রেমিট্যান্সের আড়ালের মানুষ: বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা কেন এখনো অবহেলিত?

রেমিট্যান্সের অর্থনৈতিক অবদানের আড়ালে বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের অতিরিক্ত ব্যয়, মজুরি-বঞ্চনা, পারিবারিক চাপ, বিমানবন্দর হয়রানি ও অধিকারসংকটের গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ।

প্রকাশিত:
হালনাগাদ:
 ০  ৩
রেমিট্যান্সের আড়ালের মানুষ: বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা কেন এখনো অবহেলিত?
বিদেশের ছোট একটি কক্ষে কাজের পোশাক, হেলমেট ও ভ্রমণব্যাগের পাশে বসে মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে থাকা এক অভিবাসী কর্মীর বাস্তবধর্মী দৃশ্য।

সম্পাদকীয় • অভিবাসন • শ্রম অধিকার

রেমিট্যান্সের আড়ালের মানুষ: বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা কেন এখনো অবহেলিত?

বিদেশযাত্রার ঋণ থেকে কর্মক্ষেত্রের শোষণ, পারিবারিক চাপ, বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা ও দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা পর্যন্ত একটি অধিকারভিত্তিক অনুসন্ধান

পাঠকের জন্য নোট

এই নিবন্ধে অভিবাসী কর্মীদের আর্থিক চাপ, নির্যাতন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মহত্যার ঝুঁকির প্রসঙ্গ এসেছে। কোনো ব্যক্তির সংকটকে একক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা না করে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার আলোকে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে।

মূল কথা

বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না। তাঁরা ঋণ নেন, পরিবার থেকে দূরে থাকেন, অচেনা শ্রমবাজারে কাজ করেন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ মোকাবিলা করেন এবং দেশে ফেরার পর নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করেন।

তাঁদের সম্মান করার অর্থ শুধু “রেমিট্যান্স যোদ্ধা” বলা নয়। নিরাপদ অভিবাসন, স্বচ্ছ নিয়োগ, ন্যায্য মজুরি, আইনি প্রতিকার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করাই প্রকৃত সম্মান।

“বুকে কষ্ট, মুখে হাসি, এরই নাম প্রবাসী”, এই বাক্যটি বাংলাদেশের সামাজিক কথাবার্তায় বহুল পরিচিত। বাক্যটির মধ্যে ভালোবাসা আছে, ত্যাগের স্বীকৃতিও আছে। কিন্তু এর আড়ালে একটি অস্বস্তিকর স্বাভাবিকীকরণও রয়েছে। যেন প্রবাসে যাওয়া মানুষটির কাজই কষ্ট সহ্য করা, অর্থ পাঠানো এবং নিজের প্রয়োজন নীরবে সরিয়ে রাখা।

পরিবার কখনো জানতে চায়, কত টাকা পাঠানো যাবে। কিন্তু মানুষটি কী খাচ্ছেন, কোথায় থাকছেন, ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন কি না, ঋণের চাপ কেমন অথবা মানসিকভাবে কতটা একা হয়ে পড়েছেন, সেই প্রশ্নগুলো তুলনামূলক কম শোনা যায়। এটি প্রতিটি পরিবারের বাস্তবতা নয়। কিন্তু বহু অভিবাসী কর্মীর অভিজ্ঞতায় অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ও আবেগিক দূরত্ব পাশাপাশি উপস্থিত থাকে।

রেমিট্যান্সের অঙ্ক এবং মানুষের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত অনুসারে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রাপ্ত ব্যক্তিগত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভুল বা অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যান ব্যবহার করা উচিত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২১–২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স-জিডিপি অনুপাত ছিল ৪.৫৬ শতাংশ, ১৫ শতাংশ নয়।

রেমিট্যান্স পরিবারকে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান ও ঋণ পরিশোধে সহায়তা করে। জাতীয় পর্যায়ে এটি বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ায়। কিন্তু শুধু কত ডলার দেশে এসেছে, সেই হিসাব করলে অর্থ পাঠানো ব্যক্তিটির শ্রম, ব্যয়, ঝুঁকি ও অধিকার অদৃশ্য থেকে যায়। তখন কর্মী মানুষ থেকে অর্থনৈতিক সূচকে পরিণত হন।

প্রবাসী নাকি অভিবাসী কর্মী?

