বর্ণপরিচয় থেকে বিধবা বিবাহ: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের লড়াই
বর্ণপরিচয়, বাংলা গদ্য, নারীশিক্ষা, বিধবা বিবাহ, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহবিরোধী আন্দোলনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ঐতিহাসিক অবদান।
ইতিহাস • শিক্ষা • সমাজসংস্কার
বর্ণপরিচয় থেকে বিধবা বিবাহ: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের লড়াই
শিশুর হাতে অক্ষরপরিচয়ের বই তুলে দেওয়া এবং প্রাপ্তবয়স্ক সমাজের সামনে তার নিষ্ঠুর প্রথাগুলো উন্মোচন করা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনে এই দুটি কাজ ছিল একই মানবিক সংগ্রামের অংশ।
সম্পাদকীয় নোট: আব্দুল্লাহ আল মাসুদ রচিত নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল The BackSpace Journal-এ। ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত সংস্করণ থেকে পাঠ্যটি পুনরুদ্ধার করে মুদ্রণ ও অক্ষর শনাক্তকরণজনিত বিকৃতি সংশোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যের উপস্থাপন, অনুচ্ছেদবিন্যাস, কালগত অসামঞ্জস্য এবং কয়েকটি অতিরঞ্জিত ঐতিহাসিক দাবি পরিমার্জন করা হয়েছে। লেখকের মূল বক্তব্য, বিশ্লেষণধর্মী স্বর ও বৌদ্ধিক মালিকানা সংরক্ষিত রয়েছে।
বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক অনন্য নাম। তাঁকে শুধু সংস্কৃত পণ্ডিত, লেখক কিংবা শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে তাঁর কর্মজীবনের পূর্ণ ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন সমাজসংস্কারক, মানবতাবাদী এবং জনহিতৈষী। বাংলা ভাষা ও শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ থেকে শুরু করে বিধবা বিবাহের আইনি স্বীকৃতি, নারীশিক্ষার প্রসার এবং বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে জনমত গঠন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র।
তাঁর জীবনকে একক কোনো পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। শিশুর হাতে তিনি তুলে দিয়েছিলেন বর্ণপরিচয়; আবার প্রাপ্তবয়স্ক সমাজের সামনে তুলেছিলেন এমন কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর দিতে গেলে প্রচলিত সামাজিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং পুরুষতান্ত্রিক সুবিধার কাঠামোকে নতুন করে বিচার করতে হয়। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল কেবল অক্ষরজ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া নয়, বরং মানুষের যুক্তিবোধ ও নৈতিক বিবেচনাশক্তি বিকাশের একটি উপায়।
দরিদ্র পরিবার থেকে ‘বিদ্যাসাগর’
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে একটি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা ভগবতী দেবী। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও পরিবার তাঁর শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা করেছিল।
১৮২৯ সালে তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলংকারশাস্ত্র, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায়শাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, হিন্দু আইন এবং ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। অসাধারণ মেধা, অধ্যবসায় ও বহুমুখী পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন। বিদ্যার সাগর অর্থে ব্যবহৃত এই উপাধিই পরে তাঁর ব্যক্তিগত নামকে প্রায় আড়াল করে দেয়।
বিদ্যাসাগরের দারিদ্র্য ও অধ্যবসায়কে কেন্দ্র করে বহু জনপ্রিয় কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। তবে প্রতিটি লোকপ্রিয় গল্পকে সমানভাবে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, বৃত্তি, পরীক্ষার ফলাফল এবং পরবর্তী কর্মজীবনের নথিভুক্ত তথ্যই তাঁর অসাধারণ শ্রম ও মেধার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য।
