দত্ত পরিবার | পর্ব ০৫: মৃত মানুষের ডোবা

স্নেহাকে খুঁজতে নিষিদ্ধ জঙ্গলে গিয়ে হাসান পড়ে যায় মৃত মানুষের রহস্যময় এক ডোবায়। নামহীন মৃত ব্যক্তি তাকে স্বাধীনতা, বেকারত্ব ও মুছে যাওয়া পরিচয়ের মুখোমুখি করে।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ২
দত্ত পরিবার | পর্ব ০৫: মৃত মানুষের ডোবা
দত্ত ভবনের পেছনের অন্ধকার জঙ্গলে হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা হাসান, মাটির নিচে মৃত মানুষের অস্পষ্ট উপস্থিতি এবং দূরে স্নেহার রহস্যময় ছায়া।

অভিযাত্রী ধারাবাহিক উপন্যাস

দত্ত পরিবার

পর্ব ০৫: মৃত মানুষের ডোবা

লেখক: মোঃ মেহেদি হাসান

‘দত্ত পরিবার’ ধারাবাহিক প্রসঙ্গে

১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা ও পরিচয়ের সংগ্রাম এবং ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত অভিঘাত বহন করে চলেছে দত্ত ভবন। একই মুখের পুনরাবৃত্তি, মুছে দেওয়া একটি নাম, সাড়ে বারোটায় থেমে থাকা ঘড়ি এবং নিষিদ্ধ পশ্চিমঘরের মধ্যে হাসান ধীরে ধীরে এমন এক ইতিহাসে প্রবেশ করছে, যেখানে জীবিত ও মৃতের সীমারেখা কোনো স্থায়ী নিয়ম মানে না।

পরের দিন, সন্ধ্যা

ঘুম থেকে উঠেই বুঝতে পারলাম, আমি সম্ভবত এক অনন্তকাল ঘুমিয়েছি।

কত ঘণ্টা, কত দিন কিংবা কত যুগ পেরিয়ে গেছে, তা বোঝার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ঘরে ছিল না। দেয়ালের সেগুনকাঠের ঘড়িটি যথারীতি সাড়ে বারোটার ঘরে কাঁটা গুঁজে বসে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ম্লান আলো বলছে, বাইরে সন্ধ্যা নেমে আসছে। অথচ আমার শরীর বলছে, বহু বছর পর কোনো কবরের ভেতর থেকে উঠে বসেছি।

মুখ শুকিয়ে কাঠ। মাথার ভেতরে অসংখ্য ছোট হাতুড়ি একসঙ্গে কাজ করছে। পেটে এমন খিদে চোঁচোঁ করছে, যেন গত ছয় মাসে স্মৃতি দত্তের দেওয়া সমস্ত খাবারের প্রতিশোধ একদিনেই নিতে এসেছে।

আমি ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসলাম। তারপরই আগের রাতের কথা মনে পড়ল।

ঝড়ের মধ্যে স্থির হয়ে থাকা হারিকেন।

ফটকের পাথরে খোদাই করা তিনটি সাল।

১৯৪৭

১৯৫২

১৯৭১

কাঠে তিনবার আঘাত।

“...নাথ।”

এর পরের ঘটনাগুলো মনে করতে গিয়ে মাথার ভেতরের যন্ত্রণা আরও বেড়ে গেল। হারিকেন নিভে যাওয়ার পর কী ঘটেছিল? আমি কি ফটকের সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম? স্নেহা কি আমাকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছিল? নাকি নিজের পায়ে হেঁটেই এসেছিলাম?

কোনো স্মৃতি নেই।

শুধু অস্পষ্টভাবে মনে পড়ছে, অন্ধকারের মধ্যে একাধিক পায়ের শব্দ শুনেছিলাম। একটি পায়ের শব্দ আমার সামনে, আরেকটি পেছনে। মাঝখানে আমি। তারপর কেউ আমার কানের কাছে খুব নিচু স্বরে বলেছিল, “এখনো সময় হয়নি।”

কণ্ঠটি স্নেহার ছিল কি না, নিশ্চিত হতে পারলাম না।

বিছানা থেকে নামতে গিয়ে ডান পায়ের পাতায় ব্যথা অনুভব করলাম। নিচু হয়ে দেখি, গোড়ালির কাছে শুকনো মাটির দাগ। আঙুল দিয়ে ঘষতেই দাগটি গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ল। অথচ ঘরের মেঝে পরিষ্কার। বিছানার চাদরেও মাটি নেই।

দরজার দিকে তাকালাম। ভেতর থেকে খিল দেওয়া।

আমি খিল দিয়েছিলাম কি না, মনে নেই। দত্ত ভবনে আসার পর থেকে ভুলে যাওয়ার তালিকাটি ক্রমেই বড় হচ্ছে। চাকরির আবেদনের পাসওয়ার্ড, মায়ের জন্য টাকা পাঠানোর তারিখ, নিজের ভবিষ্যৎ এবং এখন নিজের ঘরের দরজায় খিল দেওয়ার স্মৃতিও সেই তালিকায় যুক্ত হলো।

জানালার পাশে একটি নিভে যাওয়া হারিকেন রাখা।

পিতলের শরীরে কালো দাগ, কাচের বাঁ পাশে সরু চিড় এবং হাতলে বাঁধা লাল সুতো। আগের রাতে স্নেহার হাতে থাকা হারিকেনটির সঙ্গে এর কোনো দৃশ্যমান পার্থক্য নেই।

হারিকেনটি ঘরে এল কীভাবে?

হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলাম। ধাতু অস্বাভাবিক ঠান্ডা। কাচের ভেতর থেকে পোড়া কেরোসিনের বদলে কর্পূরের সামান্য গন্ধ পেলাম। একই গন্ধ পেয়েছিলাম স্নেহার প্রতিরূপ, কাঠের হাতলওয়ালা ছুরি এবং সংরক্ষণকক্ষের পুরোনো কাগজপত্রে।

খিদে, ভয় ও কৌতূহলের মধ্যে শেষ পর্যন্ত খিদেই জয়ী হলো। মানুষের শরীর খুব বাস্তববাদী। সামনে অতিপ্রাকৃত রহস্য থাকলেও পাকস্থলী সময়মতো নিজের দাবি জানায়।

দরজার খিল খুলে করিডরে বেরিয়ে এলাম।

হেলানচেয়ারের কান্না

দত্ত ভবনের করিডর সন্ধ্যার পর আরও দীর্ঘ হয়ে যায় বলে মনে হয়। দিনের আলোয় দুই প্রান্ত দেখা গেলেও এই সময় অন্ধকার এসে মাঝখানের জায়গাগুলো গিলে ফেলে। দেয়ালে ঝুলে থাকা প্রতিকৃতিগুলোর মুখ হারিয়ে যায়, শুধু কাচের ওপর প্রতিফলিত ক্ষীণ আলোয় চোখগুলো টিকে থাকে।

স্মৃতি দত্তের ঘরের দিকে এগোতে লাগলাম। তিনি হয়তো আমার জন্য খাবার প্রস্তুত করে রেখেছেন। গত ছয় মাসে নিজের কাজের হিসাব আমি যতবার ভুলেছি, তিনি আমার খাবারের হিসাব একবারও ভুল করেননি।

করিডরের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই একটি অস্ফুট কান্না কানে এল।

শব্দটি প্রথমে এত নিচু ছিল যে বাতাসের আওয়াজ বলে মনে হলো। কিছুদূর এগিয়ে বুঝলাম, কেউ কাঁদছেন। তবে সেই কান্নায় মুক্তি নেই। মানুষটি যেন কাঁদতে চান না, আবার বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্টও ধরে রাখতে পারছেন না।

কান্নার সঙ্গে একটি পুরোনো হেলানচেয়ারের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ মিশে আছে।

আরও কয়েক পা এগোতেই তাঁকে দেখতে পেলাম।

স্মৃতি দত্ত করিডরের পাশের হেলানচেয়ারে বসে দুলছেন। সাদা শাড়ি ও সাদা চুল অন্ধকারের মধ্যে মিশে গিয়ে তাঁকে প্রায় অবয়বহীন করে তুলেছে। তাঁর দুই হাত চেয়ারের হাতলে শক্ত করে রাখা। মাথা নিচু। প্রতিবার চেয়ারটি পেছনে যাওয়ার সময় মেঝেতে দীর্ঘ ছায়া তৈরি হচ্ছে, সামনে আসার সময় সেই ছায়া তাঁর পায়ের নিচে গুটিয়ে যাচ্ছে।

“দিদি?”

আমার কণ্ঠ শুনে চেয়ারটি থেমে গেল।

তিনি ধীরে মুখ তুললেন। চোখ লাল। গালের ওপর অশ্রুর শুকনো রেখা। আমাকে দেখার পর তাঁর মুখে স্বস্তি, ভয় ও অবিশ্বাস একসঙ্গে ফুটে উঠল।

“হাসান?”

তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর প্রায় ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথা রাখলেন আমার বুকের ওপর। তাঁর শরীর কাঁপছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এতদিনের সংযম ভেঙে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

স্মৃতি দত্তকে আমি সবসময় নিয়ন্ত্রিত দেখেছি। তাঁর প্রতিটি কথা পরিমিত, প্রতিটি নীরবতা পরিকল্পিত। আজ তাঁর কান্নার ভেতরে সেই নিয়ন্ত্রণের কিছুই নেই।

আমি অস্বস্তি ও মমতার মাঝামাঝি অবস্থায় তাঁর কাঁধে হাত রাখলাম।

স্মৃতি দত্ত কাঁদতে কাঁদতে বললেন

“হাসান, আমি স্নেহাকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

“খুঁজে পাচ্ছেন না মানে?”

“দুপুর থেকে কোথাও নেই। তার ঘরে নেই। বাগানে নেই। ছাদে, বারান্দায়, পশ্চিমের পুকুরপাড়ে সব জায়গায় খুঁজেছি।”

“আমাকে ডাকেননি কেন?”

“ডেকেছি। তোমার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ধাক্কা দিয়েছি, নাম ধরে ডেকেছি। তুমি কোনো উত্তর দাওনি।”

তাঁর ডান হাতের দিকে তাকালাম। অনামিকায় নীল পাথরের আংটি নেই। তার জায়গায় গভীর কাটা দাগ। চারপাশের চামড়া সামান্য লাল।

“আপনার আঙুলে কী হয়েছে?”

তিনি দ্রুত আঁচলের ভেতর হাত ঢেকে ফেললেন।

“পুরোনো ক্ষত।”

“আজ আবার কেটেছে?”

“স্নেহাকে খুঁজে বের করো, হাসান।”

এই বাড়িতে কোনো প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো তার চেয়ে বড় একটি সমস্যার কথা মনে করিয়ে দেওয়া।

দেয়ালের পাশে রাখা একটি পুরোনো হারিকেন জ্বালিয়ে হাতে নিলাম। সেটির হাতলেও লাল সুতো বাঁধা। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমার ঘরের জানালার নিচে যে হারিকেনটি পড়ে আছে, এটাই সেই হারিকেন।

আমি বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই স্মৃতি দত্ত আমার কবজি চেপে ধরলেন।

“পেছনের জঙ্গলে যেয়ো না।”

“কেন?”

