ছুটির লেসন প্ল্যান: ২০১৫-এর অসম্পূর্ণতা থেকে ২০২৬-এর ভোর
আমরা শিশুদের জন্য লেসন প্ল্যান ও শেখার ফলাফল তৈরি করি। কিন্তু নিজেদের ছুটি, বিশ্রাম এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের জন্য কি কোনো পরিকল্পনা করি? ২০১৫ সালে থেমে যাওয়া অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ তৈরির স্বপ্ন ২০২৬ সালের এক নিদ্রাহীন ভোরে ফিরে পাওয়ার ব্যক্তিগত গল্প।
Personal Essay • Holiday • Learning • Technology
ছুটির লেসন প্ল্যান: ২০১৫-এর অসম্পূর্ণতা থেকে ২০২৬-এর ভোর
আমরা শিশুদের জন্য পাঠপরিকল্পনা ও শেখার ফলাফল তৈরি করি। কিন্তু নিজেদের ছুটি, বিশ্রাম এবং বহুদিনের অসমাপ্ত স্বপ্নের জন্য কি কোনো পরিকল্পনা করি?
ছুটির দিন নিয়ে আমার ভেতরে সবসময়ই এক ধরনের দ্বৈত অনুভূতি কাজ করেছে। বাইরে থেকে ছুটিকে যত সহজ মনে হয়, ভেতর থেকে তা ততটাই জটিল। মানুষের জীবনে ছুটি কখনোই কেবল বিশ্রামের আরেক নাম নয়। অনেক সময় ছুটি হলো জমে থাকা অসমাপ্ত কাজের মুখোমুখি হওয়ার অবকাশ, কখনো নিজের ব্যর্থতার কাছে ফিরে যাওয়ার সময়, আবার কখনো এমন সব প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ার মুহূর্ত, যেগুলো কর্মদিবসের কোলাহলে আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাই।
আমার ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটাই ঘটেছে। গত কয়েক বছরের ঈদ, অবকাশ, বিরতি ও ছুটির দিনগুলোকে পাশাপাশি রাখলে একটি মজার, অথচ গভীর পরিবর্তন চোখে পড়ে। সময় যেন আমাকে ধীরে ধীরে অন্য এক মানুষে রূপান্তর করেছে। সেই রূপান্তরের গল্পে দায়িত্বের প্রসার আছে, স্বপ্নের পুনর্বিন্যাস আছে, অপূর্ণতার সঙ্গে সমঝোতা আছে, আবার কোথাও ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো আগুনের হঠাৎ জ্বলে ওঠাও আছে।
২০২৫ সালের ঈদের কথা ভাবলে প্রথমেই একটি সত্য স্বীকার করতে হয়। সেই ঈদ আর আগের মতো পুরোপুরি আমার নিজের ছিল না। বৈবাহিক জীবনে প্রবেশের পর সেটিই স্বাভাবিক। জীবনের মানচিত্র বদলে গেলে সময়ের মালিকানাও বদলে যায়। আগে ছুটি মানে ছিল নিজের মতো করে সময় ব্যবহারের একক স্বাধীনতা। এখন ছুটি মানে সময়কে ভাগ করে দেওয়া। কিছু সময় নিজের জন্য, কিছু নিজের পরিবারের জন্য, কিছু স্ত্রীর জন্য, কিছু স্ত্রীর পরিবারের জন্য।
শুনতে বিষয়টি সাধারণ। কিন্তু এর ভেতরে জীবনের একটি বড় শিক্ষা আছে। মানুষ একা থাকলে তার সময় অনেকটা একরৈখিক থাকে। সম্পর্কের ভেতরে প্রবেশ করলে সেই সময় বহু-কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। ঘড়ির কাঁটা তখন শুধু নিজের জন্য চলে না। অন্যের অপেক্ষা, প্রাপ্যতা, অনুভূতি ও প্রয়োজনও সময়ের অংশীদার হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এভাবে সময় ভাগ হয়ে গেলে মানুষ কি নিজেকে হারায়, নাকি নিজেকে আরও বিস্তৃত করে?