সংস্কৃত কলেজের পাঠ শেষ করার পর তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে ইউরোপীয় রাজকর্মচারীদের বাংলা ভাষা শেখানো হতো। পরে তিনি সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শিক্ষা যখন সংস্কারের হাতিয়ার
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে বিদ্যাসাগর কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি পাঠ্যক্রম, শিক্ষাদান-পদ্ধতি, ভর্তি-নীতি এবং ছুটির ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনেন। প্রাচীন জ্ঞানের সঙ্গে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সমকালীন যুক্তিবিদ্যার সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা ছিল তাঁর শিক্ষাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংস্কৃত শিক্ষাকে সমাজের নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাকে তুলনামূলকভাবে ব্যবহারিক করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর দৃষ্টিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ শুধু পুরোনো জ্ঞান সংরক্ষণ নয়; পরিবর্তিত সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করাও তার দায়িত্ব।
বিদ্যাসাগরের কাছে শিক্ষা ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জ্ঞানকে অন্ধভাবে বহন করা নয়; বরং কোন জ্ঞান মানুষের কাজে লাগছে, কোনটি তাকে মুক্ত করছে এবং কোনটি তাকে স্থবির রাখছে, সেই প্রশ্ন উত্থাপনের ক্ষমতা।
বাংলা গদ্যের নির্মাণে বিদ্যাসাগর
বিদ্যাসাগরের অধিকাংশ রচনা শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের প্রয়োজনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। তাঁর লেখা প্রচলিত অর্থে কল্পনাপ্রধান সাহিত্য না হলেও এই ব্যবহারিক উদ্দেশ্য তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্ব কমায় না। পাঠ্যপুস্তক, অনুবাদ, অভিযোজন এবং সমাজসংস্কারমূলক প্রস্তাবের মধ্য দিয়েই তাঁর স্বতন্ত্র গদ্যরীতি বিকশিত হয়েছিল।
তাঁর প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর একটি বেতালপঞ্চবিংশতি। সংস্কৃত কথাসরিৎসাগর-এর বেতালকাহিনি এবং তার প্রচলিত হিন্দি রূপের সহায়তায় তিনি বইটি বাংলায় রূপান্তর ও পরিমার্জন করেন। ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটিতে বেতাল রাজা বিক্রমাদিত্যকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উপাখ্যান শোনায়।
এসব উপাখ্যানের চরিত্র কাল্পনিক হলেও তাদের প্রেম, লোভ, ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা, প্রতিশ্রুতি, বাৎসল্য এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব মানবজীবনের পরিচিত অভিজ্ঞতা থেকে নির্মিত। তাই পাঠ্যপুস্তক রচনার উদ্দেশ্য প্রধান হলেও গ্রন্থটির সাহিত্যরস উপেক্ষা করা যায় না।
বাংলা গদ্যে বিরামচিহ্নের কোনো ব্যবহারই বিদ্যাসাগরের আগে ছিল না, এমন চূড়ান্ত দাবি ঐতিহাসিকভাবে অতিরঞ্জিত। তবে বাক্যের অর্থ, ছন্দ, বিরতি ও পাঠযোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যতিচিহ্ন ব্যবহারে তিনি যে শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা এনেছিলেন, তা বাংলা গদ্যের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর গদ্যের শক্তি শুধু শব্দের সৌন্দর্যে ছিল না। পাঠক কোথায় থামবেন, কোথায় বাক্যের অর্থ বদলাবে এবং কীভাবে একটি ভাব থেকে পরবর্তী ভাবে প্রবেশ করবেন, সেই পথও তাঁর বাক্যবিন্যাস তৈরি করে দিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গদ্যের মধ্যে যে প্রায় অদৃশ্য ছন্দপ্রবাহ লক্ষ্য করেছিলেন, তা এই পরিমিতি ও বাক্যশৃঙ্খলার দিকেই ইঙ্গিত করে।
