণ ও সংকটময় চরিত্র নির্মাণ করেন। বাংলা ও হিন্দি উভয় ভাষায় চলচ্চিত্রটির গ্রহণযোগ্যতা তাঁর অভিনয়কে বৃহত্তর ভারতীয় দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
রাজ কাপুরের ‘সঙ্গম’সহ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণ ও সংবাদভিত্তিক জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে প্রতিটি প্রস্তাবের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে সব উৎস একমত নয়। তাঁর কেন্দ্রীয় কর্মপরিসর যে বাংলা চলচ্চিত্রই ছিল, এ নিয়ে অবশ্য সন্দেহ নেই।
পর্দার বাইরের সৃজনশীল মানুষ
উত্তমকুমার শুধু অভিনেতা ছিলেন না। তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা, পরিচালনা, চিত্রনাট্য, সংগীত পরিচালনা ও গানেও যুক্ত ছিলেন। ‘শুধু একটি বছর’, ‘বনপলাশীর পদাবলী’ এবং ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’র মতো কাজে তাঁর বহুমুখী অংশগ্রহণ দেখা যায়। এই কাজগুলো দেখায়, চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ক্যামেরার সামনে উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের সহকর্মী, কলাকুশলী ও আর্থিক সংকটে থাকা শিল্পীদের সহায়তায় তাঁর ভূমিকার কথাও স্মৃতিচারণে আসে। তিনি ‘শিল্পী সংসদ’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অনুষ্ঠান আয়োজন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমে অসচ্ছল শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর তারকাখ্যাতি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়, শিল্পীসমাজকে সংগঠিত ও সহায়তা করার কাজেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
ব্যক্তিগত জীবনের আলো ও অস্বস্তি
উত্তমকুমার গৌরী দেবীকে বিয়ে করেছিলেন এবং তাঁদের একটি পুত্রসন্তান ছিল। জীবনের পরবর্তী দীর্ঘ সময় তিনি অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে বসবাস করেন। তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে বহু স্মৃতিকথা, সংবাদ, গুঞ্জন এবং আবেগপূর্ণ বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে।
একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ্য জীবন বুঝতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছু অংশ প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে সেই জীবনকে শুধু সম্পর্কের নাটক, গুজব কিংবা নৈতিক বিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা অন্যায়। উত্তমকুমারের পারিবারিক জীবন ছিল জটিল এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব মর্যাদা ও অভিজ্ঞতা ছিল। তাই নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া ব্যক্তিগত কথোপকথন, উদ্দেশ্য বা ঘরোয়া ঘটনার নাটকীয় বর্ণনা ইতিহাস হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
জাতীয় স্বীকৃতি
১৯৬৭ সালের চলচ্চিত্রের জন্য প্রবর্তিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে উত্তমকুমার প্রথম বিজয়ী হন। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’য় তাঁর অভিনয়ের জন্য তিনি এই সম্মান অর্জন করেন। সে সময় পুরস্কারটি ‘ভারত পুরস্কার’ নামে পরিচিত ছিল।
পুরোনো জনপ্রিয় লেখায় কখনো পদ্মশ্রী এবং জাতীয় পুরস্কারকে একসঙ্গে মিশিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাষ্ট্রীয় সম্মান। উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে উল্লেখযোগ্য হলো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার প্রথম সম্মান। যাচাইকৃত সরকারি নথি ছাড়া তাঁর নামের সঙ্গে পদ্মশ্রী যুক্ত করা উচিত নয়।
১৯৫২: বসু পরিবার
১৯৫৩: সাড়ে চুয়াত্তর
১৯৫৪: অগ্নিপরীক্ষা
১৯৫৭: হারানো সুর
১৯৬১: সপ্তপদী, ঝিন্দের বন্দী
১৯৬৬: নায়ক
১৯৬৭: চিড়িয়াখানা, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি
১৯৬৮: চৌরঙ্গী
১৯৭৪: অমানুষ
১৯৭৫: অগ্নীশ্বর, সন্ন্যাসী রাজা
নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র
শেষ শুটিং, শেষ যাত্রা
১৯৮০ সালের জুলাইয়ে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে উত্তমকুমার অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে তাঁকে কলকাতার একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
২৪ জুলাই ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স তখন ৫৩ বছর। জীবনের ৫৪তম বছরে থাকা এই মানুষটির আকস্মিক মৃত্যু বাংলা চলচ্চিত্রজগৎ ও দর্শকের কাছে গভীর আঘাত হয়ে আসে। তাঁর শেষযাত্রায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখিয়েছিল, একজন চলচ্চিত্রতারকা কীভাবে দর্শকের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারেন।
কেন আজও মহানায়ক?
উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর চার দশকের বেশি সময় পেরিয়েছে। তবু টেলিভিশন, চলচ্চিত্র উৎসব, পুনঃপ্রদর্শন, ডিজিটাল মাধ্যম ও পারিবারিক স্মৃতির মধ্য দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছাতে থাকে। ঠাকুমা, মা, মেয়ে কিংবা নাতনির প্রজন্ম একই চলচ্চিত্র আলাদা অভিজ্ঞতা নিয়ে দেখতে পারে। এই প্রজন্মান্তরের দর্শক-সম্পর্কই তাঁর তারকাখ্যাতিকে শুধু অতীতের স্মৃতি হতে দেয়নি।
কলকাতার টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের নাম তাঁর সম্মানে “মহানায়ক উত্তমকুমার” রাখা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির শিল্পীদের সম্মান জানাতে “মহানায়ক সম্মান”ও প্রবর্তন করেছে। কিন্তু সরকারি নামকরণ বা পুরস্কারের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় স্মারক রয়ে গেছে দর্শকের ভাষায়।
ভালো পোশাক, মাপা উচ্চারণ, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো, ঠোঁটের কোণে হাসি এবং পর্দায় প্রেম প্রকাশের নিজস্ব ভঙ্গি তাঁর সাংস্কৃতিক প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছে। তবে এই বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের নিচে ছিল কঠোর অনুশীলন, ব্যর্থতা থেকে শেখার ক্ষমতা এবং চরিত্রের মধ্যে নিজের তারকাছবিকে ভেঙে ফেলার সাহস।
অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় যখন স্টুডিওর দরজায় দাঁড়াতেন, তখন কেউ জানত না এই সংগ্রামী কেরানি একদিন বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে উঠবেন। তাঁর প্রথম ছবি মুক্তি পায়নি। পরের ছবিগুলোও তাঁকে সাফল্য দেয়নি। তাঁর অভিনয় নিয়ে হাসাহাসি হয়েছে, নাম বদলেছে, আত্মবিশ্বাস ভেঙেছে।
তবু তিনি থামেননি। ক্যামেরার সামনে নিজের শরীর, কণ্ঠ, দৃষ্টি ও নীরবতাকে নতুন করে শিখেছেন। ব্যর্থতার প্রতিটি স্তর থেকে কিছু শুষে নিয়ে তিনি এমন অভিনয়ভাষা নির্মাণ করেছেন, যেন মানুষটি সত্যিই নিন্দা, প্রশংসা, অপমান ও সম্মান সবকিছুকে ধারণ করতে পারতেন।
সেই কারণেই উত্তমকুমার শুধু সফল নায়ক নন। তিনি বাঙালির কাছে ব্যর্থতার পরেও নিজেকে পুনর্নির্মাণ করার এক স্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রতীক। মহানায়ক তাঁর উপাধি, কিন্তু ফিরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
১. National Film Awards, Government of India. জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ইতিহাস, বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বিষয়ে সরকারি সংগ্রহ। ২. Cinemaazi. “Uttam Kumar.” জন্ম, পারিবারিক নাট্যচর্চা, পোর্ট কমিশনারের দপ্তরে চাকরি, প্রাথমিক চলচ্চিত্র, ‘বসু পরিবার’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এবং উত্তম-সুচিত্রা জুটির বিকাশ নিয়ে জীবনী ও চলচ্চিত্র-ইতিহাস। ৩. British Film Institute. “Nayak (1966).” সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রটির নির্মাণ, অভিনয়শিল্পী ও মৌলিক তথ্য। ৪. BFI Collections Search. “Nayak.” চলচ্চিত্রটির মুক্তির সাল, পরিচালক, চিত্রনাট্য, প্রযোজনা ও অভিনয়শিল্পীর সংগ্রহভিত্তিক তথ্য। ৫. Chowdhury, Sayandeb. Uttam Kumar: A Life in Cinema. Bloomsbury India, 2021. উত্তমকুমারের তারকাসত্তা, ব্যর্থতার পর্যায়, অভিনয়, জনপ্রিয়তা ও বাংলা সংস্কৃতিতে তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ।
৬. Frontline. উত্তমকুমারের তারকাসত্তা, বাংলা চলচ্চিত্রের পরিবর্তন, উত্তম-সুচিত্রা জুটি এবং পরবর্তী সময়ের বৈচিত্র্যময় চরিত্র নিয়ে চলচ্চিত্র-ইতিহাসভিত্তিক বিশ্লেষণ। ৭. Frontline. “‘Nayak’ and the Face of Modernity.” সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের তারকাসত্তা, অভিনয় ও আধুনিকতার সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণ। সম্পাদকীয় নোট: পুরোনো নিবন্ধের অসমর্থিত প্রত্যক্ষ উদ্ধৃতি, পদ্মশ্রী-সংক্রান্ত দাবি, নির্দিষ্ট বেতন, ব্যক্তিগত জীবনের অনির্ভরযোগ্য ঘটনা এবং ব্যর্থ চলচ্চিত্রের অস্পষ্ট সংখ্যা বাদ বা সংশোধন করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের নাম বাংলা প্রচলিত বানান অনুসারে দেওয়া হয়েছে।
ব্যর্থতার নাম মুছে যে মানুষটি নিজেই নাম হয়ে উঠলেন
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
https://nfaindia.org/
https://www.cinemaazi.com/people/uttam-kumar
https://www.bfi.org.uk/film/4558c2dd-c432-5900-a6d3-9bfa0ed44871/nayak
https://collections-search.bfi.org.uk/web/Details/ChoiceFilmWorks/150033600
https://frontline.thehindu.com/arts-and-culture/cinema/uttam-kumar-bengali-stardom-dual-roles/article71395789.ece
https://frontline.thehindu.com/arts-and-culture/cinema/uttam-kumar-nayak-modernity-satyajit-ray/article71399757.ece
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0