“প্রবাসী” একটি বিস্তৃত পরিচয়। বিদেশে বসবাসরত শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, স্থায়ী অভিবাসী ও শ্রমিক সবাই এর মধ্যে থাকতে পারেন। এই নিবন্ধের প্রধান বিষয় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া, বিদেশে কর্মরত অথবা কাজ শেষে দেশে ফেরা বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী। তাঁদের সবার আয়, দক্ষতা, আইনি অবস্থা ও কর্মপরিবেশ এক নয়।

বিদেশে যাওয়ার আগেই ঋণ ও অনিশ্চয়তার শুরু

বিদেশের মাটিতে পৌঁছানোর পর নয়, অনেক কর্মীর সংকট শুরু হয় দেশ ছাড়ার আগেই। নিয়োগ ফি, ভিসা, চিকিৎসা পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, বিমানভাড়া, দালালের কমিশন এবং নানা অনানুষ্ঠানিক ব্যয় মেটাতে কেউ ঋণ নেন, কেউ জমি বা গবাদিপশু বিক্রি করেন, কেউ আত্মীয়ের কাছ থেকে সুদে অর্থ ধার করেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার আলোচনায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের অভিবাসন ব্যয় জরিপ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, একজন বাংলাদেশি কর্মীর বিদেশ যাওয়ার ব্যয় পুনরুদ্ধার করতে কমপক্ষে ১৭ মাস লাগতে পারে। ভিসা-বাণিজ্য, অস্বচ্ছ নিয়োগ, অনিয়ন্ত্রিত মধ্যস্থতাকারী এবং গোপন খরচ অভিবাসনের ব্যয় আরও বাড়ায়।

এত বড় আর্থিক বিনিয়োগের পর বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়া বা কম বেতন পাওয়া কর্মীর সামনে সহজে দেশে ফেরার পথ খোলা থাকে না। ফিরে এলে ঋণ, সামাজিক চাপ এবং ব্যর্থতার অপবাদ অপেক্ষা করতে পারে। ফলে অনেকে অনুপযুক্ত বা শোষণমূলক কাজেও থেকে যেতে বাধ্য হন।

দালালের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব কাজের ব্যবধান

বিদেশযাত্রার আগে কর্মীকে যে চাকরি, বেতন, কর্মঘণ্টা ও আবাসনের কথা বলা হয়, বাস্তবে তার সঙ্গে পার্থক্য দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো কর্মী বিদেশে পৌঁছে জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত প্রতিষ্ঠান বা পেশার বদলে অন্য কাজ করতে হবে। কারও কাজের অনুমতিপত্র থাকে না, কারও নিয়োগকর্তা পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখেন, আবার কেউ চুক্তিতে লেখা মজুরি পান না।

বাংলাদেশে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবস্থা থাকলেও কর্মী সংগ্রহে অননুমোদিত মধ্যস্থতাকারী ও সাব-এজেন্টের ভূমিকা দীর্ঘদিনের সমস্যা। কর্মীর সঙ্গে সরাসরি যার আর্থিক লেনদেন হয়, তিনি অনেক সময় লাইসেন্সধারী নিয়োগকারী নন। এতে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে দায় নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সাধারণ ভুল

সব রিক্রুটিং এজেন্সি, মধ্যস্থতাকারী, নিয়োগকর্তা বা গন্তব্যদেশের কর্মপরিবেশ এক নয়। সমস্যাকে ব্যবস্থা ও নীতির দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত ঘটনা থেকে সব প্রতিষ্ঠান বা সব অভিবাসী কর্মীর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

মজুরি-বঞ্চনা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও তাপঝুঁকি

বিদেশে কর্মরত কিছু বাংলাদেশি কর্মী সময়মতো মজুরি না পাওয়া, আংশিক বেতন, ব্যাখ্যাহীন কর্তন এবং বকেয়া মজুরির অভিযোগ করেন। মজুরি আটকে গেলে কর্মীর নিজের খাবার, বাসাভাড়া ও যাতায়াত ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে দেশে থাকা পরিবারের ব্যয় ও ঋণের কিস্তি চাপ সৃষ্টি করে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু নির্মাণ, পরিষেবা ও বহিরাঙ্গন কাজে প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শারীরিক পরিশ্রম এবং অপর্যাপ্ত বিশ্রাম স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে দেশ, ঋতু, পেশা ও কর্মক্ষেত্রভেদে পরিস্থিতি আলাদা। তাই ৪৫ বা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে প্রত্যেক অভিবাসী কর্মীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

অভিবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে গণমাধ্যম ও অধিকারভিত্তিক প্রতিবেদনে অতিরিক্ত তাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, খারাপ আবাসন, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক চাপের প্রশ্ন উঠে এসেছে। অস্বাভাবিক বা অল্প বয়সে মৃত্যুর ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্তের প্রয়োজনও বহুবার আলোচিত হয়েছে।

নারী অভিবাসী কর্মীদের পৃথক ঝুঁকি

অভিবাসী কর্মীদের নিয়ে আলোচনায় পুরুষ নির্মাণশ্রমিক বা চালকের ছবি বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু নারী অভিবাসী কর্মীদের বড় একটি অংশ গৃহকর্ম ও স্বল্পমজুরির অনানুষ্ঠানিক কাজে নিযুক্ত। তাঁদের কর্মস্থল অনেক সময় একই সঙ্গে বাসস্থান হওয়ায় কাজ ও ব্যক্তিগত সময়ের সীমা ভেঙে যায়।

আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় নারী কর্মীদের মজুরি আটকে রাখা, চলাফেরায় বাধা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং নোটিশ ছাড়াই দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি উঠে এসেছে। নারী কর্মীদের অভিজ্ঞতা সব দেশে বা সব নিয়োগকর্তার ক্ষেত্রে এক নয়, কিন্তু তাঁদের সুরক্ষায় আলাদা নীতি ও কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা প্রয়োজন।

পরিবারের কাছে মানুষ, নাকি অর্থের উৎস?

পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানো অনেক অভিবাসী কর্মীর প্রধান লক্ষ্য। সেই অর্থে সন্তান পড়াশোনা করে, চিকিৎসা চলে, ঘর তৈরি হয় এবং ঋণ পরিশোধ হয়। কিন্তু আর্থিক নির্ভরতা কখনো কখনো এমন প্রত্যাশা তৈরি করে, যেখানে কর্মীর নিজের প্রয়োজন, স্বাস্থ্য ও সঞ্চয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

কারও পক্ষে প্রত্যাশিত অর্থ পাঠানো সম্ভব না হলে তাঁকে আয় গোপন করা বা মিথ্যা বলার অভিযোগ শুনতে হতে পারে। অথচ সেই মাসে হয়তো বেতন দেরিতে এসেছে, চিকিৎসায় খরচ হয়েছে অথবা কাজই ছিল না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত আর্থিক পরিকল্পনা ও বাস্তব যোগাযোগ না থাকলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে।

আবার সব পরিবার অভিবাসী সদস্যকে অবহেলা করে না। বহু পরিবার ঋণ ভাগ করে নেয়, সঞ্চয় করে, সম্পদের হিসাব রাখে এবং প্রয়োজনে ফিরে আসতে উৎসাহ দেয়। তাই সমস্যাকে “পরিবার বনাম প্রবাসী” সংঘাত হিসেবে নয়, অসম তথ্য, অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং স্বচ্ছ আর্থিক পরিকল্পনার অভাব হিসেবেও দেখা দরকার।

দীর্ঘ প্রবাসের পর দেশে ফেরার কঠিন বাস্তবতা

দশ, পনেরো বা বিশ বছর বিদেশে থাকার পর দেশে ফেরা সব সময় স্বস্তির হয় না। পাঠানো অর্থের হিসাব, জমি বা বাড়ির মালিকানা, ঋণ, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে কর্মীর সামাজিক নেটওয়ার্ক ও পেশাগত দক্ষতার স্থানীয় মূল্যও বদলে যেতে পারে।

একজন কর্মী বিদেশে নির্দিষ্ট কাজ জানলেও দেশে ফিরে সেই দক্ষতার উপযুক্ত কাজ নাও পেতে পারেন। সঞ্চয় না থাকলে বা পাঠানো অর্থের স্বচ্ছ হিসাব না থাকলে আবার ঋণ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। তাই প্রত্যাবর্তনকে শুধু বিমানবন্দর থেকে বাড়ি পৌঁছানো হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

