ফেরদৌসী ও শাহনামা: কবির জীবন, মাহমুদের কিংবদন্তি এবং রুস্তম-সোহরাবের ট্র্যাজেডি
ফেরদৌসীর জীবন, শাহনামার উৎস ও রচনাকাল, সুলতান মাহমুদের কিংবদন্তি, রুস্তম-সোহরাবের ট্র্যাজেডি এবং মনিরউদ্দীন ইউসুফের বাংলা অনুবাদ জানুন।
PERSIAN LITERATURE • HISTORY • EPIC
ফেরদৌসী ও শাহনামা: কবির জীবন, মাহমুদের কিংবদন্তি এবং রুস্তম-সোহরাবের ট্র্যাজেডি
প্রাচীন ইরানের রাজা, বীর, প্রেম, যুদ্ধ, পরিচয় ও পতনের স্মৃতি নিয়ে ফেরদৌসী নির্মাণ করেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্য। প্রায় এক হাজার বছর পরও সেই কাব্যের ভাষা ও মানবিক ট্র্যাজেডি পাঠককে বিস্মিত করে।
সম্পাদকীয় নোট
লেখাটি প্রথমে ৮ এপ্রিল ২০২২ তারিখে ব্যাকস্পেস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। ইন্টারনেট আর্কাইভে সংরক্ষিত পাঠ থেকে উদ্ধারের পর বর্তমান সংস্করণে লেখকের মূল বিষয়, আবেগ ও সাহিত্যিক অভিপ্রায় সংরক্ষণ করে তথ্যগুলো নতুনভাবে যাচাই করা হয়েছে। ফেরদৌসীর জীবনসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠিত তথ্য, গবেষকদের মতভেদ এবং পরবর্তী সাহিত্যিক কিংবদন্তি যথাসম্ভব পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
লেখক
আব্দুল্লাহ আল মাসুদ
ফেরদৌসী, যাঁকে হাকিম আবুল কাসেম ফেরদৌসী নামেও অভিহিত করা হয়, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহাকবিদের অন্যতম। তাঁর রচিত শাহনামা তাঁকে বিশ্বসাহিত্যে অমর করে রেখেছে। প্রায় এক হাজার বছর ধরে এই মহাকাব্য ফারসিভাষী সমাজের পাঠ, আবৃত্তি, চিত্রকলা ও কাহিনিচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে। পরবর্তী সময়ে অনুবাদের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বহু ভাষার পাঠক প্রাচীন ইরানের রাজা, বীর, প্রেম, যুদ্ধ, পতন ও পুনর্জাগরণের এই বিস্ময়কর কাব্যভুবনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।
ইউরোপীয় পণ্ডিতদের কেউ কেউ ফেরদৌসীর মহাকাব্যিক প্রতিভা বোঝাতে তাঁকে “প্রাচ্যের হোমার” বলেছেন। তুলনাটি তাঁর সাহিত্যিক ব্যাপ্তির প্রতি সম্মান প্রকাশ করলেও ফেরদৌসীর প্রকৃত পরিচয় সেই উপাধির চেয়েও স্বতন্ত্র। তিনি কেবল অন্য কোনো মহাকবির প্রাচ্য প্রতিরূপ নন। ফারসি ভাষা, ইরানি সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং রাজা ও বীরদের নৈতিক সংঘাতকে তিনি যে রূপ দিয়েছেন, সেটি তাঁর নিজস্ব সভ্যতা ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের অনন্য সৃষ্টি।
ফেরদৌসীর জন্ম ও পরিচয়
অন্যান্য প্রাচীন কবি ও মনীষীর মতো ফেরদৌসীর জন্ম ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সাল নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো সূত্রে তাঁর জন্ম আনুমানিক ৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে, আবার কোনো কোনো গবেষণায় ৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি ধরা হয়েছে। মৃত্যুসালও ১০১৯, ১০২০ অথবা ১০২৫ খ্রিষ্টাব্দ হিসেবে বিভিন্নভাবে উল্লিখিত হয়েছে। তাই একটি নির্দিষ্ট সালকে প্রশ্নাতীত বলে গ্রহণ না করে বলা নিরাপদ, তিনি দশম শতকের প্রথমার্ধে তুস অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন এবং একাদশ শতকের প্রথম ভাগে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর পূর্ণ ব্যক্তিগত নাম নিয়েও প্রাচীন জীবনীকারদের বিবরণে ভিন্নতা আছে। তবে “আবুল কাসেম ফেরদৌসী তুসি” পরিচয়টি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। “আবুল কাসেম” তাঁর কুনিয়া বা সম্মানসূচক পরিচয়, “ফেরদৌসী” কবিনাম এবং “তুসি” তুস অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নির্দেশ করে। পরবর্তী সময়ে তাঁর নামের সঙ্গে “হাকিম” বিশেষণও যুক্ত হয়েছে, যা তাঁর কাব্যের জ্ঞান, নৈতিকতা ও দার্শনিক গভীরতার প্রতি সম্মান প্রকাশ করে।
ফেরদৌসী তুস অঞ্চলের একটি দেহকান পরিবারে জন্মেছিলেন বলে আধুনিক গবেষণায় তুলনামূলকভাবে শক্ত সমর্থন পাওয়া যায়। দেহকানরা সাধারণ কৃষক মাত্র ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন স্থানীয় ভূমিস্বত্বাধিকারী ও অভিজাত শ্রেণির মানুষ, যাঁদের অনেকে প্রাচীন ইরানের বংশপরম্পরা, রাজকাহিনি, আচার এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণ করতেন। এই সামাজিক পটভূমি ফেরদৌসীর প্রাচীন ইরানি ইতিহাস ও লোককাহিনির প্রতি গভীর আকর্ষণের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেয়।