২০২৪ সালের ঈদের ছুটিটিও আমি প্রকৃত অর্থে পাইনি। তখন নিজের নানা প্রকল্পের মধ্যে ডুবে ছিলাম। আমার প্রতিষ্ঠান “The BackSpace” নিয়ে কাজ ছিল, দলনির্ভর পরিকল্পনা ছিল, কয়েকটি ডিজিটাল ধারণা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ছিল এবং নিজের সক্ষমতাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার এক অদ্ভুত চাপ ছিল। ফলে ছুটি বিশ্রামে রূপ নেয়নি। সেটি ছিল আরেক ধরনের কর্মদিবস, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নয়, ব্যক্তিগত।
আরও একটু পেছনে গেলে ২০২৩ সালেও আমি অন্য এক জগতে ডুবে ছিলাম, ব্লগিংয়ের জগতে। লেখালেখি, বিষয়বস্তু, ডিজিটাল উপস্থিতি, পাঠক, চিন্তা ও প্রকাশের সঙ্গে তখন আমার সত্তা এমনভাবে জড়িয়ে ছিল যে ছুটির আলাদা কোনো ভাষাই যেন ছিল না। মনে হতো, আমি বিশ্রাম নিচ্ছি না, কেবল একটি কাজ থেকে অন্য কাজের দিকে সরে যাচ্ছি।
এই ক্রমাগত ব্যস্ততা সবসময় বাহ্যিক ছিল না। আমি প্রায় সবসময় কিছু না কিছু শেখার মধ্যে ছিলাম। কখনো সচেতন সিদ্ধান্তে, কখনো পরিস্থিতির চাপে। অনেক কিছু নিজে থেকে শিখেছি, আবার অনেক কিছু জীবন আমাকে জোর করে শিখিয়েছে। সফলতা শিখিয়েছে, ব্যর্থতা শিখিয়েছে, প্রত্যাখ্যান শিখিয়েছে, বিলম্ব শিখিয়েছে, অনিশ্চয়তা শিখিয়েছে। মানুষের শিক্ষা সবসময় বই থেকে আসে না। অনেক সময় তা আসে হেরে গিয়ে, থেমে গিয়ে, পথ বদলাতে বাধ্য হয়ে কিংবা নিজের সীমাবদ্ধতার সামনে দাঁড়িয়ে।
একটি ছুটি কি শুধু কাজ থেকে বিরতি, নাকি নিজের অসমাপ্ত পরিচয়গুলোর কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ?
২০২৬ সালে এসে আমার জীবনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর আমি পীস স্কুল এন্ড কলেজ, বগুড়ায় সহকারী শিক্ষক, ইংরেজি পদে যোগদান করি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠানটি প্রথম থেকেই কিছুটা আলাদা মনে হয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এখানে অন্তত আমার দেখা পরিসরে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক যোগাযোগের একটি উপস্থিতি আছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে গেলে মনে হয়, আপনি কেবল একটি ব্যবস্থার অংশ। আবার কোথাও গেলে মনে হয়, ব্যবস্থার ভেতরেও মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা রয়েছে। আমার কাছে পীস স্কুল এন্ড কলেজ দ্বিতীয় অনুভূতিটির কাছাকাছি। শিক্ষা এখন আর শুধু পাঠ্যবইয়ের সীমায় আটকে নেই। এটি আস্থা, পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ও ভবিষ্যৎ ভাবনার সমন্বিত ক্ষেত্র। সেই জায়গা থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে আমি কখনো কখনো একটি চলমান পরীক্ষাগার হিসেবেও দেখি, যেখানে শিশুদের শেখানোর পাশাপাশি শিক্ষার সম্ভাবনাগুলোকেও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তবে শিক্ষকতায় আমার আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়েছিল এরও আগে। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, বগুড়ায় অতিথি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। টিউশনির বাইরের প্রাতিষ্ঠানিক জগতে সেটিই ছিল আমার প্রথম প্রবেশ। একজন শিক্ষক হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে স্থাপন করার প্রথম সুযোগ।
আমি কতটা শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম, অথবা শিক্ষকতা আমার শুরুর স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল কি না, সে আলোচনা আলাদা প্রসঙ্গ দাবি করে। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে এখনও ভাবায়। জীবনের কিছু দরজা নিজেকেই খুলতে হয়, আবার কিছু দরজা খুলে দেন এমন মানুষ, যাদের আমরা আগে চিনিই না।
কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধান আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না, আমার দীর্ঘ পটভূমি সম্পর্কেও জানতেন না। তবু দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমিও তাঁকে চিনতাম না। এই অচেনা বিন্দু থেকেই কখনো কখনো জীবনের বড় মোড় তৈরি হয়। তিনি আমার জন্য শিক্ষক হওয়ার, শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ানোর এবং নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার একটি দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
কেন বহু আবেদনকারীর মধ্যে আমাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, তার পূর্ণ ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। কিন্তু সব ব্যাখ্যা জানা কি জরুরি? কারণ না জানলেও কৃতজ্ঞতা সত্য হতে পারে। তিনি আমাকে শুধু একটি কাজের সুযোগ দেননি; আমার সক্ষমতা, শ্রম ও দায়বোধকে পরীক্ষা করার সুযোগও দিয়েছিলেন। প্রায় আড়াই মাসের সেই শিক্ষকতায় আমি কতটা সফল হয়েছিলাম, তা হয়তো সবচেয়ে সৎভাবে বলতে পারবে আমার শিক্ষার্থীরা। নিজের বিচার থেকে শুধু এটুকু বলতে পারি, আমি তাঁকে লজ্জিত করতে চাইনি। নিখুঁত ছিলাম না, কিন্তু দায়িত্বহীনও ছিলাম না।
এবার বর্তমানের একটি মুহূর্তে ফিরে আসি। ছুটির আগে শেষ কর্মদিবসের এক সভায় পীস স্কুল এন্ড কলেজ, বগুড়ার অধ্যক্ষ ড. ফাহমিদা সুলতানা এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার অতীতকে সরাসরি নাড়া দিয়েছিল। বক্তব্যটি আমার ডায়েরিতে হুবহু লেখা নেই। স্মৃতিতে থাকা সারমর্মটি ছিল এমন:
“আমরা আমাদের শিশুদের জন্য লেসন প্ল্যান তৈরি করছি, লার্নিং আউটকাম তৈরি করছি। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, আমাদের নিজেদের ছুটি কীভাবে কাটবে? আমরা কি এ জন্য কোনো পরিকল্পনা করেছি? যদি না করে থাকি, তবে করা উচিত।”
কথাগুলো আপাতভাবে খুব সাধারণ। কিন্তু সাধারণ সত্যই অনেক সময় সবচেয়ে গভীর হয়। আমরা শিশুদের জন্য পরিকল্পনা করি, প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিকল্পনা করি, পাঠ্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা করি, ফলাফল ও অর্জনের পরিকল্পনা করি। কিন্তু নিজেদের মানসিক, বৌদ্ধিক ও ব্যক্তিগত ছুটির জন্য কতবার পরিকল্পনা করি? পরিকল্পনাহীন ছুটি কি সবসময় বিশ্রাম হয়ে ওঠে, নাকি অজান্তেই উদ্বেগ, নিষ্ক্রিয়তা ও সময় হারানোর অনুভূতিতে গলে যায়?