“ওদিকের মাটি ভালো নয়।”

“মাটি ভালো নয় মানে?”

“মাটি সবকিছু ভুলে যায় না।”

“স্নেহা সেখানে গিয়ে থাকলে?”

“সে যায় না।”

“আপনি এত নিশ্চিত কীভাবে?”

তিনি উত্তর দিলেন না।

“আর একটি কথা মনে রেখো,” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “জঙ্গলে কেউ ডাকলে উত্তর দিয়ো না।”

“স্নেহাও আমাকে একই সতর্কতা দিয়েছে।”

স্মৃতি দত্তের মুখের রং বদলে গেল।

“কখন?”

“পশ্চিমঘরের ভেতর থেকে আঘাত আসার রাতে।”

তিনি হাত সরিয়ে নিলেন। তাঁর চোখে এমন একটি দৃষ্টি ফুটে উঠল, যেন আমার কথার মধ্যে তিনি এমন কোনো তথ্য পেয়েছেন, যা আমার জানা উচিত ছিল না।

“সাবধানে যেয়ো, হাসান।”

বাড়ির পেছনের নিষিদ্ধ পথ

সরাসরি জঙ্গলে না গিয়ে প্রথমে স্নেহার ঘরের সামনে গেলাম। দরজা বন্ধ। দুইবার কড়া নাড়লাম। কোনো উত্তর নেই। দরজায় কান রাখতেই ভেতর থেকে খুব ক্ষীণভাবে পাতা ওল্টানোর মতো শব্দ পেলাম।

“স্নেহা?”

শব্দটি সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।

স্মৃতি দত্তকে বিষয়টি জানাতে ফিরে তাকালাম। করিডরে তিনি নেই। হেলানচেয়ারটি অবশ্য এখনো দুলছে।

চেয়ারের নিচে একটি কালচে ভেজা দাগ। পানির মতো মনে হলেও গন্ধটি পানির নয়। পুরোনো কালি ও স্যাঁতসেঁতে কাগজের মিশ্র গন্ধ।

বাগান, সামনের বারান্দা, ফটকের পাশ এবং পুকুরের ধারে খুঁজলাম। কোথাও স্নেহা নেই।

পেছনের জঙ্গলের দিকে যাওয়ার সরু পথের কাছে পৌঁছে থামলাম। স্মৃতি দত্ত নিষেধ করেছেন। কিন্তু স্নেহা যদি স্বেচ্ছায় সেখানে না গিয়ে থাকে, তাহলে আমার দাঁড়িয়ে থাকার আরও কম কারণ আছে।

হারিকেনটি উঁচু করে ধরে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

প্রথম কয়েক গজ পর্যন্ত শুকনো মাটি। এরপর পথ সরু হতে শুরু করল। দুই পাশের লতাগুলো হাত ও জামায় আটকে যাচ্ছে। কিছু লতা এত মোটা যে মনে হয় বহু বছর ধরে কেউ এগুলো কাটেনি। কোথাও কোথাও গাছের শিকড় মাটির ওপর উঠে এসে সাপের মতো পথ আটকে রেখেছে।

হারিকেনের আলো সামনে পাঁচ-ছয় হাতের বেশি যাচ্ছে না। তার বাইরের অন্ধকার এত ঘন যে আলোটি যেন কোনো দেয়ালে গিয়ে আটকে যাচ্ছে।

প্রথমে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শুনছিলাম। কিছুদূর এগোনোর পর এক মুহূর্তে সব শব্দ থেমে গেল।

পেছনে পাতার ওপর পা পড়ার শব্দ।

একবার।

তারপর আবার।

ঘুরে হারিকেন তুলে ধরলাম। কেউ নেই। শুধু আমি যে পথে এসেছি, সেই পথটিও আর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। লতাপাতাগুলো যেন আমার পেছনে আবার জোড়া লেগেছে।

“স্নেহা!”

ডাকার পরই স্মৃতি দত্তের সতর্কতা মনে পড়ল। কেউ ডাকলে উত্তর দেওয়া যাবে না। তবে নিজে ডাকলে কী হবে, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলেননি। হয়তো এই বাড়ির নিয়ম যারা লিখেছিল, তারা মানুষের বুদ্ধিকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সম্মান করেছিল।

আমার কণ্ঠ জঙ্গলের ভেতর প্রতিধ্বনিত হলো।

শেষ প্রতিধ্বনিটি নারীকণ্ঠের মতো শোনাল।

কিছুদূর গিয়ে একটি বেঁকে যাওয়া শিরীষগাছের সামনে দাঁড়ালাম। গাছটি পেরিয়ে আরও মিনিটখানেক হাঁটার পর আবার একই শিরীষগাছের সামনে এসে পড়লাম।

আমি একই জায়গায় ফিরে এসেছি। কিন্তু একবারও পেছনে ঘুরিনি।

গাছের গায়ে এবার তিনটি নতুন আঁচড় দেখা গেল।

একটি।

দুটি।

তিনটি।

ঠিক তখন দূরে একটি কমলা রঙের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল।

আগুনের ভেতরের মুখ

প্রথমে আলোটিকে জোনাকি বলে মনে হয়েছিল। পরক্ষণেই সেটি বড় হতে শুরু করল। শুকনো পাতার ওপর ছোট আগুন জ্বলে ওঠার মতো কমলা আলো ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।

সেই আগুনের মাঝখানে একটি মানুষের অবয়ব।

অবয়বটি দুই হাত ছুড়ছে। শরীর মোচড়াচ্ছে। বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছে। কিন্তু আগুনের কোনো শব্দ নেই। আশপাশের শুকনো পাতা, ঘাস কিংবা গাছের ডাল কিছুই পুড়ছে না। শুধু মানুষটি জ্বলছে।

হারিকেন উঁচু করে ধরতেই মুখটি স্পষ্ট হলো।

স্নেহা।

“স্নেহা!”