ফেরদৌসীর শিক্ষাজীবন: ইতিহাস যেখানে নীরব
ফেরদৌসীর প্রাথমিক শিক্ষা ও যৌবন সম্পর্কে পরবর্তী জীবনীতে নানা আকর্ষণীয় বিবরণ পাওয়া যায়। কোথাও দাবি করা হয়েছে, তাঁর পিতার হাতেই শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল; কোথাও বলা হয়েছে, তিনি আরবি, ইতিহাস, দর্শন এবং ধর্মীয় শাস্ত্রে গভীর শিক্ষা লাভ করেছিলেন। আবার কোনো কোনো পুরোনো বর্ণনায় নদীর তীরে বসে তাঁর কবিতা রচনার কথাও পাওয়া যায়।
কিন্তু এসব বিবরণের অধিকাংশের পক্ষে শক্ত ও সমসাময়িক ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তাঁর প্রথম জীবনের বিষয়ে ইতিহাসের নীরবতা স্বীকার করাই তাই সৎ পদ্ধতি। তবে তাঁর রচনা থেকে বোঝা যায়, ফারসি ভাষা, ইরানের রাজকাহিনি, কিংবদন্তি, বীরপরম্পরা, নৈতিক দর্শন এবং মৌখিক ও লিখিত ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ জ্ঞান ছিল।
ফেরদৌসীর আগে রাজাদের কাহিনি
শাহনামা কোনো শূন্যস্থান থেকে সৃষ্টি হয়নি। ইরানের রাজা, বীর, যুদ্ধ, প্রেম ও পতনের কাহিনি বহু শতাব্দী ধরে মৌখিক স্মৃতি, মধ্য ফারসি ঐতিহ্য এবং গদ্যসংকলনে টিকে ছিল। ফেরদৌসী এই বিচিত্র উত্তরাধিকার গ্রহণ করে তাকে একটি দীর্ঘ, সুসংহত ও মহাকাব্যিক রূপ দেন।
দাকিকির অসমাপ্ত প্রয়াস
ফেরদৌসীর আগে আবু মনসুর দাকিকি ইরানের রাজকাহিনিকে পদ্যে রূপ দেওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি সামানীয় যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ ফারসি কবি ছিলেন। কিন্তু অল্প বয়সে নিহত হওয়ায় তাঁর কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। দাকিকির রচিত প্রায় এক হাজার দ্বিপদী ফেরদৌসী নিজের মহাকাব্যে সংরক্ষণ করেন। এই অংশে গোশতাস্পের শাসন ও জরথুস্ত্রীয় ধর্ম গ্রহণের কাহিনি স্থান পেয়েছে।
আবু মনসুরি শাহনামা
দাকিকির কাব্যিক উদ্যোগের সঙ্গে আবু মনসুরের গদ্যসংকলনকে এক করে দেখা ঠিক নয়। ৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে আবু মনসুর মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রাজ্জাকের উদ্যোগে কয়েকজন পণ্ডিত ইরানের রাজবংশীয় স্মৃতি ও ইতিহাস গদ্যে সংকলন করেছিলেন। গ্রন্থটি আবু মনসুরি শাহনামা নামে পরিচিত। মূল গ্রন্থের অধিকাংশ হারিয়ে গেলেও এর ভূমিকার একটি অংশ টিকে আছে। ফেরদৌসীর মহাকাব্যের প্রধান লিখিত উৎসগুলোর মধ্যে এই সংকলন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
দুই উৎসের পার্থক্য
দাকিকি ছিলেন ফেরদৌসীর পূর্বসূরি কবি। অন্যদিকে আবু মনসুরি শাহনামা ছিল একটি গদ্যসংকলন। ফেরদৌসী পূর্বসূরি কবির অসমাপ্ত প্রচেষ্টা এবং পুরোনো গদ্য ঐতিহ্য উভয়কেই নিজের মহাকাব্যে নতুন জীবন দিয়েছেন।
ত্রিশ বছরের বেশি সময়ের কাব্যসাধনা
ফেরদৌসী আনুমানিক ৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইরানের জাতীয় মহাকাব্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি পুরোনো গদ্যকাহিনি, রাজবংশীয় স্মৃতি, লোকগাথা এবং দাকিকির রেখে যাওয়া অংশ ব্যবহার করেন। কিন্তু তাঁর কাজ কেবল পূর্ববর্তী কাহিনিকে পদ্যে অনুবাদ করা ছিল না। তিনি চরিত্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করেছেন, ঘটনাকে নাটকীয় গতি দিয়েছেন এবং ন্যায়, জ্ঞান, ক্ষমতা ও মানুষের পরিণতি নিয়ে একটি দীর্ঘ নৈতিক জগৎ নির্মাণ করেছেন।
দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি কাব্যটি রচনা ও সংশোধন করেন। গবেষকদের অধিকাংশের মতে, শাহনামার চূড়ান্ত রূপ ১০১০ খ্রিষ্টাব্দে সম্পন্ন হয়। এই সময়ের মধ্যে সামানীয় শাসনের পতন এবং গজনভি শক্তির উত্থান ঘটে। ফলে ফেরদৌসীর সাহিত্যিক জীবনের পটভূমিতে শুধু কাব্যসাধনা নয়, একটি বড় রাজনৈতিক রূপান্তরও চলমান ছিল।
কাব্যটির দ্বিপদীর সংখ্যা নিয়ে পাণ্ডুলিপিভেদে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় প্রায় ৬০ হাজার দ্বিপদী বলা হলেও সমালোচনামূলক সংস্করণে প্রায় ৫০ হাজার দ্বিপদীর হিসাব পাওয়া যায়। পরবর্তী সংযোজন ও পাঠভিন্নতার কারণে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে প্রশ্নাতীত বলা কঠিন। তবু এটি যে একজন কবির হাতে নির্মিত বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্যগুলোর একটি, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