কথাগুলো আমার ভেতরে অতীতকে জাগিয়ে তুলেছিল। একসময় ঈদ সামনে এলেই ডায়েরি বের করতাম। ছুটির দিনগুলোকে আলাদা প্রকল্পের মতো ভাগ করতাম। কোন দিনে কী শিখব, কী পড়ব, কোন কোর্স শুরু করব, কোন লেখা লিখব, কোন দক্ষতা অনুশীলন করব, কোন বই শেষ করব, এসব নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পরিকল্পনা করতাম। মনে হতো, ছুটি মানেই স্ব-নির্মাণের এক দুর্লভ মৌসুম।
এখন নিজের দিকে তাকিয়ে কখনো প্রশ্ন জাগে, আমার কি ছুটিকে ঘিরে সত্যিই কোনো পরিকল্পনা আছে? বেশির ভাগ সময় উত্তরটি “না”। সর্বোচ্চ হয়তো একটি সিনেমা বা ধারাবাহিক দেখার ইচ্ছা থাকে। যেমন ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া কোরীয় ধারাবাহিক “Melo Movie” দেখার ইচ্ছা। বিনোদন অবশ্যই অপ্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু বিনোদন যদি সচেতন বিশ্রামের বদলে অবসাদ থেকে পালানোর একমাত্র পথ হয়ে ওঠে, তখন কি আমরা সত্যিই বিশ্রাম নিই?
কখনো মনে হয়, আমি আর নিজে থেকে কিছু করছি না। জীবনই যেন আমাকে দিয়ে সব করিয়ে নিচ্ছে। আমি চালক নই, যাত্রী। এই অবস্থায় মানুষ কি ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের স্থপতিকে হারিয়ে ফেলে? আমরা কি একসময় নিজের জীবন নকশা করা বন্ধ করে দিই এবং জীবন যা সামনে ঠেলে দেয়, কেবল সেটিই বহন করতে থাকি?
তবু এই ঈদে অন্তত একটি পরিকল্পনা করেছিলাম। খুব সুসংগঠিত বা নিখুঁত পরিকল্পনা নয়। তবে নিজের জন্য কিছু করার একটি তাগিদ তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ ছুটিকে কীভাবে অর্থপূর্ণ করা যায়, তা নিয়ে ভাবছিলাম। বগুড়া থেকে গ্রামে ফেরার পর হঠাৎ বহু পুরোনো একটি অসমাপ্ত প্রকল্পের কথা মনে পড়ে গেল। বহুবার শুরু করেও শেষ করতে না পারা সেই প্রকল্পের নাম ছিল “Android App Development”।
বর্তমানে আমার কাজের পরিধি ছোট নয়। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট করছি। “ডার্ক সাইকোলজি ১০১” বইয়ের পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে নিচ্ছি। ইংরেজি ব্যাকরণ ও কম্পোজিশনের আরেকটি বই লিখছি। আমার পাইলট প্রকল্প Oviyatri.com নিয়ে কাজ করছি। ডিজিটাল প্রকাশনা এবং Microsoft-এর ডেভেলপার পরিবেশের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজের সঙ্গেও যুক্ত আছি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা-অবকাঠামো নিয়ে একটি প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছি।
কাজের অভাব ছিল না। বরং কাজের আধিক্যই ছিল। তারপরও অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ উন্নয়নে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা কেন? কারণ মানুষের ভেতরে কিছু অসমাপ্ত দরজা থাকে, যেগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না। সময়ের সঙ্গে আমরা সেগুলো ভুলে যাই, কিন্তু সুযোগ পেলে একদিন সেই দরজাই আবার শব্দ করতে শুরু করে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক কাঠামোয় নেওয়ার আমার প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, এমন প্রত্যাশা ছিল না। একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা শুধু সফটওয়্যার বা লাইসেন্স সংগ্রহের ব্যাপার নয়। এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, তথ্যনিরাপত্তা, যন্ত্রপাতি, নীতিমালা, মানবসম্পদ এবং পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন জড়িত। প্রাথমিক হিসাব বড় হতে পারে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কারিগরি নিরীক্ষা ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ককে চূড়ান্ত ব্যয় বলা দায়িত্বশীল হবে না।