মানসিক স্বাস্থ্য: যে কষ্ট দেখা যায় না

ঋণ, চাকরির অনিশ্চয়তা, মজুরি না পাওয়া, নিয়োগকর্তার আচরণ, বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক বিরোধ এবং দেশে ফেরার ভয় অভিবাসী কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সহায়তা চাওয়াকে দুর্বলতা মনে করা এবং কর্মস্থলের পাশে উপযুক্ত সেবা না থাকা পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে।

বাংলাদেশি গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বিদেশে কর্মরত ব্যক্তির আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনার কোনো কোনোটিতে ব্যবসায়িক বিরোধ, ঋণ, আর্থিক চাপ বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের অভিযোগ এসেছে। কিন্তু আত্মহত্যা জটিল এবং বহুমাত্রিক। একটি ঘটনা বা মৃত্যুকে এককভাবে “পারিবারিক কলহের ফল” বলা বৈজ্ঞানিক ও মানবিকভাবে যথার্থ নয়।

একটি ছোট গবেষণায় ফেরত অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার চিন্তার উদ্বেগজনক উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে নমুনা সীমিত হওয়ায় এটিকে সব বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীর জাতীয় হার বলা যায় না। ফলটি বরং বৃহত্তর গবেষণা, কাউন্সেলিং, গোপনীয় সহায়তা এবং প্রত্যাবর্তনপরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন নির্দেশ করে।

সংকটে কী করা উচিত?

কেউ নিজের ক্ষতি করার কথা বললে বিষয়টিকে হালকা না নিয়ে তাঁর সঙ্গে থাকা, নিকটস্থ বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা সহকর্মীর সহায়তা নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশের জরুরি সেবা, বাংলাদেশ মিশন বা স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা প্রয়োজন। নৈতিক বিচার বা দোষারোপ নয়, তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার।

বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা: অভিযোগ, প্রমাণ ও পরিবর্তন

বাংলাদেশে ফেরার মুহূর্তটি একজন অভিবাসী কর্মীর জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গণশুনানিতে অভিবাসী কর্মীরা কর্মীদের অসদাচরণ, লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ খুলে মালামাল হারানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন। এসব অভিযোগ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে নথিভুক্ত হয়েছে।

তবে প্রতিটি হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজের জন্য একই প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়। লাগেজ যাত্রার উৎস বিমানবন্দর, ট্রানজিট, এয়ারলাইন হ্যান্ডলিং, ঢাকার বিমানবন্দর বা ভুলবশত অন্য যাত্রীর কাছে যেতে পারে। ফলে ভুক্তভোগীর অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কোথায় ক্ষতি হয়েছে, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হটলাইন, সার্বক্ষণিক ম্যাজিস্ট্রেট, নজরদারি এবং baggage handling-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বডি ক্যামেরার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গবেষণা সংস্থা RMMRU-এর ২০২৬ সালের মূল্যায়নে আগের তুলনায় হয়রানি কিছুটা কমার কথা বলা হয়েছে। এই উন্নতি স্বীকার করেও বলা যায়, দ্রুত লাগেজ সরবরাহ, অভিযোগের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি এবং সব যাত্রীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।

আইন আছে, কিন্তু অধিকার কতটা পৌঁছায়?

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩ নিরাপদ ও ন্যায্য অভিবাসন, কর্মসংস্থান চুক্তি, তথ্য পাওয়ার অধিকার, আইনি সহায়তা, দেশে ফেরার অধিকার এবং কল্যাণমূলক কর্মসূচির ভিত্তি দিয়েছে। তাই “রাষ্ট্র কিছুই করে না” বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি আইন আছে বলেই সব কর্মী সুরক্ষিত, এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।

মূল প্রশ্ন বাস্তবায়ন। কর্মী নিজের অধিকার জানেন কি না, চুক্তি বুঝে স্বাক্ষর করেন কি না, অভিযোগ কোথায় করবেন জানেন কি না, দূতাবাসের শ্রম উইং সহজে পাওয়া যায় কি না এবং ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হয় কি না, এসবের ওপর আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে।

কী পরিবর্তন প্রয়োজন?