শাহনামার তিন বিশাল জগৎ
শাহনামা অর্থ “রাজাদের গ্রন্থ” বা “রাজবৃত্তান্ত”। এর কাহিনি ইরানের পৌরাণিক সূচনা থেকে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং সপ্তম শতাব্দীর আরব বিজয় পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এটি আধুনিক অর্থে শুধু ইতিহাসগ্রন্থ নয়। পৌরাণিক কল্পনা, বীরত্বগাথা, রাজবংশীয় স্মৃতি এবং ইতিহাসঘন ঘটনা এখানে একে অপরের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে।
১. পৌরাণিক পর্যায়
সৃষ্টি, প্রথম রাজা, আগুনের আবিষ্কার, সভ্যতার বিকাশ এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম এই পর্যায়ের প্রধান বিষয়। এখানে ইতিহাস ও পুরাণের সীমারেখা ইচ্ছাকৃতভাবে মিশে আছে।
২. বীরত্বগাথামূলক পর্যায়
জাল, রুস্তম, সোহরাব, সিয়াবাশ, কায়খসরু ও ইসফানদিয়ারসহ অসংখ্য বীর ও রাজপরিবারের উত্থান, সংঘাত এবং ট্র্যাজেডি এই পর্বে বিস্তৃত হয়েছে।
৩. ইতিহাসঘন পর্যায়
পরবর্তী রাজবংশ, সাসানীয় শাসন, রাজনৈতিক সংকট, সাম্রাজ্যের দুর্বলতা এবং আরব বিজয়ের দিকে অগ্রসর হওয়া ঘটনাগুলো এই পর্যায়ে অপেক্ষাকৃত ইতিহাসঘন রূপ পায়।
রাজাদের উত্থান-পতনের মধ্যেও ফেরদৌসী মানুষের ব্যক্তিগত সংকটকে আড়াল করেননি। একজন শাসক কখন ন্যায়পরায়ণ, আনুগত্য কখন অন্যায়ের সহযোগিতায় পরিণত হয়, অহংকার কীভাবে বীরকে ধ্বংস করে এবং দেরিতে প্রকাশিত সত্য কেন কোনো ক্ষতি ফিরিয়ে দিতে পারে না, এ ধরনের প্রশ্ন কাব্যজুড়ে বারবার ফিরে আসে।
ফারসি ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে শাহনামা
আরব বিজয়ের পর ইরানের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ভাষাগত পরিবেশে বড় পরিবর্তন আসে। কিন্তু ফারসি ভাষা হারিয়ে যায়নি। নবম ও দশম শতকে সামানীয় শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন ফারসি সাহিত্য বিকশিত হচ্ছিল। রুদকি, দাকিকি এবং অন্য কবিরাও এই সাহিত্যিক পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক ধারার মধ্যে ফেরদৌসীর কৃতিত্ব ছিল প্রাচীন ইরানের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে নতুন ফারসি ভাষায় এক বিশাল ও স্থায়ী কাব্যিক রূপ দেওয়া। তাই “ফেরদৌসী একাই ফারসি ভাষাকে রক্ষা করেছেন” বলা ইতিহাসকে কিছুটা সরল করে ফেলতে পারে। তবে তিনি যে ফারসি ভাষার সাহিত্যিক ক্ষমতা, মর্যাদা ও দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তাঁর ভাষায় আরবি শব্দের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সংযত। তবে কাব্যটিকে সম্পূর্ণ “অবিমিশ্র ফারসি” বলা যথাযথ নয়। ফেরদৌসীর সাফল্য শুধু কম আরবি শব্দ ব্যবহারে নয়; তাঁর সত্যিকার কৃতিত্ব হলো ফারসি ভাষাকে এত বিশাল ইতিহাস, চরিত্র, আবেগ ও নৈতিক সংকট বহনের উপযোগী এক মহাকাব্যিক শক্তিতে উন্নীত করা।
সুলতান মাহমুদ ও ফেরদৌসী
ফেরদৌসীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো গজনির সুলতান মাহমুদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। প্রচলিত জীবনীতে বলা হয়, কবি মাহমুদের বিদ্যোৎসাহিতা ও গুণগ্রাহিতার কথা শুনে তাঁর দরবারে উপস্থিত হন। দরবারে কবির প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে সুলতান তাঁকে সম্মান জানান এবং শাহনামা সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করেন।
আধুনিক গবেষণা থেকে জানা যায়, কাব্যের চূড়ান্ত রূপের সঙ্গে সুলতান মাহমুদের নাম যুক্ত ছিল এবং ফেরদৌসী তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু কবি কতদিন সরাসরি দরবারে ছিলেন, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল এবং মাহমুদ শুরু থেকেই কাব্যটির জন্য নির্দিষ্ট পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কি না, এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য অল্প।
স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার কাহিনি