বেতালপঞ্চবিংশতি ছাড়াও শেক্সপিয়রের The Comedy of Errors অবলম্বনে রচিত ভ্রান্তিবিলাস তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনার মধ্যে রয়েছে বোধোদয়, জীবনচরিত, ঋজুপাঠ, ব্যাকরণ কৌমুদী, শকুন্তলা, সীতার বনবাস, কথামালা এবং আখ্যানমঞ্জরী।
বর্ণপরিচয়: অক্ষর শেখানোর মধ্যে যে দর্শন
শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজ বর্ণপরিচয়। বাংলা ভাষা পড়তে ও লিখতে শেখার জন্য রচিত এই গ্রন্থের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি শুধু একটি বর্ণমালা-পরিচায়ক ছিল না; এর মধ্যে ভাষা শেখানোর একটি পরিকল্পিত পদ্ধতি কাজ করেছিল।
প্রথমে বর্ণ, তারপর শব্দ, শব্দগুচ্ছ, ছোট বাক্য, তুলনামূলক বড় বাক্য এবং শেষে অনুচ্ছেদ, এই ধারাবাহিকতায় পাঠ এগিয়ে যায়। প্রথম ভাগে যুক্তাক্ষরবিহীন শব্দকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ভাগে শিক্ষার্থীর সামনে যুক্তাক্ষর ও অপেক্ষাকৃত জটিল শব্দ হাজির হয়। অর্থাৎ শিশুকে শুরুতেই ভাষার সমস্ত জটিলতার মুখোমুখি না করে ধাপে ধাপে প্রস্তুত করা হয়েছে।
বর্ণপরিচয়ের শিক্ষণ-পদ্ধতির মূল ধাপ
১. পরিচিত ও স্বতন্ত্র বর্ণ শনাক্ত করা
২. বর্ণের সমন্বয়ে সহজ শব্দ তৈরি করা
৩. শব্দ থেকে ছোট ও অর্থপূর্ণ বাক্যে যাওয়া
৪. বাক্যের দৈর্ঘ্য ও গঠন ধীরে ধীরে বাড়ানো
৫. অনুচ্ছেদ ও ধারাবাহিক পাঠের মাধ্যমে বোধগম্যতা তৈরি করা
এ পদ্ধতির গুরুত্ব শুধু শিশু দ্রুত পড়তে শিখবে কি না, তাতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিশুর ওপর জটিলতা চাপিয়ে না দিয়ে তার শেখার সক্ষমতাকে ধাপে ধাপে গড়ে তোলে। পরিচিত উপাদান থেকে অপরিচিত উপাদানের দিকে অগ্রসর হওয়ার এই নীতির কারণে বর্ণপরিচয় বাংলা শিশুশিক্ষার ইতিহাসে স্থায়ী স্থান অর্জন করেছে।
বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালা ও মুদ্রণরীতিকেও অধিক যুক্তিসংগত ও ব্যবহারোপযোগী করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আধুনিক বাংলা বর্ণমালার সম্পূর্ণ নির্মাণ একা তাঁর হাতে হয়েছে, এমন দাবি করা ঠিক হবে না। বাংলা লিপি ও মুদ্রণরীতির বিকাশ ছিল দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে বিদ্যালয়শিক্ষার উপযোগী, সুশৃঙ্খল ও সহজবোধ্য করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বিধবা বিবাহ: সমাজ ও শাস্ত্রের মুখোমুখি
উনিশ শতকের হিন্দু সমাজে বহু মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হতো। স্বামীর মৃত্যু হলে তাদের একটি বড় অংশকে দীর্ঘ বৈধব্য, সামাজিক নিঃসঙ্গতা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে হতো। পুনর্বিবাহের সামাজিক সুযোগ প্রায় অনুপস্থিত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে যে মেয়েটিকে বিধবা হিসেবে জীবন কাটাতে বাধ্য করা হচ্ছিল, সে তখনো প্রাপ্তবয়স্কই হয়নি।
বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের পক্ষে শুধু আবেগনির্ভর আবেদন করেননি। তিনি শাস্ত্র, বিশেষ করে পরাশর সংহিতাসহ প্রাসঙ্গিক ধর্মীয় গ্রন্থ পরীক্ষা করে দেখানোর চেষ্টা করেন যে বিধবার পুনর্বিবাহকে সম্পূর্ণ শাস্ত্রবিরুদ্ধ বলার দাবি টেকসই নয়। তাঁর কৌশল ছিল সমাজের গ্রহণযোগ্য যুক্তিকাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে সেই কাঠামোর অসংগতি প্রকাশ করা।
তিনি ১৮৫৫ সালে বিধবা বিবাহের পক্ষে প্রস্তাব প্রকাশ করেন এবং আইন প্রণয়নের দাবিতে আবেদন সংগঠিত করেন। অন্যদিকে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের একটি শক্তিশালী অংশ এর বিরোধিতা করে পাল্টা আবেদন জানায়। এই বিরোধিতা প্রমাণ করে, সংস্কারটি কেবল একটি পারিবারিক রীতির প্রশ্ন ছিল না। এর সঙ্গে পুরুষের সামাজিক কর্তৃত্ব, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি, বংশধারা এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার ক্ষমতাও যুক্ত ছিল।