এই প্রক্রিয়ায় আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল অন্য জায়গায়। সত্যি বলতে, ব্যবস্থাপনা মহল প্রস্তাবটি গুরুত্ব দিয়ে পড়বে বলেও খুব বেশি আশা করিনি। ভেবেছিলাম, ধারণাটি হয়তো অতিরিক্ত আধুনিক বা আপাতদৃষ্টিতে ব্যয়বহুল বলে সরিয়ে রাখা হবে। কিন্তু তারা পড়েছে, প্রশ্ন করেছে এবং ভেবেছে। কোনো ধারণা তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়িত না হলেও সেটি যদি চিন্তার টেবিলে জায়গা পায়, তবে সেটিও একটি সূচনা।
এবার আবার অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ উন্নয়নে ফিরে আসি। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আমার প্রযুক্তিচর্চার একটি অদ্ভুত অধ্যায় ছিল। আমার পুরোনো দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রসেসর ও ৪ গিগাবাইট র্যামসমৃদ্ধ Dell ল্যাপটপে বহুবার Android Studio ইনস্টল করার চেষ্টা করেছি। ইনস্টল করার পর সেটি প্রায়ই বন্ধ হয়ে যেত, অথবা এত ধীর হয়ে পড়ত যে কাজ চালিয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত থাকত না।
বহুবার একটি অ্যাপ বানাতে চেয়েছি। বহুবার শুরু করেছি। বহুবার থেমে গেছি। তখন মনে হতো, সমস্যাটি কেবল ডিভাইসের। ভালো ল্যাপটপ, বেশি র্যাম বা শক্তিশালী প্রসেসর থাকলে হয়তো আমিও পারতাম। আজ পেছনে তাকিয়ে বুঝি, ডিভাইস গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেটিই একমাত্র সমস্যা নয়। বড় সীমাবদ্ধতা ছিল আমার জ্ঞানের অসম্পূর্ণতা।
প্রোগ্রামিং ভাষার মৌলিক যুক্তি, কাঠামো, বাক্যবিন্যাস, কার্যপ্রবাহ, অবজেক্ট, ক্লাস, স্টেট ও ত্রুটি শনাক্তকরণের সঙ্গে তখন আমার সম্পর্ক ছিল ভাঙা-ভাঙা। উচ্চক্ষমতার একটি কম্পিউটার পেলেও সম্ভবত কার্যকর অ্যাপ তৈরি করতে পারতাম না। কারণ জটিল ফাংশনগুলোকে মনে হতো অপরিচিত সংকেত দিয়ে লেখা কোনো গোপন লিপি।
সময়ের সঙ্গে আমি প্রযুক্তির ভেতরে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়েছি। Microsoft-এর ডেভেলপার পরিবেশ, বিভিন্ন সেবা, প্ল্যাটফর্ম, লাইসেন্স ও উন্নয়ন-সরঞ্জামের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। কয়েক বছর আগের আমি বর্তমানের এই অবস্থানকে হয়তো সহজে বিশ্বাস করত না।
তবু সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, আমি মূলত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র। চাইলে ভাষা, সাহিত্য, সমালোচনা, রচনা ও অনুবাদের পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারতাম। সেটিই হয়তো সবচেয়ে আরামদায়ক পথ হতো। কিন্তু মানুষ সবসময় আরামদায়ক পথ বেছে নেয় না। কখনো সে সেই পথেই ফিরে যায়, যেখান থেকে একসময় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
প্রযুক্তির দিকে আমার ঝোঁকের পেছনেও ছোট ছোট ঘটনার দীর্ঘ ছায়া আছে। রাজশাহী শহরে বন্ধু নাঈমের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে কোনো এক মুহূর্তে “KFC” অক্ষরকে চোখের ভুলে “CSE” হিসেবে পড়া, অথবা নির্দিষ্ট বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা, বাইরে থেকে এগুলো ছোট ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষের জীবনের সব বড় আগুন বড় কারণ থেকে জ্বলে ওঠে না। কখনো একটি ক্ষুদ্র অসম্পূর্ণতা বা একটি বঞ্চিত সম্ভাবনাই দীর্ঘমেয়াদি জেদে রূপ নেয়।
আমি কষ্ট পেয়েছিলাম। কারণ ব্যর্থতা তখন শুধু একটি ফলাফল ছিল না; সেটি ছিল স্বপ্নের পথচ্যুতি। হয়তো চেষ্টা না করলে ব্যর্থতাকে সহজে গ্রহণ করা যেত। কিন্তু যে ব্যর্থতা চেষ্টা সত্ত্বেও আসে, তা মানুষকে অন্যভাবে বদলে দেয়। আমার মনে হয়, সেই ছাইয়ের নিচে জমে থাকা আগুনই পরে আমাকে জেদি করে তুলেছিল।
অনেক রাত ঘুমাইনি। একটি ভাষা বোঝার জন্য, একটি যুক্তির কাঠামো ধরার জন্য, একটি বাক্যবিন্যাসের অর্থ আয়ত্ত করার জন্য ল্যাপটপের সামনে বসে থেকেছি। কখনো এই প্রচেষ্টা শরীর, ঘুম ও মানসিক স্থিতির ক্ষতি করেছে। মানুষ যখন নিজের বিরুদ্ধে অসমাপ্ত ব্যর্থতার প্রমাণ জমতে দিতে চায় না, তখন সে কখনো কখনো নিজেকেই আদালত বানিয়ে ফেলে। কিন্তু সেই আদালত কি তাকে ন্যায় দেয়, নাকি নতুন শাস্তির মধ্যে ঠেলে দেয়?