জনপ্রিয় কাহিনিতে বলা হয়, সুলতান মাহমুদ কাব্যের প্রতিটি দ্বিপদীর জন্য একটি স্বর্ণমুদ্রা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কাব্য সম্পন্ন হওয়ার পর ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রার পরিবর্তে কবিকে ষাট হাজার রৌপ্যমুদ্রা পাঠানো হয়। অপমানিত ফেরদৌসী সেই অর্থ গ্রহণ না করে ভৃত্য, স্নানাগারের কর্মী এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন।
কাহিনির আরও নাটকীয় রূপে রাজদরবারের ঈর্ষান্বিত কবি ও কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়। তাঁদের প্রভাবে মাহমুদ ফেরদৌসীর প্রতি বিরূপ হন এবং কবিকে গজনি ছাড়তে হয়। বহু পরে সুলতান নিজের ভুল বুঝে ফেরদৌসীর প্রাপ্য স্বর্ণমুদ্রা তুসে পাঠান। কিন্তু পুরস্কার কবির বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মাহমুদের বিরুদ্ধে ফেরদৌসীর নামে একটি ব্যঙ্গকবিতাও প্রচলিত রয়েছে। সেখানে শাসকের বংশ, চরিত্র ও কৃপণতাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। তবে প্রচলিত ব্যঙ্গকবিতার কতটুকু ফেরদৌসীর নিজের লেখা এবং কতটুকু পরবর্তী সংযোজন, তা নিয়ে গবেষকদের মতভেদ রয়েছে। উৎসনির্ভর পাঠ ছাড়া এর কোনো দীর্ঘ অংশকে ফেরদৌসীর নিশ্চিত রচনা হিসেবে উদ্ধৃত করা নিরাপদ নয়।
তবু এই কিংবদন্তির সাহিত্যিক তাৎপর্য গভীর। এটি শুধু একজন কবি তাঁর প্রাপ্য অর্থ পেলেন কি না, সেই গল্প নয়। এর মধ্যে কবি ও ক্ষমতা, সৃষ্টিশীলতা ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাময়িক রাজশক্তি ও দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যিক মর্যাদার সংঘর্ষ রয়েছে। মাহমুদের সাম্রাজ্য ইতিহাসের একটি অধ্যায়; ফেরদৌসীর কাব্য এখনো পাঠকের মুখে জীবিত।
ইউসুফ ও জুলেখা কি ফেরদৌসীর রচনা?
প্রচলিত জীবনীতে বলা হয়েছে, গজনি ত্যাগ করার পর ফেরদৌসী কোনো বুয়াইদ শাসকের আশ্রয়ে গিয়ে ইউসুফ ও জুলেখা নামে একটি দীর্ঘ কাব্য রচনা করেছিলেন। এই বক্তব্য একসময় এত ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছিল যে কাব্যটি নিয়মিতভাবে ফেরদৌসীর রচনাতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতো।
কিন্তু আধুনিক পাঠ ও পাণ্ডুলিপি গবেষণায় এই লেখকত্ব গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কাব্যটির ভাষা, রচনাশৈলী, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং পাণ্ডুলিপিগত ইতিহাস শাহনামার কবির নিশ্চিত রচনা হিসেবে গ্রহণে সমস্যা তৈরি করে। তাই ইউসুফ ও জুলেখাকে ফেরদৌসীর নিশ্চিত কাব্য না বলে তাঁর নামে আরোপিত বা বিতর্কিত রচনা হিসেবে উল্লেখ করাই সঠিক।
ফেরদৌসীর অমরত্বের জন্য অন্য কোনো রচনার প্রয়োজনও নেই। তাঁর একমাত্র নিশ্চিত মহাকাব্য শাহনামাই তাঁকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিদের সারিতে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
প্রাচীন মহাকাব্যগুলোর মধ্যে শাহনামা
বিশ্বসাহিত্যে বাল্মীকির রামায়ণ, ব্যাসের মহাভারত এবং হোমারের Iliad ও Odyssey যে মর্যাদা লাভ করেছে, ফারসি সাহিত্য ও ইরানি সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে শাহনামাও তেমন গভীর অবস্থান তৈরি করেছে। তবে এগুলোকে একটি সরল শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায় সাজানো কঠিন। প্রতিটি মহাকাব্য নিজস্ব ভাষা, সমাজ, ধর্মীয় কল্পনা ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি।
শাহনামা পৌরাণিক সৃষ্টিকাল থেকে শুরু করে ইরানের রাজবংশীয় ইতিহাস, বীরযুগ এবং সাসানীয় পতন পর্যন্ত এক বিশাল ক্যানভাস নির্মাণ করেছে। রাজাদের জয় ও পরাজয়, বীরদের আত্মত্যাগ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেম, প্রতিশোধ এবং ভুল সিদ্ধান্ত এর কাহিনিকে প্রাণ দিয়েছে।
কাব্যটি শুধু যুদ্ধের গৌরব প্রচার করে না। রাজাদের অন্যায়, দুর্বলতা ও অহংকারও এতে প্রকাশিত হয়েছে। কোনো রাজা বীরদের সাহায্যে সিংহাসন রক্ষা করেন, আবার সেই ক্ষমতাই কখনো বীরকে অপমান বা ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। তাই কাব্যটিকে রাজাদের প্রশংসাগাথা বললে এর নৈতিক জটিলতা ধরা পড়ে না।
রুস্তম ও তাঁর বীরবংশ
শাহনামার বীরত্বগাথামূলক জগতের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র রুস্তম। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে গারশাস্প, নারিমান, সাম ও জালের নাম পাওয়া যায়। রুস্তমের পিতা জাল এবং মাতা রুদাবা। কোনো কোনো পুরোনো বাংলা রচনায় “সাম”কে “শাম” এবং “নারিমান”কে বিকৃতভাবে “নূর-ইমান” লেখা হয়েছে; গ্রহণযোগ্য বংশপরম্পরায় নাম দুটি সাম ও নারিমান।
