শতবর্ষ পেরিয়েও শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ অমর, খেয়াল আছে কি বাঙালির?
প্রকাশের শতবর্ষ পেরিয়েও শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ কেন পাঠকের চোখে জল আনে? উপন্যাসের চরিত্র, কথনশিল্প, সমালোচনা ও চলচ্চিত্রযাত্রার পুনর্পাঠ।
Bengali Literature • Centenary Reappraisal
শ্রীমতী স্মৃতি দত্ত
আশ্চর্য এই যে, আমরা সব ভুলে যাই। শতবর্ষ আসে, তারপর নীরবে চলে যায়। আমাদের কি মনে ছিল, ২০১৭ সালে বাংলা কথাসাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের একজন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস গ্রন্থপ্রকাশের শতবর্ষ পূর্ণ করেছিল? একই বছরে প্রকাশিত হয়েছিল শ্রীকান্ত-এর প্রথম পর্ব এবং চরিত্রহীনও।
দেবদাস গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ৩০ জুন ১৯১৭ সালে। তার আগে উপন্যাসটি ভারতবর্ষ পত্রিকার ১৩২৩ বঙ্গাব্দের চৈত্র এবং ১৩২৪ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে আষাঢ় সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিল। উপন্যাসটি শরৎচন্দ্র তাঁর তরুণ বয়সে লিখেছিলেন। প্রকাশ নিয়ে তাঁর দ্বিধা ছিল বলেও বিভিন্ন প্রকাশনা-ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।
যে কাহিনি একসময় লেখকের নিজের কাছেই তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়নি, সেই কাহিনিই পরে তাঁর প্রধান পরিচয়গুলোর একটিতে পরিণত হলো। আজও দেশের অগণিত মানুষের কাছে তিনি দেবদাস-এর অমর স্রষ্টা। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় তাঁর রচনা অনূদিত ও পঠিত হয়েছে। তাঁর জনপ্রিয়তার সুনির্দিষ্ট পরিমাপ করা সত্যিই কঠিন।
কিন্তু বাংলা সাহিত্যের বুদ্ধিজীবী মহলের একটি অংশ সাধারণ মানুষের ভালোবাসাকে কোনো স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা শিল্পের সার্থকতার নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি বলে মনে করেন না। তাঁদের আপত্তিকে অসম্মান করার প্রয়োজন নেই। তবু আজ প্রশ্ন করা যায়, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, দুর্বলতা, অভিমান ও হারানোর বেদনার সত্যচিত্র যদি শরৎচন্দ্রের রচনায় থাকে, তাহলে তাঁর জন্য আর কত শিরোপা প্রয়োজন?
শিরোপার হিসাব করার চেয়ে আরও একবার তাঁর রচনাসমূহের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করাই সম্ভবত বেশি জরুরি।
ছোট উপন্যাস, দীর্ঘ জীবন
প্রকাশের এক শতাব্দীর বেশি সময় পরও মানুষ দেবদাস পড়ে চোখের জল ফেলে। আকারে ছোট একটি উপন্যাস, অথচ তার আবেদন এখনো ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে বিস্তৃত। দেবদাস, পার্বতী, চন্দ্রমুখী, চুনীলাল, ভুবন চৌধুরী ও ধর্মদাসকে ঘিরে নির্মিত কাহিনিটি দেখতে সহজ। কিন্তু এই সহজ কাহিনির ভেতরে শ্রেণি, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক অহংকার, অপ্রাপ্ত প্রেম, সিদ্ধান্তহীনতা ও আত্মবিনাশ জড়িয়ে আছে।
পার্বতী ভুবন চৌধুরীর সংসারে গিয়ে অল্প বয়সেই গৃহিণী ও মাতৃস্থানীয় দায়িত্ব গ্রহণ করে। মহেন্দ্র তার বিশ বছর বয়সী সৎপুত্র এবং যশোমতী তার বিবাহিত সৎকন্যা। নিজের বয়স, হারানো প্রেম এবং নতুন জীবনের বিস্ময় পেছনে রেখে সে যেন অকালেই পরিণত হয়ে ওঠে।
পার্বতীকে শুধু ব্যর্থ প্রেমিকা বললে তাই তার প্রতি অবিচার করা হয়। দেবদাস যেখানে সংকটের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ, পার্বতী সেখানে সামাজিক বিপদের আশঙ্কা জেনেও নিজের ভালোবাসার কথা বলতে পারে। পরে সে নতুন বাস্তবতার দায়িত্বও গ্রহণ করে। তার ভালোবাসা অসম্পূর্ণ, কিন্তু তার জীবন দেবদাসের মতো সম্পূর্ণ আত্মবিনাশে শেষ হয় না।
চুনীলাল কি সত্যিই খলচরিত্র?