১৮৫৬ সালের হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহকে আইনগত বৈধতা দেয় এবং এমন বিবাহ থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানকে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে আইনটি বিধবার জীবনের সব বৈষম্য দূর করেনি। পুনর্বিবাহের ফলে মৃত স্বামীর সম্পত্তির ওপর বিধবার নির্দিষ্ট অধিকার হারানোর মতো শর্তও এতে ছিল। তাই আইনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, কিন্তু পূর্ণ সামাজিক মুক্তি নয়।
আইনটি কী পরিবর্তন করেছিল?
বিদ্যাসাগরের প্রচারাভিযান ১৮৫৬ সালের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে আইনটি তিনি এককভাবে প্রণয়ন বা কার্যকর করেছিলেন, এমনভাবে ইতিহাস উপস্থাপন করা যথাযথ নয়। তাঁর লেখালেখি, আবেদন, শাস্ত্রভিত্তিক যুক্তি ও জনমত গঠনের প্রচেষ্টা ঔপনিবেশিক আইন পরিষদের সিদ্ধান্তকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছিল।
আইন পাস হওয়ার পরও সামাজিক বাধা দূর হয়নি। বিধবা বিবাহ আয়োজনে পরিবার ও ব্যক্তিকে বিরোধিতা, সামাজিক বর্জন এবং আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হতো। বিদ্যাসাগর নিজে কয়েকটি বিবাহ আয়োজনে সহায়তা করেন এবং আর্থিক দায়ও গ্রহণ করেন। তাঁর অবস্থান তাই কেবল তাত্ত্বিক সমর্থনে সীমাবদ্ধ ছিল না।
বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রশ্ন
বিধবা বিবাহের পাশাপাশি বিদ্যাসাগর বহুবিবাহ এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও লিখেছিলেন। বিশেষত কুলীন বহুবিবাহের ফলে কোনো কোনো পুরুষ বহু নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও স্ত্রীদের ভরণপোষণ, সহবাস কিংবা পারিবারিক নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করত না। সামাজিক মর্যাদা ও বংশপরিচয়ের নামে এই প্রথা নারীর জীবনকে অনিশ্চিত ও অবমাননাকর করে তুলেছিল।
বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক বিচার গ্রন্থে তিনি বহুবিবাহের সামাজিক ক্ষতি এবং এর পক্ষে ব্যবহৃত যুক্তির দুর্বলতা বিশ্লেষণ করেন। তাঁর লেখায় যুক্তি, তথ্য, শাস্ত্রব্যাখ্যা ও তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ পাশাপাশি কাজ করেছে। যাঁরা ধর্মের নামে একটি সুবিধাজনক সামাজিক প্রথাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, তাঁদের বক্তব্যকে তিনি তাঁদেরই গ্রহণযোগ্য যুক্তির ভাষায় প্রশ্ন করেছিলেন।
বাল্যবিবাহের বিরোধিতাও তাঁর নারীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহ আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। অল্প বয়সে বিয়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্ব, শিক্ষার সুযোগ হারানো এবং স্বামী মারা গেলে শিশুবিধবার জীবন, এসব ছিল একই সামাজিক ব্যবস্থার পরস্পরসংযুক্ত ফল।
১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইনকে সরাসরি বিদ্যাসাগরের একক সাফল্য কিংবা বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ রহিতকারী আইন হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। আইনটির পরিসর সীমিত ছিল এবং তা সব সম্প্রদায় বা সব বিবাহের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয়নি। বিদ্যাসাগরের বড় অবদান ছিল এসব প্রথার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী বৌদ্ধিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা।
নারীশিক্ষা ছাড়া সমাজের অগ্রগতি অসম্ভব
বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করেছিলেন, নারীকে অশিক্ষার মধ্যে রেখে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিদ্যালয় পরিদর্শন ও শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলা মাধ্যমে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন।
তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন জেলায় বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিদ্যালয়ের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন জীবনী ও গবেষণায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তাই একটিমাত্র সংখ্যাকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে বলা অধিক যুক্তিসংগত যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে কয়েক ডজন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করাই ছিল না একমাত্র চ্যালেঞ্জ। পরিবারকে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে রাজি করানো, শিক্ষিকার ব্যবস্থা করা, পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা এবং নিয়মিত অর্থসংস্থান নিশ্চিত করা ছিল কঠিন কাজ। সরকারি সহায়তা অনিশ্চিত হয়ে পড়লে তিনি ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করেন এবং বিদ্যালয়গুলো সচল রাখার চেষ্টা করেন।
বেথুন স্কুলের সঙ্গেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। নারীশিক্ষার প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে তিনি প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত সহায়তা দেন। তবে বেথুন স্কুল তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এমন দাবি সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানটির সূচনা জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের উদ্যোগে হয়েছিল; বিদ্যাসাগর পরে এর পরিচালনা ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন ও শিক্ষার স্বাধীনতা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন বিদ্যাসাগরের অন্যতম বড় কীর্তি। প্রতিষ্ঠানটির বিকাশ কয়েকটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে ঘটেছিল এবং বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে এটি নতুন পরিচয় ও সংগঠন লাভ করে। পরে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হলে প্রতিষ্ঠানটি কলেজে উন্নীত হয়। বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ সেই ঐতিহাসিক ধারার উত্তরসূরি।
এই প্রতিষ্ঠান তাঁর শিক্ষাদর্শের একটি বাস্তব রূপ। শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ শুধু ঔপনিবেশিক প্রশাসন বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর হাতে না রেখে দেশীয় উদ্যোগে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের সম্ভাবনা এখানে প্রকাশিত হয়েছিল।
পত্রিকা, জনমত ও সাংস্কৃতিক পরিসর
পত্রিকা ও জনপরিসরের সঙ্গেও বিদ্যাসাগরের সম্পর্ক ছিল। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, সোমপ্রকাশ, Hindu Patriot এবং সমসাময়িক অন্যান্য সাময়িকপত্রের বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তিনি বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে সব পত্রিকায় তিনি একই ধরনের সম্পাদকীয় পদে ছিলেন, এমন ধারণা সঠিক নয়। কোথাও তিনি লেখক, কোথাও পৃষ্ঠপোষক, কোথাও পরামর্শদাতা কিংবা চিন্তাগত সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁর সামাজিক আন্দোলন বুঝতে হলে এই সাময়িকপত্রের জগৎকে গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ আইন পরিষদে প্রস্তাব ওঠার আগেই সমাজে প্রশ্নটি দৃশ্যমান করতে হতো। প্রবন্ধ, পুস্তিকা, আবেদন, পাল্টা আবেদন এবং সংবাদপত্রের বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষা ও বহুবিবাহের প্রশ্ন জনপরিসরে প্রবেশ করেছিল।
দয়ার সাগর, কিন্তু শুধু দয়ার মানুষ নন