জালের জীবনও বিস্ময়কর। শ্বেতকেশ নিয়ে জন্মানোর কারণে পিতা সাম তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন। পৌরাণিক পাখি সিমুর্গ তাঁকে আশ্রয় দিয়ে বড় করে। পরে সাম নিজের ভুল বুঝে পুত্রকে ফিরিয়ে আনেন। জাল ও রুদাবার প্রেম এবং তাঁদের সন্তান রুস্তমের জন্ম শাহনামার স্মরণীয় কাহিনি।
রুস্তমের বাহুবল ও বিশ্বস্ততার ওপর বহুবার ইরানের সিংহাসনের স্থায়িত্ব নির্ভর করেছে। তিনি দানব, বন্য প্রাণী, শত্রুসেনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বীরের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু তাঁর মহত্ত্ব শুধু শারীরিক শক্তিতে নয়। পরিস্থিতি বিচার, রাজাদের সঙ্গে তাঁর জটিল সম্পর্ক, প্রিয় ঘোড়া রাখশের সঙ্গে বন্ধন এবং নিজের সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার মধ্যেও তাঁর চরিত্রের গভীরতা প্রকাশ পায়।
রুস্তম ও ইসফানদিয়ারের সংঘর্ষ
রুস্তমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী ইসফানদিয়ার। তাঁকে কখনো ভুলভাবে তুর্কি বীর বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে ইসফানদিয়ার ইরানি রাজপরিবারের যুবরাজ এবং রাজা গোশতাস্পের পুত্র। তিনি নিজেও ছিলেন অসাধারণ বীর।
গোশতাস্প পুত্রকে সিংহাসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও বারবার নতুন শর্ত আরোপ করেন। শেষ পর্যন্ত ইসফানদিয়ারকে নির্দেশ দেওয়া হয়, রুস্তমকে শৃঙ্খলিত করে রাজদরবারে নিয়ে আসতে হবে। রুস্তম তাঁকে সম্মান ও আতিথ্য দিতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু অপমানজনক শৃঙ্খল মেনে নিতে পারেননি। অন্যদিকে ইসফানদিয়ারও পিতার আদেশ অমান্য করতে রাজি ছিলেন না।
তাঁদের সংঘর্ষ তাই শুধু দুই শক্তিশালী যোদ্ধার যুদ্ধ নয়। এখানে রাজাজ্ঞা ও আত্মমর্যাদা, আনুগত্য ও ন্যায়, পিতার ক্ষমতা ও পুত্রের কর্তব্য পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সিমুর্গের সহায়তায় রুস্তম শেষ পর্যন্ত ইসফানদিয়ারকে মারাত্মকভাবে আহত করেন। কিন্তু এই বিজয় আনন্দের নয়। মৃত্যুর আগে ইসফানদিয়ার নিজের পুত্র বাহমানকে রুস্তমের দায়িত্বে দিয়ে যান। ভবিষ্যতে সেই সম্পর্কই রুস্তমের বংশের জন্য ধ্বংস ডেকে আনে।
রুস্তম ও সোহরাব: পিতার হাতে পুত্রের মৃত্যু
শাহনামায় রুস্তম ও সোহরাবের কাহিনি বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পিতা-পুত্র ট্র্যাজেডিগুলোর একটি। সামানগানের রাজকন্যা তাহমিনার সঙ্গে রুস্তমের সম্পর্ক থেকে সোহরাবের জন্ম। সোহরাব বড় হওয়ার সময় জানত, মহাবীর রুস্তম তার পিতা। কিন্তু পিতা ও পুত্রের কখনো দেখা হয়নি।
যৌবনেই সোহরাব অসাধারণ শক্তিশালী যোদ্ধা হয়ে ওঠে। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল পিতাকে খুঁজে বের করা। কিন্তু ইরান ও তুরানের রাজনৈতিক সংঘাত, পরিচয় গোপন এবং প্রতিপক্ষের কৌশলের কারণে সে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে রুস্তমই তার বিরুদ্ধে দাঁড়ান।
যুদ্ধক্ষেত্রে সোহরাব নিজের পরিচয় সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত পেলেও রুস্তম সতর্ক থাকেন। দুজনের কেউই সময়মতো প্রতিপক্ষের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেন না। প্রথম সংঘর্ষে তরুণ সোহরাব নিজের অসাধারণ শক্তির পরিচয় দেয়। কিন্তু পরবর্তী লড়াইয়ে রুস্তম তাকে মারাত্মকভাবে আহত করেন।
মৃত্যুর মুখে সোহরাব যখন নিজের পিতার কথা বলে, তখন রুস্তম পরিচয়ের চিহ্ন দেখে ভয়াবহ সত্যটি জানতে পারেন। যাকে তিনি শত্রু ভেবে আঘাত করেছেন, সে তাঁর নিজের সন্তান। কিন্তু সত্যটি এমন মুহূর্তে প্রকাশিত হয়, যখন আর কোনো বীরত্ব, চিকিৎসা বা অনুশোচনা সোহরাবকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।
কাহিনিটির একটি তাৎপর্য
রুস্তম-সোহরাবের কাহিনিতে মানুষ কেবল প্রতিপক্ষের হাতে পরাজিত হয় না। মানুষ পরাজিত হয় গোপন পরিচয়, রাজনৈতিক কৌশল, অহংকার এবং সত্য প্রকাশের বিলম্বের কাছে।
এই কাহিনির হৃদয়ে শুধু পিতার হাতে পুত্রের মৃত্যু নেই। রয়েছে এমন এক পৃথিবীর ব্যর্থতা, যেখানে দুই মানুষ একে অন্যকে খুঁজছিল, অথচ যুদ্ধের কাঠামো তাদের শত্রুতে পরিণত করেছে। সোহরাব পিতাকে খুঁজেছিল। রুস্তম নিজের পরিচয় ও অবস্থান রক্ষা করেছিলেন। আর রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাদের অজ্ঞতা ও সন্দেহকে ব্যবহার করেছিল।