হিন্দি, বাংলা কিংবা অন্য ভাষার কিছু চলচ্চিত্রে চুনীলালকে প্রায় খলচরিত্রে পরিণত করা হয়েছে। অথচ মূল উপন্যাসে সে এতটা একমাত্রিক নয়। সে মদ্যপ ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনের মানুষ, দেবদাসকে চন্দ্রমুখীর কাছে নিয়ে যাওয়ার পথও সে তৈরি করে। কিন্তু দেবদাসকে ধ্বংস করাই তার কোনো সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য নয়।
চুনীলাল দরজা দেখিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সেই দরজা পার হয়ে মদ্যপান ও আত্মবিনাশকে নিজের জীবনের পথ করে নেওয়ার দায় দেবদাসেরও। চলচ্চিত্রের জন্য স্পষ্ট খলচরিত্র সুবিধাজনক। উপন্যাসের মানুষ অবশ্য এত সহজে ভালো ও মন্দের দুই ভাগে বিভক্ত হয় না।
চন্দ্রমুখী: বাইজির পরিচয়ের আড়ালে মানুষটি
আর চন্দ্রমুখী? চলচ্চিত্র দেখে তাকে আমরা জাঁকজমকপূর্ণ নাচঘরের বাইজি বা নর্তকী হিসেবে কল্পনা করতে অভ্যস্ত। মূল উপন্যাসে তার সামাজিক পরিচয় যৌনপেশার সঙ্গে যুক্ত হলেও শরৎচন্দ্র তার বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে অন্তরের পরিবর্তন, ভালোবাসা, মমতা ও মানবিক মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
দেবদাসের ক্ষণিক পরিচয় ও অবজ্ঞা চন্দ্রমুখীর জীবনে এক গভীর পরিবর্তন আনে। শরৎচন্দ্র নারীচরিত্রকে নৈতিক উচ্চতায় স্থাপন করতে ভালোবাসতেন। কখনো সেই ভালোবাসায় নারীরা বাস্তব মানুষ থেকে দেবীর আসনের কাছাকাছি চলে যায়। চন্দ্রমুখীর ক্ষেত্রেও প্রশ্ন ওঠে, তার পরিবর্তন কি সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত, নাকি শরৎচন্দ্রের নারী-আদর্শের আরেকটি প্রকাশ?
প্রশ্ন থাকতেই পারে। তবু চন্দ্রমুখীকে শুধু তার পেশার পরিচয়ে আটকে রাখলে শরৎচন্দ্রের বক্তব্যের প্রধান অংশ হারিয়ে যায়। সমাজ যাকে অসম্মান করে প্রান্তে সরিয়ে রেখেছে, তার মধ্যেই লেখক ভালোবাসা, ত্যাগ ও মানবিকতার এমন শক্তি দেখিয়েছেন, যা সমাজস্বীকৃত দেবদাসের মধ্যে নেই।
উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের পার্থক্য এখানেই: পর্দা চন্দ্রমুখীর নাচঘরকে বড় করেছে, আর মূল কাহিনি তার অন্তরের মানুষটিকে বড় করে দেখেছে।
শরৎচন্দ্রের প্রেম ও অপূর্ণতার শিল্প
দেবদাস-এ শরৎচন্দ্র শারীরিকভাবে পূর্ণ প্রেমের চেয়ে স্মৃতি, বিরহ, প্রত্যাখ্যান, সামাজিক নিষেধ এবং অপূর্ণতার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। দেবদাস ও পার্বতীর মিলন ঘটে না। চন্দ্রমুখীর ভালোবাসাও পূর্ণ স্বীকৃতি পায় না। কাহিনির প্রধান তিনটি চরিত্রই কোনো না কোনো অসম্পূর্ণতার মধ্যে বেঁচে থাকে।
যে কোনো অভিজ্ঞ পাঠক বলতে পারেন, দেবদাস আবেগপ্রবণ, অতিরিক্ত রোমান্টিক, কোথাও অযৌক্তিকও। রহস্যটা সেখানেই। যদি কাহিনিটি এত অসম্পূর্ণ, এত আবেগপ্রবণ এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রটি এত সিদ্ধান্তহীন হয়, তাহলে এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে সে পাঠকের হৃদয়ে বসে আছে কী করে? এর জাদু কোথায়? আজও মানুষ দেবদাস পড়ে চোখের জল ফেলে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তরও দেবদাস-এর মধ্যেই আছে। কী অসামান্য তার গল্পবুননের শিল্প! সহজ ভাষায় নির্মিত একেকটি পরিস্থিতি ও ঘটনা দুই ধার তলোয়ারের মতো পাঠকের মনে প্রবেশ করে। বারবার পড়েও কোনো কোনো মুহূর্ত একই রকম বেদনা জাগায়।