আমি তার দিকে ছুটে গেলাম।

দূরত্ব বেশি ছিল না। তবু যতই এগোচ্ছি, সে যেন তত দূরে সরে যাচ্ছে। আগুন তার শাড়ি ও চুল ঘিরে রেখেছে, অথচ পোড়া কাপড় বা মাংসের কোনো গন্ধ নেই। বাতাসে ভেসে আসছে তীব্র কর্পূর ও বহুদিন বন্ধ থাকা ঘরের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

স্নেহার আর্তনাদ এবার পরিষ্কার শুনতে পেলাম।

“হাসান, আমাকে ফেলে যেয়ো না!”

কণ্ঠটি স্নেহার। আবার পুরোপুরি স্নেহার নয়। একই কণ্ঠের নিচে আরেকটি কর্কশ কণ্ঠ লুকিয়ে আছে। যেন দুজন মানুষ একই মুখ ব্যবহার করে একসঙ্গে কথা বলছে।

ডান পা মাটিতে রাখতেই নিচ থেকে ফাঁপা শব্দ হলো।

মাটি বসে গেল।

কিছু আঁকড়ে ধরার আগেই পুরো শরীর নিচে পড়ে গেল।

মৃত মানুষের ডোবা

প্রথম ধাক্কায় মনে হলো কোনো জলাশয়ে পড়েছি। কিন্তু এটি পানি নয়। ঘন, কালচে ও আঠালো একধরনের তরল। কোমর পর্যন্ত ডুবে যেতেই পচা গন্ধে শ্বাস আটকে এল। পায়ের নিচে শক্ত কিছু নেই। যত নড়ছি, তত নিচে তলিয়ে যাচ্ছি।

হারিকেনটি কোনোমতে মাথার ওপরে তুলে ধরলাম।

আলোয় চারপাশ দৃশ্যমান হতেই গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

এটি সাধারণ কোনো ডোবা নয়।

আমার চারপাশে মানুষের দেহ।

কোনোটি প্রায় কঙ্কাল হয়ে গেছে। কোনো দেহের গায়ে পচে যাওয়া ধুতির অংশ। একটির শরীরে ছেঁড়া পাঞ্জাবি। আরেকটির বুকের কাছে কাপড়ের সঙ্গে লেগে আছে মরচেধরা ধাতব ব্যাজ। একটি সরু কবজিতে গোলাকার ঘড়ি, যার কাঁটা সাড়ে বারোটায় থেমে আছে।

হারিকেনের আলো সামান্য নড়তেই একটি কঙ্কালের আঙুলে নীল পাথরের মতো কিছু চকচক করে উঠল। আবার আলো ফেললাম। সেখানে শুধু কালো কাদা।

আমার পা আরও নিচে চলে গেল। কালচে তরল বুক ছুঁয়েছে। শ্বাস নিতে গিয়ে পচা গন্ধ মুখের ভেতর ঢুকে পড়ছে।

হাতের কাছে একটি দেহ পেলাম। তাতে ভর দিয়ে নিজেকে ওপরে তোলার চেষ্টা করলাম। দেহটি কাদার মধ্যে দুলে উঠল। মুখের এক পাশ আমার দিকে ঘুরে এল।

“ক্ষমা করবেন,” অস্ফুট স্বরে বললাম।

মৃত মানুষের অনুমতি নেওয়ার মতো সময় ছিল না। তবু ভদ্রতা রক্ষা করতে চাইলাম। জীবিত অবস্থায় মানুষ আমাকে জায়গা দেয়নি। মৃত্যুর পর অন্তত তাঁদের শরীরের ওপর পা রাখার আগে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

একটি দেহ থেকে আরেকটিতে ভর দিয়ে এগোতে লাগলাম। ডোবার কিনারা যেন কয়েক হাত দূরে। কিন্তু আমি যতই সামনে যাচ্ছি, সেটি তত পিছিয়ে যাচ্ছে।

একটি দেহের বুকের ওপর হাত রাখতেই কাপড়ের ভেতর থেকে কাগজের খসখস শব্দ হলো। কাদামাখা একটি ছেঁড়া পাতা বেরিয়ে এল। তাতে শুধু তিনটি সাল পড়া গেল।

১৯৪৭

১৯৫২

১৯৭১

পাতাটির নিচের অংশে কারও নাম থাকার কথা। সেই জায়গাটি কালি দিয়ে ঘষে মুছে দেওয়া।

হঠাৎ কেউ আমার গোড়ালি চেপে ধরল। আরেকটি হাত আমার জামা আঁকড়ে ধরল। তারপর আরেকটি।

ঠিক তখন ডান পাশের কালো তরল থেকে একটি মুখ ভেসে উঠল। চোখ দুটি খোলা। মুখের ওপর কাদা, শুকনো রক্ত ও পচে যাওয়া চামড়ার ছাপ। তার পরও লোকটি হাসছে।

“এই যে, হাসান?”

লোকটি আরও কাছে এল।

“স্বাধীন দেশের পরাধীন নাগরিক, কেমন আছো?”

মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলার কোনো সামাজিক প্রশিক্ষণ আমার ছিল না। তাই ভদ্রতাই নিরাপদ মনে হলো।

“জি, ভালো আছি।”

“এই অবস্থায় ভালো?”