এই ঈদে হঠাৎ মনে হলো, এখন তো আমার হাতে আগের তুলনায় ভালো ল্যাপটপ আছে। ৮ গিগাবাইট র্যাম আছে, কাজ করার মতো প্রসেসর ও পরিবেশ আছে। তাহলে বহু পুরোনো অসমাপ্ত ধারণাটিকে আরেকবার বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা যায় না কেন?
আমি ভাবার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখিনি। ল্যাপটপ খুলে অনেকদিন পর আবার Android Studio ডাউনলোড করলাম। সংস্করণের নামের পাশে “Panda 2” দেখে কিছুক্ষণ থমকে গেলাম। আগে এমন নাম দেখিনি। প্রযুক্তির একটি মজার বৈশিষ্ট্য হলো, আপনি যখন ফিরে আসেন, তত দিনে সেটিও বদলে যায়। প্রয়োজনীয় নির্ভরতা ও উন্নয়ন-উপকরণ একের পর এক ডাউনলোড হতে লাগল। প্রতিটি ধাপ মনে করিয়ে দিচ্ছিল, প্রযুক্তি শুধু দক্ষতার নয়, ধৈর্যেরও পরীক্ষা।
আমার সামনে Java ও Kotlin-ভিত্তিক উন্নয়নের পথ ছিল। বর্তমান অ্যান্ড্রয়েড পরিবেশে Kotlin বেশি গুরুত্ব পায় এবং আধুনিক Jetpack Compose কাঠামোও Kotlin-কেন্দ্রিক। তবে পুরোনো পরিচিতি এবং প্রথম প্রত্যাবর্তনের প্রকৃতি বিবেচনায় আমি Java বেছে নিলাম। এটি আধুনিকতম পথ ছিল না, কিন্তু আমার জন্য পরিচিত পথ ছিল। নতুন শেখার জন্য সবসময় সবচেয়ে নতুন দরজাটি বেছে নেওয়া জরুরি নয়; কখনো যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করা সম্ভব, সেটিই প্রথম দরজা।
প্রথম প্রকল্প কী হবে? এমন কিছু দরকার ছিল, যা ছোট পরিসরে শেষ করা সম্ভব, অথচ তাতে গতিবিধি, সংঘর্ষ, স্কোর ও ব্যবহারকারীর নির্দেশনার মতো মৌলিক যুক্তিও থাকবে। তখন ছোটবেলার স্মৃতি এসে ধাক্কা দিল। নকিয়ার বিখ্যাত “Snake Game”। দাদুর ফোনে প্রথম আবিষ্কার করা সেই খেলা, যা খেলতে খেলতে কোনো একসময় ফোনটিকেই প্রায় নষ্ট করে ফেলেছিলাম।
ছোটবেলার খেলাগুলো বড়বেলায় অদ্ভুতভাবে ফিরে আসে। তারা শুধু স্মৃতিকাতরতা হয়ে ফেরে না; কখনো শেখার নিরাপদ মডেলও হয়ে ওঠে। Snake Game-কে প্রথম প্রকল্প হিসেবে উপযুক্ত মনে হলো। ছোট, পরিচিত, দৃশ্যমান, আবার এর ভেতরে যথেষ্ট যুক্তিও আছে।
আমি Java নির্বাচন করলাম। তারপর প্রাথমিক প্রকল্প-কাঠামো তৈরিতে Microsoft Copilot-এর GPT-5.4 Thinking মডেলের সহায়তা নিলাম। ঘটনাটি এমন এক সময়ের, যখন মডেলটি Copilot-এ পাওয়া যাচ্ছিল। অনেকের কাছে এটি শর্টকাট মনে হতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির নতুন যুগে সহায়তা নেওয়া এবং না বুঝে নকল করা এক বিষয় নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাঠামো, নমুনা কোড বা সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান দিতে পারে। কিন্তু কোডটি কী করছে, কোন অনুমতি নিচ্ছে, কোথায় ত্রুটি আছে, কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং নিজের যন্ত্রে নিরাপদে চলছে কি না, সেই দায় মানুষকেই নিতে হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী, খসড়া-নির্মাতা এবং পথপ্রদর্শক হতে পারে। কিন্তু বোঝাপড়া, যাচাই, নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব মানুষের। সহায়তা দক্ষতার বিকল্প নয়; সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি দক্ষতা অর্জনের সেতু।