এই কারণেই রুস্তম-সোহরাবের কাহিনি বহু শতাব্দী ধরে ফারসি ও অন্যান্য ভাষার কবি, অনুবাদক ও নাট্যকারকে আকর্ষণ করেছে। এটি একটি নির্দিষ্ট সভ্যতার গল্প হয়েও মানুষের সার্বজনীন ভয়কে স্পর্শ করে: যদি আমরা প্রিয় মানুষকে চিনতে পারি তখনই, যখন আর কিছু সংশোধনের সুযোগ থাকে না?
শাহনামার নারী চরিত্র
ফেরদৌসীর কাব্যে নারী চরিত্রগুলোকে শুধু সৌন্দর্য বা প্রেমের প্রতীক হিসেবে দেখা ঠিক নয়। রুদাবা নিজের ভালোবাসার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। তাহমিনা রুস্তমকে বেছে নেন এবং সোহরাবের পরিচয়ের ইতিহাস বহন করেন। গোরদাফারিদ যুদ্ধক্ষেত্রে সাহস ও কৌশলের পরিচয় দেন। ফারাঙ্গিস, মানিজেহ ও অন্য নারীরাও পরিবার, প্রেম, রাজনীতি ও বিপদের মধ্যে সক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
তাঁদের সিদ্ধান্ত কখনো পরিবার রক্ষা করে, কখনো রাজনৈতিক সংকটের দিক বদলে দেয়, আবার কখনো গোপন তথ্য ভবিষ্যৎ ট্র্যাজেডির কারণ হয়। ফলে শাহনামার মানবিক জগৎ বুঝতে নারী চরিত্রগুলোর agency বা সিদ্ধান্তক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হয়।
বিশ্বসাহিত্যে রুস্তম ও সোহরাব
রুস্তম-সোহরাবের ট্র্যাজেডি ফারসি ভাষার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইংরেজ কবি ম্যাথু আর্নল্ড ১৮৫৩ সালে এই কাহিনি অবলম্বনে Sohrab and Rustum: An Episode প্রকাশ করেন। এটি ফারসি মূলের সরাসরি অনুবাদ নয়; বরং মূল কাহিনির একটি ইংরেজি সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণ।
আর্নল্ডের কবিতা ইংরেজি পাঠকের মধ্যে কাহিনিটির পরিচিতি বাড়ালেও পশ্চিমা বিশ্বে ফেরদৌসীর পরিচয় এর আগেই শুরু হয়েছিল। সপ্তদশ শতকের ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং অষ্টাদশ শতকের প্রাচ্যবিদদের রচনায় তাঁর নাম পাওয়া যায়। স্যার উইলিয়াম জোন্স ফেরদৌসীকে হোমারের সঙ্গে তুলনা করেন এবং রুস্তম-সোহরাবের কাহিনি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৭৮৫ সালে জোসেফ চ্যাম্পিয়ন একটি পরিকল্পিত পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদের প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন।
রুবেন লেভির Shahnameh: The Epic of the Kings ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক ইংরেজি সংস্করণ। তবে তাঁর অনুবাদের মাধ্যমেই সমগ্র পাশ্চাত্য জগৎ প্রথম শাহনামার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল, এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তাঁর বহু আগেই ইউরোপীয় ভাষায় নির্বাচিত অংশ, অভিযোজন ও অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
বাংলায় শাহনামা ও মনিরউদ্দীন ইউসুফ
বাংলা ভাষায় শাহনামার পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত মনিরউদ্দীন ইউসুফের নাম। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কবি, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও অনুবাদক। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ফারসি ও উর্দু সাহিত্য নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ এবং বিস্তৃত কাজ ছিল।
মনিরউদ্দীন ইউসুফের অনূদিত শাহনামা বাংলা একাডেমি থেকে ছয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়। Banglapedia-তে সম্পূর্ণ অনুবাদটির প্রকাশকাল ১৯৯১ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন খণ্ডের প্রথম প্রকাশ ও পরবর্তী সমন্বিত প্রকাশের সুনির্দিষ্ট গ্রন্থপঞ্জিগত ইতিহাস নির্ধারণে বাংলা একাডেমির মূল সংস্করণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অনুবাদটি সাধারণ গদ্যসার নয়। মনিরউদ্দীন ইউসুফ মূল মহাকাব্যের কাব্যিক গতি, আবেগ এবং চরিত্রচিত্রণ রক্ষার জন্য বাংলা মুক্তছন্দের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর অনুবাদ পড়ে বাংলা পাঠক কেবল কাহিনির ঘটনাক্রম জানতে পারেন না; মহাকাব্যের বিস্তার, বীরদের গৌরব, পারিবারিক ট্র্যাজেডি এবং ফারসি কাব্যের আবেগও অনুভব করতে পারেন।
শাহনামা কি আরববিদ্বেষের কাব্য?