“পরিস্থিতি বিবেচনায় মোটামুটি।”

“ভয় পাচ্ছ?”

“আপনার আপত্তি না থাকলে সামান্য পেতে চাই।”

লোকটির হাসি আরও চওড়া হলো।

“আমি তোমাকে কী করব? বেকারত্বের ভার নিয়ে তুমি নিজেই তো একটা জীবন্ত লাশ।”

কথাটি গায়ে লাগল। মৃত মানুষের মন্তব্যও যে অপমানজনক হতে পারে, আগে জানা ছিল না।

“আমি একেবারে কিছু করি না, তা নয়। মিসেস দত্তের দেখাশোনা করি।”

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি। সভ্য সমাজে জায়গা হয়নি বলে মৃত মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছ।”

“তাঁরা মৃত, এটি এখনো প্রমাণিত নয়।”

লোকটির মুখ থেকে হাসি সরে গেল।

“নিজের বেঁচে থাকাটাই কি প্রমাণ করতে পেরেছ?”

উত্তর দিতে পারলাম না।

সে আমার আরও কাছে এসে বলল, “দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু মানুষের ক্ষুধা স্বাধীন হয়নি। অপমান স্বাধীন হয়নি। ভয় স্বাধীন হয়নি। শিক্ষিত ছেলেরা কাজের বদলে পরিচয় খোঁজে, সুপারিশ খোঁজে, অন্যের জায়গায় হাজিরা দেয়। তারপর একসময় নিজের জীবন থেকেই অনুপস্থিত হয়ে যায়।”

আমার Proxy Man পরিচয়ের কথা মনে পড়ল।

“আপনি আমার সম্পর্কে জানেন কীভাবে?”

“এই মাটির নিচে যারা থাকে, তারা ওপরের মানুষের পায়ের শব্দ শুনতে পায়।”

“আপনি কে?”

“সম্পর্ক বের করতে এসেছ?”

“আপনি যদি স্বাধীনতার যুদ্ধে মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে দেশের সম্পর্কেই আমার দাদু হন।”

লোকটি হঠাৎ রাগে আমার গলা চেপে ধরার ভঙ্গি করল।

“আমি তোর দাদু কোন সম্পর্কে? একেবারে গলা টিপে এখানেই রেখে দেব!”

“মৃত মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা দাবি করাও কি অপরাধ?”

“তোর ভূতে ভয় নেই?”

“আছে। তবে জীবিত মানুষের কাছে এতদিন ঘুরেছি যে তুলনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।”

লোকটি উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তার হাসির সঙ্গে ডোবার অন্য দেহগুলোর বুক থেকেও চাপা শব্দ বেরোতে লাগল। যেন বহু মানুষের আটকে থাকা হাসি একই সঙ্গে কাদা ভেদ করে উঠে আসছে।

সে বলল, “কত মানুষ নিজের মূল্যকে একটি নিয়োগপত্রের সঙ্গে বেঁধে ফেলে, তার হিসাব রাখো? কতজন পরিবারকে বলতে পারে না যে সে ব্যর্থ নয়, ব্যবস্থাটিই তাকে জায়গা দেয়নি? কতজন অন্যের কাছে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে করতে একদিন নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যায়?”

মায়ের কথা মনে পড়ল। বাবার ওষুধের টাকা। খালি মানিব্যাগ। হোটেলের সামনে পড়ে থাকা স্যুটকেস। বিনা পয়সায় খেতে বসা সেই রেস্তোরাঁ।

“তোমার সমস্যা শুধু চাকরি না পাওয়া নয়, হাসান। তুমি নিজে কী হতে চাও, সেটি ভুলে গিয়ে অন্যেরা তোমাকে কী হিসেবে গ্রহণ করবে, তার অপেক্ষা করছ।”

“আপনার নাম কী?”

লোকটি স্থির হয়ে গেল।

সে ধীরে মুখ আমার কাছে এনে ফিসফিস করে বলল, “যে দেশের জন্য মরেছিলাম, সেই দেশের কোনো কাগজে আমার নাম নেই। যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেই বাড়ির খাতাতেও আমার নাম নেই। এখন তুমি বলো, নামহীন মানুষ কি সত্যিই মারা যায়?”

“আপনার নাম কি ‘...নাথ’ দিয়ে শেষ?”

লোকটির চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল।

সে উত্তর দেওয়ার আগেই কাদার নিচে তলিয়ে গেল। চারপাশের মৃতদেহগুলো একসঙ্গে নড়ে উঠল। অসংখ্য হাত আমার জামা, পা ও কোমর আঁকড়ে ধরল। হারিকেনটি হাত থেকে ছুটে গেল।

আলো নিভে যাওয়ার ঠিক আগে ডোবার কিনারায় একটি নারীর অবয়ব দেখতে পেলাম।

স্নেহা।

যে ডোবার কোনো অস্তিত্ব নেই

সে ঝুঁকে আমার হাত ধরল। তার আঙুলের চাপ অস্বাভাবিক শক্ত। এক টানে আমাকে কাদা ও মৃত হাতগুলোর ভেতর থেকে ওপরে তুলে আনল।

শুকনো মাটিতে পড়ে শ্বাস নিতে লাগলাম। বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে। গলা দিয়ে বাতাস ঢুকছে, কিন্তু শরীর যেন শ্বাস নেওয়ার নিয়ম ভুলে গেছে।

স্নেহা হাঁটু গেড়ে আমার পাশে বসল।

“ধীরে শ্বাস নিন। আমার দিকে তাকান।”

চোখের সামনে তখনো ডোবার মৃত মুখগুলো ভাসছে। অন্ধের মতো হাত বাড়িয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।