১. অভিবাসন ব্যয় কমানো: সরকারনির্ধারিত ব্যয়, বাস্তব ব্যয় ও কর্মীর পরিশোধ করা অর্থের মধ্যে পার্থক্য প্রকাশ এবং অননুমোদিত অর্থগ্রহণের প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।

২. লিখিত ও বোধগম্য চুক্তি: পেশা, বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, আবাসন, চিকিৎসা, পাসপোর্টের হেফাজত এবং বিরোধ নিষ্পত্তির পথ কর্মীর বোঝার ভাষায় জানাতে হবে।

৩. সাব-এজেন্টের জবাবদিহি: কর্মীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণকারী প্রতিটি মধ্যস্থতাকারীর পরিচয় ও দায় নথিভুক্ত করতে হবে।

৪. মজুরি সুরক্ষা: সময়মতো বেতন, বৈধ কর্তন, ডিজিটাল পেমেন্ট রেকর্ড এবং বকেয়া মজুরি আদায়ের দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

৫. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: দূতাবাস, শ্রম উইং ও কর্মী সহায়তা কেন্দ্রে গোপনীয় কাউন্সেলিং এবং জরুরি referral ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৬. নারী কর্মীদের বিশেষ সুরক্ষা: নিরাপদ আশ্রয়, উদ্ধার, আইনি সহায়তা এবং গৃহকর্মীদের জন্য কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

৭. বিমানবন্দরে মর্যাদাপূর্ণ সেবা: লাগেজ অভিযোগের tracking, নির্ধারিত নিষ্পত্তিসময়, কর্মীদের আচরণবিধি এবং ফল প্রকাশ প্রয়োজন।

৮. প্রত্যাবর্তন ও পুনঃএকত্রীকরণ: দক্ষতার স্বীকৃতি, কর্মসংস্থান, ছোট ব্যবসা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং পরিবারের আর্থিক পরামর্শ একসঙ্গে দিতে হবে।

সরকারি সহায়তা পাওয়ার কয়েকটি পথ

প্রবাসী কল সেন্টার, দেশ থেকে: ১৬১৩৫

বিদেশ থেকে: +৮৮০৯৬১০১০২০৩০

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড: আহত ও অসুস্থ কর্মীর সহায়তা, প্রত্যাবাসন, চিকিৎসা, বীমা, বকেয়া পাওনা আদায়, মৃতদেহ দেশে আনা বা স্থানীয়ভাবে দাফন, শিক্ষাবৃত্তি ও পুনঃএকত্রীকরণসহ বিভিন্ন সেবা প্রদান করে।

গুরুত্বপূর্ণ: অভিযোগের সময় পাসপোর্ট, চুক্তিপত্র, ভিসা, টাকা দেওয়ার রসিদ, কথোপকথনের নথি, বেতন রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

শেষকথা

একজন অভিবাসী কর্মীকে সম্মান করার জন্য তাঁকে জাতীয় বীর বলাই যথেষ্ট নয়। বিদেশে যাওয়ার আগে প্রতারণা থেকে সুরক্ষা, বিদেশে ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বিপদে দ্রুত আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা এবং দেশে ফেরার পর মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

রেমিট্যান্স অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। কিন্তু যে মানুষটি সেই অর্থ পাঠান, তাঁর জীবন কোনো অর্থনৈতিক যন্ত্র নয়। তাঁর ক্লান্তি, অসুস্থতা, সঞ্চয়, পরিবার, ভবিষ্যৎ ও অধিকার আছে। রেমিট্যান্সের অঙ্কের আড়াল থেকে সেই মানুষটিকে দৃশ্যমান করাই আমাদের প্রথম দায়িত্ব।

লেখকত্ব, সম্পাদনা ও প্রকাশনা

মূল লেখক: আব্দুস সাদিক (সাদিক ইবনে আফতাব)

মূল শিরোনাম: “প্রবাসীরা কেন এত অবহেলিত!”