শাহনামা প্রাক্-ইসলামি ইরানের রাজবংশ, বীর এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণ করেছে। এটি সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও আরব বিজয়ের ঘটনাও বর্ণনা করে। ফলে কোনো কোনো পুরোনো সমালোচনায় কাব্যটিকে আরব শাসনের বিরুদ্ধে ইরানি ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
কিন্তু পুরো কাব্যকে কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষের দলিল হিসেবে চিহ্নিত করা যথার্থ নয়। ফেরদৌসী ইসলামি যুগের ইরানে বসবাস ও রচনা করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর মহাকাব্যের কেন্দ্রজুড়ে রয়েছে প্রাক্-ইসলামি ইরানের রাজকাহিনি ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। কাব্যটির মধ্যে সাম্রাজ্য হারানোর বেদনা আছে, কিন্তু তার পাশাপাশি ন্যায়, জ্ঞান, শাসন, ভাগ্য, অহংকার এবং মানুষের নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্নও রয়েছে।
“ইরানি জাতীয়তাবোধের বাইবেল” বা “ইরানের জীবনবেদ” ধরনের উপমা সাহিত্যিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু এগুলো কোনো নির্দিষ্ট গবেষক বা ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি হলে পূর্ণ উৎসসহ ব্যবহার করা প্রয়োজন। অন্যথায় কাব্যের গুরুত্ব বোঝাতে এমন তুলনা ব্যবহার করলেও তা রূপক হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত।
যুদ্ধের আড়ালে মানুষের কাহিনি
শাহনামায় যুদ্ধের সংখ্যা অসংখ্য। কিন্তু যুদ্ধই এর একমাত্র বিষয় নয়। যুদ্ধ ফেরদৌসীর কাছে মানুষকে পরীক্ষা করার একটি পরিস্থিতি। সেখানে একজন রাজা নিজের ন্যায়বোধ হারান, একজন বীর অহংকারের কাছে পরাজিত হন, একজন পিতা পুত্রকে চিনতে ব্যর্থ হন এবং একজন যুবরাজ অন্যায্য আদেশ ও আনুগত্যের মধ্যে আটকে পড়েন।
প্রধান বীরদের কাহিনিও পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বংশ, পরিবার, শাসন, প্রতিশোধ এবং পুরোনো সিদ্ধান্তের পরিণতি তাদের এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় যুক্ত করে। রুস্তমের একটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে তাঁর পরিবারকে প্রভাবিত করে; একজন রাজার অন্যায় পরবর্তী প্রজন্মে নতুন সংঘাত সৃষ্টি করে। এই দীর্ঘ কার্যকারণসূত্রই কাব্যটিকে বিচ্ছিন্ন বীরগাথার সংকলন না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ মহাকাব্যিক বিশ্বে পরিণত করেছে।
ফেরদৌসীর সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এখানেই। তিনি রাজা ও বীরদের অতিমানবিক মর্যাদা দিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের মানুষ হওয়া থেকে মুক্ত করেননি। তাঁরা ভালোবাসেন, ভয় পান, ভুল করেন, গোপন করেন, অনুতপ্ত হন এবং কখনো এমন সত্য জানতে পারেন, যার পরে আর কিছুই সংশোধন করা যায় না।
আজও কেন শাহনামা গুরুত্বপূর্ণ
একটি সাম্রাজ্য পতিত হতে পারে, রাজবংশ হারিয়ে যেতে পারে এবং মানচিত্র বদলে যেতে পারে। কিন্তু মানুষ অতীতকে কীভাবে স্মরণ করবে, তা নির্ধারণে ভাষা ও সাহিত্য দীর্ঘ সময় কাজ করে। শাহনামা প্রাচীন ইরানের ঘটনাগুলোকে অপরিবর্তিত ইতিহাস হিসেবে ধরে রাখেনি; বরং সেগুলোকে গল্প, চরিত্র, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভাষায় নতুন জীবন দিয়েছে।
রুস্তম-সোহরাবের কাহিনি আজও পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে, কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্কের গোপন সত্য, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কৌশল, মানুষের অহংকার এবং সময়মতো পরিচয় প্রকাশ না করার মূল্য এখনো আমাদের জীবনের অংশ। ইসফানদিয়ারের কাহিনি জিজ্ঞাসা করে, অন্যায্য আদেশের প্রতি আনুগত্যকে কি সত্যিই নৈতিক কর্তব্য বলা যায়? আর ফেরদৌসী ও মাহমুদকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তি মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা একজন কবিকে অবমূল্যায়ন করতে পারে, কিন্তু সব সময় তাঁর সৃষ্টির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
পরিশেষ
শাহনামা শুধু প্রথম শ্রেণির একটি মহাকাব্য নয়। এটি ইরানি সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক জীবন্ত সাক্ষ্য এবং একই সঙ্গে মানুষের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা, ন্যায় ও ক্ষমতা, পরিচয় ও ইতিহাসের বহুমাত্রিক সাহিত্যিক অনুসন্ধান।