সেই জন্য এত বছরেও দেবদাসকে মেরে ফেলা গেল না। তার গরুর গাড়ি পার্বতীর বাড়ির সামনে পৌঁছেছিল, কিন্তু পার্বতীর সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়নি। মানুষটির জীবন শেষ হয়েছে, অথচ তার অসমাপ্ত প্রেমযাত্রা এখনো শেষ হয়নি।
পৃষ্ঠা থেকে নির্বাক চলচ্চিত্রে
দেবদাস-এর চলচ্চিত্রযাত্রাও বিস্ময়কর। উপন্যাসটির প্রথম চলচ্চিত্ররূপ নির্মিত হয় ১৯২৮ সালে। নরেশ মিত্র পরিচালিত সেই নির্বাক ছবিতে দেবদাস হয়েছিলেন ফণী বর্মা, পার্বতীর ভূমিকায় ছিলেন তারকবালা এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় ছিলেন পারুলবালা।
এরপর এলেন প্রমথেশ বড়ুয়া। তিনি ১৯৩৫ সালে বাংলা, ১৯৩৬ সালে হিন্দি এবং ১৯৩৭ সালে অসমিয়া ভাষায় দেবদাস নির্মাণ করেন। বাংলা সংস্করণে তিনি নিজে দেবদাসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। হিন্দি সংস্করণে দেবদাস হন কুন্দনলাল সায়গল। অসমিয়া সংস্করণে অভিনয় করেন ফণী শর্মা। তিন ভাষায় তিন বছরে নির্মিত এসব চলচ্চিত্র ভারতীয় দর্শকের মনে দেবদাসকে নতুন জীবন দেয়।
এরপর কত দেবদাস এলেন! বিমল রায়ের ১৯৫৫ সালের ছবিতে দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন ও বৈজয়ন্তীমালা। ২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বানসালির নির্মাণে শাহরুখ খান, ঐশ্বরিয়া রাই ও মাধুরী দীক্ষিত। ২০০৯ সালে অনুরাগ কাশ্যপ Dev.D-এর মাধ্যমে কাহিনিটিকে আধুনিক নগরজীবনের সংকটের মধ্যে নিয়ে গেলেন।
তেলুগু, তামিল, বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া, মালয়ালম ও উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষায় কাহিনিটি বারবার পর্দায় ফিরে এসেছে। সরাসরি চলচ্চিত্রায়ন, অনুপ্রাণিত নির্মাণ, টেলিভিশন ও আধুনিক পুনর্কল্পনা একসঙ্গে গোনা হলে সংখ্যাটি উৎসভেদে বদলে যায়। তাই বিশ্বরেকর্ডের দাবি না করে এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায়, দেবদাস দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশিবার চলচ্চিত্রায়িত সাহিত্যকর্মগুলোর একটি।
হয়তো একদিন শুধু দেবদাস নিয়েই পৃথক চলচ্চিত্রোৎসব আয়োজন করা সম্ভব হবে। দর্শক বিচার করতে বসবেন, প্রমথেশ বড়ুয়া, সায়গল, দিলীপ কুমার ও শাহরুখ খানের মধ্যে কার দেবদাস সবচেয়ে স্মরণীয়। পার্বতী হিসেবে যমুনা বড়ুয়া, সুচিত্রা সেন ও ঐশ্বরিয়া রাইয়ের অভিনয় নিয়েও বিতর্ক চলবে।
আর চন্দ্রমুখী? তার আলোচনা আরেক মহাভারত। তবু বাঙালি দর্শকের একটি ব্যক্তিগত আফসোস থেকেই যায়, এত দেবদাসের ভিড়ে উত্তম কুমারকে এই চরিত্রে পাওয়া গেল না কেন?
চলচ্চিত্র কি মূল উপন্যাসকে বদলে দিয়েছে?