প্রায় পনেরো মিনিটের চিন্তা ও কোড তৈরির পর Copilot আমাকে “project snake game” নামে একটি সংকুচিত প্রকল্প-ফাইল দিল। সঙ্গে ছোট একটি বার্তা, “Ready to go...”। এই সাধারণ বাক্যটিই আমার ভেতরে অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি করল। যেন বহু বছরের বন্ধ দরজার সামনে কেউ এসে বলছে, চাবি তোমার হাতে আছে, এবার চেষ্টা করো।
অভিজ্ঞতার পরবর্তী অংশের সৌন্দর্য কোডে যতটা নয়, অনুভূতিতে তার চেয়ে বেশি। আমি Android Studio-তে Gemini-কে সহকারী হিসেবে সক্রিয় করলাম। প্রকল্পের ফাইলগুলো পর্যবেক্ষণ, সম্ভাব্য অসামঞ্জস্য শনাক্তকরণ এবং build-সংক্রান্ত সমস্যা বুঝতে তার সহায়তা নিলাম। তবে প্রতিটি প্রস্তাব গ্রহণ করার আগে যতটা সম্ভব যাচাই করেছি। এরপর প্রকল্পটি Gradle-এর সঙ্গে সমন্বয়, build এবং পরীক্ষামূলক APK তৈরির প্রক্রিয়ায় পাঠালাম।
সময় লাগল। অনেক প্রয়োজনীয় ফাইল ডাউনলোড হলো। একপর্যায়ে ল্যাপটপের কুলিং ফ্যান এমন শব্দ করতে লাগল, যেন এই বহুদিনের পরীক্ষায় যন্ত্রটিও আমার সঙ্গে শ্বাস নিচ্ছে। প্রযুক্তির যন্ত্রগুলো কখনো কখনো মানুষের মানসিক অবস্থার নীরব সহযাত্রী হয়ে ওঠে।
প্রতীক্ষার সময় Android Studio নিয়ে পড়ছিলাম। প্রকল্পের বিভিন্ন অপশন, build প্রক্রিয়া, debug সংস্করণ, APK কাঠামো, sync সমস্যা এবং environment settings বোঝার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ build output-এর পাশে “locate” অপশন দেখতে পেলাম। কৌতূহল নিয়ে ক্লিক করতেই একটি APK ফাইল চোখে পড়ল।
অনেক মানুষের কাছে এটি নিছক একটি ফাইল। আমার কাছে সেটি ছিল বহু বছরের ব্যর্থতার ভেতর জন্ম নেওয়া একটি ছোট সাফল্যের দেহ। ফাইলটি ফোনে নিলাম। ইনস্টল করার আগে Google Play Protect দিয়ে পরীক্ষা করলাম। সতর্কতা থেকে, অভ্যাস থেকে, হয়তো নিজের তৈরি জিনিসের প্রতিও সামান্য অবিশ্বাস থেকে।
“RetroViper 3310” নামটি এসেছে নকিয়ার স্মরণীয় 3310 ফোন এবং সাপের দৃঢ়, দ্রুত চরিত্রের ইংরেজি নাম “Viper” মিলিয়ে। এই কয়েকটি শব্দ পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেয় না। কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত ইতিহাসে কিছু ছোট শব্দও বড় সীমানা অতিক্রমের সাক্ষী হয়ে থাকে।
খেলাটি দেখতে ছোটবেলার Snake Game-এর মতো। পার্থক্য হলো, নিয়ন্ত্রণের বোতামগুলো এখন পর্দায়। পুরোনো ফোনে সেগুলো যন্ত্রের গায়েই থাকত। কিছুক্ষণ নিজেই খেললাম, কখনো ব্যবহারকারী হিসেবে, কখনো পরীক্ষক হিসেবে, আবার কখনো নির্মাতা হিসেবে।
নিজের তৈরি অ্যাপ নিজে ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা ভাষায় পুরোপুরি ধরা কঠিন। এটি নিছক সন্তুষ্টি নয়। এর মধ্যে এমন একটি অনুভূতি আছে, যেখানে আপনি নিজের অতীতের কাছে গিয়ে বলতে পারেন, “দেখো, একদিন যা পারনি, আজ তা নিখুঁত না হলেও সম্ভব হয়েছে।”
খেলতে খেলতে কখন রাত কেটে গেল, খেয়াল করিনি। খানিক পর বুঝলাম, বাইরে ভোর হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ জেগে উঠেছে। কেউ মাঠে যাচ্ছে, কেউ নামাজ পড়ে ফিরছে, কেউ দোকান খুলছে, কেউ গরু নিয়ে বের হচ্ছে, কেউ দিনের প্রথম কথাগুলো বলছে।
আর আমি একটি ছোট Snake Game তৈরি করে বসে আছি। বুঝতে পারছি, আজ রাতেও ঘুমানো হলো না।
অনেক রাত আছে, যেগুলো না ঘুমিয়ে মানুষ নিজেকে হারায়। আবার কিছু রাত আছে, যেগুলো না ঘুমিয়েও মানুষ নিজের হারানো কোনো অংশকে ফিরে পায়।