ফেরদৌসী রাজা ও বীরদের কাহিনি লিখেছিলেন। কিন্তু তাঁর কাব্যের সবচেয়ে স্থায়ী মুহূর্তগুলোয় আমরা রাজমুকুটের চেয়ে মানুষের মুখই বেশি দেখি। যুদ্ধশেষে পুত্রের পরিচয় জানা এক পিতা, কর্তব্য ও ন্যায়ের মধ্যে আটকে পড়া এক যুবরাজ এবং নিজের সৃষ্টির মর্যাদা নিয়ে ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানো এক কবি। এই মানুষগুলোর কারণেই প্রায় এক হাজার বছর পরও শাহনামা কেবল অতীতের স্মারক নয়, বর্তমানেরও আয়না।
১. Khaleghi-Motlagh, Djalal. “Ferdowsi, Abu’l-Qāsem.” Encyclopaedia Iranica. সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৯ জুন ২০১৬। ২. “Šāh-nāma.” Encyclopaedia Iranica. কাব্যের উৎস, সাংস্কৃতিক ভূমিকা ও গ্রহণের ইতিহাস। ৩. Khaleghi-Motlagh, Djalal. “Daqīqī, Abū Manṣūr Aḥmad.” Encyclopaedia Iranica. সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩। ৪. “Ferdowsī.” Encyclopaedia Britannica. ফেরদৌসীর জীবন, রচনাকাল ও সাহিত্যিক গুরুত্ব। ৫. “Shāh-nāmeh.” Encyclopaedia Britannica. কাব্যের বিষয়, আয়তন ও ঐতিহাসিক বিস্তার। ৬. Leoni, Francesca. “The Shahnama of Shah Tahmasp.” The Metropolitan Museum of Art. ১ জুন ২০০৮। ৭. “Suhrab Slain by Rustam.” The Metropolitan Museum of Art. রুস্তম ও সোহরাবের কাহিনিসংক্রান্ত সংগ্রহ-নথি। ৮. “Sohrab Slain by Rostam.” The Shahnameh: A Persian Cultural Emblem and a Timeless Masterpiece, Fitzwilliam Museum project। ৯. “The Dying Esfandiyar Watched by Rostam and Zal.” Fitzwilliam Museum-এর Shahnameh প্রকল্প। ১০. Loloi, Parvin. “Šāh-nāma Translations III: Into English.” Encyclopaedia Iranica. সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৪ মে ২০১৮। ১১. “Yusuf, Moniruddin.” Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh। ১২. Al-Hadi, Mohammad Ahsan এবং Tanjina Bent Noor. “Evaluation of the Bengali Translation of Ferdowsi’s Shahnameh by Monir al-Din Yusuf.” Kavoshnameh in Persian Language and Literature, খণ্ড ২৩, সংখ্যা ৫৫, ২০২৩। DOI: 10.29252/KAVOSH.2022.18181.3216। ১৩. Arnold, Matthew. Sohrab and Rustum: An Episode. প্রথম প্রকাশ: ১৮৫৩। রচনার উন্মুক্ত পাঠ, Poetry Foundation।তথ্যসূত্র ও সহায়ক পাঠ
https://iranicaonline.org/articles/ferdowsi/https://iranicaonline.org/articles/ferdowsi/
https://iranicaonline.org/articles/sah-nama/https://iranicaonline.org/articles/sah-nama/
https://iranicaonline.org/articles/daqiqi-abu-mansur-ahmad-b/https://iranicaonline.org/articles/daqiqi-abu-mansur-ahmad-b/
https://www.britannica.com/biography/Ferdowsihttps://www.britannica.com/biography/Ferdowsi
https://www.britannica.com/topic/Shah-namehhttps://www.britannica.com/topic/Shah-nameh
https://www.metmuseum.org/essays/the-shahnama-of-shah-tahmasphttps://www.metmuseum.org/essays/the-shahnama-of-shah-tahmasp
https://www.metmuseum.org/art/collection/search/453265https://www.metmuseum.org/art/collection/search/453265
https://shahnameh.fitzmuseum.cam.ac.uk/explore/objects/no-82-sohrab-slain-by-rostamhttps://shahnameh.fitzmuseum.cam.ac.uk/explore/objects/no-82-sohrab-slain-by-rostam
https://shahnameh.fitzmuseum.cam.ac.uk/explore/objects/no-85-the-dying-esfandiyar-watched-by-rostam-and-zalhttps://shahnameh.fitzmuseum.cam.ac.uk/explore/objects/no-85-the-dying-esfandiyar-watched-by-rostam-and-zal
https://iranicaonline.org/articles/sah-nama-translations-iii-English/https://iranicaonline.org/articles/sah-nama-translations-iii-English/
https://en.banglapedia.org/index.php?title=Yusuf,_Moniruddinhttps://en.banglapedia.org/index.php?title=Yusuf,_Moniruddin
https://kavoshnameh.yazd.ac.ir/article_2779.html?lang=enhttps://kavoshnameh.yazd.ac.ir/article_2779.html?lang=en
https://www.poetryfoundation.org/poems/43604/sohrab-and-rustumhttps://www.poetryfoundation.org/poems/43604/sohrab-and-rustum
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0