প্রথমবার লিখতে বসে সংকোচ বোধ করা অস্বাভাবিক নয়। শুরুতেই সুন্দর, নির্ভুল ও পরিপূর্ণ লেখা তৈরি করতে হবে, এমন চাপ অনেককে লেখার আগেই থামিয়ে দেয়। কিন্তু প্রথম লেখাটি নিখুঁত না হলে কী আসে যায়? লেখা একদিনে অর্জন করা কোনো দক্ষতা নয়। এটি পড়া, লেখা, ভুল করা এবং সংশোধনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
একবার ভাবুন, পড়ে যাওয়ার ভয়ে একটি শিশুকে যদি কখনো দাঁড়াতেই দেওয়া না হতো, তাহলে কি শিশুটি হাঁটতে শিখত? হাঁটতে শেখার আগে তাকে বারবার চেষ্টা করতে হয়। কখনো ভারসাম্য হারায়, কখনো পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। লেখার শুরুটাও অনেকটা এমন। ভুল হবে, বাক্য এলোমেলো হবে, মনের কথাটি প্রথমবার ঠিকভাবে প্রকাশ না-ও পেতে পারে। তবু লিখতে হবে।
প্রথম বাধা
ভয়কে জয় করুন
ভয়কে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং ভয় থাকা সত্ত্বেও একটি ছোট বাক্য দিয়ে শুরু করুন। শুরু করতে পারাই প্রথম অর্জন। আজ হয়তো কয়েকটি বাক্য লিখবেন, আগামীকাল একটি অনুচ্ছেদ। নিয়মিত চর্চা করতে থাকলে একদিন দেখবেন, শুধু লিখতেই নয়, নিজের চিন্তাকে আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করতেও শিখেছেন।
আপনার চিন্তা, দর্শন, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি লেখার মাধ্যমে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। আপনি অনেক কিছু ভাবছেন, কিন্তু সেগুলো কোথাও লিখছেন না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনাগুলো আপনার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। লেখা সেই সীমাবদ্ধতা ভাঙতে সাহায্য করে।
লেখা শুধু অন্যকে কিছু জানানোর মাধ্যম নয়। লিখতে গেলে নিজের ভাবনাকেও নতুনভাবে পরীক্ষা করতে হয়। কোন কথাটি গুরুত্বপূর্ণ, কোন যুক্তিটি দুর্বল এবং কোথায় আরও জানার প্রয়োজন আছে, তা লেখার সময় পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এভাবে লেখা চিন্তা, পর্যবেক্ষণ এবং আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করতে পারে।
মূল উপলব্ধি
লেখা একটি সেতু
আপনার ভাবনা এবং পাঠকের মধ্যে লেখাই সেতু হিসেবে কাজ করে। ভাবনা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, সেটি পাঠকের কাছে পৌঁছাতে প্রয়োজন পরিষ্কার ও আন্তরিক প্রকাশ। এই প্রকাশক্ষমতা স্থির কোনো গুণ নয়। নিয়মিত পড়া, লেখা, সংশোধন এবং পাঠকের প্রতিক্রিয়া থেকে শেখার মাধ্যমে এটি উন্নত করা সম্ভব।
ব্যবহারিক নির্দেশনা
লেখার দক্ষতা বাড়ানোর ৫টি উপায়
পড়া এবং লেখার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত পড়লে নতুন শব্দ, বাক্যগঠন এবং ভিন্ন দৃষ্টিকোণের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তবে শুধু পড়লেই লেখার দক্ষতা তৈরি হয় না। পড়ার পাশাপাশি নিয়মিত লেখার চর্চাও প্রয়োজন।
প্রতিদিন পড়ুন, তারপর সংক্ষেপে লিখুন
প্রতিদিন বই, প্রবন্ধ, সংবাদ, গবেষণাভিত্তিক নিবন্ধ বা আপনার আগ্রহের কোনো লেখা পড়ুন। পড়ার পর নিজের ভাষায় দুই থেকে পাঁচটি বাক্য লিখুন। লেখাটি আপনাকে কী ভাবিয়েছে, কোন তথ্যটি নতুন লেগেছে কিংবা কোথায় আপনার ভিন্নমত আছে, তা তুলে ধরতে পারেন।
কোনো ব্লগ বা ওয়েবসাইটের লেখা পড়ে গঠনমূলক মন্তব্য করেও শুরু করা যায়। শুধু “ভালো লাগল” লিখে থেমে না গিয়ে কেন ভালো লেগেছে বা কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তা বলুন। এতে চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশ করার অভ্যাস তৈরি হবে।
ছোট লেখা দিয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি করুন
শুরুতেই দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখার চাপ নেবেন না। একটি অভিজ্ঞতা, একটি প্রশ্ন, একটি বইয়ের ধারণা কিংবা দিনের একটি পর্যবেক্ষণ নিয়ে ছোট লেখা তৈরি করুন। প্রথমে ১০০ থেকে ২০০ শব্দই যথেষ্ট।
ছোট লেখা লিখতে লিখতে নিজের শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো বুঝতে পারবেন। কোনো বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হলে ধীরে ধীরে লেখার পরিধি বাড়ান। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মিত লেখা, একদিনেই বড় লেখক হয়ে ওঠার চেষ্টা নয়।