স্নেহা প্রথমে স্থির হয়ে গেল। তারপর ধীরে আমার কাঁধের ওপর হাত রাখল। অন্য হাত দিয়ে মাথার পেছনটি ধরে বলল, “আপনি নিরাপদে আছেন। শ্বাস নিন।”

তার শরীর উষ্ণ। বুকের ভেতরে হৃদস্পন্দনও অনুভব করতে পারছি। পর্ব তিনের প্রতিরূপটির শরীর ছিল অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

নিজের আচরণ বুঝতে পেরে সরে এলাম।

“দুঃখিত।”

স্নেহা উত্তর দিল না। তার মুখে রাগ, উদ্বেগ এবং এমন একটি কোমলতা, যেটি সে সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে ফেলতে চাইছে।

পরক্ষণেই কঠিন স্বরে বলল, “কতবার আপনাকে এই জঙ্গলে আসতে নিষেধ করেছি?”

“আমি তোমাকেই খুঁজতে এসেছিলাম।”

“আমাকে?”

“দিদি বললেন, দুপুর থেকে তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”

স্নেহার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

“মা আপনাকে বলেছেন?”

“হ্যাঁ। করিডরের হেলানচেয়ারে বসে কাঁদছিলেন।”

সে দীর্ঘ সময় আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

“মা গতকাল তাঁর এক অসুস্থ বান্ধবীকে দেখতে গেছেন। আজ ফেরার কথা নয়।”

আমার বুকের মধ্যে আবার বাতাস আটকে গেল।

“তাহলে বাড়িতে যিনি ছিলেন?”

“আমি জানি না।”

“তিনি তোমার জন্য কাঁদছিলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোমাকে খুঁজে পাচ্ছেন না।”

“তিনি আপনাকে স্পর্শ করেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“তাঁর আঙুলে আংটি ছিল?”

“ছিল না। কাটা দাগ ছিল।”

স্নেহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“চলুন।”

“একটু দাঁড়াও। আমি ওই ডোবার মধ্যে অনেক মৃতদেহ দেখেছি।”

“কোন ডোবা?”

পেছনে তাকালাম।

যেখান থেকে সে আমাকে টেনে তুলেছে, সেখানে শুকনো মাটি। কয়েকটি শিকড় ও ঝরা পাতা ছাড়া আর কিছু নেই। আমার জামাকাপড়ও শুকনো। কোথাও কাদা নেই। পচা গন্ধ নেই।

শুধু ডান হাতের তালুতে কালচে একটি দাগ। যেন বহু পুরোনো পোড়া কাঠ কিংবা ভেজা কালি স্পর্শ করেছি।

“আমি একজন মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি।”

“তিনি কী বলেছেন?”

“দেশের কোনো কাগজে তাঁর নাম নেই। দত্ত পরিবারের খাতাতেও নেই।”

“আর কিছু?”

“আমার বেকারত্ব নিয়ে যথেষ্ট ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন।”

স্নেহার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।

“তিনি ভুল বলেননি।”

“তুমি কি মৃত লোকটির পক্ষ নিচ্ছ?”

“আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষীর অভাব নেই।”

তার হাসি দ্রুত মিলিয়ে গেল। সে নিচু স্বরে বলল, “এই জঙ্গল মানুষকে তার ভয় দেখায় না, মি. হাসান। মানুষ নিজের কাছ থেকে যে সত্য লুকিয়ে রাখে, কখনো কখনো সেটি দেখায়।”

“তাহলে আগুনে তোমাকে দেখলাম কেন?”

স্নেহা উত্তর দিল না।

যিনি বাড়িতে থাকার কথা নয়

দত্ত ভবনে ফেরার পথটি আশ্চর্যজনকভাবে ছোট হয়ে গেল। যে পথ পেরোতে আমার এত সময় লেগেছিল, স্নেহার সঙ্গে ফিরতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগল না।

পেছনের আঙিনায় পা রাখতেই বাড়ির দোতলার একটি জানালায় আলো জ্বলে উঠল।

“ওটা কার ঘর?”

“মায়ের।”

“তিনি যদি বাড়িতে না থাকেন, আলো জ্বালাল কে?”

“এই বাড়ির সব আলো মানুষের হাতে জ্বলে না।”

করিডরের হেলানচেয়ারটি এখনো দুলছে। তবে সেখানে কেউ নেই। চেয়ারের নিচের কালচে দাগটি আগের চেয়ে বড় হয়েছে। সেটি মেঝের ওপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে একটি অসম্পূর্ণ অক্ষরের আকার নিয়েছে।

স্নেহা দাগটির সামনে ঝুঁকে বসল।

“স্পর্শ করবেন না।”

“এটা কি রক্ত?”

“না। পুরোনো কালি।”

স্নেহা নিজের কাপড়ের একটি অংশ দিয়ে দাগটি মুছে ফেলল। কাপড় সঙ্গে সঙ্গে কালো হয়ে গেল।

“আপনি আজ রাতে একা থাকবেন না।”

“তোমার ঘরে যাব?”

সে কঠিন চোখে তাকাল।

“বিপদের মধ্যেও আপনার মাথায় অপ্রয়োজনীয় চিন্তা আসে কীভাবে?”