চলচ্চিত্রের পর্দায় মৃতপ্রায় দেবদাসকে দেখতে পার্বতীর ছুটে আসা এবং তার সামনে বাড়ির বিশাল ফটক বন্ধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দর্শকের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে। অথচ উপন্যাসে সেই দীর্ঘ দৌড় এবং চোখের সামনে ফটক বন্ধ হওয়ার মেলোড্রামা একইভাবে লেখা হয়নি। চলচ্চিত্রকারেরা দৃশ্যটির নাটকীয় শক্তি বাড়িয়েছেন।
এমন আরও অনেক পরিবর্তনের কারণে আজ আমরা কোন দেবদাস মনে রাখি, তা বলা কঠিন। শরৎচন্দ্রের লেখা উপন্যাস, নাকি প্রমথেশ বড়ুয়া, বিমল রায় কিংবা সঞ্জয় লীলা বানসালির নির্মিত দৃশ্য? সাহিত্য ও চলচ্চিত্র মিলে আমাদের মনে যেন আরেকটি নতুন দেবদাস তৈরি করেছে।
চলচ্চিত্রে দেবদাসকে প্রায়ই সমাজের হাতে পরাজিত এক মহান প্রেমিক হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু উপন্যাসে তার নিজের দায় আরও স্পষ্ট। সামাজিক বাধা ছিল, পরিবারের অহংকার ছিল, শ্রেণিগত দূরত্ব ছিল। তবু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেবদাস নিজেই পিছিয়ে গেছে। তার ট্র্যাজেডি শুধু পার্বতীকে না পাওয়ার নয়, সময় থাকতে সাহসী হতে না পারারও।
সমালোচক বনাম সাধারণ পাঠক
শরৎচন্দ্র মানুষের হৃদয় জয় করার এক অবিশ্বাস্য কৌশল জানতেন। কিন্তু তাঁর এই আবেগময় কাহিনিকথন নিয়ে সাহিত্যিক সমালোচনা কম হয়নি। কোনো কোনো সাহিত্য-ইতিহাসে দেবদাস-এর করুণ পরিণতিতে অতিরিক্ত রং এবং মেলোড্রামার উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। সেই সমালোচনা অমূলক নয়।
কিন্তু এখানেই আবার প্রশ্ন আসে। পাঠকের চোখে জল আনা কি শিল্পের হানি, নাকি শিল্পের একটি বিশেষ ক্ষমতা? শুধু জনপ্রিয় হলেই কোনো সাহিত্যকর্ম মহৎ হয়ে যায় না। আবার সাধারণ পাঠক ভালোবেসেছে বলেই সেই সাহিত্যকে নিচু চোখে দেখাও ন্যায়সংগত নয়।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও শরৎচন্দ্র পেয়েছিলেন। ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক দেয়। ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার বা ডিলিট উপাধি প্রদান করে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি সম্ভবত অন্য জায়গায়। সেটি সাধারণ পাঠকের হৃদয়ে।
নোবেল পুরস্কার নিয়ে অনেক গল্প বলা যায়। কিন্তু লাখো পাঠকের ভালোবাসার পাশে পুরস্কারের হিসাব কতটা জরুরি? ভক্তজনের হৃদয়ে শরৎচন্দ্রের যে স্থান, তার পরিমাপ কোনো একটি পুরস্কার দিয়ে সম্ভব নয়।
কথনের জাদুকর
দেবদাস আজও চমৎকার। দেবদাস হয়তো একটি চরিত্র, কিন্তু দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রায় সে একটি বিশ্বাস, একটি উপমা এবং ব্যর্থ প্রেমের পরিচিত নামে পরিণত হয়েছে। আর শরৎচন্দ্র? তিনি কাহিনি-কথনের এক জাদুকর।
জাদুকর যেমন ঘুরেফিরে মাথার টুপি খুলে কখনো পায়রা, কখনো খরগোশ, কখনো রঙিন ফিতা কিংবা সোনালি রুমাল তুলে আনেন, শরৎচন্দ্রও তেমনি সাধারণ মানুষের গভীর থেকে সুখ, দুঃখ, হাসি, বেদনা ও লুকানো অভিমান টেনে বের করে এনেছেন।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত জাদুগুলোর একটি দেবদাস। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে মানুষ সেই জাদুতে মুগ্ধ। এই জনপ্রিয়তার কারণ শুধু করুণ পরিণতি নয়। শরৎচন্দ্র বিষয়টিকে যে কথনরীতি ও ভাষা দিয়েছিলেন, তার মধ্যেই কাহিনিটির স্থায়ী শক্তি লুকিয়ে আছে।
উপন্যাসের একটি সংক্ষিপ্ত সংলাপ:
“আমি এসেছি পারো।”
পার্বতী কিছুক্ষণ পরে বলল, “কেন?”
“তুমি আসতে লিখেছিলে, মনে নেই?”