তবু এখানে সতর্ক পার্থক্যটি জরুরি। অনিদ্রা কোনো অর্জন নয়, আর ঘুমের ক্ষতি সাফল্যের প্রয়োজনীয় শর্তও নয়। সেই রাতে ঘুম না হওয়া আমার শরীরের জন্য ভালো কিছু ছিল না। কিন্তু রাতটির মানসিক তাৎপর্য ছিল অন্য জায়গায়। এটি আমাকে কেবল একটি APK দেয়নি; বহু বছরের একটি অসমাপ্ত পরিচয়ের সঙ্গে পুনরায় মিলিয়ে দিয়েছিল।
আমি বুঝলাম, মানুষ পুরোপুরি তার ব্যর্থতার বাইরে চলে যায় না। একদিন সে আবার সেই ব্যর্থতার সামনে দাঁড়ায়, তবে নতুন বয়সে, নতুন অভিজ্ঞতায়, নতুন সরঞ্জামে এবং নতুন দৃষ্টিতে। তখন পুরোনো দরজাটি আগের মতো ভয়ংকর মনে হয় না। কারণ দরজা একই থাকলেও মানুষটি আর আগের মানুষ থাকে না।
এই অভিজ্ঞতা আমাকে ছুটি সম্পর্কে নতুন করে ভাবিয়েছে। ছুটি শুধু বিশ্রাম নয়, শুধু বিনোদনও নয়। কখনো ছুটি মানে নিজের বহুদিনের স্থগিত সংলাপগুলো আবার শুরু করা। নিজেকে জিজ্ঞেস করা, আমি কী হারিয়েছি? কী ফেলে এসেছি? এখনও কী হতে চাই? যে মানুষটি একসময় স্বপ্ন দেখত, সে কি এখনও আমার ভেতরে বেঁচে আছে?
কাজের দিনগুলো আমাদের উপার্জন, পদ, দায়িত্ব ও সামাজিক পরিচয় দেয়। ছুটির দিনগুলো অনেক সময় আমাদের সত্যিকার মুখ দেখায়। ব্যস্ততা মানুষকে ঢেকে রাখতে পারে, অবসর তাকে উন্মোচন করে। কিন্তু সেই উন্মোচন সবসময় আনন্দদায়ক নয়। অবসরে কারও সামনে স্বপ্ন ফিরে আসে, কারও সামনে ক্লান্তি, কারও সামনে শূন্যতা।
হয়তো এ কারণেই ড. ফাহমিদা সুলতানার কথাগুলো আমাকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। আমরা শিশুদের জন্য পাঠপরিকল্পনা ও শেখার ফলাফল তৈরি করি, কিন্তু নিজেদের জন্য কী করি? আমরা কি ছুটির লক্ষ্য নির্ধারণ করি? আমরা কি বুঝি, বিশ্রামের মধ্যেও সচেতনতা থাকতে পারে? নাকি ছুটিকে এমন একটি শূন্য স্থানে পরিণত করি, যেখানে সময় ধীরে ধীরে অপরাধবোধে গলে যায়?
আজ মনে হয়, পরিকল্পনার অভাব সবসময় অলসতার প্রমাণ নয়। অনেক সময় এটি ক্লান্তির প্রমাণ। যারা দীর্ঘদিন একসঙ্গে অনেক ভূমিকা বহন করে, তাদের ভেতরে কখনো পরিকল্পনা করার শক্তিটুকুও নিঃশেষ হয়ে যায়। তারা অলস বলে পরিকল্পনা করে না, বিষয়টি এমন নয়। বরং তারা এতটাই অবসন্ন থাকে যে নতুন সিদ্ধান্ত তৈরি করাও আরেকটি কাজ মনে হয়।
ঠিক সেখানেই হয়তো নিজের জন্য একটি নরম ও মানবিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। এমন পরিকল্পনা, যা শুধু উৎপাদনশীলতার নয়, পুনর্গঠনেরও। আমি কী শিখব, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কীভাবে বিশ্রাম নেব, কাকে সময় দেব, নিজের শরীরের কথা কীভাবে শুনব এবং কীভাবে বাঁচব, সেগুলোও সমান জরুরি।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও শারীরিক বিশ্রামের জন্য সময় রাখা।
- পরিবার ও প্রিয়জনের সঙ্গে উপস্থিত থেকে সময় কাটানো।
- বিনোদনকে অপরাধবোধ নয়, সচেতন বিশ্রাম হিসেবে গ্রহণ করা।
- একসঙ্গে অনেক প্রকল্প নয়, একটি ছোট অসমাপ্ত কাজ বেছে নেওয়া।
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিলেও ফলাফল বুঝে ও যাচাই করে ব্যবহার করা।
- ছুটি শেষে অর্জনের তালিকার পাশাপাশি মানসিক অবস্থারও মূল্যায়ন করা।
এই ঈদের কয়েকটি রাত আমাকে আরও শিখিয়েছে, জীবনের সব স্বপ্ন সরাসরি অর্জন করা যায় না। কিছু স্বপ্ন বয়সের সঙ্গে বদলে যায়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি তালিকায় হারায়। কিছু আর্থিক সীমাবদ্ধতায় থেমে যায়। কিছু প্রযুক্তিগত অক্ষমতার কাছে পড়ে থাকে। কিন্তু সব স্বপ্ন মৃত হয় না। কিছু স্বপ্ন সুপ্ত থাকে, ছাইয়ের নিচে আগুনের মতো।