“দীর্ঘ বেকারত্বে অর্জিত বিশেষ দক্ষতা।”

স্নেহার ঘর

স্নেহার ঘরে আগে কখনো প্রবেশ করিনি। আজ সে দরজা খুলতেই বই, পুরোনো কাগজ ও কোনো ভেষজ ওষুধের মৃদু গন্ধ বেরিয়ে এল।

ঘরটি দত্ত ভবনের অন্য কক্ষগুলোর তুলনায় অনেক বেশি গোছানো। দেয়ালজুড়ে উঁচু বইয়ের তাক। সেখানে শরীরবিদ্যা, রোগতত্ত্ব, ওষুধবিজ্ঞান ও অস্ত্রোপচারবিষয়ক বই। কিছু বই নতুন, কিছু এত পুরোনো যে মলাটের অক্ষর মুছে গেছে।

একটি বইয়ের মেরুদণ্ডে প্রকাশনার সাল ১৯৫১। পাশের বইটি ১৯৬৯ সালের। পাতার ফাঁকে স্নেহার হাতের লেখার মতো নোট।

“তোমার লেখা?”

“নিশ্চিত নই।”

“নিজের হাতের লেখা চিনতে পারছ না?”

“একই হাত সবসময় একই মানুষের থাকে না।”

জানালার পাশে ছোট টেবিল। তার ওপর পুরোনো স্টেথোস্কোপ, শুকনো কালির দোয়াত, কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া নোট এবং মানুষের মাথার খুলির একটি মডেল। মডেলটি আমাকে এমনভাবে দেখছে, যেন জীবিত অবস্থায় তারও চাকরি হয়নি।

টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ছবি রাখা। ছবিতে স্নেহার পাশে এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। যুবকটির চুলের বিন্যাস, চোখের দৃষ্টি ও দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে আমার সঙ্গে সামান্য মিল।

আমি ছবিটি হাতে নেওয়ার আগেই স্নেহা সেটি উল্টে রাখল।

“কে?”

“পরিচিত একজন।”

“আমি কি তার মতো দেখতে?”

“কিছু মানুষ মুখের জন্য পরিচিত হয় না। ফিরে আসার ভঙ্গির জন্য পরিচিত হয়।”

“সে কোথায়?”

“নেই।”

“কী হয়েছিল?”

স্নেহা জানালার বাইরে তাকাল।

“তার নাম সৌরভ। কাজ না পাওয়া মানেই মানুষ হিসেবে ব্যর্থ হওয়া, একসময় সে তা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। আমরা কেউ তাকে বোঝাতে পারিনি যে কোনো নিয়োগপত্র মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে না।”

“সৌরভ কি দত্ত পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল?”

“না।”

উত্তরটি খুব দ্রুত এল।

“আপনি আসলে কী হতে চান?” স্নেহা জিজ্ঞেস করল।

প্রশ্নটি সহজ। উত্তরটি নয়।

চাকরি চাই। পরিবারকে টাকা পাঠাতে চাই। বাবার ওষুধ কিনতে চাই। মায়ের কণ্ঠের ‘সম্ভব হলে’ কথাটি বন্ধ করতে চাই। একসময় বিসিএস দেওয়ার কথাও ভেবেছি। একটি সরকারি পরিচয়পত্র, সম্মানজনক পদ এবং নিয়মিত বেতন মানুষের পরিবারের কাছে তার অস্তিত্ব প্রমাণের সহজ উপায়।

কিন্তু এসবের নিচে আরেকটি ইচ্ছা বহুদিন ধরে চাপা পড়ে আছে।

“একজন লেখক।”

“কী ধরনের লেখা?”

“রহস্য। থ্রিলার। এমন গল্প, যেখানে লিখতে লিখতে লেখক নিজেও বুঝতে পারেন না কে জীবিত আর কে মৃত।”

স্নেহা চারপাশে তাকাল।

“তাহলে এই বাড়ি আপনার জন্য উপযুক্ত।”

“কর্মপরিবেশ হিসেবে দত্ত ভবনের কিছু নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা আছে।”

“লিখতে কী প্রয়োজন?”

“একটি টাইপরাইটার।”

“কম্পিউটার নয়?”

“কম্পিউটারের পর্দায় শব্দগুলো অতিরিক্ত পরিষ্কার দেখায়। রহস্য লিখতে শব্দের গায়ে একটু কালি, ধুলো আর ভুল থাকা দরকার।”

স্নেহা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

“আমার সঙ্গে আসুন।”

“কোথায়?”

“সংরক্ষণকক্ষে।”

নামহীন মানুষের টাইপরাইটার

আমরা করিডর ধরে সংরক্ষণকক্ষের দিকে এগোলাম। দত্ত ভবন নিস্তব্ধ। আমাদের পায়ের শব্দ ছাড়া কিছু শোনা যাচ্ছে না। তবু মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে, আমাদের পেছনে তৃতীয় কেউ হেঁটে আসছে। আমরা থামলে সে থামে। হাঁটলে আবার হাঁটে।

করিডরের শেষ মাথায় পাশাপাশি দুটি দরজা। বাঁ পাশে সংরক্ষণকক্ষ। ডান পাশে পশ্চিমঘর।

পশ্চিমঘরের দরজায় আগের চেয়ে বেশি আঁচড়। কাঠের মাঝখানে নতুন তিনটি দাগ। এত গভীর যে ভেতরের হালকা রঙের কাঠ বেরিয়ে এসেছে।

স্নেহা আঁচলের ভাঁজ থেকে লম্বা পিতলের চাবি বের করল।

চাবি তালায় ঢোকানোর মুহূর্তে পশ্চিমঘরের ভেতর থেকে কাঠে আঘাত এল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

“ভেতরে কে?”

“জানি না।”

“আজ কেউ ‘পুরোনো বাড়িতে নানা রকম শব্দ হয়’ বলবে না?”