দানশীলতা ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিদ্যাসাগর ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিত হন। দরিদ্র শিক্ষার্থী, অসহায় পরিবার, বিপদগ্রস্ত লেখক ও শিল্পীসহ বহু মানুষ তাঁর সহায়তা পেয়েছেন। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই মানবিক সহায়তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি।
কিন্তু তাঁকে শুধু দয়ালু মানুষ হিসেবে দেখলে তাঁর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল হয়ে যায়। তাঁর মানবিকতা ছিল সক্রিয় এবং সংঘাতময়। তিনি কেবল ব্যক্তিগত দান করেননি; যে সামাজিক ব্যবস্থা মানুষকে অসহায় করে তুলেছিল, তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছিলেন।
“দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্রের চরিত্রের প্রধান গৌরব ছিল তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্যাসাগরচরিত
উদ্ধৃতিটির ‘পৌরুষ’ শব্দকে শুধু লিঙ্গগত অর্থে বুঝলে রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নের ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়। এখানে তা দৃঢ়তা, নৈতিক সাহস এবং প্রতিকূলতার সামনে মাথা না নোয়ানোর অর্থে ব্যবহৃত। বিদ্যাসাগরের মনুষ্যত্ব ছিল অনুভূতির পাশাপাশি সিদ্ধান্ত ও কর্মের মনুষ্যত্ব।
বিদ্যাসাগরকে আজও কেন প্রয়োজন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর কাজকে শুধু উনিশ শতকের ইতিহাস হিসেবে পড়লে তার বর্তমান তাৎপর্য ধরা পড়ে না। তিনি দেখিয়েছিলেন, ভাষার সংস্কার, শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের লড়াই পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়।
যে শিশু নিজের ভাষায় স্পষ্টভাবে পড়তে ও ভাবতে শেখে, সে একদিন সমাজের প্রতিষ্ঠিত দাবিকেও প্রশ্ন করতে পারে। যে নারী শিক্ষা লাভ করে, সে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের ভাষা খুঁজে পায়। আর যে সমাজ তার ধর্মীয় ও সামাজিক বিধানকে যুক্তি ও মানবিকতার পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাতে পারে না, সেই সমাজের সংস্কার শুধু আইন দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না।
বিদ্যাসাগরের প্রতিটি লক্ষ্য তাঁর জীবদ্দশায় পূর্ণ হয়নি। বিধবা পুনর্বিবাহ আইন পাস হওয়ার পরও বিধবাদের সামাজিক মুক্তি আসেনি। বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তাঁর আপত্তি তাৎক্ষণিকভাবে সমাজ থেকে এসব প্রথা দূর করতে পারেনি। নারীশিক্ষার বিস্তারও ছিল অসম ও বাধাগ্রস্ত। তবু তিনি এমন এক বৌদ্ধিক ও নৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তী প্রজন্মকে আরও দূর এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই: একটি সমাজের অক্ষর বদলানো এবং তার অন্যায় বদলানো সম্পূর্ণ আলাদা কাজ নয়। প্রথমটি মানুষকে পড়তে শেখায়, দ্বিতীয়টি তাকে নিজের সময়কে নতুন করে পড়ার সাহস দেয়।
১. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, “বর্ণপরিচয়, বহুবিবাহ, বিধবা বিবাহ, বাল্যবিবাহ ও একজন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর”, The BackSpace Journal, ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত সংস্করণ।
২. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব, প্রথম ও দ্বিতীয় পুস্তক।
৩. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক বিচার, প্রথম ও দ্বিতীয় পুস্তক।
৪. The Hindu Widows’ Remarriage Act, 1856, Act XV of 1856।
৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্যাসাগরচরিত।
৬. Encyclopaedia Britannica, “Isvar Chandra Vidyasagar”।
৭. বিদ্যাসাগরের নির্বাচিত রচনা, জীবনীমূলক গবেষণা এবং সংস্কৃত কলেজ ও বিদ্যাসাগর কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0