একদিন যদি আবার ফিরে আসা যায়, নতুন সাহস, নতুন ধৈর্য এবং নতুন বোধ নিয়ে, তবে সেই আগুন আবার জ্বলে উঠতে পারে। তবে ফিরে আসা মানে সব পুরোনো স্বপ্নকে একই রূপে উদ্ধার করা নয়। কখনো স্বপ্নটি বদলে যায়, কখনো তার ভাষা বদলায়, কখনো সফলতার সংজ্ঞাই বদলে যায়।
আমি জানি, একটি Snake Game তৈরি প্রযুক্তির জগতে বড় কোনো ঘটনা নয়। এটি কোনো বিপ্লব নয়, বাজার বদলে দেওয়ার মতো উদ্ভাবনও নয়। কিন্তু মানুষ তার জীবনকে সবসময় পৃথিবীর মাপে মাপতে পারে না। কিছু অর্জনের মূল্য তার জটিলতায় নয়, প্রেক্ষাপটে।
আমার কাছে ছোট অ্যাপটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ভেতরে ২০১৫ সালের অক্ষমতা আছে, ২০২১ সালের হতাশা আছে, ২০২৬ সালের প্রত্যাবর্তন আছে। এর মধ্যে পুরোনো Dell ল্যাপটপ আছে, নতুন যন্ত্র আছে, কোডভীতি আছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক নতুন উন্নয়নপদ্ধতি আছে এবং সবচেয়ে বেশি আছে এই সত্যটি যে আমি এখনও চেষ্টা করি।
সম্ভবত এ কারণেই ছুটির দিনগুলো এখন আর আমার কাছে অবহেলার সময় নয়। এগুলো সবসময় বড় পরিকল্পনায় পূর্ণ হবে না। হওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু কাজের চাপে নিজের ভেতরের যে অসমাপ্ত ঘরগুলো বন্ধ করে রাখি, ছুটি এসে সেসব ঘরের দরজা সামান্য খুলে দিতে পারে।
তখন আপনি সিনেমা দেখতে পারেন, ঘুমাতে পারেন, বিশ্রাম নিতে পারেন, পরিবারকে সময় দিতে পারেন। সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এর মাঝেও যদি একটি পুরোনো অসমাপ্ত কাজকে আবার স্পর্শ করা যায়, তবে ছুটি কেবল ক্যালেন্ডারের লাল দাগ হয়ে থাকে না। এটি ব্যক্তিগত পুনর্গঠনের একটি ঋতু হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ফিরে আসি সেই ভোরে। গ্রামের সকাল, মানুষের জেগে ওঠা এবং আমার নিদ্রাহীন চোখের সামনে নিজের বানানো অ্যাপের পর্দা। দৃশ্যটি যত সাধারণই হোক, আমার কাছে সেটি ছিল একটি নীরব ঘোষণা। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি এখনও শেষ হয়ে যাইনি।
দায়িত্ব আমাকে বদলেছে, সম্পর্ক আমার সময়কে ভাগ করেছে, প্রতিষ্ঠান আমাকে নতুন পরিচয় দিয়েছে, জীবনের চাপ আমাকে ক্লান্ত করেছে। কিন্তু আমার ভেতরে যে শিখতে চাওয়া মানুষটি ছিল, সে পুরোপুরি নিভে যায়নি। সে হয়তো শুধু একটি নিরাপদ অবকাশ, একটি উপযুক্ত সরঞ্জাম এবং ফিরে আসার সাহসের অপেক্ষায় ছিল।
ছুটি আমাদের শুধু থামায় না। কখনো কখনো এটি আমাদের দেখায়, আমরা কে ছিলাম, এখন কে আছি এবং এখনও কে হতে পারি।
সেই রাতে আমার ঘুম হয়নি। অনিদ্রাটি স্বাস্থ্যকর ছিল না, কিন্তু ভোরটি অর্থপূর্ণ ছিল। কারণ আমি শুধু একটি অ্যাপ তৈরি করিনি; নিজের পুরোনো সম্ভাবনার সঙ্গে আবার পরিচিত হয়েছিলাম।
তথ্যসূত্র ও প্রযুক্তিগত পাঠ
- Android Studio release notes, Google Android Developers।
- Android Studio Panda 2 stable release announcement, ৩ মার্চ ২০২৬।
- Kotlin and Android, Android Developers।
- Java versions in Android builds, Android Developers।
- Gemini in Android Studio, Android Developers।
- Melo Movie, Netflix Official Site।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0