“আজ নয়।”

সে সংরক্ষণকক্ষের তালা খুলল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই কর্পূর, পুরোনো কাঠ, ধুলো ও কাগজের গন্ধ নাকে এল।

ঘরের উত্তর দেয়ালের ষষ্ঠ প্রতিকৃতির সামনে এসে থামলাম। আমার মতো দেখতে মানুষটি যথারীতি স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। তার অনামিকায় নীল পাথরের আংটি। নিচের ফলকে মুছে দেওয়া নাম।

স্নেহা ঘরের শেষ প্রান্তে একটি কাপড়ে ঢাকা টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করল।

কাপড় সরাতেই কালো রঙের পুরোনো টাইপরাইটার দেখা গেল। ধুলোয় ঢাকা থাকার কথা, কিন্তু যন্ত্রটি অস্বাভাবিক পরিষ্কার। যেন কিছুক্ষণ আগেই কেউ মুছে রেখেছে।

টাইপরাইটারে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ লাগানো। কাগজের ওপর কোনো লেখা নেই।

আমি হাত বাড়িয়ে একটি কী চাপতে গেলাম। তার আগেই টাইপরাইটারের ভেতর থেকে ধাতব শব্দ হলো।

একটি কী নিজে থেকেই নিচে নেমে গেল।

কাগজের ওপর কালো একটি অক্ষর ফুটে উঠল। তারপর দ্বিতীয় কী। তৃতীয়টি।

হঠাৎ টাইপরাইটারের রোলার ঘুরে কাগজটি এক লাইন ওপরে উঠে গেল। নতুন লাইনে দ্রুত কয়েকটি কী পড়ল।

যে নাম খাতায় নেই, সে নাম ছবিতে খুঁজো না।

যে মানুষ ডোবায় শুয়ে আছে, সে এখনো বাড়ির ভেতর হাঁটে।

আমার ডান হাতের কালচে দাগটি জ্বলে উঠল। তালুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দাগটি ধীরে ধীরে একটি বাংলা অক্ষরের রূপ নিচ্ছে।

স্নেহা উত্তর দেওয়ার আগেই পশ্চিমঘরের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

কণ্ঠটি খুব নিচু। খুব পরিচিত।

“স্নেহা...”

আমরা দুজন পশ্চিমঘরের দিকে তাকালাম।

কণ্ঠটি আবার ডাকল। এবার স্নেহাকে নয়।

“হাসান...”

স্নেহা আমার হাত চেপে ধরল। তার হাত এবার উষ্ণ নয়।

বরফের মতো ঠান্ডা।

আমি ধীরে তার মুখের দিকে তাকালাম। বাঁ ভ্রুর পাশের ছোট তিলটি আছে। একই চোখ, একই মুখ। তবু তার পেছনে ঝুলে থাকা কাচের আলমারিতে যে প্রতিবিম্বটি দেখা যাচ্ছে, সেটি আমাদের দিকে মুখ করে নেই।

প্রতিবিম্বের স্নেহা পশ্চিমঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।

আর আমার প্রতিবিম্বটি দাঁড়িয়ে আছে ষষ্ঠ প্রতিকৃতির সামনে।

আমরা বাস্তবে যেখানে দাঁড়িয়ে নেই।

ঠিক তখন সাড়ে বারোটায় থেমে থাকা ঘড়ির ঘণ্টা বেজে উঠল।

একবার।

দুইবার।

তিনবার।

তারপর টাইপরাইটারের সব কী একসঙ্গে নেমে গেল।

কাগজের নিচের অংশে ফুটে উঠল

“...নাথ”

কিন্তু নামের নিচে লেখা তারিখটি ১৯৪৭, ১৯৫২ কিংবা ১৯৭১ নয়।

তারিখটি আজকের।

চলবে...

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রচনা-সংক্রান্ত ঘোষণা

‘দত্ত পরিবার’ একটি মৌলিক কাল্পনিক সাহিত্যকর্ম। এর চরিত্র, পরিবার, বাড়ি, পশ্চিমঘর, মৃত মানুষের ডোবা এবং পারিবারিক রহস্য সৃজনশীল নির্মাণ। ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাস্তব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

দত্ত পরিবারের সদস্য, নামহীন মৃত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট চরিত্রগুলোর ঐতিহাসিক ভূমিকা উপন্যাসের কাল্পনিক কাহিনির অংশ। কোনো দর্শন, স্মৃতি, জনশ্রুতি বা অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতাকে যাচাইকৃত ঐতিহাসিক দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
মোঃ মেহেদি হাসান আমার পুরো নাম: মোঃ মেহেদি হাসান। কলম নাম: মি. বিকেল। আমি ‘অভিযাত্রী (Oviyatri)’ ওয়েবসাইটের প্রধান সম্পাদক ও পরিচালক। আমি পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেছি। আমার লেখা প্রথম বই ‘জোনাকিরা সব ঘুমিয়ে গেছে (ছোট গল্প সংকলন)’ প্রকাশিত হয় গত ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ সালে ভারতে এবং ১ম জানুয়ারী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে। বইটি বর্তমানে রকমারি.কম -এ উপলব্ধ। বর্তমানে আমি একটি স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত আছি। এছাড়াও আমি মাইক্রোসফটে ডেভেলপার প্রোগ্রামে গত ২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস থেকে কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২৫ আগস্ট, ২০২১ সালে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করি। বর্তমানে এই ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে ‘দ্য ব্যাকস্পেস’ প্রতিষ্ঠানের টিম কতৃক। আমার সম্পর্কে বা আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অথবা, আমাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ থাকলে যোগাযোগ করুন: [email protected] -এই ঠিকানায়। অভিযাত্রীতে আপনাকে স্বাগতম!