“না।”
অল্প কয়েকটি বাক্য। অথচ তার মধ্যে কত ইতিহাস, অভিমান এবং অসম্ভব হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ! সংলাপগুলো যেন পরবর্তী চলচ্চিত্রকারদের জন্য আগে থেকেই দৃশ্যের কাঠামো তৈরি করে রেখেছিল। শরৎচন্দ্র জানতেন, কোথায় কথা থামিয়ে দিলে অব্যক্ত অংশটি পাঠকের মনে আরও জোরে বাজবে।
দেবদাস কি কখনো পুরোনো হবে?
হয়তো হবে না। কারণ দেবদাস শুধু একজন ব্যর্থ প্রেমিকের নাম নয়। সে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারা মানুষের নাম। সে পরিবারের সামনে নিজের সত্য উচ্চারণ করতে ব্যর্থ মানুষের নাম। সে ভালোবাসাকে দায়িত্বে পরিণত করতে না পেরে অনুশোচনায় জীবন নষ্ট করা মানুষের নাম।
আর পার্বতী ও চন্দ্রমুখী শুধু তার প্রেমকাহিনির দুটি নারী নয়। তাঁরা ভিন্ন সামাজিক অবস্থান থেকে ভালোবাসা, আত্মমর্যাদা, প্রত্যাখ্যান, দায়িত্ব ও পরিবর্তনের ভিন্ন ভাষা তৈরি করেন। দেবদাস ভেঙে পড়ে, কিন্তু তাঁরা নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার পথ নির্মাণ করেন।
এ কারণেই প্রতিটি যুগ নিজের মতো করে দেবদাস পড়ে। এক যুগ তার প্রেম দেখে, আরেক যুগ তার কাপুরুষতা দেখে। কেউ সামাজিক বিভাজন দেখে, কেউ আত্মবিনাশী পুরুষের সংকট। কেউ পার্বতীকে নতুন করে আবিষ্কার করে, কেউ চন্দ্রমুখীর মানবিক মর্যাদা।
দেবদাসের জীবন শেষ হয়েছিল পার্বতীর দরজার বাইরে। কিন্তু পাঠকের মনে সেই বন্ধ দরজা আজও একটি প্রশ্ন খুলে দেয়: সময় থাকতে ভালোবাসার পক্ষে দাঁড়াতে না পারলে, পরে শুধু ভালোবাসলেই কি তার দায় শেষ হয়ে যায়?
তথ্যসূত্র ও সহায়ক পাঠ
১. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দেবদাস, মূল বাংলা পাঠ, ষোলো পরিচ্ছেদ।
২. বাংলাপিডিয়া, “চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র”, লেখকের জীবন, সাহিত্যকর্ম ও সম্মাননাবিষয়ক নিবন্ধ।
বাংলাপিডিয়ায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
৩. Adorn Publication, দেবদাস-এর রচনাকাল, পত্রিকায় প্রকাশ ও প্রথম গ্রন্থপ্রকাশের সংক্ষিপ্ত তথ্য।
Adorn Publication: দেবদাস
৪. Corey K. Creekmur, “The Devdas Phenomenon”, University of Iowa, Indian Cinema।
University of Iowa: The Devdas Phenomenon
৫. Salman Al-Azami এবং Tasleem Shakur, “Saratchandra’s Devdas: A Comparison Between the Original Bengali Text and its Two Hindi Film Adaptations”, Liverpool Hope University Repository।
Liverpool Hope University Repository
৬. Aliza Rahman, “The Progressive Depiction of Women in Devdas”, The Daily Star, ১৭ নভেম্বর ২০২৩।
৭. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম আর্টস, “শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস (১৯১৭)”, ১৬ অক্টোবর ২০১১।
বিডিনিউজ আর্টস: দেবদাস
পুনঃপ্রকাশ ও সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: শ্রীমতী স্মৃতি দত্তের লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৪ এপ্রিল ২০২২-এ ব্যাকস্পেস জার্নাল-এ। মূল ওয়েবসাইটে লেখাটি বর্তমানে সরাসরি পাওয়া না যাওয়ায় Internet Archive-এ সংরক্ষিত সংস্করণ থেকে পাঠটি উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমান সংস্করণে লেখিকার মূল বক্তব্য, স্বর, সাহিত্যিক মূল্যায়ন ও স্মরণীয় উপমা সংরক্ষণ করে বানান, বাক্যগঠন, পুনরাবৃত্তি এবং কয়েকটি তথ্যগত অসংগতি সংশোধন করা হয়েছে। অযাচাইকৃত প্রত্যক্ষ উদ্ধৃতি ও জীবনীমূলক গল্প বাদ বা সীমিত ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখজনক
0
চমৎকার
0