মূল প্রকাশ: দ্য ব্যাকস্পেস জার্নাল, ২৮ জুলাই ২০২৩

গবেষণা, তথ্য যাচাই ও সম্পাদনা: অভিযাত্রী সম্পাদনা প্যানেল

কপিরাইট: বর্তমান গবেষণাভিত্তিক ও সম্পাদিত সংস্করণের প্রকাশনা অধিকার অভিযাত্রী কর্তৃক সংরক্ষিত। মূল লেখকের নাম, প্রশ্ন ও সৃজনশীল অবদান স্বীকৃত।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. Bangladesh Bank. Quarterly Report on Remittance Inflows in Bangladesh: January–March 2023। রেমিট্যান্স প্রবাহ ও জিডিপির সঙ্গে অনুপাত। প্রতিবেদন দেখুন

২. World Bank Data. “Personal Remittances, Received: Bangladesh.” রেমিট্যান্সের পরিমাণ ও জিডিপি অনুপাতের সময়ক্রমিক উপাত্ত। উপাত্ত দেখুন

৩. International Labour Organization. “Bangladesh: Rethinking Labour Migration Governance for a Fairer Future.” ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪। অভিবাসন ব্যয়, নিয়োগব্যবস্থা, মধ্যস্থতাকারী ও নারী কর্মীদের ঝুঁকি। মূল লেখা দেখুন

৪. International Organization for Migration. Bangladesh Migration Snapshot Report 2023। শ্রম অভিবাসন, প্রত্যাবর্তন ও রেমিট্যান্সের সমন্বিত উপাত্ত। প্রতিবেদন দেখুন

৫. বাংলাদেশ সরকার। “বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩।” নিরাপদ অভিবাসন, কর্মসংস্থান চুক্তি, তথ্য, আইনি সহায়তা ও কল্যাণমূলক অধিকারের আইনি কাঠামো। আইন দেখুন

৬. The Daily Star. “Passengers at Mass Hearing Share Bitter Experiences at the Dhaka Airport.” ১০ আগস্ট ২০২২। অভিবাসী কর্মীদের অসদাচরণ ও লাগেজসংক্রান্ত অভিযোগ। প্রতিবেদন দেখুন

৭. The Business Standard. “Passengers Lambast Biman, Dhaka Airport for Service Issues.” ২৫ জুন ২০২৪। বিমানবন্দরসেবা, লাগেজ, কাস্টমস ও যাত্রী অভিযোগ। প্রতিবেদন দেখুন

৮. FairSquare Projects ও Vital Signs Partnership. The Deaths of Migrants in the Gulf, মার্চ ২০২২। তাপঝুঁকি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, আবাসন, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা ও মানসিক চাপ। প্রতিবেদন দেখুন

৯. Ahmed, Pavel; Akter, Mst. Safia; Hawlader, Rashed Ahmed. “From Migration to Psychological Distress: Depression, Suicidal Thoughts and Associated Factors among Bangladeshi Migrant Workers.” Journal of Working-Class Studies, ২০২৫। সীমিত নমুনাভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণা। গবেষণাটি দেখুন

১০. ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। আহত ও অসুস্থ কর্মী, বীমা, প্রত্যাবাসন, বকেয়া পাওনা, শিক্ষাবৃত্তি ও পুনঃএকত্রীকরণসহ সরকারি কল্যাণসেবা। সরকারি সেবার পাতা দেখুন

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখজনক দুঃখজনক 0
চমৎকার চমৎকার 0
আব্দুস সাদিক আমি আব্দুস সাদিক, একজন কনটেন্ট রাইটার ও বহুবিষয়ক ফিচার লেখক। মানুষের জীবন, স্বাস্থ্যসচেতনতা, মানবিক সম্পর্ক, জীবনধারা, জীবনী, বিনোদন ও খেলাধুলার নানা বিষয় নিয়ে লিখতে ভালোবাসি। জটিল ও প্রয়োজনীয় তথ্যকে সহজ, সাবলীল এবং পাঠকবান্ধব ভাষায় তুলে ধরাই আমার লেখার প্রধান লক্ষ্য। ২০২২ সালের কাতার FIFA World Cup চলাকালে বিশ্বকাপের বিভিন্ন ঘটনা ও আলোচিত প্রসঙ্গ নিয়েও লেখালেখি করেছি। পাঠকের চিন্তা, সচেতনতা ও দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক মূল্য যোগ করতে পারে, এমন লেখা তৈরি করতে চাই।