একটি লেখা প্রকাশ করুন
সাহস করে একটি লেখা প্রকাশ করুন। সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ব্যক্তিগত ব্লগ, অনলাইন ম্যাগাজিন অথবা কোনো লেখকগোষ্ঠীর জন্য লেখা হতে পারে। প্রকাশের আগে বানান, বাক্যের স্বচ্ছতা এবং তথ্যের নির্ভুলতা পরীক্ষা করুন।
পাঠকের মন্তব্যের উত্তর দিন। তবে সব মন্তব্যকে চূড়ান্ত বিচার হিসেবে গ্রহণ করবেন না। কোন প্রতিক্রিয়া গঠনমূলক, কোনটি ব্যক্তিগত পছন্দ এবং কোনটি অপ্রাসঙ্গিক, তা আলাদা করতে শিখুন।
পাঠকের প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, আপনার বক্তব্য কোথায় পরিষ্কার হয়েছে এবং কোথায় আরও ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল। এই শেখা পরবর্তী লেখাকে আরও উন্নত করবে।
কৌতূহল থেকে বিষয় খুঁজুন
“কী নিয়ে লিখব?” নতুন লেখকদের খুব পরিচিত প্রশ্ন। এর উত্তর আপনার চারপাশেই আছে। নিজের কাজ, পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা, কোনো সমস্যা, কোনো বই, সামাজিক ঘটনা অথবা এমন একটি প্রশ্ন নিয়ে লিখুন, যা আপনাকে ভাবায়।
অনলাইনে অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। তবে পাওয়া তথ্য সরাসরি সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। সরকারি নথি, মূল গবেষণা, বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম, পরিচিত প্রকাশনা এবং প্রাসঙ্গিক বই থেকে তথ্য যাচাই করুন। অন্যের লেখা থেকে ধারণা নিলে উৎস উল্লেখ করুন এবং অন্যের ভাষা নিজের নামে ব্যবহার করবেন না।
কোনো লেখা পড়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হলে প্রশ্নটি লিখে রাখুন। তারপর বিষয়টি সম্পর্কে আরও পড়ুন। অনেক সময় একটি ভালো লেখা কোনো বড় উত্তর থেকে নয়, বরং একটি সৎ ও স্পষ্ট প্রশ্ন থেকে শুরু হয়।
ডায়েরি বা নোট লেখার অভ্যাস করুন
ডায়েরি লেখা পুরোনো হলেও কার্যকর একটি অভ্যাস। সারাদিনের প্রতিটি ঘটনা লিখতে হবে না। দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, একটি উপলব্ধি, কোনো কথোপকথন অথবা মনে থেকে যাওয়া একটি প্রশ্ন লিখুন।
কাগজের ডায়েরিতে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য না হলে ফোনের নোট অ্যাপ, কম্পিউটারের document অথবা ব্যক্তিগত digital journal ব্যবহার করতে পারেন। মাধ্যমটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, নিয়মিত লিখতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি সপ্তাহের শেষে আগের লেখাগুলো আবার পড়ুন। কোথায় বাক্য অস্পষ্ট হয়েছে, কোন ভাবনাটি আরও বিস্তৃত করা যায় এবং কোন বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে, তা চিহ্নিত করুন। পুরোনো লেখার সঙ্গে নতুন লেখা তুলনা করলে নিজের অগ্রগতি সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।
সাধারণ ভুল
প্রথম খসড়াকেই চূড়ান্ত ভাববেন না
প্রথমে মনের কথাটি লিখুন। এরপর অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিন, অস্পষ্ট বাক্য পরিষ্কার করুন এবং তথ্য যাচাই করুন। লেখা মানে শুধু শব্দ বসানো নয়। পুনরায় পড়া, প্রয়োজনীয় অংশ পুনর্লিখন এবং সংশোধন করাও লেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ACTION STEPS
আজকের ছোট অনুশীলন
১. আজ পড়া বা দেখা কোনো একটি বিষয় নির্বাচন করুন।
২. বিষয়টি আপনাকে কেন ভাবিয়েছে, তা পাঁচটি বাক্যে লিখুন।
৩. লেখাটি একবার পড়ে অপ্রয়োজনীয় শব্দ বাদ দিন।
৪. আগামী সাত দিন একই অভ্যাস চালিয়ে যান।
শেষ কথা
শুরুটা আজই হোক
ভালো লেখার অপেক্ষায় বসে থাকলে হয়তো শুরুই করা হবে না। বরং লিখতে শুরু করুন, তারপর লেখাটিকে ভালো করে তুলুন। প্রথম লেখাটি দুর্বল হতে পারে, কিন্তু না-লেখা কোনো দিনই উন্নত হয় না।
সাহস করে আজই একটি বাক্য লিখুন। পরের বাক্যটি তখন আর এত কঠিন মনে হবে না। শুভকামনা।
লেখকত্ব ও সম্পাদকীয় কৃতিত্ব
প্রকাশনা পরিচিতি
কপিরাইট: © অভিযাত্রী। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।